মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – কিভাবে আমর সেপিয়েন্স হলাম.. (প্রথম পর্ব)

ভূমিকা

হোমো সেপিয়েন্স খুবই অদ্ভুত একটি প্রাণি। আমাদের পূর্বসূরিরা প্রথমে গাছে বাস করতেন, আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে তারপর তারা মাটিতে – নিচে নেমে এসেছিলেন, তারপর তারা দ্বিপদী প্রাণিতে পরিণত হয়েছিলেন এবং অবশেষে পুরো পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করেছিলেন – আর সেখান থেকেই অসীম সম্ভাবনার অভিমূখে তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। আচরণের এই পরিবর্তন এখনোও সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর অন্যতম, কিন্তু আমরা এটি সমাধান করার পথে রয়েছি, প্রাগৈতিহাসিক বিজ্ঞানগুলোর বিস্ময়কর সাম্প্রতিক অগ্রগতির কল্যাণে।

জীবাশ্মীভূত ডিএনএ পৃথক, সংগ্রহ আর অনুক্রম করার মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে, প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে আমরা এই পৃথিবীটিকে কমপক্ষে আরো তিনটি মানব প্রজাতিদের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম, এবং আমরা জানি যে, সেপিয়েন্সরা, আফ্রিকার একটি প্রজাতি – যারা আফ্রিকার বাইরে দুটি অন্য প্রজাতির সাথে আন্তঃপ্রজনন করেছিল। নতুন জীবাশ্ম থেকে আমরা আরো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি, আমাদের পূর্বসূরিরা শুধুমাত্র পূর্ব আফ্রিকায় উদ্ভুত হয়নি, বরং আসলেই তারা একটি সমগ্র-আফ্রিকার প্রজাতি ছিলেন। আমরা আরো আবিষ্কার করেছি যে, ইতোপূর্বে যা আমরা ভাবতাম, তার চেয়ে আরো এক লক্ষ বছর আগে সেপিয়েন্সরা আসলেই প্রথমবারের মত তদের সমগ্র-আফ্রিকাব্যাপী সূতিকাগারটি ত্যাগ করেছিল।

যদিও বহু বছরের গবেষণার মাধ্যমে হোমো সেপিয়েন্সদের সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যে অনেক কিছু আবিষ্কার করেছি, কিন্তু কিভাবে আমরা বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে মানুষে পরিণত হয়েছিলাম সেই সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে এখনো বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন আছে । জলবায়ুর পরিবর্তন কি আমাদের তথাকথিত পূর্বসূরিদের জঙ্গল থেকে সাভানার সমতল অভিমূখে যাত্রাটিকে পরিচালিত করেছিল, যা ধারাবাহিক কিছু জটিল শারীরস্থানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করেছিল? এটি  কি তবে বাইপেডালিজম বা দ্বিপদী হবার কারণে ঘটেছিল, যা অন্য কাজের জন্য আমাদের হাতগুলোকে মুক্ত করেছিল? হাতিয়ারের ব্যবহার? আমাদের বড় মস্তিস্ক? তবে আমরা কি মানুষে পরিণত হয়েছি, কারণ আমরা সহমর্মী এবং সহযোগিতা করতে সক্ষম?

দীর্ঘ সময় ধরে, বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী তত্ত্ব ছিল। তারপর, ২০১৫ সালে আমরা বিস্ময়কর একটি আবিষ্কার করেছিলাম : ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগে, যে এলাকাটি বর্তমানে কেনিয়া, হাত দিয়ে বানানো পাথরের হাতিয়ার বা উপকরণ। সবচেয়ে প্রাচীনতম মানব জীবাশ্মটির সময়কাল পরিমিত হয়েছে ২.৮ মিলিয়ন বছর, সুতরাং যে হাত এইসব হাতিয়ার তৈরি করেছিল সেগুলো অবশ্যই মানুষ হতে পারে না। এই হাতগুলো খুব সম্ভবত ছিল অষ্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতিদের সদস্যদের, প্রাক-মানব একটি প্রজাতি। তাহলে হাতিয়ার আমাদের মানুষে পরিণত করেনি।

এই সংবাদটি আমাদেরকে আরো মনোযোগ সহকারে আমাদের পূর্বসূরিদের পর্যবেক্ষণ করতে প্ররোচিত করেছিল, সেপিয়েন্সদের সম্বন্ধে আরো নতুন কিছু যা আবিষ্কারের কারণ হয়েছে। এই ধারাবাহিকে ‘হমিনাইজেশন’ বা মানবে পরিণত হবার প্রক্রিয়ার আনুক্রমিক পর্বগুলো নিয়ে মূলত আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে, অর্থাৎ  প্রাক-মানব পর্ব থেকে হোমো হিসাবে বিবর্তনীয় রূপান্তর ( যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মানুষে রূপান্তরিত হবার সাংস্কৃতিক দিকগুলোও), অস্ট্রালোপিথেকাসদের সাথে যা আফ্রিকায় শুরু হয়েছিল তিন মিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় পূর্ব থেকে। এটি ছিল বিস্ময়কর একটি রূপান্তর, যে রূপান্তরটি একটি অদ্ভুত, অনন্য, ঋজু প্রাণিদের সৃষ্টি করেছিল, যাদের শক্তিশালী বৌদ্ধিক ক্ষমতা আছে, যাদের সবেচয়ে বিবর্তিত রূপটি, সেপিয়েন্স, এর সব পূর্বসূরিদের বংশঐতিহ্য ধারণ করে।

আমরা এখন জানি যে, সেপিয়েন্সদের অগ্রসর বৌদ্ধিক ক্ষমতার প্রাথমিক ভূমিকা হচ্ছে আমাদের টিকে থাকতে সহায়তা করা। কিন্তু কোথায়? প্রকৃতিতে, নাকি,  সমাজে? প্রকৃতিতে যখন একা, সেপিয়েন্সরা তখন দূর্বল, কিন্তু দলবদ্ধভাবে আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে সবেচেয়ে দুর্ধর্ষ শিকারি। পরিবেশগতভাবে এটি অসম্ভব অনুভূত হয় : একটি সর্বব্যাপী প্রজাতি যারা প্রকৃতিকে তাদের বাসস্থানে পরিণত করেছিল – যে বাসস্থানটি এখন বৈশ্বিক মাত্রা অর্জন করেছে। এই ধারাবাহিকে এই রহস্যময় বিবর্তনীয় কাহিনিটি  ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হবে। এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রাণির ইতিহাস: আপনি।

প্রথম অধ্যায় : নরবানরের উত্তরসূরি এক দ্বিপদী

“প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রাচীন প্রাইমেটদের প্রথম মানুষ রূপে বিবর্তিত হবার চালিকা শক্তি ছিল। এটি শুধুমাত্র আমাদের পূর্বসূরিদের দ্বিপদী প্রাণিতেই রূপান্তরিত করেনি, মাটির উপর সোজা হয়ে হাঁটতে পারার ক্ষমতা, চলাফেলার জন্য যা অনেক বেশি দক্ষতর একটি উপায় হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু এছাড়াও এটি একটি স্ব-দৃঢ়ীকরণের চক্রের সূচনা করেছিল: যত বেশি দ্বিপদী তারা হয়েছিল, মাটিতে প্রয়োজনীয় সম্পদ আরোহণ করতে তত বেশি তারা সফল হয়েছিল, যা দ্বিপদী আচরণকে আরো দৃঢ়তর করেছিল..। যদিও, শুধুমাত্র এটি ব্যাখ্যা করতে পারে না, কেন মানুষরা স্থায়ীভাবে দ্বিপদী প্রাণিতে পরিণত হয়েছিল”।

১৭৪৮ সালে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের মত মানুষরা প্রাণিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। উদ্ভিদ ও প্রাণীবিজ্ঞানী কার্ল লিনেয়াস (১৭০৭-৭৮) তার “সিস্টেমা নাটুরি” ( দ্য সিস্টেম অব নেচার – প্রকৃতির পদ্ধতি) বইয়ে সমজাতীয় এক গোষ্ঠী প্রাণিদের সাথে আমাদের বিন্যস্ত করেছিলেন – একটি জিনাস বা গণ – যার নাম তিনি দিয়েছিলেন “হোমো”, এবং আমাদের শ্রেণিবিন্যাস করেছিলেন “সেপিয়েন্স” হিসাবে, যার অর্থ “জ্ঞানী”। আজ, হোমো সেপিয়েন্স হচ্ছে একমাত্র অস্তিত্বশীল মানব রূপ।

স্তন্যপায়ী প্রাণি হিসাবে – উষ্ণরক্ত বিশিষ্ট প্রাণী যারা তাদের সন্তানদের প্রতিপালন করে – সেপিয়েন্সরা প্রাইমেট অর্ডার বা বর্গের সদস্য: পাঁচ আঙ্গুলসহ সামনের দিকে ফেরানো চোখ, এবং বসে থাকা অবস্থায় সোজা বা ঋজু শরীরের নরবানর (এইপ)। আমাদের জানা নেই কবে প্রাইমেটরা প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল, কিন্তু আমরা জানি যে ইয়োসিন পর্বে তাদের ইতোমধ্যেই অস্তিত্ব ছিল, যে পর্বটি আজ থেকে  ৫৬ থেকে ৩৩.৯ মিলিয়ন বছর পূর্বে ছিল। কোথা থেকে তারা বিবর্তিত হয়েছিল? আমরা সেটিও নিশ্চিতভাবে জানি না, কিন্তু ৭০ মিলিয়ন বছর আগে, যখন ডায়নোসররা পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল, সেই সময়ও একটি আদি-প্রাইমেট (প্রোটোপ্রাইমেট) প্রজাতিরও অস্তিত্ব ছিল, “পার্গাটোরিয়াস” নামে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে – ইদুর আকারের ক্ষুদ্র একটি প্রাণি। তবে যখন ডায়নোসরদের আধিপত্য সমাপ্ত হয়েছিল, তখন আধুনিক স্তন্যপায়ীরা, প্রাইমেটরাসহ, তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল।

বর্তমানে, অধিকাংশ প্রাইমেটরাই ক্রান্তীয় অঞ্চলের বাসিন্দা এবং বৃক্ষবাসী জীবনাচরণের সাথে যারা অভিযোজিত, যা ইঙ্গিত করে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীনতম পূর্বসূরি – হোমিনিড এইপ বা নরবানররা – ক্রান্তীয় বনাঞ্চলে বাস করতো, যেখানে গাছগুলো ছিল দীর্ঘ, ফল ছিল প্রচুর। বর্তমানে অধিকাংশ হোমিনিড নরবানররা আফ্রিকায় বসবাস করে, মানব প্রজাতি উৎসস্থল হিসাবে যা আফ্রিকার প্রতি ইঙ্গিত করে।

প্রাক-মানব হোমিনিন

পর্যাপ্ত পরিমান প্রমাণ এখন আমাদের কাছে আছে, যেগুলো এসেছে আফ্রিকা মহাদেশে খুঁজে পাওয়া বহু সংখ্যক প্রাগৈতিহাসিক হোমিনিন জীবাশ্ম থেকে, যা প্রস্তাব করছে যে “হোমো” – দের জন্ম হয়েছিল আফ্রিকায়।

বর্তমানে, হোমিনিড পরিবারে অন্তর্ভুক্ত সদস্যরা হচ্ছে : মানুষ, বনোবো, শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং ওরাং উটান (ছবি ১)। এছাড়াও আমরা বহু জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছি, বিশেষ করে “আর্ডিপিথেকাস”, “প্যারানথ্রোপাস” এবং “অস্ট্রালোপিথেকাস”, যারা ছিল আমাদের প্রাক-মানব পূর্বসূরি, অর্থাৎ হোমিনিনরা, যারা শিম্পাঞ্জির চেয়ে আমাদের অনেক বেশি নিকটাত্মীয়। তাহলে হোমিনিড পরিবারকে আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি সেইসব গ্রেইট এইপ বা নরবানরদের পরিবার হিসেবে, যাদের মানবসদৃশ রূপ আছে এবং দুই পায়ের উপর ভর করে হাঁটার একই ধরনের ক্ষমতা আছে।

ছবি ১ : হোমিনিড পারিবারিক বৃক্ষ : হোমিনিডদের ভিন্ন শাখাগুলো বহু মিলিয়ন বছর আগেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমরা একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে জানি না ঠিক কখন তা ঘটেছিল। কারণ এখনও এই তথ্যগুলো দেবার মত জীবাশ্ম নমুনা আমরা খুঁজে পাইনি আর এছাড়াও জিনগত উপাত্ত যথেষ্ট নির্ভুল নয়। যেমন, “প্যান” আর “হোমো” – দের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বসূরি ৭ থেকে ৫.৫ মিলিয়ন বছর আগে কোনো সময় বেঁচে ছিল। 
Continue reading “মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”
মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস