হাইপেশিয়া: প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

হাইপেশিয়া

যখন প্রাচীন দর্শনের সেই জগতটির কথা কল্পনা করতে বলা হয়, অধিকাংশই টোগা পরিহিত দাড়িসহ একগুচ্ছ বৃদ্ধের কথা ভাবেন। কিন্তু উন্মুক্ত চত্বরে একজন নারী বক্তৃতা দিচ্ছেন, এবং তার সেই বক্তৃতা শোনার আকর্ষণে সেখানে বহু দূর থেকে আসা শ্রোতা-দর্শকদের একটি বড় জমায়েত সৃষ্টি হয়েছে – এমন দৃশ্য অধিকাংশেরই ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আর এটি হচ্ছে আরো বহু কারণের একটি – আলেক্সান্ড্রিয়ার হাইপেশিয়া কেন এত আকর্ষণীয় এক চরিত্র।

হাইপেশিয়া ছিলেন একজন গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক। তিনি ছিলেন প্রথম দার্শনিকদের একজন, যিনি ছিলেন একজন নারী এবং যার জীবনের মূল ঘটনাগুলো সম্বন্ধে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বিবরণ আছে। এই সত্য সত্ত্বেও, বহু পুরাণ তাকে পরিবেষ্টিত করে আছে। তার মৃত্যু পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় তিনি কবিতা, সাহিত্য, শিল্পকলা, এবং এমনকি ‘আগোরা’ নামে একটি ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রে ( ইংরেজি ভাষায় যে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল স্পেনে) কেন্দ্রীয় চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছিলেন, প্রখ্যাত অভিনেত্রী র‍্যাচেল ভাইজ যেখানে হাইপেশিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এইসব কাহিনীগুলো, যদিও উপভোগ্য, কিন্তু হাইপেশিয়ার জীবন এবং কাজ সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সংশয় সৃষ্টি করেছে। আর সেকারণেই কিংবদন্তীর এইসব আস্তরণগুলো সরিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ, যেন হাইপেশিয়া আসলেই যেমন মানুষ ছিলেন, সেটি আমরা প্রকৃতভাবে মূল্যায়ন করতে পারি।

র‍াফায়েল, স্কুল অব এথেন্সের ডিটেইল, হাইপেশিয়া (ফ্রানচেসকো মারিয়া ডেলা রোভেরে ছিলেন এর মডেল) 

মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে (যদিও সঠিক তারিখটি আমাদের অজানা) হাইপেশিয়া জন্মগ্রহন  করেছিলেন। আলেক্সান্ড্রিয়া তখন রোম সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল। প্রসঙ্গক্রমে, এটি ছিল আলেক্সান্ড্রিয়ার আরেকজন বিখ্যাত নারী, সপ্তম ক্লিওপেট্রার জন্মের প্রায় ৪০০ বছর পরের ঘটনা। আলেক্সান্ড্রিয়া শহরটি জ্ঞানচর্চার একটি কেন্দ্র হিসাবে সুপরিচিত ছিল, এটি প্রায় এথেন্সের সমকক্ষ ছিল। শহরের বিখ্যাত শিক্ষক-পণ্ডিতদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে বহু দূর দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এই শহরে আসতেন। ধারণা করা হয়, হাইপেশিয়ার বাবা থিওন, আলেক্সান্ড্রিয়ার মর্যাদাপূর্ণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ছিল – যে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ছিল ‘মোউসেইওন’। থিওন একজন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ এবং শিক্ষক ছিলেন, যিনি তার জীবদ্দশায় বহু গণিতের বই সম্পাদনা করেছিলেন তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ বইটির একটি আদি সংস্করণ সম্পাদনা। এই বইটি গণিতে আদি পর্বের বহু মৌলিক সূত্র আর মূলনীতিগুলোর বিবরণ দিয়েছিলেন। এবং থিওনের এই বইটি সংক্রান্ত আলোচনা ও সংযোজন এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, হাইপেশিয়ার মা সম্বন্ধে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই এবং লিপিবদ্ধ ইতিহাস তার সম্বন্ধে কোনো তথ্য নেই।

থিওন খুব অল্প বয়স থেকে হাইপেশিয়াকে গণিত আর দর্শন শিখিয়েছিলেন, এবং উৎসগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, হাইপেশিয়া তার মেধায় খুব দ্রুত বাবাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। পঞ্চম-শতাব্দীর বাইজানটাইন ইতিহাসবিদ সক্রেটিস স্কলাসটিকাস তার ‘ইক্লেসিয়াসটিকাল হিস্টরি’ বইয়ে লিখেছিলেন, “দার্শনিক থিওনের কন্যা হাইপেশিয়া সাহিত্য এবং বিজ্ঞানে এমন কিছু অর্জন করেছিলেন যে, তিনি তার সমসাময়িক সব দার্শনিকদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন”। তার গাণিতিক অর্জনের ক্ষেত্রে, হাইপেশিয়া বহু সংখ্যক গাণিতিক বই সম্পাদনা এবং সেগুলো নিয়ে মন্তব্য-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা লিখেছিলেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল টলেমির ‘আলমাজেস্ট’-এর বইগুলো। আর এই লেখার মধ্যেই তিনি তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গাণিতিক অবদান রেখেছিলেন দীর্ঘ ভাগ করার পদ্ধতি একটি উন্নত পদ্ধতি আবিষ্কার করার মাধ্যমে, ‘ট্যাবুলার’ পদ্ধতি হিসাবে যা বর্ণিত হয়েছিল। এছাড়াও তিনি ডিওফ্যানটাসের তের খণ্ডের “অ্যারিথমেটিকা” ওপর তার মন্তব্য বিবরণী ও পর্যালোচনা লিখেছিলেন এবং “হ্যান্ডি টেবলস অব টলেমি” বইটির একটি নতুন সংস্করণ সংকলন করেছিলেন,  কোনিক সেকশনসংক্রান্ত জ্যামিতি বিষয়ক অ্যাপোলিনিয়াসের বইটির বিবরণ লিখেছিলেন (গণিতে, একটি কোনিক সেকশন অথবা শুধু কোনিক হচ্ছে একটি বক্ররেখ যা কোনো কোন আর একটি সমতলের প্রস্থচ্ছেদে আমরা পাই। তিন ধরনের কোনিক সেকশন আছে, হাইপারবোলা [অধিবৃত্ত], প্যারাবোলা [পরাবৃত্ত] এবং এলিপস [উপবৃত্ত], এবং বৃত্ত হচ্ছে উপবৃত্তের একটি বিশেষ পরিস্থিতি, যদিও একটি চতুর্থ ধরনের কোনিক সেকশন বলা হয়)। তার গাণিতিক বিষয়সংক্রান্ত লেখাগুলো ছাড়াও তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা যন্ত্র নির্মাণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন, যেমন অ্যাস্ট্রোল্যাব, যে যন্ত্রটি গ্রহদের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য ব্যবহার করা হতো।

যেহেতু হাইপেশিয়ার দর্শন সংক্রান্ত কোনো লেখার আজ অস্তিত্ব নেই, সেকারণে আমাদের জানা নেই তিনি কোনো মৌলিক ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন কিনা। তবে, গবেষকরা মনে করেন, এমন কিছু হবার সম্ভাবনা কম, কারণ সেই সময়কার পণ্ডিত ও গবেষকরা নতুন মৌলিক কোনো ধারণা রচনা করা নয়, বরং ইতোমধ্যে বিদ্যমান কাজগুলোর বিশ্লেষণ এবং বিবরণী রচনা, তাদের পূর্ববর্তীদের ধারণাগুলো আরো বিস্তারিত ও বিকশিত করা নিয়েই মূলত ব্যস্ত ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন বিদ্যমান বইগুলোকে সংরক্ষণ করাই ছিল মূলত এর কারণ, বিশেষ করে আলেক্সান্ড্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরিটি ধ্বংস হবার পরে, যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়েছিল। আর সে কারণেই হাইপেশিয়াকে নতুন আবিষ্কারকের চেয়ে বরং আরো বেশি দক্ষ একজন গাণিতিক ব্যাখ্যাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কেন, তাহলে হাইপেশিয়াকে একজন দক্ষ দার্শনিক হিসাবে আমাদের বিবেচনা করা উচিত হবে? এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে তিনি তার শিক্ষার্থীদের যা শিক্ষা দিতেন সেটির দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে, কারণ শিক্ষকের ভূমিকায় হাইপেশিয়া সত্যিকারভাবেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং নিজেকে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। একাধিক ঐতিহাসিক সূত্র  দর্শন সংক্রান্ত তার শ্রেণীকক্ষের বক্তৃতাগুলোর জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর সেই বক্তৃতা শুনতে শুধুমাত্র উৎসাহী শিক্ষার্থীরাই উপস্থিত হতে না, সেই সময়ের রাজনৈতিক নেতারাও আসতেন। তার ছাত্রদের একজন, সাইনেসিয়াস অব সাইরিনি, তার কাজে এতই গুণমুগ্ধ ছিলেন যে তিনি হাইপেশিয়াকে উদ্দেশ্য করে লেখা সব চিঠিতে তাকে কেবল ‘দার্শনিক’ নামে সম্বোধন করতেন। তার বন্ধুকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে, হাইপেশিয়া ছিলেন “এত সুপরিচিত একজন, তার সুখ্যাতি আক্ষরিকভাবেই অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমরা দেখেছি এবং নিজ কানে শুনেছি তিনি সন্মানের সাথে দর্শনের রহস্যগুলোর উপর পৌরহিত্য করেছেন”। হাইপেশিয়ার কাছ থেকে শিক্ষা নিতে সাইনেসিয়াস প্রায়শই তরুণদের বহু দূর থেকে আলেক্সান্ড্রিয়ায় প্রেরণ করতেন।

মাঝে মধ্যে হাইপেশিয়ার শিক্ষার্থীদের এই মুগ্ধতা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশস্তির খানিকটা বেশি কিছুতে পরিণত হতো, কারণ তার সৌন্দর্য তার শ্রেণীকক্ষের বহু তরুণকে তার প্রেমে পড়তে প্ররোচিত করেছিল। হাইপেশিয়া, নিজে অবশ্যই এই ধরনের কোনো আবেগ দ্বারা তাড়িত হননি, এবং সব তথ্যসূত্র অনুযায়ী তার মৃত্যু অবধি তিনি কুমারী ছিলেন। একটি বিখ্যাত সাক্ষাৎকার, যা বর্ণনা করেছিলেন প্লেটোনিক দার্শনিক দামাসকিয়াস, যেখানে হাইপেশিয়া তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুরক্ত ছাত্রটির মুগ্ধতাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে একটি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে, তিনি আশা করেছিলেন এই বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজের একঘেয়েমি তার অনুরাগীকে ক্লান্ত  করে তুলবে। যখন এই পদ্ধতি আশানুরূপ কোনো ফল দেয়নি হাইপেশিয়া বাধ্য হয়েছিলেন আরো চরম পন্থা গ্রহন করতে, এবং একদিন তিনি তার মাসিকের রক্তে রক্তাক্ত কাপড়ের টুকরোটি বের করে ছেলেটির মুখের সামনে দুলিয়ে বলেছিলেন, সে যা চাইছে সেটি আসলে যৌন কামনা, আর এটি তার মেধা আর দর্শনের সত্যিকারের বিস্ময়ের সাথে তুলনা করার মত সুন্দর কিছু নয়। হয়তো বিস্ময়কর নয়, হাইপেশিয়া তরুণের আগ্রহটিকে আরো অগ্রসর হওয়া থেকে থামাতে পেরেছিলেন যখন তার আত্মা “লজ্জা আর বিস্ময়ে সেই অসুন্দর দৃশ্য দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, এবং সে তার সঠিক মানসিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেছিল”।

যখন তিনি শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা দিতে ব্যস্ত থাকতেন না,  হাইপেশিয়া বক্তৃতা দিতে, জনগনের জন্য উন্মুক্ত চত্ত্বরে যেতেন। ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রগুলো বর্ণনা করেছে যে, হাইপেশিয়া “যদিও একজন নারী, কিন্তু তিনি দার্শনিকের আলখাল্লা পরেই শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতেন”। আমরা জানি যে, তিনি প্লেটো, অ্যারিস্টোটল, এবং অন্য দার্শনিকদের কাজ সম্বন্ধে উন্মুক্তভাবেই শিক্ষা দিতেন যে কাউকেই, যারা তার কথা শুনতে আগ্রহী হতেন। এটি সেই সময়কার পুরুষ দার্শনিকদের জন্য স্বাভাবিক একটি আচরণ ছিল, কিন্তু জনসমক্ষে এভাবে শিক্ষাদানের ব্যাপারটি একজন নারীর জন্য খুবই ব্যতিক্রম একটি ঘটনা ছিল। তার শিক্ষার জন্য অগণিত শিক্ষার্থীর কাছে হাইপেশিয়ার অত্যন্ত সম্মানজনক একটি অবস্থান, তার অসাধারণ প্রতিভারই সাক্ষ্য, শুধুমাত্র দর্শন নয় এছাড়াও একজন আকর্ষণীয় এবং কূটনৈতিক বক্তা হিসাবেও, বুদ্ধিমত্তার দ্বারা যিনি শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছিলেন।

এছাড়াও হাইপেশিয়ার জনপ্রিয়তার আংশিক একটি কারণ ছিল বিচিত্র ধরনের মানুষ এবং দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি তার উন্মুক্ততা এবং তাদের ধারণাগুলো অন্তর্ভুক্তিকরণ করার ক্ষমতা। যদিও তিনি  নিজে একজন প্যাগান (বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর কোনোটিতেই বিশ্বাসী নয় এমন কেউ) ছিলেন, কিন্তু শিক্ষার্থী হিসাবে তিনি বহু খ্রিস্টান এবং ইহুদী শিক্ষার্থীদের গ্রহন করেছিলেন এবং শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা খুবই উল্লেখযোগ্য একটি বিষয়, সেই সময়ের ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসন্তোষ আর উত্তেজনার কথা যদি বিবেচনা করা হয়। তার ছাত্র এবং বন্ধু সাইনেসিয়াস পরে একজন খ্রিস্টান বিশপ হয়েছিলেন, এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন ওরেস্টস, যিনি আলেক্সান্ড্রিয়ার গভর্নর ছিলেন। এই সম্পর্কগুলোর মাধ্যমে খুবই প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে তার তিনি একটি খ্যাতি নির্মাণ করেছিলেন, রাজনৈতিক নেতারা তাদের কাজের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা মোকাবিলা করতে প্রায়শই তার উপদেশ প্রার্থনা করতেন।

সুতরাং হাইপেশিয়া একজন শিক্ষক-গবেষক এবং মেধাবী গণিতজ্ঞ ছাড়াও আরো বেশি কিছু ছিলেন। তিনি একজন জনবুদ্ধিজীবী ছিলেন, যিনি তার সৃষ্টি করা সংযোগগুলোর মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সমাজে আর ভূমিকাকে ব্যবহার করেছিলেন। দামাসকিয়াস সুন্দরভাবে এটি বর্ণনা করেছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন:

 “হাইপেশিয়ার শৈলী ছিল এরকম: তিনি শুধু অলঙ্কারশাস্ত্র আর দ্বান্দিক ন্যায়শাস্ত্রেই দক্ষ ছিলেন না, এছাড়াও তিনি ব্যাবহারিক বিষয়গুলোয় বিশেষভাবে প্রাজ্ঞ ছিলেন, নাগরিকদের অধিকার, চাহিদা আর স্বার্থরক্ষায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। এভাবেই, তিনি পুরো শহরেই ব্যপকভাবে গভীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাকে সেভাবে সম্মানের সাথে স্বাগত জানানো ও সম্বোধন করা হতো”।

দুঃখজনকভাবে তার এই নাগরিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহন এবং ক্ষমতাবান ও রাজনীতিবিদদের উপর তার প্রভাব একটি পর্যায়ে তার নৃশংস মৃত্যুর কারণ হয়েছিল, আর সেই মৃত্যুর কাহিনী দূর্বল চিত্তের কারো শোনার মত কাহিনী নয়। ৩৪২ থেকে ৪১২ খ্রিস্টাব্দ অবধি আলেক্সান্দ্রিয়ার পোপ ছিলেন থিওফিলাস নামের একজন ব্যক্তি, তাদের বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও যিনি হাইপেশিয়ার সাথে একটি সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তবে থিওফিলাসের মৃত্যুর পর, তার ভাইপো সিরিল শহরের ক্ষমতা নেবার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন। সিরিলের একজন সমালোচক ছিলেন হাইপেশিয়ার বন্ধু ওরেস্টেস, যিনি এই সংঘর্ষ মোকাবেলা করতে হাইপেশিয়ার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। সিরিলের সমর্থকদের মধ্যে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হাইপেশিয়ার কারণেই ওরেস্টেস আর সিরিল তাদের পারস্পরিক দন্দ্ব মিটিয়ে ফেলতে পারছেন না, আর যার কারণে শহরে আরো বেশি পরিমানে সহিংসতার বিস্তার ঘটছে। এই গুজব শুরু হবার অল্প কিছুদিন পরেই, পারাবালানি (পারাবালানি একটি ভ্রাতৃত্ব-সংগঠন, যা খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসের আদি পর্বে অসুস্থদের সেবা ও মৃতদের সৎকার জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলেছিল, যা সেই সময় বিপজ্জনক একটি কাজ ছিল, প্রায়শই তারা স্থানীয় বিশপের সাথে কাজ করতো, এবং তাদেরকে দেহরক্ষী হিসাবে বিশপরা ব্যবহার করতেন, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের সাথে সহিংস সংঘর্ষে।) নামে পরিচিত সন্ন্যাসীদের একটি দল হাইপেশিয়াকে বহন করা একটি ঘোড়াগাড়ির উপর আক্রমণ করেছিল, যখন তিনি শহরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা হাইপেশিয়ার শরীরে সমস্ত কাপড় খুলে তাকে নগ্ন করেছিল এবং তার শরীরটিকে বেশ কয়েক টুকরোয় খণ্ডিত করে হত্যা করেছিল, আর এই বীভৎস নিষ্ঠুরতায় তারা ব্যবহার করেছিল এমন কিছু অস্ত্র, যা একটি গ্রিক অনুবাদের ইঙ্গিত অনুযায়ী ঝিনুকের খোলস কিংবা ছাদে ব্যবহৃত টাইল হতে পারে। এরপর তারা তার শরীরের খণ্ডাংশগুলো শহরের মধ্য দিয়ে টেনে হেচড়ে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তারা তার শরীরের অবশিষ্টাংশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল।

হাইপেশিয়ার এই নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো আলেক্সান্ড্রিয়াকে প্রকম্পিত করেছিল, শুধুমাত্র এই ঘটনা অভূতপূর্ব বিভৎসতার কারণেই নয়, বরং এ ছাড়াও সেই সময় অবধি, দার্শনিকরা শহুরে জীবনে সব কিছুর উর্ধে, অস্পৃশ্য বলেই বিবেচিত হতেন। ওরেস্টেসের সমর্থকদের আরো অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডটির প্রত্যাশিত উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল , এবং খুব শীঘ্রই সিরিল শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দখল করে নিয়েছিল। হাইপেশিয়ার হত্যাকাণ্ডটি সিরিলের নির্দেশে ঘটেছিল, নাকি এটি সেই সময়ে আলেক্সান্দ্রিয়া বিদ্যমান আরো ব্যাপক অস্থিতিশীলতা, উৎকণ্ঠা আর সহিংসতার একটি পরিণতি, সেটি নিয়ে বিতর্ক এখনো অমীমাংসিত। তবে যা-ই হোক না কেন, এটি স্পষ্ট যে হাইপেশিয়ার সামাজিক মর্যাদা এবং প্রভাব তাকে সহিংসতার একটি নিশানায় পরিণত করেছিল।

দর্শনের প্রথম জ্ঞাত নারী শহীদ, হাইপেশিয়ার নাটকীয় হৃদয়বিদারক ইতিহাসকে প্রায়শই নানা ধরনের লক্ষ্য সমর্থন কিংবা বিরোধিতা করতে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক সময়ের প্রারম্ভে হাইপেশিয়া জন টোল্যান্ডের একটি বইয়ের মূল চরিত্র হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, বইটির নাটকীয় ( এবং দীর্ঘ ) শিরোনাম ছিল: “হাইপেশিয়া: অর, দ্য হিস্টরী অব এ মোস্ট বিউটিফুল, মোস্ট ভার্চুয়াস, মোস্ট লার্নেড, অ্যান্ড এভরিওয়ে অ্যাকমপ্লিশড লেডি: হু ওয়াস টর্ন টু পিসেস বাই দ্য ক্লার্জি অব আলেক্সান্দ্রিয়া টু গ্রাটিফাই দা প্রাইড. এম্যুলেশস অ্যান্ড ক্রয়েলটি অব দেয়ার আর্চবিশপ, কমনলি বার আনডিজার্ভডলি স্টিল’ড সেইন্ট সিরিল”। শুধু শিরোনাম নয় হাইপেশিয়ার জীবন নিয়ে টোল্যান্ডের স্পষ্টতই অতিরঞ্জন বইয়ের বাকি অংশেও প্রবেশ করেছিল, তার ক্যাথলিক-বিরোধী লক্ষ্য পূরণের প্রত্যাশায় যেখানে তিনি মনগড়া কিছু কাহিনী রচনা করেছিলেন। টোল্যান্ডের এই বইটির ভ্রান্তিগুলোর বিবরণ দিয়ে টমাস লিউইস পরবর্তীতে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে নাটকীয়তার প্রতি টোল্যান্ডের অতি-প্রবণতায় প্ররোচিত হয়ে। লিউইস তার এই প্রবন্ধটির শিরোনাম দিয়েছিলেন, “দ্য হিস্টরী অব হাইপেশিয়া, এ মোস্ট ইমপুডেন্ট স্কুল-মিস্ট্রেস অব আলেক্সান্ড্রিয়া, মার্ডারড অ্যান্ড টর্ন টু পিসেস বাই দ্য পপুলেস, ইন ডিফেন্স অব সেইন্ট সিরিল অ্যান্ড দ্য আলেক্সান্ড্রিয়ান ক্লার্জি, ফ্রম দ্য অ্যাসপারসনস অব মি টোল্যান্ড”। এই দুটি লেখাতেই আমরা দেখি হাইপেশিয়াকে মেয়েলি ‘স্টেরিওটাইপ’ বা  গৎবাঁধা ধারণা হিসাবে পুনঃসূত্রবদ্ধ করা হয়েছে, যা ইচ্ছাকৃতভাবেই তার অস্তিত্বের বাস্তবতা আর জটিলতাকে উপেক্ষা করেছে।

১৮৫৩ সালে, চার্লস কিংসলি হাইপেশিয়াকে নিয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, যা তাকে আরো বড় জনগোষ্ঠীর কাছে কাছে সুপরিচিত একটি চরিত্রে রূপান্তরিত করেছিল। ১৯০৮ সালে আমেরিকান লেখক এলবার্ট হুবার্ড একটি বই লিখেছিলেন যেটিকে তিনি হাইপেশিয়ার একটি জীবনী হিসাবে দাবী করেছিলেন। তবে, এই বইটি কাহিনী এবং অগণিত অপ্রমাণসিদ্ধ দাবি দিয়ে পূর্ণ ছিল। এই ধরনের বইগুলো হাইপেশিয়ার একটি কাল্পনিক, রোমান্টিক ইমেজ নির্মাণ করেছিল এবং তার জীবন ঘিরে পুরাণগুলোও সংখ্যাবৃদ্ধি করেছিল, যার অনেকগুলো এখনো টিকে আছে।

বিংশ শতাব্দীতে, উঠতি নারীবাদী আন্দোলন হাইপেশিয়ার কাহিনীটিকে গ্রহন করে নিয়েছিল। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের স্ত্রী, ডোরা রাসেল, নারী আর পুরুষের মধ্যকার শিক্ষাবৈষম্য নিয়ে আলোচনা করে একটি বই লিখেছিলেন, যার শিরোনাম ছিল “হাইপেশিয়া অর উওম্যান অ্যান্ড নলেজ” (১৯২৫)। এই বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন: “হাইপেশিয়া ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চার্চের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যার নিন্দা করেছিলেন, এবং খ্রিস্টানরা যাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করেছিল। এই বইটির নিয়তি সম্ভবত তেমনই হবে”। রাসেলের বক্তব্য ছিল – এমনকি হাজার বছর পরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুরুষ-প্রধান একটি স্থান হিসাবেই রয়ে গেছে, যেখানে নারীদের প্রা্য়শই গুরুত্বের সাথে গ্রহন করা হয় না। আর সে কারণে হাইপেশিয়ার উত্তরাধিকার এতই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন প্রথম সেই নারীদের একজন, যিনি সফলভাবে শিক্ষায়তিক জ্ঞানের বলয়ে প্রবেশ করতে সফল হয়েছিলেন, যে বলয়টি মূলত পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

হাইপেশিয়া নিজেও দর্শন আর সমাজকে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হিসাবে দেখেছিলেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং গণিতের প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন, কিন্তু একই সাথে তিনি তার জ্ঞান আর কুটনৈতিক প্রাজ্ঞতাকে সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি নিজেকেই শ্রেণীকক্ষ বা লাইব্রেরিতে সীমাবদ্ধ রাখতে পারতেন। শিক্ষাদান আর লেখালেখি করে শান্ত জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি তারা মতামত প্রকাশ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং সার্বিক সামাজিক কল্যাণের জন্য তার রাজনৈতিক প্রভাবটিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, যে ঝুঁকি অবশেষে তার মৃত্যুর কারণে পরিণত হয়েছিল।

কাহিনী ছাড়িয়েও, আমরা জানি যে হাইপেশিয়া ছিলেন একজন বুদ্ধিমান, আকর্ষণীয় চরিত্রর সাহসী একজন নারী। খুব সম্ভবত তিনি তার সময়ে নেতৃস্থানীয় শিক্ষক ছিলেন, এছাড়াও সমাজ-সচেতনতার কারণে তিনি আলেক্সান্ড্রিয়ায় একজন গুরুত্বপূর্ণ জনবুদ্ধিজীবী ছিলেন। আমি আশা করি যে তিনি আরো বেশি নারীকে এমন ঝুঁকি নিতে অনুপ্রাণিত করবেন, সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করার অভিপ্রায়ে যারা দার্শনিক আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে চত্ত্বর অভিমূখে হেঁটে যাবেন ।

আরো জানতে:

স্কলাসটিকাস, সক্রেটিস, দি এক্লেসিয়াসটিকাল হিস্টরি, ৪৪০
দ্য লেটারস অব সাইনেসিয়াস, বিশপ অব টলেমায়িস, ৩৯৪-৪১৩
দামাসকিয়াস, লাইফ অব ইসিডোরে, ৫৩০
এ.বি. মাইকেল ডিকিন, হাইপেশিয়া অব আলেক্সান্ড্রিয়া, ম্যাথমেটিশিয়ান অ্যান্ড মার্টার (২০০৭)
মারিয়া ডিজিয়েলস্কা, হাইপেশিয়া অব আলেক্সান্ড্রিয়া (রিভিলিং অ্যান্টিকুইটি) (১৯৯৬)
হিস্টরি চিকস পডকাস্ট, এপিসোড ৯৫: হাইপেশিয়া অব আলেক্সান্ড্রিয়া
ডোরা রাসেল, হাইপেশিয়া: অর উওম্যান অ্যান্ড নলেজ (১৯৭৬)
এডওয়ার্ড জে. ওয়াটস, হাইপেশিয়া: দ্য লাইফ অ্যান্ড লিজেন্ড অব অ্যান অ্যানসিয়েন্ট ফিলোসফার (২০১৭)

হাইপেশিয়া: প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

One thought on “হাইপেশিয়া: প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s