পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক ও নিঃসঙ্গ নভোচারী

(কাজী মাহবুব হাসান | আসমা সুলতানা )

কল্পনা করুন আপনি একজন শিল্পী আর আপনার শিল্পকর্মটি সত্যিকারভাবে ‘আউট অব দিস ওয়ার্ল্ড’ অর্থাৎ পৃথিবীর বাইরে কোনো উন্মুক্ত গ্যালারীতে প্রদর্শিত হচ্ছে, শুধুমাত্র একটি শিল্পকর্মই সেখানে আছে, অবশ্য আক্ষেপও আছে, কারণ গ্যালারীটি দর্শকশূন্য ( নাকি দর্শক আছে !)। মধ্যযুগীয় নাইটদের সাহসী অভিযান আর রুশ-মার্কিন শীতল-যুদ্ধ চলাকালীন মহাশূন্য জয়ের প্রতিযোগিতায় নভোচারীদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সমন্বয় সৃষ্টির করার ভাবনার বেলজিয়ান শিল্পী পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক হচ্ছেন আপাতত পৃথিবীতে এমনই একমাত্র শিল্পী, এবং তার আক্ষেপের কারণ বেশ বিস্তারিত। চাঁদের ধুলায় শুয়ে আছে নিঃসঙ্গ নভোচারী, ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, প্রায় সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের ছোট এই ভাস্কর্যটি সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পী পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক।

১৯৬৯ সালের মার্চের এক সকালে শিল্পী হয়ডাঙ্ক ম্যানহাটানে তার গ্যালারীতে গিয়েছিলেন, গ্যালারী ডিরেক্টর লুইস ডয়েসম্যান, আর ম্যালিক ডিক ওয়াডলের মধ্যে চলমান বিস্ময়কর একটি কথোপকথনের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। ”কেন আমরা পলের একটি ভাস্কর্য চাঁদে প্রতিস্থাপন করছি না?” লুইসের আজব এই প্রশ্নের ওয়াডেলের উত্তর দেবার আগেই হয়ডাঙ্ক এই কথোপকথনে প্রবেশ করে মন্তব্য করেছিলেন, ”তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে’? কিভাবে আমরা সেই কাজটি করবো?” ডয়েসম্যান তার অবস্থানে অটল থেকেই বলেন, ”আমি জানিনা, তবে একটা উপায় আমি বের করবো”। এবং তিনি আসলেই সেটি করেছিলেন। ১৯৭১ সালে অগাস্ট মাসের ২ তারিখ, গ্রিনিচ স্ট্যান্ডার্ড সময় ১২:১৮ য় অ্যাপোলো -১৫ কম্যান্ডার স্কট সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা আলুমিনিয়ামের একটি ভাস্কর্য তার পার্ক করা ল্যুনার রোভারে কাছে ধূলার উপর শুইয়ে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে চাঁদ বাতাসহীন একটি পাথর খণ্ড থেকে রুপান্তরিত হয়েছিল আমাদের জানা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী স্থলে। স্কট সেই মুহূর্তটিকে মহাশূন্য অভিযানের প্রতিযোগিতায় জীবন বিসর্জন দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ বীর নভোচারীদের প্রতি একটি নিবেদন হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। ভাস্কর্যটির সাথে ছিল একটি ফলক, যেখানে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি মোট চৌদ্দজন ( আটজন যুক্তরাষ্ট্রের আর ছয় জন রুশ নভোচারী) নিহত নভোচারীর নাম লেখা ছিল।

আর ভ্যান হয়ডাঙ্ক শিহরিত হয়েছিলেন তার শিল্পকলা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মানব-নিয়তির নতুন সূচনার দিক নির্দেশ করছে, এবং আশা করেছিলেন তিনি খুব শীঘ্রই ”পিকাসোর চেয়ে আরো বড়” কিছুতে পরিণত হবেন। কিন্তু বাস্তবে তার চাঁদের ভাস্কর্যটি, ফলেন অ্যাস্ট্রোনট, উচ্ছাস নয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে ওয়াডেল গ্যালারী বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। নাসা ছাড়তে হয় নভোচারী স্কটকে। জনগনের প্রকল্প থেকে ব্যবসা করে লাভবান হবার জন্যে হয়ডাঙ্ককে অভিযুক্ত করা হয়, যিনি তার জন্মস্থান বেলজিয়ামে স্বল্প পরিচিত একটি শিল্পী জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন । প্রায় বিস্মরিত একটি ভাস্কর্য আর তিরষ্কৃত আশির দশকের এই শিল্পী এখনও ভাবেন তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমাদের মাথার উপর ২৩৮০০০ মাইল উঁচুতে এখনও ফলেন অ্যাস্ট্রোনট আমাদের নক্ষত্র ছোয়ার স্বপ্নকে ধারণ করে শুয়ে আছে। হয়ডাঙ্ক অবশ্য অতীতে বেঁচে থাকেননি। অ্যান্টওয়ার্পের কাছে একটি শহরতলীতে তিনি তার কাজ অব্যহত রেখেছিলেন, এবং তার শিল্পকর্মে মহাশূন্য, গ্রহ, নক্ষত্র আর নভোচারী চিরন্তন থিমটি তিনি অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।

১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কে একবার বেড়াতে আসার পর তিনি ওয়াডেল গ্যালারীর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে বেলজিয়ামে তিনি তার প্রথম স্পেস থিম একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন, জুল ভার্নের প্রতি মুগ্ধতা, আর্ট অ্যাকাডেমির স্থবিরতার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেই তিনি মহাশূন্য অভিযানের থিমে ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে নিউ ইয়র্কের ওয়াডেল গ্যালারীতে প্রথম প্রদর্শনীতে তার আর্টিস্ট স্টেটমেন্ট ঘোষণা করেছিল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক জায়গা হচ্ছে কেপ কেনেডি’। আর মহাশূন্য নিয়ে তার এই উন্মাদনাই ডয়েসম্যানকে উচ্চাভিলাষী সেই মন্তব্যটি করার জন্যে উদ্দীপ্ত করেছিল। তার প্রাথমিক অবিশ্বাসের পর, খুব সহজে তাকে রাজী করানো সম্ভব হয়েছিল এবং এক মাসের মধ্য তিনি সম্ভাব্য চাঁদের ভাস্কর্যটির কনসেপ্ট ড্রইং করতে শুরু করেন।

ধারণাটি মূলত ছিল প্রাক্তন বিজ্ঞাপন-বিপনন কর্মী ও গ্যালারি পরিচালক লুইস ডয়েসম্যানের, তিনি বিশ্বাস করতেন চাঁদে শুধু ভাস্কর্যই স্থাপন করা যাবে না, এটি আবশ্যিকও, তার স্মৃতিকথায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তখন স্পেস-এজ, নক্ষত্রে যাবার প্রতিযোগিতা চলছে, আমি বহু মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করি, কিন্তু একটি উপায় খুঁজে না পাওয়া অবধি আমি থামিনি’। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু ঘটনা এবং একজন মধ্যস্তকারীর সহায়তা হয়ডাঙ্ক ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে নিজেকে নভোচারী ডেভিড স্কট ও তার সহকর্মীদের সাথে এক টেবিলে বসে নৈশভোজ করতে আবিষ্কার করেছিলেন। তখনও অ্যাপোলো ১৫ র মিশন শুরু হতে আট সপ্তাহ বাকী। স্পষ্টতই স্কট আর হয়ডাঙ্কের পছন্দের কিছু বিষয় মিলেছিল, যেমন, প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা আর মধ্য-আমেরিকার মায়াদের পূরাণ, এবং একটি পর্যায়ে স্কট তার সহকর্মীদের জানান, ‘দেখো, এই ভদ্রলোক কি বলছেন, আসো, আমরা ওর একটা ভাস্কর্য চাঁদে নিয়ে যাই’।

হয়ডাঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরেই কাজে লেগে যান, তার ছেলে শিল্পী প্যাট্রিককে নিয়ে একটি প্লাস্টার আর প্লেক্সিগ্লাসের মডেল তৈরী করে ফেলেন, মানব-ভবিষ্যৎ যার বিষয়। কিন্তু হয়ডাঙ্কের ভবিষ্যতবাদী নান্দনিকতা আর স্কটের গম্ভীর দার্শনিক উদ্দেশ্য সমন্বয় করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি বেশ কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। শিল্পী হিসাবে তিনি একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, তিনি তার শিল্পকর্মের মূলভাবনায় রেখেছিলে মহাশূন্য অভিযাত্রীদের ঐতিহাসিক সেই যাত্রার উত্তেজনা আর বীরোচিত সাহস, ‘আমাদের সন্তানদের কাছে তারা হয়তো স্বাভাবিক, তবে তামাদের পৌত্রদের কাছে তারা পুরাণের চরিত্র’। কিন্তু স্কট ও তার সহযাত্রীরা ভেবেছিলেন আরো ব্যক্তিগত স্মারকসূচক কোনো কিছু হবে সেই শিল্পকর্মটি, ‘আমরা একমত হয়েছিলাম আমাদের সেইসব সহকর্মীদের সন্মান জানাতে, যারা মহাশূন্য অভিযানের প্রচেষ্টায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন, এই তালিকায় আমাদের সোভিয়েত সহকর্মীদেরও আমরা স্মরণ করতে চেয়েছিলাম’। তখন শীতল যুদ্ধের সময়, এটি অবশ্যই লক্ষণীয় একটি সিদ্ধান্ত, বিশেষ রুশ-মার্কিন মহাশূন্য জয়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার সময়।
লুনার মডিউলে নভোচারীরা কি সাথে নিতে পারবেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। এছাড়া এমন উপাদানে সেই ভাস্কর্যটি বানাতে হবে, যেন সেটি চাঁদে টিকে থাকার মত যথেষ্ট শক্তিশালী হবে, যেখানে দিনের তাপমাত্রা প্রায় ২৫০ ডিগ্রী স্পর্শ করে আর রাতে যা নেমে যায় শূন্যের ২৫০ ডিগ্রী নীচে। হয়ডাঙ্ক এই নন্দনতাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে ব্রুকলিনের একটি ঢালাই প্রতিষ্ঠান, মিলগো/বাফকিনের সাথে যোগাযোগ করেন । ভাস্কর্যটিকে অবশ্যই আকারে ছোটো হতে হবে, এবং স্কটের নির্দেশ অনুযায়ী এটি যেন বিশেষ কোনো জাতি বা বর্ণ এবং লিঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব না করে, যা তাপমাত্রার চরম তারতম্য সহ্য করতে পারবে। সুতরাং হয়ডাঙ্ককে এমন কিছু ডিজাইন করতে হবে যেখানে তার অতীতমূখী ভবিষ্যতবাদ আর আধ্যাত্মিক প্রকটতা, যা তার অন্য ভাস্কর্যে বৈশিষ্ট্যসূচক, মূলত এই প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়ে যাবে। ‘আমি এর চেয়ে ভালো কাজ করেছি, এটি সেরা ভ্যান হয়ডাঙ্ক নয়’। ব্রুস গিটিনের বানানো ছাঁচে অবশেষে তৈরী হয় মানবসদৃশ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, যার নির্মাণ উপাদান ছিল অ্যালুমিনিয়াম, কারণ এটিকে শক্তিশালী, আর হালকা হতে হবে। শিল্পী চেয়েছিলেন তার এই অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষুদ্র মূর্তিটি সোজা হয়ে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে।



অ্যাপোলো ১৫ যাত্রা শুরু হবার কথা ছিল জুলাই ২৬ তারিখে (১৯৭১)। ৮১ বছর বয়সে যখন তাকে স্মরণ করতে বলা হয় কিভাবে বিশাল একটি নিবেদিত টিমের কড়া নজরদারীর মধ্যে স্কট মূর্তিটিকে গোপনে চাঁদ অবধি নিয়েগিয়েছেন, তিনি স্বীকার করেছিলেন, বিষয়টি তার তার নিজেরই মনে নেই। কিন্তু চাঁদেরযেদিন তিনি পা দিয়েছিলেন তিনি জানতেন তার পকেটে মূর্তিটি আছে। জুলাই ৩০ তারিখে তাদের লুনার মডিউলটি চাঁদে নেমেছিল, স্কট এবং আরইউন সেখানে ৩ দিন কাটান। টান টান নিয়মবদ্ধ সময়ের হিসাবে তারা তাদের কাজগুলো সম্পাদন করেন।

একেবারের শেষ মূহূর্তে তিনি ফলেন অ্যাষ্ট্রোনেটের জন্য সময় বের করেছিলেন, এবং সেটির একটি ছবি তুলেছিলেন। আর তখনও পর্যন্ত কারোরই সেটি অস্তিত্ব জানা ছিলনা। নিয়মমাফিক পুরো চাঁদ অভিযানে তারা ১১০০ ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে হিউস্টনের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে মনোযোগ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন আরউইন আর স্কট ফলেন অ্যাস্ট্রোনটকে চাঁদের প্রথম নাগরিক হিসাবে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি তার পকেট থেকে মূর্তিটি বের করেন, চাঁদের ধুলোর উপর সরাসরি সেটি স্থাপন করেন, এর পাশে সেই স্মারক ফলকটি রাখেন যেখানে মৃত নভোচারীদের নামের একটি তালিকা ছিল। নিজের ধর্মবিশ্বাসকে তিনি প্রকাশ করেননি, তবে স্কট আধ্যাত্মিকভাবে তার এই নিবেদনটিকে একটি নীরব অন্তেষ্টিক্রিয়া হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। সামান্য একটি মিনিট, তারপর আবার দ্রুত তারা তাদের রুটিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর পাঁচ ঘন্টা পর লুনার মডিউল চাঁদকে পেছনে ফেলে চলে যায় অরবিটিং মডিউলের সাথে যুক্ত হবার জন্যে। তাকে সেই মুহূর্তটি, যখন তিনি প্রথম শিল্পকলাটিকে চাঁদে মাটিতে রেখেছিলেন, যখন মনে করতে বলা হয়েছিল, তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, যেন আমরা ভুলে না যাই কেন আমরা সেটি সেখানে রেখেছিলাম।

এটি ভূলে যাবার পর্বটি শুরু হয় পৃথিবীতে ফিরে আসার পর থেকে। ডেভিড স্কট সংবাদ সন্মেলনে এটি প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু বিষয়টি আসলেই সেভাবে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। আর নভোচারীদের মনে হয়ছিল এই কাজটি মৃত নভোচারীদের স্মরণেই তারা করেছিলেন। তিনি তার বার্তায় যোগ করেছিলেন, ‘দুঃখজনকভাবে দুটি নাম এখানে বাদ পড়েছে ( প্লেক থেকে, ভ্যালেন্টাইন বন্ডারেঙ্কো, গ্রিগরি নেলইয়ুবভ’। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের মৃত্যু সম্বন্ধে পরে জানতে পেরেছে কারণ সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচীকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তা, আরো একজন মৃত্যুবরণ করা নভোচারীর নাম বাদ পড়েছিল, রবার্ট হেনরী লরেন্স জুনিয়র, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী, বিমান-বাহিনীর অফিসার, যিনি ১৯৬৭ সালে তার মহাশূন্য যাত্রার প্রশিক্ষণের সময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। নভোচারীরা এরপর তাদের তারকা খ্যাতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর শিল্পী ভ্যান হয়ডাঙ্ক অদ্ভুত নীরবতায় তার কাজে ফিরে যান। মানব জাতিকে নক্ষত্রের জগতের দিকে নির্দেশিত করার সেই বিষয়টি ক্রমশ তার কাছে আরো বেশী স্বপ্নের মত অনুভূত হতে শুরু করেছিল।
নাসার মিশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্কট শিল্পী ভাস্করের নাম উচ্চারণ করেননি, অনেকটাই অজ্ঞাতনামা একটি স্মারক হিসাবে তিন সেটি চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন, আর স্কট ( খুব অদ্ভতভাবেই) ধারণা করেছিলেন, শিল্পী নিজেও সেটাই চেয়েছেন। শুরুর দিকে এটি মেনে নেয়া ছাড়া হয়ডাঙ্কের আর কিছু করার ছিলনা, যদিও তার বোঝাপড়া সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন ছিল। তিনি অ্যাপোলো ১৫ নভোচারীদের লিখেছিলেন, ‘এই শতাব্দীতে মানুষের মহাকাশ অভিযানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন’। স্কটকে লেখা আলাদা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘দুঃখিত তুমি চাঁদে পুরোনো মন্দির পাওনি, তবে নিশ্চয়ই চাঁদের উপর হাটার অভিজ্ঞতা তোমাকে ভিন্ন মাত্রার একটি বাস্তবতায় নিশ্চয়ই নিয়ে গিয়েছিল’। কিন্তু ক্রমশ ভ্যান হয়ডাঙ্ক অস্থির হতে শুরু করেছিলেন এই কৃতিত্বটি না দাবী করতে পেরে, যা তিনি আসলেই মনে করেছিলেন তার ঐতিহাসিক একটি সৃষ্টি। এই মতবিরোধটি স্পষ্ট প্রকাশ পায় সেপ্টেম্বর মাসে, বেলজিয়ামে একটি কনফারেন্সে যখন নভোচারী স্কটের সাথে দেখা হয়েছিল তার, সেখানে তাকে বলা হয়, আরো একবছর এই ভাস্কর্য বিষয়ে কারো কাছে কিছু না বলতে।
এছাড়াও তিনি ‘ফলেন অ্যাস্ট্রেনট’ নামটি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার মনে এটি মহাকাশ অভিযানের উদ্দেশ্য বীরযাত্রা এমন কিছু নির্দেশ করে না।। নভোচারী, বিশেষ করে স্কট তার অনুমতি ছাড়াই এই নামটি ব্যবহার করেছিলেন। নভোচারী স্কট অবশ্য পরে মনে করতে পারেননি কিভাবে নামটি এসেছিল, তবে সম্ভবত সেই সময়ে সয়ুজে অভিযানে মারা যাওয়া তিনজন কসমোনটের কথা মনে করেই এই নামটি তার মনে এসেছিল। নভোচারীদের কাছে হয়ডাঙ্কের শিল্পকর্মটি ছিল মূলত একটি নামফলকসহ স্মারক।

কিন্তু পরে যখন এই অভিযান সংক্রান্ত নাসার প্রকাশিত বুকলেটে ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’ এর ভাস্কর হিসাবে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, তখন হয়ডাঙ্ক আর সহ্য করতে পারেননি। তাকে নীরব রাখার একটাই কারণ তিনি ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন, আর সেটি হচ্ছে ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যাবার একক কৃতিত্ব দাবী করার লক্ষ্যে নভোচারীদের একটি চাল। এবং এই ফাটলটি আরো প্রশস্ত হয়েছিল যখন নভেম্বরে তিনি নভোচারীদের কাছ থেকে একটি চিঠি পান যে, স্মিথসোনিয়ান ইন্সস্টিটিউট চাঁদে রাখা ভাস্কর্যটির একটি অনুলিপি রাখার অনুমতি চাইছে। এবং তারা মনে করেন যে এই প্রস্তাবে তার রাজি হওয়া উচিৎ। এবং অবশ্যই তাদের একটি হুবহু অনুলিপি দরকার, একই উপাদান, একই রকম দেখতে এবং একটি শিল্পীর সৃষ্টি অনুলিপি। ‘তারা এটি কিনতেও রাজী আছে যদি তুমি আরো দুটো বানাও’। তবে ভান হয়ডাঙ্ক দ্বিগুণভাবে অপমানিত বোধ করেছিলেন, প্রথমত, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম শিল্পী হিসাবে তার সাথে না বরং নভোচারীদের সাথে যোগাযোগ করেছিল, কারণ শিল্পীর নাম তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কাছে গোপন রেখেছিলেন, এবং সেই আমন্ত্রণপত্রে তাকে ভাস্কর হিসাবে উল্লেখ না করে বলা হয়েছে ‘কারিগর’। আর তিনি কখনোই এই অপমান ভুলতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কারিগর না আমি শিল্পী, তোমরা যদি চাঁদে গিয়ে গর্ব করতে পারো, আমিও গর্ব করতে পারি সেখানে আমার একটি ভাস্কর্য আছে’।

পরিশেষে অবশ্য তার অহংকার হার মানে ভবিষ্যতের অমরত্বের আশায়। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামের জন্যে তিনি দুটি রেপ্লিকা নির্মাণ করেন । যাদের একটি তাদের স্থায়ী জায়গা পায় National Air and Space Museum এ, অন্যটি শিল্পী উপহার দেন বেলজিয়ামের রাজাকে। আর হিউস্টনের একই নির্মাতার কাছ থেকে সেই স্মৃতি ফলকটির একটি অনুলিপি তৈরী করার ব্যবস্থা করেছিলেন স্কট।

স্মিথসোনিয়ান থেকে আসা অনুরোধ হয়ডাঙ্ককে তার নীরবতা ভাঙ্গতে প্ররোচিত করেছিল। নিউ ইয়র্কে তার প্রতিনিধি ওয়াডেল গ্যালারীর মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল যে, এটি প্রথম প্রচার হবে সিবিএস নিউজের অ্যাঙ্কর ওয়াল্টার ক্রংকাইটের মাধ্যমে, যিনি অ্যাপোলো ১৬ মিশনের আগে ঘোষণা করবেন চাঁদে ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী কে ।

১৯৭২ সালে মার্চে হয়ডাঙ্ক স্কটকে সতর্ক করে দেন তিনি টিভি সাক্ষাৎকার দেবেন, চাঁদে প্রথম শিল্পকর্ম নিয়ে। এর উত্তর স্কট জানান, ‘হয়তো তোমাকে এর উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করা হবে, যে প্রশ্নটি অর্থপূর্ণ উত্তর শুধু আমরা নভোচারীরা দিতে পারি’। কিন্তু হয়ডাঙ্ক তার চূড়ান্ত মন্তব্য করেন হাতে লেখা একটি নোটে, ‘সিবিএস যে যাওয়ার একমাত্র কারণ সেটি ঘোষণা দেয়া যে, এই শিল্পকর্মটি আমার ডিজাইন করা, যা আপনি স্বাভাবিক বলে মনে করবেন। একজন শিল্পীর কোনো শিল্পকর্মের স্রষ্টা হিসাবে পরিচিত হবার অধিকার আছে। আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি একমাত্র শিল্পী যার কাজ পুরোপুরিভাবে সে মহাশূন্যের প্রতি নিবেদিন হিসাবে পরিচিত, এবং শিল্পকলার জগতে এই বিষয়ে ক্রমশ কথাবার্তা হচ্ছে। আমি আপনার বার্তা পুরোপুরি বুঝতে পারছি, কিন্তু কোনোভাবে এই স্মারকটিকে আমি খাটো করছিনা’।

কিন্তু স্কট এটি পছন্দ করেননি, কারণ তার মনে হয়েছিল এই অজ্ঞাত থাকার ব্যপারটি তাদের সহকর্মী আত্মত্যাগের প্রতি নিবেদিত স্মারকটিকে আরো মহৎ করে তুলেছে। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ভাবনা বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। ১৯৭২ সালের এপ্রিলের ১৬ তারিখ হয়ডাঙ্ক টিভিতে ঘোষণা করেন, হাতে একটি রেপ্লিকা নিয়ে, ‘আমি মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলাম, নক্ষত্রের জগতই মানুষের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ’, তিনি বলেন, ‘এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্মারক ভাস্কর্য’, কিন্তু কংক্রাইট স্মরণ করিয়ে দেন, ‘না, পৃথিবী নয়, এই মহাবিশ্বে, আর চাঁদে সেখানে এটি রাখা হয়েছে’।

শিল্পী হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবার পর, তার আশাবাদ ফিরে এসেছিল। এবার নিশ্চয়ই তিনি তার ভাস্কর্যগুলোর জন্যে পরিচিতি পাবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন বেশীদিন টেকেনি। অবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেই সময় মানুষ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনেট’ পছন্দ করেনি, তারা ভাবতে পারেননি চাঁদে এই ভাস্কর্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি কারণ ছিল হয়ডাঙ্ক যে বিদেশী সেটা নিউ ইয়র্কের শিল্পীরা পছন্দ করেননি, একজন বিদেশী, বিত্তশালী তবে দ্বিতীয় শ্রেণীর গ্যালারী যাকে প্রতিনিধিত্ব করে চাঁদে ভাস্কর্য স্থাপন করার কোনো যোগ্যতা তার নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমস সমালোচনা করে বলে এটি স্ফীত টিউনিং ফর্ক ছাড়া আর কিছু না। ততদিনে চাঁদে অভিযানের আগ্রহ কমে গেছে সরকারী পর্যায়ে, বেশ কিছূ মিশন বাতিল ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।

ডিক ওয়াডেল শিল্পীর সম্মতিতে একটি নিয়তিনির্ধারক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ৯৫০ টি শিল্পীর সাক্ষরিত রেপ্লিকা ৭৫০ ডলার করে বিশেষ আগ্রহী সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এবারে তারা বিজ্ঞাপনও দেন। শিল্পী জানতেন নভোচারীরা বিষয়টি পছন্দ করবেন না, কিন্তু এই কাজটি থামানোর কোনো ইচ্ছাও তার ছিলনা। স্কট আর হয়ডাঙ্কের মধ্যে চিঠি আদান প্রদান হয়, কিন্তু হয়ডাঙ্ক এর হাতে আসলেই আর কোনো উপায় ছিলনা। কিন্তু তাদের এই ভিন্নমতটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকতো। কিন্তু এখানে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, অ্যাপোলো ১৫ -র নভোচারীরা কিছু কভার স্ট্যাম্প নিয়ে গিয়েছিল, যাদের চাঁদের পোস্টমার্ক সহ ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কথা ছিল এর ১০০ টি এমন কভার স্ট্যাম্প ২১০০০ ডলার দিয়ে জার্মান কালেকটর হেরমান কিনে নেবেন, যে টাকাটি ব্যবহার করা হবে নভোচারীদের সন্তানদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট সৃষ্টি করতে। কথা ছিল এগুলো বিক্রি করা হবে পরে যখন নভোচারীরা নাসার সাথে যুক্ত থাকবেন না। কিন্তু হেরমান প্রায় সাথে সাথে তার বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। এর জন্যে বিপদে পড়েছিলেন নভোচারীরা, তাদের কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তদন্ত কমিটির কাছে এই রেপ্লিকা বিক্রিও গ্রহনযোগ্য ছিলনা। এর পরের বছরগুলোয় বেশ কিছূ তদন্ত হয়, এছাড়া চাঁদের মিশন নিয়ে আগ্রহ কমে যেতে শুরু করে।

জেরার মুখে স্কট স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে এই প্রকল্পে নভোচারীদের কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু মাত্র ৫০ টি কপি তৈরী করার পর ওয়াডেল গ্যালারী প্রকল্পটি বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনাগুলো শিল্পী এবং গ্যালারীর জন্যে নেতিবাচক প্রচারণা ছিল, কংক্রাইটের ইন্টারভিউর পর একটি প্রমাণ্য চিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল ‘স্পেস চাইল্ড’ নামে, কিন্তু সেটি কখনোই প্রদর্শন করা হয়নি। আর ওয়াডেল গ্যালারীর ব্যবসাও মুখ থুবড়ে পড়েছিল, ডিক ওয়াডেল হতাশায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫০ বছরের মারা যান। হয়ডাঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরে যান এবং তার কাজ অব্যহত রাখেন মূলত সবার অগোচরে। নভোচারী তিনজনও একপর্যায়ে নাসা থেকে চাকরী ছেড়ে দেন। বেশ পরে নাসা পুনতদন্ত কভার-স্ট্যাম্প সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে নভোচারীদের দায়মুক্তি দিয়েছিল।


ইতিহাদবিদরা ফলেন অ্যাস্ট্রোনটের দিকে নজর না দিলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে ঘটনাটির চল্লিশ বছর পর শিল্পীকে মিউজিয়ামে বক্তৃতা দেবার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। স্কটের সাথে যোগাযোগ করেন, তিনিও সেই অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা, কিন্তু বিস্ময়ের সাথে জানতে পারেন স্কটদের সেই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণই করা হয়নি। এর কারণ পরে অবশ্য বলা হয়েছিল বাজেটের অভাব। তবে যাই হোক স্কটের ক্ষোভ একটুও কমেনি, তিনি বলেন, ‘আমি একমাত্র মানুষ যে কিনা ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যেতে পারতো, আর সেটি কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা’। সেদিন উপস্থিত প্রায় ৪০ জন, এছাড়া অ্যান্ডি ওয়ারহোল, অ্যানি লেইবোভিৎস, নরমান রকওয়েলের কাজের পাশে সাজানো তার ফলেন অ্যাস্ট্রোনেট, কিন্তু একমাত্র তারই একটি শিল্পকর্ম পৃথিবীর বাইরে আছে। তিনি পুরো কাহিনীটি বলেন এবং নভোচারীদের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমার মত ভীতু মানুষ কখনোই মহাশূন্যে যেতে পারতো না’।

(সমাপ্ত)

পল ভ্যান হয়ডাঙ্ক ও নিঃসঙ্গ নভোচারী

ইয়োহানেস ভারমিয়ের: নিরাভিমান সৌন্দর্য দেখার চোখ..

( গ্রেট থিংকার্স সিরিজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান)

girl-with-a-pearl-earring-5(Girl with a Pearl Earring c. 1665)

মিথ্যা গ্ল্যামার বা চাকচিক্যপূর্ণ মোহিনী সৌন্দর্যে সম্পৃক্ত একটি পৃথিবীতে আমরা বাস করি। বাস্তবিকভাবে, সমস্যাটির মূল কিন্তু গ্ল্যামারে নয়, বরং সেই সব বিষয়গুলোতে, যেগুলোকে গ্ল্যামারাস বলে বিবেচনা করবো বলে আমরা সামষ্টিকভাবে ঐক্যমতে পৌছেছি। অবশ্যই  এই গ্ল্যামারের পুরো ধারণাটিকে আমাদের জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে কোনো অগ্রগতি হবে না। এর পরিবর্তে বরং আমাদের যা করা প্রয়োজন সেটি হচ্ছে আমাদের প্রশংসা আর উত্তজেনাগুলো আরো প্রজ্ঞার সাথে সেই সব জিনিসগুলোর প্রতি নির্দেশিত করা, যেগুলো আসলেই মর্যাদা পাবার যোগ্যতা রাখে।

শিল্পীরা মৌলিক যে কাজটি আমাদের জন্যে করতে পারেন, সেটি হচ্ছে এই গ্ল্যামারের স্পটলাইটি সবচেয়ে সেরা, – ও সবচেয়ে সহায়ক দিকে – ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তারা সেই জিনিসগুলো শনাক্ত করতে পারেন, আমাদের যা উপেক্ষা করার প্রবণতা আছে, কিন্তু আদর্শিকভাবেই আমাদের যা অনেক বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিৎ। এবং যে পেলবতা, সৌন্দর্য আর প্রজ্ঞার সাহায্যে তারা সেইসব জিনিসগুলো আঁকেন, আমরাও সেই জিনিসগুলোর সত্যিকার মূল্য অনুধাবন করতে শিখি।

Continue reading “ইয়োহানেস ভারমিয়ের: নিরাভিমান সৌন্দর্য দেখার চোখ..”

ইয়োহানেস ভারমিয়ের: নিরাভিমান সৌন্দর্য দেখার চোখ..

ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিয়েডরিখ: অসীমের সীমানা

গ্রেট থিংকার্স সিরিজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

Close your physical eye, so that you may see your picture first with the spiritual eye. Then bring what you saw in the dark to the light, so that it may have an effect on others, shining inwards from outside. A picture must not be invented, it must be felt.  C.D.Friedrich

Caspardavidfriedrich_self1-1(Self-portrait,1800)

অপ্রত্যাশিতভাবেই  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটি যা শিল্পকলা আমাদের জন্যে করতে পারে, সেটি হচ্ছে আমাদের এটি শেখাতে পারে কিভাবে দুঃখ সহ্য করতে হয়। এটি সেটি করতে পারে সেই দৃশ্যগুলো আমাদের মনে জাগিয়ে ‍তুলে, যা অন্ধকার, বিষণ্ন, কষ্টকর, আর সংশয় আর বিচ্ছিন্নতায় আমরা হয়তো যে যন্ত্রণার অভিজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি সেটিকে স্বাভাবিকীকরণ ও মর্যাদা দান করে।, মাহাত্ম্য আর কারিগরী দক্ষতায় তারা উন্মোচন করে, দুঃখ মানবিক এই পরিস্থিতির আবশ্যিক একটি অংশ।

703px-Caspar_David_Friedrich_-_Wanderer_above_the_sea_of_fog-41Wanderer above the Sea of Fog (1818)

মহিমান্বিত দুঃখের একজন চিত্রকর ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিয়েডরিখ ১৭৭৪ সালে বাল্টিক সাগরের তীরে উত্তর-জার্মানীর একটি প্রাচীন বাণিজ্যিক শহর, গ্রাইফসভাল্ডে জন্মগ্রহন করেছিলেন। খুবই সুন্দর একটি শহর, উত্তর জার্মানীর কঠোরতার মানদণ্ডে যা হতে পারে। এই জায়গাটি আগে পরিচিত ছিল সুইডিশ পোমেরানিয়া নামে।

Continue reading “ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিয়েডরিখ: অসীমের সীমানা”

ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিয়েডরিখ: অসীমের সীমানা

এডওয়ার্ড হপার: নিঃসঙ্গ সূর্যমুখী

গ্রেট থিংকার্স প্রজেক্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে – আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

If you could say it in words, there would be no reason to paint.  Edward Hopper

Self-portraits: Edward Hopper

এডওয়ার্ড হপার সেই সব বিষণ্ন দেখতে বহু চিত্রকর্মের চিত্রকর, যেগুলো আমাদের বিষণ্ন করে তোলেনা। এর পরিবর্তে , সেগুলো আমাদের নিঃসঙ্গতাকে শনাক্ত করতে আর মেনে নিতে সহায়তা করে যা প্রায়শই সব বিষণ্নতার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে।

automatAutomat (1927)

তার বিখ্যাত ‘অটোম্যাট’ চিত্রকর্মে, আমরা একটি রমণীকে একাকী বসে কফি পান করতে দেখি। স্পষ্টতই অনেক রাত, আর তার গরম কাপড়ের কোট, মাথার হ্যাট দেখে আমরা বলতে পারি বাইরে বেশ ঠাণ্ডাও। ঘরটিকে মনে হয় বেশ বড়, উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত এবং সেখানে আর কাউকে আমাদের চোখে পড়েনা। অন্দরসজ্জাও খুবই ব্যবহারিক, রমনীটি দেখতে মনে হয় আত্ম-সচেতন, অপ্রতিভ, খানিকটা ভীত। হয়তো এভাবে বাইরে কোথায় একাকী বসে থাকতে সে অভ্যস্ত নয়। স্পষ্টতই যেন মনে হয় কোনো খারাপ কিছু ঘটেছে। সে দর্শককে আমন্ত্রণ জানায় তাকে নিয়ে কাহিনী কল্পনা করতে, বিশ্বাসঘাতকতা অথবা কোনো কিছু হারানোর। মনে হয় যেন সে চেষ্টা করছে তার হাত যেন না কাপে, যখন যে কফির কাপ তার ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসছে। উত্তর আমেরিকার যে কোনো অন্ধকার বড় শহরের ফেব্রুয়ারীর রাত এগারোটার দৃশ্য হতে পারে এটি।

Continue reading “এডওয়ার্ড হপার: নিঃসঙ্গ সূর্যমুখী”

এডওয়ার্ড হপার: নিঃসঙ্গ সূর্যমুখী

সাই টম্বলি: সাংবেশিক আঁচড়ের বিমূর্ত ইশারা

গ্রেট থিংকার্স প্রজেক্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

বিমূর্ত শিল্পকলা সম পরিমান বিরক্ত আর সংশয় উদ্রেক করা অব্যাহত রেখেছে। আপনি হয়তো জানেন বিমূর্ত শিল্পকলা কেমন: শূন্য সাদা একটি ক্যানভাস, ঠিক মাঝখানে গভীর কালো একটি , হলুদ পটভূমির উপর  বেগুনী রঙের একটি ছোপ, আটটি ইস্পাতের দণ্ড এলোমেলো স্তুপাকারে সাজানো, এর মানে কি হতে পারে ? কেউ কি ঠাট্টা করছে আমাদের সাথে? একটা শিশুও তো পারে …..

(Rose Series)

আরো খানিকটা সহমর্মিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করতে (যা উপযোগী আর পক্ষপাতহীন হবে) আমাদের প্রথম মূলনীতিতে ফিরে যেতে হবে এবং জিজ্ঞাসা করতে হবে:  কোনো কিছু আসলেই যেমন দেখতে সেটি সেভাবে না দেখানোর মধ্যে ভালো কি বিষয় থাকতে পারে? বিমূর্ত শিল্পকলার কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্যটি হচ্ছে সব ধরনের প্রতিনিধিত্বকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি আবেগের কাছে পৌছানো। সঙ্গীতের মত, বিমূর্ত শিল্পকলাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ইকোইং হিসাবে (অর্থাৎ মূল শব্দ শেষ হবার পর সেটির প্রতিধ্বনি) অথবা, আমাদের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অথবা মেজাজের একটি রুপ দেয়া। কিছু কিছু বিষয় হয়তো আপেক্ষিকভাবে সহজবোধ্য, যেমন, প্রশান্তি অথবা ক্রোধ, অন্যগুলো ভাষায় সহজে সংজ্ঞায়িত করার অসম্ভব। সেকারণে এমন কিছু বলা খুব একটা সহায়ক নয়: এই পেইন্টিংটা তো কোনো কিছুর মত দেখতে না। সত্যি, এটি বাইরের পৃথিবীর কোনো কিছুর মত দেখতে নয় ঠিকই, কিন্তু তার কারণ অভ্যন্তরের জগতকে প্রতিনিধিত্ব করাই এটির মূল উদ্দেশ্য। বরং যে প্রশ্নটি আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিৎ হবে: এই পেইন্টিংটি দেখে ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছে?  এটি কি আমার কোনো আবেগীয় অবস্থাকে জাগিয়ে তুলছে? মানব জাতির কোন আভ্যন্তরীণ দৃশ্যপটকে এখানে হাজির হবার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে?

Continue reading “সাই টম্বলি: সাংবেশিক আঁচড়ের বিমূর্ত ইশারা”

সাই টম্বলি: সাংবেশিক আঁচড়ের বিমূর্ত ইশারা

দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা মইনুল আহসান সাবের ভাইকে বইটি প্রকাশ করার জন্যে।
দেখার দৃষ্টিভঙ্গি
জন বার্জারের ওয়েজ অব সিইং এর অনুবাদ
অনুবাদ: আসমা সুলতানা, কাজী মাহবুব হাসান
প্রচ্ছদ পরিকল্পনা: আসমা সুলতানা
প্রকাশক: দিব্য প্রকাশ

রকমারি ডট কম লিংক:

https://www.rokomari.com/book/170587/dekhar-drishtivongi–ways-of-seeing-

WOS_book_2018

দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত

নৈনসুখ

20 nainsukh 01
(আত্মপ্রতিকৃতি, নৈনসুখ, ১৭৭০)

রাজহংসীকে দেখে অসাড় এক মালিক
নৈনসুখ (১৭১০-১৭৮৪)

(পরবর্তী প্রজেক্টের একটি অধ্যায়, পাহাড়ী রীতির মিনিয়েচার শিল্পী গুলেরের নৈনসুখকে নিয়ে কিছু কথা :
  কাজী মাহবুব হাসান  এবং আসমা সুলতানা)

শত শত ভারতীয় মিনিয়েচার চিত্রকর্ম দেখে একটি খেলা আপনি শুরু করতে পারেন, এর নাম দিতে পারেন, মোগল মিনিয়েচার বিংগো। সেখানে কি দাম্ভিক কোনো রাজকুমার আছে খুব ঋজু শিরদাড়াসহ? চেক। বিশাল তাবু বা বড় আকারের কোনো শিবির? চেক। সঙ্গীত আর বাদ্যশিল্পীরা? রাজসভায় জমায়েত সদস্যরা? চমৎকার বাগান? চেক, চেক, চেক। এইসব চিত্রকর্মগুলোর বেশীরভাগই নিখুঁত সুন্দর, দক্ষতা ও কারিগরী দিক থেকে, তবে সেগুলো নিয়ন্ত্রিত, এমনকি হিসাব নিকাশ করে উপস্থাপিত চিত্রকর্ম। আপনি অনুভব করতে শুরু করবেন এইসব চিত্রকর্মগুলো কোনো চিন্তাভাবনা না করেই আঁকা নিয়মমাফিক কাজ, এবং এই কাজগুলো যারা করার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের প্রতি শিল্পীদের আনুগত্য এবং বশ্যতার বিষয়টিও আপনি অনুভব করতে পারবেন।

Continue reading “নৈনসুখ”

নৈনসুখ

এটাই আমি : অমৃতা শের-গিল

 

185N09318_7ZKB2 (2)

Self-portrait by Amrita Sher-Gil (1933)

 

অমৃতা শের-গিল : এটাই আমি
১৯১৩-১৯৪১

(সুনীল খিলনানীর একটি লেখা অবলম্বনে: কাজী মাহবুব হাসান এবং আসমা সুলতানা)

‘ঈশ্বর! এই যাত্রার চৌম্বকীয় আকর্ষণ থেকে অনুগ্রহ করে আমাকে রক্ষা করো’। (১) ( অমৃতা শের-গিল, ১৯৩৩)

ভ্যান গো থেকে ড্যাস স্নো, কোনো শিল্পীর অকালমৃত্যু তাকে ঘিরে বেশ লাভজনক একটি অলৌকিক আভা প্রদান করে, বিশেষ করে যদি মৃতদেহের ব্যক্তিত্ব ক্যানভাসগুলোর মতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে থাকে। শিল্পী অমৃতা শের-গিল, বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শিল্পকলার প্রথম তারকা – খুবই আরাধ্য পণ্যদ্রব্যে রুপান্তরিত হয়েছিলেন, যখন মাত্র আঠাশ বছর বয়সে প্রথাবিরোধী একটি জীবন কাটানোর পর রহস্যময় একটি পরিস্থিতিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।  শিল্পী এম এফ হুসেইন পরে যখন তার অবস্থানকে চিহ্নিত করেছিলেন ‌‌’ভারতীয় শিল্পকলার রাণী’ হিসাবে, তবে এই বিশেষণটি অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে ধারমুক্ত ছিল না (২)। যখন বেঁচে ছিলেন, তার সমসাময়িক  পুরুষ শিল্পীরা প্রায়শই শের-গিলের মর্যাদা হানি করেছিলেন শুধুমাত্র একজন ‘উচ্চাকাঙ্খী প্ররোচনাদায়ী শিল্পী’ হিসাবে তাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে। সাংবাদিক ম্যালকম মাগেরিজ, যার সাথে শের-গিলের সংক্ষিপ্ত এবং তীব্র প্রেমের সম্পর্ক ছিল, মন্তব্য করেছিলেন, শের-গিল, ‌’বরং অতি আত্ম-সচেতন আত্মাম্ভরিতাপূর্ণভাবেই শৈল্পিক’ (৩)।  যে বাক্যটি শুনলে একটি প্রশ্নের কথা মনে হয়, একজন কর্মরত শিল্পী এরচেয়ে অন্যকিছু কি হতে পারে? আমার মনে হয়, তার মোহনীয়তা, এবং তার জীবনের দূঃখজনক পরিণতি শুধুমাত্রই একটি পাদটীকা – যদিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ সেই পাদটিকাটি – সেই সত্যটির, তিনি আসলেই ছবি আঁকতে জানতেন, এবং আধুনিক ভারতের অমসৃন আর ক্রটিপূর্ণ সত্তার মহান একজন চিত্রকর ছিলেন।

Continue reading “এটাই আমি : অমৃতা শের-গিল”

এটাই আমি : অমৃতা শের-গিল