আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস: ডারউইনের মতো যিনি স্বতন্ত্রভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা ভেবেছিলেন

(ভূমিকা: মূলত শন বি ক্যারল এর Great Minds Think Alike: How Alfred Wallace came to share Darwin’s revolutionary insights অবলম্বনে এটি লেখা । লেখাটির একটি সম্পাদিত সংস্করণ,২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী মুক্তমনা ব্লগে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংস্করণটি আরেকটু পরিবর্ধিত করা হয়েছে শন বি ক্যারল এর Remarkable Creatures: Epic Adventures In The Search For The Origins of Species এর তৃতীয় অধ্যায় Drawing the lines between Monkeys and Kangaroos, এডওয়ার্ড লারসনের Evolution: The Remarkable History of a Scientific Theory ও মাইকেল শেরমারের In Darwin’s Shadow) বইগুলো থেকে তথ্য নিয়ে)

(ছবি: লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রাঙ্গনে উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা প্রকৃতি বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস স্মারক ভাস্কর্য। সাত ফুট লম্বা এই ব্রোন্জ ভাষ্কর্যটির শিল্পী অ্যান্হনী স্মিথ। ২০১৩ সালে ৭ নভেম্বর ডেভিড অ্যাটেনবরো এটি উন্মোচন করেছিলেন)

ডারউইন ও ওয়ালেস: সমান্তরাল পথে

গত দুই শত বছরে প্রজাতির উৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান অনুপ্রাণিত করেছিল বহু অসাধারণ বৈজ্ঞানিক অভিযান। পুরো ২০০৯ সাল জুড়ে চার্লস ডারউইনের দুইশততম জন্মবার্ষিকীতে সারা পৃথিবী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছিল পৃথিবীর অন্যতম সেরা প্রকৃতিবিজ্ঞানী আর সুদূরপ্রসারী এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের নেতা ডারউইনের অবদান। ডারউইনের বিখ্যাত সমুদ্রযাত্রা আর তার গবেষণা অতি সুপরিচিত, আর তা অত্যন্ত সঙ্গত কারণে, পরিচিত হওয়াটাই উচিৎ। কিন্তু বিবর্তন তত্ত্বের সূচনা, শুরুর দিকে এর ক্রমবিকাশ আর গ্রহনযোগ্যতার জন্য আমরা কিন্তু আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের কাছেও অনেকাংশে ঋণী। আরো অনেক বেশী কঠিন ‍অবস্থার মধ্য দিয়ে ওয়ালেস দুটি সূদীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন এবং স্বতন্ত্রভাবে তিনিও প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে ডারউইনের মত একই ধরনের ‍উপসংহারে পৌছে ছিলেন। এই পর্বটি আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে নিয়ে।

(ছবিঃ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (বায়ে)বিবর্তন কেমন করে কাজ করছে সে বিষয়েই শুধুমাত্র ডারউইনের মত একই উপসংহারেই পৌছাননি,এমনকি তিনি একই বাক্য ব্যবহার করেছিলেন তার তত্ত্বাটকে ব্যাখ্যা করতে।)

ওয়ালেসের নাটকীয় কাহিনী আর বৈজ্ঞানিক অবদানগুলোর পরিচিতি সাধারণত অনেক কম। লেখক সি. ডব্লিউ. সেরাম তার অভিযানকে ব্যাখা করেছিলেন ‘কর্ম আর প্রাণশক্তির একটা ‍মিশ্রণ’ হিসাবে, আর আলফ্রেড ওয়ালেসের অভিযান ছাড়া আর কোনো প্রকৃতিবিজ্ঞানীরই অভিজ্ঞতাকে এটি সঠিক সংজ্ঞায়িত করতে পারবে না। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য অভিযান ‍আর আবিষ্কারের কথা, যেমন কিভাবে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ডারউইনের মত একই সিদ্ধান্তে পৌছেছিলেন আর এছাড়াও কেমন করে এই দুই মহান প্রকৃতিবিজ্ঞানীর মধ্যে উষ্ণ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, নীচের কয়েকটি পরিচ্ছদ হলো সেই অসাধারণ কাহিনীরই বিবরণ।

ওয়ালেস ও ডারউইন, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক পরিচিতি আর তাদের মানসিকতায় দুজনই খুব ভিন্ন ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মিলগুলোও ছিল বিস্ময়কর। গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন ওয়ালেস, নিজেই নিজেকে শিক্ষিত করে তুলেছিলেন, আর অন্যদিকে সেই সময়ে পয়সা দিয়ে কেনা সম্ভব সেরা সব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই ডারউইন পেয়েছিলেন। দুজনেই প্রকৃতি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন অল্প বয়সেই, শখ হিসাবে শুরু করা এই আগ্রহটি দুজনেই রূপান্তর করেছিলেন তাদের পেশায়। দুজনেই চেয়েছিলেন ইংল্যাণ্ড থেকে বের হতে আর ক্রান্তীয় অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে নানা প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ সংগ্রহ করে বিখ্যাত হতে। দুজনেই সেটা করেছিলেন তাদের তরুণ বয়সে, ডারউইন যখন এইচ এম এস বিগলে ওঠেন তখন তার বয়স ছিল ২২ এবং ওয়ালেস প্রথম ইংল্যান্ড ছেড়ে বের হন তখন তার বয়স ছিল ২৫। সর্বোপরি দুজনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল ছিল, তারা দুজনই বিপুল পরিমান প্রজাতির নমুনা সংগ্রহে দক্ষ ছিলেন এবং এই নমুনা সংগ্রহ করার মাধ্যমেই তাঁরা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন প্রত্যেকটি প্রজাতিই পরস্পর থেকে কত ভিন্ন, বৈচিত্র্যময় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হতে পারে। আর কষ্টার্জিত এই জ্ঞানের মাধ্যমেই তারা নমুনা সংগ্রাহক থেকে হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানী, তারা শুধুমাত্র জানতে চাননি, কোনো একটা নির্দিষ্ট স্থানে কত ধরনের প্রাণী প্রজাতি বসবাস করে বরং সেই নির্দিষ্ট জায়গায় ‍কিভাবে তাদের সৃষ্টি হয়েছিল সেটি তারা জানতে চেয়েছিলেন। আর এই প্রশ্নগুলোই তাদের দুজনকেই পৃথকভাবে ‍অনন্য এবং যৌথ এক বৈপ্লবিক আবিষ্কারের পথে নিয়ে গিয়েছিল। 

সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক স্বচ্ছলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে পুঁজি করে বিগল অভিযানের জন্যে ডারউইন নির্বাচিত হয়েছিলেন ও পরে স্বাধীন বিজ্ঞানী হিসাবে স্বচ্ছল জীবনে স্থিতিশীল হয়েছিলেন। তাকে কখনোই জীবিকা অর্জন করতে কাজ করতে হয়নি। ১৮৪৮ থেকে ১৮৬২ ওয়ালেস দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বেসিনে নমুনা সংগ্রহের অভিযানে গিয়েছিলেন প্রকৃতি বিজ্ঞানী বন্ধু হেনরী ওয়াল্টার বেটস এর সাথে, তারপর তিনি পাড়ি জমান মালয় দ্বীপপুঞ্জে; পশুর চামড়া, কীটপতঙ্গ আর উদ্ভিদের নমুনা ব্রিটিশ সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে সমুদ্র যাত্রার জন্য তার নিজেকেই অর্থের যোগান করতে হয়েছিল। সমুদ্রযাত্রার জন্য তাকে ব্যবহার করতে হয়েছিল বাণিজ্যিক জাহাজগুলো, এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে তিনি যে জাহাজ পেয়েছিলেন সেটাই ধরেছিলেন। স্থানীয় গাইডদের ব্যবহার করে তিনি এমন সব এলাকায় অভিযান করেছিলেন যেখানে ইউরোপীয়রা এর আগে কখনো যায়নি। ডারউইনের ব্যতিক্রম ওয়ালেস খুব সহজে আদিবাসীদের সাথে মিশে যেতে পেরেছিলেন, তিনি বরং ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের সঙ্গ এড়িয়ে চলতেন। দুজনেই বৈজ্ঞানিক সমাজের নজর কেড়েছিলেন তাদের সংগ্রহ করা নমুনা ইংল্যাণ্ডে পাঠিয়ে, নিজেদের খ্যাতিকে সংহত করেছিলেন তাদের অভিযানের ভ্রমণ কাহিনী লিখে।

প্রজাতিরা বিবর্তিত হচ্ছে এমন একটি ধারণা সম্বলিত ট্রান্সমিউটেশন হাইপোথিসিস তখন ইউরোপে বিতর্কের ঝড় তুলেছিল, বৈপ্লবিক এই ধারণাটি উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে খুব কম বিজ্ঞানীই গ্রহন করতে পেরেছিলেন। কারণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল রাজনীতি, ধর্ম ও বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক ধারণাগুলোকে আলিঙ্গন করা। সহজাতভাবে ওয়ালেস সবকিছু বিবর্তিত হয় এই ধারণাটিকে গ্রহন করে নিয়েছিলেন, তিনি তার নমুন সংগ্রহ করার এলাকার পরিধি বাড়িয়েছিলেন আংশিকভাবে সেই হাইপোথিসিসটি পরীক্ষা করার জন্য, বিবর্তনীয় ভৌগলিক বিস্তারে একই রকম বা কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত প্রজাতিরা পাশাপাশি এলাকায় বসবাস করবে, তিনি ভেবেছিলেন বিবর্তনের স্বপক্ষে সেটি বেশ শক্তিশালী প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।

চিন্তায় তার চেয়ে অনেক বেশী রক্ষণশীল ডারউইন ঘটনাচক্রে প্রজাতিদের ঠিক সেকরমই একটি বিন্যাস লক্ষ করেছিলেন ১৮৩৫ সালে গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি উপসংহারে পৌছান এই সব প্রজাতিগুলো বিবর্তিত হয়েছে কোনো একক পূর্বসূরি প্রজাতি থেকে। একবার যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এমন কিছু ঘটছে, তিনি ওয়ালেসের চেয়ে বেশী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন এর মূল প্রক্রিয়াটিকে বোঝার জন্য এবং তিনি দুই দশক ধরে নানা ভাবে তার তত্ত্বটিকে পরীক্ষা করে দেখার প্রচেষ্টা করেন। প্রজাতিদের ভৌগলিক বিস্তার নিয়ে দুজনের একই রকম আগ্রহ থেকে ওয়ালেসের সাথে ডারউইনের পত্র যোগাযোগ শুরু হয় ১৮৫৫ সালে, কিন্তু বিবর্তনকে চালিত করার শক্তিটি কি জানার জন্য তাদের তীব্র আগ্রহের কথা শুরুর দিকে তারা একে অপরকে বলেননি। আর তারা দুজনেই তাদের উত্তর খুজে পান ম্যালথাসের রচনায়। ডারউইনের ভাবনায় সেটি এসেছিল ডাউন হাউসে স্বাচ্ছন্দময় বৈঠকখানায় আর ওয়ালেসকে ধারণাটি স্পর্শ করেছিল, বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার হালমাহেরা দ্বীপের দোদিঙ্গা নামের একটি গ্রামে আদিবাসীদের কুটিরে শুয়ে ম্যালেরিয়ার তীব্র জ্বরে ভোগার সময়। ম্যালথাসে পপুলেশন লিমিটের ধারণাটিকে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের উপর প্রয়োগ করে তারা দুজনেই স্বতন্ত্রভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে এই প্রক্রিয়াটি পূর্ববর্তী কোনো প্রজাতি থেকে নতুন প্রজাতির জন্ম দিতে পারে উপকারী আর সহায়ক প্রকরণসহ সদস্যদের বাঁচার ও প্রজনন করার সুযোগ দিয়ে।

কঠোর শৈশব

১৮২৩ সালে ৮ জানুয়ারী ওয়ালেস জন্মগ্রহন করেছিলেন মনমুথশায়ারের উস্কের কাছে কেনসিংটন কটেজে (বতর্মানে এটি ওয়েলস এর অংশ) । এর কয়েক বছর আগেই বাবা থমাস ও মা ম্যারি আন ওয়ালেস ক্রমশ দৈন্যতায় আক্রান্ত তাদের মধ্যবিত্ত পরিবারটি নিয়ে লন্ডন থেকে কেনসিংটন কটেজে এসে বসতি গড়েন খরচ কমানোর আশায়। তাদের নয়টি সন্তানের মধ্যে ওয়ালেস ছিলেন অষ্টম। পরিবারটি আবার হার্টফোর্ডে এসে বসতি গড়ে যখন ওয়ালেসের বয়স পাঁচ, এখানকার হেল’স গ্রামার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৩৫ সালে পরিবারটি তাদের শেষ সম্পদ হারিয়ে ফেলে এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে, পরিণতিতে ১৮৩৭ সালে স্কুল ছাড়তে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। ১৪ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে তিনি লন্ডনে আসেন তার ভাই জনের সাথে থাকার জন্য, জন তখন কাঠ মিস্ত্রীর শিক্ষানবীশ হিসাবে কাজ করছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি বেশী দিন থাকতে পারেননি, লন্ডন ছেড়ে তিনি তার সবচেয়ে বড় ভাই উইলিয়ামের কাছে আসেন বেডফোর্ডশায়ারে।

উইলিয়াম ভূমি জরিপের কাজ করতেন। পরের সাড়ে ছয় বছর ওয়ালেস ভূমি জরিপের কাজের জন্য দক্ষিণ ইংল্যাণ্ড আর ওয়েলস-এর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। ১৮৪১ সালের হেমন্তে ওয়েলস-এর নিয়াথে আসার পর প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্বন্ধে তার সত্যিকারের একটি আগ্রহের জন্ম হয়। কারণ ভূমি জরিপের সময় তিনি যে উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো দেখতেন তাদের শনাক্ত করতে চাইতেন। এভাবেই তিনি প্রথম উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৩ সাল নাগাদ ভূমি জরিপের কাজের বেশ মন্দা থাকায় সেই চাকরীও তাকে ছাড়তে হয়। পরে লিস্টারের একটি স্কুলে তিনি অংক, জরিপের শিক্ষক হিসাবে চাকরী পান । লিস্টারে খুব ভালো একটি লাইব্রেরী ছিল, সেখানেই প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানা বইগুলো পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এই লাইব্রেরীতে প্রকৃতি বিজ্ঞানী হেনরী ওয়াল্টার বেটস এর সাথেও তার দেখা হয়েছিল ( পরে তার সহযোগী বন্ধু ছিলেন তিনি আজীবন), যিনি প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করার ব্যপারে ওয়ালেসের উৎসাহের আগুনটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ওয়ালেস বিস্মিত হয়েছিলেন শহরের দশ কিলোমিটারের মধ্যে এক হাজারেরও বেশী বিটল প্রজাতি দেখে।

(ছবি: হেনরী ওয়াল্টার বেট (১৮২৫-১৮৯২) ইংরেজ প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও অভিযাত্রী তিনি প্রথম প্রাণীদের মধ্যে mimicry ( বা অনুকরণ, যেখানে একটি প্রজাতির প্রাণী অন্য একটি প্রজাতির প্রাণীর মত রুপ নেয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের সুবিধা নেবার জন্য) । তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন ওয়ালেস এর সাথে আমাজন অভিযানের জন্য। ১৮৫২ সালে ফেরার পথে ওয়ালেস সব নমুনা হারালেও বেটস এর ভাগ্য ভালো ছিল। তিনি ফিরেছিলেন ১১ বছর পর, প্রায় পনেরো হাজার প্রজাতি তিনি লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৮০০০ ছিল বিজ্ঞানের জন্য নতুন। The Naturalist on the River Amazons নামের একটি জনপ্রিয় বইও লিখেছিলেন।)

১৮৪৫ এ তিনি প্রথম রবার্ট চেম্বার্স এর Vestiges of the Natural History of Creation বইটি পড়েন, তিনি বিবর্তনের ধারণায় বিশ্বাস করতে শুরু করেন ( সেই সময় ধারণাটি পরিচিত ছিল ট্রান্সমিউটেশন নামে; A Voyage Up the River Amazon নামের একটি বই একসাথে ব্রাজিল অভিযানে যাওয়ার জন্যে বন্ধু বেটসকে প্রস্তাব করতে তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল । উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও বিক্রয়ের জন্য তারা নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করবেন। ওয়ালেসের জন্য আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিবর্তনের পক্ষে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করবেন, চেষ্টা করবেন বুঝতে প্রক্রিয়াটি কি। ১৮৪৮ সালে ২৫ বছরের ওয়ালেস আর ২৩ বছরের বেটস লিভারপুল থেকে পারা (এখন বেলেম) অভিমূখে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে একসাথে কাজ শুরু করলে, মতানৈক্যের কারণে দুজন দুদিকে যাত্রা শুরু করেন। ওয়ালেস মূলত ছিলেন মধ্য আমাজন ও রিও নেগরো এলাকায়, যেখানে তিনি তার ভূমি জরিপের কৌশল ব্যবহার করে একটি ম্যাপও তৈরি করেন। কয়েক বছর পর এই ম্যাপটি প্রকাশ করেছিল Royal Geographical Society, বহু বছর ধরে এই এলাকার এটাই ছিল সবচেয়ে নিঁখুত ম্যাপ।

ছবি: ওয়ালেসের আঁকা রিও নেগরো নদীর ম্যাপ, ১৮৫৩ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছিল)

গভীর আমাজনে

১৮৪৭ সালে ওয়ালেস তার বন্ধু এবং নমুনা সংগ্রাহক হেনরী ওয়াল্টার বেটসকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন আমাজনে অভিযানের জন্য। তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতি বিজ্ঞানের তার একটি নিজস্ব সংগ্রহশালা গড়ে তোলা। কিন্তু সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক আলোচনার বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধেও ওয়ালেসের ভালো ধারণা ছিল। ডারউইন যেমন তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন কোনো মহান ধারণার বা তত্ত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করার কোনো প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য ছাড়াই, ওয়ালেস কিন্তু তা করেননি, তিনি বন্ধু বেটসকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই অভিযানের সময় তারা ‘প্রজাতির উৎপত্তির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন’, সমস্যাটি ১৮৪৭ সালের সমসাময়িক সময়ে একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছিল: প্রজাতিরা কি অপরিবর্তনশীল এবং বিশেষভাবে ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট, নাকি পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট ?

(ছবি: ১৮৪৮ সালে তরুণ ওয়ালেস , ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে যাত্রার করার সমসাময়িক সময়ে )

ওয়ালেস এবং বেটস দুজনেই ছিলেন স্বশিক্ষিত সৌখিন প্রকৃতিবিজ্ঞানী, যাদের ডারউইনের মত না ছিল কোনো পারিবারিক অর্থসম্পদ, না ‍ছিল বিজ্ঞানীদের কোনো সমিতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো যোগাযোগ কিংবা ব্রিটিশ নৌ-বাহিনীর জাহাজে সংরক্ষিত কোনো জায়গা। আমাজনের দিকে সমুদ্রযাত্রার জন্য তাদের জায়গা নিতে হয় বানিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে আর তাদের যাতায়াতের খরচ মেটান দুষ্প্রাপ্য বা চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নমুনা বিক্রির জন্য ইংল্যান্ডে পাঠানোর মাধ্যমে।

(ছবি: ১৮৪৭ সালে বেটসকে লেখা তরুণ ওয়ালেসের এর চিঠি, এখানে বিবর্তন সম্বন্ধে তার আগ্রহটির আভাস আমরা পাই। প্রজাতির উৎপত্তি জানার জন্য তার আগ্রহের প্রকাশ। তখন তার বয়স মাত্র ২৪)

১৮৪৮ এর মে মাসে ব্রাজিলের উত্তরপূর্ব ‍উপকুলে পারা’তে এসে পৌছান তারা । কিছুদিন এক সাথে (দেড় বছর) বেটস এর সাথে কাজ করার পর আলাদা আলাদা পথে যাত্রা শুরু করেন দুইজন, ওয়ালেস এগিয়ে যান আমাজনের মূল শাখা ধরে, পরে রিও নেগ্রো এবং এর সবচেয়ে বড় শাখা রিও দোস উয়াউপেস ধরে। চার বছরের কষ্টকর আর বিপদসঙ্কুল যাত্রা আর সংগ্রহ শেষে, ১৮৫২ সাল নাগাদ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ২০০০ মাইল ভিতরে তিনি পৌছে যান, এতটা দূরে কোনো ‍ইউরোপীয় এর আগে আসেননি। এই চার বছরের শেষ আড়াই বছর ওয়ালেস কাজ করেছেন একা একা। সাড়ে তিন মাস ইয়োলো ফিভারে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে তখন তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাবারের অভাব, ক্রান্তীয় অঞ্চলের অসুখ তাকে এমনটাই কাবু করে ফেলে যে, তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন, ফিরে না গেলে হয়তো জঙ্গলেই তার মৃত্যু হতে পারে। নদীপথের বিভিন্ন স্থানে তার সংরক্ষিত নমুনা ছাড়াও ওয়ালেসের সাথে ছিল অনেক ধরনের বিচিত্র জীবন্ত প্রাণীর একটি বড় ধরনের সংগ্রহ – বানর, ম্যাকাও, প্যারট এবং একটি টোকান, তার আশা ছিল এসব তিনি লন্ডন চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে পারবেন। এদের দেখাশোনা করতে গিয়ে তার অবশিষ্ট সামান্য শক্তিও প্রায় শেষ প্রান্তে পৌছে যায়।

 ব্রাজিলে তার সাথে ছোট ভাই হার্বার্টও এসেছিল, রিও নেগরো পর্যন্ত দুই ভাই একসাথেই ছিলেন। কিন্তু এর পরে ওয়ালেস একাই মহাদেশের আরো ভেতরে ঢুকে পড়েন। ১৮৫২ সালে যখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনও তিনি জানেন না তার ভাই ইংল্যান্ডগামী জাহাজে ওঠার আগেই মারা গেছেন ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হয়ে। ওয়ালেস পারায় ফিরতে নদীর মুখের দিকে যাত্রা শুরু করেন। তিনি লন্ডন অভিমূখী হেলেন নামের একটি জাহাজ খুঁজে পান । এই জাহাজে ৩৪ টা জীবন্ত প্রাণী, আর অনেকগুলো বাক্স ভরা নমুনা আর মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ আর গবেষণার কাগজপত্র নিয়ে তিনি দেশে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করেন।

(ছবি: আমাজনে তার চার বছর থাকাকালীন ওয়ালেস জোগাড় করেন টোকান সহ বিপুল পরিমান জীবন্ত প্রাণী। দুঃখজনকভাবে ইংল্যান্ডে ফেরার পথে তাকে হারাতে হয় সবকিছু )

সমুদ্রে বিপর্যয়

যাত্রা শুরুর প্রায় ৩ সপ্তাহ পর বারমুডার প্রায় ৭০০ মাইল পূর্বে, একদিন সকালে খাবার পরপরই, জাহাজের ক্যাপ্টেন ওয়ালেসের কেবিনে এসে তাকে জানান, ‘আমি দুঃখিত, আমার কিছু করার উপায় নেই, জাহাজে আগুন ধরে গেছে, দেখুন আপনি কি করতে পারেন’, ক্যাপ্টেনের সাথে ওয়ালেস মালপত্র রাখার জায়গায় এসে দেখতে পান আগুন ছড়িয়ে পড়েছে অনেকখানি, কুণ্ডলী পাকিয়ে বের হচ্ছে ধোয়া। জাহাজের নাবিকরা ব্যর্থ হয় সেই প্রচণ্ড আগুন নেভাতে, অবশেষে লাইফবোট পানিতে নামানোর নির্দেশ দেন ক্যাপ্টেন, ওয়ালেস তার গরম আর ধোয়া ভরা কেবিনে ঢুকে উদ্ধার করেন একটা ছোট টিনের বাক্স, যার ভেতরে ছিল কিছু কাগজপত্র, কিছু আঁকা ছবি আর একটি ডায়েরী । লাইফবোটে দড়ি ধরে নামার সময় পিছল খেয়ে দড়িতে কেটে যায় তার হাত, সমুদ্রের লোনা পানির ঝাপটা সেই ক্ষতের যন্ত্রণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। লাইফবোটে ওঠার পর টের পান, কোথাও কোনো ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকছে লাইফবোটে। ওয়ালেস চোখের সামনে হেলেনকে পুড়তে আর সেই সাথে তার এত কষ্ট করে সংগ্রহ করা প্রাণী আর নমুনাগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেন। (সৌভাগ্যক্রমে ওয়ালেসের এজেন্ট তার সব নমুনার জন্য বীমা করে রেখেছিলেন, কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে বীমার পরিমান ছিল খুব কম)।

(ছবি: ১৮৮৬ তার লেখা বইয়ের একটি অলঙ্করণ, হেলেন জাহাজটিতে আগুন জ্বলছে)

মধ্য আটলান্টিকের প্রায় ছিদ্র হওয়া লাইফবোটে শুয়ে খোলা আকাশের নীচে একটার পর একটা অনিশ্চিৎ দিন অতিক্রান্ত হয় ওয়ালেসের।। তৃষ্ণার্ত, সমুদ্রের পানিতে ভেজা, প্রায় সারাক্ষণই লাইফবোটে জমে উঠতে থাকা পানি ক্রমাগত সেঁচায় ভীষণভাবে ক্লান্ত আর তীব্র ক্ষুধার্ত ওয়ালেসের গায়ে সূর্যের প্রখর আলোয় ফোসকা পড়ে যায় । অবশেষে ১০ দিনের মাথায় তাদের উদ্ধার করে জর্ডেসন নামের আরেকটি জাহাজ। উদ্ধারকারী এ‌ই জাহাজে বসে ওয়ালেস, ব্রাজিলে তার এক বন্ধুকে এই দুর্ঘটনা আর ক্ষতির পরিমান ব্যাখ্যা করে একাট চিঠি লেখা শুরু করেন:

‘এখন যখন বিপদ কেটে গেছে, আমিও বুঝতে পেরেছি আমার ক্ষতির পরিমানটা। কতগুলো কষ্টের দিন আর সপ্তাহ আমি পার করেছি শুধু একটাই সখের আশা নিয়ে যে, ‍এই সব জঙ্গল থেকে নতুন ধরনের আর সুন্দর সব প্রাণীদের দেশে নিয়ে যাবো; অনেক স্মৃতি বিজড়িত এরা অনেক আপন হত আমার,যা প্রমাণ করতো, আমি আমার সুযোগের সদ্বব্যবহার করেছিলাম, যারা ভবিষ্যতে আমাকে একটা পেশা দিতে পারতো, স্বাচ্ছন্দ দিতে পারতো । এখন সব শেষ, আমার কাছে একটা নমুনাও বেঁচে নেই যা প্রমাণ করবে ঐসব অচেনা দেশে আমি একদিন ঘুরে বেড়িয়েছি….’;

আসলে ওয়ালেসের বিপদ কিন্তু তখনও কাটেনি। দুটো বড় আকারের ঝড়ের মুখে পড়ে জর্ডেসন। ওয়ালেস তার বন্ধুকে লিখেছিলেন, দেশে ফেরার পথে তিনি ‘৫০ বার’ শপথ কেটেছেন ‘ যদি একবার ইংল্যান্ডে পৌছাতে পারি, কখনোই আর সমুদ্রপথ পা বাড়াবো না’, তিনি যদি তার সেই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতেন, সেখানেই, তার কাহিনী শেষ হয়ে যেত আর খুব অল্পকিছু মানুষই আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে চিনতেন। কিন্তু তার বন্ধুকে তিনি যেভাবে লিখেছিলেন ‘অনেক কঠিন প্রতিজ্ঞাও দ্রুত ম্লান হয়ে যায়’, ওয়ালেসও সিদ্ধান্ত নেন যে, অপূরনীয় ক্ষতি আর প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা সত্ত্বেও আবার সমুদ্রযাত্রায় বের হবেন।

মালয় দ্বীপপুঞ্জে

আমাজন থেকে তার পাঠানো নমুনা বিক্রি করার এজেন্ট ছিলেন স্যামুয়েল স্টিভেন্স। প্রায় সব হারানো ওয়ালেসকে সাহায্য করেছিলেন স্যামুয়েল স্টিভেন্স। স্টিভেন্সই বুদ্ধি করে ২০০ পাউন্ড দিয়ে ওয়ালেসে সংগ্রহকে বীমা করে রেখেছিলেন। তার নমুনা বিক্রী করে ওয়ালেস যতটুকু আশা করেছিলেন, সে তুলনায় টাকাটা সামান্য, কিন্তু টাকাটা ছিল বলে ওয়ালেসকে অন্তত কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। ওয়ালেসকে সেই সময় যারা দেখেছেন তারা  অন্তত বুঝেছিলেন আমাজন থেকে ফেরার সময়ের ক্ষতিটা তার পরবর্তী অভিযানে বাধা না হয়ে বরং আরো নতুন অভিযানে যেতে তাকে আরো বেশী দৃঢ়সংকল্প করে তুলেছে । নতুন কোনো জায়গায় অভিযান আর নমুনা সংগ্রহের তীব্র ইচ্ছা অপূর্ণ  রয়ে গিয়েছিল ওয়ালেসের, এছাড়াও প্রজাতির উৎপত্তির কারণ অনুসন্ধানের প্রতি তার বাড়তি উৎসাহ তো ছিলই। ১৮৫২ সাল, সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক জগতের জানা মতে তখনও এই রহস্যের সমাধান হয়নি। যদিও ডারউইন কিন্তু তার উপসংহারে পৌছে গিয়েছিলেন অনেক বছর আগেই, কিন্তু তার সেই তত্ত্বটির কথা শুধুমাত্র খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কারোরই জানা ছিল না, আর ‌এই ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে ওয়ালেস অবশ্যই ছিলেন না।

ওয়ালেস তার পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে ভাবা শুরু করলেন দেশে ফেরার পর পরই। তার কাছে বড় প্রশ্নটা ছিল, এবার তিনি কোথায় যাবেন? কারণ তাকে তার অভিযানের বাণিজ্যিক এবং বৈজ্ঞানিক, দুটো দিকই ভাবতে হবে। তিনি শ্রমজীবি শ্রেণীর মানুষ, তার কাছে  জীবিকা নির্বাহের ব্যাপারটা জরুরী। তাকে এমন সব প্রাণী বা নমুনা সংগ্রহ করতে হবে যা বিক্রি করলে মোটা অঙ্কের অর্থ লাভ হবে। সেকারণে আবার আমাজনে ফিরে যাবার চিন্তাটি তিনি বাদ দিলেন, যদিও সেখানে তখনও তার ব্ন্ধু হেনরী ওয়াল্টার বেটস ছিলেন। নতুন কোনো দিকে তাকে যেতে হবে।

 মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞ নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন তিনি, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া আর অষ্ট্রেলিয়ার মাঝখানে অসংখ্য দ্বীপের সমাবেশ হল এই মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞ, শুধু মাত্র জাভা ছাড়া, অন্য সব দ্বীপগুলোর উদ্ভিদ ও প্রাণী ছিল অজানা। সেখানকার ওলন্দাজদের বসতি থেকে আসা যথেষ্ট পরিমান তথ্য, ওয়ালেসকে মনস্থির করতে সাহায্য করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সেখানে গেলে যেমন ভালো নমুনা সংগ্রহ করার সম্ভাবনা আছে, তেমনই ভ্রমণকারীদের জন্যে পর্যাপ্ত সুবিধাও আছে । মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞটির পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃতি ৪০০০ মাইল আর উত্তর দক্ষিনে প্রায় ১৩০০ মাইল, আকারে প্রায় পুরো দক্ষিণ অ্যামেরিকা মহাদেশের মত বড় । ক্রান্তীয় বনভূমি দিয়ে আবৃত এই দ্বীপগুলোকে দেখতে আপাতদৃষ্টিতে একই রকম লাগলেও, জীববৈচিত্র্যে তারা পরন্পর থেকে ভিন্ন । এই পার্থক্যগুলোই আবিষ্কার আর ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে ওয়ালেস আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব মানচিত্রে তার ‍নাম লেখেন।

আগের অভিযানের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলো দমিয়ে রাখতে পারেনি ওয়ালেসকে। ১৮৫৪ সালে মালয় দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে তিনি ব্রিটেন ত্যাগ করেন ( বর্তমানে যা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমোর)। এক সহযোগী চার্লস অ্যালেনকে নিয়ে তিনি প্রথম সিঙ্গাপুরে এসে পৌছান।

Image result for wallace line

(ছবিঃ ওয়ালেস লাইন (Wallace’s Line) হল ইন্দোনেশিয়ার মাঝ বরাবর একটি অদৃশ্য সীমারেখা, যা সম্পুর্ণ আলাদা দুটি প্রানীজগতকে পৃথক করেছে।)

আগের অভিযানের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলো দমিয়ে রাখতে পারেনি ওয়ালেসকে, ১৮৫৪ সাল মালয় দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে তিনি ব্রিটেন ত্যাগ করেন ( বর্তমানে যা সিঙ্গাপুর,মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমোর) । ব্রাজিলের তুলনায় দূর প্রাচ্যের এই দ্বীপপুন্জ্ঞে যাওয়ার পথ অনেক দীর্ঘ। এক সহযোগী চার্লস অ্যালেনকে নিয়ে তিনি ১৮৫৪ সালে এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুর এসে পৌছান ওয়ালেস, সেখান থেকে শুরু করেন তার অভিযান। এখানে তাকে মুখোমুখি হতে হয় আমাজন থেকে সর্ম্পুন ভিন্ন এক প্রকৃতির আর বিপদের।

সিংগাপুর পোকামাকড় সংগ্রহের জন্য খুবই ভালো একটা জায়গা। কিন্তু কিছু সমস্যাও ছিল,যেমন: ‘যেখানে সেখানে বাঘের জন্য গর্ত, ডাল পালা দিয়ে সেগুলো এমনভাবে ঢাকা থাকে, বেশ কয়েকবার  আমি তার মধ্যে পড়তে গিয়ে বেঁচে গেছি, প্রায় ১৫ বা ২০ ফুট গর্ত,  এর মধ্যে একবার পড়লে কোনো সাহায্য ছাড়া একা একা ওঠা অসম্ভব একটা ব্যাপার’। সিঙ্গাপুরে তখন বাঘ ঘুরে বেড়াত; গড়ে প্রতিদিন একজন করে বাসিন্দার মৃত্যুর কারণ ছিল বাঘের আক্রমণ। মাঝে মাঝে ওয়ালেসও তাদের গর্জন শুনতে পেতেন, তবে ব্রিটিশদের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যে সমস্যাটিকে হালকা করে তিনি মন্তব্য করেন .. ’পোকামাকড় খোঁজার কাজটা একটু চিন্তার বিষয় বলতে হবে..যখন এরকম একটা হিংস্র প্রাণী আসে পাশেই কোথাও লুকিয়ে থাকে… ’।

এছাড়া স্থানীয়দের হিংস্রতাও সম্বন্ধে নানা কথা প্রচলিত ছিল। ওয়ালেস বাঁশের ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমাতেন তা দেখে তার এক বন্ধু তাকে শোয়া যায় এমন একটা সোফা ধার দেন, কারণ এভাবে মেঝেতে শোয়া ছিল বিপজ্জনক, ‘ যেহেতু চারপাশে খারাপ মানুষের দল, যারা রাতের বেলা বর্শার ফলা দিয়ে মেঝের নীচ থেকে আমাকে এফোড় ওফোড় করে দিতে পারে, সেজন্য আমাকে দয়া করে একটা সোফা ধার দেয়া হয়েছে, যার উপর আমি শুতে পারি, অবশ্য সেটা আমি ব্যবহার করিনি, কারণ এ দেশে খুবই গরম’।

http://wallacefund.info/sites/wallacefund.info/files/Raby20.jpg

(ছবি: ১৮৬২ সালে সিংঙ্গাপুরে তোলা একটি ছবিতে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (ডানে))

ওয়ালেস এই এলাকায় তার জীবনের পরবর্তী আট বছর কাটিয়েছিলেন, ষাট থেকে সত্তরটি অভিযানের মাধ্যমে তিনি ১৪০০০ মাইল অতিক্রম করেছিলেন। তার সংগ্রহের পরিমানও ছিল বিস্ময়কর – প্রায় ১১০,০০০ কীটপতঙ্গ, ৭৫০০ ঝিনুক, ৮০৫০ পাখির চামড়া, ৪১০ স্তন্যপায়ী ও সরিসৃপ প্রজাতি, এদের মধ্যে ৫০০০ টি ছিল সেই সময়ে বিজ্ঞানের জন্য নতুন। বাকান দ্বীপে তার সবচেয়ে পরিচিত আবিষ্কার ছিল Golden Birdwing Butterfly (Ornithoptera croesus) আর  Standard-Wing Bird of Paradise (Semioptera wallacei), এবং বোর্ণিও থেকে Birdwing Butterfly (Trogonoptera brookiana)। তার সেই অভিযানের বিবরণ The Malay Archipelago অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল পাঠক সমাজে, উনবিংশ শতাব্দীর সেরা বৈজ্ঞানিক ভ্রমণকাহিনীর একটি ছিল সেটি।

অঙ্কুরিত ধারণাগুলো

এধরনের সমস্যায় আদৌ বিচলিত না হয়ে ওয়ালেস প্রতিদিন রুটিন মাফিক তার কাজ করে যেতেন। ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে ঠাণ্ডা পানিতে গোছল আর কফি দিয়ে দিন শুরু হতো তার। প্রথমে আগের দিনে যা কিছু সংগ্রহ করেছিলেন তা ঠিকমত সাজাতেন, তারপর তার সংগ্রহ করার সব জিনিসপত্র নিয়ে আবার বের হয়ে যেতেন জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। তার হাতে থাকতো পোকা মাকড় ধরার জাল, কাধে ঝোলানো বড় বাক্স, মৌমাছি, ভ্রমর ধরার জন্য সাড়াশি, ছোট আর বড় পোকামাকড়ের নমুনা রাখার জন্য ঘাড়ে প্যাচানো সুতোয় বাধা কর্কের ছিপি লাগানো দুই মাপের দুটো কাচের বোতল, আর কোনো কোনোদিন হাতে থাকত রাইফেল। তার সংগ্রহ করা নমুনাগুলো সংরক্ষণ করার জন্য তিনি স্থানীয়ভাবে তৈরী আররাক নামের একধরনের অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন ধরনের ফল,শস্যদানা, আখ এবং নারিকেলের দুধকে ফার্মেন্টেশনের মাধ্যমে এই পানীয় তৈরী হতো। যেহেতু পানীয়টি বেশ জনপ্রিয় ছিল, ওয়ালেসের তাই তার নমুনা সংরক্ষণের জন্য এই পানীয় সরবরাহে কখনও টান পড়েনি। স্থানীয় আদিবাসীদের বিশেষ পছন্দ হবার কারণে প্রায়ই তারা ওয়ালেসের ক্যাম্প থেকে অ্যাররাক চুরি করে নিয়ে যেত।  এসব ঠেকাতে এর মধ্যে ওয়ালেস প্রায় মরা সাপ বা টিকটিকি ডুবিয়ে রাখতেন। কিন্তু আদিবাসীদের তা আদৌ বিচলিত করতো না। এছাড়া স্থানীয় আদিবাসীরা এমনিতেই বুঝতে পারতো না এই মানুষটা কেন এত ভালো পানীয় নষ্ট করছে এসব জীব জন্তু, গাছ ইত্যাদি যত্ন করে সংরক্ষণ করে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে ওয়ালেস বলতেন, আমাদের দেশে অনেক মানুষ এগুলো দেখবে সেজন্য এগুলো যত্ন করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় ওয়ানুমবাই আদিবাসীরা যারা ইংল্যান্ডকে উং লাং বলেতেন, তারা  এ কথায় আরো আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করতেন,  নিশ্চয়ই উং লাং এ এর চেয়ে ভালো দেখার মত আরো অনেক কিছু আছে।

ওয়ালেস জানতেন এদেরও নিজস্ব কিছু সংগ্রহের প্রথা আছে, যেমন, ডায়াক আদিবাসীরা তাদের শত্রুদের মাথা সংগ্রহ করতেন। স্থানীয় অধিবাসীদের হিংস্রতার কুখ্যাতি থাকা সত্ত্বে দ্বীপপুঞ্জে কিছু কিছু অংশে আদিবাসীরা জঙ্গল সম্বন্ধে তাদের অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান ওয়ালেসের সাথে ভাগ করে নিয়েছিল এবং তিনি যা চাইছেন তা খুঁজতে তাকে সাহায্য করেছিল । দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দর আর মুল্যবান প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য্য তিনি সংগ্রহ করেছিলেন – ওরাং উটান, বানর, অসাধারণ সুন্দর বার্ডস অব প্যারাডাইস, বিশাল আকারের উজ্জ্বল রঙ্গের প্রজাপতি। ওয়ালেস এসব দেখে লিখেছিলেন: ‘প্রকৃতি মনে হয় খুবই সযত্নে সাবধানে ঠিক করেছে ,সহজলভ্যতার জন্য যেন তার সবচেয়ে সেরা ঐশ্বর্য্যরাশির মূল্য যেন কমে না যায়, প্রথমেই আমরা দেখি, উন্মুক্ত পোতাশ্রয়বিহীন, অবান্ধব সমুদ্র উপকুল,যা প্রশান্ত মহাসাগরের প্রচণ্ড ঢেউয়ের সম্মুখে উম্মোচিত; ‍তারপরেই জঙ্গলে ঢাকা পার্বত্য দেশ, জলাভুমি, খাড়া পর্বতমালার ধারালো কিনার, প্রায় অসম্ভব অনতিক্রান্ত এক প্রতিবন্ধকতা, এবং সবশেষে বন্য আর হিংস্র একটা জাতি.. ’,

যত বছরই তিনি জঙ্গলে কাটান না কেন, নতুন কিছু সংগ্রহের উত্তেজনা তার এতটুকু কমেনি।

তার সংগ্রহ করা বিভিন্ন প্রজাতির নমুনাগুলোর অসাধারণ বৈচিত্র্য, প্রজাতির প্রত্যেকটি সদস্যর মধ্যকার ভিন্নতা এবং কোথায় তাদের তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তার প্রতি ওয়ালেসের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল । এগুলো একজন পেশাদার সংগ্রাহকের ব্যবহারিক চিন্তার বিষয় হতে পারে, কিন্তু তার বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছিল।

(ছবি: বিভিন্ন দ্বীপে বার্ডউইং প্রজাতির প্রজাপতিদের বিভিন্নতা পর্যবেক্ষণ ওয়ালেসকে বুঝতে সাহায্য করেছিল কেমন করে প্রজাতির পরিবর্তন হয়। ছবিটি কেয়ার্ন বার্ডউইং এর, অষ্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় স্থানীয় প্রজাপতি)

যেমন, সুন্দর বার্ডউইঙ্গ প্রজাপতি, যাদের বড় ডানা আর উজ্জ্বল রং এর জন্য সংগ্রাহকদের মধ্যে বিশেষ চাহিদা ছিল, খুঁজতে গিয়ে ওয়ালেস লক্ষ করেছিলেন যে, বিভিন্ন ধরনের বার্ডউইঙ্গের বসবাস দ্বীপপুঞ্জের সুনির্দিষ্ট দ্বীপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের পাখিরা ডারউইনকে যে ইঙ্গিত দিয়েছিল, এই প্রজাপতিগুলো তাকে ঠিক সেই একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিল, যে প্রজাতিও পরিবর্তিত হয়। ওয়ালেস বুঝতে পেরেছিলেন বিশেষ সৃষ্টিবাদ এই বৈচিত্র্যের ব্যাখ্যা দিতে পারেনা।

যখন ডারউইন নীরব ছিলেন তার বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে, ওয়ালেস তখন ভাবছিলেন সশব্দে, তিনি তার চিন্তা লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছিলেন নোটবুকে,  ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পাঠানো একের পর এক তার লেখায়। এদের মধ্যে কোনোটা সংক্ষিপ্ত মাঠপর্যায়ের নোট; কোনোটাতে সুস্পষ্ট প্রকাশ পায় তার সুবিশাল ধারণাগুলো। কিন্তু ডারউইনের ক্ষেত্রে নীরব থাকার যে সব কারণ ছিল, ওয়ালেসের তা ছিল না । তার হারাবার কিছুই ছিল না বরং তাকে সুনাম অর্জন করতে হবে, বিজ্ঞানীদের মধ্যে তার জায়গা করে নিতে হবে, এটাই ছিল তার উদ্দেশ্য।

প্রকৃতির একটি নিয়ম

১৮৫৫ সালে বোর্নিওর সারাওয়াকে বর্ষার মওসুমে অপেক্ষা করার সময়, ওয়ালেস ভূতত্ত্ব আর প্রাকৃতিক ইতিহাসের নানা সূত্র সংযোগ করে একটা নতুন সূত্র বা নিয়মের প্রস্তাব করেন: ‘Every species has come into existence coincident both in space and time with pre-existing closely allied species‘ অর্থাৎ প্রত্যেকটি প্রজাতির উৎপত্তি হয় সমসাময়িক স্থান ও সময়ে ইতিপূর্বেই বিদ্যমান নিকট বা প্রায় সমগোত্রীয় প্রজাতিদের থেকে।

ওয়ালেস ধারণা করেন, প্রজাতিরা পরস্পারিক সম্পর্কযুক্ত  a branching tree বা গাছের শাখাপ্রশাখার মত; তিনি প্রস্তাব করেছিলেন নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয় পুরাতন প্রজাতি থেকে, যেমন করে গাছে নতুন শাখার জন্ম হয় পুরাতন শাখা থেকে। এই প্রস্তাবনাটি বিপদজ্জনক না হলেও নিঃসন্দেহে সাহসী ছিল, এটার সরাসরি লক্ষ্য ছিল  প্রজাতির বিশেষ সৃষ্টি সম্বন্ধে প্রচলিত মতবাদ। ওয়ালেসের এই প্রস্তাব সরাসরি সেই  ‘‍বিশেষ সৃষ্টির’ প্রচলিত মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, যার মূল ধারণাই ছিল প্রত্যেকটি প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে বিশেষভাবে, একই সাথে, যে ভৌগলিক অবস্থানে তাদের বসবাস তার উপযোগী করে। ‍ ‍উপরন্তু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওয়ালেস তার প্রাকৃতিক নিয়মের সপক্ষে সেই একই যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যা ডারউইন দুই দশক ধরে তীব্র মানসিক যন্ত্রণাসহ একা একা নিজের মধ্যে রেখেছিলেন কিন্তু কোথাও প্রকাশ করেননি।

ওয়ালেস ক্রমশ পরিবর্তনশীল পৃথিবীর ভূতত্ত্ব এবং জীবাশ্ম রেকর্ডে প্রাপ্ত জীবনের সুস্পষ্ট পরিবর্তন সংক্রান্ত  নানা ধারণার সন্নিবেশ করেছিলেন তার প্রস্তাবনায়। তিনি দাবী করেছিলেন যা অতীতে হয়েছে তা বর্তমানে কেন হবে না. ‘বর্তমানে পৃথিবীতে জীবনের ভৌগলিক বিস্তার ও বিন্যাস অবশ্যই এর পৃষ্ঠের এবং এর অধিবাসীদের  অতীতের সকল পরিবর্তনেরই ফলাফল’, সংক্ষেপে পৃথিবী এবং জীবন একই সাথে বিবর্তিত হয়েছে। সেই সময়ের সমাজ কেবল পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ধারণার সাথে পরিচিত হতে শিখেছে, প্রাণীদের পরিবর্তন হয়েছে এমন ধারণা মোটেও জনপ্রিয় ছিল না।

ওয়ালেস তার ‘সারাওয়াক সূত্র’ সমর্থনে বিশেষ করে দ্বীপগুলোতে প্রজাতির বিস্তার সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণগুলো ব্যাখ্যা করেন। যেমন, ‘গালাপাগোসে’, তিনি লেখেন, ‘যেখানে অল্পসংখ্যক স্বকীয় উদ্ভিদ আর প্রানী গোষ্ঠীসমুহ বিদ্যমান, কিন্তু বেশীর ভাগই দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখন্ডে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাথে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত, বিষয়টি এযাবৎ কোনো ধরনের,এমনকি কোনো আনুমানিক ব্যাখ্যাও পায়নি।’ ওয়ালেস ডারউইনের পর্যবেক্ষণের প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, যার এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। তিনি এর সাথে আরো যোগ করেন, অন্য নতুন সৃষ্টি হওয়া দ্বীপগুলোর মতো এই দ্বীপগুলোতেও বাতাস আর স্রোতের মাধ্যমে বাহিত হয়ে অবশ্যই প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিল প্রাণী এবং উদ্ভিদ, এবং একটা বিশাল সময়ের ব্যপ্তিতে সেখানে আদি প্রাণী আর উদ্ভিদরা একসময় শেষ হয়ে যায় তার জায়গায় থেকে যায় শুধু  এদের পরিবর্তিত প্রোটোটাইপ, এর মানে হল, দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে গালাপোগোসের মত একই রকম ফিন্চ প্রজাতি না, কিন্তু তাদের সাথে পারন্পরিক মিল এত বেশী যে, দক্ষিণ আমেরিকার ফিন্চ প্রজাতির পাখিরা নিশ্চয়ই গালাপাগোস দ্বীপগুলোতে বসতি স্থাপন করেছিল।

ওয়ালেস যুক্তি দেন যে, প্রজাপতির পরিবার, পাখি আর নানা ধরনের উদ্ভিদ একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকায় সীমাবদ্ধ। আমাজনে থাকাকালীন সময়ে তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির বানর নদীর একপাশেই সীমাবদ্ধ।‘এরকম হওয়ার কথা না’ তিনি লিখেছিলেন ‘যদি না তাদের সৃষ্টি আর বিস্তারের উপর প্রকৃতির কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করে থাকে।’ ‘ বিস্তার’ শব্দটি দিয়ে ওয়ালেস যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হল, একটি প্রজাতির কতটুকু বিস্তার লাভ করতে পারে কোনো এলাকায়, যা ভৌগলিক বিশেষত্ব,  যেমন নদী, পর্বতশ্রেণী ইত্যাদি দ্বারা সীমাবদ্ধ। যখন এই রচনা প্রথম প্রকাশিত হয়, প্রায় কে‌উই তা পড়েনি বা লক্ষই করেনি। ওয়ালেস তার প্রস্তাবিত প্রাকৃতিক সূত্র সম্বন্ধে লন্ডন থেকে কোনো প্রতিক্রিয়াই শুনতে পেলেন না শুধুমাত্র কিছু অসন্তোষ ছাড়া, যেমন, তার উচিৎ নমুনা সংগ্রহে মনোযোগী হওয়া, তত্ত্ব তৈরী করা না। কিন্তু তিনি পুরোনো বন্ধু হেনরী ওয়াল্টার বেটস এর কাছ থেকে ঠিকই একটি চিঠি পান, যদিও আমাজনের গভীরে তিনি ছিলেন তখন, তারপরও জার্নালের একটা কপি তিনি যোগাড় করেছিলেন, তিনি ওয়ালেসকে প্রান খুলে প্রশংসা করেন তার  এই প্রস্তাবের জন্য, যিনি তা মনে করেছিলেন, ‘সত্যের মত, এতই সহজ এবং স্পষ্ট যে যারাই এটা পড়েছে আর বুঝেছে তারা এর সহজবোধ্যতা দেখে আশ্চর্য হবেন’।

১৮৫৫ সালে বোর্নিওর সারাওয়াকে থাকার সময় তিনি তার বিবর্তন সংক্রান্ত তার প্রথম বিখ্যাত লেখাটি লিখেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি আবিষ্কারের আগে। সেটি মূলত সারাওয়াক সূত্র বিষয়ক (Sarawak Law) On the Law Which Has Regulated the Introduction of New Species; পেপারটি চার্লস লাইয়েলকে মুগ্ধ করেছিল, তিনিও বিবর্তন সম্বন্ধে ভাবতে শুরু করেন। ১৮৫৬ সালে এপ্রিল লাইয়েল ডারউইনের বাসায় বেড়াতে এলে ডারউইন প্রথমবারের মত লাইয়েলকে তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ২০ বছর ধরে গোপনে ডারউইন যে তত্ত্বটি নিয়ে কাজ করছিলেন। লণ্ডনে ফেরা কয়েকদিন পরই লাইয়েল ডারউইনকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন দ্রুত যেন তিনি তার তত্ত্বটি প্রকাশ করেন, কারণ কেউ না কেউ হয়তো তাকে সেই দৌড়ে হারিয়ে দিতে পারে ( লাইয়েলের মনে মনে সম্ভবত তখন ওয়ালেসের কথাই ভাবছিলেন।) সুতরাং ১৮৫৬ সালে মে মাসে ডারউইন তার একটি খসড়া রুপরেখা লিখতে শুরু করেন, তিনি অবশ্য সেটি শেষ না করে বিবর্তন সংক্রান্ত একটি বই লেখা শুরু করেছিলেন।

(ছবিঃ মেগাপোড, ছবিটি ১৮৪৮ সালে ইংলিশ পাখিবিশেষজ্ঞ জন গুল্ড এর আকা, ইন্দোনেশিয়ায় এই পাখিটি শুধুমাত্র ওয়ালেস রেখার পূর্বে পাওয়া যায়।)

রেখা অংকন

ওয়ালেস প্রায়ই এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়া আসা করতেন। মালয় দ্বীপপুঞ্জে আট বছরে তিনি মোট ১৪,০০০ মাইল পাড়ি দিয়েছিলেন, এর মধ্যে কিছু কিছু দ্বীপে তিনি বেশ কয়েকবার অভিযান করেছিলেন। তার পথ কোনদিকে হবে তা নির্ধারণ করতো  নৌকা পাওয়া বা না পাওয়ার উপর। তিনি সিংঙ্গাপুর থেকে সুলাবেসী দ্বীপের মাকাস্বার যাবার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ১৮৫৬ সালে মে মাসের একদিন একটি চীনা জাহাজে সিংঙ্গাপুর থেকে বালি যান, যেখানে যাওয়ার কোনো উদ্দেশ্যই ‍ছিল না তার, কিন্তু তিনি আশা করেছিলেন সেখান থেকে সুলাবেসী দ্বীপে লোম্বোক, পরে মাকাস্বার যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন। আকস্মিক দুর্ঘটনার কারণে তার এই ভিন্ন পথে আসাটাই ওয়ালেসের অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পথ করে দেয়।

বালিতে ওয়ালেস এমন কিছু পাখি খুঁজে পেলেন, যা তিনি পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে অভিযানের সময় দেখেছিলেন, যেমন, একটি উইভার, একটি কাঠঠোকরা, একটি থ্রাশ, একটি স্টারলিং , িতেমন বিশেষ কোনো উত্তেজনার বিষয় না। কিন্তু ‘তারপর লোম্বোকে, বিশ মাইলেরও কম একটা প্রণালী যা একে বালি থেকে পৃথক করেছে, আমি স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলাম একই ধরনের পাখিদের সাথে আবার দেখা হবে, কিস্তু সেখানে আমার তিন মাস অবস্থান করার সময়, আমি তাদের কোনোটিরই দেখা পেলাম না। ’, বরং ওয়ালেস ভিন্ন প্রজাতির পাখিদের খুঁজে পেলেন: সাদা কাকাতুয়া, হানিসাকলের তিনটি প্রজাতি, একটা জোরে জোরে শব্দ করা পাখি, যাকে স্থানীয়রা ডাকে ‘কোয়াইচ-কোয়াইচ’ এবং একটা অদ্ভুত পাখি যার নাম মেগাপোড ( বিগ ফুট বা বড় পা), যে তার বড় পা ব্যবহার করে ডিমের জন্য বড় জায়গা তৈরীতে। এধরনের সমগোত্রীয় কোনো পাখি সুমাত্রা, বোর্নিও বা জাভার পশ্চিমের দ্বীপগুলোর কোথাও দেখা যায় না।

ওয়ালেসকে বিষয়টি বেশ ভাবনায় ফেলেছিল। ওয়ালেসের কাছে প্রশ্ন তখন একটাই, কি সেই প্রতিবন্ধকতা যা কিনা এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে এই প্রজাতিগুলোর বিস্তার ব্যাহত করেছে। নিশ্চয়ই পাখিদের কাছে মাত্র ২০ মাইলের একটা প্রণালী কোনো বাধা হবার কথা না। বন্ধু বেটস এর কাছে লেখা চিঠিতে ওয়ালেস এই রহস্যের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে এর সমাধানে তিনি প্রস্তাব করেন, ‘নিশ্চয়ই বালি আর লোম্বোকের মধ্যে কোনো অদৃশ্য ‘সীমারেখা’ আছে। ফ্লোরেস বা তিমোরের আরো পুর্বদিকে গেলে, যেমন আরু দ্বীপে আর নিউ গিনিতে, পাখি প্রজাতির এই পরিবর্তন আরো সুস্পষ্ট হয়। সুমাত্রা, জাভা বা বোর্নিওতে পাখিদের যে পরিবারগুলো দেখা যায়, তারা আরু, নিউ গিনি বা অষ্ট্রেলিয়ায় অনুপস্থিত, একইভাবে এর বীপরিতটাও তাই। একইভাবে পূর্ব আর পশ্চিমের দ্বীপগুলোর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে পার্থক্যও লক্ষণীয়। পশ্চিমের বড় দ্বীপগুলোতে আছে বানর, বাঘ, গন্ডার। কিন্তু আরুতে কোনো প্রাইমেট কিংবা কোনো মাংসাশী প্রাণী নেই। স্থানীয় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সবাই মারসুপিয়ালস – যেমন, ক্যাঙ্গারু, কুসকুস ইত্যাদি।

বালি আর লোম্বোকের মধ্যে সীমারেখার অস্তিত্ব সম্বন্ধে ওয়ালেসের মনে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না বরং এর তার জন্য এর তাৎপর্য্য ছিল অনেক গভীর। ওয়ালেস যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রজাতির বিশেষভাবে সৃষ্টির মতবাদ অনুযায়ী, একই ধরনের জলবায়ুর দেশগুলোতে একই ধরনের প্রাণী এবং ভিন্ন জলবায়ুর দেশগুলোতে ভিন্ন রকম প্রাণীদেরই উপস্থিতি লক্ষ করার কথা। কিন্তু এরকম কিছু কিন্তু তিনি আদৌ পর্যবেক্ষণ করেননি। পশ্চিমে বোর্নিও আর পূর্বে নিউ গিনি’র মধ্যে তুলনা করে তিনি লেখেন: ‘খুবই কঠিন হবে ব্যাখ্যা করা যেখানে দুটি দেশ জলবায়ু আর ভূতাত্ত্বিক প্রকৃতিতে সদৃশ্য, কিন্তু তাদের পাখিরা এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সম্ভার সম্পূর্ণ আলাদা’।

নিউ গিনি আর অষ্ট্রেলিয়াকে তুলনা করে তিনি লেখেন, এরকম পার্থক্য আমরা খুব কমই খুঁজে পাবো, এক দেশে বিরতিহীনভাবে বৃষ্টি আর আর্দ্রতা, আরেকটিকে তীব্র শুষ্কতার কমবেশী প্রকোপ, ওয়ালেস যুক্তি দেন, ‘‍যদি ক্যাঙ্গারুরা শুষ্ক সমতলে আর অষ্ট্রেলিয়ার বনে বিশেষভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তাহলে নিশ্চই কোনো কারণ আছে নিউ গিনির ঘন, আর্দ্র জঙ্গলে তাদের আবির্ভাবের। পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে বানররা যে জায়গা দখল করেছে পূর্ব দিকের দ্বীপগুলোর ক্রান্তীয় বনভূমিতে সেই আবাসস্থল দখল করেছে গেছো ক্যাঙ্গারুরা।

ওয়ালেস আরো যুক্তি দেন যে, নিশ্চই প্রজাতির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে অন্য কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করছে। সেই নিয়মটাই, ওয়ালেসের প্রস্তাব অনুযায়ী ছিল, ‘সারাওয়াক সূত্র’, যা ‍তিনি এর দুবছর আগেই উত্থাপন করেছিলেন। আবারও ওয়ালেস তার পর্যবেক্ষণের স্বপক্ষে ভূতত্ত্ব আর ভূগোলের উপর নির্ভর করেছিলেন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে, নিউ গিনি, অষ্ট্রেলিয়া, এবং আরু অবশ্যই অতীতে কোনো এক সময় সংযুক্ত ছিল আর সেকারণেই একই ধরনের পাখি আর স্তন্যপায়ী প্রাণী সেখানে পাওয়া যায়, একইভাবে ওয়ালেস ব্যাখ্যা করেন যে, পশ্চিমের দ্বীপগুলোও কোনো একসময় এশিয়ার অংশ ছিল, সেকারণেই ক্রান্তীয় এশিয়ার প্রাণীদের সেখানে পাওয়া যায় -যেমন, বানর, বাঘ ইত্যাদি।

(ছবি: ওয়ালেস লাইন ও এর বর্ধিত কিছু সংস্করণ)

ওয়ালেসের ধারণা ছিল সঠিক। বালি আর লোম্বকের মধ্যে দূরত্ব কম হলেও যে সাগর তাদের পৃথক করেছে, তা পরবর্তীতে দেখা গেছে অনেক গভীর। বালি যেমন কন্টিনেন্টাল শেলফের প্রান্তে অবস্থিত, লোম্বক ঠিক তার বাইরে অবস্থিত। বালি পশ্চিমের অন্য দ্বীপগুলোর সাথে অতীতে সংযুক্ত থাকলেও লম্বোকের সাথে কখনোই যুক্ত ছিলনা। সুতরাং ২০ কিমি প্রশস্ত কোনো প্রণালীকে অতিক্রম করার ব্যাপার নয়, অনেক মিলিয়ন বছর ধরে এই পার্থক্যটা অনেক বড় ছিল। এবং জীবজগত সেই দ্বীপগুলোতে পৃথক পৃথকভাবেই অভিযোজিত হয়েছে, সেই নির্দিষ্ট দ্বীপের পরিবেশ অনুযায়ী। যদিও আজ দ্বীপগুলো পাশাপাশি, কিন্ত ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা আসলে নতুন প্রতিবেশী।

(ছবি : গেছো ক্যাঙ্গারু, যাদের শুধুমাত্র ওয়ালেস রেখার পূর্বে পাশে দেখা যায়, রেখার পশ্চিমে বানররা যে জায়গা দখল করে আছে, পুর্বদিকে সেই জায়গাটি দখল করে আছে এরা।)

ওয়ালেস সফল হয়েছিলেন, প্রজাতির উৎপত্তি এবং কিভাবে প্রজাতির বিস্তার হয়, এই দুটি প্রশ্নকে সংযুক্ত করতে এবং তিনি এশিয়া আর অষ্ট্রেলিয়ার প্রাণীজগতকে পৃথক করা সীমারেখাটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার এই আবিষ্কার চিরকালের জন্য ‘ওয়ালেস লাইন’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে আর ওয়ালেসকে প্রতিষ্ঠিত করে জৈবভূগোলের (Biogeography) জনক হিসাবে, যা উদ্ভিদ আর প্রাণীদের ভৌগলিক বিস্তার নিয়ে অধ্যয়ন করে।

দুই মহান মনের সম্মিলন

অবশেষে ওয়ালেস লন্ডনের বিজ্ঞানী সমাজে সামান্য কিছুটা হলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেন। চার্লস ডারউইনের সাথে তিনি চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করলেন । যেখানে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন, তার ‘সারাওয়াক ল’ তেমন কোনো নজর কাড়েনি, এমনকি কোনো ভিন্নমতের মুখোমুখিও হয়নি। ১৮৫৭ সালে মে মাসে ডারউইন তাকে উত্তর দেন: ‘আমি আপনার প্রবন্ধের প্রায় প্রতিটি শব্দের সাথেই একমত পোষণ করছি। আমি মনে করি আপনিও আমার সাথে একমত হবেন, যে আসলে খুব কম সময়ই আমরা কোনো তাত্ত্বিক প্রবন্ধের সাথে এত বেশী মাত্রায় সমমত পোষণ করি’। চিঠিতে ডারউইন আরো উল্লেখ করেন যে প্রজাতির বৈচিত্র্যের প্রশ্ন নিয়ে তিনি তার গবেষণার ২০ তম বর্ষে আছেন, এবং এ বিষয়ে তিনি একটি বড় আকারের বই লেখায় বেশ অগ্রসরও হয়েছেন, যেটা তিনি আশা করছেন আগামী দুই বছরে শেষ হবে না। অনেকটা একজন সিনিয়র প্রকৃতি বিজ্ঞানীর নোটিসের মত ব্যাপারটা, যে তিনি ব্যাপারটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবছেন, এবং সময় হলে তার সম্পূর্ণ মতামত প্রকাশ করবেন। কিন্তু আসলে নোটিসটা ডারউইনের জন্য প্রযোজ্য ছিল কারণ ওয়ালেস এই উত্তরের কাছাকাছি পৌছে যাচ্ছেন।

প্রজাতি যে বিবর্তিত হয় ওয়ালেসের কাছে সেটা আর তখন কোনো প্রশ্ন ছিল না, বরং কিভাবে হয়, সেটাই ছিল প্রশ্ন। ১৮৫৮ র ফেব্রুয়ারীতে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ হেলমাহেরায় ডোডিঙ্গা গ্রামের আদিবাসীদের কুটিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তীব্র জ্বরের প্রকোপে ( সম্ভব ম্যালেরিয়া), তখনই হঠাৎ করে তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি বিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসাবে তার চিন্তায় আসে। পর্যায়ক্রমে জ্বর বাড়া আর কমার মাঝে, ওয়ালেসের আর কিছু্ই করার ছিল না শুধুমাত্র, ‘ আমার পছন্দের বিশেষ কিছু বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করা ছাড়া।’ ৮৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার দিনে কম্বল মুড়ি দিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে পড়া ইংলিশ অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাসের জনসংখ্যার উপর একটা রচনার কথা ভাবছিলেন ওয়ালেস। তার মনে হলো যে, ম্যালথাস যেমন যুক্তি দিয়েছিলেন মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ মানব জনসংখ্যার লাগামহীন বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে তা আসলে প্রাণীজগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি ভেবে দেখলেন প্রাণীদের প্রজনন হার মানুষের চেয়ে অনেক বেশী দ্রুত আর যদি তা নিয়ন্ত্রণে না থাকতো, সারা পৃথিবীতে প্রাণীদের সংখ্যা মাত্রাহীনভাবে বেড়ে যেত। কিন্তু তার সমস্ত অভিজ্ঞতা তাকে জানাচ্ছে প্রাণীজগতের জনসংখ্যা সীমাবদ্ধ। ‘বন্য প্রাণীর জীবন’ ওয়ালেসের পর্যবেক্ষণে ‘হচ্ছে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম (Struggle for existence)’ , ওয়ালেস আরো যোগ করলেন, ‘সকল ইন্দ্রিয়, শারীরিক এবং মানসিক শক্তি পূর্ন ব্যবহারের প্রয়োজন হয় তাদের নিজেদের অস্তিত্ব আর তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে প্রতিপালন করতে’, খাদ্যের সন্ধান, বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা প্রাণী জীবনের প্রধানতম কাজ, আর দূর্বলেরা তাই টিকে থাকতে পারে না সেই সংগ্রামে। দক্ষ নমুনা সংগ্রহকারী ওয়ালেস খুব ভালো করে জানতেন, একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে বৈচিত্র্য, “হয়তো এই সব বৈচিত্র্যগুলোর বা প্রকরণের…অবশ্যই প্রজাতির সদস্যদের আচরণ বা ক্ষমতার উপর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রভাব আছে, যতই তা ক্ষুদ্রতম হোক না কেন… এমন কোনো বৈচিত্র্য বা প্রকরণ যা কিনা কাউকে সামান্য শক্তিশালী করে, …অবশ্যই সংখ্যায় তারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে’।

জ্বর একটু কমলে যখনই তিনি কোনো মতে উঠে বসতে পেরেছিলেন, ওয়ালেস তার ধারণাগুলো মাত্র কয়েক রাতের মধ্যে সম্পূর্ণ লিখে ফেলেছিলেন। তিনি তার সেই প্রবন্ধটির নাম দেন On the Tendency of Varieties to Depart indefintly from the Original বা মূল রুপ থেকে বৈচিত্রতার অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবর্তিত হবার প্রবণতা প্রসঙ্গে’, পরে তিনি তার ধারণাটিকে বলেছিলেন Survival of the fittest , যে বাক্যটি তিনি সমাজ বিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সারের লেখা থেকে ধার করেছিলেন। ওয়ালেসের রচনা ‍ছিল শুধু একটা খসড়া রুপরেখা মাত্র, ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানের কেন্দ্র থেকে ১০,০০০ মাইল দুরে, ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত একটি দ্বীপে আদিবাসীদের কুটিরে শুয়ে জ্বরের প্রকোপের মধ্যে পুরো চিন্তাটা অনুধাবন করে লেখা। ওয়ালেস সরাসরি লেখাটাকে জার্ণালে পাঠাতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন আগে তার রচনা কেউ পড়ুক। সুতরাং তিনি লেখাটি পাঠালেন একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানীর কাছে, যার সাথে তিনি কেবল পত্র যোগাযোগ শুরু করেছিলেন, তিনি ছিলেন চার্লস ডারউইন।

(ছবিঃ ইন্দোনেশিয়ার দূর্গম দ্বীপ টেরনাটে (দুরে), যেখানে ওয়ালেস ম্যালেরিয়ার সাথে যুদ্ধ করার সময় তার প্রাকৃতিক ‘নির্বাচন’ নিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে বড় তত্ত্বটি নিয়ে ভেবেছিলেন)

( ছবি: হেলমাহেরা দ্বীপে নতুন করে বানানো কুটির, রাসেল ওয়ালেস এখানে এ ধরনের কুটিরে শুয়ে ম্যালেরিয়ার জ্বরে ভোগার সময় ম্যালথাসে সূত্র ও বিবর্তনে চালিকা শক্তি হিসাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটির কথা ভেবেছিলেন)

ডারউেইনের কাছে তিনি পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়েছিলেন, যদি সেটি পড়ে ডারউইন ভালো কিছু মনে করেন তিনি যেন সেটি চার্লস লাইয়েলের কাছে পাঠিয়ে দেন। লাইয়েলের সাথে ওয়ালেসের কোনো পত্র যোগাযোগ ছিল না, কিন্ত সেই সময়ে তিনি একজন শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী ছিলেন, ওয়ালেস হয়তো ভেবেছিলেন তিনি তার তত্ত্বটি পড়তে আগ্রহী হতে পারেন কারণ এটি সেই সূত্র যা তিনি তার সারাওয়াক ল পেপারে উল্লেখ করেছিলেন সেটি ব্যাখ্যা করে । ডারউইনই ওয়ালেসকে বলেছিলেন, লাইয়েল তার ১৮৫৫ সালের পেপারটিকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। আরেকটি কারণ হতে পারে লাইয়েল বই Principles of Geologyর বিবর্তন বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ওয়ালেস তার প্রবন্ধে কিছু যুক্তি প্রস্তাব করেছিলেন। ওয়ালেসের জানা ছিল না যে, ডারউইন বহুদিন আগেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি আবিষ্কার করেছেন (১৮৩৮);

১৮৫৮ সালেন জুন মাসের কোনো সময় ডারউইন ওয়ালেসের রচনাসহ চিঠিটি হাতে পান। রচনাটি পড়ে, তিনি হতভম্ব হয়ে যান। এতটা অবাক হতেন না যদি তিনি ওয়ালেসের পাঠানো সব বার্তাগুলোর দিকে আরেকটু মনোযোগ দিতেন। যাই হোক ওয়ালেসের পাণ্ডুলিপিটি পড়ে ডারউইন প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে তার ধারণার প্রথম খসড়া রচনার ১৬ বছর পর যা ভাবলেন তা হলো: ‘আমি শঙ্কিত যে, আমার তত্ত্বের মৌলিকতা, যতটুকু তা হোক না কেন, সবই ধ্বংস হয়ে যাবে’।

ডারউইন বিস্মিত হয়েছিলেন তার সেই প্রবন্ধটি পড়ে। ওয়ালেসের প্রবন্ধটি শুরু হয় ম্যালথাসের পপুলেশন প্রিন্সিপলটি পুনব্যাখ্যা করে: ‘বন্য প্রাণীদের জীবন হচ্ছে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’, তিনি লেখেন, ‘কারণ প্রতিটি প্রজাতিতে যতজন বাঁচতে পারে তারচেয়ে অনেক বেশী সংখ্যক সদস্যের জন্ম হয়। আর তাদের প্রত্যেকে পরস্পর থেকে ভিন্ন। কোনো একটি প্রাণীর একক অস্তিত্ব টিকে থাকাটি নির্ভর করে তার নিজের উপর, এবং যারা মারা যায় তারা অবশ্যই হচ্ছে সবচেয়ে দূর্বলতম’। এমন একটি অনুচ্ছেদ ওয়ালেস লিখেছিলেন, যেন মনে হয় তিনি তার নিজের কঠোর জীবন থেকে উদাহরণ টানছেন, ‘এবং যারা তাদের অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত করতে পারে তারা শুধু হতে পারে যারা স্বাস্হ্য আর প্রাণশক্তিতে ভরপুর। কোনো উপকারী প্রকরণই যোগান দিতে সেই প্রয়োজনীয় সুবিধাটির যা বেঁচে থাকতে সহায়তা করে এবং সেই প্রকরণটি তার সন্তানদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়’।

তিনি লামার্কিয় বিবর্তনের সেরা উদাহরণটি ব্যবহার করেন এটি ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্য, ব্যাখ্যা করেন জিরাফ তাদের লম্বা ঘাড় পায়নি সারাক্ষণ এটি লম্বা করে টানার জন্য, কারণ যে কোনো প্রকরণ, এর পূর্বসূরির মধ্যে ছিল, যেমন যাদের লম্বা ঘাঢ় ছিল, তারা সুবিধা পেয়েছিল তাদের ছোট ঘাড় সহ সদস্যদের চেয়ে কারণ তারা বেশী খাদ্য খুঁজে পেয়েছিলো, যখন আরো উচু গাছের ডালে তারা তাদের খাদ্য পেয়েছে। আর এই পার্থক্যগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে সময় অতিক্রান্ত হয়ে একসময় নতুন রুপের সৃষ্টি করে। এখানেই আমরা একটি সাধারণ নিয়মে কিভাবে প্রজাতি বিকাশ ও দ্বিবিভাজিত হয়, যা প্রকৃতিতে ঘটে, তার একটি ধারণা পাই –

আর ডারউইন ওয়ালেসের শব্দগুলোকে তার তত্ত্বটির নিখুত একটি সংক্ষিপ্ত রুপ হিসাবে পাঠ করেন। হতাশ ডারউইন পাণ্ডুলিপিটি ওয়ালেসের অনুরোধ মতই লাইয়েলের কাছে পাঠান, সাথে তার একটি চিঠিতে লেখেন, ‘আপনার কথাই সত্য হলো’, প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বটি যখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি লাইয়েলকে জানিয়েছিলেন, লাইয়েল বলেছিলেন. ‘আপনি যদি এটি প্রকাশ না করলে অন্য কেউ সেটি করবে’, ডারউইন তাকে বলেছিলেন ‘আমার ১৮৪২ এর পাণ্ডুলিপিটি হাতে পেলেও এর চেয়ে ভালো সার-সংক্ষেপ করতে পারতেন না ওয়ালেস। আমার যা মৌলিকত্ব ছিল তার সবটাই গেছে’। তবে ডারউইন তার প্রাথমিক হতাশায় খোনিকটা অতিরঞ্জিত করেই কথাটি বলেছিলেন, কারণ তার খুব বিস্তারিতভাবে ভাবা তত্ত্বটির সাথে ওয়ালেসের একটি অন্তর্দৃষ্টি নির্ভর ভাবনা কিছূ পার্থক্য ছিল। ভালো করে লক্ষ্ করলে দেখা যাবে ডারউেইন একক সদস্যদের মধ্যে প্রতিযোগিতার উপর জোর দিয়েছিলেন বেশী, আর ওয়ালেস প্রকরণের উপর পরিবেশগত নিয়ামকগুলোর চাপকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার ব্যাখ্যায়। আর লাইয়েল ‍দুজনের অবদানকে শনাক্ত করেছিলেন, হুকারকে সাথে নিয়ে তিনি লিনিয়ান সোসাইটিতে একটি সেমিনারের আয়োজন করেন এবং সেখানে ওয়ালেসের প্রবন্ধটি ডারউইনের এর আগে দুটো প্রবন্ধের সাথে পাঠ করা হয়। ওয়ালেস কিছুই জানতেন না এ বিষয়ে, কিন্তু পরে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। ডারউইন দ্রুত তার তত্ত্বটি বিস্তারিতভাবে লিখতে বসেন।

ওয়ালেসের প্রবন্ধটিকে ( না তাকে জানানো হয়নি) ডারউইনের অপ্রকাশিত প্রবন্ধের সাথে একইসাথে ১৮৫৮ সালে ১ জুলাই Linnean Society of London এর সভায় পাঠ করার সিদ্ধান্ত নেন। সমিতির জার্নালে ২০ আগষ্ট এটি প্রকাশিত হয়েছিল On the Tendency of Species to Form Varieties; And On the Perpetuation of Varieties and Species by Natural Means of Selection”, ডারউইনের অবদানকে ওয়ালেসের প্রবন্ধের আগে রাখা হয় তার অগ্রাধিকার দিয়ে। ওয়ালেস মন্তব্য করেছিলেন তাকে না জানিয়ে কোনো প্রুফ সংশোধন ছাড়াই লেখাটি প্রকাশ করা হয়েছে, যা লাইয়েল আর হুকারের সূচনা মন্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

এছাড়া হতভম্ব হবার কারণটা আরো স্পষ্ট হয়, যদি ডারউইনের পরিকল্পিত বড় আকারের একটা বইটির সম্প্রতি সমাপ্ত খসড়া দুটি অধ্যায়, আমরা ওয়ালেসের রচনার ভাষার সাথে তুলনা করি। ফেব্রুয়ারী, ১৮৫৭ সালে, ডারউইন তার বইয়ের ৫ম অধ্যায়েলেখেন এবং নাম দেন ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’ , এর পরের মাসেই তিনি ৬ ষ্ঠ অধ্যায় শেষ করেন যেখানে ব্যাখ্যা করেন যে: সমস্ত প্রকৃতি, যুদ্ধরত.. এই সংগ্রামে প্রায়শই বর্তায় ডিম বা বীজের উপর, অথবা চারাগাছে … যে কোনো বৈচিত্র্য বা প্রকরণ, তা যতই ক্ষুদ্রতম হোক না কেন, যদি তা জীবনের যে কোনো অংশে যদি সামান্যতমভাবে জীবের উপকার করে, সেই বৈচিত্র্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মে সুরক্ষিত হয় বা নির্বাচিত হয়’। দুই লেখকের কেউই পরস্পরের চিন্তা বা রচনা সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন না। তাহলে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো ভাষার এই লক্ষণীয় সদৃশ্যতা – অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম এবং ক্ষুদ্রতম বৈচিত্র?

মহান মনিষীরা একই ভাবে চিন্তা করেন। ডারউইন এবং ওয়ালেস দুজনই প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং বুঝেছেন এটা আসলে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। দুজনেই একই প্রজাতিরই অনেক নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন যে, প্রজাতির মধ্যে বৈচিত্র্যতা বুঝতে পেরেছিলেন। দুজনেই দেখেছিলেন সামান্য ভিন্ন প্রজাতিরা নির্দিষ্ট দ্বীপে সীমাবদ্ধ এবং অনুধাবন করেছিলেন প্রজাতি পরিবর্তিত হয়। দুজনেই ম্যালথাসের রচনাটি পড়েছিলেন, বুঝতে পেরেছিলেন জনসংখ্যার উপর এর গুরুত্ব। একই ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ তাদের প্রায় একই ধরনের উপসংহারে নিয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও ডারউইন, প্রজাতির উদ্ভব সম্বন্ধে তার প্রথম অনুধাবনের ২০ বছর পরও শঙ্কিত হয়েছিলেন যে,‘আমার সব মৌলিকতা, যতটুকুই থাকুক না কেন, সব তুচ্ছ হয়ে যাবে।’

সামান্য একটু গর্বিত

ওয়ালেসের পাণ্ডুলিপি ডারউইনের হাতে আসার পর আসলে কি ঘটেছিল তা কিছু কিছু পণ্ডিতদের মধ্যে এখনও বিতর্কের বিষয়। মূল সত্যটা হলো যে, ওয়ালেস ডারউইনকে তার নিবন্ধটি পাণ্ডুলিপিটি ভূতত্ত্ববিদ স্যার চার্লস লাইয়েল বরাবর পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন, যা ডারউইন করেছিলেন। স্যার লাইয়েল এবং প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী জে. ডি. হুকার, যারা দুজনেই ডারউইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, যাদের কাছে আগেই ডারউইন তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব এবং এর সপক্ষে মৌলিক সব যুক্তিগুলো ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশ করেছিলেন। লাইয়েল এবং হুকার ওয়ালেসের প্রবন্ধটি এবং সাথে ডারউইনের রচনার একটি সংক্ষিপ্ত রুপ আসন্ন লিনিয়ান সোসাইটির সভায় ( ১ জুলাই, ১৮৫৮)  যৌথভাবে পাঠ এবং প্রকাশ করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন ।

আবিষ্কার করার একক গৌরব কি ওয়ালেসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল? যৌথ প্রকাশনার ব্যপারটা কি সঠিক ছিল? (যৌথ প্রকাশের আগে বিষয়টা কিন্তু ওয়ালেসকে জানানোই হয়নি ), অপরদিকে ডারউইনই কিন্তু প্রথম ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ ( প্রাকৃতিক নির্বাচন) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এবং তিনি তার ১৮৪২ সালের ধারণাগুলোর প্রাথমিক রুপরেখা, অন্ততপক্ষে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক ভাবে, অন্য বিজ্ঞানীদের সামনে প্রকাশও করেছিলেন।

তবে এটি সত্যি, আজ ডারউইনের নাম আর তার কর্ম ওয়ালেসের তুলনায় অনেক বেশীই পরিচিত। কিন্তু একবার ভেবে দেখুনতো এ বিষয়ে ওয়ালেসের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতে পারে। তিনি সবসময় এর কৃতিত্বটা ডারউইনকেই দিয়েছেন। মালয় দ্বীপপুঞ্জে থাকাকালীন, ডারউইনের কাছ থেকে ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটির একটি কপি তিনি হাতে পান। বার বার বইটিতিনি পড়েন। তারপর তার প্রতিক্রিয়া বন্ধু বেটসকে ব্যক্তিগত একটা চিঠিতে প্রকাশ করেন:

‘আমি জানিনা কিভাবে এবং কার কাছে আমি ডারউইনের এই বইটার প্রতি আমার প্রশংসাটা সম্পুর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারব … আমি সততার সাথে বিশ্বাস করি, যতই ধৈর্য্য নিয়ে আমি বিষয়টা নিয়ে কাজ এবং গবেষণা করি না কেন, আমি কখনোই এই বইয়ের মতো বিষয়টির সম্পূর্ণতার কাছে পৌছাতেই পারবো না, এর সুদৃঢ় যুক্তি, অপুর্ব ভাষা আর প্রাণশক্তি … ডারউইন একটা নতুন বিজ্ঞান এবং একটা নতুন দর্শনের সৃষ্টি করেছেন, আর আমি ‍বিশ্বাস করি, মানুষের জ্ঞানের কোনো শাখাতেই এমন পূর্ণতার আর কোনো নজির নেই, যা কিনা কেবল একজন ব্যাক্তির পরিশ্রম আর গবেষণার ফসল।’

(ছবি: রয়্যাল সোসাইটির ৩৫০ তম বার্ষির্কীতে প্রকাশিত একটি স্ট্যাম্পে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস)

এই চিঠিতে যেমন না, তার বাকী দীর্ঘ জীবনে কোনোদিনও (৯০ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন তিনি) ওয়ালেস অনুশোচনা, বিদ্বেষ বা ক্ষোভের একটিও শব্দ উচ্চারণ করেননি। তিনি সবসময় একে ডারউইনীয় তত্ত্ব বলেই উল্লেখ করেছেন। ১৮৬৯ সালে ভ্রমণ নিয়ে লেখা তার সবচেয়ে বড় বইটা The Malay Archipelago, তিনি উৎসর্গ করেছিলেন এভাবে: ‘চার্লস ডারউইনকে, The Origin of Species এর লেখক, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা বা বন্ধুত্বতার চিহ্ন হিসাবে নয়, তার কর্ম আর প্রতিভার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে’। ১৯০৫ সালে তার নিজের আত্মজীবনী My Life এর একটি পুরো অধ্যায় তিনি ডারউইনের সাথে তার ব্যাক্তিগত বন্ধুত্বের বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে অনুশোচনার, ঈর্ষার বা কোনো অসন্তোষের একটি শব্দও ছিলনা ।

(ছবি: ওয়ালেস, (ছবিতে তার জীবনের শেষে). ১৮৫৮ সালে ডারউইনকে তার রচনাটা পাঠানোর জন্য কোনোদিনও মনস্তাপে ভুগেছিলেন কিনা, তা কখনো প্রকাশ করেননি)

হয়তো ওয়ালেসের কাছে মূল ব্যাপারটাই ছিল বিজ্ঞানী সমাজে তার স্বীকৃতি আর গ্রহনযোগ্যতা পাওয়া নিয়ে। ১৮৫৮ সালের আগ পর্যন্ত তিনি যারা চিন্তার জগতে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এমন সব বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের -আসরে ছিলেন একজন বহিরাগত। যখন তিনি জানতে পারেন যে লাইয়েল এবং হুকার তার প্রবন্ধ সম্বন্ধে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন, তিনি তার পুরাতন বন্ধু আর স্কুলের সহপাঠীকে লেখেন যে, ‘আমি সামান্য গর্ববোধ করছি..’, ওয়ালেস ঐ চক্রের কেন্দ্রে থাকতে চাননি. শুধুমাত্র তিনি বিজ্ঞানীদের চক্রের ভেতরে ঢোকার সুযোগ চেয়েছিলেন। আর সেটা, এবং আরো অনেককিছু , তিনি নিঃসন্দেহে অর্জন করেছিলেন।

( ছবি: ওয়ালেস, তার স্ত্রী অ্যানি ও মেয়ে ভায়োলেট। ওয়ালেস মারিওন লেসলীকে ভালোবেসেছিলেন একসময়, এমনকি তাদের বিয়ের সব আয়োজনও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মারিওন সেই বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। ওয়ালেস তার আত্মজীবনীতে তার সম্ভাব্য কারণ হিসাবে বলেছিলেন, তার অর্থ উপার্জন করার অনিশ্চয়তা, বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। তবে তিনি খুব মর্মাহত হয়েছিলেন, ডারউইনের কাছে একটি চিঠিতে লেখেন, ‘আপনি হয়তো কল্পনা করতে পারবেন আমি কতটা দূঃখ পেয়েছি, যখন আপনাকে আমি বলবো, আমার জীবনে এর আগে আমি কোনো নারীর দেখা পাইনি যাকে আমি ভালোবাসতে পারি আর এই ক্ষেত্রে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমি সত্যিকারের কারো কাছে বিনিময়ে ভালোবাসাও পাচ্ছি’। তিনি বিষয়টি খুব বেশী কাউকে জানাননি। ডারউইনকে তার ব্যক্তিগত কথা বলার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন। তার এই হৃদয় ভাঙ্গার যন্ত্রণা তিনি ভুলতে পেরেছিলেন যখন তার সাথে অ্যানি মিটেন এর দেখা হয়েছিল। বিখ্যাত প্রকৃতি বিজ্ঞানী উইলিয়াম মিটেন এর কন্যা অ্যানিকে তিনি বিয়ে করেছিলেন ১৮৬৬ সালে। বাকী জীবন তারা এক সাথেই ছিলেন।)

ওয়ালেস তার বাকী জীবন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করে গেছেন, এছাড়া নানা বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন। প্রায় ১০০০ প্রবন্ধ আর ২২ টি বই তিনি লিখেছিলেন ( যেমন The Malay Archipelago, The Geographical Distribution of Animals, Island Life , Darwinism), বহু সন্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর তিনি ঘুমের মধ্যেই মারা যান।। তার মৃত্যুর খবর নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সম্বন্ধে লেখে “the last of the giants belonging to that wonderful group of intellectuals that included, among others, Darwin, Huxley, Spencer, Lyell, and Owen, whose daring investigations revolutionised and evolutionised the thought of the century.”

ওয়ালেসের কয়েকজন বন্ধু প্রস্তাব করেছিলেন তার সমাধি ওয়েস্টমিনিষ্টার অ্যাবিতে দেয়া হোক, কিন্তু ওয়ালেসের স্ত্রী তার স্বামীর অনুরোধ অনুযায়ী ডরসেটের ব্রডস্টোনে ব্রডস্টোন সিমেট্রিতে তাকে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করেন । ১৯১৫ সালে তার নামের একটি মেডালিয়ন ওয়েষ্ট মিনিস্টার অ্যাবিতে ডারউইনের মেমোরিয়োলের পাশে স্থাপন করা হয়।


ছবি: ব্রডস্টোন সমাধিক্ষেত্রে ওয়ালেস এর সমাধি। ২০০০ সালে এটিকে জীর্ণদশা থেকে সংস্কার করে A. R. Wallace Memorial Fund, ১৯১৩ সালেই পোর্টল্যান্ডে পাওয়া একটি জীবাশ্ম গাছের ৭ ফুট দীর্ঘ কান্ড Purbeck লাইমস্টোন এর বেদীতে স্হাপনা করা হয়। ২০০০ সালে একটি সন্মানসুচক প্লেকও স্হাপন করা হয় মার্বেল পাথরের ভিত্তিতে)

আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস: ডারউইনের মতো যিনি স্বতন্ত্রভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা ভেবেছিলেন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s