জেরি কয়েনের হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু

মূল: জেরি অ্যালেন কয়েন
অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান

প্রকাশনা: উড়াল বুকস/ অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানী

মার্চ ২০২১

অর্ডার করতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন অথবা কল করুন 16297
https://www.rokomari.com/book/204435/why-evolution-is-true
পাওয়া যাবে, অমর একুশে বইমেলা স্টল নম্বর : ৪৪১-৪৪২-এ

জেরি কয়েনের হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু

রিচার্ড ডকিন্সের দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ

মূল: The Greatest Show on Earth – Richard Dawkins
অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান
প্রচ্ছদ : আসমা সুলতানা
প্রকাশক: দিব্য প্রকাশ, ২০১৯
(অমর একুশে বইমেলা ২০২১ এ দিব্যপ্রকাশের স্টল নং ২৭৩-৭৬ টি এস সির গেইটের দিকে)

রিচার্ড ডকিন্সের দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ

রিচার্ড ডকিন্সের দ্য সেলফিশ জিন

দ্য সেলফিশ জিন
মূল : রিচার্ড ডকিন্স
অনুবাদ : কাজী মাহবুব হাসান
প্রচ্ছদ : আসমা সুলতানা

প্রকাশনা:
Agrodoot & Company
+880 1752-176671
agrodootbd@gmail.com

একুশে বই মেলায় স্টল নম্বর : ৪৪১-৪৪২, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

রিচার্ড ডকিন্সের দ্য সেলফিশ জিন

বিল ব্রাইসনের দ্য বডি

মূল: The Body: A Guide for Occupants – Bill Bryson
অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান
প্রচ্ছদ : আসমা সুলতানা
প্রকাশক: দিব্য প্রকাশ, ২০২১
(অমর একুশে বইমেলা ২০২১ এ দিব্যপ্রকাশের স্টল নং ২৭৩-৭৬ টি এস সির গেইটের দিকে)

ভূমিকার পরিবর্তে..

You don’t need a science degree to understand about science. You just need to think about it.’ Bill Bryson

এ বইটি শরীর নামে বিস্ময়কর জিনিসটির একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা। এটি বিল ব্রাইসনে ‘দ্য বডি: এ গাইড ফর দ্য অকুপ্যান্টস (ডবলডে, ২০১৯) বইটির একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা। এই বইটি হাতে তুলে নিয়ে যখন আপনি এই ভূমিকার কয়েকটি শব্দ পড়বেন, হয়তো অনুভব নাও করতে পারেন, আপনার শরীরটি তখন খুবই ব্যস্ত। আপনার ফুসফুস কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ৩০০ সেক্সটিলিয়ন অক্সিজেন অণু শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে ব্যবহার করবে। আপনার হাড়ের মজ্জা ২০০ মিলিয়ন নতুন লোহিত রক্ত কণিকা তৈরী করে ফেলবে। যে হাতটি এই বইটি ধরে আছে সেটি প্রকৃতির অসাধারণ একটি সৃষ্টি, যা নিয়ন্ত্রণ করছে কনুইয়ের নীচে থাকা একগুচ্ছ মাংসপেশী, চোখের প্রতিটি পলক আপনার চোখকে রক্ষা করছে, আপনার মস্তিষ্ক আপনার ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রবেশ করা তথ্যগুলো ব্যবহার করে একটি বাস্তবতার সৃষ্টি করছে, আপনার হৃৎপিণ্ড আপনার অজান্তেই স্পন্দিত হচ্ছে। শরীর প্রতিবাদ না করলে প্রায়শই এই রক্ত-মাংসের বিস্ময়কর যন্ত্রটির দিকে আমরা নজরই দেই না। এই বইটি তাই আপনাকে বিস্মিত করবে, শরীরের প্রতি যত্নশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে, কারণ এটাই আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এখানেই আমাদের মূল বসবাস।

সন্দেহ নেই যে শরীর সুপরিকল্পিত কোনো যন্ত্র নয়, কারণ দীর্ঘ বিবর্তনীয় ঐতিহ্য এটি ধারণ করে আছে। অবশ্যই অনায়াসে এ যন্ত্রটি সমস্যা তৈরি করতে পারে, আমাদের আধুনিক জীবন আর বিবর্তনীয় অতীতের অসামঞ্জস্যতার বহু অসুখের কারণ হিসাবে অনায়াসেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কিন্তু এই পারস্পরিক নির্ভরশীল প্রায় ৩৭.২ ট্রিলিয়ন কোষগুচ্ছ যা আমাদের একেবারেই নিজস্ব সম্পদ, সেটি সার্বিকভাবেই বিস্ময়কর একটি কাঠামো। আর আমরা যারা এটি সারক্ষণ ব্যবহার করছি সে বিষয়ে তাদের ন্যুনতম কিছু জানাও দরকার। বিল ব্রাইসন, যিনি ইতিপূর্বে বিজ্ঞান ও ইতিহাস নিয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নির্দেশিকা ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব এভরিথিং’ লিখেছিলেন, তিনি এবার দৃষ্টি দিয়েছেন আমাদের শরীরের দিকে।

বইটির প্রতি অধ্যায় আমাদের শরীরের একেকটি অংশকে নিয়ে। ইতিহাস, জীবনী, ব্যক্তিগত কাহিনি, বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার, শব্দের উৎস সম্বন্ধে জ্ঞান ইত্যাদির একত্র বুননে সৃষ্টি অধ্যায়গুলোকে করা হয়েছে। আর এর পরিণতি তথ্যবহুল, সহজপাঠ্য, কখনো চমকে দেয়ার মত তথ্যসহ একটি বই, যা পাঠককে হতাশ না করার সম্ভাবনা বেশি। এই বইটির মধ্যে আমরা কিছু অজানা অপরিচিত বীরোচিত ব্যক্তির দেখা পাবো, বহু বিচিত্র উপায়ে যাদের অবদান আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, অথচ তাদের অনেকের নামই আমরা জানিনা, অথচ তাদের অবদানের কারণে তারা এক একটি স্মারকস্তম্ভ পাবার যোগ্যতা রাখেন। এছাড়াও জানবো চিকিৎসা বিজ্ঞানের গতিধারা বদলে দেয়া ক্ষুদ্র কিছু আবিষ্কার, যেগুলোর যুগান্তকারী ভূমিকা মূল্যায়ন করা কেবল আমাদের মত উত্তর প্রজন্মের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে।

বইটি একই সাথে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বেশ কিছু ভূল ধারণা চিহ্নিত করে তাদের প্রকৃত রুপটিকে স্পষ্ট করেছে, কিছু ক্ষেত্রে আমাদের চারপাশে সেই মিথগুলোকে আবর্তিত হতে থাকা সামাজিক বাণিজ্যিক বাস্তবতা যেভাবে বিভ্রমের পর্দা টেনে রেখেছে সেখানেও তিনি আলো ফেলবার চেষ্টা করছেন, হয়তো এই বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে সেটি। খুব দ্রুত যদি সেখানে আমরা কোনো পরিবর্তন না আনতে পারি ব্রাইসন আমাদের এই বইয়ের পাতায় একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ব্যপারে সতর্ক করেও দিয়েছেন। ক্রমশ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠা ব্যকটেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত অস্ত্রভাণ্ডার আমাদের প্রায় শেষ, বিশ্বব্যপী ৭০০০০০ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠা এই ভয়ঙ্কর অণুজীবগুলোর সাথে অস্ত্রপ্রতিযোগিতা আমরা ভয়ানকভাবেই পিছিয়ে পড়ছি। আর পরিস্থিতি যদি এমনই হয়ে থাকে,  মানুষের বিস্ময়কর হাত আর মস্তিষ্ক যে সভ্যতা গড়ে তুলেছে সেটির অস্তিত্ব নিয়েই সংকট তৈরি হবে। আমাদের এই শরীর যেন এর অসাধারণ আর স্বীকৃতি না পাওয়া ক্লান্তিকর বিরতিহীন কাজগুলো  অব্যহত রাখতে পারে, সেজন্য অনেক কিছুই আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।

বইটি আমাদের এই বিরতিহীন ব্যবহার করা শরীর সম্বন্ধে বিস্ময়কর কিছু তথ্যও দেবে। যে তরুণাস্থি আপনার হাড়ের সন্ধিগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে, সেগুলো কাচের চেয়েও মসৃণ, যাদের ফ্রিকশন কোএফিসিয়েন্ট বরফের চেয়ে পাঁচগুণ কম। যত বেশী ব্যয়াম আপনি করবেন আপনার হাড় ততই একটি হরমোন তৈরী করবে, যা আপনার বার্ধক্যগ্রস্ত হবার প্রক্রিয়াটিকে সীমিত রেখে মেজাজ, প্রজনন-উর্বরতা আর স্মৃতিশক্তিকে বাড়াবে, এছাড়া বিষন্নতা আর স্মৃতিভ্রংসতা থেকে রক্ষা করবে। আপনার জিহবায় স্বাদ কোরকগুলো আমাদের শরীরে ইনসুলিন নিঃসরণের সূচনা করে, খাদ্য এমনকি গলার দিকে পাঠানোর আগেই আপনার শরীর খাদ্যের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমাদের তৈরী করেছে সাত বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন পরমাণু, আর যে মৌলগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেটি কিনতে আপনার খরচ হবে প্রায় ৯৬,৫৪৬.৭৯ পাউন্ড। ৬০ জন মানুষের নাভি নিয়ে একটি গবেষণায় ২৩৬৮ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কৃত হয়েছে, যার ১৪৫৮ টি ছিল বিজ্ঞানের কাছে অজানা। সারা জীবনে আপনার হৃৎপিণ্ড যে পরিমান কাজ করে সেটি এক টন ওজনকে ১৫০ মাইল উপরে তোলার সমতূল্য। বুকের দুধ খাওয়ানো মা তাদের স্তনবৃন্ত দিয়ে তার শিশুর মুখের লালায় ব্যকটেরিয়া যাচাই করে দেখতে পারেন, যা তার দুধের অ্যান্টিবডির পরিমান সমন্বয় করে দেয়। আপনার শরীরে যত ডিএনএ অণু আছে সেগুলো একটির পর একটি যুক্ত করলে সেটি ১০ বিলিয়ন মাইল দীর্ঘ হবে, আর সেটি প্লুটোর কক্ষপথ ছাড়িয়ে যাবে, যেভাবে বিল ব্রাইসন এখানে মন্তব্য করেছিলেন, চিন্তা করে দেখুন, যথেষ্ট পরিমানে ‘আপনি’ আছেন এই সৌর জগত ছাড়িয়ে যাবার জন্য, আপনি খুব আক্ষরিকার্থই মহজাগতিক।

আমাদের শরীরের বিস্ময়ই শুধু নয় ব্রাইসন এর মেয়াদকালের দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পুরো বিংশ শতাব্দী জুড়ে আমাদের আয়ু যতটুকু দীর্ঘ হয়েছে, সেটি এর আগের দীর্ঘ আট হাজার বছরের অর্জনকেও অতিক্রমন করেছে। ভবিষ্যতের সুস্বাস্থ্যের জন্যে আমাদের জীবনের প্রথম এক হাজার দিন নানা কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জরায়ুতে থাকাকালীন এবং জন্ম পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের চাপ আপনাকে রুগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী করে তুলতে পারে। জাংক ফুড আর নিষ্ক্রিয় জীবনাচরণ মানে আমাদের সন্তানরা তাদের পিতামাতাদের জন্যে সল্পায়ু হবার সম্ভাবনা ধারণ করছে। আসলেই আমরা খেয়েই অকালমৃত্যুর দিকে এখন অগ্রসর হচ্ছি, এবং একই সাথে এমন সন্তানের জন্ম দিচ্ছি যেন তারা আমাদের সাথেই কবরে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। আর এটি যতটা না চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা তার চেয়ে বেশী রাজনৈতিক একটি সমস্যা। গ্লাসগো শহরের পূর্বপ্রান্তের বাস করে এমন কারো গড় আয়ু ৫৪ বছর, যা যুক্তরাজ্যের গড় আয়ুর ২৫ বছর কম, আর এই পরিসংখ্যানগুলো উন্নত করতে চিকিৎসা বিজ্ঞান নয় সরকারী উদ্যোগের দরকার। বহু দেশের পরিসংখ্যানই আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সাথে স্বাস্থ্যের নিয়ামকগুলোর সম্পর্কগুলো সম্বন্ধে আমাদের এমনই তথ্য দেয়।

নিউ ইয়র্কের হারলেমে ৩০ বছরের কোনো কৃষ্ণাঙ্গ  পুরুষ সমবয়সী কোনো বাংলাদেশীর চেয়ে সংক্ষিপ্ত আয়ু হবার সম্ভাবনা বেশি, আর এর কারণ মাদক, সহিংসত নয় বরং স্ট্রোক, ডায়াবেটিস আর হৃদরোগের বাড়তি ঝুঁকি। এখানেই তিনি উল্লেখ করেন যে এমনকি ধনী যুক্তরাষ্ট্রবাসীরা ( যাদের আচরণ আমরা প্রায়শই অনুকরণ করছি)  মধ্যম আয়ের ইউরোপিয়দের চেয়ে অল্প বয়সে মারা যান, খাদ্যাভ্যাস, স্থুলতা এবং বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অদ্ভুত, অতিব্যয়বহুল, অসমতাপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবার কারণে। এখানে কী আমরা কোনো সমান্তরাল উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি। হল্যান্ড আর সুইডেনের গড়পড়তা মানুষ সপ্তাহে যে পরিমান ক্যালোরি গ্রহন করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষরা গড়ে তার চেয়ে দুটি পুরো চিজ কেক সমপরিমান বেশী ক্যালোরি গ্রহন করে থাকেন। যে কোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রবাসীরা পরস্পরদের গুলি করে, মদ্যপান করে গাড়ি চাড়ায়, এবং ইটালিয়ানদের ছাড়া আর যে কারো চেয়ে কম নিয়মিত সিটবেল্ট বাধে। ইনসুলিন ওষুধটির পেটেন্ট এর আবিষ্কারকরা মানবতা কল্যাণে বিনামূল্যে দান করেছিল, বর্তমানে ইউরোপের চেয়ে ছয়গুণ বেশি দামে এটি যুক্তরাষ্ট্রবাসীদের ক্রয় করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে যত ডাক্তার আছে, স্বাস্থ্যসেবায় তার চেয়ে দ্বিগুণ সংখ্যক অর্থনৈতিক প্রশাসক আছে, স্বাস্থ্য সেবায় সর্বোচ্চ ব্যয় করেও বেশীর ভাগ সূচকে একটি অনেক দেশ থেকেই বহু পিছিয়ে আছে। আমরা কী এই উদাহরণগুলো থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারি। সামাজিক রাজনৈতিক বলয়ে দেশের ভবিষ্যতের লক্ষ্যে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে প্রভাবিত করার মত তথ্যপুষ্ট ধারণা  আমরা সাধারণ মানুষরা কি পেতে পারি। হয়তো পারি, আর এই বইটি সেটি পেতে সহায়তা করবে।

এই বইটি যারা ডাক্তার নয় তাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্বন্ধে এটি গুরুত্বপূর্ণ কিছু অন্তর্দৃষ্টি দেবে, বিশেষ করে অতিচিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যপারগুলোর প্রতি। এখানেই আমরা উপাত্ত পাই দীর্ঘমেয়াদী সুসম্পর্কগুলো জীবন দীর্ঘ করে, আসলেই আমাদের ইতিবাচক সামাজিক আর আবেগীয় জীবন ‘ডিএনএ’কে সুরক্ষা করে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের উপর করা গবেষণা দেখেছিল যে ডাক্তারকে তার রোগীরা সবচেয়ে বেশী সহমর্মিতাপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, তাদের মধ্যে জটিলতার পরিমান ৪০ শতাংশ কম। আমরা কী চিকিৎসক-রোগীর মধ্যকার সহমর্মিতাপূর্ণ সম্পর্ককে আরো বেশি গুরুত্ব দেবার কথা ভাবছি? আর কীভাবেই বা সেটি সম্ভব। এই আলোচনাগুলোয় প্রবেশ করতে আগের আমাদের অসুস্থতার সাথে আমাদের সম্পর্ক – এই শরীর সম্বন্ধে আমাদের জানতে হবে।

কোনো সন্দহ নেই এই বইটি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবে, আপনি আসলেই একটি চলমান, চিন্তারত বিস্ময়ের একটি ক্যাটালগ, আর আমরা কীভাবে আমাদের এই অস্তিত্বের অসাধারণত্বকে উদযাপন করতে পারি? বেশ, অধিকাংশের জন্য সে কাজটি হচ্ছে সর্বনিম্ন মাত্রায় ব্যয়াম এবং বেশী মাত্রায় খাদ্যগ্রহন।  কিন্তু এই বইয়ে  ব্রাইসনের বিশ্বকোষীয় মাত্রায় পাঠ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেরা বিজ্ঞানীদের পরামর্শ থেকে চূড়ান্ত একটি উপসংহারে আমরা কিন্তু পৌঁছাতে পারি, যা জীবনের সবচেয়ে সেরা ব্যবস্থাপত্র হতে পারে: খানিকটা কম খান, খানিকটা বেশী সক্রিয় হয়ে উঠুন।

লেখক পরিচিতি

উইলিয়ম ‘বিল’  ব্রাইসন ( জন্ম ডিসেম্বর ৮, ১৯৫১) যুক্তরাষ্ট্র আইওয়া ডে মোয়ানসে জন্ম গ্রহন করেন। ড্রেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি তার শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। তার সেই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে লেখা ভ্রমণের বইগুলোর জন্য তিনি সুপরিচিত, যেমন ‘নাইদার হেয়ার নর দেয়ার: ট্রাভেলস ইন ইউরোপ, এ ওয়াক ইন দ্য উডস, নোটস ফ্রম এ স্মল আইল্যান্ড, আই অ্যাম এ স্ট্রেঞ্জার হেয়ার মাইসেফ, ইন এ সানবার্নড কান্ট্রি। ১৯৯৫ সালে ইংল্যান্ডকে নেয়া লেখা ‘নোটস ফ্রম এ স্মল আইল্যান্ড’ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন প্রোগ্রামটি তাকে খ্যাতি দিয়েছিল। ব্রাইসন বিশেষভাবে সুপরিচিত হয়েছিলেন ২০০৩ সালে তার লেখা খুব জনপ্রিয় ‘এ শর্ট হিস্টরি অব এভিরিথিং’ বইটির জন্য, এটি শুধু বিজ্ঞানের বর্তমান পরিস্থিতি ও ইতিহাস নিয়েই আলোচনা করেনি, বিজ্ঞানের সাধারণ এবং কখনো কৌতুকপূর্ণ সূচনার বর্ণনাও দিয়েছিল। ব্রাইসন ইংরেজী ভাষার ইতিহাস নিয়েও বই লিখেছেন। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল অবধি তিনি ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়াও তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডন, রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রির একজন সন্মানিত ফেলো। তার সর্বশেষ ‘দ্য বডি: এ গাইড ফর অকুপ্যান্টস’ বইটি ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি ২০২০ সালে রয়্যাল সোসাইটির বছর সেরা বিজ্ঞান বইয়ে সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিল ব্রাইসনের দ্য বডি

আউটগ্রোয়িং গড – রিচার্ড ডকিন্স

আউটগ্রোয়িং গড : এ বিগেনার্স গাইড ( ইবুক)
মূল: রিচার্ড ডকিন্স | অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান
সুপ্রজ্ঞা অনুবাদ উদ্যোগ
প্রকাশনা: সেই বই (২০২১)

রিচার্ড ডকিন্স এই বইয়ে বিজ্ঞান, দর্শন এবং কৌতূহলোদ্দীপক উদাহরণ ব্যবহার করে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান নির্ভর ইচ্ছানিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়াগুলোর উর্ধে উঠে সমালোচনামূলক একটি চিন্তার কাঠামো গড়ে তোলার সাহসী পদক্ষেপ নেবার আহবান জানিয়ে অস্তিত্বের কেন্দ্রে থাকা মৌলিক একটি প্রশ্ন নিয়ে আমাদের ভাবতে উৎসাহী করেছেন।

আউটগ্রোয়িং গড ইবুকটির লিংক

রিচার্ড ডকিন্সের আরো কিছু অনুবাদ

দ্য গড ডিল্যুশন
দ্য সেলফিশ জিন
বাস্তবতার জাদু

আউটগ্রোয়িং গড – রিচার্ড ডকিন্স

মিথ্যা – স্যাম হ্যারিস (ইবুক)

মূল: লাইয়িং – স্যাম হ্যারিস (Lying – Sam Harris )
অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান
(সুপ্রজ্ঞা অনুবাদ উদ্যোগ)

প্রকাশনা: সেই বই
ই বুকের লিঙ্ক: https://sheiboi.com/Book/BookDetails?bookId=3303

দার্শনিক এবং স্নায়ুবিজ্ঞানী স্যাম হ্যারিস তার এই খুবই সংক্ষিপ্ত এই বইটিতে ব্যাবহারিক নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘মিথ্যা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। মিথ্যার বলা সাগ্রহ সম্মতি কীভাবে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং জাতীয় জীবনে আরো বড় অপরাধগুলোকে উজ্জীবিত আর অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূণ একটি নৈতিক ক্রটি ভূমিকা পালন করেন।

মিথ্যা – স্যাম হ্যারিস (ইবুক)

আইজাইয়া বার্লিনের স্বাধীনতা

Everything is what it is: liberty is liberty, not equality or fairness or justice or culture, or human happiness or a quiet conscience..

(গ্রেট থিংকার্স সিরিজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কাজী মাহবুব হাসান)

Political theorist and historian of ideas Isaiah Berlin on Oct. 23, 1992. (Sophie Bassouls/Sygma via Getty Images)

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম একজন সেরা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, কুটনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিক স্যার আইজাইয়া বার্লিন ১৯০৯ সালের ৬ জুন জন্মগ্রহন করেছিলে রিগা-লাটভিয়ায় (তখন সেটি রুশ সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল) একটি বিত্তশালী রুশ- ইহুদী পরিবারে । তার পরিবারটি বাল্টিক অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ টিম্বার কোম্পানী নিয়ন্ত্রণ করতো। রুশ বিপ্লেবের পরে পরিবারটি ইংল্যান্ডে বসতি গড়েছিল। পরে তিনি অক্সফোর্ডে পড়াশুনা করেছিলেন। তাকে বলা হয় ইনটেলেকচুলায় হিস্টরী বা হিস্ট্রি অব আইডিয়া ক্ষেত্রটির জনক। যে ক্ষেত্রটির মূল বিষয়টি হচ্ছে, ধারণাগুলো একক বা বিচ্ছিন্নভাবে সৃষ্টি হয়না মানষ থেকে যারা এটি বিকশিত করেন এবং ব্যবহার করেন, আর সেকারণে কোনো একটি ধারণাকে শুধুমাত্র বিমূর্ত কোনো প্রস্তাব হিসাবে না ভেবে সেটিকে এর সংস্কৃতি, জীবন আর ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতায় বিচার করতে হবে। বার্লিন বিশেষভাবে পরিচিত ১৯৫৮ সালে অক্সফোর্ডে দেয়া একটি লেকচার, Two Concepts of Liberty, তিনি এখানে রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে অ্যানালাইটিক দর্শনের পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ভাষা দর্শনে তার দক্ষতাই তাকে প্ররোচিত করেছিল রাজনৈতিক শব্দগুলো সম্বন্ধে আমাদের বোঝাপড়ার সূক্ষ্ম বিষয়গুলো যাচাই করে দেখতে। সাধারণ রাজনৈতিক সংজ্ঞায় যে শব্দগুলোকে মনে হয় একটি একক ধারণা হিসাবে আসলে সেগুলো বহু ব্যবহারযোগ্য বহুত্ববাদ এবং সেই সাথে নানা অর্থ ধারণ করে। যেমন, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, দুটি ধারণা, নেগেটিভ ফ্রিডম বা কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা, আর পজিটিভ ফ্রিডম, অথবা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা, যা জিজ্ঞাসা করে না যে আমরা কি থেকে স্বাধীন বরং আমরা কি করতে স্বাধীন। বার্লিন বলেন এ্‌ই দু্টি ভিন্ন ধারণা পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক।

স্বাধীনতা খুবই শক্তিশালী একটি শব্দ। আমরা প্রায় সবাই ইতিবাচকভাবে এই শব্দটির প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করি, এবং এই স্বাধীনতার পতাকাতলে বিপ্লবের সূচনা হয়ছে, বহু যুদ্ধ লড়া হয়েছে, নিরন্তর এটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চলেছে, কিন্তু স্বাধীনতা শব্দটি দিয়ে আসলেই আমরা কি বোঝাতে চাই? আর একটি বাস্তবতা হচ্ছে সব ধরনের রাজনীতিবিদদের আমরা যখন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন বলে দাবী করতে শুনি, সেটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে, আসলে যখন আমরা এই বিষয়টি কথা বলি, সবার মনে আসলে এটি সম্বন্ধে সবসময় একই ধরনের ধারণার উপস্থিতি থাকে না। তাহলে কি বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতা হতে পারে? আর যদি তাই হয়, এই ভিন্ন ধরনের স্বাধীনতাগুলো কি পারস্পরিক সংঘর্ষে জড়াতে পারে? এক ধরনের স্বাধীনতার সমর্থন কি অন্য ধরনের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে? এমনকি মানুষকে স্বাধীনতার নামে তাহলে কোনো কিছু করতে বাধ্যও করা যেতে পারে?

বিংশ শতাব্দীর রুশ-ইংলিশ রাজনৈতিক দার্শনিক আইজা্ইয়া বার্লিন (১৯০৯-১৯৯৭) ভেবেছিলেন এই সব প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’। ১৯৫৮ সালে ‘টু কনসেপ্ট অব লিবার্টি’ (১৯৫৮) শীর্ষক তার একটি প্রবন্ধে দুই ধরনের স্বাধীনতার মধ্যে তিনি পার্থক্য করেছিলেন ( ফ্রিডম ,এখানে যেটি আমি স্বাধীনতা হিসাবে উল্লেখ করছি অথবা ‘লিবার্টি’, দুটো শব্দই তিনি পরস্পর পরিবর্তনীয় হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন), যাদের তিনি নাম দিয়েছিলেন নেগেটিভ ফ্রিডম আর পজিটিভ ফ্রিডম ( নেগেটিভ স্বাধীনতা আর পজিটিভ স্বাধীনতা)। নেগেটিভ ফ্রিডম বা স্বাধীনতা হচ্ছে অনাহূত বা অন্যদের অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা। আপনি নেগেটিভভাবে স্বাধীন সেই পর্যায় অবধি, যতদূর অবধি অন্য কেউ ব(বা অন্যরা) আপনি কি করতে পারবেন সেখানে কোনো সীমাবদ্ধ আরোপ করছে না। যদি অন্যরা কিছু করতে আপনাকে বাধা দেয়, প্রত্যক্ষভাবে তারা যা করে তার মাধ্যমে অথবা পরোক্ষভাবে সেই সামাজিক আর অর্থনৈতিক বন্দোবস্তকে সমর্থন করে যা আপনার জন্যে প্রতিকূল। তাহলে যে পর্যায় অবধি অন্যরা তাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করে, বার্লিন জোর দিয়েছিলেন, শুধুমাত্র অন্য মানুষ যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সেটাই কারো স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। প্রাকৃতিক কোনো কারণ কিন্তু এখানে বিবেচ্য নয়। আমি নিজে চাইলে শূন্যে ভাসতে হতে পারবোনা, সেটি ভৌত সীমাবদ্ধতা কিন্তু এটি আমার স্বাধীনতার জন্যে প্রতিবন্ধকতা নয়।

কার্যত সবাই একমত যে নেগেটিভ স্বাধীনতার উপর খানিকটা সীমাবদ্ধতা আমাদের অবশ্যই মেনে নিতে হবে, যদি আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে চাই। সব রাষ্ট্রেরই প্রয়োজন যেন তাদের নাগরিকরা আইন ও নিয়ম অনুসরণ করে, যা পরিকল্পিত হয়েছে যেন সবাই সমাজে একসাথে বসবাস করতে পারে এবং সমাজ মসৃণভাবে পরিচালিত হয়। আমরা আমাদের স্বাধীনতার উপর এইসব সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেই অন্য সুবিধাগুলোর একটি ‘বিনিময়-মূল্য’ হিসাবে, যেমন, শান্তি, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ইত্যাদি। একই সাথে আমরা অনেকেই দাবী করি প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু কিছু এলাকা আছে যেখানে কারো (সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের) নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়, যেখানে প্রত্যেকেরই যথেষ্ট পরিমান, যদি পূর্ণ নাও হয়. স্বাধীনতা থাকা উচিত। রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের একটি বিষয় মূলত এই ব্যক্তিগত নেগেটিভ স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সীমানা কি হওয়া উচিত সেটি নিয়ে। যেমন, রাষ্ট্র কি এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, কোন বইটি আমরা পড়তে পারবো আর কোনটি পারবো না অথবা আমাদের যৌনজীবন কেমন হওয়া উচিত ইত্যাদি বিষয়ে?
যখন নেগেটিভ স্বাধীনতা হচ্ছে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকার স্বাধীনতা, তখন পজিটিভ স্বাধীনতা হচ্ছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধীনতা। পজিটিভলি স্বাধীন হওয়া মানে নিজের ”মনিব” হওয়া, যৌক্তিকভাবে আচরণ করা এবং নিজের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নির্বাচন ও সিদ্ধান্তের ব্যপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া। এটি মনে হতে পারে নেগেটিভ স্বাধীনতার বিপরীত কোনো কিছু, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি সেই মাত্রায় যেন অন্য কেউ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। তবে, পজিটিভ আর নেগেটিভ স্বাধীনতার মধ্যে একটি ফাটল বের করা যেতে পারে, যেমন, একজন ব্যক্তির হয়তো আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অভাব আছে এমন কি যখন তাকে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না। ভাবুন, যেমন, একজন মাদকাসক্ত যে তার আসক্তি ছাড়তে পারছে না, যা তাকে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে অবশ্যই পজিটিভভাবে স্বাধীন নয় ( অর্থাৎ তার আচরণ যৌক্তিক নয়, তার নিজের ভালোর জন্যে যা করা উচিত সেটি কিন্তু সে করছে না) এমনকি যদিও তার নেগেটিভ স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হচ্ছে না ( কেউ তাকে মাদক নিতে বাধ্য করছে না)। এইসব পরিস্থিতিতে, বার্লিন লিখেছিলেন, খুব স্বাভাবিক কোনো কিছুর দুটি সত্তা ( সেলফ) আছে এমন কিছু ভাবা, একটি নীচু সত্তা, যা অযৌক্তিক,আবেগপ্রবৃত্ত এবং আরেকটি উচ্চ সত্তা, যা যৌক্তিক এবং দূরদর্শী।

আর প্রস্তাবনাটি হচ্ছে যে একজন ব্যক্তি পজিটিভভাবে স্বাধীন শুধুমাত্র যখন তার উচ্চ সত্তাটি প্রাধান্য বিস্তার করে। যদি এটি সঠিক হয়, তাহলে আমরা হয়তো কোনো একজন ব্যক্তিকে আরো স্বাধীন করে তুলতে পারবো তার উপর চাপ প্রয়োগ করে। আমরা যদি কোনো মাদকাসক্তকে মাদক নেয়া থেকে দূরে রাখতে পারি, আমরা হয়তো তার উচ্চতর সত্তাকে সহায়তা করতে পারি তার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে। তার নেগেটিভ স্বাধীনতাকে সীমিত করে, আমরা তার পজিটিভ স্বাধীনতাকে বাড়াতে পারি। আর এখানে কিন্তু খুব সহজে একটি বিষয় অনুধাবন করতে পারি, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীকে খুব সহজেই অপব্যবহার করা যেতে পারে নানা ধরনের ক্ষতিকর, বিভ্রান্তিমূলক হস্তক্ষেপ আর পদক্ষেপ নেবার মাধ্যমে। বার্লিন যুক্তি দিয়েছিলেন, পজিটিভ আর নেগেটিভ স্বাধীনতার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটি, এবং এটি অপব্যবহারের ঝুকি আরো বেড়ে যায় যদি আমরা উচ্চ সত্তাকে কোনো একটি সামাজিক গোষ্ঠীর পরিচয় হিসাবে স্বীকৃতি দেই (একটি গোত্র, বর্ণ, একটি চার্চ, একটি রাষ্ট্র)। কারণ তাহলে হয়তো আমরা সেই উপসংহারে পৌছাবো যে প্রতিটি ব্যাক্তি স্বাধীন যখন একটি গোষ্ঠী একক ব্যক্তির কামনাকে দমন করে রাখে ( যা উদ্ভুত হয় নীচু, অসামাজিক সত্তা থেকে), এবং এটি এর ইচ্ছা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়। আর এই দিক পরিবর্তনের যে বিষয়টি বার্লিনকে বিশেষভাবে চিন্তিত করেছিল সেটি হচ্ছে এটি একক ব্যক্তির উপর নির্যাতন বা জোরপূর্বক কিছু করতে বাধ্য করার বিষয়টিকে যুক্তিযুক্ত করে, আর সেটি শুধুমাত্র সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসাবে নয়, যেমন, নিরাপত্তা আর সহযোগিতা, বরং সেই ব্যক্তিদের নিজেদের স্বাধীন করার একটি উপায় হিসাবে।

এই জোর করার বিষয়টি আসলেই জোর করার মত কোনো বিষয় হিসাবে দেখা হয়না, বরং দেখা হয় মুক্ত করা হচ্ছে এমন একটি হস্তক্ষেপ হিসাবে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদকে বাতিল করে দেয়া হয় নীচু সত্তার একটি অভিব্যক্তি হিসাবে, যেমন, মাদকের জন্যে আসক্তির তীব্র তৃষ্ণা। বার্লিন এটিকে বলেছিলেন, ”মনস্ট্রাস ইমপারসোনেশন” ( ভয়ঙ্কর ছদ্মবেশিতা) । ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের যা সুযোগ দেয়, মানুষ এবং সমাজের সত্যিকার ইচ্ছাগুলো অবজ্ঞা করতে, তাদের উপর জোর খাটাতে, নির্যাতন করতে তাদের ‘আসল’ সত্তার নামে এবং সেটি পক্ষ হয়ে। জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস নাইনটিন এইটি ফোরের (১৯৪৯) কথা হয়তো এটি স্মরণ করিয়ে দেবে, যা দেখিয়েছিল কিভাবে একটি স্ট্যালিনবাদী রাজনৈতিক দল, সত্য সম্বন্ধে এর নিজস্ব ধারণা ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেয়, দলের নেতাকে ভালোবাসতে তাকে স্বাধীন করার মাধ্যমে)। নাৎসি জার্মানীর এবং স্ট্যালিনবাদী রাশিয়ার কতৃত্ববাদী সরকারগুলো কিভাবে স্বাধীনতার ধারণাকে অপব্যবহার করেছিল সেই বিষয়ে বার্লিন ভেবেছিলেন । আর তিনি সঠিক ছিলেন এধরনের চিন্তা করার প্রক্রিয়াগুলোর বিপদ সবার নজরে এনে।

কিন্তু এর মানে এই না পজিটিভ স্বাধীনতার প্রবর্ধন সবসময়ই ভুল। বার্লিন নিজেও এমন কোনো দাবী করেননি, এবং তিনি লক্ষ করেছিলেন যে নেগেটিভ স্বাধীনতাকেও ঠিক একইভাবে অপব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু মানুষের হয়তো আসলে সাহায্য লাগতে পারে বুঝতে, তাদের নিজেদের জন্যে কোনটি ভালো পদক্ষেপ এবং কিভাবে তারা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগতে পারবেন। এবং আমরা এমনকি বিশ্বাসও করতে পারি যে, তাদের সেটি করতে সহায়তা করা রাষ্ট্রেরও একটি দায়িত্ব হতে পারে। আর আসলেই, বাধ্যতামূলক শিক্ষার নেপথ্যে এটাই প্রধান যুক্তি। আমাদের অবশ্যই দরকার আছে যে শিশুরা স্কুলে যাবে ( তাদের নেগেটিভ স্বাধীনতাকে যা খুব কঠেোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে) কারণ আমরা বিশ্বাস করি স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি আসলেই তাদের নিজেদের জন্যেই প্রয়োজনীয়। শিশুরা নিজেরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে এমন একটি কোনো পরিস্থিতিতে ছেড়ে দেয়া, তর্কসাপেক্ষ, অবহেলা আর নির্যাতনের সমতুল্য। প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রেও, এমনকি যুক্তি দেয়া যায় যে, এর নাগরিকদের একটি সমৃদ্ধ আর পরিপূর্ণ জীবন কাটাতে সহায়তা করা রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব। আর এই ধরনের সহায়তা বিশেষভাবে জরুরী মুক্তবাজার অর্থনীতির সমাজগুলোয়,যেখানে, বিজ্ঞাপনদাতারা বিরতিহীনভাবে নীচু সত্তার চাহিদা মেটাতে আমাদের প্রলোভিত করে যাচ্ছে)। এছাড়াও হতে পারে যে কিছু মানুষ তাদের জীবনের অর্থ আর লক্ষ্য খুজে পায় আরো ব্যপক কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে, যেমন, নারীবাদ, আর তাদের সেটি করতে সহায়তা করে আমরা তাদের নিজেদের মুক্ত করতে সহায়তা করি।

অবশ্যই এইসব আরো বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আসলেই কাজ করে শিশুদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে অথবা একটি তাদের গড়ে পিটে এমন একটি রুপে তৈরী করে, যা সামাজিক আর অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী। কে তাহলে সিদ্ধান্ত নেবে কোনটি সমৃদ্ধ আর পরিপূর্ণ জীবন? কিভাবে কোনো রাষ্ট্র বৈধ উপায়ে অন্য মানুষদের সহায়তা করতে পারে ভালো একটি জীবন কাটাতে? আসলেই কি জোর করে কোনো কিছু করতে বাধ্য করা গ্রহনযোগ্য হতে পারে কোনো সময়? এইসব প্রশ্নগুলো আসলেই আমরা কোন ধরনের সমাজে বাস করতে চাই সেই বিষয়ে, এবং কোনো সহজ উত্তরও নেই এই প্রশ্নগুলোর। কিন্তু নেগেটিভ আর পজিটিভ স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য কি, এটি বুঝতে দেবার মাধ্যমে বার্লিন আমাদের একটি শক্তিশালী উপায় দিয়ে গেছেন এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার জন্যে।

আইজাইয়া বার্লিনের স্বাধীনতা

পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক ও নিঃসঙ্গ নভোচারী

(কাজী মাহবুব হাসান | আসমা সুলতানা )

কল্পনা করুন আপনি একজন শিল্পী আর আপনার শিল্পকর্মটি সত্যিকারভাবে ‘আউট অব দিস ওয়ার্ল্ড’ অর্থাৎ পৃথিবীর বাইরে কোনো উন্মুক্ত গ্যালারীতে প্রদর্শিত হচ্ছে, শুধুমাত্র একটি শিল্পকর্মই সেখানে আছে, অবশ্য আক্ষেপও আছে, কারণ গ্যালারীটি দর্শকশূন্য ( নাকি দর্শক আছে !)। মধ্যযুগীয় নাইটদের সাহসী অভিযান আর রুশ-মার্কিন শীতল-যুদ্ধ চলাকালীন মহাশূন্য জয়ের প্রতিযোগিতায় নভোচারীদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সমন্বয় সৃষ্টির করার ভাবনার বেলজিয়ান শিল্পী পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক হচ্ছেন আপাতত পৃথিবীতে এমনই একমাত্র শিল্পী, এবং তার আক্ষেপের কারণ বেশ বিস্তারিত। চাঁদের ধুলায় শুয়ে আছে নিঃসঙ্গ নভোচারী, ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, প্রায় সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের ছোট এই ভাস্কর্যটি সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পী পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক।

১৯৬৯ সালের মার্চের এক সকালে শিল্পী হয়ডাঙ্ক ম্যানহাটানে তার গ্যালারীতে গিয়েছিলেন, গ্যালারী ডিরেক্টর লুইস ডয়েসম্যান, আর ম্যালিক ডিক ওয়াডলের মধ্যে চলমান বিস্ময়কর একটি কথোপকথনের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। ”কেন আমরা পলের একটি ভাস্কর্য চাঁদে প্রতিস্থাপন করছি না?” লুইসের আজব এই প্রশ্নের ওয়াডেলের উত্তর দেবার আগেই হয়ডাঙ্ক এই কথোপকথনে প্রবেশ করে মন্তব্য করেছিলেন, ”তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে’? কিভাবে আমরা সেই কাজটি করবো?” ডয়েসম্যান তার অবস্থানে অটল থেকেই বলেন, ”আমি জানিনা, তবে একটা উপায় আমি বের করবো”। এবং তিনি আসলেই সেটি করেছিলেন। ১৯৭১ সালে অগাস্ট মাসের ২ তারিখ, গ্রিনিচ স্ট্যান্ডার্ড সময় ১২:১৮ য় অ্যাপোলো -১৫ কম্যান্ডার স্কট সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা আলুমিনিয়ামের একটি ভাস্কর্য তার পার্ক করা ল্যুনার রোভারে কাছে ধূলার উপর শুইয়ে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে চাঁদ বাতাসহীন একটি পাথর খণ্ড থেকে রুপান্তরিত হয়েছিল আমাদের জানা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী স্থলে। স্কট সেই মুহূর্তটিকে মহাশূন্য অভিযানের প্রতিযোগিতায় জীবন বিসর্জন দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ বীর নভোচারীদের প্রতি একটি নিবেদন হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। ভাস্কর্যটির সাথে ছিল একটি ফলক, যেখানে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি মোট চৌদ্দজন ( আটজন যুক্তরাষ্ট্রের আর ছয় জন রুশ নভোচারী) নিহত নভোচারীর নাম লেখা ছিল।

আর ভ্যান হয়ডাঙ্ক শিহরিত হয়েছিলেন তার শিল্পকলা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মানব-নিয়তির নতুন সূচনার দিক নির্দেশ করছে, এবং আশা করেছিলেন তিনি খুব শীঘ্রই ”পিকাসোর চেয়ে আরো বড়” কিছুতে পরিণত হবেন। কিন্তু বাস্তবে তার চাঁদের ভাস্কর্যটি, ফলেন অ্যাস্ট্রোনট, উচ্ছাস নয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে ওয়াডেল গ্যালারী বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। নাসা ছাড়তে হয় নভোচারী স্কটকে। জনগনের প্রকল্প থেকে ব্যবসা করে লাভবান হবার জন্যে হয়ডাঙ্ককে অভিযুক্ত করা হয়, যিনি তার জন্মস্থান বেলজিয়ামে স্বল্প পরিচিত একটি শিল্পী জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন । প্রায় বিস্মরিত একটি ভাস্কর্য আর তিরষ্কৃত আশির দশকের এই শিল্পী এখনও ভাবেন তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমাদের মাথার উপর ২৩৮০০০ মাইল উঁচুতে এখনও ফলেন অ্যাস্ট্রোনট আমাদের নক্ষত্র ছোয়ার স্বপ্নকে ধারণ করে শুয়ে আছে। হয়ডাঙ্ক অবশ্য অতীতে বেঁচে থাকেননি। অ্যান্টওয়ার্পের কাছে একটি শহরতলীতে তিনি তার কাজ অব্যহত রেখেছিলেন, এবং তার শিল্পকর্মে মহাশূন্য, গ্রহ, নক্ষত্র আর নভোচারী চিরন্তন থিমটি তিনি অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।

১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কে একবার বেড়াতে আসার পর তিনি ওয়াডেল গ্যালারীর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে বেলজিয়ামে তিনি তার প্রথম স্পেস থিম একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন, জুল ভার্নের প্রতি মুগ্ধতা, আর্ট অ্যাকাডেমির স্থবিরতার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেই তিনি মহাশূন্য অভিযানের থিমে ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে নিউ ইয়র্কের ওয়াডেল গ্যালারীতে প্রথম প্রদর্শনীতে তার আর্টিস্ট স্টেটমেন্ট ঘোষণা করেছিল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক জায়গা হচ্ছে কেপ কেনেডি’। আর মহাশূন্য নিয়ে তার এই উন্মাদনাই ডয়েসম্যানকে উচ্চাভিলাষী সেই মন্তব্যটি করার জন্যে উদ্দীপ্ত করেছিল। তার প্রাথমিক অবিশ্বাসের পর, খুব সহজে তাকে রাজী করানো সম্ভব হয়েছিল এবং এক মাসের মধ্য তিনি সম্ভাব্য চাঁদের ভাস্কর্যটির কনসেপ্ট ড্রইং করতে শুরু করেন।

ধারণাটি মূলত ছিল প্রাক্তন বিজ্ঞাপন-বিপনন কর্মী ও গ্যালারি পরিচালক লুইস ডয়েসম্যানের, তিনি বিশ্বাস করতেন চাঁদে শুধু ভাস্কর্যই স্থাপন করা যাবে না, এটি আবশ্যিকও, তার স্মৃতিকথায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তখন স্পেস-এজ, নক্ষত্রে যাবার প্রতিযোগিতা চলছে, আমি বহু মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করি, কিন্তু একটি উপায় খুঁজে না পাওয়া অবধি আমি থামিনি’। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু ঘটনা এবং একজন মধ্যস্তকারীর সহায়তা হয়ডাঙ্ক ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে নিজেকে নভোচারী ডেভিড স্কট ও তার সহকর্মীদের সাথে এক টেবিলে বসে নৈশভোজ করতে আবিষ্কার করেছিলেন। তখনও অ্যাপোলো ১৫ র মিশন শুরু হতে আট সপ্তাহ বাকী। স্পষ্টতই স্কট আর হয়ডাঙ্কের পছন্দের কিছু বিষয় মিলেছিল, যেমন, প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা আর মধ্য-আমেরিকার মায়াদের পূরাণ, এবং একটি পর্যায়ে স্কট তার সহকর্মীদের জানান, ‘দেখো, এই ভদ্রলোক কি বলছেন, আসো, আমরা ওর একটা ভাস্কর্য চাঁদে নিয়ে যাই’।

হয়ডাঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরেই কাজে লেগে যান, তার ছেলে শিল্পী প্যাট্রিককে নিয়ে একটি প্লাস্টার আর প্লেক্সিগ্লাসের মডেল তৈরী করে ফেলেন, মানব-ভবিষ্যৎ যার বিষয়। কিন্তু হয়ডাঙ্কের ভবিষ্যতবাদী নান্দনিকতা আর স্কটের গম্ভীর দার্শনিক উদ্দেশ্য সমন্বয় করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি বেশ কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। শিল্পী হিসাবে তিনি একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, তিনি তার শিল্পকর্মের মূলভাবনায় রেখেছিলে মহাশূন্য অভিযাত্রীদের ঐতিহাসিক সেই যাত্রার উত্তেজনা আর বীরোচিত সাহস, ‘আমাদের সন্তানদের কাছে তারা হয়তো স্বাভাবিক, তবে তামাদের পৌত্রদের কাছে তারা পুরাণের চরিত্র’। কিন্তু স্কট ও তার সহযাত্রীরা ভেবেছিলেন আরো ব্যক্তিগত স্মারকসূচক কোনো কিছু হবে সেই শিল্পকর্মটি, ‘আমরা একমত হয়েছিলাম আমাদের সেইসব সহকর্মীদের সন্মান জানাতে, যারা মহাশূন্য অভিযানের প্রচেষ্টায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন, এই তালিকায় আমাদের সোভিয়েত সহকর্মীদেরও আমরা স্মরণ করতে চেয়েছিলাম’। তখন শীতল যুদ্ধের সময়, এটি অবশ্যই লক্ষণীয় একটি সিদ্ধান্ত, বিশেষ রুশ-মার্কিন মহাশূন্য জয়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার সময়।
লুনার মডিউলে নভোচারীরা কি সাথে নিতে পারবেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। এছাড়া এমন উপাদানে সেই ভাস্কর্যটি বানাতে হবে, যেন সেটি চাঁদে টিকে থাকার মত যথেষ্ট শক্তিশালী হবে, যেখানে দিনের তাপমাত্রা প্রায় ২৫০ ডিগ্রী স্পর্শ করে আর রাতে যা নেমে যায় শূন্যের ২৫০ ডিগ্রী নীচে। হয়ডাঙ্ক এই নন্দনতাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে ব্রুকলিনের একটি ঢালাই প্রতিষ্ঠান, মিলগো/বাফকিনের সাথে যোগাযোগ করেন । ভাস্কর্যটিকে অবশ্যই আকারে ছোটো হতে হবে, এবং স্কটের নির্দেশ অনুযায়ী এটি যেন বিশেষ কোনো জাতি বা বর্ণ এবং লিঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব না করে, যা তাপমাত্রার চরম তারতম্য সহ্য করতে পারবে। সুতরাং হয়ডাঙ্ককে এমন কিছু ডিজাইন করতে হবে যেখানে তার অতীতমূখী ভবিষ্যতবাদ আর আধ্যাত্মিক প্রকটতা, যা তার অন্য ভাস্কর্যে বৈশিষ্ট্যসূচক, মূলত এই প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়ে যাবে। ‘আমি এর চেয়ে ভালো কাজ করেছি, এটি সেরা ভ্যান হয়ডাঙ্ক নয়’। ব্রুস গিটিনের বানানো ছাঁচে অবশেষে তৈরী হয় মানবসদৃশ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, যার নির্মাণ উপাদান ছিল অ্যালুমিনিয়াম, কারণ এটিকে শক্তিশালী, আর হালকা হতে হবে। শিল্পী চেয়েছিলেন তার এই অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষুদ্র মূর্তিটি সোজা হয়ে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে।



অ্যাপোলো ১৫ যাত্রা শুরু হবার কথা ছিল জুলাই ২৬ তারিখে (১৯৭১)। ৮১ বছর বয়সে যখন তাকে স্মরণ করতে বলা হয় কিভাবে বিশাল একটি নিবেদিত টিমের কড়া নজরদারীর মধ্যে স্কট মূর্তিটিকে গোপনে চাঁদ অবধি নিয়েগিয়েছেন, তিনি স্বীকার করেছিলেন, বিষয়টি তার তার নিজেরই মনে নেই। কিন্তু চাঁদেরযেদিন তিনি পা দিয়েছিলেন তিনি জানতেন তার পকেটে মূর্তিটি আছে। জুলাই ৩০ তারিখে তাদের লুনার মডিউলটি চাঁদে নেমেছিল, স্কট এবং আরইউন সেখানে ৩ দিন কাটান। টান টান নিয়মবদ্ধ সময়ের হিসাবে তারা তাদের কাজগুলো সম্পাদন করেন।

একেবারের শেষ মূহূর্তে তিনি ফলেন অ্যাষ্ট্রোনেটের জন্য সময় বের করেছিলেন, এবং সেটির একটি ছবি তুলেছিলেন। আর তখনও পর্যন্ত কারোরই সেটি অস্তিত্ব জানা ছিলনা। নিয়মমাফিক পুরো চাঁদ অভিযানে তারা ১১০০ ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে হিউস্টনের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে মনোযোগ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন আরউইন আর স্কট ফলেন অ্যাস্ট্রোনটকে চাঁদের প্রথম নাগরিক হিসাবে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি তার পকেট থেকে মূর্তিটি বের করেন, চাঁদের ধুলোর উপর সরাসরি সেটি স্থাপন করেন, এর পাশে সেই স্মারক ফলকটি রাখেন যেখানে মৃত নভোচারীদের নামের একটি তালিকা ছিল। নিজের ধর্মবিশ্বাসকে তিনি প্রকাশ করেননি, তবে স্কট আধ্যাত্মিকভাবে তার এই নিবেদনটিকে একটি নীরব অন্তেষ্টিক্রিয়া হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। সামান্য একটি মিনিট, তারপর আবার দ্রুত তারা তাদের রুটিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর পাঁচ ঘন্টা পর লুনার মডিউল চাঁদকে পেছনে ফেলে চলে যায় অরবিটিং মডিউলের সাথে যুক্ত হবার জন্যে। তাকে সেই মুহূর্তটি, যখন তিনি প্রথম শিল্পকলাটিকে চাঁদে মাটিতে রেখেছিলেন, যখন মনে করতে বলা হয়েছিল, তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, যেন আমরা ভুলে না যাই কেন আমরা সেটি সেখানে রেখেছিলাম।

এটি ভূলে যাবার পর্বটি শুরু হয় পৃথিবীতে ফিরে আসার পর থেকে। ডেভিড স্কট সংবাদ সন্মেলনে এটি প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু বিষয়টি আসলেই সেভাবে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। আর নভোচারীদের মনে হয়ছিল এই কাজটি মৃত নভোচারীদের স্মরণেই তারা করেছিলেন। তিনি তার বার্তায় যোগ করেছিলেন, ‘দুঃখজনকভাবে দুটি নাম এখানে বাদ পড়েছে ( প্লেক থেকে, ভ্যালেন্টাইন বন্ডারেঙ্কো, গ্রিগরি নেলইয়ুবভ’। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের মৃত্যু সম্বন্ধে পরে জানতে পেরেছে কারণ সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচীকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তা, আরো একজন মৃত্যুবরণ করা নভোচারীর নাম বাদ পড়েছিল, রবার্ট হেনরী লরেন্স জুনিয়র, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী, বিমান-বাহিনীর অফিসার, যিনি ১৯৬৭ সালে তার মহাশূন্য যাত্রার প্রশিক্ষণের সময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। নভোচারীরা এরপর তাদের তারকা খ্যাতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর শিল্পী ভ্যান হয়ডাঙ্ক অদ্ভুত নীরবতায় তার কাজে ফিরে যান। মানব জাতিকে নক্ষত্রের জগতের দিকে নির্দেশিত করার সেই বিষয়টি ক্রমশ তার কাছে আরো বেশী স্বপ্নের মত অনুভূত হতে শুরু করেছিল।
নাসার মিশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্কট শিল্পী ভাস্করের নাম উচ্চারণ করেননি, অনেকটাই অজ্ঞাতনামা একটি স্মারক হিসাবে তিন সেটি চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন, আর স্কট ( খুব অদ্ভতভাবেই) ধারণা করেছিলেন, শিল্পী নিজেও সেটাই চেয়েছেন। শুরুর দিকে এটি মেনে নেয়া ছাড়া হয়ডাঙ্কের আর কিছু করার ছিলনা, যদিও তার বোঝাপড়া সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন ছিল। তিনি অ্যাপোলো ১৫ নভোচারীদের লিখেছিলেন, ‘এই শতাব্দীতে মানুষের মহাকাশ অভিযানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন’। স্কটকে লেখা আলাদা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘দুঃখিত তুমি চাঁদে পুরোনো মন্দির পাওনি, তবে নিশ্চয়ই চাঁদের উপর হাটার অভিজ্ঞতা তোমাকে ভিন্ন মাত্রার একটি বাস্তবতায় নিশ্চয়ই নিয়ে গিয়েছিল’। কিন্তু ক্রমশ ভ্যান হয়ডাঙ্ক অস্থির হতে শুরু করেছিলেন এই কৃতিত্বটি না দাবী করতে পেরে, যা তিনি আসলেই মনে করেছিলেন তার ঐতিহাসিক একটি সৃষ্টি। এই মতবিরোধটি স্পষ্ট প্রকাশ পায় সেপ্টেম্বর মাসে, বেলজিয়ামে একটি কনফারেন্সে যখন নভোচারী স্কটের সাথে দেখা হয়েছিল তার, সেখানে তাকে বলা হয়, আরো একবছর এই ভাস্কর্য বিষয়ে কারো কাছে কিছু না বলতে।
এছাড়াও তিনি ‘ফলেন অ্যাস্ট্রেনট’ নামটি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার মনে এটি মহাকাশ অভিযানের উদ্দেশ্য বীরযাত্রা এমন কিছু নির্দেশ করে না।। নভোচারী, বিশেষ করে স্কট তার অনুমতি ছাড়াই এই নামটি ব্যবহার করেছিলেন। নভোচারী স্কট অবশ্য পরে মনে করতে পারেননি কিভাবে নামটি এসেছিল, তবে সম্ভবত সেই সময়ে সয়ুজে অভিযানে মারা যাওয়া তিনজন কসমোনটের কথা মনে করেই এই নামটি তার মনে এসেছিল। নভোচারীদের কাছে হয়ডাঙ্কের শিল্পকর্মটি ছিল মূলত একটি নামফলকসহ স্মারক।

কিন্তু পরে যখন এই অভিযান সংক্রান্ত নাসার প্রকাশিত বুকলেটে ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’ এর ভাস্কর হিসাবে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, তখন হয়ডাঙ্ক আর সহ্য করতে পারেননি। তাকে নীরব রাখার একটাই কারণ তিনি ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন, আর সেটি হচ্ছে ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যাবার একক কৃতিত্ব দাবী করার লক্ষ্যে নভোচারীদের একটি চাল। এবং এই ফাটলটি আরো প্রশস্ত হয়েছিল যখন নভেম্বরে তিনি নভোচারীদের কাছ থেকে একটি চিঠি পান যে, স্মিথসোনিয়ান ইন্সস্টিটিউট চাঁদে রাখা ভাস্কর্যটির একটি অনুলিপি রাখার অনুমতি চাইছে। এবং তারা মনে করেন যে এই প্রস্তাবে তার রাজি হওয়া উচিৎ। এবং অবশ্যই তাদের একটি হুবহু অনুলিপি দরকার, একই উপাদান, একই রকম দেখতে এবং একটি শিল্পীর সৃষ্টি অনুলিপি। ‘তারা এটি কিনতেও রাজী আছে যদি তুমি আরো দুটো বানাও’। তবে ভান হয়ডাঙ্ক দ্বিগুণভাবে অপমানিত বোধ করেছিলেন, প্রথমত, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম শিল্পী হিসাবে তার সাথে না বরং নভোচারীদের সাথে যোগাযোগ করেছিল, কারণ শিল্পীর নাম তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কাছে গোপন রেখেছিলেন, এবং সেই আমন্ত্রণপত্রে তাকে ভাস্কর হিসাবে উল্লেখ না করে বলা হয়েছে ‘কারিগর’। আর তিনি কখনোই এই অপমান ভুলতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কারিগর না আমি শিল্পী, তোমরা যদি চাঁদে গিয়ে গর্ব করতে পারো, আমিও গর্ব করতে পারি সেখানে আমার একটি ভাস্কর্য আছে’।

পরিশেষে অবশ্য তার অহংকার হার মানে ভবিষ্যতের অমরত্বের আশায়। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামের জন্যে তিনি দুটি রেপ্লিকা নির্মাণ করেন । যাদের একটি তাদের স্থায়ী জায়গা পায় National Air and Space Museum এ, অন্যটি শিল্পী উপহার দেন বেলজিয়ামের রাজাকে। আর হিউস্টনের একই নির্মাতার কাছ থেকে সেই স্মৃতি ফলকটির একটি অনুলিপি তৈরী করার ব্যবস্থা করেছিলেন স্কট।

স্মিথসোনিয়ান থেকে আসা অনুরোধ হয়ডাঙ্ককে তার নীরবতা ভাঙ্গতে প্ররোচিত করেছিল। নিউ ইয়র্কে তার প্রতিনিধি ওয়াডেল গ্যালারীর মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল যে, এটি প্রথম প্রচার হবে সিবিএস নিউজের অ্যাঙ্কর ওয়াল্টার ক্রংকাইটের মাধ্যমে, যিনি অ্যাপোলো ১৬ মিশনের আগে ঘোষণা করবেন চাঁদে ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী কে ।

১৯৭২ সালে মার্চে হয়ডাঙ্ক স্কটকে সতর্ক করে দেন তিনি টিভি সাক্ষাৎকার দেবেন, চাঁদে প্রথম শিল্পকর্ম নিয়ে। এর উত্তর স্কট জানান, ‘হয়তো তোমাকে এর উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করা হবে, যে প্রশ্নটি অর্থপূর্ণ উত্তর শুধু আমরা নভোচারীরা দিতে পারি’। কিন্তু হয়ডাঙ্ক তার চূড়ান্ত মন্তব্য করেন হাতে লেখা একটি নোটে, ‘সিবিএস যে যাওয়ার একমাত্র কারণ সেটি ঘোষণা দেয়া যে, এই শিল্পকর্মটি আমার ডিজাইন করা, যা আপনি স্বাভাবিক বলে মনে করবেন। একজন শিল্পীর কোনো শিল্পকর্মের স্রষ্টা হিসাবে পরিচিত হবার অধিকার আছে। আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি একমাত্র শিল্পী যার কাজ পুরোপুরিভাবে সে মহাশূন্যের প্রতি নিবেদিন হিসাবে পরিচিত, এবং শিল্পকলার জগতে এই বিষয়ে ক্রমশ কথাবার্তা হচ্ছে। আমি আপনার বার্তা পুরোপুরি বুঝতে পারছি, কিন্তু কোনোভাবে এই স্মারকটিকে আমি খাটো করছিনা’।

কিন্তু স্কট এটি পছন্দ করেননি, কারণ তার মনে হয়েছিল এই অজ্ঞাত থাকার ব্যপারটি তাদের সহকর্মী আত্মত্যাগের প্রতি নিবেদিত স্মারকটিকে আরো মহৎ করে তুলেছে। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ভাবনা বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। ১৯৭২ সালের এপ্রিলের ১৬ তারিখ হয়ডাঙ্ক টিভিতে ঘোষণা করেন, হাতে একটি রেপ্লিকা নিয়ে, ‘আমি মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলাম, নক্ষত্রের জগতই মানুষের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ’, তিনি বলেন, ‘এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্মারক ভাস্কর্য’, কিন্তু কংক্রাইট স্মরণ করিয়ে দেন, ‘না, পৃথিবী নয়, এই মহাবিশ্বে, আর চাঁদে সেখানে এটি রাখা হয়েছে’।

শিল্পী হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবার পর, তার আশাবাদ ফিরে এসেছিল। এবার নিশ্চয়ই তিনি তার ভাস্কর্যগুলোর জন্যে পরিচিতি পাবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন বেশীদিন টেকেনি। অবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেই সময় মানুষ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনেট’ পছন্দ করেনি, তারা ভাবতে পারেননি চাঁদে এই ভাস্কর্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি কারণ ছিল হয়ডাঙ্ক যে বিদেশী সেটা নিউ ইয়র্কের শিল্পীরা পছন্দ করেননি, একজন বিদেশী, বিত্তশালী তবে দ্বিতীয় শ্রেণীর গ্যালারী যাকে প্রতিনিধিত্ব করে চাঁদে ভাস্কর্য স্থাপন করার কোনো যোগ্যতা তার নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমস সমালোচনা করে বলে এটি স্ফীত টিউনিং ফর্ক ছাড়া আর কিছু না। ততদিনে চাঁদে অভিযানের আগ্রহ কমে গেছে সরকারী পর্যায়ে, বেশ কিছূ মিশন বাতিল ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।

ডিক ওয়াডেল শিল্পীর সম্মতিতে একটি নিয়তিনির্ধারক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ৯৫০ টি শিল্পীর সাক্ষরিত রেপ্লিকা ৭৫০ ডলার করে বিশেষ আগ্রহী সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এবারে তারা বিজ্ঞাপনও দেন। শিল্পী জানতেন নভোচারীরা বিষয়টি পছন্দ করবেন না, কিন্তু এই কাজটি থামানোর কোনো ইচ্ছাও তার ছিলনা। স্কট আর হয়ডাঙ্কের মধ্যে চিঠি আদান প্রদান হয়, কিন্তু হয়ডাঙ্ক এর হাতে আসলেই আর কোনো উপায় ছিলনা। কিন্তু তাদের এই ভিন্নমতটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকতো। কিন্তু এখানে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, অ্যাপোলো ১৫ -র নভোচারীরা কিছু কভার স্ট্যাম্প নিয়ে গিয়েছিল, যাদের চাঁদের পোস্টমার্ক সহ ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কথা ছিল এর ১০০ টি এমন কভার স্ট্যাম্প ২১০০০ ডলার দিয়ে জার্মান কালেকটর হেরমান কিনে নেবেন, যে টাকাটি ব্যবহার করা হবে নভোচারীদের সন্তানদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট সৃষ্টি করতে। কথা ছিল এগুলো বিক্রি করা হবে পরে যখন নভোচারীরা নাসার সাথে যুক্ত থাকবেন না। কিন্তু হেরমান প্রায় সাথে সাথে তার বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। এর জন্যে বিপদে পড়েছিলেন নভোচারীরা, তাদের কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তদন্ত কমিটির কাছে এই রেপ্লিকা বিক্রিও গ্রহনযোগ্য ছিলনা। এর পরের বছরগুলোয় বেশ কিছূ তদন্ত হয়, এছাড়া চাঁদের মিশন নিয়ে আগ্রহ কমে যেতে শুরু করে।

জেরার মুখে স্কট স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে এই প্রকল্পে নভোচারীদের কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু মাত্র ৫০ টি কপি তৈরী করার পর ওয়াডেল গ্যালারী প্রকল্পটি বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনাগুলো শিল্পী এবং গ্যালারীর জন্যে নেতিবাচক প্রচারণা ছিল, কংক্রাইটের ইন্টারভিউর পর একটি প্রমাণ্য চিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল ‘স্পেস চাইল্ড’ নামে, কিন্তু সেটি কখনোই প্রদর্শন করা হয়নি। আর ওয়াডেল গ্যালারীর ব্যবসাও মুখ থুবড়ে পড়েছিল, ডিক ওয়াডেল হতাশায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫০ বছরের মারা যান। হয়ডাঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরে যান এবং তার কাজ অব্যহত রাখেন মূলত সবার অগোচরে। নভোচারী তিনজনও একপর্যায়ে নাসা থেকে চাকরী ছেড়ে দেন। বেশ পরে নাসা পুনতদন্ত কভার-স্ট্যাম্প সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে নভোচারীদের দায়মুক্তি দিয়েছিল।


ইতিহাদবিদরা ফলেন অ্যাস্ট্রোনটের দিকে নজর না দিলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে ঘটনাটির চল্লিশ বছর পর শিল্পীকে মিউজিয়ামে বক্তৃতা দেবার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। স্কটের সাথে যোগাযোগ করেন, তিনিও সেই অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা, কিন্তু বিস্ময়ের সাথে জানতে পারেন স্কটদের সেই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণই করা হয়নি। এর কারণ পরে অবশ্য বলা হয়েছিল বাজেটের অভাব। তবে যাই হোক স্কটের ক্ষোভ একটুও কমেনি, তিনি বলেন, ‘আমি একমাত্র মানুষ যে কিনা ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যেতে পারতো, আর সেটি কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা’। সেদিন উপস্থিত প্রায় ৪০ জন, এছাড়া অ্যান্ডি ওয়ারহোল, অ্যানি লেইবোভিৎস, নরমান রকওয়েলের কাজের পাশে সাজানো তার ফলেন অ্যাস্ট্রোনেট, কিন্তু একমাত্র তারই একটি শিল্পকর্ম পৃথিবীর বাইরে আছে। তিনি পুরো কাহিনীটি বলেন এবং নভোচারীদের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমার মত ভীতু মানুষ কখনোই মহাশূন্যে যেতে পারতো না’।

(সমাপ্ত)

পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক ও নিঃসঙ্গ নভোচারী

ইবন খালদুন: ইতিহাসের দর্শন

(গ্রেট থিংকার্স সিরিজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: কাজী মাহবুব হাসান)

‘যিনি নতুন পথ খুঁজে পান তিনি পথপ্রদর্শক, এমনকি যদি সেই পথটি আবার অন্যদের খুঁজে বের করতেও হয়। এবং যিনি তার সমসাময়িকদের চেয়ে অনেক সামনে হাটেন তিনি নেতা, এমনকি যদি সেই স্বীকৃতি পেতে বহু শতাব্দী অতিক্রান্তও হয়’।

আবু জাইদ আবদ-আল-রাহমান ইবন খালদুন আরব-ইসলাম ইতিহাসে ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম ধর্মাশ্রিত নয় এমন ইতিহাসের দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন। সবচেয়ে শ্রেষ্ট আরব ইতিহাসবিদ হিসাবে বিবেচিত খালদুনকে সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাস বিজ্ঞানের জনকও বলা হয়। তিনি সভ্যতাকে বোঝার জন্যে আমাদের ধারণার জগতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান রেখে গেছেন। তবে তার অবদান বুঝতে হলে তার জীবন আর সময়টিকে বুঝতে হবে। তার পুরো নামটি বেশ বড় তাই ইবন খালদুন নামেই উত্তর প্রজন্মের কাছে তিনি বেশী পরিচিত। তার আত্মজীবনীর সূত্রে জানা যায় তার পূর্বসুরিদের বংশটির সূচনা ইয়েমেনের হাডরামুটে। অবশ্য তার এই আরব উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে এটি নিশ্চিত যে তিনি ১৩২২ সালের ২৭ মে তিউনিসে জন্মগ্রহন করেছিলেন (তিউনিসিয়া)। তার শিক্ষিত বিদ্বান পরিবারের আবহ আর সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী তিনি প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছিলেন। তার পূর্বসুরিদের মত তার পিতাও রাজনীতি সক্রিয় তবে বিদ্বান ছিলেন, তার কাছেই খালদুনের প্রথম শিক্ষা পেয়েছিলেন। উনিশ বছর বয়সে তার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল সেই সময়ে তিউনিসের শাসক ইবন তাফরাকিনের বিশেষ দূত হিসাবে।

১৩৫২ সালে তিউনিস যখন কনস্টান্টিনের (বর্তমান আলজেরিয়া) আমির আবু জিয়াদ দখল করে নিয়েছিলেন ইবন খালদুন পালিয়ে আবায় এসেছিলেন। আলজেরিয়ায় তিনি এভাবেই বহুবার আসা যাওয়া করেছিলেন, পরে বিসক্রায় তিনি বসতি গড়েন। একই সময় মরোক্কোর নতুন রাজা আবু ইনান আলজেরিয়া আক্রমণ করেন। তার বিবরণ অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই তিনি নিজেই সুলতানের সাথে দেখা করতে যান এবং সুলতান তাকে আলজেরিয়ার আত্মসমর্পন দলিল আর সাক্ষ্য দেবার জন্যে বুজিতে পাঠিয়েছিলেন। এরপরে তিনি ফেজে আসেন, এবং সুলতানের রাজসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিলেন। ফেজে থাকাকালীন সময়ে তিনি আরো পড়াশুনা করেছিলেন। সেই সময় ফেজ ছিল মরক্কোর রাজধানী এবং উত্তর আফ্রিকা আর আন্দালুসিয়ার বিদ্বানদের একটি মিলন ক্ষেত্র। ইবন খালদুন একই সাথে নিত্য নতুন রাজকীয় দায়িত্ব পাচ্ছিলেন, জীবনের এই সময়ে তিনি খুবই উচ্চাভিলাষী ছিলেন, রাজসভার রাজনীতিতে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। আলজেরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত সুলতানের সাথে তিনি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু মরক্কোর সুলতান বিষয়টি জানতে পেরে তাকে কারাবন্দী করেছিলেন। সুলতানের মৃত্যু হলে দুইবছর পর তাকে মুক্ত করা হয় এবং পুরোনো পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। কিন্তু যে উজির তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন সুলতান আবু সালেমের সাথে। এরপর তিনি নতুন সুলতানের দরবারে আরো উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এই সময়টি ছিল তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আর উৎপাদনশীল একটি সময়।

পরিশেষে তিনি প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। তবে এবারও তিনি বিজয়ী দলের সাথে ছিলেন, চেয়েছিলেন সভার উচ্চ পদটি যেন তিনি পান কিন্তু তাকে সেটি দেয়া হয়নি সম্ভবত তার বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে। তিনি ক্ষুদ্ধ হয়েই পদত্যাগ করে আন্দালুসিয়ায় যান। গ্রেনাডার সুলতানের বিশেষ দূত হয়ে তিনি কাস্তিলে গিয়েছিলেন। কাস্তিলে পেড্রো দ্য ক্রুয়েল তাকে তার সভাসদ হতে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু খালদুন প্রস্তাবটি গ্রহন করেননি। গ্রেনাডার সুলতান তাকে একটি ছোট গ্রাম (এলভিরা) দান করেছিলেন। কিন্তু অস্থির খালদুন আলজেরিয়ায় বুজিতে (বর্তমান বেজাইয়া) ফিরে আসেন বন্ধু সুলতান আবু আব্দুল্লাহর আমন্ত্রণে। তখন তার বয়স ৩২, তিনি আমির মুহাম্মদের হাজিব বা চেম্বারলেইনের দায়িত্ব পান। কিন্তু বেশী দিন তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি। আমিরের পতন হলে বিসক্রায় তিনি চলে যান। তবে তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। এর পরে তাকে আমরা আলজেরিয়ার কাসানটিনায় (কনস্টান্টিন) ফোর্ট সালামায় দেখি, সেখানে ৪৫ বছর বয়সে তিনি তার বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমা লিখেছিলেন। এটি তিনি কাসানটিনার আমির সুলতান আবুল আব্বাসকে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু এখানেও তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি, প্রায় ২৭ বছর পর বিজয়ী আমির আব্বাসের সেনাদলের সাথে তার জন্মশহর তিউনিসে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন তার জন্যে বেশ বৈরী হয়ে উঠেছিল, ১৩৪২ সালে উত্তর আফ্রিকার এই এলাকা তিনি চিরতরে ত্যাগ করেন। মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় যখন তাকে আমরা দেখি তখন তার বয়স ৫০।

তবে তিনি হজ্জ্বগামী মক্কার ক্যরাভানে যোগ না দিয়ে কায়রো অভিমুখে যাত্রা করেন। কায়রোয় তিনি ইতিমধ্যে তার লেখা ও পাণ্ডিত্যের জন্যে সুখ্যাত হয়ে উঠেছিলে। বিদ্বানরা তাকে স্বাগত জানান। সুলতান তাকে বিশেষ অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। একটি পর্যায়ে বিচারকও হয়েছিলেন, কিন্তু আবার ষড়যন্ত্রের শিকার হন, এসময় পারিবারিক ট্র্যাজেডিও ঘটে, তার পরিবার আর সম্পত্তি বহন করা জাহাজটি একটি ঝড়ে কবলে পড়ে নিমজ্জিত হয়। এরপরে তাকে মূলত শিক্ষকতাই করতে দেখি আমরা। মিসরের অস্থির রাজনৈতিক পটভূমির সাথে তার ভাগ্যের উত্থান-পতনও জড়িয়ে পড়েছিল। তিনি একইসাথে তার বিশ্বজনীন ইতিহাস নিয়ে লেখাটি সম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেন। এই পর্যায়ে তিনি তার বিখ্যাত ‘আসাবিয়া’ ধারণাটি প্রয়োগ করেছিলেন কোনো রাজ্যের উত্থান-পতনের ব্যাখ্যা হিসাবে। আর এটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন সুলতান সালাহ আল-দিনের পর থেকে মিসরের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিবরণে। যদিও আবার তিনি বিচারক ( মালিকি ) হয়েছিলেন তবে অনিচ্ছাসত্ত্বে। সুযোগ পেতেই তিনি সুলতান ফারাজের কারাভানের সাথে দামাস্কাসের পথে যাত্রা করেন। সুলতান পরে ফিরে আসলেও খালদুন ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সেখানে থেকে যান। এখানে থাকার সময় তাকে আমরা কুটনীতিতে সক্রিয় থাকতে দেখি। যেমন, দামাস্কাস আক্রমন করতে এগিয়ে আসা তিমুরলেনের (তৈমুর লং) এর সাথে যুদ্ধে না গিয়ে সমঝোতার একটি চুক্তিতে আসতে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে দামাস্কাসের সাথে তৈমুরের প্রথম আলোচনা ব্যর্থ হবার পর ইবন খালদুন ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে দেখা করতে দামাস্কাস ত্যাগ করেন। এখনও নিশ্চিত নয় তিনি নিজেই এই কাজটি করেছিলেন নাকি তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে তাকে স্বাগত জানানো হয়েছিল তৈমুরের রাজসভায় এবং সেখানে তিনি প্রায় পয়ত্রিশ দিন সেখানে ছিলেন।

তিনি তৈমুরের সাথে একজন দোভাষীর মাধ্যমে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন, তিনি কি বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন তার বিবরণও আমরা পাই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে। আমার তার লেখায় জানতে পারি তৈমুর তাকে তার সভায় যোগ দিতে আহবানও জানান। তবে সেটি করার আগে তিনি মিসরে ফিরে তার অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার অনুমতি চেয়েছিলেন। দামাস্কাসের জন্যে সহনীয় গ্রহনযোগ্য চুক্তি নিয়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন। এরপর তার জীবনের শেষাংশে আমরা তাকে কায়রোয় খুঁজে পাই। একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিবেশে তাকে আমরা বেশ কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে ও হারাতে দেখি। এখানেই তিনি ১৪০৬ সালে (কারো মতে ১৩৯২) মৃত্যুবরণ করেন ৭৪ বছর বয়সে। কায়রোর বাব আন-নাসরের বাইরে সুফি কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। তিনি মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে তার বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমার ভূমিকাটি লিখেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের আর মাগরেবের (উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা) ভূ-রাজনৈতিক-সামাজিক আর অর্থনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছিলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রস্তাবনা করার জন্যে।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই পশ্চিমা বিশ্বে তিনি তার যোগ্য আসনটি পেতে শুরু করেছিলেন, বিশেষ করে যখন তারা বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো মানব ইতিহাসে পরবর্তীতে আসা ধারনাগুলোর সদৃশ ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইবন খালদুনের বিশ্ব ইতিহাসের সেই বিশাল ভূমিকা – Muqaddima (Prolegomena) ফরাসী এবং ইংরেজী ভাষায় আবির্ভূত হয়েছিল চুতুর্দশ শতকে এই আরব ইতিহাসবিদ পশ্চিমে ব্যপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন তার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি আর ধারণাগুলোর জন্যে, ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজ এবং ধর্ম নিয়ে।

ইবন খালদুনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম ধারণাটি যার ভিত্তি ছিল উত্তর আফ্রিকার রাজনীতিতে যা তিনি পেশাগত জীবনেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হিসাবেই অর্জন করেছিলেন, যা বিশেষভাবে তার পশ্চিমা বোদ্ধা পাঠকদের নজরে এনেছিল। তিনি লিখেছিলেন:

‘নেতৃত্ব শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে এর অস্তিত্ব ধরে রাখে, আর শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র টিকে সামাজিক সৌহার্দ্যের মধ্যে’।

তিনি সৌহার্দ বোঝাতে যে আরবী শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি হচ্ছে ‘আসাবিয়া’, যার অর্থ একটি ‘গোষ্ঠীবদ্ধ অনুভূতি’, সামাজিক সৌহার্দ্য অথবা গোত্রবাদীতা, শব্দটি এই বইয়ে ৫০০ বারের বেশী তিনি উল্লেখ করেছিলেন। আসাবিয়ার মূল উৎস মরুভূমির পরিস্থিতিতে, যেখানে গোত্রের মধ্যবর্তী সৌহার্দ টিকে থাকার জন্যে একান্ত জরুরী একটি পূর্বশর্ত। যখন যাযাবর গোত্রগুলো একত্র হয়, তাদের শ্রেষ্ঠতর সামাজিক সংহতি এবং সামরিক দক্ষতা নগরবাসীদের তাদের কৃপার পাত্র করে তোলে। শুধুমাত্র ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত না হয়েও প্রায়শই, তারা বহু নগর দখল করে, নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই, ইবন খালদুনের মতে, এই বিজয়ী গোত্রের মানুষরা তাদের ‘আসাবিয়া’ হারিয়ে ফেলে এবং বিলাসিতা, আড়ম্বর, আর অলসতায় দুষিত হয়। শাসক, যিনি আর সেই সাহসী আর দুর্ধর্ষ গোত্র-যোদ্ধাদের উপর ভরসা রাখতে পারেন না তার প্রতিরক্ষার জন্যে, তিনি বাধ্য হন মাত্রারিক্ত কর আরোপ করতে যেন তিনি নানা ধরনের সৈন্যদের বেতন দিয়ে পুষতে পারেন, আর এটাই পরে আরো সমস্যার কারণ হয়, এবং এক পর্যায়ে সেই রাজবংশ এবং রাষ্ট্রের পতনের কারণ হয়।

খালদুনের এই পারাডাইমের বহু মুগ্ধ পাঠক ছিলেন, আর্নল্ড টয়েনবি (১৮৯৯-১৯৭৫) মুকাদ্দিমাকে স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এ ধরনের কাজের মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম কাজ হিসাবে শনাক্ত করেছিলেন। যদিও টয়েনবির সভ্যতার চক্রাকারে উত্থান আর পতনের ধারণার তীব্র সমালোচক হিউ ট্রেভর রপার (১৯১৪-২০০৩) ইবন খালুদনের লেখার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি তবে তিনি সেটি বর্ণনা করেছিলেন সূক্ষ্ম গভীর আর সমুদ্রের মত আকারহীন বিবরণ হিসাবে। ইতিহাসবিদ মার্শাল হজসন যার তিন খণ্ডের বিখ্যাত The Venture of Islam: Conscience and History in a World Civilization এখনও তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে ইসলামের হিষ্টিরিওগ্রাফির, তিনি মুকাদ্দিমাকে বর্ণনা করেছিলেন “ইসলামিসেট” সভ্যতার একটি সেরা সাধারণ ভূমিকা হিসাবে ( ইসলামিসেট শব্দটি তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, আর সংকীর্ণভাবে ধর্মীয় ইসলামিক শব্দটির পরিবর্তে)। চেক বৃটিশ দার্শনিক এবং নৃতত্ববিদ আর্নষ্ট গেলনার (১৯২৫-১৯৯৫) ইবন খালদুনকে ম্যাক্স ভেবেরের পূর্বসূরি হিসাবে শনাক্ত করেছিলেন, এছাড়া আর্থার লাফের, দেখিয়েছিলেন ইবন খালদুনই প্রথম সেই ধারণাটি করেছিলেন কর বাড়ালে রাজস্ব আয়ে পতন ঘটাতে পারে।

কেউ কেউ ইটালীর দার্শনিক জ্যামবাতিস্তা ভিকোকে (১৬৬৮-১৭৪৪) ইতিহাস দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করেন। অন্যরা এই কৃতিত্ব দেন ফরাসী দার্শনিক মন্টেস্ক্যুকে (১৬৮৯-১৭৫৫)। বাস্তবিকভাবে, আরব দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ ইব্ন খলদুন (১৩৩২-১৪০৬) ছিলেন প্রথম পথিকৃত যিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে, ইতিহাসের, অন্য যে কোনো বিজ্ঞানের মতই, গবেষণার প্রয়োজন আছে। তিনি বলেছিলেন,

‘এটি নানা পরিস্থতি আর ঘটনার বিজ্ঞান এবং এর কারণগুলো খুব গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ, আর এভাবেই এটি প্রজ্ঞার প্রাচীন এবং মৌলিক একটি অংশ, এবং যা এর বিজ্ঞানগুলোর একটি হবার দাবী রাখে’।

তার দ্য ইন্ট্রোডাকশন (মোকাদ্দিমা, ১৩৭৭) বইটিতে তিনি আরো লিখেছিলেন,

‘ইতিহাস হচ্ছে খুব মূল্যবান মতবাদের একটি শিল্প, এর সুফল অগণিত এবং এটি সম্মানজনক এর উদ্দেশ্যে; এটি অতীত কোনো জাতি সম্বন্ধে আমাদের তথ্য দেয় তাদের আচরণ, তাদের জীবনের প্রাসঙ্গিকতায় তাদের নবীদের সম্বন্ধে এবং তাদের রাষ্ট্র এবং রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতায় রাজাদের সম্বন্ধে, সুতরাং যারা পার্থিব কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে অতীতের কাছে দিক নির্দেশনা অনুসন্ধান করেন, তারা যেন সেই সুবিধাটি পেতে পারেন’।

ইবন খালদুনের তত্ত্ব ইতিহাসকে দুটি প্রধান অংশে বিভাজিত করেছিল: ঐতিহাসিক প্রকাশ বা ‘হিস্টোরিকাল ম্যানিফেস্ট’ আর ঐতিহাসিক সারমর্ম বা ‘হিস্টোরিকাল জিস্ট’। তার মতে, শুধুমাত্র কোনো ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করার মধ্যে ইতিহাসের নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখা উচিত নয়, বরং এর পরিবেশ, সামাজিক লোকাচার এবং রাজনৈতিক ভিত্তিগুলো অনুসন্ধান করা উচিত।

‘সত্যিকারের ইতিহাসের অস্তিত্বের কারণ হচ্ছে মানব সামাজিক জীবন সম্বন্ধে আমাদের অবহিত করা, যা আসলেই এই পৃথিবীরই পরিবেশ আর সেই পরিবেশের প্রকৃতি, যা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়। এটির মূল বিষয় হচ্ছে সভ্যতা, বন্যতা আর গোত্রবাদীতা, সেই সাথে বিচিত্র উপায়গুলো, যার মাধ্যমে মানুষ পরস্পরের উপর ক্ষমতা অর্জন করে এবং এসবের পরিণতিগুলো, সেই রাষ্ট্র, তাদের প্রাধান্যপরম্পরার কাঠামো, এবং মানুষের পেশা, জীবনাচরণ, বিজ্ঞান, কারুকাজ এবং বাকী সব কিছুসহ যা সেই পরিবেশে ঘটে বিচিত্র পরিস্থিতির অধীনে’।

ইবন খালদুনের পদ্ধতির ভিত্তি ছিল সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ, তুলনামূলক আলোচনা এবং নীরিক্ষা। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর বিবরণ, এই বিবরণগুলোর উৎস এবং ইতিহাসবিদদের ব্যবহৃত পদ্ধতি যাচাই এবং বিশ্লেষণ তিনি করতে বৈজ্ঞানিক সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি একই ঘটনার বিভিন্ন বিবরণ আর ব্যাখ্যা পরীক্ষা এবং পরস্পর তুলনামুলক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছিলেন, সেই বিবরণগুলো থেকে মিথ্যা, ভ্রান্তি আর অতিরঞ্জিতাকে বাতিল এবং যা আসলেই ঘটেছিল তার নৈর্ব্যক্তিক কিছু ধারণা অর্জন করার লক্ষ্যে। বহু বিবরণই মিথ্যাচার ধারণ করে কারণ সেগুলো কোনো শাসককে তোষামোদ করে তুষ্ট করার প্রচেষ্টায় অথবা অথবা কোনো সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করতে লেখা হয়েছে। খবর-নির্মাতা আর গল্প-বলিয়েরা পরিকল্পিতভাবেই প্রতারণা এবং মিথ্যাচার করেন তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যপূরণে। আর সেকারণেই তিনি ইতিহাসবিদদের তাগিদ দিয়েছিলেন আরো বেশী পাণ্ডিত্যপূর্ণ, পর্যবেক্ষণে নিখুঁত এবং মূল আধেয় এবং এর অন্তর্নিহিত অনুচ্চারিত নানা তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দক্ষ হয়ে উঠতে, যেন তিনি সেখানে কার্যকর সমালোচনা আর সুস্পষ্টতা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারেন।

যদিও তিনি দৃঢ়ভাবেই ঈশ্বর-বিশ্বাসী ছিলেন তবে কখনোই ইতিহাসের কোনো স্বর্গীয় লক্ষ্যের কথা তিনি উচ্চারণ করেননি অথবা কোনো স্বর্গীয় পরিসমাপ্তির কথা বলেননি যেখানে ইতিহাস এসে থেমে যাবে। তিনি বাস্তবিকভাবেই বলেছিলেন, ‘অতীত ভবিষ্যতের মতই, পানি থেকে পানি যেমন’। মনে হতে পারে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে মানব ইতিহাসের কোনো পরিসমাপ্তি নেই। ইবন খালদুন আরো অগ্রসর হয়ে, দেবতা অথবা কোনো স্বর্গীয় প্রত্যাদেশের অধস্তন যেন মনে এমন উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর উপর অধিবিদ্যামূলক ধারণাগুলো আরোপ করে ইতিহাসকে -যা মূলত একটি বিজ্ঞান – শিল্পকলা আর সাহিত্যের নিকটবর্তী কোনো বিষয়ের রূপান্তরিত করার জন্যে ইতিহাসবিদদের সমালোচনা করেছিলেন।

পরিণতিতে কিছু মুসলিম আর পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা ইতিহাস নিয়ে তার এই ধারণাটিকে ব্যবহার করেছিল তাকে নিরীশ্বরবাদী হিসাবে প্রমাণ করতে, তবে স্পষ্টতই তিনি ঈশ্বর অবিশ্বাসী ছিলেন না। তার প্রস্তাবনা ছিল ‘ইতিহাসের বিজ্ঞান’ অধিবিদ্যার অন্তর্গত কোনো বিষয় নয়, এবং এটিকে অধিবিদ্যার কোনো বিষয়ে রূপান্তরিত করাও যাবেনা। তিনি কখনোই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। তার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তার কাজ ‘ঈশ্বর অনুপ্রাণিত, বিশুদ্ধ অনুপ্রেরণা’। ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস আছে কিনা এটি সেই বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে।

তবে ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুব স্পষ্ট এবং তার পূর্বসূরি কয়েকজন মসুলমান দার্শনিকদের ব্যতিক্রম, বিশেষ করে আল ফারাবী (৮৭০-৯৫০), ইবন সিনা (৯৮০-১০৩৭)। একজন পর্যবেক্ষণ/পরীক্ষামূলক দার্শনিক হিসাবে তিনি নবী মোহাম্মদের ৫৭০-৬৩২) পবিত্র সামাজিক পরীক্ষা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, আর সেকারণে ইতিহাসকে তার অশেষ হিসাবে দেখতে পারার কথা নয়। যদি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে চূড়ান্ত সত্য হিসাবে মেনে নেয়া হয় এবং তার নবীরা ও তাদের নানা ধর্মীয় পরীক্ষা যদি এই তথ্যটির সাক্ষ্য দেয়, তাহলে সেই বক্তব্যটি, অতীতের ইতিহাস ঠিক ভবিষ্যতের মত, এমন কথার অবশ্যই মানে হতে পারে যে, এটি মূলত একটি বিরতিহীন ধারাবাহিক ঘটনার সমষ্টি যা কোনো একটি জাতিতে এসে থেমে যায় না, বরং আবর্তাকারে চলমান থাকে।

ইবন খালদুন বিশ্বাস করতেন ঐতিহাসিক কোনো ঘটনার এমনকি খুব ক্ষুদ্রতম কোনো তথ্যকে ভালো করে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করা উচিত, কারণ এগুলো খুব সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, বরং জটিল। তিনি ইতিহাসকে সহজ কোনো বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতেন না, যেহেতু এটি ‘ঘটনাপ্রবাহের গুণগত মাণ ও তাদের কারণ সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান’। আর যেহেতু ইতিহাসের অধিবিদ্যামূলক তত্ত্বগুলো তার দৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক, ইবন খালদুন ইতিহাসের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দর্শনের তাত্ত্বিক ক্ষেত্র থেকে কার্য ও কারণের সম্বন্ধ সংক্রান্ত ধারণাগুলো আমদানী করেছিলেন মূলত ঐতিহাসিক ঘটানসমূহের পার্থিব ‘কারণ এবং নিয়ামকগুলোর’ উপর মনোযোগ দিয়ে। তার পদ্ধতি ছিল সরাসরিভাবে ইনডাকটিভ (আরোহি), যা সরাসরি ইন্দ্রিয় এবং বুদ্ধিমত্তার উপর ভরসা করে কোনো সাধারণ নিয়মের প্রতি তথ্য নির্দেশ না করেই।

তিনি মনে করতেন, বিমূর্ততা আর পরীক্ষামূলকতার মধ্য একটি বড় ফাটল আছে, প্রথমটি ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি আর দ্বিতীয়টি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পৃথিবীর বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। স্বর্গীয় জ্ঞানের বিষয় হচ্ছে একটি অদৃশ্য আত্মা কোনো যা কোনো পরীক্ষার নিয়নন্ত্রণাধীন নয় এবং যার কোনো সংবেদনাত্মক প্রমাণও নেই। সুতরাং এই পৃথিবীতে তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে পারার কথা নয়। আর যেহেতু এই সংবেদাত্মক আর অসংবেদনাত্মক কোনোকিছুর মধ্যে সাধারণ মিল নেই, ইবন খালদুন বিমূর্ত আর স্বর্গীয় জগতকে তার যুক্তিবাদী সিলোজজম (দুটি বিবৃতি থেকে সিদ্ধান্ত-অনুমান) থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। আর ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গিটি গ্রহন করেছেন আধুনিক পজিটিভিজম (জল্পনাকল্পনা বা মানসবিচারের স্থলে ইন্দ্রিয়গম্য প্রপঞ্চ ও সন্দেহাতীত তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, অগস্তঁ কোঁতে’র (ফরাসি দার্শনিক, ১৭৯৮-১৮৫৭) দার্শনিক মতবাদ; প্রত্যক্ষবাদ; দৃষ্টবাদ) এমনকি প্রয়োগবাদীরাও (কোনো ভাব, প্রত্যয় বা উক্তির সত্যতা বা মূল্যনির্ভর করে মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে তার প্রাসঙ্গিকতার উপর- এই তত্ত্ব বা বিশ্বাস; প্রয়োগবাদ )ইবন খালদুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন এর সূচনা ধাপে ।

ইতিহাসের ‘মিথ্যাচারের’ কারণগুলো নিয়ে তার বিশ্লেষণ ও শনাক্তকরণে, ইবন খালদুন বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছিলেন, যেমন: সেকটারিয়ানিজম বা উপদলীয়তা, ভুল উৎসের উপর ভরসা করা, কিছু গোপন উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞতা এবং শাসকশ্রেণীকে তোষামোদ করার প্রবণতা। সেকারণে, বহু ইতিহাসবিদ, অনুলিপনকারী এবং গল্প-বলিয়েরা কোনো ঘটনার অসত্য বিবরণ মেনে নেবার মত ভুল করেছেন কিংবা সেই ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন যা আসলেই ঘটেনি কারণ তারা আরো নিবিড়ভাবে সেই রিপোর্টের উৎস সত্য না মিথ্যা যাচাই করার প্রচেষ্টা না করে, অন্য কিছুর সাথে তুলনা না করে বা এই বিষয়টির উপর তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা আরোপ না করেই শুধুমাত্র রিপোর্টের উপর ভরসা করেছেন। আর এভাবে তার নিজেদের দূর্বল ইতিহাসবিদ হিসাবে প্রমাণ করেছেন। যেমন, আল-মাসুদি এবং বেশ কিছু আরব ইতিহাসবিদ মেনে নিয়েছিলেন যে নবী মোজেস যে ইসরায়েলাইট বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেখানে বিশ বছর বয়স বা এর উর্ধে ৬০০০০০ পুরুষ সদস্য ছিল। কিন্তু যদি আমরা সতর্কভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি দেখবো এটি ভুল, কারণ জ্যকব ও গোত্র সদস্যরা যখন মিসরে প্রবেশ করেছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০। জ্যাকব থকে মোজেস অবধি মাত্র মাত্র চার প্রজন্ম ব্যবধান, তাহলে কিভাবে মোজেসের বাহিনীতে এত সংখ্যক তরুণ আর পুরুষ সৈন্য থাকা সম্ভব? এছাড়াও, ইসরায়েলাইটরা নিজেরাই যেমন উল্লেখ করেছে সলোমনের বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১২,০০০ আর তার ১৪০০ ঘোড়া ছিল, যখন কিনা তারা এই রাজ্যকে তাদের রাজ্যের শক্তিশালী অবস্থান আর সবচেয়ে বড় সম্পসারণ হিসাবে হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন।

তাহলে এখানে আল-মাসুদ ভৌগলিক বাস্তবতা অস্বীকার করতেও সফল হয়েছিলেন। কীভাবে এই বিশাল সেনাবাহিনী তিনি এই ঘুরপথে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন? নির্দিষ্ট একটি এলাকার মধ্যে দিয়ে কিভাবে এত মানুষের জায়গা করা সম্ভব? ঐতিহাসিক জ্ঞানেও আল-মাসুদ ভালো করেননি। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটি রাজ্যে সেই রাষ্ট্রটিকে সুরক্ষা করতে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনানিবাস থাকে আর সেটি নির্ভর করে দেশটি আয়তনের উপর। কোনো একটি রাজ্যে যার ছয় লক্ষ বা তার বেশী সৈন্য আছে তার সীমানা ইসরায়েলের প্রাচীন রাজ্যের তুলনায়অবশ্যই অনেক বড় হতে হবে।

‘একজন ইতিহাসবিদের জন্যে আবশ্যিক’ কি হতে পারে সেই বিষয়ে ইবন খালদুন একটি ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ঘটনা আর কাহিনী বিশ্লেষণ করতে পারার মত যোগ্য হয়ে উঠতে একজন ইতিহাসবিদের জন্যে আবশ্যিক বিষয়গুলো তিনি উল্লেখ করেছিলেন:

(১) রাজনীতির নিয়ম আর জনগণের প্রকৃতি সম্বন্ধে একটি বোঝাপড়া
(২) প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং স্থান ও কালভেদে এর ভিন্নতা সম্বন্ধে জ্ঞান
(৩) বিভিন্ন জাতির সামাজিক পরিবেশ সম্বন্ধে পরিচিতি, যেমন, এর জীবনাচরণ, নৈতিকতা, উপার্জন, মতবাদ ইত্যাদি।
(৪) বর্তমান সময় সম্বন্ধে একটি বোঝাপড়া এবং অতীতের সাথে এটি তুলনা করতে পারার দক্ষতা
(৫) রাষ্ট্র আর গোত্রের উৎপত্তি আর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান, তাদের ঘোষিত মূলনীতি, আইন, তাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সম্বন্ধে জ্ঞান

ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সম্বন্ধে একটি বিশ্লেষণী বোঝাপড়া অর্জন করতে হলে তাহলে ইতিহাসবিদদের অবশ্যই সেই পর্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো অধ্যয়ন করতে হবে, যা তিনি অনুসন্ধান করছেন এবং কোনো বিশেষ ঘটনার সাথে সেটি তাকে তুলনামূলক একটি বিশ্লেষণ করতে হবে যে বিষয়ে জানতে তিনি আগ্রহী। তারপর তার উচিত হবে একই ধরনের ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করা যা ঘটেছে অন্য পর্বে এইসব পর্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসহ। যখন তিনি এই দুটি প্রধান ধাপ সম্পন্ন করবেন, তখন কোনো ঘটনাকে যুক্তিসঙ্গত এবং সম্ভবত সত্য অথবা অগ্রহনযোগ্যে আর অবশ্যই নিশ্চিত মিথ্যা হিসাবে শনাক্ত করতে পারার মত সক্ষমতা তার থাকা উচিত। সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনা কেবলমাত্র পৃথকভাবে অধ্যয়ন করা উচিত তাদের সেই সময়পর্বের সাধরণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে, জানতে যে, তাদের কোন অংশটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা।
তার ‘দ্য ইনটেলেক্ট’ বিশ্লেষণে ইবন খালদুন বিশ্বাস করেছিলেন, বোধশক্তি ও বিচারবুদ্ধি বা মেধার একটা সীমানা আছে যা এটি অতিক্রম করতে পারেনা আর সেটাই এটিকে বাধা দেয় ঈশ্বর ও তার অন্য বিষয়গুলো সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে জানতে। এটাই এর বাস্তবতা, আর মানুষ এটিকে আপগ্রেড বা উন্নয়নও করতে পারেনা অথবা এর সক্ষমতার স্তরও বৃদ্ধি করতে অক্ষম। তিনি দাবী করেন যে, বুদ্ধিমত্তা কখনোই ‘আত্মা আর স্বর্গীয় সত্তার’ বাস্তবতা আর উচ্চতর জগতে অস্তিত্বশীল কোনো বিষয় নিয়ে ‘সচেতন’ (বা অবহিত) হতে পারেনা কারণ এটি তার নাগালের বাইরে, আর এটি সে জানতে এবং প্রমাণ করতে অক্ষম। আমরা শুধুমাত্র যা কিছু বস্তুগত সেটি সম্বন্ধে অবহিত হতে পারি, যদি কোন কিছু নিরবয়ব হয় আমরা এটি না পারি প্রমাণ করতে, না পারি কোন প্রমাণকে এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করতে।

ইবন খালদুন অধিবিদ্যা নিয়ে বেশী ভাবতে মেধাকে খুব সামান্যই উৎসাহ দিয়েছেন, তিনি আল গাজালীকে (১০৫৯-১১১১) বরং ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন, আরব-ইসলামি বৌদ্ধিক ধারায় দার্শনিক ভাবনায় একটি চূড়ান্ত আর প্রায়-মরণঘাতি আঘাত হেনে। তাসত্ত্বেও বলতে হবে একটি দরজা বন্ধ করে ইবন খালদুন সম্পুর্ন নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছিলেন মানব মনের জন্যে: সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের দর্শন।

(সমাপ্ত)

ইবন খালদুন: ইতিহাসের দর্শন

ভেতরে থাকা এক টুকরো বসন্ত: কামু

দার্শনিক অ্যালান দো বোতোঁ’র একটি লেখা অবলম্বনে:

আলবেয়ার্ত কামু ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন মধ্য-বিংশ শতাব্দীর ফরাসী-আলজেরীয় একজন দার্শনিক। আমাদের মনোযোগের উপর তার দাবীর ভিত্তি মূলত তার তিনটি কালজয়ী উপন্যাস, The Outsider (১৯৪২), The Plague (১৯৪৭), and The Fall (১৯৫৬) এবং দুটি দার্শনিক প্রবন্ধ, The Myth of Sisyphus (১৯৪২) and The Rebel (১৯৫১)। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন মাত্র ৪৬ বছর বয়সে, তার প্রকাশক মিশেল গালিমর্দ ঘটনাচক্রে তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন, যখন তিনি তার ফাসেল ভেগা স্পোর্টস কারটি নিয়ে একটি দূর্ঘটনায় পড়েছিলেন। মৃত্যুর সময় কামুর পকেটে একটি ট্রেনের টিকিট ছিল, যা তিনি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেন একেবারে শেষ মূহূর্তে, গালিমর্দের গাড়িতে একসাথে গন্তব্যে ফিরবেন বলে।

কামুর খ্যাতি সূচনা করেছিল তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি আউটসাইডার’; উপন্যাসটির পটভূমি তার জন্মস্থান আলজিয়ার্স, এটি মূলত মারসোউল্ট (Meursault) নামের স্বল্পভাষী, বিচ্ছিন্ন, শ্লেষপটু আর নৈরাশ্যবাদী একটি চরিত্রের জীবনকে ঘিরে – যিনি ভালোবাসা, কাজ অথবা বন্ধুত্ব , সবকিছুই অর্থহীন বলে মনে করতেন, এবং ঘটনাচক্রে একদিন তিনি – খানিকটা ভুলবশত – একজন আরব ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন। তিনি জানতেন না তার এরকম একটি কাজের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল এবং পরিণতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয় – আংশিকভাবে এর কারণ বিচারের সময় তিনি কোনো ধরণের অনুশোচনা প্রকাশ করেননি, এমনকি নিজের নিয়তি নিয়েও তিনি কোনো ধরনের উৎকণ্ঠাও প্রকাশ করেননি।

উপন্যাসটি সেই মানসিক অবস্থাটির একটি চিরন্তন রুপ দিয়েছিল – যা সংজ্ঞায়িত করেছিলেন সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্কহাইম, ‘অ্যাসানোমি’ (asanomie) নামে – হতদ্যোম, অবসাদগ্রস্থ, আবেগহীন, উদাসীন, বিচ্ছিন্নতার সেই পরিস্থিতি, যখন কেউ নিজেকে অন্য সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন অনুভব করেন এবং তাদের সহমর্মিতা কিংবা মূল্যবোধগুলো ভাগ করে নেবার কোনো উপায় খুজে পান না। দীর্ঘদিন ধরেই তার দি আউটসাইডার বইটি পড়া ফরাসী তরুণদের বয়ঃসন্ধিকাল থেকে উত্তরণের একটি আচার হিসাবে গণ্য হয়ে এসেছে, এবং অবশ্যই ব্যপারটা সহজ নয়, কারণ এ বইটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা সতেরো বছর বয়সে প্রথমবারের মত আত্মস্থ করা জটিল একটি কাজ।

দি আউটসাইডারের নায়ক মারসোউল্ট সবকিছু যেভাবে বিদ্যমান সে সংক্রান্ত সব প্রচলিত উত্তরগুলোকে কখনোই মেনে নিতে পারেননি। তিনি সবকিছুকেই ভণ্ডামি আর ভাবপ্রবণতায় আক্রান্ত হিসাবে দেখতেন – এবং তিনি বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যেতে অক্ষম ছিলেন। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রদত্ত বা উপস্থাপিত সর্বজন স্বীকৃত ব্যাখ্যাগুলোকে গ্রহন করতে পারতেন না, যেমন শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র, সম্পর্ক, সরকার পদ্ধতি।

তিনি সাধারণ বুর্জোয়া জীবনের বাইরে দাড়িয়ে ছিলেন, তীব্রভাবে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছেন সেই সমাজের নিঃশেষিত নৈতিকতা আর পরিবার আর অর্থ উপার্জনের প্রতি সংকীর্ণ উৎকণ্ঠাগুলোকে। কামু বইটির যুক্তরাষ্ট্রের সংস্করণের পরিশেষে লিখেছিলেন, ‘মারসোউল্ট এই খেলায় অংশগ্রহন করেনি। সে মিথ্যা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, সে নিজে আসলে কী, সেটাই সে বলেছিল, সে তার অনুভূতি গোপন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল – আর সে কারণে সমাজও তাৎক্ষণিকভাবে হুমকি অনুভব করেছিল’।

বইটির অস্বাভাবিক মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষমতাটির বড় একটি অংশ এসেছে শীতল আর বিচ্ছিন্নতার যে কণ্ঠস্বর নিয়ে মারসোউল্ট আমাদের সাথে কথা বলেন – আমরা মানে তার পাঠকরা।

নৈরাশ্যবাদী আধুনিকতার শিশু  কামু মেনে নিয়ে নিয়েছিলেন এই সুবিশাল মহাবিশ্বের বৃহত্তর কাঠামোয় আমাদের সবার জীবনই অর্থহীন – তবে অন্য দার্শনিকদের ব্যতিক্রম তিনি চুড়ান্ত আশাহীনতা অথবা নৈরাশ্যবাদকে সরাসরি প্রতিরোধ করেছিলেন তার লেখায় । তিনি যুক্তি দেন যে আমাদের সে জ্ঞান নিয়েই বাঁচতে হবে যে, আমাদের সব প্রচেষ্টাই নিষ্ফল, আমাদের জীবন খুব দ্রুত সবাই ভুলে যাবে এবং আমাদের প্রজাতি অংশোধনীয়ভাবে নীতিভ্রষ্ট, সহিংস এবং তাসত্ত্বেও তাদের সব সহ্য করে টিকে থাকতে হবে। কামু লিখেছিলেন, আমরা সিসিফাসের মত, যে গ্রিক যে চরিত্রটিকে দেবতারা শাস্তি দিয়েছিলেন বড় একটি পাথরের টুকরো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে তোলার জন্য, কিন্ত পাথরটি উপরের তোলার পর সেটি আবার গড়িয়ে  নীচে পড়ে যেত, সিসিফাসকে আবার সেটি ঠেলে উপরে ওঠাতে হতো – এভাবেই অনন্তকাল ধরে সিসিফাস এ অর্থহীন পরিশ্রমের শাস্তিতে বন্দী। কিন্তু পরিশেষে, কামু প্রস্তাব করেন, আমরা যা-ই কিছু করি না কেন, আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে যতটুকু আমরা পারি। আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে অস্তিত্বের এই অর্থহীনতার প্রেক্ষাপটটিকে – এবং তারপর এই চিরন্তন আশাহীনতার সম্ভাবনাকে জয় করতে হবে। তার সেই বিখ্যাত প্রস্তাবনা – One must imagine Sisyphus happy  (আমাদের অবশ্যই সিসিফাসকে সুখি কল্পনা করতে হবে)।

এখানেই আমরা কামুর মুগ্ধ করার ও প্ররোচনা দেবার অসাধারণ দিকটি অনুভব করতে পারি। কামু তার নিজেকে এবং আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চান সেই সব কারণগুলো যে জীবনকে সহ্য করা অর্থহীনতা নয়। এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি অসাধারণ তীব্রতা আর পাণ্ডিত্যের সাথে নানা বিষয় নিয়ে লিখেছিলেন, সম্পর্ক, প্রকৃতি, গ্রীষ্ম,খাদ্য এবং বন্ধুত্ব। জীবনে বেঁচে থাকার কারণ দেখানোর পথপ্রদর্শক হিসাবে কামু চমৎকার। বহু দার্শনিক থেকেই কামু ভিন্ন ছিলেন এ ক্ষেত্রে।  কামু ছিলেন সুদর্শন, খুব সফল ছিলেন নারীদের সাথে, তার জীবনের ১০ বছরে, বহু সম্পর্ক তার প্রমাণ। চমৎকার ফ্যাশন জ্ঞান ছিল তার, জেমস ডিন আর হামফ্রে বোগার্টের স্টাইলের একটি চমৎকার মিশ্রণ ছিলেন তিনি, সন্দেহ নেই কেন ‘ভোগ’ ম্যাগাজিন তাদের প্রচ্ছদে তাকে চেয়েছিল। কিন্তু কামুর জন্য এই সব শুধুমাত্র খামখেয়ালী সখ ছিল না – কারণ তিনি সত্যিকারভাবে জীবনের অদ্ভুত দিকটি অনুধাবন করেছিলেন, হয়তো সেটি যে কাউকে আশাহীনতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় – কিন্তু একই সাথে আরো বেশী তীব্রভাবে বাঁচতে বাধ্য করে। সেভাবে কামু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন নিজের কাছে – এবং গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেছিলেন সাধারণ জীবনের আনন্দগুলোর কথা। তিনি বলেছিলেন তিনি তার দর্শনকে দেখেন  a lucid invitation to live and to create, in the very midst of the desert – এই মরুভূমির মধ্যে বেঁচে থাকা আর সৃষ্টি করার জন্য একটি সুস্পষ্ট আহবান হিসাবে।

তিনি সাধারণত্বের পক্ষে কথা বলেছিলেন – দর্শনে সাধারণত্বের সমর্থক সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তার গভীর দর্শনের পাতার পর পাতা পড়ার পর, পাঠকরা সেই সব মুহুর্তে স্বস্তির শ্বাস ফেলেন যখন কামু সুর্যালোক, চুমু কিংবা নাচের প্রশংসা করেছেন। নাটক কিংবা থিয়েটারের সাথে জড়িত থাকা কামুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তার পছন্দ আসলে কি – ফুটবল নাকি থিয়েটার, কামু উত্তর দিয়েছিলেন – কোনো ইতস্ততা ছাড়া ফুটবল। কামু স্থানীয় আলজিয়ার্স টীমে গোলকিপার হয়ে খেলেছন, এছাড়া ইউনিভার্সিটির অ্যাথেলেটিক্স টিমেও ছিলেন। টিম স্পিরিট, ভ্রাতৃত্ববোধ ও একটি সাধারণ উদ্দেশ্য – সবকিছু কামুকে দারুন ভাবে নাড়া দিয়েছিল, ৫০ এর দশকে যখন একটি ক্রীড়া ম্যাগাজিন সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো ইউনিভার্সিটি ফুটবল টিমে তার কাটানো সময় , তিনি বলেছিলেন, বহু বছর পর, যখন আমার অনেক কিছুই দেখা হয়ে গেছে, আর মানুষের নৈতিকতা ও কর্তব্য সম্বন্ধে আমি যা নিশ্চিতভাবে জানি, সে সব কিছুর জন্য আমি ক্রীড়ার কাছে ঋণী। কামু সে সব নৈতিকতার কথা বলছিলেন যা তিনি তার প্রবন্ধগুলোয় সমর্থন করেছেন: বন্ধুর পাশে থাকা, খেলোয়াড়সূলভ মনোভাব আর সাহসিকতাকে মূল্য দেয়া। 

কামু সুর্যকে ভালোবাসতেন, তার চমৎকার প্রবন্ধ Summer in Algiers তিনি লিখেছিলেন পানি উষ্ণতা আর রমনীদের বাদামী শরীরের দৃশ্য তিনি উপভোগ করতেন, লিখেছিলেন, ‘২০০০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত, বেলাভূমিতে নগ্ন শরীরের আবির্ভাব হয়েছে, ২০ শতাব্দী ধরে মানুষ ঔদ্ধত্ব আর অকপটতাকে ভদ্রতা দেবার চেষ্টা করেছে, চামড়া আর মাংসের পরিমান কমিয়ে, পরিচ্ছদকে জটিল করে। আজ তরুণরা ভূমধ্যসাগরীয় বেলাভূমিতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে পুনরাবৃত্তি করছে ডেলোসে সেই ক্রীড়াবিদদের ভঙ্গিমাগুলো’। একধরণের নতুন পাগানিজমের স্বপক্ষে তিনি কথা বলেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল শরীরের তাৎক্ষণিক সুখ খোঁজা: ‘আমি চমৎকার দীর্ঘদেহী এক তরুণীর কথা মনে করতে পারি, যে সারা বিকেল জুড়েই নেচেছিল। তার আটোসাটো নীল জামার উপর পরা ছিল জেসমিনের মালা, সারা শরীর যার ঘামে সিক্ত। নাচের সময় মাথা পেছনে হেলিয়ে প্রাণখুলে সে হাসছিল, যখনই টেবিলের পাশ সে অতিক্রম করছিল, ফুল আর মাংসের একটি মিশ্র গন্ধ সে রেখে যাচ্ছিল’।

কামু প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে যারা এই সব তুচ্ছ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন না বরং তাদের কামনা আরো মহতী কিছু – আরো বিশুদ্ধ:’ যদি জীবনের বিরুদ্ধে কোনো পাপ থেকে থাকে, এটি হয়তো জীবনের হতাশার বিষয়টি নয়, বরং অন্য কোনো জীবনের আশা করা আর এই জীবনের মাহাত্ম থেকে পালিয়ে বেড়া’।

একটি চিঠিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে আকৃষ্ট করে যতক্ষণ অবধি তারা জীবনের ব্যপারে আগ্রহী, সুখের জন্য উদগ্রীব। বহু কারণ আছে যার জন্য মৃত্যুবরণ করা যুক্তিযুক্ত কিন্তু কোনো কিছু যুক্তিযুক্ত না যার জন্য হত্যা করা যেতে পারে’।

তার জীবদ্দশায় কামু প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু প্যারিসে বুদ্ধিজীবি সমাজ তাকে গভীরভাবে সন্দেহ করতো। কারণ তিনি কখনো প্যারিসের সেই অভিজাতদের দলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন কর্মজীবি pied-noir ( শব্দটি বোঝায় এমন কেউ যার জন্ম আলজেরিয়ায়, তবে ইউরোপীয় তার বংশঐতিহ্যে), যিনি শৈশবেই যুদ্ধাহত বাবাকে হারিয়েছিলেন, মা জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন উচ্চবিত্তদের বাড়ী পরিষ্কার করে। সুতরাং ব্যপারটা কাকতলীয় নয় যে, কামুর প্রিয় দার্শনিক ছিলেন মনতাইন – আরেকজন মাটির কাছাকাছি বাস করা নিরহংকার ফরাসী এবং এমন একজন যাকে আমরা ভালোবাসতে পারি তিনি যা লিখেছেন এবং তিনি যেমন ছিলেন উভয় কারণেই।

বিংশ শতাব্দী সাহিত্যে যে কিংবদন্তীর সূচনা বাক্য আছে কামুর দি আউটসাইডারের সূচনা বাক্যটি তাদের মধ্যে অন্যতম। একটি বাক্যই পুরো উপন্যাসটির সুর নির্ধারণ করে দিয়েছে।“Today mother died. Or maybe yesterday, I don’t know. ‘আজ মা মারা গেলেন। অথবা গতকাল, আমি জানি না’। উপন্যাসটির শেষও তীব্রভাবে উদ্ধত। মারসোউল্ট, পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া আর উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘটানো হত্যাকাণ্ডটির জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়, যেহেতু বন্দুকের ঘোড়ায় চাপ দেবার অনুভূতি কেমন হতে পারে সেটা কৌতুহলোদ্দীপক হতে পারে – সে সব ধরনের স্বান্তনাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, এবং সাহসের সাথে মেনে নিয়েছিল মানব জাতির প্রতি মহাবিশ্বের চুড়ান্ত নির্বিকার নিঃস্পৃহতাকে : ‘আমার শেষ ইচ্ছা হচ্ছে আমার রায় কার্যকর হবার দিন দর্শকদের একটি জমায়েত হবে,আর তারা আমাকে শুভকামনা জানাবে ঘৃণা আর বিদ্বেষপূর্ণ চিৎকারে’।

এমনকি যখন আমরা নিজেরা হত্যাকারী নই এবং আমরা আসলেই বিষন্ন হতে পারি যখন আমাদের মায়ের মৃত্যু হয়, তারপরও দি আউটসাইডারের মেজাজে কিছু আছে যা কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের সবার কম বেশী আছে, যখন আমরা ভাবি আমাদের যথেষ্ঠ পরিমান স্বাধীনতা আছে অনুধাবন করার যে আমরা একটি খাঁচায় বাস করি, কিন্তু আমাদের সেই খাঁচা থেকে বের হবার জন্য প্রয়োজনীয়তা স্বাধীনতা নেই … কিংবা কেউই যখন আমাদের বুঝতে পারে না – সবকিছু অনেক বেশী হতাশাপূর্ণ মনে হয় … মনে পড়ছে এমন কোনো অভিজ্ঞতা ?

এই উপন্যাসটি ছাড়াও কামু দার্শনিক খ্যাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি একটি প্রবন্ধ The Myth of Sisyphus, এই বইটির সূচনা বাক্যটিও যুগান্তকারী.. “There is but one truly serious philosophical problem and that is suicide. Judging whether life is or is not worth living, that is the fundamental question of philosophy. বা সত্যিকারভাবে একটি মাত্র দার্শনিক সমস্যা আছে এবং সেটি হচ্ছে আত্মহত্যা, বেঁচে থাকার কি আদৌ কোনো মুল্য আছে কিংবা নেই – এই বিষয়টি বিচার করা, আর এটাই দর্শনের মৌলিক প্রশ্ন। এই ধরনের একটি প্রস্তাবনার কারণ, কামুর চোখে, কারণ যখনই আমরা গভীরভাবে ভাবতে শুরু করি, যেমন দার্শনিকরা করে থাকেন, আমরা দেখতে পাই জীবনের আসলে কোনো অর্থ নেই – এবং সেকারণেই আমরা বাধ্য হই ভাবতে আমরা কি এটি শেষ এর সাথে সব হিসাব নিকাশ চুকিয়ে ফেলবো কি – ফেলবো না।

বরং এই চরম দাবী বা প্রস্তাবনাটির অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে আমাদের উচিৎ হবে কামুকে দর্শনের ইতিহাসের তার অবস্থানে বসাতে। তার নাটকীয় ঘোষণা যে – আমাদের আত্মহত্যার কথা বিবেচনা করতে হবে কারণ জীবন অর্থহীন মনে হতে পারে – এমন প্রস্তাবনাটি নির্ভর করে আছে সেই ধারণায় যে জীবন আসলেই সমৃদ্ধ হতে পারে ঈশ্বর প্রদত্ত অর্থময়তায় – যে ধারণাটি আজ আমাদের অনেকের কাছেই মনে হতে পারে বহু দূরবর্তী কোনো ধারণা। তারপরও যদি খুব ভালো করে লক্ষ করা যায় , দেখা যাবে অন্তত পশ্চিমে গত দুই হাজার ধরে, জীবনের অর্থময়তার ধারণাটির উৎস অন্য সব কিছুর চেয়ে একটি প্রতিষ্ঠান- খ্রিস্টীয় চার্চ।

কামু বহু দার্শনিকদের সেই ধারবাহিকতায় অবস্থান করছেন, কিয়ের্কেগার্দ থেকে নীচাহ থেকে হাইডেগার এবং সার্ত্রে, যার প্রত্যেকেই মল্লযুদ্ধ করেছেন সেই অস্বস্তিকর উপলদ্ধির সাথে যে, বাস্তবিকভাবেই জীবনের কোন পূর্বনির্ধারিত অর্থ নেই। আমরা শুধুমাত্র জৈববৈজ্ঞানিক অণুসমষ্ঠী যারা অচেতনভাবেই ঘূর্ণায়মান নির্বিকার কোনো একটি মহাবিশ্বের ছোট একটি পাথরের টুকরোর উপর। আমাদের এখানে কোনো কল্যাণময় স্বর্গীয় সত্তা প্রতিস্থাপন করেননি এবং এমন কোন নির্দেশও দেননি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে আমাদের মুক্তির জন্য, যেমন – টেন কমান্ডমেন্ট , গসপেল কিংবা কোনো ধর্মগ্রন্থানুসারে। কোনো পথ নির্দেশনা নেই এবং কোনো সুবিশাল ‍উদ্দেশ্য নেই । আর এই উপলদ্ধিটাই সে সব দার্শনিকদের বহু প্রস্তাবিত সংকটের কেন্দ্রে অবস্থিত, যাদের আমরা এখন জানি অস্তিত্ববাদী বা Existentialists হিসাবে।

ভেতরে থাকা এক টুকরো বসন্ত: কামু