মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: কিভাবে আমরা সেপিয়েন্স হলাম.. (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্বিতীয় অধ্যায়: সংস্কৃতি, বিবর্তনীয় বেগবর্ধক

“সংস্কৃতি মানব বংশধারার আবির্ভাবে কারণ হয়েছিল কিছু অস্ট্রালোপিথেকাস হাতিয়ার নির্মাতাদের বিবর্তন তরান্বিত করার মাধ্যমে। তাদের বর্ধিত শারীরিক কাঠামো এবং বর্ধিত মস্তিস্কের আয়তন হোমিনাইজেশন প্রক্রিয়াটির সূচনা করেছিল, যা আরো বৃহত্তর এবং আরো সহযোগিতাপূর্ণ মানব সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভবের কারণ হয়েছিল, যেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করেছিল “ভাষাতাত্ত্বিক গ্রুমিং বা পরিচর্যা” ((  রবিন ডানবার তার “গ্রুমিং,গসিপ এবং ইভোল্যুশন অব ল্যাঙ্গুয়েজ” বইয়ে ভাষার বিবর্তনকে বুঝতে একটি নতুন উপায় প্রস্তাব করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী একটি সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি করার পদ্ধতি হিসাবে ভাষা বিবর্তিত হয়েছিল: গসিপ বা গাল-গল্প করার মাধ্যমে। এটি মানুষদের সহায়তা করেছিলেন অন্য প্রাইমেটদের তুলনায় আরো বড় গোষ্ঠীতে থাকার জন্য। শিকারী প্রাণির আক্রমণ থেকে বাঁচতে আমাদের পূর্বসূরিরা যে বড় গোষ্ঠীগুলো তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিল”।


অস্ট্রালোপিথেকাসদের কিছু বংশধারাকে মানুষে রূপান্তরিত করেছিল কী? আমরা বিশ্বাস করি এই প্রশ্নের উত্তর বেশ সুস্পষ্ট: সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বলতে এখানে নির্দেশ করা হচ্ছে যে-কোনো একগুচ্ছে আচরণিক বৈশিষ্ট্য, প্রতীক এবং ধারণা, যা কোনো একটি প্রাণি গোষ্ঠী স্থানিক ( একই গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে) এবং  কালিক (প্রজন্মান্তরে) স্তরে ভাগাভাগি করে নেয়। এই সংজ্ঞানুযায়ী, ডলফিন অথবা শিম্পাঞ্জিদের গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, যদিও মানুষের ওপর যে মাত্রায় এটির বিবর্তনীয় প্রভাব আছে, সেভাবে এই প্রাণিদের উপর এটি প্রভাব ফেলতে পারেনি। অস্ট্রালোপিথেকাসদের বিশেষ কিছু বংশধারায় সংস্কৃতি কি ভিন্নভাবে বিকশিত পারে, যখন দ্বিপদী আচরণ তাদের হাতগুলোকে অন্য কাজ করার জন্য মুক্ত করে দিয়েছিল? হ্যাঁ, ২০১৫ সালে আমরা যেমন দেখেছিলাম, যখন আবিষ্কৃত হয়েছিল হোমোদের উদ্ভবের আগেই পাথরের টুল বা হাতিয়ার তৈরি করা শুরু হয়েছিল। কেনিয়ার টুরকানা হৃদের পশ্চিম তীরের নিকটে একটি জায়গা, লোমেকউই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় প্রাগৈতিহাসবিদ সোনিয়া হারমন্ডের ( সিএনআরএস এবং স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়) নেতৃত্ব একটি দল আমাদের জানা আছে এমন সবচেয়ে প্রাচীন পাথর-নির্মিত হাতিয়ার বা টুল আবিষ্কার করেছিলেন, যেগুলো  প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল। আর সেকারণে এটি হোমিনিন জীবনাচরণে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের স্মারক। হোমো জিনাস বা গণের সবচেয়ে প্রাচীন যে জীবাশ্মটি আবিষ্কৃত হয়েছে সেটি হচ্ছে একটি আংশিক চোয়ালের হাড়, ‘জ এলডি ৩৫০ -১’, যার সাথে এখনও ছয়টি দাঁত যুক্ত হয়ে আছে। এটি পাওয়া গিয়েছিল ইথিওপিয়ায় লেডাই গেরারুতে, এবং এর সময়কাল ২.৮ মিলিয়ন বছর আগের কোনো একটি সময়। লোমেকোয়াই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আবিষ্কৃত হাতিয়ারগুলো ইঙ্গিত করছে একটি প্রস্তর সংস্কৃতি, যা এখন পরিচিত ‘লোমেকুইয়ান’ সংস্কৃতি নামে, এভাবে হোমো জিনাসের সবচেয়ে প্রাচীনতম জীবাশ্মের চেয়েও আধা মিলিয়ন বছর প্রাচীন। এই সংশয়পূর্ণ বিষয়টি সবচেয়ে সরলতম ব্যাখ্যা হচ্ছে – এই অস্ত্রগুলো তৈরি করেছিলসেই সময়ে অস্তিত্ব ছিল এমন হোমিনিডরাই, অস্ট্রালোপিথেকাসদের কেউ।

সংস্কৃতিবান কিন্তু চ্যাপটা-মুখো

সোনিয়া হারমন্ডের দল নিকটবর্তী এলাকায়  আরেকটি আবিষ্কারের দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, কেনিয়ানথ্রোপাস প্ল্যাটিওপস (কেনিয়ার চ্যাপটা-মুখো মানব), একটি জীবাশ্মের নমুনা, যা নরবানরদের মত বৈশিষ্ট্যসূচকে দীর্ঘ মুখ প্রদর্শন করেনি বরং এর ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক সংক্ষিপ্ততর একটি মুখ, যেখানে কিছু জীবাশ্মবিদ অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস ও আদি হোমো – উভয় প্রজাতির বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কেনিয়ানথ্রোপাস প্লাটিওপস সম্ভবত অস্ট্রালোপিথেকাসের মত একই বিবর্তনীয় স্তরে অবস্থিত ছিল, বিশেষ করে অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেননসিস, যারা একই এলাকা একই সময়ে বসবাস করেছিল। যেহেতু ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগে কেনিয়ায় কোনো ভিনগ্রহবাসী থাকার কথা নয়, সেকারণে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত উপসংহার হচ্ছে – অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেননসিস অথবা কেনিয়ানথ্রোপাস প্লাটিওপস প্রজাতির সদস্যরাই লোমেকউই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আবিষ্কৃত পাথরের হাতিয়ারগুলো নির্মাণ করেছিল। কিন্তু যারাই এগুলো নির্মাণ করুক না কেন আমরা সুনির্দিষ্টভাবেই বলতে পারি যে প্রথম হাতিয়ার-নির্মাতাদের সময়কাল অস্ট্রালোপিথেকাসদের বিবর্তনীয় পর্বে ছিল। হাতিয়ার নির্মাণ একটি সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ, যা এসেছিল এমন একটি সংস্কৃতি থেকে, যা হোমোদের পূর্ববর্তী।

কিন্তু আমরা কি এমন কিছু আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? হ্যাঁ, আর এর কারণ হচ্ছে এমন: প্রাইমেটবিশেষজ্ঞ এবং নৃতত্ত্ববিদ জেন গুডঅল ১৯৬০ এর দশক থেকে তানজানিয়ার গম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্ক শিম্পাঞ্জীদের নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, তার সেই গবেষণা থেকে আমরা জানি মানব নয় এমন হোমিনিডরা হাতিয়ার ব্যবহার করে। কিন্তু তারা পরিস্থিতি লব্ধ হাতিয়ার ব্যবহার করে, যেমন কোনো ভারী লাঠি বা পাথর, কোনো গর্ত খুঁড়তে অথবা কোনো বাদামের খোলস ভাঙ্গতে। লোমেকউই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আবিষ্কৃত পাথরের হাতিয়ার এর ব্যতিক্রম, উদ্দেশ্যমূলকভাবেই আঘাত করে তৈরি করা পাথরের হাতিয়ার, যেগুলোর ধারালো প্রান্ত আছে। এগুলো তৈরি করা হয়েছিল দুটি কৌশল ব্যবহার করে – একটি স্থির নেহাইয়ের উপর হাতিয়ার বানানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত পাথরটিকে সরাসরি আঘাত করে (বড় পাথরের উপর পাথরটিকে আঘাত করে প্রয়োজনীয় রূপ দেয়া) অথবা কোনো স্থির নেহাইয়ের উপর বাইপোলার বা দ্বিমেরু বা উভয় দিক থেকে আঘাত দিয়ে ( পাথরকে রূপ দেয়া আরেকটি পাথর ব্যবহার করে একটি অন্য একটি পাথরের উপরে রেখে)।  এই জটিলতাগুলো ইঙ্গিত করছে যে এসব কৌশলগুলো উপর এই গোষ্ঠীটি দক্ষতা অর্জন করেছিল, আর এভাবেই একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাঠামোর মধ্যে এটি সম্প্রচারিত হয়েছিল (ছবি ৬)।

উপরন্তু এই দুটি পদ্ধতি পাথরের হাতিয়ার খোদাই প্রদর্শন করছে যে, প্রজাতির বিবর্তনের মত, প্রযুক্তিগত বিবর্তনও ঝোপের মত বহু শাখাপ্রশাখাযুক্ত: এই কৌশলগুলো নিরন্তরভাবে বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছিল, শাখা তৈরি করেছিল, যেগুলো আবার দ্রুত মারা গিয়েছিল, কিন্তু মূল কাণ্ডটির বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ ( সিএনআরএস) এর প্রাগৈতিহাসবিদ হেলেন রোশ, যিনি এই গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন, তিনি ব্যাখ্য করেছিলেন: “প্লাইও-প্লাইস্টোসিন আচরণিক বিবর্তন বেশ জটিল একটি বিষয়, জৈববৈজ্ঞানিক বিবর্তনের মতই জটিল”। প্লাইও-প্লাইস্টোসিন, আমাদের লক্ষ করা উচিত, হচ্ছে লোমেকউই ৩ এর যুগ।

ছবি ৬: পাথরের হাতিয়ার নির্মাণ -পাথর “ন্যাপিং” পক্রিয়াগুলো প্রথম হোমো সেপিয়ন্সদের আবির্ভূত হবার বহু আগেই অনেক অগ্রসর ছিল। এই কৌশলগুলোর অন্তর্ভুক্ত সরাসরি আঘাত ব্যবহার করে মুক্ত হস্তে ন্যাপিং প্রথমে একটি পাথরকে ধারালো করে তোলা (১) এরপর একটি বাইফেস তৈরি করা (বাইফেস অর্থ যখন দুইপাশ থেকেই পাথর অপসারণ করে হাতিয়ার তৈরি করা হয়।), একটি নরম স্ট্রাইকার বা আঘাতকারী দিয় পরোক্ষ আঘাত (৩) ((‘লিথিক রিডাকশন’ পদ্ধতিতে হাতিয়ার তৈরি করার জন্য ‘ন্যাপিং’ হচ্ছে ফ্লিন্ট, চের্ট, অবসিডিয়ান অথবা ‘কনকয়ডাল ফ্র্যাকচারিং’ পাথরের [যে পাথরগুলো ভেঙ্গে যায় পৃথক হবার কোনো নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক সমতল অনুসরণ করে না] ইত্যাদির আকৃতি দেয়া । আর ‘লিথিক রিডাকশন’ প্রত্নতত্ত্বে বিশেষ করে প্রস্তর যুগে উদ্ভাবিত একটি পদ্ধতি, যা ব্যবহার করে পাথরের রূপ দেয়া হতো এটির প্রাকৃতিক রূপ থেকে কিছু অংশ ক্রমান্বয়ে আঘাতের মাধ্যমে অপসারণ করে, যেন এগুলোকে হাতিয়ারে পরিণত করা যায়))।
Continue reading “মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”
মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নীল শুবিন এর ইয়োর ইনার ফিশ

In this three-part series evolutionary biologist and the author of the best-selling book Your Inner Fish, Neil Shubin reveals the story of life on Earth hidden within in our bodies. From the badlands of Ethiopia to the shores of Nova Scotia, he searches for clues that lie bruied in rock and searches for answers written in our DNA. (PBS)

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

নীল শুবিন এর ইয়োর ইনার ফিশ

আমাদের পারিবারিক বৃক্ষ


শীর্ষ ছবি: All in the Family, টাইম ম্যাগাজিন/নেচার ( http://blog.joinsmsn.com/usr/c/h/chobjay47/10/
human%20tree(0).jpg)

(লেখকের কথা: রিমা চাড্ধা’র Our Family Tree অবলম্বনে। রিমা চাড্ধা’র Our Family Tree একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ স্লাইড শো । খুব সহজবোধ্য উপাস্থপনের জন্য স্লাইডগুলো বাংলায় রুপান্তরিত করেছি, রিমা চাড্ধা Nova Science now এবং Nova online এর সহকারী সম্পাদক)

‘হমিনিড’ বা গ্রেট এইপদের পরিবারের মধ্যে আমার সবচেয়ে বুদ্ধিমান হতে পারি, কিন্তু অন্য গ্রেট এইপ: শিম্পান্জ্ঞি, বনোবো এবং ওরাং উটান -দের সাথে আমাদের অনেক কিছুরই মিল আছে । অন্যদিকে লেসার প্রাইমেট, যেমন বানরদের, সাথে আমাদের বড় পার্থক্যগুলো হচ্ছে, আমরা সহ পাঁচ হমিনিড প্রাইমেটদের কোন লেজ নেই, শরীরের আকারও বড় আর বুদ্ধিমত্তাও বেশী। এমনকি আমাদের ডিএনএ’র শতকরা ৯৮ ভাগই একরকম। তারপরও কিছু পার্থক্য আছে, আমাদের এই পরিবারের সদস্যেদের মাঝে, যেমন, খাদ্যাভ্যাস, মেজাজ আর সামাজিক আচরণে। এই সরলীকৃত আমাদের পারিবারিক বৃক্ষে সংক্ষেপে এবং সামগ্রিকঅর্থে আমাদের সাথে অন্যান্য গ্রেট-এইপদের কি ধরনের সদৃশ্যতা বা বিসদৃশ্যতা আছে তা দেখানো হয়েছে :

Continue reading “আমাদের পারিবারিক বৃক্ষ”

আমাদের পারিবারিক বৃক্ষ