স্টয়িসিজমের সহজ পাঠ

স্টয়িসিজম, বলা হয় বাস্তবতায় যারা জীবন কাটাতে চান তাদের জন্যে দর্শনের একই শাখাটি সৃষ্টি করা হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে জিনো অব কিটিয়াম ( বর্তমান সাইপ্রাসের লারনাকা) স্টয়িসিজম দর্শনের ধারণাগুলোর সূচনা করেছিলেন। কিন্তু এর তিনজন বিখ্যাত অনুশীলনকারীর জন্যে এই দর্শনটি মূলত পরিচিত, এপিকটিটাস, সেনেকা এবং মার্কাস অরেলিয়াস। দর্শনটি দাবী করে যে ভার্চু বা সদগুণ (যেমন, প্রাজ্ঞতা) হচ্ছে সুখ এবং কথা নয় কাজ বা আচরণ সুবিবেচনার ভিত্তি হওয়া উচিত, বাহ্যিক কোনো ঘটনা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, শুধুমাত্র সেই ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়া আর আমাদের নিজেদের উপরে নিয়ন্ত্রণ আছে। দর্শনটির খুব অল্প কিছু কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল। এটি চেষ্টা করে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে ঠিক কতটা অনিশ্চিৎ এই জগতটি হতে পারে। আমাদের জীবনের এই মুহূর্ত কত সংক্ষিপ্ত হতে পারে। কিভাবে আমরা নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দৃঢ়, অবিচলিত ও শক্তিশালী হতে পারি। এবং পরিশেষে, যুক্তি নয়, বরং সচেতন চিন্তা ছাড়াই ইচ্ছানিরপেক্ষ ইন্দ্রিয়ের উপর আবেগতাড়িত নির্ভরশীলতাই আমাদের সব অসন্তুষ্টির উৎস।

পৃথিবী সম্বন্ধে জটিল কোনো তত্ত্ব দিতে ব্যস্ত নয় এই দর্শন, বরং এটি আমাদের সহায়তা করতে চায় কিভাবে আমরা ক্ষতিকর আবেগগুলো থেকে নিজেদের মূক্ত করতে পারি, আর আসলেই যে কাজটি করা যায় সেই কাজটি যেন করতে পারি। এটি অন্তহীন বিতর্ক নয় বরং কাজের উপর প্রতিষ্ঠিত। দর্শনটির তিনজন অগ্রদূত ছিলেন। মার্কাস অরেলিয়াস, রোম সম্রাট ছিলেন তিনি, তার সময়ে পৃথিবী সবচেয়ে ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি, যিনি প্রায় সারাটি জীবন সাম্রাজ্যের সীমান্তে যুদ্ধ করেছিলেন রোম কেন্দ্রিক সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে, এবং তারপরও প্রতিদিন তিনি নিজের জন্যে ডায়েরী লিখেছেন, সংযম, সহমর্মিতা আর মানবতা ইত্যাদি নানা বিষয়ে। যা ছিল তার ধ্যান বা মেডিটেশন। এপিকটিটাস ছিলেন ক্রীতদাস, দাসত্বের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল, এবং তিনি তার নিজের একটি শিক্ষাকেন্দ্র খুলেছিলেন, যেখানে রোমের অনেক সেরা মন শিক্ষিত হয়েছিল এই দর্শনে। আর সেনেকা, প্রচুর চিঠিতে তিনি তার জীবনের দর্শন লিখে গেছেন, পরবর্তীতে রোম সম্রাট নিরোর নির্দেশে তাকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল।

কিন্তু এই পরিচিত তিনজন ছাড়াও এই দর্শন অনুশীলন করেছেন বহু রাজা, প্রেসিডেন্ট, শিল্পী, লেখক আর উদ্যোক্তারাও। বহু ঐতিহাসিক আর আধুনিক মানুষই তাদের জীবন দিয়ে প্রদর্শন করেছেন স্টয়িসিজম দর্শন কিভাবে জীবনে বাঁচার একটি উপায় হতে পারে। প্রাশিয়ার রাজা ফ্রেডেরিখ দ্য গ্রেট তার ঘোড়ার স্যাডেল-ব্যাগের মধ্যে এই দর্শনের বই রাখতেন, কারণ তিনি মনে করতেন, বিপদে এই বইগুলো তাকে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষা করবে। মনতাইন, রাজনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক দার্শনিক, সারাক্ষণ যেন দেখা যায় এভাবে তার চোখের সামনে এপিকটিটাসের একটি বাক্য খোদাই করে রেখেছিলেন। সতেরো বছরের জর্জ ওয়াশিংটনকে এই দর্শন সম্বন্ধে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তার এক প্রতিবেশী, পরে ভ্যালি ফর্জে সেই ভয়ঙ্কর শীতে তিনি কাটোকে নিয়ে একটি নাটক পরিচালনা করেছিলেন তার সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করতে। মারা যাবার সময় টমাস জেফারসনের বিছানার পাশেই ছিল সেনেকার একটি বই। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের বিশ্বের পারস্পরিক-নির্ভরশীল সংযোগ সংক্রান্ত তত্ত্বকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এই দর্শন – যা তার এক স্কুল শিক্ষক তাকে পরিচয় করিয়েছিলেন, তার সেই শিক্ষকটি মার্কাস অরিলিয়াসের লেখা অনুবাদ করেছিলেন। রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, জন স্টুয়ার্ট মিল, মার্কাস অরিলিয়াস আর স্টয়িসিজমের কথা উল্লেখ করেছিলেন তার ‘অন লিবার্টি’ বইটিতে, বলেছিলেন – প্রাচীন মনের এটি সর্বোচ্চ নৈতিক সৃষ্টি।

অন্য অনেক দর্শন ভাবনা থেকে স্টয়িসিজম ভিন্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থে: এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রায়োগিক, দৈনন্দিন দিনে যা ব্যবহার করা যাবে। এটি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়। এটি একটি উপকরণ যা আমরা ব্যবহার করতে পারি আমাদের দক্ষতাকে আরো শাণিত করতে, যেন আমরা আরো উত্তম মানুষে পরিণত হই। এটি একটি জীবন দর্শন, দর্শনের ধারণাপুষ্ট একটি জীবনের প্রস্তুতি, যেখানে মনে সঠিক অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনের অনুসারীরা কিছু অনুশীলন করেন, আধ্যাত্মিক অনুশীলন, সেখান থেকে তারা মানসিক শক্তি সংগ্রহ করেন। এই অনুশীলনের একটি হচ্ছে স্টয়িক মেডিটেশন।

যেমন :

স্টয়িক মেডিটেশন ১ : নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচন

Continue reading “স্টয়িসিজমের সহজ পাঠ”
স্টয়িসিজমের সহজ পাঠ