ব্রুনো : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

ইতিহাসে বীর এবং খলনায়কের কোনো অভাব নেই। প্রায়শই তাদের জীবন সম্পৃক্ত জটিল বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করে বিচিত্র ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। এই অতিসরলীকরণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসের স্থান ও কালে সেই মানুষটির সামাগ্রিক জীবনকে অবমূল্যায়ন করা হয়, আর বহুমূখী এই চরিত্রগুলো ইতিহাস-অজ্ঞতার পরিণতি হন। জিওর্ডানো (জর্ডানো) ব্রুনো এধরনের বহু চরিত্রের একজন। আশির দশকে লোকপ্রিয় মানসে যাকে নিয়ে আসতে সবচেয়ে সফল ভূমিকা পালন করেছিলেন কার্ল সেগান। সেগানের চেতনার উত্তরসূরী নিল ডে গ্রাস টাইসনের উপস্থাপনায় কালজয়ী বিজ্ঞান-প্রামাণ্যচিত্র ‘কসমস’-এর দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণেও ব্রুনো পূনরাবির্ভূত হয়েছিলেন। নতুন ‘কসমসের’ প্রথম পর্বেই অতিসরলীকরণ আর ইতিহাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণায় পরিপৃক্ত একটি ‘অ্যানিমেশনে’ আমরা ব্রুনোকে আবির্ভূত হতে দেখি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে, ইটালী একীভূত হবার মুহূর্তে চার্চ বিরোধীদের অবস্থানের উদ্ধত প্রতীক হিসাবে বিবেচিত ব্রুনোকে এর আগেও ব্যবহার করা হয়েছিল বর্তমানে বিজ্ঞান ইতিহাসবিদদের দ্বারা ভ্রান্ত প্রমাণিত ড্রেপার-হোয়াইটের ‘কনফ্লিক্ট’ হাইপোথিসিসে, যা দাবী করেছিল বিজ্ঞান ও ধর্ম একটি নিরন্তর সংঘর্ষে লিপ্ত। যদিও খ্যাতিমান বহু বিজ্ঞানী যেমন আছেন যারা এই ‘কনফ্লিক্ট’ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, আবার এমন বিজ্ঞানীরাও আছেন, যারা বিজ্ঞান আর ধর্মের মিথষ্ক্রিয়ায় ‘কমপ্লেক্সিটি’ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। তবে এই লেখাটির বিষয় বিজ্ঞান আর ধর্মের সেই মিথষ্ক্রিয়া নয়, বরং ‘অ্যাড হক’ কিংবদন্তীতে রূপান্তরিত হওয়া একজন প্রবল কৌতূহলী দার্শনিকের জীবন ও তার দর্শন।

প্রতি বছর সতেরো ফেব্রুয়ারি রোমে কাম্পো ডেই ফিওরে চত্বরে বিচিত্র বিশ্বাস ধারণকারী একগুচ্ছে মানুষ একত্রিত হন – নিরীশ্বরবাদী, বহুইশ্বরবাদী, নাস্তিবাদী, মেসন, অতীন্দ্রিয়বাদী, খ্রিষ্টীয় সংস্কারবাদী, এবং ইটালির মুক্ত চিন্তকদের সমিতির সদস্যরা, যাদের সাথে এমনকি যুক্ত হয় পৌরসভার একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল। উনবিংশ শতকে নির্মিত একটি স্মারক মূর্তির বেদীতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পন করতে প্রতি বছর এই অদ্ভুত সমাবেশটি একত্রিত হয়, যে মূর্তিটি যাজকীয় মাথার আবরণীর নীচ থেকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে পিয়াৎসার দিকে তাকিয়ে আছে : ফুল, মোমবাতি, কবিতা এবং নিবেদনের স্মারক সেই মূর্তির ভিত্তিমূলে ক্রমশ জড়ো হতে থাকে, যেখানে লেখা আছে, “ ব্রুনোর প্রতি, সেই প্রজন্ম থেকে যাদের আগমন সে অনুমান করেছিলেন, এখানে, যেখানে আগুন তাকে দগ্ধ করেছিল”। ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে চার শতাব্দী আগে এখানেই যাকে মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল ক্যাথলিক চার্চের ইনক্যুইজিশন, সেই প্রথাবিরোধী ব্যক্তিকে এরপর বহু বিচিত্র ধরনের আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে ইতোমধ্যেই আত্মীকৃত করা হয়েছে, আর যা প্রতিফলিত করছে তার ধারণা, লেখা ও চরিত্রের অন্তর্নিহিত জটিলতা আর স্ববিরোধীতাগুলোকে।

নেপলসের কাছে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির পাদদেশে নোলায় ১৫৪৮ সালে  ফিলিপো ব্রুনো (১৫৪৮) জন্মগ্রহন করেছিলেন। একজন সৈনিকের ছেলে ব্রুনো সতেরো বছর বয়সে নিকটবর্তী নেপলসে সেই সময়ের সুখ্যাত সান ডোমেনিকো ম্যাজিওরের ডমিনিকান কনভেন্টে যোগ দিয়েছিল। ডমিনিকান অর্ডারের (খ্রিষ্টীয় যাজকদের একটি সংঘ) সদস্য হবার পরে তিনি “জিওরডানো” নামটি গ্রহন করেছিলেন। এখানে তিনি দর্শন এবং ধর্মতত্ত্বে তার প্রতিভা প্রদর্শন করেছিলেন, কিন্তু তার এই প্রতিভা তাকে যতটা সুবিধা দিয়েছিল, ততটাই তার জন্য সমস্যাজনক প্রমাণিত হয়েছিল। প্রথাগত মতবাদগুলোকে প্রশ্ন এবং নিষিদ্ধ বই খুঁজে পড়ার জন্য  তিনি তার উর্ধ্বতনদের সাথে বিরতিহীনভাবেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন। এখানে তিনি অ্যারিস্টোটলীয় এবং থোমিয় ((থোমবাদ হচ্ছে দার্শনিক আর ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার ধারা, যা বিখ্যাত ডমিনিকান দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক থমাস অ্যাকোয়াইনাসের কাজ ও চিন্তার (১২২৫-১২৭৪) উত্তরসূরি হিসাবে বিকশিত হয়েছিল )) ঘরানায় প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন, এবং অবশেষে তিনি নিজে একটি অতীন্দ্রিয়বাদী নব্যপ্লেটোবাদের সমর্থক হয়েছিলেন, যার সাথে প্রাচীন পৌরাণিক চরিত্র হারমেস ট্রিসমেজিস্টাসের সময় আর কাজ নিয়ে পুনরুজ্জীবিত আগ্রহ দ্বারা সিক্ত ধারণাগুলোও মিশ্রিত হয়েছিল। তার এসব প্রথাবিরোধী বিশ্বাসগুলো ইনকুইজিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, প্রথমে নেপলসে এবং পরবর্তীতে রোমে। জিজ্ঞাসাবাদ এড়াতে তিনি ডমিনিকান দীক্ষা ত্যাগ করে ১৫৭৬ সালে ইটালি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন ( যদিও তাকে ডমিনিকান অর্ডার থেকে তখন বহিষ্কার করা হয়নি, তবে ১৫৭৬ সালে ইটালি ত্যাগ করেছিলেন গোপনে। কনভন্টের প্রিভি বা টয়লেটে বসে তৎকালীন সংস্কারপন্থী সুপরিচিত পণ্ডিত ইরাসমাসের লেখা একটি বই পড়ার সময় তিনি কারো নজরে পড়েছিলেন। যদিও প্রমাণ লুকাতে তিনি ছিদ্র দিয়ে বইটি ফেলে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কেউ ঠিকই সেই মলের স্তূপ থেকে সেটি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল। ))

ইটালী থেকে ব্রুনো ক্রমশ উত্তরে অগ্রসর হয়েছিলেন, আর এই প্রক্রিয়ায় দীক্ষাচ্যুত একজন (ফ্রায়ার) যাজক থেকে (তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এই অনুমোদিত অনুপস্থিতির জন্য), ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় হেনরি ব্যক্তিগত শিক্ষক রূপে নিজেকেও রূপান্তরিত করেছিলেন, আর বেশ সংক্ষিপ্ত সময়ে এই সবকিছুই ঘটেছিল। ব্রুনো যেখানেই গিয়েছিলেন, শুরুতে তিনি সফলতা অর্জন করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগই থাকুক না কেন, তিনি দরিদ্র কিংবা একাকী ছিলেন না, বেশ কিছু ক্ষমতাবান পৃষ্ঠপোষক তাকে সহায়তা করেছিলেন। ১৫৭৯ সালে তিনি দর্শনে অধ্যাপক হিসাবে ফ্রান্সের তুলুজে নিয়োগ পান, ১৫৮১ সালে ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় হেনরি তাকে সোরবনে লোভনীয় একটি চাকরি দেন এবং ১৫৮৩ সালে তিনি ইংল্যান্ডে এসেছিলেন, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের সাথে তিনি থাকতেন এবং নিয়মিতভাবে (রানি প্রথম এলিজাবেথের) রাজসভার সদস্যদের সাথে মিলিত হয়েছেন।

দ্রুত এই বিস্ময়কর উত্থান ইঙ্গিত করে  ব্রুনো ঔদ্ধত্য, সাহস আর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণীয়তা, কিন্তু যদিও তিনি প্রভাবশালীদের বলয়ে বিচরণ এবং তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি অথবা যে কৃত্রিম স্মরণ রাখার পদ্ধতি যা তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন তার জন্য সুখ্যাতি অর্জন করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু তার অবস্থান সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তিনি শত্রু তৈরি করতেন ঠিক ততটা তৎপরতার সাথে যেভাবে তিনি ভক্তদের আকর্ষণ করতেন। এবং তার উন্মুক্ত বক্তৃতায় সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য একাধিক শহরের কারাগারে তাকে সময় কাটাতে হয়েছিল। তিনি বেশ কিছু বই প্রকাশ করেছিলেন, যা বিপজ্জনক চিন্তাবিদ হিসাবে তার কুখ্যাতিকে আরো দৃঢ় করেছিল। ব্রুনো খুব সহজ চরিত্রের মানুষ ছিলেন না। তাকে বহু শহরে ঘুরতে হয়েছে কারণ তিনি খুবই তর্কপ্রিয়, শ্লেষাত্মক, এবং বিতর্কিত বিষয়ের প্রতি অদম্য আকর্ষণ অনুভব করতেন। নানা ধরনের বিদ্যায়তনিক বিতর্কের যুক্ত হয়েছিলেন, যার অধিকাংশই তার ‘কসমস’ সংক্রান্ত ধারণাসংক্রান্ত নয়। একটি উদাহরণ যেমন, কম্পাস কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটি নিয়ে একটি চরম তর্কবিতর্কের কারণে তাকে ফ্রান্স থেকে পালাতে হয়েছিল। ব্রুনো প্যারিস থেকে লন্ডনে উপস্থিত হয়েছিলেন, এরপর বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত, আর্চডিউক, রাজা এবং সম্রাটদের জন্য কাজ করার সুযোগ আবিষ্কার করে আবার প্যারিসে, তারপর সেখান থেকে ভিটেনবুর্গ, প্রাগ, জুরিখ, ফ্রাঙ্কফুর্ট, পাদুয়া এবং অবশেষে ভেনিস। সারাক্ষণই তিনি সহানুভূতিশীল পৃষ্ঠোপষকদের অনুসন্ধান করেছিলেন, কর্তৃপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার হবার সম্ভাবনা থেকে যারা তাকে সুরক্ষা করবে এবং তার দর্শন বিকশিত করার সুযোগ করে দেবে। কিন্তু একটি পর্যায়ে তার ভাগ্য নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ।

১৫৯১ সালে একজন সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকের শিক্ষক হিসাবে তিনি ভেনিসে আসার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, এবং ভেনিসে আসার কিছুদিন পরই সেই ব্যক্তি তাকে ইনক্যুইজিশনের কাছে ধরিয়ে দিয়েছিল। আট বছর কারাগারে অবস্থান এবং দুটি দীর্ঘ বিচার কার্যের পর তাকে ১৬০০ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি কাম্পো ডেই ফিওরে অভিমূখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে আগুনে জীব্ন্ত দগ্ধ করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। কথিত আছে  তার শেষ মুহূর্তে তার সামনে অনুশোচনার জন্য উপস্থাপন করা ক্রুশ থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।  ক্যাথলিক মতবাদ ধর্মান্তরিত জার্মান যাজক গাসপার শোপে, যিনি ব্রুনোর শেষ বিচারকার্য ও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সাক্ষী ছিলেন, পরবর্তীতে এর একটি বিবরণ লিখেছিলেন তার বন্ধুকে পাঠানো একটি চিঠিতে – যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার পর,তিনি আর কোনো প্রত্যুত্তর দেন নি শুধুমাত্র ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বরে “আমি এটি গ্রহন করতে যতটা না শঙ্কিত, আপনারা হয়তো আরো বেশি শঙ্কিত আমার উপরে এই দণ্ড আরোপ করতে” বলা ছাড়া।  ব্রুনোর দীর্ঘ কারাবাস এবং বিচারপ্রক্রিয়া হলি অফিসের ইতস্ততা বিষয়টি ইঙ্গিত করে, যা একটি শনাক্তকরণ স্বীকৃতি যে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আসলেই সুষ্পষ্ট নয়। ব্রুনো ঔদ্ধত্য, অস্বীকার আর সততা, এবং তার বক্তব্য অমূলক বলে প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি তার মৃত্যুকে শহীদত্বের আবরণ দিয়েছিল। এমন কিছু হয়তো তিনি নিজেও সেই সময় অনুভব করতে পেরেছিলেন, যদি আমরা তার উত্তর, আর প্রতিক্রিয়াগুলো বিচার করে দেখি। কিন্তু এই শহীদত্বের প্রকৃতি, যদি এমন কিছু আসলেই সেটি হয়ে থাকে, নির্দিষ্ট করা খুব সহজ কাজ নয়।

ব্রুনো অপ্রত্যাশিতভাবে ২০১৪ সালে বিশেষ সমর্থন পেয়েছিলেন কার্ল সেগানের আশির দশকের শুরুতে প্রথম সম্প্রচারিত বিখ্যাত “কসমস” প্রামাণ্যচিত্রটির নতুন সংস্করণ  “কসমস : এ স্পেসটাইম অডিসি” শীর্ষক ফক্স টেলিভিশনের প্রামাণ্য ধারাবাহিকে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একটি ভূমিকাসহ অনুষ্ঠানটি প্রথম পর্বটি সম্প্রচারিত হয়েছিল বিশ্বব্যাপী, যেখানে জ্যোতিপদার্থবিদ নিল ডে গ্রাস টাইসন ব্রুনোর জীবন নিয়ে একটি অ্যানিমেটেড (এবং অতিসরলীকৃত ) সংস্করণ উপস্থাপন করেছিলেন – এবং সেটি সেই দাবীটিরই পুনরাবৃত্তি করেছিল যা প্রায়শই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাকে নিয়ে করা হয়ে থাকে: আর সেটি হচ্ছে, তিনি ছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের প্রথম “শহীদ”।

ব্রুনোর জীবনের জনপ্রিয় বিবরণে, প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে, ‘কোপার্নিকাসবাদ’ এবং মহাজাগতিক স্তরে আরো বহু পৃথিবী ও প্রাণের অস্তিত্ব সমর্থন করার জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। এছাড়া তাকে মুক্ত চিন্তার জন্য শহীদ এবং আমাদের মহাবিশ্ব সংক্রান্ত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির একজন আদি, নির্যাতিত প্রস্তাবক হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে, ক্যাথলিক চার্চের ইনক্যুইজিশন যাকে তার এই বিশ্বাসের কারণে নাকি পুরো ইউরোপ জুড়ে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল, এবং পরিশেষে যাকে জনসমক্ষে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয়েছিল। তিনি নতুন ধারণার প্রতি কর্তৃপক্ষের চিরন্তন অসহিষ্ণুতার একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তবে, এই বিবরণগুলো  জিওয়ার্ডানো ব্রুনোর ঘটনাটির দুটি মৌলিক দিক উপেক্ষা করেছিল, যা বিষয়টির উপর ভিন্ন ধরনের অর্থ একটি আরোপ করেছিল। প্রথমটি হচ্ছে সেই সংশয়, আসলেই আমরা কতটা আন্তরিকভাবে মনে করি যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস, এবং এছাড়া যা ‘বৈজ্ঞানিক বিপ্লব’ নামে পরে পরিচিতি পেয়েছিল, তার সাথে  ব্রুনোকে যুক্ত করা যেতে পারে, আর দ্বিতীয়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তার জীবনের অনস্বীকার্য সেই ট্রাজেডিটিকে, যা তাকে প্রতীক নয়, বরং ভারসাম্যে তাকে আরো মানবিক করে তোলে।

ব্রুনোর জীবন নিয়ে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হচ্ছে যে, আমরা আসলেই জানি না, তার বিরুদ্ধে আনীত ধর্মদ্রোহিতা বা হেরেসির অভিযোগটির সঠিক ভিত্তিটি কি ছিল  আর এর সহজ কারণটি হচ্ছে এই সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক সব দলিলপত্র হারিয়ে গেছে। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরবর্তীতে গ্যালিলেওর বিখ্যাত বিচারকার্য থেকে, আমাদের কাছে যে বিচার প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ আছে।  ব্রুনোর ক্ষেত্রে আমাদের সেই বিষয়গুলো খুঁজতে হবে সমসাময়িক বিবরণে এবং তার লেখা পর্যালোচনা করে। আমরা জানি না ঠিক কি কারণ ব্রুনোকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। তার রায়ের আদেশের যে কাগজ এখনও টিকে আছে সেটি ধর্মদ্রোহিতার আটটি পৃথিক অভিযোগ তালিকাভুক্ত করেছিল, যা তিনি প্রত্যাহার করে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, কিন্তু রোম থেকে তার চূড়ান্ত বিচারের বিস্তারিত দলিলটি হারিয়ে গিয়েছিল যখন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ভ্যাটিকান আর্কাইভ লুট করেছিলেন এবং এর একটি অংশ প্যারিসে স্থানান্তরিত করেছিলেন, সুতরাং এই সব কাগজ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্ধারণ করার ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এইসব কাগজ থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে তার বিশ্বতত্ত্ব ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে তার অপরাধের তালিকার সামান্য একটি অংশ গঠন করেছে।

তিনি বহু বিষয় নিয়ে লিখেছিলেন, যা বর্তমানে শুধুমাত্র গবেষকদের আগ্রহের বিষয় হিসাবে সীমিত ( প্রধানত, নিওপ্লেটোনিজম, হার্মেটিকাল দর্শন, সর্বপ্রাণবাদ এবং সর্বেশ্বরবাদ)। তবে তার লেখাগুলোর মধ্যেও কোপানির্কাসবাদের একটি প্রচার ও প্রাণবন্ত সমর্থন এবং একটি দাবী ছিল – নক্ষত্রগুলো আমাদের মতই অসীম সংখ্যক সূর্য যাদের প্রতিটিকে আবর্তন করছে আমাদের মত বুদ্ধিমান সত্তা অধ্যুষিত বহু পৃথিবী। ডেম ফ্রান্সিস ইয়েটস, বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি-ভাষায় নের্তৃস্থানীয়  ব্রুনো গবেষক তার “জিওর্ডানো ব্রুনো অ্যান্ড হারমেটিক ট্র্যাডিশন” (১৯৬৪) বইয়ে লিখেছিলেন: “চিন্তা আর বিজ্ঞানের ইতিহাসের ক্ষেত্রে ব্রুনো প্রধানত স্মরণীয়, শুধুমাত্র তার কোপারনিকাস তত্ত্বটি গ্রহন করে নেবার কারণে নয়, বরং আরো বেশি তার কল্পনার বিস্ময়কর অতিক্রমণের জন্য – যার দ্বারা তিনি তারা কোপার্নিকাসবাদের সংস্করণে অনন্ত সংখ্যক মহাবিশ্বের ধারণা সংযুক্ত করেছিলেন, যা ছিল তত্ত্বটির একটি সম্প্রসারণ যা কোপার্নিকাস নিজে প্রস্তাব করেননি”। যদিও এই সম্প্রসারণের উৎস আর উদ্দেশ্য ছিল বেশ ভিন্ন।

শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ ছাড়া তার লেখার  আজ কোনো কিছুই আমদের কৌতূহলী করে না, তার অধিকাংশ কাজের সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আসলেই ব্রুনো কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন না, এবং তিনি এই বিষয়ে যা কিছু লিখেছিলেন সেটি এই বিষয়ে তার উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করেছিল। তার “অন দ্য ইনফিনিট ইউনিভার্স অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড” (De l’Infinito Universo et Mondi) বইটির মূল ভাবনা কোপার্নিকাসবাদ নয়, বরং সর্বেশ্বরবাদ এবং সর্বপ্রাণবাদ, যে ধারণাটি তিনি আরো বিস্তারিত করেছিলেন তার “দি অ্যাশ ওয়েনেসডে সাপার” (La Cena de le Ceneri) বইয়ে। অন্তত তার আধুনিক পাঠকদের কাছে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে,  তার ব্যক্তিগত বিশ্বতত্ত্ব কোপার্নিকাসের ধারণা দ্বারা সমর্থিত হয়েছিল, এর বিপরীতটি নয়। তার বেশির ভাগ কাজই মূলত ধর্মতাত্ত্বিক এবং  যা মূলত ছিল চার্চের আধ্যাত্মিক শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তির প্রতি আবেগময় সম্মুখ আক্রমণ, বিশেষ করে মানব পরিত্রাণ এবং আত্মার শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃতি নিয়ে ( অথবা আধুনিক অর্থে, তিনি চার্চের আধ্যাত্মিকতাবাদের বিরোধিতা করেছিলেন অনুশোচনাহীন, সর্বব্যাপী বস্তুবাদ দিয়ে)। কোপার্নিকাসের পদ্ধতিটি যেখানে সেটি আদৌ প্রবেশ করেছিল, সেটি এর মূল ভাব নিয়ে নয় বরং সহায়ক একটি পার্শ্বধারণা হিসাবে। তারা “অ্যাশ ওয়েনেসডে সাপার” বইতে আমরা কোপার্নিকাস সংক্রান্ত তার সংস্করণটি পূর্ণ প্রকাশ খুঁজে পাই, এবং এই কাজটি উন্মোচন করেছিল যে, যা কিছু তিনি জানতেন তার অধিকাংশ আপাতদৃষ্টিতে পরোক্ষ উৎস থেকে এসেছিল, এবং যা সঠিক ছিল না অথবা অন্ততপক্ষে বিশেষ কিছু জ্যোর্তিবিজ্ঞান সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে তিনি সংশয়গ্রস্ত ছিলেন। আধুনিক পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে তার তথাকথিত জ্যামিতিক প্রকাশ অনুসরণ করা কঠিন, আর এর কারণ সেই সময় আর এই সময়ের শৈলীগত ভিন্নতা নয়, বরং এর কারণ, মূলত,সেগুলো জ্যামিতিকভাবেই বোধগম্য নয়। গাণিতিক যুক্তির প্রতি তিনি ( এবং গণিতবিদদের প্রতি) সুস্পষ্ট ঘৃণা প্রদর্শন করেছিলেন, এবং আপাতদৃষ্টিতে মাঝে মাঝেই তিনি কোপার্নিকাসকে ‘হার্মেটিক’ দার্শনিক হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। এই অর্থে  ব্রুনো কোপার্নিকাসের পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তার অনুবাদক গোসেলিন ও লার্নারের শব্দ ব্যবহার করে. “একটি বিশাল রূপকার্থে” , মহাবিশ্ব সম্বন্ধে তার পূর্ব-নির্ধারিত উপসংহারগুলো সমর্থন করার উদ্দেশ্যে। ব্রুনোকে নিয়ে চার্চের অভিযোগ জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে নয়, বরং তার ধর্মতত্ত্ব নিয়ে। আর কোপার্নিকাসের ধারণাটি এখানে মূল সমস্যা ছিল না, চার্চের আপত্তির উৎস ছিল এটি তিনি কোথায় নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন।

কোপার্নিকান পদ্ধতি যে অসীম সংখ্যক মহাবিশ্বের সম্ভাবনার অনুমতি দেয় সেটি শনাক্ত করার জন্য ব্রুনোকে প্রায়শই স্বীকৃতি দেয়া হয় । বাস্তবিকভাবে, সেই ধারণাটি যে, একটি সূর্যকেন্দ্রিক ( হেলিওসেন্ট্রিক) সৌরজগতের বর্ণনা অসীম মহাবিশ্বের অস্তিত্বের অনুমতি দেয় (অথবা অন্ততপক্ষে সম্ভাবনাটিকে বাতিল করে না) সেটি প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন ১৫৭৬ সালে টমাস ডিগেস তার  “এ পারফিট ডেসক্রিপশন অব সেলেস্টিয়াল অরবেস” বইতে, যেখানে ডিগেস কোপার্নিকান পদ্ধতি উপস্থাপন করেছিলেন এবং সম্প্রসারণ করেছিলেন, মহাবিশ্ব যে অসীম এমন একটি ধারণা প্রস্তাবনাসহ। আবার অসীম সংখ্যক মহাবিশ্বের ধারণাটিও ডিগেসের মৌলিক ছিল না, কারণ এর একাধিক ঐতিহাসিক পূর্বসূরি ছিল, বিশেষ করে পঞ্চদশ শতাব্দীতে নিকোলাস অব কুসা এবং খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে পরমানুবাদী লুক্রেশিয়াস ( যাদের দুজনের কথাই ব্রুনো অনিয়মিতভাবে তাদের কাজে উল্লেখ করেছিলেন)। ব্রুনোর দুটি কাজ মহাবিশ্ব সংক্রান্ত তার দৃষ্টিভঙ্গিটিকে ব্যাখ্যা করেছিল, “দ্য অ্যাশ ওয়েনেসডে সাপার” এবং “অন দি ইনফিনিট ইউনিভার্স অ্যান্ড ওয়ার্ল্ডস”, ডিগেসের বইটি প্রকাশনার আট বছর পরে ১৫৮৪ সালে প্রকাশ হয়েছিল, ব্রুনো যখন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন। যদিও এমন কোনো প্রামাণিক দলিল নেই যা প্রমাণ করে ডিগেস ও ব্রুনো, দুজনের দেখা হয়েছিল, তবে ডিগেসের কাজ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল এবং ব্রুনো সম্ভবত তার ধারণাটির সংস্পর্শে এসেছিলেন রানি প্রথম এলিজাবেথের ইংল্যান্ডে বুদ্ধিজীবি বলয়ে সময় কাটানোর সময়। তবে নিশ্চিতভাবেই ব্রুনো ডিগেস থেকে আরো অগ্রসর হয়েছিলেন একটি অসীম মহাবিশ্বের কিছু তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে, কিন্তু এমন কিছু বলা যে এই ধারণাটি ব্রুনো প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন সেটি সঠিক নয়।

আর হেরেসি বা ধর্মদ্রোহিতার জন্য ব্রুনোর অভিযোগ ও দণ্ডাদেশে কোপার্নিকাসের পদ্ধতি যে খুবই ক্ষুদ্র একটি ভূমিকা পালন করেছিল সেই বিষয়ে আরো প্রমাণ এসেছে কোপার্নিকাসের কাজ নিয়ে সমসাময়িক আলোচনার দলিল থেকে। আপাতদৃষ্টিতে লোকপ্রিয় বহু বিবরণ যা লক্ষ করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেটি হচ্ছে  ব্রুনোর মৃত্যুর বেশ পরে চার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কোপার্নিকাসবাদের নিন্দা করেছিল। যদিও কোপার্নিকাসের পদ্ধতিটি  ব্রুনোর সময় একটি আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় ছিল, কিন্তু খুব কম সংখ্যক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ১৬০০ সালে এটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন ( এর প্রধান কারণ ছিল তখন এর সপক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না), এবং ক্যাথলিক চার্চও ১৬১৬ সালের আগে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করেনি। সেই সময় নাগাদ, টেলিস্কোপের মাধ্যমে কিছু গ্যালিলেওর কিছু পর্যবেক্ষণ ( একই সময়ে যা আরো কয়েকজনই সেটি করেছিলেন, কিন্তু আমরা মূলত গ্যালিলেওর নামের সাথে বেশি পরিচিত) বৌদ্ধিক দৃশ্যপটকে রূপান্তরিত করতে শুরু করেছিল। এবং তখনই শুধুমাত্র চার্চ বাধ্য হয়েছিল ক্রমশ বাড়তে থাকা এই বিতর্কে একটি অবস্থান নিতে।

এই বিষয়টি মূলত সামনে এসেছিল ক্যাথলিক যাজক পাওলো আন্টোনিও ফসকারিনির (১৫৬৫-১৬১৬) একটি বই প্রকাশের পরে, যা কোপার্নিকাসের পদ্ধতিকে সমর্থন করেছিল ভ্রাম্যমান যাজক সন্ন্যাসীদের উত্থাপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে যে, এটি বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক। ফসকারিনি এই প্রকাশনা বিষয়টিকে ধর্মতাত্ত্বিক ভাষায় সমস্যাটিকে উত্থাপন করেছিল, যা চার্চ আর উপেক্ষা করতে পারেনি। যদি কোপার্নিকাসবাদ আসলেই মূল কারণ হয়ে থাকে ১৬০০ সালে ব্রুনোকে ধর্মদ্রোহী হিসাবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার, তাহলে এই পদ্ধতিকে সেই সময়ে সুস্পষ্টভাবে চার্চ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ব্রুনোকে দণ্ডিত করা ক্যাথলিকদের ধর্মীয় আদালতটির প্রধান বিচারক ছিলেন একজন জেসুইট ধর্মতাত্ত্বিক, রবার্ট বেলারমিন (১৫৪২-১৬২১) ( যাকে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চার্চের ‘হাতুড়ি’ হিসাবে চিহ্নিত করা হতো)। তিনি সেই সময়ের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজিয়াম রোমানামের প্রধান ছিলেন। তাকে ১৬১৬ সালে পোপ পঞ্চম পল ফসকারিনি কেসটির ক্ষেত্রে কোপার্নিকাসের পদ্ধতিটি পরীক্ষা করে দেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন, এবং তিনি ঐ একই বছর গ্যালিলেওকে একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সময় নিষেধ করেছিলেন এই ধারণাটি ধারণ ও সমর্থন না করতে ( এই  সাক্ষাতে খুঁটিনাটি কি আলোচনা হয়েছিল বা হয়নি সেটি ১৬৩৩ সালে গ্যালিলেওর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তি রচনা করেছিল)। বেলারমিনের কোনো লেখাই কিন্তু ১৬১৬ সালে এই বিষয়ে ব্রুনোর আগের কেসটি বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেনি। যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে ব্রুনোর বিচারকার্যে কোপার্নিকাসবাদ মূলত কোনো ভূমিকাই রাখেনি।

এছাড়াও এমনকি ১৬১৬ সালেও কোপার্নিকাসবাদ সুনির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি। বেলারমিনের পর্যালোচনা ও প্রতিবেদনের পরও, কোপার্নিকাসের ডে রেভ্যুলুশনিবাস (De Revolutionibus) এবং ফসকারিনির বইটি (এবং আরো কিছু বইয়ের সাথে) ‘ইনডেক্স অব ফরবিডেন বুকস’ বা নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় রাখা হয়েছিল। কোপার্নিকাসের বইটি এই তালিকায় ছিল যতদিন না সুনির্দিষ্ট কিছু সম্পাদনা করা হয়েছিল, কিন্তু সার্বিকভাবে তার মূল ধারণাটি অক্ষত ছিল ( কিছু শব্দ এবং অনুচ্ছেদ বাতিল করার পরে)। এটি অবশ্যই আনুষ্ঠানিক একটি প্রতিক্রিয়া, কিন্তু তারপরও এটি অবশ্যই সার্বিকভাবে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা থেকে বহু দূরবর্তী একটি অবস্থান ছিল। ১৬১৬ সালে ৫ মাচ ইনডেক্স নির্ধারণ করার সম্মেলনের একটি ঘোষণায় ধারণাটিকে “মিথ্যা এবং ধর্মীয় গ্রন্থ বিরোধী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, কিন্তু ভুল বা ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসাবে নয়। আর সেকারণেই নির্দেশিত সংশোধনীসহ কোপার্নিকাসের বইটির সম্পাদিত অনুলিপিগুলো ১৬১৬ সালের পরে প্রকাশিত হয়েছিল। এবং পরিস্থিতি যথেষ্ট পরিমানে অস্পষ্ট ছিল যে গ্যালিলেও মনে করেছিলেন যতদিন তিনি কোপার্নিকাসের পদ্ধতিকে একটি “হাইপোথিসিস” হিসাবে বিবেচনা করবেন তিনি তার কাজ অব্যাহত রাখতে পারবেন কোনো সমস্যা ছাড়া, অবশ্য ১৬৩৩ সালে তার বিচারকার্য বিষয়টিকে থামিয়ে দিয়েছিল। যদি ব্রুনোকে কোপার্নিকাসবাদের কারণে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হতো তাহলে চার্চের অবস্থান নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকতো না। চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞাটা আসেনি ১৬৬৪ সালের আগে, যখন পোপ সপ্তম আলেক্সান্ডার পোপের নির্দেশনা (বুল) জারি করে সাধারণভাবে হেলিওসেন্ট্রিজমের ধারণাটিকে দণ্ডিত করেছিলেন, সুস্পষ্টভাবে “যে বইগুলো পৃথিবীর স্থির নয় এই ধারণা প্রচার করে” সেগুলো নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ( উল্লেখ্য গ্যালিলেও মারা গিয়েছিলেন ১৬৪২ সালে)। এই চূড়ান্ত দণ্ডটি – কিন্তু শেষ কথা নয় । আর চার্চের বাইরে বুদ্ধিজীবি সমাজ যে এগিয়ে গিয়েছিল সেটি প্রদর্শন করে সেই সত্যটি, নিষেধাজ্ঞা জারি হবার দুই বছর পর, ১৬৬৫ আর ১৬৬৬ সালে প্লেগ মহামারির প্রাদুর্ভাবের সময় ইংল্যান্ডে আইজাক নিউটন, কেমব্রিজ থেকে নিজ বাড়িতে মূলত কোয়ারান্টাইনে থাকার সময় ক্যালকুলাস, অপটিক্স, মেকানিক্স এবং মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে তার যুগান্তকারী কাজগুলো করেছিলেন, আর সেটাই অ্যারিস্টোটালীয় বিশ্বসংক্রান্ত  দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে অবশেষে বিশ্রাম দিয়েছিল। 

ব্রুনো জীবনের দ্বিতীয় এবং প্রায়শই উপেক্ষা করা হয় একটি সত্য ১৫৭৬ থেকে ১৫৯১ সালের মধ্যবর্তী ইটালী থেকে তার নির্বাসনপর্ব সম্পর্কিত। অধিকাংশ সংক্ষিপ্ত বিবরণ ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় তার ভ্রমণের শুধুমাত্র আবশ্যিক তথ্যগুলো দিয়েছে, কিন্তু এইসব বিবরণে যা উহ্য ছিল সেটি হচ্ছে তার এই শহর থেকে শহরে স্থান পরিবর্তনগুলোর কারণ কিন্তু ইনক্যুইজিশনের গ্রেফতার এড়ানোর প্রচেষ্টা ছিল না, এর কারণ মূলত ছিল তার নিজের সমস্যাজনক ব্যক্তিত্ব। যদিও ব্রুনো সহানুভূতিশীল পৃষ্ঠপোষক খুঁজে বের করতে কিছু সময়ের জন্য বেশ সফল হয়েছিলেন, যারা তাকে সহায়তা করেছিল, কিন্তু প্রতিবারই তিনি এমন কিছু করতেন যেগুলো সেই পৃষ্ঠপোষকদের সাথে তার সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট করতো, প্রায়শই তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অধীনে প্রবেশ করার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি তাদের ক্ষোভের কারণ হতেন। ইনক্যুইজিশনের এর সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না, কারণ যে মুহূর্ত তিনি ইটালি ত্যাগ করেছিলেন, তিনি তাদের আওতার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। আর যখন তিনি ফরাসী রাষ্ট্রদূতের সুরক্ষায়  প্রথম এলিজাবেথের রাজত্বকালে প্রটেষ্টান্ট ইংল্যান্ডে এবং প্রটেষ্টান্ট জার্মানীতে অবস্থান করছিলেন এটি বিশেষভাবে সত্য ছিল।

তার নির্বাসন-পর্ব মূলত ধারাবাহিক দূর্ভাগ্যের কাহিনি, যার অধিকাংশেরই কারণ তিনি নিজেই, সহানুভূতিশীল পৃষ্ঠপোষকদের শক্রতে রূপান্তরিত করতে তিনি সফল হয়েছিলেন, যে পৃষ্ঠপোষকরা হয়তো তাকে ভবিষ্যতের এমনকি আরো বড় বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারতেন। তার বক্তৃতা এবং লেখায় তিনি তার উল্লেখযোগ্যমাত্রার অভিব্যক্তিপূর্ণ দক্ষতায় তিক্ততাপূর্ণ কটুবাক্য ব্যবহারে নিজেকে প্রায়শই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, বিশেষ করে যারা তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতেন তাদের অপমান করার করতে তিনি, গাধা, শূকর, জানোয়ার, নির্বোধ, মাথামোটা ইত্যাদি নানা শব্দ ব্যবহার করতেন। একই সাথে তিনি সবসময়ই তার নিজের ধারণাগুলো নিয়ে অতি আত্মম্মন্যতা প্রকাশ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি, নিজের ধারণাগুলোকে বর্ণনা করতে তিনি বহু অহংকারী উদ্ধত শব্দ ব্যবহার করতেন ( ব্রুনোর এই অতিরঞ্জিত আত্ম-মূল্যায়ন মাঝে মাঝেই বেশ অস্বস্তিকর মনে হতে পারে তার পাঠকদের কাছে)। এই সময়ে তার কার্যকলাপগুলো নিবুদ্ধিতার অভ্রান্ত চিহ্ন বহন করছে, বিশেষ করে যুক্তিসঙ্গত বিকল্প থাকা সত্ত্বেও নিজ স্বার্থে পদক্ষেপ নিতে তার পৌনঃপুনিক ব্যর্থতায় যা সুস্পষ্ট। অবশেষে ইটালিতে তার প্রত্যাবর্তন ( এক বছরের মধ্যে ভেনিসে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল) মূলত প্রণোদিত করেছিল আংশিকভাবে সেই বাস্তবতাটি – ১৫৯১ সাল নাগাদ তিনি কার্যত তার ফেলে আসা সব সম্পর্কই চূড়ান্তভাবে নষ্ট করে ফেলেছিলেন, এবং ফিরে আসা ছাড়া তার কিছুই করার ছিল না। আর সে কারণে তিনি সেই নিমন্ত্রণ গ্রহন করেছিলেন যা তাকে অবশেষে ইনক্যুইজিশনের হাতে তুলে দিয়েছিল। বহু উপায়েই  ব্রুনো নিজেকেই সেই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিলেন, যা ১৬০০ সালে ফেব্রুয়ারী মাসের ১৭তম দিনে যা কাম্পো ডেই ফিয়োরেতে শীতের আকাশ প্রজ্জ্বলিত করেছিল।

সন্দেহ নেই ব্রুনো ছিলেন মেধাবী, তবে কলহপ্রিয় এবং পরিশেষে আত্ম-বিনাশী। তার লেখায় এমন কিছুই ছিল না যা কিনা কোনোভাবে আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্যভাবে কোনো অবদান রাখতে পারে এবং বাস্তবিকভাবেই জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত তার লেখায় বিষয়টি সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তার উপলব্ধির দুর্বলতা প্রকাশ করেছিল। বর্তমানে তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ বহুলাংশে (আরো বেশ কিছু কারণের মধ্যে) কোপার্নিকাসবাদের প্রতি তার উচ্চকণ্ঠ সমর্থন দেবার কারণে , যে ধারণাটি পরবর্তীতে বিশ্ব সংক্রান্ত আমাদের বর্তমান ধারণা কেন্দ্রীয় অন্তর্দৃষ্টিতে পরিণত হয়েছিল। এছাড়া, তার “অন দ্য ইনফিনিট ইউনিভার্স অ্যান্ড ওয়ার্ল্ডস” বইটি অনেকের কাছে এখনও আবেদন ধরে রেখেছে, কারণ এটি তাদের গভীরভাবে লালিত “মহাবিশ্বের অন্যত্র জীবনের অস্তিত্ব আছে” বিশ্বাসটির সাথে অনুরণিত হয়েছিল, যদিও সেই বাস্তব সত্যটি সত্ত্বে, পৃথিবী-বহির্ভূত জীবনের সমর্থকরা এর দুর্বোধ্য পাতাগুলোয় খুব সামান্য কৌতূহলোদ্দীপক কিছু খুঁজে পাবেন। এই ধারণাটি মৌলিকভাবে ব্রুনোর নয়, কিন্তু কোপার্নিকাসের তত্ত্ব সংক্রান্ত সীমিত উপলব্ধিসহ যুক্তির দ্বারা এটি বেশ প্রাণবন্তভাবে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন । তার সময়ে প্রতিষ্ঠিত শাসক কর্তৃপক্ষের দ্বারা তার বিশ্বাসের দণ্ড হিসাবে তিনি যে ভয়ঙ্করভাবে সহিংস একটি পরিণতিতে উপনীত হয়েছিলেন, এটি তার রহস্যময়তাকে ক্ষুন্ন করেনি।

বাস্তবিকভাবে ব্রুনোর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো বেশ অসংগঠিত ও অসম্পূর্ণ এর প্রকৃতিতে, যার ভিত্তি মূলত তার সজ্ঞা, কোনো সঠিক গণিত তার ধারণাগুলো সমর্থন করেনি, এবং তিনি প্রাচীন ম্যাজিক নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, যেভাবে তিনি পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী ছিলেন ( এই বাস্তবতাটি কসমসে তার সংক্ষিপ্ত কল্পিত জীবনী থেকে সতর্কভাবে অপসারণ করা হয়েছিল)। ব্রুনো নিয়ে ইয়েটসের অধ্যয়ন গুরুত্বারোপ করেছিল রেনেসার গুপ্তবিদ্যাসংক্রান্ত চিন্তার ইতিহাসে তার অবস্থানের উপর, যা একটি ঐতিহ্যের ধারা অংশ ছিল রামোন লুলের সময় থেকে যা বিস্তৃত ( যার স্মরণশক্তির কৌশলের উপর ব্রুনো আরো বিস্তারিত একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন) ছিল রোসিক্রুসিয়ান এবং তাদের ছাড়িয়ে আরো বহুদূর অবধি। এবং ইয়েটসের প্রভাব মূলত অবদান রেখেছে বিংশ শতাব্দী শেষাংশে তার সম্বন্ধে বিদ্যমান সেই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে যে, তিনি একজন ম্যাগাস ও হারমেটিস্ট। তবে আরো সাম্প্রতিক অধ্যয়নগুলো এই ভারসাম্যটিকে খানিকটা হেলিয়ে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক ধারণার বিকাশে ব্রুনোর ভূমিকার প্রতি, যদিও ব্রায়ান কক্স, যিনি ব্রুনোর “নাটকীয় মৃত্যু” কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন তার বিখ্যাত হিউম্যান ইউনিভার্সের প্রথম অধ্যায়ে (২০১৪) তিনিও বাধ্য হয়েছিলেন স্বীকার করে নিতে যে বিজ্ঞানে তার অবদান প্রশ্নবিদ্ধ। প্রোটো বা আদি বিজ্ঞানীর চেয়ে বরং তিনি অনেক বেশি বেপরোয়া একজন মুক্তচিন্তক ছিলেন।

ঐতিহাসিক  ব্রুনোকে তার জীবন ও কাজের পরবর্তী গ্রাসকৃত রূপগুলো পৃথক করা খুব জটিল, সেকারণে – যদিও সেটি তিনি আসলেই কি বিশ্বাস করতেন এই  প্রশ্নটির উত্তর দেবার মত জটিল নয়। তিনি একজন অতিপ্রজ লেখক ছিলেন, যিনি হাস্যরসাত্মক নাটক এবং দার্শনিক সংলাপ লিখেছিলেন কথিত ইটালিয় ভাষায়, এবং বিশাল কবিতা আর গণিতের বই লিখেছিলেন ল্যাটিন ভাষায়। “জিওয়ার্ডানো ব্রুনো লেখার বিস্ময়কর বৈচিত্র্য প্রদর্শন করে মহাবিশ্ব নিয়ে ধারণাগুলো প্রকাশ করার বিষয়টি তিনি কতটা কষ্টসাধ্য অনুভব করেছিলেন”, ইংরেজি ভাষায় লেখা তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক জীবনীকার, ইনগ্রিড ডি রোলল্যান্ড তার “জিওর্ডানো ব্রুনো: ফিলোসফার/হেরেটিক” বইয়ে (২০০৮) এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন। তার প্রথম দিককার কাব্য নাটকের শিরোনাম, “দ্য কান্ডলমেকার” (১৫৮২) তিনি নিজেকে “ ব্রুনো দ্য নোলান” হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, যে কিনা “নো একাডেমির শিক্ষক”, যার ডাক নাম, “বিরক্ত বা হতাশ কেউ”। নির্বাসনকালীন তার পুরো জীবনে, তিনি তার জন্মশহরের প্রতি স্মৃতিবেদনাময় একটি আনুগত্য ধরে রেখেছিলেন, তার লেখায় তার দ্বিতীয় সত্তাকে তিনি “দ্য নোলান” এবং বিশেষ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিটি, যা তিনি লালন করেছিলেন এবং তার পুরো লেখক-জীবনব্যাপী পরিশীলিত করেছিলেন সেটিকে “নোলান দর্শন” নামে তথ্যনির্দেশ করেছিলেন।

আর এই দর্শনটি আসলে কি সেটি খুব সহজে সংক্ষেপিত করা মুশকিল, যদিও আমার তার লেখা থেকে জানি, যেমন “দ্য অ্যাশ ওয়েনেসডে সাপার” (১৫৮৪), এবং “অন দ্য ইমেন্স অ্যান্ড নাম্বারলেস” (১৫৯১) বইয়ে বর্ণিত তার অসীম মহাবিশ্বের তত্ত্বটি অনুপ্রাণিত করেছিলেন কোপারনিকাস ও নিকোলাস অব কুসা – তিনি অনুভব করেছিলেন যাদের ধারণাগুলো, যতটুকু গভীরে যাওয়ার দরকার ছিল ততটুকু যায়নি। তিনি সন্দেহাতীতভাবে দর্শনের শিক্ষায় লার্নড ম্যাজিকে বিশ্বাস করতেন, তিনি তার “অন দ্য ট্রিপল মিনিমাম” (১৫৯১) বইয়ে প্রস্তাব করেছিলেন যে, ক্ষুদ্র কণাদের দিয়ে তৈরি হয় মহাবিশ্ব, তিনিও যাদের “অ্যাটম” বলে চিহ্নিত করেছিলেন, ঈশ্বর বা দেবত্ব বলতে তিনি বুঝতেন একটি একটি নিরীহ প্রাণসঞ্চারণ শক্তি যা কল্পিত স্থির নক্ষত্রের বলয়ের বাইরে কোথাও নয়, বরং অসীম মহাবিশ্বের প্রতিটি গঠনকারী অংশে যা খুঁজে পাওয়া যায়।

“অস্তিত্বের মূলনীতি, প্রতিটি প্রজাতির উৎস,
মন, ঈশ্বর, সত্তা, এক, সত্য, নিয়তি, যুক্তি”।

ট্রিনিটি আর খ্রিষ্টের ঈশ্বরত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে তার বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে, তার ঈশ্বর সংক্রান্ত এই দৃষ্টিভঙ্গিটির আবশ্যিকভাবে একটি ইঙ্গিত ছিল। আর তার ধর্মদ্রোহিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর একটি, যার কারণে তাকে ভেনেশিয়ান ইনক্যুইজিশনের সামনে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দাড়াতে হয়েছিল।

“কার্যত, আমার মনে সেই সন্দেহ আছে পুত্র আর পবিত্র আত্মা (পারসন) শব্দটির ব্যাপারে, কারণ কখনোই আমি তাদের পবিত্র পিতা থেকে ভিন্ন ‘পারসন’ হিসাবে বুঝতে পারিনি”। (একজন পারসন হচ্ছে এমন কেউ যনি নিজেই সম্পূর্ণ কিন্তু এমন কেউ তার সম্পর্কগুলো দিয়ে তৈরি)।

যদিও  ব্রুনোর বিচিত্র বিষয়ে লেখাগুলো পুরোপুরিভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ সংলগ্ন রূপ পায় না, আমরা তারপরও  সেখানে সেই ধারণাগুলোর বীজের উপস্থিতি টের পাই যা পরবর্তী চিন্তাবিদরা আরো বিকশিত করেছিলেন । কিন্তু ‘নোলান’ দর্শন মূলত একটি সমন্বয়বাদী, সহিষ্ণু বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, এবং ব্রুনো এটি নিয়ে বেশ বড় একটি কল্পনা লালন করেছিলেন: তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্ব আর ঈশ্বরের ঐক্য সংক্রান্ত তার ধারণাগুলো, যা ক্যাথলিক আর প্রটেষ্টান্টদের মধ্যকার মনগড়া বিভাজনের সীমাতিক্রম করে গেছে, সেটি হয়তো তার সমকালীন ইউরোপকে খণ্ড-বিখণ্ড করা ধর্মীয় সংঘর্ষগুলো সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে – শুধুমাত্র যদি তিনি একজন সমকালীন শাসককে খুঁজে পেতেন, যিনি কিনা তার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতেন এবং সমর্থন করতেন। এমন একটি ভূমিকা গ্রহন করার জন্য বিভিন্ন সময়ে, বইয়ের উৎসর্গপত্রে এবং তার কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসার মাধ্যমে ব্রুনো ফ্রান্সের অষ্টম হেনরি, ইংল্যান্ডের প্রথম এলিজাবেথ ও হলি রোমান সম্রাট দ্বিতীয় রুডোলফকে তোষামোদ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যদিও তিনি সীমিত পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন, তাদের কেউই তার প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারেননি। অবশেষে, তার বৈশিষ্ট্যসূচক আত্মবিশ্বাসের সাথে, আপাতদৃষ্টি মনে হয়েছিল তিনি তার ধারণাগুলো একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছেন।

১৫৯১ সালে যখন ব্রুনো যখন ইটালি ফিরে এসেছিলেন, তার অবশিষ্ট শুভাকাঙ্খীদের উপদেশ উপেক্ষা করে, তিনি ভেনিসে তার পরিচিত একজন ডোমিনিকান যাজকের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, এবং ফ্রায়ারকে বলেছিলেন, তিনি একটি বই প্রস্তুত করতে  যাচ্ছেন যা নতুন পোপ অষ্টম ক্লেমেন্টের প্রতি তিনি উৎসর্গ করবেন। চার্চ থেকে বহিষ্কৃত নির্বাসিত একজন, যার প্রতি এমনিতেই ইনক্যুইজিশনের সন্দেহজনক নজর ছিল, তিনি কিনা বিশ্বাস করেন, ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিটি তার সম্পূর্ণ ধর্মতত্ত্ব পনুর্বিবেচনা ও সংশোধন করবে। স্পষ্টতই ব্রুনো এমন উদ্ধত পূর্বধারণা করা প্রায় পাগলামীর পরিচায়ক। কিন্তু ব্রুনোর সম্ভবত তার নিজের ধারণার উপর সেই শ্বাসরূদ্ধকর আত্মবিশ্বাস ছিল, যা প্রায়শই তার চারপাশের মানুষরা ঔদ্ধত্য আর অহমিকা হিসাবে ব্যাখ্যা করতেন। তার জীবনীকার ইয়েটস এমনকি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এটি হয়তো তার এক ধরনের ম্যানিয়া বা উন্মত্ততা ছিল: “তাদের লক্ষ পূরণের তাড়না,  অথবা তাদের অতিআত্মম্মন্যতা, অথবা তাদের সর্বক্ষণ বসবাস করা সেই প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীনতার মত একধরনের আনন্দ-চঞ্চল পরিস্থিতি – যা জিওর্ডানো ব্রুনোর মত মানুষদের সব ধরনের বিপদের ধারণা থেকে অনাক্রম্য করে তুলতে পারে”।

পোপের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবার ব্যপারে ব্রুনোর আশাবাদী হবার কিছু ভিত্তি ছিল।: পোপ ক্লেমেন্ট তার অতীত পূর্বসূরিদের চেয়ে সার্বিকভাবেই বেশি উদারনৈতিক হিসাবে বিবেচিত ছিলেন, এবং একই বছর আরেকজন সমমনা ইটালিয় হারমেটিস্ট ফ্রানচেস্কো পাটরিৎসি এবং হারেমটিক ধর্মীয় দর্শনের একটি বই উৎসর্গ করেছিল পোপের প্রতি, এবং রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা পদ দিয়ে যাকে পুরষ্কৃত করা হয়েছিল। ((হারমেটিসিজম হচ্ছে একগুচ্ছ দার্শনিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস যা মূলত নির্ভরশীল হার্মিস ট্রিসমেজিসটাসের লেখা। এই আন্দোলনটি সূচনা হচ্ছে প্রথম শতাব্দীতে আলেক্সান্ড্রিয়ায়, যেখানে এটি ইহুদি, খ্রিষ্টীয় অতীন্দ্রিয়বাদের নানা অংশগুলো হেলেনিস্টিক দার্শনিক ও মিসরীয় গুপ্তবিদ্যা সাথে মিশ্রিত হয়েছিল। পরিণতিতে একটি মিশ্রধারা যা একই সাথে আকর্ষণ করেছিল মধ্যযুগের সূচনাপূর্বে মুসলিম পণ্ডিত এবং রেনেসাঁর সূচনায় ইউরোপিয় বুদ্ধিজীবিদের। মূলত, মহাবিশ্বের ধারণা, যে মহাবিশ্বটি শৃঙ্খলাপূর্ণ মূলনীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, এই ক্ষেত্রে এটি প্রতিধ্বনিত্ব হয় সব কিছু গঠনকারী উপাদানে মহাজাগতিক কম্পনে।, এটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ ছিল পশ্চিমা ওকাল্টিজমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, একই সাথে এটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশে সহায়তা করেছিল। এই সংযোগ সুস্পষ্ট হেরমেটিকাল ও আলকেমিকাল বইগুলো লেখা হয়েছিল সেই সময়ের প্রভাবশালী বহু চিন্তাবিদদের যেমন জিওয়ার্ডো ব্রুনো, জন ডি, ফ্রান্সিস বেকন ও আইজাক নিউটন।))

হয়তো এই হারিয়ে যাওয়া বইটি হয়তো নোলান দর্শনের একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয়বাদী বিবরণ প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু  ব্রুনো এটি শেষ করার সুযোগ পায়নি। ভেনেশিয়ান ইনক্যুইজিশনের কাছে তাকে ধরিয়ে ছিল সেই অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তি যিনি তাকে ভেনিসে ডেকে এনেছিলেন পৃষ্ঠপোষকতা করবেন বলে। এমনকি কারাগারে তার শেষ কক্ষ থেকেও ব্রুনো মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছিলেন যেন তার লেখাগুলো পোপের হাতে পৌঁছায়। তার দণ্ডের বিবরণের প্রতিলিপি উল্লেখ করেছিল, ইনক্যুইজিটরদের সামনে তার নিজের বিরুদ্ধমতগুলো অস্বীকার করতে রাজী না হয়ে – “আপনি একটি প্রতিবেদন পেশ করেছেন পবিত্র পোপ ও আমাদের বরাবর, যা , যেভাবে আপনি বলেছেন, আপনার আত্মপক্ষ সমর্থনের দলিল”। এমনকি যদিও পোপ সেটি পড়েও থাকেন, যার  সম্ভাবনা খুবই কম, ব্রুনোর ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য তখন অনেক বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল।

ব্রুনো নিয়ে মুগ্ধ হওয়া পরবর্তীতে লেখকের সংখ্যাও কম নয়, বিশেষ করে যে ভাবনার প্রতীক তিনি ছিলেন, জেমস জয়েস, অস্কার ওয়াইল্ড, বার্টোল্ট ব্রেখট, সবাই তাদের লেখায় ব্রুনো প্রতি তথ্যনির্দেশ করেছিলেন, এবং ভিক্টর হিউগো ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক দাতা যখন কাম্পো ডেই ফিওরেতে  ব্রুনোর স্মারক ভাস্কর্যটি নির্মানের জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য আহবান জানানো হয়েছিল। পশ্চিমা চিন্তার ইতিহাসে যদি ব্রুনোর সত্যিকারের অবদান নিয়ে তার জীবনকাহিনি, এবং যে সাহসের সাথে তিনি তার ধারণাগুলো মৃত্যু অবধি সমর্থন করেছিলেন যদি কম কিছু বলার থেকে থাকে, হয়তো এটি পুরাণ এবং পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হওয়া কোনো বীরোচিত একক প্রথাবিরোধী ব্যক্তির কাহিনির প্রতি আমাদের অনিবার্য ভালোবাসার পরিণতি।  ব্রুনোকে সহজেই প্রগতিশীলতার প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করা যায়, যার আলোকিত জ্ঞান দমনমূলক ধর্মীয় রক্ষণশীলতার মুখোমুখি হয়েছিল, তার সময়ের চেয়ে বহু অগ্রসর একজন ব্যক্তি, ঠিক যেভাবে তিনি কোপার্নিকাসকে বিবেচনা করতেন । তার “দি অ্যাশ ওয়েনেসডে সাপার” বইতে তিনি লিখেছিলেন,

“কেউ কি কখনো যথেষ্ট পরিমানে এই জার্মানের মাহাত্ম্যকে প্রশংসসা করতে পারবে, যিনি নির্বোধ জনগণের চিন্তার প্রতি সামান্য ভ্রূক্ষেপ না করেই বিশ্বাসের স্রোতের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে তার অবস্থান গ্রহন করেছিলেন? কে তাকে সেই ব্যক্তিদের মধ্য একজন হিসাবে বিবেচনা করবেন না, যারা তাদের সৌভাগ্যজনক প্রতিভাসহ, নিজেদের উন্নীত করতে পেরেছিলেন বাকি সবার থেকে, এবং ঋজু হয়ে দাড়িয়েছিলেন, সবচয়ে বিশ্বস্ততার সাথে স্বর্গীয় বুদ্ধিমত্তার চোখ দ্বারা নির্দেশিত হয়ে”? (কোপার্নিকাস জাতিগতভাবে পোলিশ ছিলেন কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ব্রুনো তাকে বারবারই জার্মান হিসাবে সম্বোধন করেছিলেন)।

ব্রুনো হয়তো সেই পছন্দীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন একটি নতুন রোমের শিক্ষার্থীদের নিকটে, পোপের কর্তৃত্ব থেকে সদ্য স্বাধীন “রিসরজিমেন্টো” পর্বের পরে ( “যে প্রজন্মের তিনি পূর্বদর্শন করেছিলেস”)। এখন ইটালি বহু জায়গায় হয়তো তার নামে পিয়াৎসা, রাস্তা এবং কলেজ আছে কিন্তু কর্তৃপক্ষের সাথে তার সম্পর্ক অস্বস্তিকরই রয়ে গেছে। তার অনুসারী গ্যালিলেও যিনি ইনক্যুইজিশনের মুখোমুখি হবার পর তার মতামত প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, তাকে ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পোপ দ্বিতীয় জন পল ক্ষমা করেছিলেন, কিন্তু ২০০০ অবধি, ব্রুনোর মৃত্যুর চারশ বছর পরে, সেই একই পোপ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল যে, নোলান খ্রিষ্টীয় মতবাদ থেকে এতটাই বিচ্যুত হয়েচিল যে খ্রিষ্টীয় ক্ষমা প্রদান করা সম্ভব নয়।  হয়তো ইনকুইজিশন এখনও আমাদের সাথে আছে, ভিন্ন রূপের এবং প্রতিটি নতুন প্রজন্ম যা তিনি আগেই কল্পনা করেছিলেন, তারা যেন অবশ্যই তাদের চিন্তা করার স্বাধীনতাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহন করেন। যতদিন সেই মানুষগুলো থাকবেন, যারা তাদের ধারণাগুলো উচ্চস্বরে বলতে সাহসী হবেন এবং তার জন্য নির্বাসিত কিংবা কারাবন্দীর শিকার হবেন তাদের জন্য ব্রুনো জীবিত থাকবেন – বৌদ্ধিক সাহসের একটি প্রতীক হিসাবে। তার সেই আগুনের শিখা আরো দীর্ঘদিন প্রজ্জ্বলিত থাকুক।

রিশিষ্ট

ধর্ম আর যা মধ্যযুগ আর আদি আধুনিক পর্বে আধুনিক “বিজ্ঞান” হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল, এই দুটির মধ্য আরো বাস্তব এবং আরো সূক্ষ্মতর স্তরে মিথষ্ক্রিয়া নিয়ে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ কোনো আলোচনা করার প্রচেষ্টা করে দেখুন, তখনই চার্চ আদি বিজ্ঞানের কৃপাহীন আর অজ্ঞ শক্র ছিল সেটি বোঝাতে ব্রুনোকে ‘প্রমাণ’ হিসাবে উপস্থাপন করা হবে। আর যা-ই হোক পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, আর নক্ষত্রগুলো শুধুমাত্র গ্রহসহ সূর্য এমন কথা সাহস করে বলার কারণে চার্চই বা কেন তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করবে? আসলেই ইতিহাস বিশ্লেষণ ও বোঝার কঠিন কাজটি করার বদলে যারা সরল শ্লোগান পছন্দ করেন, তাদের কাছে  ব্রুনো জটিল একটি প্রশ্নের সরল একটি উত্তর। সূক্ষ্মতা আর জটিলতা হচ্ছে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের প্রথম বলি।

কার্ল সেগানের “কসমস”  প্রামাণ্য-ধারাবাহিকটির নতুন সংস্করণ যা নিল ডেগ্রাস টাইসন উপস্থাপন করেছিলেন, তিনি সেখানে একটি অ্যানিমেটেডে অংশ ব্যবহার করেছিলেন, আর সেগানের মতই সেটিও ইতিহাসের একটি বিকৃতি ছিল, যেভাবে সেগান হাইপেশিয়া আর আলেক্সান্ড্রিয়ার লাইব্রেরি নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ইতিহাস উপস্থাপন করে তাকে বিজ্ঞানের শহীদ হিসাবে একটি প্রজন্মের মনে রোপন করেছিলেন। নতুন কসমসে ব্রুনো কিংবদন্তীর একটি এগারো মিনিটের সংস্করণ প্রচারিত হয়েছিল।  যেখানে ব্রুনোকে উপস্থাপন করা হয়েছে নেপলসের একজন আন্তরিক তরুণ ফ্রায়ার হিসাবে যিনি ছিলেন সত্যের একজন প্রকৃত অনুসন্ধানী। এরপর টাইসন আমাদের জানিয়েছিলেন ব্রুনো “সেই বইগুলো পড়ার সাহস করেছিলেন – যা চার্চ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, আর সেটাই তার পতনের কারণ হয়েছিল”। অ্যানিমেশনে এরপর আমরা সেই দৃশ্যটি দেখি যেখানে ব্রুনো তার ঘরে মেঝের কাঠের পাটাতনের নীচে লুকানো লুক্রেশিয়াসের “অন দ্য নেচার অভ থিংস” এর অনুলিপি পড়ছেন, প্রথম সমস্যাটি এখানে হচ্ছে যে, লুক্রেশিয়াসের কাজটি চার্চ ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করেনি আদৌ, আর এটাকে মেঝের নীচে লুকিয়ে রাখার কারণ ছিল না। পজ্জিও ব্রাক্কিওলিনি বইটির একটি ছাপা অনুলিপি প্রকাশ করেছিলেন  ব্রুনোর জন্মের এক শতাব্দী আগে এবং এটি কখনোই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, যখন  ব্রাক্কিওলিনি মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপি থেকে যখন এটি অনুলিপি করেছিলেন, এছাড়াও যখন কিনা তার সংস্করণটি ব্যপকভাবে সম্প্রচারিত হয়েছিল। সেই ধারণাটি যে চার্চ লুক্রেশিয়াসের কাজটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে ও ধ্বংস করতে চেয়েছিল, সেটি একটি এবং জনপ্রিয় কল্পনায় এই পুরাণটি নুতন জীবন পেয়েছিল স্টিফেন গ্রিনব্লাটের ছদ্ম-ইতিহাসের বই দ্য সোয়ার্ভ – এ (যে বইটি বিস্ময়করভাবে পুলিৎজার পুরষ্কারও পেয়েছিল)।

 কসমসের অ্যানিমেশনটি দেখিয়েছিল ব্রুনো অসীম মহাবিশ্বের ধারণার প্রতি ব্রুনোর মন উন্মুক্ত হয়েছিল লুক্রেসিয়াসের বই পড়ে, কিন্তু এরপর ডিজনীর ভিলেনের মত আশ্রমের লোকজন তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি অবশ্যই সত্য নয়। ব্রুনোকে জোর করে বের করে দেয়া হয়নি তিনি নিজেই সেই ধর্মীয় আশ্রম থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রচুর টিকা-টীপ্পনীসহ ইরাসমাসের একটি বইসহ ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু ব্রুনো কোথায় তার সুবিশাল কসমসের ধারণা পেয়েছিলেন যেখানে পৃথিবী এর কেন্দ্রে অবস্থিত নয়, যেখানে নক্ষত্ররা হচ্ছে অন্য সূর্য, যেখানে বহু সংখ্যক পৃথিবী আছে, তাদের কিছু এমনকি আমাদের মতই জীব দ্বারা অধ্যুষিত হবারও সম্ভাবনা আছে। কসমসে অ্যানিমেশনে ইতিহাস-বিচ্যুত সরলীকরণ এই প্রশ্নের উত্তর হিসাবে লুক্রেশিয়াসের নাম প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু এইসব কিছু ব্রুনো লুক্রেশিয়াসের কাছ থেকে পাননি বা নিজেও কল্পনা করে সৃষ্টি করেননি। ধারণাটি তিনি সরাসরি সংগ্রহ করেছিলেন সেই ব্যক্তির নিকট থেকে যাকে তিনি “স্বর্গীয় কুসানুস” নামে চিহ্নিত করেছিলেন, পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রাকৃতিক দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক নিকোলাস অব কুসা।

বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রকৃত ইতিহাসের আগ্রহী এমন যে কেউই ব্রুনোর চেয়ে আরো উল্লেখযোগ্য অনেকের নাম উল্লেখ করতে পারবেন, যারা আসলেই প্রোটো-সায়েন্টিস্ট বা আদি-বিজ্ঞানী ছিলেন। এই পর্বটি প্রচারের পর লেখকরা দাবী করেছিলেন যে আদি বিজ্ঞানীরা এমন বিষয় নিয়ে কাজ করেছিলেন আর পুরোপুরিভাবে অবৈজ্ঞানিক, যেমন নিউটন ও কেপলার। কিন্তু কেপলার কিংবা নিউটন দুজনেই আরো গবেষণা ভিত্তিক কাজ করেছিলেন, কিন্তু  ব্রুনো হারমেটিকাল অতিন্দ্রীয়বাদ, পবিত্র জ্যামিতি এবং অস্পষ্ট, মূলত আবিষ্কৃত প্রাচীন মিসরীয় ধর্মই তার সব গবেষণার অংশ ছিল, তিনি বিজ্ঞানের কোনো কাজ করেননি। অন্ততপক্ষে তারা ব্রুনোর নিকোলাস অব কুসার কাছে ঋণটি ব্যাখ্যা করতে পারতেন, কুসানুস তার “ডে ডকটা ইগনোরানটিয়া” বইয়ে লিখেছিলেন:

“ এই মহাবিশ্বের কোনো পরিধি নেই, কারণ যদি এর একটি কেন্দ্র এবং পরিধি থাকে, তাহলে কিছু না কিছু এই পৃথিবীর পরিধির বাইরে অবস্থিত হবে, যে ধারণা সম্পূর্ণ সত্য বর্জিত। সুতরাং, যেহেতু এটি অসম্ভব যে মহাবিশ্ব একটি শারীরিক কেন্দ্র আর পরীসীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, এই মহাবিশ্বকে অনুধাবন করা আমাদের ক্ষমতা বহির্ভূত, যার কেন্দ্র আর পরিধিগুলো হচ্ছে ঈশ্বর, এবং যদি মহাবিশ্ব অসীম না হতে পারে, তাহলে এটিকে সীমাবদ্ধ হিসেবেও কল্পনা করা যাবে না, কারণ এমন কোনো পরিসীমা নেই যার মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ করে রাখা যেতে পারে”।

এই অন্তর্দৃষ্টিটা ব্রুনোর নয়, কিন্তু সেটাকে কেন তাহলে “স্বর্গীয় কুসানুস” এর অবদান হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি কসমসের লেখকরা; কারণ এটি তাদের কাহিনির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। কুসানুস বিশেষভাবে সন্মানিত ছিলেন এবং তাকে আসলেই চার্চের কার্ডিনাল বানানো হয়েছিল, সুতরাং মতবাদ নির্ভর ধর্মীয় নেতারা এই মুক্তচিন্তক প্রতিভাবানকে নির্যাতন করেননি। কসমসে আরো দেখান হয়েছিল যে ব্রুনো অক্সফোর্ডে বক্তৃতা দিচ্ছেন. গোমড়ামুখো আর অভিজাত পণ্ডিততার তার কোপার্নিকাসের সমর্থনের বিরোধিতা কতে, এবং একটি পর্যায়ে তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। আবারও বাস্ততা এমন ছিল না। হেলিওসেন্ট্রিজম নিয়ে অক্সফোর্ডের পণ্ডিতদের মধ্যে বিরোধিতার কোনো তথ্য আবিষ্কৃত হয়নি, অক্সফোর্ডের পণ্ডিতদের সমস্যা ছিল ব্রুনো আসলে আরেকজন পণ্ডিতে গবেষণা নিয়ে ‘কুম্ভিলকবৃত্তি’ করেছেন। কিন্তু এই তথ্যগুলো নির্যাতিত মুক্তচিন্তকের কাহিনির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।

অ্যানিমেশনে আরো দেখানো হয়েছিল হেলিওসেন্ট্রিজম এবং  অসীম একটি কসমসের (যার কেন্দ্র পৃথিবী নয়) ধারণা সমর্থন করেছিলেন বলেছিল তাকে নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। আমরা যেমন দেখেছি, পরের ধারণাটি আদৌ নতুন এবং বিতর্কিত ছিল না। ১৫৮০ র দশক নাগাদ কোপার্নিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক হাইপোথিসিসও বিশেষভাবে নতুন কিছু ছিল না , যদিও এটি খানিকটা বেশি বিতর্কিত ছিল। কার্যত কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী এটি গ্রহন করেননি কারণ এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ক্রুটি ছিল বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে মনে রাখা যে, এই পর্যায়ে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এটিকে ধর্মবিরোধী বলে বিবেচনা করেনি। এমনকি যদিও কেউ কেউ ভেবেছিলেন এর কিছু অস্বস্তিকর তাৎপর্য আছে।

ব্রুনোকে তার ধর্ম সংক্রান্ত ধারণার জন্য ক্যাথলিক চার্চ থেকে এক্সকমিউনিকেট করা হয়েছিল। এক্সকমিউনেকেট মানে মৃত্যুদণ্ড নয়। তিনি নিজেকে যখন ক্যালভিনিস্ট দাবী করেছিলেন তার ইউরোপব্যাপী ভ্রমনের সময়, ক্যাথলিক চার্চের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। ক্যালভিনিস্টরা তাকে সাময়িকভাবে এক্সকমিউনিকেট করেছিল যখন তিনি একজন প্রসিদ্ধ অধ্যাপককে আক্রমণ করে পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন, এবং ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেছিলেন। আমরা জানিনা সেই  পুস্তিকার বিষয়বস্তু কি ছিল, তবে সেই অধ্যাপকের কিছু তার দৃষ্টিতে ভুল উল্লেখ করে শ্লেষাত্মক ভাষায় সমালোচনা করা হয়েছিল। এরপর লুথারিয়ানরা তাকে বহিষ্কার করেছিলেন, যখন তিনি ইংল্যান্ডে, যেখানে তাকে একজন ক্যালভিনিস্ট হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কোপার্নিকাসও প্রথম আদি-বিজ্ঞানী ছিলেন না যিনি কিনা একটি গতিশীল পৃথিবীর ধারণাটি অনুসন্ধান করে দেখেছিলেন। মধ্যযুগীয় পণ্ডিত নিকোলাস ওরেসমে ১৩৭৭ সালে সেই প্রমাণগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন যা পৃথিবীর আবর্তনের ধারণাটিকে সমর্থন করেছিল, এবং এটি অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য বলে বিবচেনা করেছিলেন। চার্চ আদৌ ভ্রুক্ষেপ করেনি। কোপার্নিকাসের হিসাবনিকাশ এবং তার তত্ত্বটি তার বই প্রকাশের আগেই প্রচারিত হয়েছিল ( তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত) যা পোপ সপ্তম ক্লেমেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, যিনি ইয়োহান ভিডমানস্টাডকে ডেকেছিলেন ভ্যাটিকানের বাগানে এই তত্ত্বটি নিয়ে একটি বক্তৃতা উপস্থাপন করতে, যা পোপ পছন্দ করেছিলেন। নিকোলাস কার্ডিনাল শোয়েনবার্গ এরপর কোপার্নিকাসকে তার কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করতে বলেছিলেন, আর কোপার্নিকাস দেরি করেছিলেন ধর্মীয় নির্যাতনের ভয় নয় বরং অন্য গণিতজ্ঞ আর জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে। ১৬১৬ সালের আগে হেলিওসেন্ট্রিজম বিতর্কিত বিষয় ছিল না, যখন গ্যালিলেও সংক্রান্ত ঘটনাটি শুরু হয়েছিল, ব্রুনোর মৃত্যুর প্রায় দেড় দশক পরে। 

কসমসের অ্যানিমেশন লেখকদের এই বিষয়গুলো সম্বন্ধে হয়তো খুবই অস্পষ্ট ধারণা ছিল, কারণ আদি-বিজ্ঞানী হিসাবে ব্রুনোর শহীদ হবার কাহিনিটিকে সেই পুরানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ রাখতে তাদের বেশ কসরৎ করতে হয়েছিল। ব্রুনোর বিচারের দৃশ্যে আমরা প্রথম ধারণা পাই যে ব্রুনোর সাথে চার্চের দ্বন্দ্বের কারণ আসলে বহু জাগতিক অসীম মহাবিশ্বের ধারণা কিংবা কোনো বিশ্বতাত্ত্বিক প্রস্তাবনা নয়। সুতরাং আমরা ডিজনীসদৃশ খলনায়ক বিচারককে দেখি অভিযোগের একটি তালিকা পাঠ করতে, যেমন – হলি ট্রিনিটি ও যীশুর দেবত্ব অস্বীকার করা, এবং আর কিছু বিশুদ্ধভাবে ধর্মতাত্ত্বিক অভিযোগ। আর এটি যেভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল দেখে মনে হতে পারে যেন, এটি কোনো না কোনোভাবে  অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বা এমনকি বানোয়াট অভিযোগ, যখন কিনা বাস্তব সত্য হচ্ছে এগুলোই ছিল “প্রকৃত” কারণ যার জন্য তাকে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। আজ যতই ভয়াবহ অনুভূত হোক না কেন, মেরি কুমারিত্বকে অস্বীকার, এবং যীশুকে শুধুমাত্র একজন জাদুকর হিসাবে ভাবা এবং  “ট্রান্সসাবস্ট্যানসিয়েশন” অস্বীকার  করা ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে আপনার আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়াতো, অবশ্যই যদি অনুশোচনা করার পৌনঃপুনিক সুযোগ আপনি অস্বীকার না করতেন।

কিন্তু অ্যানিমেশনটি আমাদের বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করেছিল, ব্রুনোর বিরুদ্ধে আনীত সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হচ্ছে – অন্য জগতের অস্তিত্ব দাবী করা। আমরা যেমন দেখেছিলাম, এটি আসলেই সেই সময়ে চার্চের জন্য কোনো সমস্যাজনক কিছু ছিল না। আবারও সেই নিকোলাস অব কুসার বই থেকে একটি উদ্ধৃতির কথাই ধরুন, যে বইটি  ব্রুনোর বহু বিশ্বাসকেই অনুপ্রাণিত করেছিলেন। যেমন তিনি লিখেছিলেন :

“জীবন, পৃথিবীতে যেভাবে মানুষ প্রাণি আর উদ্ভিদ রূপে অস্তিত্বশীল সেটি পাওয়া যাবে, আসুন ধরে নেই উচ্চতর একটি রূপে সৌর এবং নক্ষত্রলোকে। অগণিত নক্ষত্র আর মহাকাশের অংশ অধ্যুষিত নয় এবং শুধুমাত্র আমাদের এই পৃথিবী জীবন দ্বারা অধ্যুষিত –  হয়তো যা নিম্ন ধরনের জীবসত্তা দ্বারা অধ্যুষিত – এমন কিছু ভাবার বদলে আমার ধারণা করবো যে, প্রতিটি অংশেই জীবনের বসবাস আছে, স্তর বিন্যাসে আর প্রকৃতিতে যা ভিন্ন, যারা তাদের অস্তিত্বের জন্য ঈশ্বরের কাছে ঋণী, যিনি সব নক্ষত্রলোকের কেন্দ্র ও পরিধি …মূল্যায়ন করার কোনো মানদণ্ডের অভাবে আমাদের নিজেদের জগত ছাড়া অন্য জগতের বাসিন্দাদের সম্বন্ধে আমরা আরো কম জানি”।

আবারো এসব কিছু বলার জন্য নিকালাস অব কুসাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। বরং তাকে কার্ডিনাল বানিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়েছিল। কসমসে ব্রুনোকে ঈশ্বরের বিশ্বাসী দেখা হয়েছে তিনি মূলত সর্বেশ্বরবাদী ছিলেন, কিন্তু তাকে দেখানো একজ ন মুক্তমনা হিসাবে যাকে মতবাদীরা হত্যা করেছিল। স্পষ্টতই ইতিহাস নয়, এটি ছিল রাজনীতি। এই অ্যানিমেশনটি শেষ হয়েছিল ডেগ্রাস টাইসনের সতর্কবাণী দ্বারা যে, ব্রুনো কোনো “বিজ্ঞানী নয়” এবং তার ধারণাগুলো সৌভাগ্যপূর্ণ অনুমান ছাড়া আর বেশি কিছু নয়। কেউ কেউ আসলেই মনে করেছিলেন এই সতর্কতা কোনো না কোনো ভাবে পুরো অ্যানিমেশন জুড়ে তথ্যবিকৃতিকে ক্ষমা করতে পারে, আর এর অর্থ হচ্ছে এই অনুষ্ঠানটি ব্রুনোকে শুধুমাত্র মুক্তচিন্তার জন্য শহীদ, এবং গোড়া মতবাদের বিপদ সংক্রান্ত একটি শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু এই উদ্দেশ্য পূরণে ইতিহাস বিকৃতি আর কল্পনার আশ্রয় নেওয়াটাই সবচেয়ে সমস্যাজনক। এখানে লক্ষ্য স্পষ্টতই মুক্তচিন্তা আর গোঁড়ামি বিষয়ে একটি বক্তব্য রাখা যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টিতত্ত্ববাদ নিয় চলমান সাংস্কৃতিক যুদ্ধে। ব্রুনো ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন, এই ধারণাটি অ্যানিমেশনে বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করেছিল, কিন্তু তিনি আসরেই ছিল সর্বেশ্বরবাদী, কিন্তু তাকে উপস্থাপন করা হয়েছিল উন্মুক্ত মনের এবং মুক্ত বিশ্বাসী যাকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং গোঁড়া আক্ষরিকতাবাদের শক্তি তাকে হত্যা করেছিল। অ্যানিমেশনে প্রদর্শিত ফল ছুড়ে মারা অক্সফোর্ডের পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য ব্রুনোর চিৎকার, “তোমাদের ঈশ্বর খুব ছোট” আসলেই হয়তো এই পুরো কাহিনির মূল বিষয়। এই পুরো দৃশ্যটি আমেরিকার সাংস্কৃতিক যুদ্ধে গোঁড়া আক্ষরিকতাবাদীদের প্রতি নির্দেশিত ছিল, এবং একই সাথে প্রচেষ্টা ছিল বিশ্বাসীদের প্রতিও আবেদন রাখতে, কারণ এই অনুষ্ঠানটি আমেরিকান দর্শকরা প্রধানত ঈশ্বরবাদী। এটাই ছিল ব্রুনোকে নিয়ে গড়ে তোলা কিংবদন্তীর মূল কাঠামো। প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছিল আধুনিক বার্তা সম্প্রচার করতে।

ক্যাম্পো ডেই ফিওরির ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছিল এত্তোরে ফেরারি এবং ১৮৮৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ইটালির একীভূত হবার পরে, যার বিরোধিতা করেছিল চার্চ। গ্রন্ড ওরিয়েন্ট ডি’টালিয়া মেজনিক অর্ডারের সদস্যরা এই স্মারকটি প্রতিষ্ঠা করেছিল চার্চের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট একটি রাজনৈতিক প্রতীক হিসাবে।  নিরীশ্বরবাদী আর মুক্তচিন্তকরা এটি সন্মান করে প্রতি বছর। যদি কেউ ইঙ্গিত করেন যে,  ব্রুনো বরং নিরীশ্বরবাদীদের জন্য একটি অদ্ভুত প্রতীক, বিশেষ করে তার অদ্ভুত অতীন্দ্রিয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাদুকরী অনুশীলনগুলো, যা সাধারণত উপেক্ষা করা হয়। যদি কেউ সাহস করে উল্লেখ করেন যে শুধুমাত্র ধর্মীয় ধারণার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, বহুবিশ্ব অথবা অসমী মহাবিশ্ব সংক্রান্ত অনুমানগুলোর জন্য নয়, তাদের সাধারণত স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, তারা এই ভয়াবহ দণ্ডকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করছেন। বহু মানুষ যারা নিজেদের যুক্তিবাদী মনে করেন, তারা হয়তো আসলেই নিজেদের কম যুক্তিবাদী হিসাবে উপস্থাপন করতে পারেন।

মূল কিছু উৎস

Broderick, James, 1961, Robert Bellarmine, Saint and Scholar (Westminster, MD.: Newman Press)

di Santillana, Giorgio, 1955, The Crime of Galileo (Chicago: Univ. of Chicago Press)

Singer, Dorothea Waley, 1950, Giordano Bruno, his Life and Thought. (New York: Schuman) [contains an annotated translation of On the Infinite Universe and Worlds]

van Helden, Albert, 1995, Giordano Bruno, hypertext biography as part of the .

White, Andrew Dickson, 1896, The Warfare of Science with Theology in Christendom (New York: D. Appleton & Company), 1978 reprint.

Yates, Frances, 1964, Giordano Bruno and the Hermetic Tradition (Chicago: Univ. of Chicago Press);

Yates, Frances, 1950, Giordano Bruno, his Life and Thought. (New York: Schuman) [contains an annotated translation of On the Infinite Universe and Worlds]

van Helden, Albert, 1995, Giordano Bruno, hypertext biography as part of the .

White, Andrew Dickson, 1896, The Warfare of Science with Theology in Christendom (New York: D. Appleton & Company), 1978 reprint.

ব্রুনো : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s