ব্রুনো : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

ইতিহাসে বীর এবং খলনায়কের কোনো অভাব নেই। প্রায়শই তাদের জীবন সম্পৃক্ত জটিল বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করে বিচিত্র ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। এই অতিসরলীকরণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসের স্থান ও কালে সেই মানুষটির সামাগ্রিক জীবনকে অবমূল্যায়ন করা হয়, আর বহুমূখী এই চরিত্রগুলো ইতিহাস-অজ্ঞতার পরিণতি হন। জিওর্ডানো (জর্ডানো) ব্রুনো এধরনের বহু চরিত্রের একজন। আশির দশকে লোকপ্রিয় মানসে যাকে নিয়ে আসতে সবচেয়ে সফল ভূমিকা পালন করেছিলেন কার্ল সেগান। সেগানের চেতনার উত্তরসূরী নিল ডে গ্রাস টাইসনের উপস্থাপনায় কালজয়ী বিজ্ঞান-প্রামাণ্যচিত্র ‘কসমস’-এর দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণেও ব্রুনো পূনরাবির্ভূত হয়েছিলেন। নতুন ‘কসমসের’ প্রথম পর্বেই অতিসরলীকরণ আর ইতিহাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণায় পরিপৃক্ত একটি ‘অ্যানিমেশনে’ আমরা ব্রুনোকে আবির্ভূত হতে দেখি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে, ইটালী একীভূত হবার মুহূর্তে চার্চ বিরোধীদের অবস্থানের উদ্ধত প্রতীক হিসাবে বিবেচিত ব্রুনোকে এর আগেও ব্যবহার করা হয়েছিল বর্তমানে বিজ্ঞান ইতিহাসবিদদের দ্বারা ভ্রান্ত প্রমাণিত ড্রেপার-হোয়াইটের ‘কনফ্লিক্ট’ হাইপোথিসিসে, যা দাবী করেছিল বিজ্ঞান ও ধর্ম একটি নিরন্তর সংঘর্ষে লিপ্ত। যদিও খ্যাতিমান বহু বিজ্ঞানী যেমন আছেন যারা এই ‘কনফ্লিক্ট’ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, আবার এমন বিজ্ঞানীরাও আছেন, যারা বিজ্ঞান আর ধর্মের মিথষ্ক্রিয়ায় ‘কমপ্লেক্সিটি’ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। তবে এই লেখাটির বিষয় বিজ্ঞান আর ধর্মের সেই মিথষ্ক্রিয়া নয়, বরং ‘অ্যাড হক’ কিংবদন্তীতে রূপান্তরিত হওয়া একজন প্রবল কৌতূহলী দার্শনিকের জীবন ও তার দর্শন।

প্রতি বছর সতেরো ফেব্রুয়ারি রোমে কাম্পো ডেই ফিওরে চত্বরে বিচিত্র বিশ্বাস ধারণকারী একগুচ্ছে মানুষ একত্রিত হন – নিরীশ্বরবাদী, বহুইশ্বরবাদী, নাস্তিবাদী, মেসন, অতীন্দ্রিয়বাদী, খ্রিষ্টীয় সংস্কারবাদী, এবং ইটালির মুক্ত চিন্তকদের সমিতির সদস্যরা, যাদের সাথে এমনকি যুক্ত হয় পৌরসভার একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল। উনবিংশ শতকে নির্মিত একটি স্মারক মূর্তির বেদীতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পন করতে প্রতি বছর এই অদ্ভুত সমাবেশটি একত্রিত হয়, যে মূর্তিটি যাজকীয় মাথার আবরণীর নীচ থেকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে পিয়াৎসার দিকে তাকিয়ে আছে : ফুল, মোমবাতি, কবিতা এবং নিবেদনের স্মারক সেই মূর্তির ভিত্তিমূলে ক্রমশ জড়ো হতে থাকে, যেখানে লেখা আছে, “ ব্রুনোর প্রতি, সেই প্রজন্ম থেকে যাদের আগমন সে অনুমান করেছিলেন, এখানে, যেখানে আগুন তাকে দগ্ধ করেছিল”। ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে চার শতাব্দী আগে এখানেই যাকে মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল ক্যাথলিক চার্চের ইনক্যুইজিশন, সেই প্রথাবিরোধী ব্যক্তিকে এরপর বহু বিচিত্র ধরনের আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে ইতোমধ্যেই আত্মীকৃত করা হয়েছে, আর যা প্রতিফলিত করছে তার ধারণা, লেখা ও চরিত্রের অন্তর্নিহিত জটিলতা আর স্ববিরোধীতাগুলোকে।

Continue reading “ব্রুনো : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ”
ব্রুনো : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ