নাঙ্গেলি : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

মনু এস. পিল্লাই-এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে

তার নাম ছিল নাঙ্গেলি এবং তিনি চেরথালায় বাস করতেন, কেরাল উপকূলের উপকূলের পানি পরিবেষ্টিত একটি বর্ধিতাংশ। আমাদের জানা নেই তিনি কবে জন্ম গ্রহন করেছিলেন অথবা কে তাকে জন্ম দিয়েছিল। বলা হয়ে থাকে তিনি উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে মারা গিয়েছিলেন, এবং তার মৃত্যুর পর অতিক্রান্ত দুই শত গ্রীষ্মে শতাধিক ভিন্ন ছাঁচে তার আত্মার পূনর্জন্ম হয়েছে। ইন্টারনেটে আজ নাঙ্গেলির বহু সমর্থক আছেন, তার গল্প বলছেন সেই নারী পুরুষরা যারা তাদের বর্তমান এই সময়ে অনুপ্রেরণা আর সাহস খুঁজছেন। এবং তারাও নাঙ্গেলির বিসর্জনকে নতুন ছাঁচে উপস্থাপন করেছেন, এমন একটি কাহিনি সৃষ্টি করেছেন, যা এর মূল চরিত্র নাঙ্গেলির কাছেই অবোধ্য মনে হতো। নাঙ্গেলি সমাজের হৃৎপিণ্ডে ছুরিকাঘাত করা একজন নারী থেকে এমন একজন নারীতে রূপান্তরিত হয়েছেন, যিনি ঔসব ধূর্ত প্রতারণাপূর্ণ শৃঙ্খলের জন্য প্রাণ দিয়েছিল, যাকে আমরা অনেকেই ‘অনার’ বা সন্মান হিসেবে চিনি।

প্রিয়া কুরিয়ানের ইলাসট্রেশন: নালেঙ্গি

এই কাহিনির রূপরেখা সুপরিচিত। নাঙ্গেলি ও তার পুরুষ, চিরুকন্দন ছিলে ‘এজহাভা’ – যারা মূলত ‘টডি ট্যাপার’ অর্থাৎ নারিকেল বা তালগাছের ফুল থেকে যারা নির্যাস সংগ্রহ করেন, পরে সেটিকে ‘টডি’ নামে মৃদু অ্যালোকোহল পানীয় তৈরি করা হয়।। এজহাভা সমাজের সেই অস্বস্তিকর শূন্যস্থানে পরিশ্রম করে বাঁচেন, সমাজ যাদের শ্রেনীভূক্ত করে নিচু জাত হিসেবে, তবে সবচেয়ে নিচু জাত নয়। তাদের ছোট একটি কুটির ছিল যেখানে তারা বাস করতেন, এবং তাদের কোনো সন্তান ছিল না। নাঙ্গেলি ও চিরুকন্দনের জন্য জীবন তাদের যে-কোনো প্রতিবেশির মত কঠোর আর নির্মম ছিল। তারা দিনে এনে দিনে খেতেন, জাতপ্রথার বেধে দেয়া নিয়ম মেনে চলতেন, সমাজের উচু জাতের মানুষদের অহংকারের প্রতি নতজানু হতেন। নাঙ্গেলি প্রতিবাদ করার আগ পর্যন্ত তাদের কোনো কিছুই বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল না। সমাজের মুরুব্বীরা দাবী করেছিলেন যে, নাঙ্গেলি তার সন্মান রক্ষার্থে এই প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েছিল, কিন্তু এমন কিছু বলার কারণ ছিল তারা সেই সত্যটি স্বীকার করতে আতঙ্কিত হয়েছিলেন – নাঙ্গেলি আসলে তাদের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন। নাঙ্গেলি বিদ্রোহী ছিলেন, এবং বহু বিদ্রোহীর মতোই মৃত্যুতে তার স্মৃতি তিনি যাদের বিরোধিতা করেছিলেন তাদের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি নিপীড়কদের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার ঐতিহ্য এখন অন্য নিপীড়কদের হাতের মুঠোয়।


যে কেরালা নাঙ্গেলি আর চিরুকন্দন জানতেন সেটি আজকের আধুনিক কেরালা নয়। এর স্বাস্থবান শিশু, স্বাধীন পিতামহী-মাতামহী আর শিক্ষিত জনগণের জন্য যে কেরালা নিয়ে উচ্ছাস করা হয় এটি সেই কেরালা নয় । এটি ছিল কঠোর, নিষ্ঠুর একটি এলাকা, আর ত্রিবাঙ্কুর (ট্রাভাংকোর) মানচিত্রে চেরথালা ছিল ক্ষুদ্র একটি বিন্দু – যে রাজ্যটির একজন স্বাধীন রাজা ছিলেন। যে রাজার প্রতি তারা কর আর আনুগত্যের প্রতিশ্রুতে আবদ্ধ ছিলেন। ভূমির কর ছিল কম, কিন্তু রাজারা তাদের পূর্বসূরিদের এই ভুল শোধরানোর চেষ্টা করেছিল বিচিত্র ধরনের রাজস্ব আরোপ করে। যদি আপনি ভূমিহীন মৎসজীবী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার মাছ ধরার জালের ওপর আপনাকে কর দিতে হবে। আপনি যদি পুরুষ হন, এবং গোফ রাখতে পছন্দ করেন, তাহলে কর আদায়ের জন্য সেটি কর পরিদর্শকের এখতিয়ারের মধ্যে থাকবে। যদি আপনার দাস থাকে, তাহলে আপনাকে ঔসব জীবন্ত রক্তমাংসের জন্য কর দিতে হবে। নাঙ্গেলি ও পুরুষ চিরুকন্দন অনুগত প্রজার মতো রাজ্যে নিয়ম মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যারা এই গল্পটি বলছেন তারা আপনাকে বলবেন যে তিনি একটি ঘৃণ্য করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন যা কিনা তার ‘সন্মানের’ সেই নাজুক বিষয়টিকে স্পর্শ করেছিল। আত্মমর্যাদা আছে এমন কোনো নারীর মতো যখনই এটি তার অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করেছে, তিনি ঘোষণা করেছিলেন – ‘আর নয়’।

Continue reading “নাঙ্গেলি : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ”
নাঙ্গেলি : প্রোক্রাস্টিজের বিছানায় প্রজ্বলিত পুরাণ

ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (ইবুক)

২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী চার্লস ডারউইনের জন্মদিনে ধারাবাহিকভাবে এই লেখাটি শুরু করেছিলাম নিজস্ব ব্লগে (জীবনের বিজ্ঞান) প্রকাশ করার ইচ্ছা নিয়ে। ইবুকটি সেই লেখাটির পরিবর্ধিত আর সম্পাদিত একটি রুপ। চার্লস ডারউইন ১৮০৯ সালে ১২ ফেব্রুয়ারী ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহন করেছিলেন। বর্তমানে দিনটি আন্তর্জাতিক ডারউইন দিবস হিসাবে পালন করা হয়। বিজ্ঞান এবং যুক্তির আলোয় কুসংস্কারমুক্ত জীবন উদযাপনের দিন হিসাবে চার্লস ডারউইনের জন্মদিন, ১২ ফেব্রুয়ারীকে নব্বই দশকের শুরুতে,আন্তর্জাতিক ডারউইন দিবস হিসাবে বেছে নেয়া হয়েছিল । প্রতিভাবান ব্রিটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন মানব সভ্যতার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী আর বৈপ্লবিক ধারণাটির জন্ম দিয়েছিলেন: প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন। জীববিজ্ঞান তো বটেই বিজ্ঞানের নানা শাখায় এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার মাষ্টারপিস ‘অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ (নামটি সম্পাদিত সংক্ষেপিত একটি রুপ, On the Origin of Species) বইটি, পৃথিবী এবং সেখানে আমাদের নিজেদের অবস্থান সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটিকে চিরকালের মত বদলে দিয়েছিল। খুব সরল এই ধারণার মাধ্যমে, ডারউইন জীবের সকল জটিলতা আর বৈচিত্র্যের একটি সাধারণ ব্যাখ্যা দিতে পেরেছিলেন ।গত দেড় শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা তার এই ধারণাটির সপক্ষে প্রমাণ জুগিয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে। বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধীতার কারণ কখনোই এর প্রমাণের স্বল্পতা নয়, বরং এর সম্বন্ধে অজ্ঞতা। ডারউইনকে নিয়ে ধারাবাহিক এই লেখাটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে ডারউইনের জীবনে সেই গুরুত্বপুর্ণ সময়ে কাহিনী। লেখাটির মূল সূত্র কার্ল জিমারের (Carl Zimmer) এর Evolution, the triumph of an idea র কিছু অধ্যায়, তবে বেশ কিছু বাড়তি তথ্য এসেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে।

কাজী মাহবুব হাসান 

প্রকাশক : হাইপারস্পেস

বইটির ডাউনলোড লিঙ্ক :

ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (ইবুক)

সিদ্ধার্থ মুখার্জির জিন: একটি অন্তরঙ্গ ইতিহাস

Siddhartha Mukherjee’s THE GENE: An Intimate History  

অনুবাদ: কাজী মাহবুব হাসান
প্রচ্ছদ: এম সি এশারের বন্ড অব ইউনিটি অবলম্বনে আসমা সুলতানা
প্রকাশনা: দিব্য প্রকাশ

আপনি যখন আয়নার দিকে তাকান, আপনি শুধু আপনার মুখই দেখেন না, একটি জাদুঘরও দেখেন, নৃতাত্ত্বিক ডেভিড অ্যান্থনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, যদিও একটি অর্থে এটি আপনারই মুখ, কিন্তু বহু বৈশিষ্ট্যের কোলাজ হিসেবে এটি তৈরি, যে বৈশিষ্ট্যগুলো আপনি আপনার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পেয়েছেন। ঐ যে ঠোঁট আর চোখ যা আপনার প্রিয় বা আপনাকে বিব্রত করে সেটি শুধু আপনার একার নয়, এটি আপনার পূর্বসূরিদেরও বৈশিষ্ট্য। আজ যদিও তাদের অস্তিত্ব নেই, কিন্তু খণ্ডাংশ রূপে আপনার মধ্যে তারা এখনো খুবই জীবন্ত। এমনকি জটিল বৈশিষ্ট্যগুলো, যেমন, ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা, সঙ্গীত সৃষ্টি, কিংবা ভীড়ে লজ্জা পাওয়া, কিংবা কোনো অসুখে আক্রান্ত হবার বাড়তি প্রবণতা – এইসব বৈশিষ্ট্যই আপনার পূর্বসূরিদের মধ্যে কারো-না-কারো ছিল। শুধু আমাদের শরীর নয়, আমরা সারাক্ষণই আমাদের অতীত নিয়ে ঘুরি, আর আমাদের সামাজিক আচারে এটি টিকে আছে, এমনকি আমাদের বাচনভঙ্গিতে। অতীত হচ্ছে একগুচ্ছ অদৃশ্য চশমা, যা আমরা সারাক্ষণই পরে আছি, যার মধ্যে আমরা পৃথিবীকে দেখছি আর পৃথিবীও আমাদের দেখছে। নিচের দিকে তাকিয়ে তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করি বা না করি, আমরা সবসময়ই আমাদের পূর্বসূরিদের কাধে ওপর দাড়িয়ে আছি।

Continue reading “সিদ্ধার্থ মুখার্জির জিন: একটি অন্তরঙ্গ ইতিহাস”
সিদ্ধার্থ মুখার্জির জিন: একটি অন্তরঙ্গ ইতিহাস