সিদ্ধার্থ মুখার্জির জিন: একটি অন্তরঙ্গ ইতিহাস

Siddhartha Mukherjee’s THE GENE: An Intimate History  

অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান
প্রচ্ছদ: এম সি এশারের বন্ড অব ইউনিটি অবলম্বনে আসমা সুলতানা
প্রকাশনা: দিব্য প্রকাশ

আপনি যখন আয়নার দিকে তাকান, আপনি শুধু আপনার মুখই দেখেন না, একটি জাদুঘরও দেখেন, নৃতাত্ত্বিক ডেভিড অ্যান্থনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, যদিও একটি অর্থে এটি আপনারই মুখ, কিন্তু বহু বৈশিষ্ট্যের কোলাজ হিসেবে এটি তৈরি, যে বৈশিষ্ট্যগুলো আপনি আপনার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পেয়েছেন। ঐ যে ঠোঁট আর চোখ যা আপনার প্রিয় বা আপনাকে বিব্রত করে সেটি শুধু আপনার একার নয়, এটি আপনার পূর্বসূরিদেরও বৈশিষ্ট্য। আজ যদিও তাদের অস্তিত্ব নেই, কিন্তু খণ্ডাংশ রূপে আপনার মধ্যে তারা এখনো খুবই জীবন্ত। এমনকি জটিল বৈশিষ্ট্যগুলো, যেমন, ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা, সঙ্গীত সৃষ্টি, কিংবা ভীড়ে লজ্জা পাওয়া, কিংবা কোনো অসুখে আক্রান্ত হবার বাড়তি প্রবণতা – এইসব বৈশিষ্ট্যই আপনার পূর্বসূরিদের মধ্যে কারো-না-কারো ছিল। শুধু আমাদের শরীর নয়, আমরা সারাক্ষণই আমাদের অতীত নিয়ে ঘুরি, আর আমাদের সামাজিক আচারে এটি টিকে আছে, এমনকি আমাদের বাচনভঙ্গিতে। অতীত হচ্ছে একগুচ্ছ অদৃশ্য চশমা, যা আমরা সারাক্ষণই পরে আছি, যার মধ্যে আমরা পৃথিবীকে দেখছি আর পৃথিবীও আমাদের দেখছে। নিচের দিকে তাকিয়ে তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করি বা না করি, আমরা সবসময়ই আমাদের পূর্বসূরিদের কাধে ওপর দাড়িয়ে আছি।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মধ্যেই আছে একটি সম্পূর্ণ লাইব্রেরি, জীবন তৈরির পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা, সুতার মতো একটি দীর্ঘ অণু ডিএনএ-এর ওপর যাদের অবস্থান, এই সূত্রকটি তৈরি করেছে চারটি নিউক্লিওটাইড বেস, আর এদের অনুক্রমই হচ্ছে ডিএনএ সিকোয়েন্স। ডিএনএ-এর যে অংশটি নির্ধারণ করে কোন প্রোটিনটি তৈরি হবে, সেটি হচ্ছে জিন। আর জিন যে জিনিসটি তৈরি করার নির্দেশনা বহন করে সেটি হচ্ছে প্রোটিন (এছাড়াও আরএনএ), এবং কখন কি প্রোটিন তৈরি করতে হবে কোষকে সেই নির্দেশনাটি দিয়ে জৈবিক কর্মকাণ্ড, এবং কোষ কাঠামো ও আপনাকে তৈরি করে প্রোটিন – আপনার চুলের রং থেকে রক্তের সুগারের মাত্রা সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে জিন। প্রতিটি জিনে আবার অনেকগুলো অংশ থাকে, প্রোটিন তৈরি নির্দেশনা দেয়া অংশটিকে বলে ‘এক্সন’, আর এক্সনের দুই পাশে থাকা ‘অর্থহীন’ ডিএনএ অংশটিকে বলে ইনট্রোন, এছাড়াও জিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রক অনুক্রম, যদিও তাদের কাজ এখনো বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি কিন্তু এই অংশগুলোই কোনো নির্দিষ্ট জিনকে সক্রিয় আর নিষ্ক্রিয় করে তুলতে সক্ষম। প্রতিটি জিনই ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করে, যেমন ধরুন নাকের আকৃতি, এই তথ্যগুলো বহন করা জিনগুলো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়, আর সেই কারণে আপনার চাচাতো ভাই আপনার দাদার নাক উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে পারে।

মানুষ বহু দিন আগেই লক্ষ্য করেছিল পিতামাতারা তাদের সন্তানদের মধ্যে একটি ‘সাদৃশ্য’ সঞ্চারণ করেন.  এবং সন্তানরাও তাদের সন্তানদের মধ্যে একই ভাবে ‘সাদৃশ্য’ সঞ্চারিত করে – কিন্তু কিভাবে ?  খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পাইথাগোরাস প্রস্তাব করেছিলেন, পুরুষের বীর্য এই তথ্যগুলো নারীর শরীরে নিয়ে যায়, যেখানে এটি প্রতিপালিত হয়। এর আরো দুইশ বছর পরে অ্যারিস্টোটলের সতর্ক চোখ লক্ষ করেছিল যে কিছু গ্রিকদের চেহারা তাদের মা কিংবা নানীদের মতো, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন নারীরাও পুরুষের মতে সাদৃশ্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারণ করে, আর এটি বহন করছে রক্তে ( এখনো আমরা রক্তের ধারা বা রক্তের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলি)। সঠিকভাবেই অ্যারিস্টোটল বলেছিলেন, সব প্রাণী শুধু গঠনগত উপাদানই নয় ( যেমন কাঠমিস্ত্রির কাঠ), এছাড়াও এটি একটি ‘বার্তা’ সঞ্চারণ করে-আকৃতি এবং রূপ। এর পরবর্তী দুই সহস্রাব্দে খুবই সামান্যই আমরা জানতে পেরেছিলাম। ১৮৫৯ সালে যখন চার্লস ডারউইন তার ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পেসিস বাই মিনস অব ন্যাচারাল সিলেকশন’ প্রকাশ করেছিলেন, তিনি খুব অস্বস্তিকরভাবে সচেতন ছিলেন – তার পুরো বিবর্তন তত্ত্ব দাড়িয়ে আছে এমন একটি ভিত্তির ওপর, যা দেখা সম্ভব নয়। বংশগতির একটি তত্ত্ব তখনো আসা বাকি ছিল। ১৮৩৩ সালে জার্মান জীববিজ্ঞান অগুস্ট ভাইজম্যান সাতটি স্ত্রী আর পাঁচটি পুরুষ সাদা ইদুরের লেজ কেটে দিয়েছিলেন দেখতে, তাদের সন্তানরা লেজ নিয়ে জন্ম নেয় কিনা, আমাদের কাছে এখন বিষয়টি স্পষ্ট কিন্তু সেই সময় এটি কারোরই নিশ্চিতভাবে জানা ছিল না, এই পরীক্ষা যখন শেষ হয়েছিল ভাইজম্যান ইদুরদের পাঁচটি প্রজন্মান্তরে ৯০১ টি লেজ কেটেছিলেন, কিন্তু কোনো লেজহীন ইদুরের জন্ম হয়নি। এভাবেই বিজ্ঞান অগ্রসর হয়েছিল।

‘বংশগতিবিদ্যা’ (বা হেরেডিটি) ছিল সেই বিজ্ঞান, ভবিষ্যদ্রষ্টা এইচ. জি. ওয়েলস যাকে বলেছিলেন ‘মিসিং সায়েন্স’- ‘জীববিজ্ঞান আর নৃতত্ত্বের সীমানায় এই অনাবিষ্কৃত জ্ঞানের খনি, যা প্লেটোর সময় যেমন অনুদঘাটিত ছিল কার্যত এখনো তেমনই রয়ে গেছে, আর সরল সত্যে এটি মানবতার সব বিজ্ঞান যা কখনো ছিল বা কখনো আবিষ্কৃত হবে, তার চেয়ে দশগুণ বেশি গুরত্বপূর্ণ’। এই ‘মিসিং সায়েন্স’ এখন জেনেটিক্স নামে পরিচিত – আর এর পলায়নপর মৌলিক কণা, জৈববৈজ্ঞানিক তথ্যের অপরিহার্য একক, যাদের আমরা জিন বলি। কিন্তু প্রথমে জিন ধারণাটি আবিষ্কার করতে হয়েছিল  – বিমূর্ত একটি ধারণা হিসেবে। তারপর এর ভৌত সত্তা, প্রকৃত রূপটি, যা শরীরের প্রতিটি কোষে বিদ্যমান, সেটি আবিষ্কার করতে হয়েছিল। আর এই আবিষ্কার আর অনুসন্ধানের গল্প বহু উপায়ে খন্ডিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু কখনোই এই বিস্তৃত বিশালতা নিয়ে নয়, যা সিদ্ধার্থ মুখার্জি তার নতুন ইতিহাস ‘দ্য জিন’ বইটিতে উপস্থাপন করেছেন।

এমনকি আপনি যদি ১৮৬৬ সালে মেন্ডেলের প্রবন্ধটি প্রকাশ থেকে শুরুও করেন, জেনেটিক্স অপেক্ষাকৃত নতুন একটি বিজ্ঞান, কিন্তু তারপরও বিস্ময়কর সংক্ষিপ্ত সময়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সব শাখা থেকে ব্যক্তিক ধারণা অবধি এর উপস্থিতি সর্বব্যাপী। মাত্র কয়েক দশকের আগেই আমরা জিন ‘পড়তে’ শিখেছি, তাদের কর্মপদ্ধতি জেনেছি, এবং আন্তঃপ্রজাতি স্থানান্তর, জিন চিকিৎসা ও জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্লভ জৈবপদার্থগুলো সৃষ্টি করতে শিখেছি সেই তথ্যটি ব্যবহার করে। জিন নিয়ে আমাদের ক্রমবর্ধমান উপলব্ধিগুলো এই পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান, আর আমাদের বিবর্তনীয় ইতিহাসের অজানা প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া অব্যাহত রেখেছে।  আজ এমনকি আমরা এখন জানি কিভাবে জিন ‘সম্পাদনা’ করতে হয়। আমরা চাইলে আমাদের একটি নতুন সংস্করণ তৈরি করার ঝুঁকিপূর্ণ আর ভয়ঙ্কর সেই ধারণাটিকে আবারও প্রশ্রয় দিতে পারি।  জেনেটিক্সের সমৃদ্ধি আমাদের একাধিক কঠিন নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। কারণ স্মরণকালের অতীতে যেমন দেখেছি – যখনই বংশানুক্রমে সঞ্চারণযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা শনাক্ত করেছি, প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সেই জ্ঞান উন্নত সংস্করণের মানব সৃষ্টি করার সম্মিলিত উদ্যোগে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী  উইলিয়াম বেটসন ভবিষ্যদ্দর্শী একটি মন্তব্যে সতর্ক করেছিলেন – ‘যখন বংশগতির বাস্তব তথ্যগুলো আমরা জানব, মানব জাতি এর মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করবে, যখনই ক্ষমতা আবিষ্কৃত হয়, মানুষ সবসময় সেদিকেই আকৃষ্ট হয়। বংশগতির বিজ্ঞান খুব শীঘ্রই বিস্ময়কর মাত্রায় ক্ষমতা দেবে’।

এই বইতে আমরা দেখব কিভাবে  ডাররউইনের কাজিন ফ্রান্সিস গলটন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ইউজেনিক্স বা সুপ্রজনন সমর্থন করেছিলেন – নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে মানব সমাজ উন্নতিকরণ। এমনকি যখন একটি জিন আসলে কি হতে পারে সেটি তার জানা ছিল না। কিন্তু তিনি দাবী করেছিলেন, বুদ্ধিমান শক্তিশালী আর সুন্দর মানুষদের আরো প্রজনন করা উচিত, আর অযোগ্যদের কম প্রজনন করা উচিত। গলটন ধারণা করছিলেন একটি কিভাবে বর্ণবাদী শক্তি বংশগতির ওপর নির্ভর করে সেটি ব্রিটিশ সমাজ আর কুৎসিত আর খর্বকায় হওয়া থেকে রক্ষা করতে সুপ্রজনন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। ১৯৩০ সাল নাগাদ ব্রিটিশ ও আমেরিকার প্রকল্পগুলো তথাকথিত জিনগতভাবে ক্রটিপূর্ণ ব্যক্তিদের বন্ধ্যাকরণ করতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীতে জার্মানিতে নাৎসিদের ‘রাসেনহাইজিন’ বিকশিত হতে অনুপ্রাণিত করেছিল, হিটলারে জার্মানির বন্ধ্যাকরণ আইন, প্রতিবন্ধী হত্যা, এবং পরে ভয়ঙ্কর ডা. মেনগেলের অসউইচে জমজ নিয়ে নিষ্ঠুর গবেষণা আসলেই মানব বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোনো গবেষণার পরিস্থিতি চিরকালের জন্য কলঙ্কিত করেছিল। মধ্য বিংশ শতাব্দী নাগাদ এটি ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক একটি ধারণায় পরিণত হয়েছিল।  ষাটের দশকে মুষ্টিমেয় কিছু বিজ্ঞানী জিনপ্রযুক্তির বিস্ময়কর উত্থান পূর্বধারণা করতে পরেছিলেন – রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ৭০ এর দশকে শুরুতে একটি প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে জিন স্থানান্তর সম্ভব করেছিল।  শুরুতে নৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাপূর্ণ ‘ঈশ্বর’ ভূমিকা পালন এবং প্রকৃতির সাথে অযথা ঝুঁকি নেয়ার উৎকণ্ঠা থাকলেও ওষুধ আর প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান যেমন হরমোন তৈরি করা সুবর্ণ সুযোগ সেই সব ইতস্ততাকে দ্রুত প্রতিস্থাপিত করেছিল। এবং ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল – জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে নির্মিত সত্তা, সেগুলোর তৈরি করার পদ্ধতি, পেটেন্ট, বাণিজ্যিক উদ্যোগ, লাভজনক প্রতিষ্ঠান – জৈব প্রযুক্তি হিসবে জনসচেতনতায় জেনেটিক্স প্রবেশ করেছিল।

পুলিৎজার পুরষ্কার বিজয়ী ক্যান্সারের ইতিহাস নিয়ে লেখা তার পূর্ববর্তী ‘দ্য এমপেরর অব অল ম্যালাডিজ’ বইয়ের মতো এই বইটিতেও সিদ্ধার্থ মুখার্জি সর্বব্যাপী একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জিনের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন – স্পষ্টতই ব্যাপক ও সামগ্রিক এবং ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ। বৈজ্ঞানিক দৃশ্যগুলোর মধ্যে চলচ্চিত্রের মতোই ক্রস-কাটিং হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তার নিজস্ব পারিবারিক ইতিহাসের নানা খণ্ডচিত্র। তার চাচাত ভাই এবং দুই চাচা বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, আর এই অসুখ, যা উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছে বলে অনুমিত অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে সঞ্চারিত হবার উৎকণ্ঠাটি আমরা তার চিন্তায় পরিব্যপ্ত হয়ে থাকতে দেখি।  

প্রথম দৃষ্টিতে প্রাকৃতিক জগতে কোনো কিছুই কিন্তু প্রস্তাব করে না যে জিনের অস্তিত্ব আছে, বংশগতি সেই সুনির্দিষ্ট পৃথক কণাগুলোর ধারণা উন্মোচন করতে হলে আসলেই আপনাকে অদ্ভুত সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। আর যে মানুষটি প্রথম সেই পরিশ্রমটি করেছিলেন তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসী গ্রেগর মেন্ডেল। বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের একটি বর্নোর একটি মঠে তিনি বসবাস করতেন। এই অ্যাবিতে প্রায় পাঁচ একর বিস্তৃত একটি বাগান ছিল। মেঠো ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে নিষেধ করার পর মেন্ডেল মটরশুঁটি চাষ করতে শুরু করেছিলেন। তিনি সেগুলো শুধু চাষই করেননি, তিনি শংকর তৈরি করেছিলেন – লম্বা গাছের সাথে খাটো গাছ, সাদা ফুলের সাথে বেগুনী ফুল, মসৃণ বীজাধার সাথে কুঞ্চিত বীজাধার। তিনি তার পাওয়া উপাত্তগুলোর মধ্যে একটি বিন্যাস শনাক্ত করতে শুরু করেছিলেন, অপ্রত্যাশিত পরিণতি, সংরক্ষিত অনুপাত, গানিতিক ছন্দ, বংশগতি অভ্যন্তরীণ যুক্তি ইশারা তিনি অনুসরণ করতে পেরেছিলেন। প্রায় আট বছর দীর্ঘ পরিশ্রম শেষে তিনি একট প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা তিনি বর্নোর কৃষক আর উদ্ভিদবিদদের সভায় পাঠ করেছিলেন এবং বর্নো ন্যাচারাল সায়েন্স সোসাইটির প্রসিডিংস- এ সেটি প্রকাশিত হয়েছিল। এবং তারপর— না কিছুই হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি জটপাকানো জাল, এটি যৌক্তিক বক্ররেখার মতো নয়, এবং চার দশক মেন্ডেলের পথিকৃত কাজ, যে গবেষণা পরে আধুনিক জীববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা করেছিল, কার্যত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

আধুনিক জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠা হতে নতুন শতাব্দীর সূচনা অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছিল, মেন্ডেলের সেই হারিয়ে যাওয়া প্রবন্ধ অ্যামস্টারডাম আর কেমব্রিজের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন । মেন্ডেল বংশগতির মৌলিক একক খুজে পেয়েছিলেন, তিনি প্রমাণ করেছিলেন, অবশই এমন কোনো একটি একক থাকতে হবে। এবং অবশেষে একজন ডাচ উদ্ভিদবিজ্ঞানী এর একটি সংক্ষিপ্ত নাম দিয়েছিলেন, ‘জিন’। কিন্তু জিন আসলে কি? প্রথমে যা ছিল একটি বিমূর্ত ধারণা, একটি রহস্য, জৈব যন্ত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অশরীরী – সংজ্ঞানুযায়ী জিনকে হতে হবে যে-কোনো বৈশিষ্ট্যের বাহক যা বংশানুক্রমে সঞ্চারণযোগ্য অথবা আংশিকভাবে সঞ্চারণযোগ্য, কেউ হয়তো বলবেন যে চোখের রং, উচ্চতা, এমনকি বুদ্ধিমত্তার জন্য জিন আছে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য অন্য বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি সংজ্ঞায়নযোগ্য। বিংশ শতাব্দীতে নতুন প্রযুক্তি আর নতুন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রগুলো এই বিমূত আর উপপ্রেময় ধারণাটি আরও সুস্পষ্ট করেছিল, আর জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক এবং রোজালিন্ড ফ্র্যাংকলিনের সেই জীবন্ত ভৌত রূপটি – বিখ্যাত ডাবল হেলিক্স, সেই পেঁচানো ‘ডিএনএ’ দ্বিসূত্রক অণু – আবিষ্কারের মাধ্যমে বিখ্যাত ‘অনুধাবনটি’ এসেছিল –  জিন মালায় বাধা পুতির মতো এই ক্রোজোমের ওপরেই গ্রথিত (একটি সাধারণ রূপক)। বিজ্ঞানী এগুলো পৃথক করেছেন এবং গণনা করেছেন, এখন আমরা জানি একটি মানুষ তৈরি করতে প্রায় ২১০০০ থেকে ২৩০০০ জিন প্রয়োজন।  জিন হচ্ছে একটি বার্তা, এটি প্রোটিন তৈরি একটি নির্দেশনা, এটি নীলনকশা যা কোনো একটি কাঠামোর তৈরি নির্দেশনা হতে পারে কিন্তু আরো সঠিকভাবে, রিচার্ড ডকিন্স যেমন বলেছিলেন, একটি রেসিপি যা একটি প্রক্রিয়াকে সংকেতাবদ্ধ করেছে। জিনোম হচ্ছে একটি অ্যালগরিদম, এবং একই সাথে এটি সংকেত বা কোড। পরিশ্রমসাধ্য আর উদ্ভাবন পটু উপায়ে যার মর্মোদ্ধার করা হয়েছে। এটি অসীম জীব্ন চক্রের শুরু ও শেষ – একটি জিন হচ্ছে একটি বার্তা, যা একটি প্রোটিন তৈরি করে, যে প্রোটিন রূপ এবং কাজ তৈরি করে, যা জিন নিয়ন্ত্রণ করে।

সিদ্ধার্থ মুখার্জির জিনের ইতিহাস নিয়ে এই বইটি সময়ক্রম নয় – বরং মূল ধারণাগুলোর ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। আর এটি জরুরী, কারণ বিজ্ঞান কদাচিৎ যৌক্তিক পথ অনুসরণ করে অগ্রসর হয়, আর এছাড়া জেনেটিক্স একই সাথে বহু ক্ষেত্রেই এর প্রভাব বিস্তার করে, জীববিজ্ঞান, তথ্যবিজ্ঞান, এমনকি মনোবিজ্ঞান। আমরা এই বইয়ে দেখব কিভাবে বিজ্ঞানের এই নতুন শাখা জেনেটিক্স বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিল। কিভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞাকে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। শুধু নাৎসি জার্মানির সুপ্রজনন জিনবিজ্ঞান স্মরণই হয়তো যথেষ্ট, যার লক্ষ্য ছিল জাতিগত বিশোধন আর ‘বিশুদ্ধ’ জাতিগত উন্নয়ন, মানসিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের অপসারণ, কিন্তু সুপ্রজনন বা ইউজেনিক্সের সামাজিক তাড়না কিন্তু আরো আগেই শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে। আর এই ধারণাগুলো এখনো নির্বাপিত হয়নি, বরং নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে।  আরো সম্প্রতি আমরা এখনও বর্ণ সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণায় তথ্যপুষ্ট বির্তকগুলো দেখতে পাই –  ১৯৮০-এর দশকেই জেমস কিউ. উইলসনর হার্নস্টাইন অপরাধ সহিংসতাকে খারাপ জিনের সাথে যুক্ত করেছিলেন তার বিতর্কিত ‘ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান নেচার’ বইয়ে, এবং  চার্লস মারের বিতর্কিত ১৯৯০-এর দশকের ‘দ্য বেল কার্ভ’ বইটি আফ্রিকার বংশোদ্ভুত মানুষের ওপর এশিয় ও শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করেছিল। আমরা এই বইয়ে সিদ্ধার্থ মুখার্জিকে এই এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করতে দেখি। আমরা জানতে পারি যে, বুদ্ধিমত্তার সংকীর্ণ আর পরিবর্তনশীল সংজ্ঞা আর পরিমাপ ভ্রান্ত ক্রটিপূর্ণ এবং সাংস্কৃতিকভাবে পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে। এই বিতর্ক ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদের শনাক্ত করতে হবে আমাদের বর্ণ শ্রেণিগুলো কত বেশি কৃত্রিম। হিউম্যান জিনোম প্রকল্প ও এর উত্তরসূরি প্রকল্প থেকে আসা জ্ঞানের বিস্ফোরণ জিনগত বৈচিত্রের সেই গোষ্ঠীগুলোয় পরিসংখ্যানগত পরিমাপ দিয়েছে যাদের বর্ণ বা রেস হিসেবে আমরা শ্রেণীবিন্যস্ত করি। আর বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে আমরা দেখেছি বৈচিত্র্য খুব সামান্য, আর গোষ্ঠী অভ্যন্তরে যা অনেক বেশি।

জিন শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের প্রতিক্রিয়ায় কাজ করে: কোষ অন্য কোষকে নির্দেশনা দেয় কি করতে হবে। আমাদের স্নায়ুকোষ আর যকৃতকোষে একই জিন আছে, কিন্তু, জিনবিজ্ঞানীরা বহুদিন আগেই যেমন বুঝতে পেরেছিলেন, কিছু জিন কোনো এক ধরনের কোষে সক্রিয় হয়, আবার অন্য ধরনের কোষে যা নিষ্ক্রিয় থাকে। আপনার জিনোম হচ্ছে প্যালেট এটি পুরো চিত্রকর্ম নয়। এই বইয়ে বেশ কিছু গবেষণা উল্লেখ করে সিদ্ধার্থ মুখার্জি আমাদের প্ররোচিত করেন অনুধাবন করতে যে, আমাদের জিনোম হয়তো বাহ্যিক পরিবেশের প্রতিও প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। কিছু বাহ্যিক প্রভাব হয়তো জিন সক্রিয়/নিষ্ক্রিয় করার রাসায়নিক সুইচকে প্রভাবিত করে, যা জিনোমের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের ওপরেও বাড়তি একটি স্তর যুক্ত করে – এপিজেনেটিক্স। হয়তো সেগুলো বংশানুক্রমে সঞ্চারণযোগ্য কোনো স্থায়ী চিহ্ন এঁকে দিয়ে যায় আমাদের জিনোমের ওপর। আমাদের বংশগতি পরোক্ষভাবে আমাদের পরিবেশও, এবং জৈববৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রবাহ সরলরৈখিক নয় বরং চক্রাকার।  অবশ্য এই দাবীর ব্যপারে মুখার্জি সতর্ক ছিলেন, এটি বহু আগেই প্রত্যাখ্যাত লামার্কবাদের প্রত্যাবর্তন নয়, যা দাবী করেছিল অর্জিত বৈশিষ্ট্যাবলি বংশানুক্রমে সঞ্চারণযোগ্য। কিন্তু এখানে তিনি যতটা হবার দরকার তিনি ততটা সতর্ক হননি, আর বইয়ের এই বিষয়টি বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, যা প্রদর্শন করে সেই প্রাচীন প্রকৃতি-বনাম-প্রতিপালন বিতর্কটি আসলেই কতটা বৈজ্ঞানিক এবং মতাদর্শগত আবেগ নির্ভর,  এবং জিনবিজ্ঞানী কতটা উৎকণ্ঠিত যে সাধারণ পাঠক হয়তো সেই ধারণাটি পেতে পারেন যে, পরিবেশ আসলেই সবকিছু। কিন্তু এই বইয়ের পাঠকরা বুঝতে পারবেন যে, জিন আমাদের শারীরিক আর মানসিক স্বরূপতা নির্ধারণ করে এই ধারণাটি ‘সরলীকৃত’ সংস্করণ থেকে আমাদের চিন্তা খানিকটা সরিয়ে দেবার ক্ষেত্রে তিনি সঠিক ভূমিকাই পালন করেছেন। এপিজেনেটিক্সের বহুবিধ সংস্করণ নিয়ে বিতর্কগুলো এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু এই বইটির শেষে অধ্যায়গুলো আমাদের কিছু উপায় নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করবে ।

জিন যেমন আমাদের স্বরুপতা নির্ধারক আবার তেমনি এটি নির্ধারক নয়, এই আপার্তবৈপরিত্যটি মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হয়। কিন্তু যখন আমরা জানি যে আমাদের জিনোম আমাদের কিভাবে সংজ্ঞায়িত করে, আমরা আরো জানতে পারি কিভাবে আমরা আমাদের জিনোমের নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রম করে যেতে পারি। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ-এর যুগে, জিন আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণের একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের এখন জিন থেরাপি, জিন এডিটিং আছে, সিদ্ধার্থ মুখার্জি যাকে উত্তর জিনোম বিশ্ব বলছেন সেখানে আমরা এমন একটি শক্তি অর্জন করতে যাচ্ছি যা যুগপৎ উত্তেজনাপূর্ণ এবং ভয়ঙ্কর, কারণ আমরা আমাদের নিজেদের পড়তে এবং নতুন করে লিখতে শিখব।

সিদ্ধার্থ মুখার্জির জিন: একটি অন্তরঙ্গ ইতিহাস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s