ইবন খালদুন: ইতিহাসের দর্শন

(গ্রেট থিংকার্স সিরিজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: কাজী মাহবুব হাসান)

‘যিনি নতুন পথ খুঁজে পান তিনি পথপ্রদর্শক, এমনকি যদি সেই পথটি আবার অন্যদের খুঁজে বের করতেও হয়। এবং যিনি তার সমসাময়িকদের চেয়ে অনেক সামনে হাটেন তিনি নেতা, এমনকি যদি সেই স্বীকৃতি পেতে বহু শতাব্দী অতিক্রান্তও হয়’।

আবু জাইদ আবদ-আল-রাহমান ইবন খালদুন আরব-ইসলাম ইতিহাসে ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম ধর্মাশ্রিত নয় এমন ইতিহাসের দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন। সবচেয়ে শ্রেষ্ট আরব ইতিহাসবিদ হিসাবে বিবেচিত খালদুনকে সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাস বিজ্ঞানের জনকও বলা হয়। তিনি সভ্যতাকে বোঝার জন্যে আমাদের ধারণার জগতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান রেখে গেছেন। তবে তার অবদান বুঝতে হলে তার জীবন আর সময়টিকে বুঝতে হবে। তার পুরো নামটি বেশ বড় তাই ইবন খালদুন নামেই উত্তর প্রজন্মের কাছে তিনি বেশী পরিচিত। তার আত্মজীবনীর সূত্রে জানা যায় তার পূর্বসুরিদের বংশটির সূচনা ইয়েমেনের হাডরামুটে। অবশ্য তার এই আরব উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে এটি নিশ্চিত যে তিনি ১৩২২ সালের ২৭ মে তিউনিসে জন্মগ্রহন করেছিলেন (তিউনিসিয়া)। তার শিক্ষিত বিদ্বান পরিবারের আবহ আর সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী তিনি প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছিলেন। তার পূর্বসুরিদের মত তার পিতাও রাজনীতি সক্রিয় তবে বিদ্বান ছিলেন, তার কাছেই খালদুনের প্রথম শিক্ষা পেয়েছিলেন। উনিশ বছর বয়সে তার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল সেই সময়ে তিউনিসের শাসক ইবন তাফরাকিনের বিশেষ দূত হিসাবে।

১৩৫২ সালে তিউনিস যখন কনস্টান্টিনের (বর্তমান আলজেরিয়া) আমির আবু জিয়াদ দখল করে নিয়েছিলেন ইবন খালদুন পালিয়ে আবায় এসেছিলেন। আলজেরিয়ায় তিনি এভাবেই বহুবার আসা যাওয়া করেছিলেন, পরে বিসক্রায় তিনি বসতি গড়েন। একই সময় মরোক্কোর নতুন রাজা আবু ইনান আলজেরিয়া আক্রমণ করেন। তার বিবরণ অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই তিনি নিজেই সুলতানের সাথে দেখা করতে যান এবং সুলতান তাকে আলজেরিয়ার আত্মসমর্পন দলিল আর সাক্ষ্য দেবার জন্যে বুজিতে পাঠিয়েছিলেন। এরপরে তিনি ফেজে আসেন, এবং সুলতানের রাজসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিলেন। ফেজে থাকাকালীন সময়ে তিনি আরো পড়াশুনা করেছিলেন। সেই সময় ফেজ ছিল মরক্কোর রাজধানী এবং উত্তর আফ্রিকা আর আন্দালুসিয়ার বিদ্বানদের একটি মিলন ক্ষেত্র। ইবন খালদুন একই সাথে নিত্য নতুন রাজকীয় দায়িত্ব পাচ্ছিলেন, জীবনের এই সময়ে তিনি খুবই উচ্চাভিলাষী ছিলেন, রাজসভার রাজনীতিতে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। আলজেরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত সুলতানের সাথে তিনি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু মরক্কোর সুলতান বিষয়টি জানতে পেরে তাকে কারাবন্দী করেছিলেন। সুলতানের মৃত্যু হলে দুইবছর পর তাকে মুক্ত করা হয় এবং পুরোনো পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। কিন্তু যে উজির তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন সুলতান আবু সালেমের সাথে। এরপর তিনি নতুন সুলতানের দরবারে আরো উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এই সময়টি ছিল তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আর উৎপাদনশীল একটি সময়।

পরিশেষে তিনি প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। তবে এবারও তিনি বিজয়ী দলের সাথে ছিলেন, চেয়েছিলেন সভার উচ্চ পদটি যেন তিনি পান কিন্তু তাকে সেটি দেয়া হয়নি সম্ভবত তার বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে। তিনি ক্ষুদ্ধ হয়েই পদত্যাগ করে আন্দালুসিয়ায় যান। গ্রেনাডার সুলতানের বিশেষ দূত হয়ে তিনি কাস্তিলে গিয়েছিলেন। কাস্তিলে পেড্রো দ্য ক্রুয়েল তাকে তার সভাসদ হতে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু খালদুন প্রস্তাবটি গ্রহন করেননি। গ্রেনাডার সুলতান তাকে একটি ছোট গ্রাম (এলভিরা) দান করেছিলেন। কিন্তু অস্থির খালদুন আলজেরিয়ায় বুজিতে (বর্তমান বেজাইয়া) ফিরে আসেন বন্ধু সুলতান আবু আব্দুল্লাহর আমন্ত্রণে। তখন তার বয়স ৩২, তিনি আমির মুহাম্মদের হাজিব বা চেম্বারলেইনের দায়িত্ব পান। কিন্তু বেশী দিন তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি। আমিরের পতন হলে বিসক্রায় তিনি চলে যান। তবে তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। এর পরে তাকে আমরা আলজেরিয়ার কাসানটিনায় (কনস্টান্টিন) ফোর্ট সালামায় দেখি, সেখানে ৪৫ বছর বয়সে তিনি তার বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমা লিখেছিলেন। এটি তিনি কাসানটিনার আমির সুলতান আবুল আব্বাসকে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু এখানেও তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি, প্রায় ২৭ বছর পর বিজয়ী আমির আব্বাসের সেনাদলের সাথে তার জন্মশহর তিউনিসে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন তার জন্যে বেশ বৈরী হয়ে উঠেছিল, ১৩৪২ সালে উত্তর আফ্রিকার এই এলাকা তিনি চিরতরে ত্যাগ করেন। মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় যখন তাকে আমরা দেখি তখন তার বয়স ৫০।

তবে তিনি হজ্জ্বগামী মক্কার ক্যরাভানে যোগ না দিয়ে কায়রো অভিমুখে যাত্রা করেন। কায়রোয় তিনি ইতিমধ্যে তার লেখা ও পাণ্ডিত্যের জন্যে সুখ্যাত হয়ে উঠেছিলে। বিদ্বানরা তাকে স্বাগত জানান। সুলতান তাকে বিশেষ অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। একটি পর্যায়ে বিচারকও হয়েছিলেন, কিন্তু আবার ষড়যন্ত্রের শিকার হন, এসময় পারিবারিক ট্র্যাজেডিও ঘটে, তার পরিবার আর সম্পত্তি বহন করা জাহাজটি একটি ঝড়ে কবলে পড়ে নিমজ্জিত হয়। এরপরে তাকে মূলত শিক্ষকতাই করতে দেখি আমরা। মিসরের অস্থির রাজনৈতিক পটভূমির সাথে তার ভাগ্যের উত্থান-পতনও জড়িয়ে পড়েছিল। তিনি একইসাথে তার বিশ্বজনীন ইতিহাস নিয়ে লেখাটি সম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেন। এই পর্যায়ে তিনি তার বিখ্যাত ‘আসাবিয়া’ ধারণাটি প্রয়োগ করেছিলেন কোনো রাজ্যের উত্থান-পতনের ব্যাখ্যা হিসাবে। আর এটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন সুলতান সালাহ আল-দিনের পর থেকে মিসরের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিবরণে। যদিও আবার তিনি বিচারক ( মালিকি ) হয়েছিলেন তবে অনিচ্ছাসত্ত্বে। সুযোগ পেতেই তিনি সুলতান ফারাজের কারাভানের সাথে দামাস্কাসের পথে যাত্রা করেন। সুলতান পরে ফিরে আসলেও খালদুন ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সেখানে থেকে যান। এখানে থাকার সময় তাকে আমরা কুটনীতিতে সক্রিয় থাকতে দেখি। যেমন, দামাস্কাস আক্রমন করতে এগিয়ে আসা তিমুরলেনের (তৈমুর লং) এর সাথে যুদ্ধে না গিয়ে সমঝোতার একটি চুক্তিতে আসতে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে দামাস্কাসের সাথে তৈমুরের প্রথম আলোচনা ব্যর্থ হবার পর ইবন খালদুন ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে দেখা করতে দামাস্কাস ত্যাগ করেন। এখনও নিশ্চিত নয় তিনি নিজেই এই কাজটি করেছিলেন নাকি তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে তাকে স্বাগত জানানো হয়েছিল তৈমুরের রাজসভায় এবং সেখানে তিনি প্রায় পয়ত্রিশ দিন সেখানে ছিলেন।

তিনি তৈমুরের সাথে একজন দোভাষীর মাধ্যমে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন, তিনি কি বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন তার বিবরণও আমরা পাই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে। আমার তার লেখায় জানতে পারি তৈমুর তাকে তার সভায় যোগ দিতে আহবানও জানান। তবে সেটি করার আগে তিনি মিসরে ফিরে তার অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার অনুমতি চেয়েছিলেন। দামাস্কাসের জন্যে সহনীয় গ্রহনযোগ্য চুক্তি নিয়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন। এরপর তার জীবনের শেষাংশে আমরা তাকে কায়রোয় খুঁজে পাই। একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিবেশে তাকে আমরা বেশ কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে ও হারাতে দেখি। এখানেই তিনি ১৪০৬ সালে (কারো মতে ১৩৯২) মৃত্যুবরণ করেন ৭৪ বছর বয়সে। কায়রোর বাব আন-নাসরের বাইরে সুফি কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। তিনি মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে তার বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমার ভূমিকাটি লিখেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের আর মাগরেবের (উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা) ভূ-রাজনৈতিক-সামাজিক আর অর্থনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছিলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রস্তাবনা করার জন্যে।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই পশ্চিমা বিশ্বে তিনি তার যোগ্য আসনটি পেতে শুরু করেছিলেন, বিশেষ করে যখন তারা বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো মানব ইতিহাসে পরবর্তীতে আসা ধারনাগুলোর সদৃশ ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইবন খালদুনের বিশ্ব ইতিহাসের সেই বিশাল ভূমিকা – Muqaddima (Prolegomena) ফরাসী এবং ইংরেজী ভাষায় আবির্ভূত হয়েছিল চুতুর্দশ শতকে এই আরব ইতিহাসবিদ পশ্চিমে ব্যপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন তার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি আর ধারণাগুলোর জন্যে, ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজ এবং ধর্ম নিয়ে।

ইবন খালদুনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম ধারণাটি যার ভিত্তি ছিল উত্তর আফ্রিকার রাজনীতিতে যা তিনি পেশাগত জীবনেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হিসাবেই অর্জন করেছিলেন, যা বিশেষভাবে তার পশ্চিমা বোদ্ধা পাঠকদের নজরে এনেছিল। তিনি লিখেছিলেন:

‘নেতৃত্ব শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে এর অস্তিত্ব ধরে রাখে, আর শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র টিকে সামাজিক সৌহার্দ্যের মধ্যে’।

তিনি সৌহার্দ বোঝাতে যে আরবী শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি হচ্ছে ‘আসাবিয়া’, যার অর্থ একটি ‘গোষ্ঠীবদ্ধ অনুভূতি’, সামাজিক সৌহার্দ্য অথবা গোত্রবাদীতা, শব্দটি এই বইয়ে ৫০০ বারের বেশী তিনি উল্লেখ করেছিলেন। আসাবিয়ার মূল উৎস মরুভূমির পরিস্থিতিতে, যেখানে গোত্রের মধ্যবর্তী সৌহার্দ টিকে থাকার জন্যে একান্ত জরুরী একটি পূর্বশর্ত। যখন যাযাবর গোত্রগুলো একত্র হয়, তাদের শ্রেষ্ঠতর সামাজিক সংহতি এবং সামরিক দক্ষতা নগরবাসীদের তাদের কৃপার পাত্র করে তোলে। শুধুমাত্র ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত না হয়েও প্রায়শই, তারা বহু নগর দখল করে, নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই, ইবন খালদুনের মতে, এই বিজয়ী গোত্রের মানুষরা তাদের ‘আসাবিয়া’ হারিয়ে ফেলে এবং বিলাসিতা, আড়ম্বর, আর অলসতায় দুষিত হয়। শাসক, যিনি আর সেই সাহসী আর দুর্ধর্ষ গোত্র-যোদ্ধাদের উপর ভরসা রাখতে পারেন না তার প্রতিরক্ষার জন্যে, তিনি বাধ্য হন মাত্রারিক্ত কর আরোপ করতে যেন তিনি নানা ধরনের সৈন্যদের বেতন দিয়ে পুষতে পারেন, আর এটাই পরে আরো সমস্যার কারণ হয়, এবং এক পর্যায়ে সেই রাজবংশ এবং রাষ্ট্রের পতনের কারণ হয়।

খালদুনের এই পারাডাইমের বহু মুগ্ধ পাঠক ছিলেন, আর্নল্ড টয়েনবি (১৮৯৯-১৯৭৫) মুকাদ্দিমাকে স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এ ধরনের কাজের মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম কাজ হিসাবে শনাক্ত করেছিলেন। যদিও টয়েনবির সভ্যতার চক্রাকারে উত্থান আর পতনের ধারণার তীব্র সমালোচক হিউ ট্রেভর রপার (১৯১৪-২০০৩) ইবন খালুদনের লেখার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি তবে তিনি সেটি বর্ণনা করেছিলেন সূক্ষ্ম গভীর আর সমুদ্রের মত আকারহীন বিবরণ হিসাবে। ইতিহাসবিদ মার্শাল হজসন যার তিন খণ্ডের বিখ্যাত The Venture of Islam: Conscience and History in a World Civilization এখনও তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে ইসলামের হিষ্টিরিওগ্রাফির, তিনি মুকাদ্দিমাকে বর্ণনা করেছিলেন “ইসলামিসেট” সভ্যতার একটি সেরা সাধারণ ভূমিকা হিসাবে ( ইসলামিসেট শব্দটি তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, আর সংকীর্ণভাবে ধর্মীয় ইসলামিক শব্দটির পরিবর্তে)। চেক বৃটিশ দার্শনিক এবং নৃতত্ববিদ আর্নষ্ট গেলনার (১৯২৫-১৯৯৫) ইবন খালদুনকে ম্যাক্স ভেবেরের পূর্বসূরি হিসাবে শনাক্ত করেছিলেন, এছাড়া আর্থার লাফের, দেখিয়েছিলেন ইবন খালদুনই প্রথম সেই ধারণাটি করেছিলেন কর বাড়ালে রাজস্ব আয়ে পতন ঘটাতে পারে।

কেউ কেউ ইটালীর দার্শনিক জ্যামবাতিস্তা ভিকোকে (১৬৬৮-১৭৪৪) ইতিহাস দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করেন। অন্যরা এই কৃতিত্ব দেন ফরাসী দার্শনিক মন্টেস্ক্যুকে (১৬৮৯-১৭৫৫)। বাস্তবিকভাবে, আরব দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ ইব্ন খলদুন (১৩৩২-১৪০৬) ছিলেন প্রথম পথিকৃত যিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে, ইতিহাসের, অন্য যে কোনো বিজ্ঞানের মতই, গবেষণার প্রয়োজন আছে। তিনি বলেছিলেন,

‘এটি নানা পরিস্থতি আর ঘটনার বিজ্ঞান এবং এর কারণগুলো খুব গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ, আর এভাবেই এটি প্রজ্ঞার প্রাচীন এবং মৌলিক একটি অংশ, এবং যা এর বিজ্ঞানগুলোর একটি হবার দাবী রাখে’।

তার দ্য ইন্ট্রোডাকশন (মোকাদ্দিমা, ১৩৭৭) বইটিতে তিনি আরো লিখেছিলেন,

‘ইতিহাস হচ্ছে খুব মূল্যবান মতবাদের একটি শিল্প, এর সুফল অগণিত এবং এটি সম্মানজনক এর উদ্দেশ্যে; এটি অতীত কোনো জাতি সম্বন্ধে আমাদের তথ্য দেয় তাদের আচরণ, তাদের জীবনের প্রাসঙ্গিকতায় তাদের নবীদের সম্বন্ধে এবং তাদের রাষ্ট্র এবং রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতায় রাজাদের সম্বন্ধে, সুতরাং যারা পার্থিব কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে অতীতের কাছে দিক নির্দেশনা অনুসন্ধান করেন, তারা যেন সেই সুবিধাটি পেতে পারেন’।

ইবন খালদুনের তত্ত্ব ইতিহাসকে দুটি প্রধান অংশে বিভাজিত করেছিল: ঐতিহাসিক প্রকাশ বা ‘হিস্টোরিকাল ম্যানিফেস্ট’ আর ঐতিহাসিক সারমর্ম বা ‘হিস্টোরিকাল জিস্ট’। তার মতে, শুধুমাত্র কোনো ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করার মধ্যে ইতিহাসের নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখা উচিত নয়, বরং এর পরিবেশ, সামাজিক লোকাচার এবং রাজনৈতিক ভিত্তিগুলো অনুসন্ধান করা উচিত।

‘সত্যিকারের ইতিহাসের অস্তিত্বের কারণ হচ্ছে মানব সামাজিক জীবন সম্বন্ধে আমাদের অবহিত করা, যা আসলেই এই পৃথিবীরই পরিবেশ আর সেই পরিবেশের প্রকৃতি, যা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়। এটির মূল বিষয় হচ্ছে সভ্যতা, বন্যতা আর গোত্রবাদীতা, সেই সাথে বিচিত্র উপায়গুলো, যার মাধ্যমে মানুষ পরস্পরের উপর ক্ষমতা অর্জন করে এবং এসবের পরিণতিগুলো, সেই রাষ্ট্র, তাদের প্রাধান্যপরম্পরার কাঠামো, এবং মানুষের পেশা, জীবনাচরণ, বিজ্ঞান, কারুকাজ এবং বাকী সব কিছুসহ যা সেই পরিবেশে ঘটে বিচিত্র পরিস্থিতির অধীনে’।

ইবন খালদুনের পদ্ধতির ভিত্তি ছিল সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ, তুলনামূলক আলোচনা এবং নীরিক্ষা। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর বিবরণ, এই বিবরণগুলোর উৎস এবং ইতিহাসবিদদের ব্যবহৃত পদ্ধতি যাচাই এবং বিশ্লেষণ তিনি করতে বৈজ্ঞানিক সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি একই ঘটনার বিভিন্ন বিবরণ আর ব্যাখ্যা পরীক্ষা এবং পরস্পর তুলনামুলক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছিলেন, সেই বিবরণগুলো থেকে মিথ্যা, ভ্রান্তি আর অতিরঞ্জিতাকে বাতিল এবং যা আসলেই ঘটেছিল তার নৈর্ব্যক্তিক কিছু ধারণা অর্জন করার লক্ষ্যে। বহু বিবরণই মিথ্যাচার ধারণ করে কারণ সেগুলো কোনো শাসককে তোষামোদ করে তুষ্ট করার প্রচেষ্টায় অথবা অথবা কোনো সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করতে লেখা হয়েছে। খবর-নির্মাতা আর গল্প-বলিয়েরা পরিকল্পিতভাবেই প্রতারণা এবং মিথ্যাচার করেন তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যপূরণে। আর সেকারণেই তিনি ইতিহাসবিদদের তাগিদ দিয়েছিলেন আরো বেশী পাণ্ডিত্যপূর্ণ, পর্যবেক্ষণে নিখুঁত এবং মূল আধেয় এবং এর অন্তর্নিহিত অনুচ্চারিত নানা তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দক্ষ হয়ে উঠতে, যেন তিনি সেখানে কার্যকর সমালোচনা আর সুস্পষ্টতা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারেন।

যদিও তিনি দৃঢ়ভাবেই ঈশ্বর-বিশ্বাসী ছিলেন তবে কখনোই ইতিহাসের কোনো স্বর্গীয় লক্ষ্যের কথা তিনি উচ্চারণ করেননি অথবা কোনো স্বর্গীয় পরিসমাপ্তির কথা বলেননি যেখানে ইতিহাস এসে থেমে যাবে। তিনি বাস্তবিকভাবেই বলেছিলেন, ‘অতীত ভবিষ্যতের মতই, পানি থেকে পানি যেমন’। মনে হতে পারে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে মানব ইতিহাসের কোনো পরিসমাপ্তি নেই। ইবন খালদুন আরো অগ্রসর হয়ে, দেবতা অথবা কোনো স্বর্গীয় প্রত্যাদেশের অধস্তন যেন মনে এমন উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর উপর অধিবিদ্যামূলক ধারণাগুলো আরোপ করে ইতিহাসকে -যা মূলত একটি বিজ্ঞান – শিল্পকলা আর সাহিত্যের নিকটবর্তী কোনো বিষয়ের রূপান্তরিত করার জন্যে ইতিহাসবিদদের সমালোচনা করেছিলেন।

পরিণতিতে কিছু মুসলিম আর পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা ইতিহাস নিয়ে তার এই ধারণাটিকে ব্যবহার করেছিল তাকে নিরীশ্বরবাদী হিসাবে প্রমাণ করতে, তবে স্পষ্টতই তিনি ঈশ্বর অবিশ্বাসী ছিলেন না। তার প্রস্তাবনা ছিল ‘ইতিহাসের বিজ্ঞান’ অধিবিদ্যার অন্তর্গত কোনো বিষয় নয়, এবং এটিকে অধিবিদ্যার কোনো বিষয়ে রূপান্তরিত করাও যাবেনা। তিনি কখনোই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। তার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তার কাজ ‘ঈশ্বর অনুপ্রাণিত, বিশুদ্ধ অনুপ্রেরণা’। ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস আছে কিনা এটি সেই বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে।

তবে ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুব স্পষ্ট এবং তার পূর্বসূরি কয়েকজন মসুলমান দার্শনিকদের ব্যতিক্রম, বিশেষ করে আল ফারাবী (৮৭০-৯৫০), ইবন সিনা (৯৮০-১০৩৭)। একজন পর্যবেক্ষণ/পরীক্ষামূলক দার্শনিক হিসাবে তিনি নবী মোহাম্মদের ৫৭০-৬৩২) পবিত্র সামাজিক পরীক্ষা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, আর সেকারণে ইতিহাসকে তার অশেষ হিসাবে দেখতে পারার কথা নয়। যদি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে চূড়ান্ত সত্য হিসাবে মেনে নেয়া হয় এবং তার নবীরা ও তাদের নানা ধর্মীয় পরীক্ষা যদি এই তথ্যটির সাক্ষ্য দেয়, তাহলে সেই বক্তব্যটি, অতীতের ইতিহাস ঠিক ভবিষ্যতের মত, এমন কথার অবশ্যই মানে হতে পারে যে, এটি মূলত একটি বিরতিহীন ধারাবাহিক ঘটনার সমষ্টি যা কোনো একটি জাতিতে এসে থেমে যায় না, বরং আবর্তাকারে চলমান থাকে।

ইবন খালদুন বিশ্বাস করতেন ঐতিহাসিক কোনো ঘটনার এমনকি খুব ক্ষুদ্রতম কোনো তথ্যকে ভালো করে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করা উচিত, কারণ এগুলো খুব সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, বরং জটিল। তিনি ইতিহাসকে সহজ কোনো বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতেন না, যেহেতু এটি ‘ঘটনাপ্রবাহের গুণগত মাণ ও তাদের কারণ সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান’। আর যেহেতু ইতিহাসের অধিবিদ্যামূলক তত্ত্বগুলো তার দৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক, ইবন খালদুন ইতিহাসের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দর্শনের তাত্ত্বিক ক্ষেত্র থেকে কার্য ও কারণের সম্বন্ধ সংক্রান্ত ধারণাগুলো আমদানী করেছিলেন মূলত ঐতিহাসিক ঘটানসমূহের পার্থিব ‘কারণ এবং নিয়ামকগুলোর’ উপর মনোযোগ দিয়ে। তার পদ্ধতি ছিল সরাসরিভাবে ইনডাকটিভ (আরোহি), যা সরাসরি ইন্দ্রিয় এবং বুদ্ধিমত্তার উপর ভরসা করে কোনো সাধারণ নিয়মের প্রতি তথ্য নির্দেশ না করেই।

তিনি মনে করতেন, বিমূর্ততা আর পরীক্ষামূলকতার মধ্য একটি বড় ফাটল আছে, প্রথমটি ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি আর দ্বিতীয়টি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পৃথিবীর বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। স্বর্গীয় জ্ঞানের বিষয় হচ্ছে একটি অদৃশ্য আত্মা কোনো যা কোনো পরীক্ষার নিয়নন্ত্রণাধীন নয় এবং যার কোনো সংবেদনাত্মক প্রমাণও নেই। সুতরাং এই পৃথিবীতে তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে পারার কথা নয়। আর যেহেতু এই সংবেদাত্মক আর অসংবেদনাত্মক কোনোকিছুর মধ্যে সাধারণ মিল নেই, ইবন খালদুন বিমূর্ত আর স্বর্গীয় জগতকে তার যুক্তিবাদী সিলোজজম (দুটি বিবৃতি থেকে সিদ্ধান্ত-অনুমান) থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। আর ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গিটি গ্রহন করেছেন আধুনিক পজিটিভিজম (জল্পনাকল্পনা বা মানসবিচারের স্থলে ইন্দ্রিয়গম্য প্রপঞ্চ ও সন্দেহাতীত তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, অগস্তঁ কোঁতে’র (ফরাসি দার্শনিক, ১৭৯৮-১৮৫৭) দার্শনিক মতবাদ; প্রত্যক্ষবাদ; দৃষ্টবাদ) এমনকি প্রয়োগবাদীরাও (কোনো ভাব, প্রত্যয় বা উক্তির সত্যতা বা মূল্যনির্ভর করে মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে তার প্রাসঙ্গিকতার উপর- এই তত্ত্ব বা বিশ্বাস; প্রয়োগবাদ )ইবন খালদুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন এর সূচনা ধাপে ।

ইতিহাসের ‘মিথ্যাচারের’ কারণগুলো নিয়ে তার বিশ্লেষণ ও শনাক্তকরণে, ইবন খালদুন বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছিলেন, যেমন: সেকটারিয়ানিজম বা উপদলীয়তা, ভুল উৎসের উপর ভরসা করা, কিছু গোপন উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞতা এবং শাসকশ্রেণীকে তোষামোদ করার প্রবণতা। সেকারণে, বহু ইতিহাসবিদ, অনুলিপনকারী এবং গল্প-বলিয়েরা কোনো ঘটনার অসত্য বিবরণ মেনে নেবার মত ভুল করেছেন কিংবা সেই ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন যা আসলেই ঘটেনি কারণ তারা আরো নিবিড়ভাবে সেই রিপোর্টের উৎস সত্য না মিথ্যা যাচাই করার প্রচেষ্টা না করে, অন্য কিছুর সাথে তুলনা না করে বা এই বিষয়টির উপর তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা আরোপ না করেই শুধুমাত্র রিপোর্টের উপর ভরসা করেছেন। আর এভাবে তার নিজেদের দূর্বল ইতিহাসবিদ হিসাবে প্রমাণ করেছেন। যেমন, আল-মাসুদি এবং বেশ কিছু আরব ইতিহাসবিদ মেনে নিয়েছিলেন যে নবী মোজেস যে ইসরায়েলাইট বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেখানে বিশ বছর বয়স বা এর উর্ধে ৬০০০০০ পুরুষ সদস্য ছিল। কিন্তু যদি আমরা সতর্কভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি দেখবো এটি ভুল, কারণ জ্যকব ও গোত্র সদস্যরা যখন মিসরে প্রবেশ করেছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০। জ্যাকব থকে মোজেস অবধি মাত্র মাত্র চার প্রজন্ম ব্যবধান, তাহলে কিভাবে মোজেসের বাহিনীতে এত সংখ্যক তরুণ আর পুরুষ সৈন্য থাকা সম্ভব? এছাড়াও, ইসরায়েলাইটরা নিজেরাই যেমন উল্লেখ করেছে সলোমনের বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১২,০০০ আর তার ১৪০০ ঘোড়া ছিল, যখন কিনা তারা এই রাজ্যকে তাদের রাজ্যের শক্তিশালী অবস্থান আর সবচেয়ে বড় সম্পসারণ হিসাবে হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন।

তাহলে এখানে আল-মাসুদ ভৌগলিক বাস্তবতা অস্বীকার করতেও সফল হয়েছিলেন। কীভাবে এই বিশাল সেনাবাহিনী তিনি এই ঘুরপথে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন? নির্দিষ্ট একটি এলাকার মধ্যে দিয়ে কিভাবে এত মানুষের জায়গা করা সম্ভব? ঐতিহাসিক জ্ঞানেও আল-মাসুদ ভালো করেননি। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটি রাজ্যে সেই রাষ্ট্রটিকে সুরক্ষা করতে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনানিবাস থাকে আর সেটি নির্ভর করে দেশটি আয়তনের উপর। কোনো একটি রাজ্যে যার ছয় লক্ষ বা তার বেশী সৈন্য আছে তার সীমানা ইসরায়েলের প্রাচীন রাজ্যের তুলনায়অবশ্যই অনেক বড় হতে হবে।

‘একজন ইতিহাসবিদের জন্যে আবশ্যিক’ কি হতে পারে সেই বিষয়ে ইবন খালদুন একটি ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ঘটনা আর কাহিনী বিশ্লেষণ করতে পারার মত যোগ্য হয়ে উঠতে একজন ইতিহাসবিদের জন্যে আবশ্যিক বিষয়গুলো তিনি উল্লেখ করেছিলেন:

(১) রাজনীতির নিয়ম আর জনগণের প্রকৃতি সম্বন্ধে একটি বোঝাপড়া
(২) প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং স্থান ও কালভেদে এর ভিন্নতা সম্বন্ধে জ্ঞান
(৩) বিভিন্ন জাতির সামাজিক পরিবেশ সম্বন্ধে পরিচিতি, যেমন, এর জীবনাচরণ, নৈতিকতা, উপার্জন, মতবাদ ইত্যাদি।
(৪) বর্তমান সময় সম্বন্ধে একটি বোঝাপড়া এবং অতীতের সাথে এটি তুলনা করতে পারার দক্ষতা
(৫) রাষ্ট্র আর গোত্রের উৎপত্তি আর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান, তাদের ঘোষিত মূলনীতি, আইন, তাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সম্বন্ধে জ্ঞান

ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সম্বন্ধে একটি বিশ্লেষণী বোঝাপড়া অর্জন করতে হলে তাহলে ইতিহাসবিদদের অবশ্যই সেই পর্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো অধ্যয়ন করতে হবে, যা তিনি অনুসন্ধান করছেন এবং কোনো বিশেষ ঘটনার সাথে সেটি তাকে তুলনামূলক একটি বিশ্লেষণ করতে হবে যে বিষয়ে জানতে তিনি আগ্রহী। তারপর তার উচিত হবে একই ধরনের ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করা যা ঘটেছে অন্য পর্বে এইসব পর্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসহ। যখন তিনি এই দুটি প্রধান ধাপ সম্পন্ন করবেন, তখন কোনো ঘটনাকে যুক্তিসঙ্গত এবং সম্ভবত সত্য অথবা অগ্রহনযোগ্যে আর অবশ্যই নিশ্চিত মিথ্যা হিসাবে শনাক্ত করতে পারার মত সক্ষমতা তার থাকা উচিত। সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনা কেবলমাত্র পৃথকভাবে অধ্যয়ন করা উচিত তাদের সেই সময়পর্বের সাধরণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে, জানতে যে, তাদের কোন অংশটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা।
তার ‘দ্য ইনটেলেক্ট’ বিশ্লেষণে ইবন খালদুন বিশ্বাস করেছিলেন, বোধশক্তি ও বিচারবুদ্ধি বা মেধার একটা সীমানা আছে যা এটি অতিক্রম করতে পারেনা আর সেটাই এটিকে বাধা দেয় ঈশ্বর ও তার অন্য বিষয়গুলো সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে জানতে। এটাই এর বাস্তবতা, আর মানুষ এটিকে আপগ্রেড বা উন্নয়নও করতে পারেনা অথবা এর সক্ষমতার স্তরও বৃদ্ধি করতে অক্ষম। তিনি দাবী করেন যে, বুদ্ধিমত্তা কখনোই ‘আত্মা আর স্বর্গীয় সত্তার’ বাস্তবতা আর উচ্চতর জগতে অস্তিত্বশীল কোনো বিষয় নিয়ে ‘সচেতন’ (বা অবহিত) হতে পারেনা কারণ এটি তার নাগালের বাইরে, আর এটি সে জানতে এবং প্রমাণ করতে অক্ষম। আমরা শুধুমাত্র যা কিছু বস্তুগত সেটি সম্বন্ধে অবহিত হতে পারি, যদি কোন কিছু নিরবয়ব হয় আমরা এটি না পারি প্রমাণ করতে, না পারি কোন প্রমাণকে এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করতে।

ইবন খালদুন অধিবিদ্যা নিয়ে বেশী ভাবতে মেধাকে খুব সামান্যই উৎসাহ দিয়েছেন, তিনি আল গাজালীকে (১০৫৯-১১১১) বরং ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন, আরব-ইসলামি বৌদ্ধিক ধারায় দার্শনিক ভাবনায় একটি চূড়ান্ত আর প্রায়-মরণঘাতি আঘাত হেনে। তাসত্ত্বেও বলতে হবে একটি দরজা বন্ধ করে ইবন খালদুন সম্পুর্ন নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছিলেন মানব মনের জন্যে: সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের দর্শন।

(সমাপ্ত)

ইবন খালদুন: ইতিহাসের দর্শন