মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: কিভাবে আমরা সেপিয়েন্স হলাম.. (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্বিতীয় অধ্যায়: সংস্কৃতি, বিবর্তনীয় বেগবর্ধক

“সংস্কৃতি মানব বংশধারার আবির্ভাবে কারণ হয়েছিল কিছু অস্ট্রালোপিথেকাস হাতিয়ার নির্মাতাদের বিবর্তন তরান্বিত করার মাধ্যমে। তাদের বর্ধিত শারীরিক কাঠামো এবং বর্ধিত মস্তিস্কের আয়তন হোমিনাইজেশন প্রক্রিয়াটির সূচনা করেছিল, যা আরো বৃহত্তর এবং আরো সহযোগিতাপূর্ণ মানব সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভবের কারণ হয়েছিল, যেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করেছিল “ভাষাতাত্ত্বিক গ্রুমিং বা পরিচর্যা” ((  রবিন ডানবার তার “গ্রুমিং,গসিপ এবং ইভোল্যুশন অব ল্যাঙ্গুয়েজ” বইয়ে ভাষার বিবর্তনকে বুঝতে একটি নতুন উপায় প্রস্তাব করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী একটি সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি করার পদ্ধতি হিসাবে ভাষা বিবর্তিত হয়েছিল: গসিপ বা গাল-গল্প করার মাধ্যমে। এটি মানুষদের সহায়তা করেছিলেন অন্য প্রাইমেটদের তুলনায় আরো বড় গোষ্ঠীতে থাকার জন্য। শিকারী প্রাণির আক্রমণ থেকে বাঁচতে আমাদের পূর্বসূরিরা যে বড় গোষ্ঠীগুলো তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিল”।


অস্ট্রালোপিথেকাসদের কিছু বংশধারাকে মানুষে রূপান্তরিত করেছিল কী? আমরা বিশ্বাস করি এই প্রশ্নের উত্তর বেশ সুস্পষ্ট: সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বলতে এখানে নির্দেশ করা হচ্ছে যে-কোনো একগুচ্ছে আচরণিক বৈশিষ্ট্য, প্রতীক এবং ধারণা, যা কোনো একটি প্রাণি গোষ্ঠী স্থানিক ( একই গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে) এবং  কালিক (প্রজন্মান্তরে) স্তরে ভাগাভাগি করে নেয়। এই সংজ্ঞানুযায়ী, ডলফিন অথবা শিম্পাঞ্জিদের গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, যদিও মানুষের ওপর যে মাত্রায় এটির বিবর্তনীয় প্রভাব আছে, সেভাবে এই প্রাণিদের উপর এটি প্রভাব ফেলতে পারেনি। অস্ট্রালোপিথেকাসদের বিশেষ কিছু বংশধারায় সংস্কৃতি কি ভিন্নভাবে বিকশিত পারে, যখন দ্বিপদী আচরণ তাদের হাতগুলোকে অন্য কাজ করার জন্য মুক্ত করে দিয়েছিল? হ্যাঁ, ২০১৫ সালে আমরা যেমন দেখেছিলাম, যখন আবিষ্কৃত হয়েছিল হোমোদের উদ্ভবের আগেই পাথরের টুল বা হাতিয়ার তৈরি করা শুরু হয়েছিল। কেনিয়ার টুরকানা হৃদের পশ্চিম তীরের নিকটে একটি জায়গা, লোমেকউই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় প্রাগৈতিহাসবিদ সোনিয়া হারমন্ডের ( সিএনআরএস এবং স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়) নেতৃত্ব একটি দল আমাদের জানা আছে এমন সবচেয়ে প্রাচীন পাথর-নির্মিত হাতিয়ার বা টুল আবিষ্কার করেছিলেন, যেগুলো  প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল। আর সেকারণে এটি হোমিনিন জীবনাচরণে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের স্মারক। হোমো জিনাস বা গণের সবচেয়ে প্রাচীন যে জীবাশ্মটি আবিষ্কৃত হয়েছে সেটি হচ্ছে একটি আংশিক চোয়ালের হাড়, ‘জ এলডি ৩৫০ -১’, যার সাথে এখনও ছয়টি দাঁত যুক্ত হয়ে আছে। এটি পাওয়া গিয়েছিল ইথিওপিয়ায় লেডাই গেরারুতে, এবং এর সময়কাল ২.৮ মিলিয়ন বছর আগের কোনো একটি সময়। লোমেকোয়াই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আবিষ্কৃত হাতিয়ারগুলো ইঙ্গিত করছে একটি প্রস্তর সংস্কৃতি, যা এখন পরিচিত ‘লোমেকুইয়ান’ সংস্কৃতি নামে, এভাবে হোমো জিনাসের সবচেয়ে প্রাচীনতম জীবাশ্মের চেয়েও আধা মিলিয়ন বছর প্রাচীন। এই সংশয়পূর্ণ বিষয়টি সবচেয়ে সরলতম ব্যাখ্যা হচ্ছে – এই অস্ত্রগুলো তৈরি করেছিলসেই সময়ে অস্তিত্ব ছিল এমন হোমিনিডরাই, অস্ট্রালোপিথেকাসদের কেউ।

সংস্কৃতিবান কিন্তু চ্যাপটা-মুখো

সোনিয়া হারমন্ডের দল নিকটবর্তী এলাকায়  আরেকটি আবিষ্কারের দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, কেনিয়ানথ্রোপাস প্ল্যাটিওপস (কেনিয়ার চ্যাপটা-মুখো মানব), একটি জীবাশ্মের নমুনা, যা নরবানরদের মত বৈশিষ্ট্যসূচকে দীর্ঘ মুখ প্রদর্শন করেনি বরং এর ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক সংক্ষিপ্ততর একটি মুখ, যেখানে কিছু জীবাশ্মবিদ অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস ও আদি হোমো – উভয় প্রজাতির বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কেনিয়ানথ্রোপাস প্লাটিওপস সম্ভবত অস্ট্রালোপিথেকাসের মত একই বিবর্তনীয় স্তরে অবস্থিত ছিল, বিশেষ করে অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেননসিস, যারা একই এলাকা একই সময়ে বসবাস করেছিল। যেহেতু ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগে কেনিয়ায় কোনো ভিনগ্রহবাসী থাকার কথা নয়, সেকারণে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত উপসংহার হচ্ছে – অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেননসিস অথবা কেনিয়ানথ্রোপাস প্লাটিওপস প্রজাতির সদস্যরাই লোমেকউই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আবিষ্কৃত পাথরের হাতিয়ারগুলো নির্মাণ করেছিল। কিন্তু যারাই এগুলো নির্মাণ করুক না কেন আমরা সুনির্দিষ্টভাবেই বলতে পারি যে প্রথম হাতিয়ার-নির্মাতাদের সময়কাল অস্ট্রালোপিথেকাসদের বিবর্তনীয় পর্বে ছিল। হাতিয়ার নির্মাণ একটি সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ, যা এসেছিল এমন একটি সংস্কৃতি থেকে, যা হোমোদের পূর্ববর্তী।

কিন্তু আমরা কি এমন কিছু আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? হ্যাঁ, আর এর কারণ হচ্ছে এমন: প্রাইমেটবিশেষজ্ঞ এবং নৃতত্ত্ববিদ জেন গুডঅল ১৯৬০ এর দশক থেকে তানজানিয়ার গম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্ক শিম্পাঞ্জীদের নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, তার সেই গবেষণা থেকে আমরা জানি মানব নয় এমন হোমিনিডরা হাতিয়ার ব্যবহার করে। কিন্তু তারা পরিস্থিতি লব্ধ হাতিয়ার ব্যবহার করে, যেমন কোনো ভারী লাঠি বা পাথর, কোনো গর্ত খুঁড়তে অথবা কোনো বাদামের খোলস ভাঙ্গতে। লোমেকউই ৩ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আবিষ্কৃত পাথরের হাতিয়ার এর ব্যতিক্রম, উদ্দেশ্যমূলকভাবেই আঘাত করে তৈরি করা পাথরের হাতিয়ার, যেগুলোর ধারালো প্রান্ত আছে। এগুলো তৈরি করা হয়েছিল দুটি কৌশল ব্যবহার করে – একটি স্থির নেহাইয়ের উপর হাতিয়ার বানানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত পাথরটিকে সরাসরি আঘাত করে (বড় পাথরের উপর পাথরটিকে আঘাত করে প্রয়োজনীয় রূপ দেয়া) অথবা কোনো স্থির নেহাইয়ের উপর বাইপোলার বা দ্বিমেরু বা উভয় দিক থেকে আঘাত দিয়ে ( পাথরকে রূপ দেয়া আরেকটি পাথর ব্যবহার করে একটি অন্য একটি পাথরের উপরে রেখে)।  এই জটিলতাগুলো ইঙ্গিত করছে যে এসব কৌশলগুলো উপর এই গোষ্ঠীটি দক্ষতা অর্জন করেছিল, আর এভাবেই একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাঠামোর মধ্যে এটি সম্প্রচারিত হয়েছিল (ছবি ৬)।

উপরন্তু এই দুটি পদ্ধতি পাথরের হাতিয়ার খোদাই প্রদর্শন করছে যে, প্রজাতির বিবর্তনের মত, প্রযুক্তিগত বিবর্তনও ঝোপের মত বহু শাখাপ্রশাখাযুক্ত: এই কৌশলগুলো নিরন্তরভাবে বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছিল, শাখা তৈরি করেছিল, যেগুলো আবার দ্রুত মারা গিয়েছিল, কিন্তু মূল কাণ্ডটির বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ ( সিএনআরএস) এর প্রাগৈতিহাসবিদ হেলেন রোশ, যিনি এই গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন, তিনি ব্যাখ্য করেছিলেন: “প্লাইও-প্লাইস্টোসিন আচরণিক বিবর্তন বেশ জটিল একটি বিষয়, জৈববৈজ্ঞানিক বিবর্তনের মতই জটিল”। প্লাইও-প্লাইস্টোসিন, আমাদের লক্ষ করা উচিত, হচ্ছে লোমেকউই ৩ এর যুগ।

ছবি ৬: পাথরের হাতিয়ার নির্মাণ -পাথর “ন্যাপিং” পক্রিয়াগুলো প্রথম হোমো সেপিয়ন্সদের আবির্ভূত হবার বহু আগেই অনেক অগ্রসর ছিল। এই কৌশলগুলোর অন্তর্ভুক্ত সরাসরি আঘাত ব্যবহার করে মুক্ত হস্তে ন্যাপিং প্রথমে একটি পাথরকে ধারালো করে তোলা (১) এরপর একটি বাইফেস তৈরি করা (বাইফেস অর্থ যখন দুইপাশ থেকেই পাথর অপসারণ করে হাতিয়ার তৈরি করা হয়।), একটি নরম স্ট্রাইকার বা আঘাতকারী দিয় পরোক্ষ আঘাত (৩) ((‘লিথিক রিডাকশন’ পদ্ধতিতে হাতিয়ার তৈরি করার জন্য ‘ন্যাপিং’ হচ্ছে ফ্লিন্ট, চের্ট, অবসিডিয়ান অথবা ‘কনকয়ডাল ফ্র্যাকচারিং’ পাথরের [যে পাথরগুলো ভেঙ্গে যায় পৃথক হবার কোনো নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক সমতল অনুসরণ করে না] ইত্যাদির আকৃতি দেয়া । আর ‘লিথিক রিডাকশন’ প্রত্নতত্ত্বে বিশেষ করে প্রস্তর যুগে উদ্ভাবিত একটি পদ্ধতি, যা ব্যবহার করে পাথরের রূপ দেয়া হতো এটির প্রাকৃতিক রূপ থেকে কিছু অংশ ক্রমান্বয়ে আঘাতের মাধ্যমে অপসারণ করে, যেন এগুলোকে হাতিয়ারে পরিণত করা যায়))।
Continue reading “মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”
মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – কিভাবে আমর সেপিয়েন্স হলাম.. (প্রথম পর্ব)

ভূমিকা

হোমো সেপিয়েন্স খুবই অদ্ভুত একটি প্রাণি। আমাদের পূর্বসূরিরা প্রথমে গাছে বাস করতেন, আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে তারপর তারা মাটিতে – নিচে নেমে এসেছিলেন, তারপর তারা দ্বিপদী প্রাণিতে পরিণত হয়েছিলেন এবং অবশেষে পুরো পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করেছিলেন – আর সেখান থেকেই অসীম সম্ভাবনার অভিমূখে তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। আচরণের এই পরিবর্তন এখনোও সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর অন্যতম, কিন্তু আমরা এটি সমাধান করার পথে রয়েছি, প্রাগৈতিহাসিক বিজ্ঞানগুলোর বিস্ময়কর সাম্প্রতিক অগ্রগতির কল্যাণে।

জীবাশ্মীভূত ডিএনএ পৃথক, সংগ্রহ আর অনুক্রম করার মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে, প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে আমরা এই পৃথিবীটিকে কমপক্ষে আরো তিনটি মানব প্রজাতিদের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম, এবং আমরা জানি যে, সেপিয়েন্সরা, আফ্রিকার একটি প্রজাতি – যারা আফ্রিকার বাইরে দুটি অন্য প্রজাতির সাথে আন্তঃপ্রজনন করেছিল। নতুন জীবাশ্ম থেকে আমরা আরো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি, আমাদের পূর্বসূরিরা শুধুমাত্র পূর্ব আফ্রিকায় উদ্ভুত হয়নি, বরং আসলেই তারা একটি সমগ্র-আফ্রিকার প্রজাতি ছিলেন। আমরা আরো আবিষ্কার করেছি যে, ইতোপূর্বে যা আমরা ভাবতাম, তার চেয়ে আরো এক লক্ষ বছর আগে সেপিয়েন্সরা আসলেই প্রথমবারের মত তদের সমগ্র-আফ্রিকাব্যাপী সূতিকাগারটি ত্যাগ করেছিল।

যদিও বহু বছরের গবেষণার মাধ্যমে হোমো সেপিয়েন্সদের সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যে অনেক কিছু আবিষ্কার করেছি, কিন্তু কিভাবে আমরা বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে মানুষে পরিণত হয়েছিলাম সেই সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে এখনো বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন আছে । জলবায়ুর পরিবর্তন কি আমাদের তথাকথিত পূর্বসূরিদের জঙ্গল থেকে সাভানার সমতল অভিমূখে যাত্রাটিকে পরিচালিত করেছিল, যা ধারাবাহিক কিছু জটিল শারীরস্থানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করেছিল? এটি  কি তবে বাইপেডালিজম বা দ্বিপদী হবার কারণে ঘটেছিল, যা অন্য কাজের জন্য আমাদের হাতগুলোকে মুক্ত করেছিল? হাতিয়ারের ব্যবহার? আমাদের বড় মস্তিস্ক? তবে আমরা কি মানুষে পরিণত হয়েছি, কারণ আমরা সহমর্মী এবং সহযোগিতা করতে সক্ষম?

দীর্ঘ সময় ধরে, বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী তত্ত্ব ছিল। তারপর, ২০১৫ সালে আমরা বিস্ময়কর একটি আবিষ্কার করেছিলাম : ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগে, যে এলাকাটি বর্তমানে কেনিয়া, হাত দিয়ে বানানো পাথরের হাতিয়ার বা উপকরণ। সবচেয়ে প্রাচীনতম মানব জীবাশ্মটির সময়কাল পরিমিত হয়েছে ২.৮ মিলিয়ন বছর, সুতরাং যে হাত এইসব হাতিয়ার তৈরি করেছিল সেগুলো অবশ্যই মানুষ হতে পারে না। এই হাতগুলো খুব সম্ভবত ছিল অষ্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতিদের সদস্যদের, প্রাক-মানব একটি প্রজাতি। তাহলে হাতিয়ার আমাদের মানুষে পরিণত করেনি।

এই সংবাদটি আমাদেরকে আরো মনোযোগ সহকারে আমাদের পূর্বসূরিদের পর্যবেক্ষণ করতে প্ররোচিত করেছিল, সেপিয়েন্সদের সম্বন্ধে আরো নতুন কিছু যা আবিষ্কারের কারণ হয়েছে। এই ধারাবাহিকে ‘হমিনাইজেশন’ বা মানবে পরিণত হবার প্রক্রিয়ার আনুক্রমিক পর্বগুলো নিয়ে মূলত আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে, অর্থাৎ  প্রাক-মানব পর্ব থেকে হোমো হিসাবে বিবর্তনীয় রূপান্তর ( যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মানুষে রূপান্তরিত হবার সাংস্কৃতিক দিকগুলোও), অস্ট্রালোপিথেকাসদের সাথে যা আফ্রিকায় শুরু হয়েছিল তিন মিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় পূর্ব থেকে। এটি ছিল বিস্ময়কর একটি রূপান্তর, যে রূপান্তরটি একটি অদ্ভুত, অনন্য, ঋজু প্রাণিদের সৃষ্টি করেছিল, যাদের শক্তিশালী বৌদ্ধিক ক্ষমতা আছে, যাদের সবেচয়ে বিবর্তিত রূপটি, সেপিয়েন্স, এর সব পূর্বসূরিদের বংশঐতিহ্য ধারণ করে।

আমরা এখন জানি যে, সেপিয়েন্সদের অগ্রসর বৌদ্ধিক ক্ষমতার প্রাথমিক ভূমিকা হচ্ছে আমাদের টিকে থাকতে সহায়তা করা। কিন্তু কোথায়? প্রকৃতিতে, নাকি,  সমাজে? প্রকৃতিতে যখন একা, সেপিয়েন্সরা তখন দূর্বল, কিন্তু দলবদ্ধভাবে আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে সবেচেয়ে দুর্ধর্ষ শিকারি। পরিবেশগতভাবে এটি অসম্ভব অনুভূত হয় : একটি সর্বব্যাপী প্রজাতি যারা প্রকৃতিকে তাদের বাসস্থানে পরিণত করেছিল – যে বাসস্থানটি এখন বৈশ্বিক মাত্রা অর্জন করেছে। এই ধারাবাহিকে এই রহস্যময় বিবর্তনীয় কাহিনিটি  ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হবে। এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রাণির ইতিহাস: আপনি।

প্রথম অধ্যায় : নরবানরের উত্তরসূরি এক দ্বিপদী

“প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রাচীন প্রাইমেটদের প্রথম মানুষ রূপে বিবর্তিত হবার চালিকা শক্তি ছিল। এটি শুধুমাত্র আমাদের পূর্বসূরিদের দ্বিপদী প্রাণিতেই রূপান্তরিত করেনি, মাটির উপর সোজা হয়ে হাঁটতে পারার ক্ষমতা, চলাফেলার জন্য যা অনেক বেশি দক্ষতর একটি উপায় হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু এছাড়াও এটি একটি স্ব-দৃঢ়ীকরণের চক্রের সূচনা করেছিল: যত বেশি দ্বিপদী তারা হয়েছিল, মাটিতে প্রয়োজনীয় সম্পদ আরোহণ করতে তত বেশি তারা সফল হয়েছিল, যা দ্বিপদী আচরণকে আরো দৃঢ়তর করেছিল..। যদিও, শুধুমাত্র এটি ব্যাখ্যা করতে পারে না, কেন মানুষরা স্থায়ীভাবে দ্বিপদী প্রাণিতে পরিণত হয়েছিল”।

১৭৪৮ সালে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের মত মানুষরা প্রাণিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। উদ্ভিদ ও প্রাণীবিজ্ঞানী কার্ল লিনেয়াস (১৭০৭-৭৮) তার “সিস্টেমা নাটুরি” ( দ্য সিস্টেম অব নেচার – প্রকৃতির পদ্ধতি) বইয়ে সমজাতীয় এক গোষ্ঠী প্রাণিদের সাথে আমাদের বিন্যস্ত করেছিলেন – একটি জিনাস বা গণ – যার নাম তিনি দিয়েছিলেন “হোমো”, এবং আমাদের শ্রেণিবিন্যাস করেছিলেন “সেপিয়েন্স” হিসাবে, যার অর্থ “জ্ঞানী”। আজ, হোমো সেপিয়েন্স হচ্ছে একমাত্র অস্তিত্বশীল মানব রূপ।

স্তন্যপায়ী প্রাণি হিসাবে – উষ্ণরক্ত বিশিষ্ট প্রাণী যারা তাদের সন্তানদের প্রতিপালন করে – সেপিয়েন্সরা প্রাইমেট অর্ডার বা বর্গের সদস্য: পাঁচ আঙ্গুলসহ সামনের দিকে ফেরানো চোখ, এবং বসে থাকা অবস্থায় সোজা বা ঋজু শরীরের নরবানর (এইপ)। আমাদের জানা নেই কবে প্রাইমেটরা প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল, কিন্তু আমরা জানি যে ইয়োসিন পর্বে তাদের ইতোমধ্যেই অস্তিত্ব ছিল, যে পর্বটি আজ থেকে  ৫৬ থেকে ৩৩.৯ মিলিয়ন বছর পূর্বে ছিল। কোথা থেকে তারা বিবর্তিত হয়েছিল? আমরা সেটিও নিশ্চিতভাবে জানি না, কিন্তু ৭০ মিলিয়ন বছর আগে, যখন ডায়নোসররা পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল, সেই সময়ও একটি আদি-প্রাইমেট (প্রোটোপ্রাইমেট) প্রজাতিরও অস্তিত্ব ছিল, “পার্গাটোরিয়াস” নামে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে – ইদুর আকারের ক্ষুদ্র একটি প্রাণি। তবে যখন ডায়নোসরদের আধিপত্য সমাপ্ত হয়েছিল, তখন আধুনিক স্তন্যপায়ীরা, প্রাইমেটরাসহ, তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল।

বর্তমানে, অধিকাংশ প্রাইমেটরাই ক্রান্তীয় অঞ্চলের বাসিন্দা এবং বৃক্ষবাসী জীবনাচরণের সাথে যারা অভিযোজিত, যা ইঙ্গিত করে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীনতম পূর্বসূরি – হোমিনিড এইপ বা নরবানররা – ক্রান্তীয় বনাঞ্চলে বাস করতো, যেখানে গাছগুলো ছিল দীর্ঘ, ফল ছিল প্রচুর। বর্তমানে অধিকাংশ হোমিনিড নরবানররা আফ্রিকায় বসবাস করে, মানব প্রজাতি উৎসস্থল হিসাবে যা আফ্রিকার প্রতি ইঙ্গিত করে।

প্রাক-মানব হোমিনিন

পর্যাপ্ত পরিমান প্রমাণ এখন আমাদের কাছে আছে, যেগুলো এসেছে আফ্রিকা মহাদেশে খুঁজে পাওয়া বহু সংখ্যক প্রাগৈতিহাসিক হোমিনিন জীবাশ্ম থেকে, যা প্রস্তাব করছে যে “হোমো” – দের জন্ম হয়েছিল আফ্রিকায়।

বর্তমানে, হোমিনিড পরিবারে অন্তর্ভুক্ত সদস্যরা হচ্ছে : মানুষ, বনোবো, শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং ওরাং উটান (ছবি ১)। এছাড়াও আমরা বহু জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছি, বিশেষ করে “আর্ডিপিথেকাস”, “প্যারানথ্রোপাস” এবং “অস্ট্রালোপিথেকাস”, যারা ছিল আমাদের প্রাক-মানব পূর্বসূরি, অর্থাৎ হোমিনিনরা, যারা শিম্পাঞ্জির চেয়ে আমাদের অনেক বেশি নিকটাত্মীয়। তাহলে হোমিনিড পরিবারকে আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি সেইসব গ্রেইট এইপ বা নরবানরদের পরিবার হিসেবে, যাদের মানবসদৃশ রূপ আছে এবং দুই পায়ের উপর ভর করে হাঁটার একই ধরনের ক্ষমতা আছে।

ছবি ১ : হোমিনিড পারিবারিক বৃক্ষ : হোমিনিডদের ভিন্ন শাখাগুলো বহু মিলিয়ন বছর আগেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমরা একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে জানি না ঠিক কখন তা ঘটেছিল। কারণ এখনও এই তথ্যগুলো দেবার মত জীবাশ্ম নমুনা আমরা খুঁজে পাইনি আর এছাড়াও জিনগত উপাত্ত যথেষ্ট নির্ভুল নয়। যেমন, “প্যান” আর “হোমো” – দের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বসূরি ৭ থেকে ৫.৫ মিলিয়ন বছর আগে কোনো সময় বেঁচে ছিল। 
Continue reading “মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”
মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস