
ছবি: বায়ে: বারট্রাম বরডেন বোল্টউড (Bertram Borden Boltwood) , ডানে: আর্থার হোমস (Arthur Holmes), রেডিওমেট্রিক ডেটিং ( রেডিওঅ্যাকটিভ ডেটিং ও বলা হয় মাঝে মাঝে) হচ্ছে যে কৌশল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা কিছু জিনিস যেমন পাথর এর বয়স নিরুপন করেতে পারেন। এই কাজটি করা হয় পাথরের মধ্যে উপস্থিত প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া যায় এমন তেজষ্ক্রিয় আইসোটোপ ও তাদের ক্ষয় হবার পর যে মৌলটি সৃষ্টি হয় তার একটি তুলনামুলক অনুপাত ব্যবহার করে, যেখানে আমরা সেই তেজষ্ক্রিয় পদার্থটির ক্ষয় হবার হারটি আমাদের জানা। ১৯০৭ সালে রেডিওমেট্রিক ডেটিং প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে দেখাতে সক্ষম হয় পৃথিবী অনেক প্রাচীন ( সেই সময়ের হিসাব অনুযায়ী ২.২ বিলিয়ন বছর, যদিও আমরা আজ জানি পৃথিবী আসলে এর চেয়ে দ্বিগুন প্রাচীন); ১৯০২ সালে আর্ণেষ্ট রাদারফোর্ড এবং ফ্রেরেরিখ সডি প্রথম লক্ষ করেন কিছু রেডিওঅ্যাকটিভ বা তেজষ্ক্রিয় মৌল, যেমন ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়াম একটি নির্দিষ্ট এবং পুর্বধারনা করা যায় এমন এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ক্ষয় হয়ে ভিন্ন মৌলে রুপান্তরিত হয়; অনেকের কাছে এই তথ্যটি আলকেমীর মত মনে হলেও বারট্রাম বরডেন বোল্টউড (Bertram Borden Boltwood) নামের এক আমেরিকার রসায়নবিকে একটু বেশী কৌতুহলী করে তুলেছিল। তার নিজের এবিষয়ে গবেষনায় তিনি লক্ষ্য করেন ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম খনিজ আকরে সবসময়ই সীসা উপস্থিতি; ১৯০৭ সালে তিনি প্রস্তাব করলেন যে সীসা নিশ্চয়ই ইউরেনিয়াম আর থোরিয়াম তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু তিনি জানতেন ইউরেনিয়ামের কি হারে ক্ষয় হয় যার একটি সুচক হচ্ছে হাফ লাইফ, তিনি কোন ইউরেনিয়াম আকরে ইউরেনিয়াম আর সীসার অনুপাতকে একধরনের সময় নিরুপনের ঘড়ি হিসাবে ব্যবহার করেন, এবং তিনি তার গবেষনায় দেখেন ইউরেনিয়াম আকর এবং সেই সুত্রে আকরটি যেখানে পাওয়া যাচ্ছে ভুত্বক এর বয়স হচ্ছে প্রায় ২.২ বিলিয়ণ। সেই সময় এটি একটি নাটকীয়ভাবে বিশাল একটি সংখ্যা; এরপরে এই দৃশ্যে আসেন একজন বৃটিশ ভুতাত্ত্বিক আর্থার হোমস (Arthur Holmes), ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি বোল্টউড এর টেকনিককে আরো সুক্ষ করে ইউরেনিয়াম-সীসা রেডিওমেট্রিক ডেটিং এর মাধ্যমে সঠিকভাবে একটি ডেভোনিয়ান পর্বের পাথরের বয়স নির্ণয় করেন। এরপরে তিনি এই প্রক্রিয়াটিকে আরো সুক্ষ করে তোলেন, এজন্যই তাকে বলা হয় আধুনিক জিওক্রোনোলজীর জনক। পরবর্তীতে আইসোটোপের আবিষ্কার এবং আরো বেশ কয়েকজনের ( আলফ্রেড ও নাইয়ের) গবেষনায় পৃথিবীর বয়স চল্লিশের দশকেই স্থির হয় ৪.৫ বিলিয়নের কাছাকাছি। পাথরের বয়স নির্ণয়ের সেই প্রক্রিয়া এখন পরিচিত হোমস-হোটারমেন মডেল ( ফ্রিটজ হোটারম্যানস ও হোমস এর নামানুসারে); আর্থার হোমস এর আরেকটি মৌলিক অবদান হলো, তিনি প্রথম প্লেট টেকটোনিক এর মেকানিজম ব্যাখ্যা করেন, আলফ্রেড ওয়াগেনার (Alfred Wegener) এর প্রস্তাবিত যে তত্ত্বটি তখনও বিজ্ঞানীরা আমলে নেননি।

ছবি: ঘড়ির মত এই ডায়াগ্রামটি ভুতাত্ত্বিক সময় এবং পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটা কিছু গুরুত্বপুর্ণ সময়কে নির্দেশ করছে। Hadean বা হেডিয়ার ইয়ন পৃথিবীতে জীবনের জীবাশ্ম আবিষ্কার হবার আগের সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। িএর উপরের সীমা এখন ধারনা করা হয় প্রায় ৪.০ Ga বা গিগাঅ্যানাম ( বা বিলিয়ন) আগে।
ছবি: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে উইলিয়াম স্মিথ ( বায়ে) এবং জন ফিলিপস এর আবক্ষ মুর্তি; ১৭৮৭ সালে উইলিয়াম স্মিথ সমারসেট ইংল্যান্ডে এক ভুমি জরিপের কাজ পেয়েছিলেন, সেখানে একটি পুরোনো খনির ভিতরে ও এর আশে পাশে উন্মুক্ত হয়ে থাকা ভুত্বকের স্তরগুলো তার নজর কেড়েছিল, তিনি লক্ষ্য করেন এদের স্তরগুলো তিনি তাদের বৈশিষ্টসুচক কিছু প্রকৃতি দিয়ে আলাদা করা যাচ্ছে। একই রকম স্তরের বিন্যাস সেই জমির আশে পাশেও তিনি দেখেন। ভালো করে আরো পরীক্ষা করার পর তিনি বুঝতে পারেন যে প্রতিটি স্তর আসলে বিশেষ ধরনের শিলা দিয়ে তৈরী এবং তাদের প্রতিটি স্তরেই পাওয়া যাচ্ছে বৈশিষ্টসুচক কিছু জীবাশ্ম।তিনি দেখলেন জিগশ ধাধার মত কোন একটি স্তরের জীবাশ্ম দিয়ে অন্য কোথাও একই স্তরকে শনাক্ত করতে পারছেন। তার এই খুব সাধারণ একটি অর্ন্তদৃষ্টি উইলিয়াম স্মিথ এর তুলে দিয়েছিল পৃথিবী ভুতাত্ত্বিক মানচিত্রের চাবি: পাথর এবং জীবাশ্মরা স্তরে স্তরে বিন্যস্ত থাকে। উইলিয়াম স্মিথ একাই সারা বৃটেনের ভুতাত্ত্বিক মানচিত্রটি তৈরী করে ফেলেন। ভীষন কাজ পাগল সাংসারিক জীবনে অদক্ষ মানুষটা আবিষ্কারের নেশায় উত্তর প্রজন্মকে উপহার দিয়ে যান অসাধারন একটি আবিষ্কার। তার নিজের জীবন ভালো কাটেনি, দেনা শোধ না করতে পেরে তাকে জেল খাটতে হয়েছে, স্ত্রী মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন; কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত না থাকা, পৃষ্ঠপোষকতার কোন নিশ্চয়তা ছাড়াই তিনি তার বিশাল কাজটি করে ফেলেছিলেন, তার সাথে ছিল তার ভাগ্নে জন ফিলিপস, বাবা মা হারা ফিলিপস এর অভিভাবক ছিলেন তিনি। ১৮১৫ সালে তার ম্যাপটি শেষ হলে স্পষ্টতই বোঝা যায় কি অসাধারন কাজটি তিনি করেছেন; কিন্তু দুর্ভাগ্য তখন লন্ডনের জিওলজিকাল সোসাইটির প্রধান ছিলেন জর্জ বেলাস গ্রীনফ, তিনি উইলিয়াম স্মিথকে কোন সমর্থন জানালেন না.. আর ম্যাপটি বিক্রি করে তার দেনা শোধ করারও সম্ভব হয়না। ১৮৩১ সালে অ্যাডাম সেজউইক ( ডারউইনের শিক্ষক) অবশেষে উইলিয়াম স্মিথকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দেবার ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রথম দেখিয়েছিলেন পাথরের সবচেয়ে নীচের স্তর থেকে কিভাবে জীবাশ্ম সবচেয়ে গভীর, অর্থাৎ নীচে থেকে ক্রমাগত উপরে বদলাতে থাকে, তিনি এটাও দেখান যে কিভাবে বিশেষ বৈশিষ্টসুচক জীবাশ্ম কে আমরা ব্যবহার করতে পারি ভুত্বকের স্তরকে যে কোন জায়গায়। আর সবচেয়ে বড় যে অবদান,সেটি হলো তার ভাগ্নে জন ফিলিপসকে শিখিয়ে ছিলেন কিভাবে ভুত্বকের স্তর আর জীবাশ্ম চিনতে হয়। জন ফিলিপস প্রথাবিরুদ্ধ ছিলেন না, তার ছিল অক্সফোর্ডের শিক্ষা..প্রাতিষ্ঠানিক সেই শক্তি নিয়ে তিনি মামার কাজটি শেষ করতে আত্মনিয়োগ করেন, ভুত্বকের যে স্তরগুলো মামা তাকে চিনিয়েছেন, তিনি এর অর্থ খোজার চেষ্টা করেন। তিনি প্রতিটি স্তরের জীবাশ্মদের তালিকা করেন, মামার ম্যাপটি নিয়ে তিনি প্রতিটি স্তরে পাওয়া জীবাশ্মদের বিন্যাসের একটি অর্থ খোজার চেষ্টা করেন। ফিলিপস ই প্রথম সময়ের তিনি এরা কে চিহ্নিত করেন, যেখানে প্রত্যেকটি এরার কিছু নিজস্ব জীবাশ্মর অস্তিত্ত্ব আছে। এই এরা গুলোর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত হয়েছে সুস্পষ্ট বিভেদরেখায়, যেখানে একটি এরার জীবাশ্মগুলো অন্য একটি এরায় আর দেখা যায় না।যেখানে জায়গা করে নেয় নতুন সব প্রজাতি। এর উপর ভিত্তি করে তিনি প্রধান জিওলজিক্যাল এরার নাম দেন, ১৮৫৫ সালে তার একটি পেপারে তিনি এদের নাম উল্লেখ করেন: Paleozoic, Mesozoic, এবং Cenozoic ; বর্তমানে যে কোন মিউজিয়ামে গেলেই এর গুরুত্ব আপনি বুঝতে পারবেন।

ছবি: জিওলজিক্যাল টাইম স্কেল: উইলিয়াম স্মিথ এবং জন ফিলিপস এর সাধে জর্জ কুভিয়ের,জ্যা দ’ওমালিয়াস দালোয় এবং আলেকজান্ডার ব্রোনিয়ার্ট উনিশ শতকের প্রথমাংশে ভুত্বকের স্তরকে সেখানে থাকা বৈশিষ্টসুচক জীবাশ্ম দিয়ে চিহ্নিত করেছিলেন, যা ভুতত্ত্ববিদদের সহায়তা করেছিল পৃথিবীর ইতিহাসকে শ্রেনীবিভক্ত করার জন্য সারা পৃথিবী জুড়ে ।পুরো প্রক্রিয়াটিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল বৃটিশ ভুতত্ত্ববিদরা।ভুত্বকের স্তরের নামকরনে তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই, যেমন ক্যাম্ব্রিয়ান ( Cambrian: ওয়েলস এর ঐতিহ্যবাহী নাম), অরডোভিসিয়ার, সিলুরিয়ান, ওয়েলস এর প্রাচীন দুটি গোত্রদের নামের সাথে মিলিয়ে রাখা; ডেভোন এসেছে ইংলিশ কাউন্টি ডেভন থেকে। কার্বনিফেরাস নামটি কয়লার স্তর থেকে আসা, পার্মিয়ান নামটি এসেছে রুশ এলাকা পার্ম এর নামের সাথে যেখানে এই স্তরটি ব্যাখ্যা করেন স্কটিশ ভুতাত্ত্বিক রোডেরিক মার্চিসন ট্রায়াসিক নামটি এসেছে এর তিনটি স্তর থেকে, জুরা পর্বতের সামুদ্রিক লাইমস্টোন থেকে এসেছে জুরাসিক, ক্রিটাশিয়াস ( ক্রিটা মানে চক), ক্যালসিয়াম কার্বনেট এর স্তর থেকে এর নাম; জন ফিলিপস ( উপরে ) এই সব পর্বগুলো এরা এবং নানা সাবডিভিশনে ভাগ করেন, টারশিয়ারী এবং কোয়াটারনারী পর্ব ও ইপোক এ।তিনি প্রথম গ্লোবাল জিওলজিকাল টাইম স্কেল প্রকাশ করেন, প্রতিটি এরায় পাওয়া জীবাশ্মর বিন্যাস লক্ষ্য করে।
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : চতুর্থ অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The Greatest Show on Earth: The evidence for evolution by Richard Dawkins
প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)
তৃতীয় অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব)
তৃতীয় অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)
চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)
নীরবতা এবং মন্থর সময় ….
চতুর্থ অধ্যায়: তৃতীয় পর্ব
রেডিওঅ্যাকটিভ ঘড়ি:
এবার তেজষ্ক্রিয় বা রেডিওঅ্যাকটিভ ঘড়ির কথা আলোচনা করা যাক ; আমাদের বেছে নেবার মত বেশ অনেকগুলো এধরনের ঘড়ি আছে। এবং আমি যেমনটি বলেছিলাম, সৌভাগ্যক্রমে এরা শতাব্দী থেকে বহু মিলিয়ন বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রত্যেকটিরই একটি ভুল হবার সীমা আছে, সাধারণত যা ১ শতাংশ। সুতরাং আপনি যদি কোন পাথরের বয়স নির্ণয় করতে চান, যার বয়স হতে পারে শত মিলিয়ন বছর, আপনি নিশ্চয়ই ১ মিলিয়ন বছরের ভ্রান্তি সন্তুষ্ট হয়েই মেনে নেবেন। যদি দশ মিলিয়ণ বছরের কোন পাথরের বয়স নির্ণয় করতে চান, তাহলে কম বেশী লক্ষ বছরের ভ্রান্তি আপনাকে মেনে নিতে হবে।
কিভাবে তেজষ্ক্রিয় ঘড়ি কাজ করে সেটা বুঝতে তেজষ্ক্রিয় বা রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ আসলে কি সেটি আগে জানতে হবে। প্রতিটি পদার্থ তৈরী হয় এলিমেন্ট বা মৌল দিয়ে, যারা সাধারণত রাসায়নিক সংযোগের মাধ্যমে অন্য মৌলের সাথে যুক্ত থাকে; প্রায় ১০০ টি মৌল আছে, অবশ্য সংখ্যাটা সামান্য কিছু বেশী হতে পারে যদি আপনি সেই মৌলগুলোকেও গণনা করেন যাদের শুধুমাত্র ল্যাবরেটরীতেই শনাক্ত করা গেছে, এবং কিছুটা কম হবে যদি শুধুমাত্র প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এমন মৌলদের গণনা করেন।
Continue reading