বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: দ্বিতীয় পর্ব

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

ভুমিকা: মিলান কুন্দেরা’র ( Milan Kundera) উপন্যাস Nesnesitelná lehkost bytí এর চেক ভাষা থেকে মাইকেল হেনরী হাইম এর ইংরেজী অনুবাদ The Unbearable Lightness of Being এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।
(প্রথম পর্ব)
_________________________________________________

 দ্বিতীয় পর্ব: আত্মা এবং শরীর
_______________

লেখকের পক্ষে পাঠকদের মনে বিশ্বাস জন্মানোর চেষ্ঠা সম্ভবত অর্থহীন হবে যে, তার চরিত্রগুলো আসলেই কোন একসময় জীবিত ছিল। কোন মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি তাদের, তাদের জন্ম হয়েছে একটি কিংবা দুটি উদ্দীপক বাক্য বা কোন একটি সাধারন মৌলিক পরিস্থিতি থেকে। টমাসের জন্ম হয়েছে ’আইনমাল ইস্ট কাইনমাল’ (Einmal ist keinmal’), এই প্রবাদ বাক্যটি থেকে।তেরেজার জন্ম হয়েছে একটি পেটের গুড়গুড় শব্দ থেকে।

প্রথম বারের মত যখন তেরেজা টমাসের ফ্ল্যাটে যায়,তার পেটের ভেতরে গুড়গুড় করে শব্দ শুরু হয়েছিল; আর এমন হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু ছিল না, কারন সেই সকালের খাবারের পর সে আর কিছু খায়নি; ট্রেনে উঠে বসার আগে প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে শুধু একটা স্যান্ডউইচ খেয়েছিল । তার সমস্ত চিন্তা জুড়ে ছিল ভবিষ্যতের দিকে তার এই দু:সাহসী যাত্রার কথা, খাওয়ার কথা তার মনেই ছিল না। কিন্তু যখন আমরা আমাদের শরীরকে উপেক্ষা করি, খুব সহজেই আমরা তার শিকারে পরিণত হই। খুবই খারাপ লাগছিল তার, পেটের মধ্যে এই অস্বস্তিকর শব্দ নিয়ে টমাসের সামনে দাড়িয়ে থাকতে। মনে হচ্ছিল তখনই সে কেদে ফেলবে। সৌভাগ্যজনকভাবে, প্রথম দশ সেকেন্ড পরই টমাস তাকে আলিঙ্গন করে, এবং তেরেজাকে তার শরীরের গভীর থেকে আসা বিব্রতকর শব্দগুলোর কথা ভুলিয়ে দেয়।

সুতরাং তেরেজার জন্ম হয়েছে সেই পরিস্থিতিতে, যা খুব নিষ্ঠুরভাবে প্রকাশ করে শরীর এবং আত্মার অসমন্বয়যোগ্য দ্বৈততা, সেই মৌলিক মানবিক অভিজ্ঞতাটি।

বহুদিন আগে, মানুষ বিস্ময়ের সাথে তার বুকের ভিতর  ছন্দময় স্পন্দনের শব্দ শুনতে পেত, কখনো বুঝতে পারেনি শব্দগুলো আসলে কি। শরীরের মত অনাত্মীয় আর অচেনা একটি জিনিসের সাথে মানুষ পারেনি নিজেকে একাত্ম করে ভাবতে। শরীরটা ছিল যেন একটি খাচার মত, আর সেই খাচার ভিতরে ছিল কিছু একটা জিনিস,যা দেখতো, শুনতো, ভয় পেতো, ভাবতো এবং বিস্মিত হতো, সেই কিছু বিষয়টি হলো -যা রয়ে যায় শরীরের সব হিসাব নিকাশ শেষ হলে – আত্মা।

আজ অবশ্য, আমাদের শরীর আর অচেনা কিছু নয়: আমরা জানি আমাদের বুকের মধ্যে ছন্দময় স্পন্দন আসলে হৃদপিন্ড, নাক হচ্ছে একটা পাইপের মুখ যা শরীরের বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে,ফুসফুসে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাবার জন্য। আমাদের চেহারা আর কিছুই না, শুধু একটা ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেল, যা শরীরের নানা কর্মকান্ড কেমন চলছে তার জানান দেয়: পরিপাক,দৃষ্টি, শ্রবণ ক্ষমতা, শ্বাস, চিন্তা।

যেদিন থেকেই মানুষ তার শরীরের নানা অংশকে নাম দিতে শিখেছে, শরীর তাকে কম সমস্যায় ফেলেছে। মানুষ এটাও জেনেছে, আত্মা আসলে  তার মস্তিষ্কের কর্মরত গ্রে ম্যাটার ছাড়া আর কিছু না। শরীর এবং আত্মার প্রাচীন দ্বৈততা এখন ঢাকা পড়ে গেছে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এবং  হাসতেও পারি আমরা একে শুধুমাত্র সেকেলে একটি কুসংস্কার মনে করে।

কিন্তু শুধু প্রেমে পড়েছে এমন কাউকে তার পেটের গুড়গুড় শব্দ শোনানো হোক, আত্মা এবং শরীরের একাত্মতা, বিজ্ঞানের যুগে  সেই ক্যাব্যিক মায়াময়তা সাথে সাথেই ম্লান হয়ে যায়।

Continue reading “বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: দ্বিতীয় পর্ব”
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: দ্বিতীয় পর্ব

বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: প্রথম পর্ব

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

ভুমিকা: মিলান কুন্দেরা’র ( Milan Kundera) উপন্যাস Nesnesitelná lehkost bytí এর চেক ভাষা থেকে মাইকেল হেনরী হাইম এর ইংরেজী অনুবাদ The Unbearable Lightness of Being এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা; এই ব্লগের জন্য আমি এর ধারাবাহিক অনুবাদ করছি বেশ কয়েকদিন হলো, আলাদা পাতা হিসাবে খন্ড খন্ড ভাবে লেখাগুলো আছে এই ব্লগে। এখানে প্রথম পর্বটি সবগুলো অংশ একসাথে পোষ্ট করলাম। দ্বিতীয় পর্বের ১ থেকে ৮  এখানে;

_________________________________________________

 প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার
_______________ 

চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের [১] ধারনাটা খুব রহস্যময়, আর নীচাহ [২]  প্রায়ই এটি দিয়ে অন্য দার্শনিকদের ধাধার মধ্যে ফেলে দিতেন: এমনটা ভাবা যে, আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে ঠিক যেমনটা আগেই ঘটেছিল আর এই পুনরাবৃত্তিরও পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে অনন্তকাল; আসলেই এমন একটি উন্মত্ত অলীক ধারনার  অর্থ কি হতে পারে?

নেতিবাচক ভাবে যদি ব্যাখ্যা করতে চাই, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের মিথ বলছে যে, কোন একটি জীবন যা চিরকালের মত হারিয়ে গেছে, যা কখনোই আর ফিরে আসবে না, সে জীবন আসলে ছায়ার মত, নির্ভার, আগে থেকেই মৃত এবং হতে পারে সেই জীবন দুঃসহভাবে কুৎসিত, সুন্দর কিংবা মহৎ, এর ভয়াবহতা, মহত্ব এবং সৌন্দর্য সব কিছুই অর্থহীন। চতুর্দশ শতাব্দীর আফ্রিকার ‍দুই রাজ্যের মধ্যকার যুদ্ধকে যেমন আমরা যতুটুকু গুরুত্ব দেই, যে যুদ্ধ পৃথিবীর নিয়তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করেনি, এমন কি সেখানে লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ তীব্রতম নিপীড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হয়েও যদি থাকে, সেই জীবনকে আসলে আমাদের তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেবার কোন প্রয়োজন নেই।

চতুর্দশ শতাব্দীর দুটি আফ্রিকার রাজ্যর মধ্যে যুদ্ধটাই কি বদলে যাবে যদি  বার বার এর পুনরাবৃত্তি হয়, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনে?

পরিবর্তিত হবে সেটি: এটি পরিবর্তিত হবে কঠিন একটি বস্তুতে, চিরস্থায়ী ভাবে প্রস্ফীত, যার অসারতা অসংস্কারযোগ্য।

যদি ফরাসী বিপ্লবের চিরন্তনভাবে পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, ফরাসী ঐতিহাসিকরা রোবসপিয়েরকে [৩] নিয়ে খানিকটা কম গর্ব অনুভব করতেন। কিন্তু যেহেতু তারা এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না, বিপ্লবের সেই রক্তাক্ত বছর গুলো পরিণত হয়েছে শুধুমাত্র কতগুলো শব্দ, তত্ত্ব আর আলোচনায়, পালকের মত হালকা হয়ে গেছে, আর কারো মনেই  তা ভীতির উদ্রেক করেনা। একজন রোবসপিয়ের, যে ইতিহাসে মাত্র একবার আসে এবং  যে রোবসপিয়েরের যার চিরন্তন পুনরাগমন ঘটে  ফরাসীদের মাথা কাটার জন্য, তাদের মধ্যে পার্থক্য অসীম।

সেকারনে আসুন আমরা অন্ততঃ একমত হই, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের ধারনাটি আমাদের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গী দেয়, যেখান থেকে সাধারনত কোন কিছুকে আমরা যেভাবে চিনি, তার থেকে ভিন্ন অনুভুত হয়: তারা আবির্ভুত হয় তাদের ক্ষনস্থায়ী প্রকৃতির গুরুত্ব হ্রাস করিয়ে দেয়া কোন পরিস্থিতি ছাড়াই। এই গুরুত্ব হ্রাস করানো পরিস্থিতি কোন একটি মতামতে পৌছাতে আমাদের বাধা দেয়। কারন কিভাবে আমরা কোন কিছুকে দোষারোপ করবো, যা ক্ষনস্থায়ী, আসা যাওয়ার মধ্যে তার অবস্থান? অবসানের গোধুলীবেলায় অতীতবিধুরতার আলোয় উদ্ভাসিত হয় সবকিছু, এমনকি গিলোটিনও।

কিছু দিন আগে, আমার ভিতর একটি অবিশ্বাস্য অনুভুতির উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম, হিটলারে উপর একটি বই এর পাতা উল্টাতে গিয়ে, তার কিছু প্রতিকৃতি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল: সেগুলো শৈশবে কথা মনে করে দিয়েছিল আমাকে। যুদ্ধের সময়ই আমি বড় হয়েছি, আমার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও তাদের জীবন দিয়েছেন হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। কিন্তু আমার জীবনের হারানো সেই সময়ের সব স্মৃতি, যা আর কোনদিনও ফিরে আসবে না, তার তুলনায়, তাদের মৃত্যু আসলে কি?

হিটলারের সাথে এই পুনর্মিলন আসলে প্রকাশ করে, এই পৃথিবীর একটি গভীরতম নৈতিক বিকৃতি, যা নির্ভর করে প্রধানত পুনরাবৃত্তির অনস্তিত্বের উপর, কারন এই পৃথিবীতে সবকিছুই পুর্বেই ক্ষমাপ্রাপ্ত এবং সেকারনে সবকিছুই নৈরাশ্যজনকভাবেই অনুমতিপ্রাপ্ত।

Continue reading “বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: প্রথম পর্ব”
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: প্রথম পর্ব