দ্য হিরো অ্যাস আর্টিস্ট

close-up-face-statue-of-david-in-florence-david-smith(ডেভিড, মাইকেলেঞ্জেলো)

কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন থেকে অনুবাদ – আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

‘কখনো কখনো মানুষ ভেবেছে যে রেনেসাঁ পর্বের ইতালীয়রা তাদের বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুহলতা থাকা সত্ত্বেও কেন চিন্তা বা দর্শনের ইতিহাসে আরো অনেক বেশী অবদান রেখে যায়নি। এর কারণ হচ্ছে সেই সময়ের সবচয়ে গভীরম ভাবনা শব্দে প্রকাশিত হয়নি বরং সেটি প্রকাশিত হয়েছিল দৃশ্যমান চিত্রকলায়।’ কেনেথ ক্লার্ক

The-Creation-of-Adam-1512-Michelangelo(ছবি: মাইকেলেঞ্জেলো, মানব সৃষ্টি)

ফ্লোরেন্স থেকে রোম, দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয় অনেকটাই, একরোখা, দ্রুতবুদ্ধির, ধীর আর সুন্দর গতিময় মানুষদের শহর থেকে গুরুগম্ভীর ভারী এমন একটি শহরে, যা মানুষের আশা আর উচ্চাকাঙ্খার সুবিশাল একটি কম্পোষ্ট বা জৈবসারের স্তুপের মত; সব অলঙ্কার থেকে বঞ্চিত, প্রায় দূর্ভেদ্য রহস্যাবৃত, রাজকীয় চাকচিক্যময়তার একটি জঙ্গল, যেখানে শুধুমাত্র একজন প্রাচীন সম্রাট, মারকাস অরেলিয়াস (১), দাড়িয়ে আছেন মাটির উপরে, বহু শতাব্দী জুড়ে সুর্যের আলোয়। মানদণ্ডও পরিবর্তিত হয়েছে। আমি ভ্যাটিকানের কোর্টইয়ার্ডে বা প্রাঙ্গনে দাড়িয়ে আছি, যার শেষ প্রান্তে স্থপতি ব্রামান্টে (২) একটি সান-ট্র্যাপ (৩) তৈরী করেছিলেন, যা পরিচিত বেলভেদেয়ার (৪) নামে, যেখান থেকে পোপ প্রাচীন এই শহরটির দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এর আকৃতি যদিও কোনো নিশের (৫) মত, তবে কোনো বিশাল আকারের ভাস্কর্যকে ধারণ করার বদলে, এটি আকারে ছিল সুবিশাল- আসলেই সবসময় এটি পরিচিত ছিল ‘ইল নিককিওনে’ নামেই- যার অর্থ ‘দানবাকৃতির নিশ’- এটি সুবিশাল পরিবর্তনের একটি বহির্মূখি এবং দৃশ্যমান প্রতীক, যা রেনেসাঁর সভ্যতাকে গ্রাস করেছিল ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো একটি সময়ে। স্বাধীন আর সক্রিয় মানুষদের পৃথিবী ছিল না সেটি আর বরং দানব আর বীরদের একটি পৃথিবী।

এই নিশের মধ্যে একটি মানুষকে ধারণ করতে পারে এমন বড় আকারের ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরী একটি পাইন-কোনের ভাস্কর্য আছে। এটি এসেছে এর আগের দানবদের জগত থেকে, প্রাচীন রোমের সেই পৃথিবী থেকে, এবং এটি সম্ভবত হেড্রিয়ানের (৫) সমাধির ফিনিয়াল (৬) ছিল; কিন্তু মধ্যযুগে মনে করা হতো এটি হিপপোড্রোমের (৭) সেই বিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করছে, রথ বা চ্যারিওট প্রতিযোগিতার সময় যেখান থেকে রথ চালকরা তাদের ঘোড়া ঘুরিয়ে আনতেন। এবং যেহেতু এই হিপপোড্রোমে বহু খ্রিস্টীয় শহীদদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, এই জায়গাটাকেই খ্রিস্টীয় চার্চ তাদের প্রধান কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য নির্বাচন করেছিল। বিশাল, অস্পষ্ট একটি ধারণা, যদি ফ্লোরেন্স এর তীক্ষ্ম সুস্পষ্ট ধারণাগুলোর সাথে এর তুলনা করা হয়। কিন্তু রোমে এই সব ধারণাগুলো খুব একটা অস্পষ্ট ছিলনা, কারণ প্রাচীনকালের সুবিশাল আকারের ভবনগুলো সেখানে ছিল (৮০), আজ আমরা যতটা দেখি, সেই সময় তার চেয়ে আরো অনেক বেশী ছিল তাদের সংখ্যা। এমনকি তিন শতাব্দী পরও, যখন এই সব ভবনগুলোকে মার্বেল পাথরের খনির মত ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখানেই আমাদের অনুপাত ও মাত্রাবোধটি আরো বেশী সম্প্রসারিত হয়েছিল, বিস্ময়করভাবেই তারা এখনও আকারে অনেক বড়। মধ্যযুগে মানুষ এই দানবীয় আকার ও মাত্রায় নিষ্পেষিত বোধ করেছে নিজেদের। তারা দাবী করেছে এই সব ভবনগুলো নিশ্চয়ই নির্মাণ করেছে দানবরা অথবা বড় জোর, তারা এদের মনে করে নিয়েছে প্রাকৃতিক কোন প্রপঞ্চ হিসাবে – যেমন কোনো পর্বত – এবং এই সব দানবাকৃতির ভবনের মধ্যে তারা তাদের কুড়ে ঘর নির্মাণ করেছিল, ঠিক যেমন করে কেউ উপত্যাকা বা আশ্রয়দানকারী পাহাড়ের ঢালের সুযোগ নেয় তাদের বসতি বানাতে। রোম ছিল গরুর পাল আর ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো ছাগলদের শহর, অল্প কিছু দূর্গসদৃশ টাওয়ার ছাড়া যেখানে কোন কিছুই নির্মাণ করা হয়নি, যেখান থেকে প্রাচীন পরিবারগুলো তাদের অর্থহীন ও বিরাহীন দ্বন্দ চালিয়ে যেত – যে দ্বন্দ আক্ষরিকার্থেই সমাপ্তিহীন, কারণ তারা এখনও তাদের কলহ অব্যাহত রেখেছে।

Continue reading “দ্য হিরো অ্যাস আর্টিস্ট”

Advertisements
দ্য হিরো অ্যাস আর্টিস্ট

কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন

kenneth-clark-800x600-1(ছবি: কেনেথ ক্লার্ক)

(আসমা সুলতানা ও আমি কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন বইটি অনুবাদ করেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। সেই বইটির অনুবাদকের ভূমিকাটি নিচে প্রকাশ করলাম। সহ অনুবাদক শিল্পী আসমা সুলতানা কিংবা প্রকাশক কারো অনুমতি ছাড়াই কাজটি করছি। – কাজী মাহবুব হাসান)

কেন এই বইটি

শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে লেখা হয়েছে এমন উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ শিল্পকলার ইতিহাসবিদ স্যার কেনেথ ক্লার্ক এর ‘সিভিলাইজেশন’ বইটি অন্যতম। এই বইটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এর সঙ্গী একই শিরোনামে ১৩ পর্বের প্রামাণ্য ধারাবাহিকটির জন্য। ১৯৬৯ সালে বিবিসি টেলিভিশনের জন্য নির্মিত প্রথম রঙ্গীন এই প্রামাণ্য চিত্রটি, শুধুমাত্র বিষয়বস্তু নয় বরং আরো বেশ কিছু কারণেই ছিল যুগান্তকারী। সে বিষয়ে অবশ্য আমরা পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো। ২০০৫ এ প্রামাণ্যচিত্রটির হাই ডেফিনিশন ডিভিডি এবং ২০১১ সালে ব্লু রে ডিস্ক প্রকাশনা এবং ২০১৪ সালে লন্ডনে টেট ব্রিটেইন গ্যালারীতে দর্শক নন্দিত কেনেথ কèার্কের ব্যাক্তিগত শিল্পকলা সংগ্রহের প্রদর্শনী আরো একবার প্রমাণ করে কেনেথ ক্লার্ক এখনও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারাননি। সেকারণে সত্তরের দশকের শুরুর দিকে প্রকাশিত আমাদের প্রিয় এই বইটি বাংলায় অনুবাদ করার জন্য নির্বাচিত করতে আদৌ তেমন কোনো কিছু ভাবার প্রয়োজন পড়েনি। মোট ১৩ টি স্বতন্ত্র প্রবন্ধের একটি ধারাবাহিক আখ্যানের সূত্রে তিনি রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর অন্ধকার যুগের সময় পেরিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার নির্মাণে শিল্পকলা, স্থাপত্য, সাহিত্য, দর্শন, মানবতবাদ, যুক্তি এবং শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসের মিথস্ক্রিয়াকে উপস্থাপন করেছিলেন, তাঁর স্বভাবসুলভ শিথিল সততা আর সহজাত আবেগ আর কৃর্তত্বপূর্ণ সংবেদনশীলতায়। এখনও শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে ব্যপক আর সর্বব্যাপী মন্তব্য করার ক্ষেত্রে কোনো শিল্পসমালোচকই তাঁর মত এত সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেননি ।

সভ্যতা : কেনেথ ক্লার্ক এর একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গী

সিভিলাইজেশন: এ পারসোনাল ভিউ বাই কেনেথ ক্লার্ক , ঠিক এভাবেই প্রামাণ্য ধারাবাহিকটির নামকরণ করা হয়েছিল যখন ১৯৬৯ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী এর প্রথম পর্বটি বিবিসি টু টেলিভশনে সম্প্রচার করা হয়। উপশিরোনাম ‘এ পারসোনাল ভিউ বাই কেনেথ ক্লার্ক’ কদাচিৎ উল্লেখ করা হলেও এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সভ্যতার মতো সর্বব্যাপী একটি বিষয়কে নির্দিষ্ট পরিসীমায় প্রকাশ করার জন্য, এর মূল চিত্রনাট্যকার ও উপস্থাপক কেনেথ ক্লার্কের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অবধারিত, যেখানে তিনি মূলত নজর দিয়েছিলেন পশ্চিম ইউরোপের সভ্যতা এবং খুব সংক্ষিপ্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতার ইতিহাসের প্রতি। তখন বিবিসি টু এর কন্ট্রোলারের দ্বায়িত্বে ছিলেন খুব পরিচিত মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব ডেভিড অ্যাটেনবুরো । কারগরী কারণে প্রথম রঙ্গীন টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ দক্ষতায় বিবিসি’র অন্য চানেলগুলোর থেকে বেশ এগিয়ে ছিল তাঁর বিবিসি টু। দৃশ্যমান শিল্পকলা নিয়ে বোদ্ধা দর্শককে আকৃষ্ট করার অভিপ্রায়ে, একটি বড় পরিসরে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণে তিনি উৎসাহী হয়েছিলেন। কিন্তু কেনেথ ক্লার্ককে সেই প্রামাণ্য চিত্রে উপস্থাপক হিসাবে কেন নির্বাচিত করেছিলেন ডেভিড অ্যাটেনবুরো?

Continue reading “কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন”

কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন