জেরি কয়েনের ফেইথ ভার্সেস ফ্যাক্ট

ভূমিকা:

* অসম্পাদিত খসড়া, একাধিক বানান সমস্যাসহ..বইটি অনুবাদ চলমান (একটি সতর্কীকরণ)

‘বিজ্ঞানের একটি ভালো দিক হচ্ছে, আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন, এটি সত্য।’ – নিল ডে গ্রাস টাইসন

ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ‘বিজ্ঞান আর ধর্ম কি পরস্পর সঙ্গতিপূর্ণ ?’- বিতর্কিত এই বিষয়টি নিয়ে আমি বিতর্ক করেছিলাম এক তরুণ লুথারিয়ান ধর্মতাত্ত্বিকের সাথে। জায়গাটি ছিল দক্ষিণ ক্যারোলাইনার ঐতিহাসিক সার্কুলার কনগ্রেগেশনাল চার্চ, দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম চার্চ। আমাদের দুজনের বিশ মিনিট করে বক্তব্য দেবার পর (তিনি প্রস্তাবনা পক্ষে, অর্থাৎ ’হ্যাঁ’ আর আমি বিপক্ষে অর্থাৎ ’না’), আমাদেরকে বলা হয়েছিল, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি মাত্র বাক্য দিয়ে প্রকাশ করার জন্য। আমি আমার সংক্ষিপ্ত বাক্যটি মনে করতে পারছিনা কিন্তু আমি খুব স্পষ্টভাবেই মনে করতে পারছি, ধর্মতাত্ত্বিকের সেই বাক্যটিকে: ‘আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে ধর্মবিশ্বাস (ফেইথ) হচ্ছে একটি উপহার (গিফট)।’

এটি ছিল সেই “লে’স্পিরিট ডে’স্কালিয়ে” মুহূর্ত বা সিড়িতে হঠাৎ বুদ্ধিমান উত্তর মনে আসার মুহূর্তের একটি, যখন আপনি এর প্রতিউত্তরে একটি ক্রটিহীন প্রতিক্রিয়া মনে প্রস্তুত করতে পারবেন – কিন্তু  সুযোগ বেশ অনেকক্ষণ আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। কারণ বিতর্কের অনুষ্ঠানটি শেষ হবার অল্প কিছুক্ষণ পর জার্মান ভাষায় ‘গিফট’ শব্দটির অর্থ যে, বিষ, আমার শুধুমাত্র সেটিই মনে হয়নি বরং আমি স্পষ্টভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম ধর্মতাত্ত্বিকের বিদায় মন্তব্যটি ‘বিজ্ঞান ও ধর্ম সঙ্গতিপূর্ণ ’ তার এই মূল বক্তব্যকেই দূর্বল করে দিয়েছে। আমি আসলেই কি বলেছিলাম জানি না, আমার যা বলা উচিৎ ছিল সেটি হচ্ছে: বিশ্বাস ধর্মে হয়তো কোনো উপহার হতে পারে,কিন্তু বিজ্ঞানের জন্য এটি বিষ, কারণ সত্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে বিশ্বাস কোনো উপায় হতে পারে না।

এই বইটি এখন সেই কথাগুলো বলতে আমাকে একটি সুযোগ দিয়েছে। বিজ্ঞান এবং ধর্ম, ফেইথ বা বিশ্বাসকে যে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বিবেচনা করে থাকে, আমাদের এই মহাবিশ্ব সংক্রান্ত সত্যগুলো আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো যেভাবে তাদের পরস্পর অসামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে, এই বইটির আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সেটি। আমার মূল বক্তব্য হচ্ছে যে, বিজ্ঞান ও ধর্ম, বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বহু উপায়ে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী – উভয়েই ‘অস্তিত্ব সংক্রান্ত দাবি’ করে কোনটি সত্য সেই বিষয়ে – কিন্ত পৃথক কর্মকৌশল তারা ব্যবহার করে সেই লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য। এবং আমি যুক্তি দেবো যে, বিজ্ঞানের সেই কর্ম কৌশলগুলো, যার ভিত্তি যুক্তি এবং পর্যবেক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নির্ভর গবেষণা, অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য, কিন্তু ধর্মের সেই কৌশলগুলো, এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ধর্মবিশ্বাস, মতবাদ এবং ঐশী প্রত্যাদেশ – সেগুলো অনির্ভরযোগ্য এবং যা ভুল, অপ্রমাণযোগ্য এবং পরস্পরবিরোধী উপসংহারের দিকে আদের পরিচালিত করে। সত্যিই, প্রমানের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসের উপর ভরসা করার জন্যই ধর্ম সত্য অনুসন্ধানে নিজেকেই অনুপযুক্ত করেছে।

আমি মনে করি, তাহলে – আর এখানে আমি বহু ‘অ্যাকোমোডেশনিষ্ট’ থেকে ভিন্নমত পোষণ করি, যারা মনে করেন ধর্ম এবং বিজ্ঞান, যদিও সদৃশ অথবা সম্পুরক নয়, অন্ততপক্ষে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থানে নেই – ধর্ম এবং বিজ্ঞান একধরনের যুদ্ধে রত : উপলদ্ধি বা বোঝার জন্য যুদ্ধ, আমরা যা কিছু সত্য বলে গ্রহন করি, তার জন্য আমাদের কি যথেষ্ঠ ভালো কারণ আছে কিনা, তার জন্য যুদ্ধ।

যদিও এই বইটি ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যে দ্বন্দ নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে আমি এটাকে দেখি শুধুমাত্র আরো ব্যপক একটি যুদ্ধের খণ্ডযুদ্ধ হিসাবে – সেই যুদ্ধটি হলো যৌক্তিকতা আর কুসংস্কারের মধ্যে যুদ্ধ। ধর্ম যদিও শুধু একধরনের কুসংস্কার মাত্র (অন্যগুলো যেমন, জ্যোতিষবিদ্যায়, অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা, হোমিওপ্যাথি, আধ্যাত্মিক নিরাময় প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস), কিন্তু সব কুসংস্কারের মধ্যে এটি সবচেয়ে ব্যপক আর ক্ষতিকর একটি রুপ। আর বিজ্ঞান হচ্ছে শুধুমাত্র এক ধরনের যৌক্তিকতা ( দর্শন এবং গণিত হচ্ছে অন্য ধরনের যৌক্তিকতা), কিন্তু এটাই এর সবচেয়ে বিকশিত রুপ এবং শুধুমাত্র একটি উপায় যা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে আর বুঝতে সক্ষম।

সব কুসংস্কারগুলো, যারা কিনা দাবী করে তারা সত্যকে ব্যাখ্যা করছে, তারা আসলেই ছদ্মবিজ্ঞানের নানা রুপমাত্র এবং সবগুলোই একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে থাকে, মিথ্যা প্রমাণিত হবার সকল সম্ভাবনা থেকে নিজেদেও সুরক্ষা করার জন্য। যেমনটা আমরা দেখবো, ছদ্মবিজ্ঞানের সমর্থকরা যারা হোমিওপ্যাথি অথবা ইএসপি ( এক্সট্রা সেনসরি পারসেপসন) পছন্দ করেন, তারা প্রায়শই তাদের বিশ্বসকে সমর্থন করেন একই ধরনের যুক্তি ব্যবহার করে, যা ধর্মতাত্ত্বিকরা তাদের ধর্মবিশ্বাসের সমর্থনে সাধারণত ব্যবহার করে থাকেন।

যদিও বিজ্ঞান বনাম ধর্ম বিতর্ক যৌক্তিকতা আর অযৌক্তিকতার মধ্যে চলমান বৃহত্তর যুদ্ধের অন্তর্গত একটি যুদ্ধ, বেশ কয়েকটি কারণে আমি এই বিষয়টির উপর বেশী গুরুত্ব দিয়েছি। প্রথমত, এই বিতর্কটি এখন আরো বেশী ব্যপক এবং দৃশ্যমান, এবং খুব সম্ভবত এর কারণ ধর্মের সমালোচনায় একটি নতুন উপাদানের আবির্ভাব। নব্য নিরীশ্বরবাদ – অবিশ্বাসের যে রুপটি স্যাম হ্যারিস এবং রিচার্ড ডকিন্সের মত লেখকদের পৃথক করেছে পুরোনো নিরীশ্বরবাদীদের থেকে, যেমন জ্যাঁ-পল সার্ত্রে এবং বার্ট্রাণ্ড রাসেল – আর সবচেয়ে নবীন বিষয়টি হচ্ছে সেই পর্যবেক্ষণটি, বেশীরভাগ ধর্মই এমন দাবীর উপর ভিত্তি কওে প্রতিষ্ঠিত যা কিনা বৈজ্ঞানিক হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মানে হচ্ছে, ঈশ্বর এবং বহু ধর্মের মূল প্রস্তাবনাগুলো হচ্ছে হাইপোথিসিস, সেগুলো, নিদেনপক্ষে নীতিগতভাবে, বিজ্ঞান এবং যুক্তি দিয়ে নীরিক্ষা করা যেতে পারে। যুক্তিটি দাবী করছে যে যদি ধর্মের দাবীকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব না হয় নির্ভরযোগ্য স্বাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে, তাদেরও সন্দেহজনক ভ্রান্ত বৈজ্ঞানিক দাবীর মতই প্রত্যাখান করা উচিৎ, যতক্ষণ অবধি নতুন কোনো উপাত্ত আমরা না পাই। এই যুক্তিকে আরো দৃঢ় করেছে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলো, যেমন কসমোলজি, নিউরোবায়োলজী এবং বিবর্তন জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে।

এই সব ক্ষেত্রের আবিষ্কারগুলো কিছু প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো সংক্রান্ত ধর্মের দাবীগুলোকে অসার প্রমাণিত করেছে, যেমন মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং মানব নৈতিকতা ও সচেতনতার অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্ভব নয় এবং সেকারণে এগুলো ঈশ্বরের অস্তিতের স্বপক্ষে প্রমাণ। তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র সংকোচিত হতে দেখে, বিশ্বাসীরা আরো বেশী জোরপূর্বক দাবী করে যে, ধর্ম আসলে প্রকৃতিকে বোঝার একটি উপায় যা বিজ্ঞানের সম্পুরক। কিন্তু অন্য নানা ধরনের অযৌক্তিকতা ছাড়াও ধর্মের উপর নজর দেবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ কিন্তু একটি ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করা নয়, বরং মূল কারণটি হচ্ছে, অন্য সব ধরনের কুসংস্কারের মধ্যে ধর্ম সবচেয়ে বেশী পরিমান সর্বজনীন ক্ষতির কারণ হবার সম্ভাবনা বহন করে। খুব অল্প কয়জন মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হয় জ্যোতিষবিদ্যায় বিশ্বাস করার জন্য; কিন্ত আমরা এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে দেখবো, বহু মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন কোনো একটি নির্দিষ্ট ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস অথবা ধর্মবিশ্বাস একটি সদগুণ এমন ধারণার দ্বারা।

আমার ব্যক্তিগত এবং পেশাগত, উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহ আছে এই বিতর্কে, কারণ আমি আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনটি কাটিয়েছি বিবর্তন জীববিজ্ঞান পড়িয়ে ও গবেষণা করে, বিজ্ঞানের যে শাখাটি সবচেয়ে বেশী নিন্দিত আর প্রত্যাখাত হয়েছে ধর্মের কারণে। আমার জীবনীর আরো বেশ কিছু এখানে বলার সময় এসেছে: আমি প্রতিপালিত হয়েছি একজন সেক্যুলার ইহুদী হিসাবে, যে প্রতিপালন, বেশীরভাগ মানুষই জানেন, নিরীশ্বরবাদ থেকে চুল পরিমান ভিন্ন। কিন্তু একটি ঈশ্বরের উপরেে আমার অস্পষ্ট বিশ^াস পরিত্যক্ত হয়েছিলে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে যখন, সতের বছর বয়সে, আমি প্রথম বীটলস এর সার্জেন্ট পেপার অ্যালবামটি শুনছিলাম এবং হঠাৎ করেই আমি অনুধাবণ করেছিলাম আমাকে – এবং অন্য যে কোনো কাউকেই, যে ধর্মীয় দাবীগুলো শেখানো হয়েছে, তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তাহলে, শুরু থেকে আমার অবিশ^াসের ভিত্তি ছিল স্বর্গীয় কোনো কিছুর জন্য প্রমাণের অনুপস্থিতিতে। বহু বিশ^াসীদের সাথে যদি তুলনা করা হয়, আমার ঈশ্বর প্রত্যাখান পর্বটি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং যন্ত্রণাহীন। কিন্তু এর পর ধর্ম নিয়ে আমি তেমন কিছু ভাবিনি পেশাজীবি বিজ্ঞানী হওয়া অবধি।

বিজ্ঞান আর ধর্মের দ্বন্দে নিমজ্জিত হবার জন্য বিবর্তন জীববিজ্ঞানী হবার চেয়ে আর কোনো নিশ্চিৎ পথ নেই। প্রায় অর্ধেকের বেশী যুক্তরাষ্ট্রবাসী পুরোপুরিভাবে বিবর্তনকে অস্বীকার করেছে বাইবেলে বর্ণিত কাহিনীকে আক্ষরিকার্থে সত্য এমন দাবীকে সমর্থন করে, যেখানে প্রতিটি জীবিত প্রজাতি, অথবা নিদেনপক্ষে আমাদের নিজেদের প্রজাতিটি, হঠাৎ করে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন একটি স্বর্গীয় সত্ত্বা দশ হাজার বছরেরও কম সময়ে মধ্যে। এবং বাকী অংশের বেশীর ভাগই বিশ্বাস করেন বিবর্তনকে কোনো না কোনোভাবে পরিচালিত করেছেন স্বয়ং ঈশ্বর – এই অবস্থানটি সরাসরি অস্বীকার করে প্রাকৃতিক সেই দৃষ্টিভঙ্গি যা গ্রহন করছেন বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা: সেই বিবর্তন, মহাবিশ্বের আর যে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার মতোই পদার্থবিদ্যার সূত্রসমূহের পরিণতি, যেখানে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্ত্বার সংশ্লিষ্টতা নেই। বাস্তবিকভাবেই প্রতি পাঁচ জন যুক্তরাষ্ট্রবাসীদের মাত্র একজন বিবর্তনকে বিশুদ্ধভাবে প্রাকৃতিক একটি ঘটনা হিসাবে দেখেন বিজ্ঞানীদের মত।

যখন আমি বিবর্তনের প্রথম কোর্সটি পড়েছিরাম ইউনিভার্সিটি অব মেরীল্যাণ্ডে, আমি এর বিরোধীতাকারীদের সরাসরি শুনতে পেতাম। আমার ক্লাসরুমের ঠিক নীচের চত্ত্বরে একজন যাজক প্রায়ই উচ্চস্বরে চিৎকার করে বক্তৃতা দিতেন বিবর্তন কেন শয়তানের অস্ত্র এই সংক্রান্ত বিষয়ে। এবং আমার নিজেরই অনেক ছাত্রছাত্রী, যদিও তার তাদের দ্বায়িত্ব মোতাবেক ক্লাসে বিবর্তন শিখছে, তারা বিষয়টি স্পষ্ট করেছিল যে তারা এর একটি শব্দও বিশ্বাস করেন না। অবিশ্বাস্য রকম সুবিশাল পরিমান প্রমাণ থাকা সত্তেও কেন এমন বিরোধী অবস্থান নেয়া সম্ভব সেটি জানতে কৌতুহলী হয়ে আমি ক্রিয়েশনিজম বা সৃষ্টিতত্ত্ববাদ নিয়ে পড়তে শুরু করেছিলাম। এবং বাস্তব সত্যটি হচ্ছে সুখ্যাত যে ডজন খানেক সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের মধ্যে, যাদের সাথে আমার দেখা হয়েছে, তাদের মধ্যে আমি শুধু একজনকেই জানি, দার্শনিক ডেভিড বেরলিনস্কি – যার বিবর্তন বিরোধী অবস্থান ধর্ম দ্বারা প্রচোরিত নয়।

অবশেষে, পঁচিশ বছরের শিক্ষাকতা জীবন শেষে, পুরোটা সময় জুড়ে বিবর্তন বিরোধী নানা প্রতিরোধের সন্মুখীন হয়ে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সৃষ্টিতত্ত্ববাদের এই সমস্যাটির আমি মোকাবেলা করবো আমার জানা আছে এমন একটি মাত্র উপায়ে: বিবর্তনের স্বপক্ষে সব প্রমাণগুলোকে উপস্থাপন করে একটি বই লেখার মাধ্যমে -জীবাশ্ম রেকর্ড, ভ্রূণতত্ত্ববিদ্য, আণবিক জীববিজ্ঞান, প্রাণী ও উদ্ভিদের ভূগোল, জীবদেহের বিকাশ ও গঠন ইত্যাদি নানা ক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব পর্বত পরিমান নানা প্রমাণ উপস্থাপন করে। অদ্ভুতভাবে, আমার আগে কেউই এমন কোনো বই লেখেননি। আমি ভেবেছিলাম, কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ অথবা এমনি যারা সংশয়বাদী – নিশ্চয়ই বিবর্তনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করবেন তাদের ভ্রান্ত অবস্থান পরিত্যাগ করে, একবার যখন তারা এই প্রমাণগুলো দেখবেন সুস্পষ্টভাবে।

আমার ধারণা ভুল ছিল। যদিও আমার বইটি হোয়াই ইভ্যোলুশন ইজ ট্রু, বই হিসাবে খুব পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে এবং সফল হয়েছে (এমনকি নিউ ইয়র্ক টাইমস এর বেস্ট সেলার লিষ্টেও জায়গা করে নিয়েছিল বেশ কিছু দিনের জন্য) এবং যদিও বেশ কিছু ধর্মীয় পাঠকদের কাছ থেকে আমি কিছু চিঠি পেয়েছিলাম, যারা দাবী করেছিলেন, আমি বিবর্তনে স্বপক্ষে তাদের মত পরিবর্তন করতে সাহায্য করেছি, তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের সংখ্যা আদৌ পরিবর্তিত হয়নি: গত বত্রিশ বছর ধরেই এটি ৪০ থেকে ৪৬ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করছে।

প্রমাণ দেখিয়ে বিবর্তনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রবাসীদের মতামত পরিবর্তনের প্রচেষ্টার অসারতা বুঝতে আমার খুব বেশী সময় লাগেনি। কারণ বিশ্বাস তাদের পরিচালিত করে একেবারে চোখের সামনে উপস্থাপিত সব বাস্তব সত্যগুলোকে প্রত্যাখান করতে। আমার এর আগের বইটিতে আমি এধরণের একটি বোধোদয়ের মুহূর্তের কাহিনী বর্ণনা করেছিলাম, যখন আমি বষয়টি অনুধাবন করেছিলাম। শিকাগোর চাকচিক্যময় একটি উপশহরে ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ, ব্যবসার আলাপ থেকে নিস্তার পাবার জন্য কিছুটা বিজ্ঞান শেখার ইচ্ছায় তাদের সাপ্তাহিক মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজনে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন বিবর্তন বিষয়ে কিছু বলার জন্য। বিবর্তনের স্বপক্ষে নানা প্রমাণ নিয়ে, যেখানে অন্তবর্তীকালীন জীবাশ্ম, অবলুপ্ত অঙ্গ এবং ভ্রূণতাত্ত্বিক বিকাশ জনিত নানা অস্বাভাবিকতা যেমন ডলফিনদের অপসৃয়মান পা ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রচুর পরিমানে ছবির স্লাইডসহ আমি আমার বক্তব্যটি উপস্থাপন করেছিলাম। মনে হয়েছিল তারা আমার পরিশ্রমটি বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু বক্তৃতার পর, উপস্থিত একজন আমার কাছে করমর্দন করেন এবং বলেন, ডঃ কয়েন, বিবর্তনের স্বপক্ষে আপনার দেয়া প্রমাণগুলো আমার কাছে খুবই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে, কিন্তু তারপরও আমি বিবর্তন বিশ্বাস করিনা।’

আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিভাবে কারো পক্ষে প্রমাণগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হবার পরও, সে তারপরও তার ভ্রান্ত বিশ্বাসে অবিচল থাকতে পারে? এর উত্তর, অবশ্যই, আমার উপস্থাপিত প্রমাণগুলোর বিরুদ্ধে তার ধর্মবিশ্বাস প্রতিষেধকের কাজ করছে।

একজন বিজ্ঞানী হিসাবে, যে কিনা তেমন কোনো ধর্মীয় দীক্ষা ছাড়াই প্রতিপালিত হয়েছে, আমি বুঝতে পারিনা কিভাবে কোনো কিছু মানুষকে শক্তিশালী উপাত্ত আর প্রমাণের বিরুদ্ধে অন্ধ করে রাখতে পারে। কেন মানুষ একই সাথে ধার্মিক আর তারপরও বিবর্তনকে গ্রহন করতে পারেনা? এই প্রশ্নটি আমাকে পরিচালিত করেছিল ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্কটি নিয়ে প্রকাশিত নানা প্রবন্ধ আর বইয়ের অনুসন্ধানে, এবং সেখানে আবিষ্কার করেছিলাম, যে বিদ্যমান এই সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রকাশনাগুলো মূলত আসলেই যাকে আমি বলবো অ্যাকোমোডেশনিষ্ট: যারা এই দুটি ক্ষেত্রকেই দেখেন সামঞ্জষ্যপূর্ণ, পারস্পরিক সহায়ক ও সম্পুরক অথবা অন্ততপক্ষে প্রতিপক্ষ হিসাবে তারা দ্বন্দরত নয়। কিন্তু আমি যত গভীরে প্রবেশ করেছি, এবং ধর্মতত্ত্বও পড়তে শুরু করেছি, আমি অনুধাবন করেছি বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে আছে একগুঁয়ে দূর্দম অসামঞ্জষ্যতা, যেগুলোকে আড়াল করা হয়েছে ছদ্মাবরণে অথবা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে অ্যাকোমোডেশবাদী প্রকাশনায়।

উপরন্তু, আমিও দেখতে শুরু করেছিলাম যে ধর্মতত্ত্ব বিষয়টি নিজেই, অথবা নিদেনপক্ষে মহাবিশ্ব সম্বন্ধে ধর্ম যে সত্য দাবীগুলো করে, সেটিকে রুপান্তরিত করেছে এক ধরনের বিজ্ঞানে, কিন্তু এমন একটি বিজ্ঞান যেখানে দূর্বল প্রমাণগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী প্রস্তাবনা করার জন্য কোনটি সত্য সেই বিষয়ে। বিজ্ঞানী হিসাবে, আমি একটি গভীর মিল লক্ষ্য করেছিলাম বিশ্বাসের পক্ষে ধর্মতত্ত্বের পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি- ভিত্তিক সত্যতা প্রতিপাদকগুলো আর ছদ্মবিজ্ঞানীদের ব্যবহৃত সেই কৌশলের মধ্যে, যা তারা ব্যবহার করে থাকে তাদের আধিপাত্য বজায় রাখার ক্ষেত্র সুরক্ষা করার উদ্দেশ্যে। এই সব আ প্রায়োরি প্রস্তাবনার একটি কারো পছন্দকৃত দাবীগুলোকে সমর্থন আর যুক্তিযুক্ত করার প্রতিজ্ঞা, এমনকিছু যা কোনো দাবী হয়তো মিথ্যা হতে পারে বিজ্ঞানের এমন নিরন্তর নীরিক্ষার প্রচলিত আচারের দৃঢ় পরিপন্থী হয়ে দাড়িয়ে আছে। তারপরও ধর্মীয় মানুষরা তাদের জীবন ও ভবিষ্যত বাজি রাখতে পারে এমন কোন প্রমাণের উপর, সেই প্রমানের মাণ এমনকি ধারে কাছেও আসতে পারবে না, ধরুন, সেই উপাত্তগুলোর কাছে যা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রয়োজন হয় একটি নতুন কোনো ঔষধকে হতাশা জনিত মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করার জন্য। পরিশেষে আমি দেখেছি যে বিজ্ঞান আর ধর্মের সামঞ্জষ্যপূর্ণতার দাবীগুলো আসলে দূর্বল, তাদের ভিত্তি ধর্মের প্রকৃতি সংক্রান্ত এমন দাবী, যা খুব কম বিশ্বাসী আসলেই গ্রহনযোগ্য মনে করেন, এবং ধর্মকে কখনোই বিজ্ঞানের সঙ্গতিপূর্ণ করা যাবে না এটিকে এমন একটি গুরুতরভাবে লঘুকৃত না করে যে এটি আর সেই ধর্ম থাকে না বরং রুপান্তরিত হয় মানবতাবাদী দর্শনে।

সুতরাং আমি শিখেছি সৃষ্টিতত্ত্ববাদের অন্য বিরোধীরা আমাকে কি বলতে পারে: আমেরিকানদের বিবর্তনের সত্য গ্রহন করানোর জন্য প্ররোচিত করার বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট শুধুমাত্র বাস্তব সত্যে শিক্ষা প্রদান করাই নয়, বরং ধর্ম বিশ্বাসের শিক্ষা থেকে মুক্ত হবার প্রচেষ্টা, একটি ডি-এডুকেশন প্রক্রিয়াও – বিশ্বাসের যে রুপটি প্রমাণের প্রয়োজনকে প্রতিস্থাপিত করে খুব সরল আবেগীয় গৃহীত দ্বায়িত্ব গ্রহন করে। আমি আপনাদের বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করবো যে ধর্ম, বেশীর ভাগ বিশ্বাসীরা যা যেভাবে পালন করে, সেটি গুরুতরভাবে বিজ্ঞান বিরোধী এবং এই দ্বন্দ বিজ্ঞানের নিজেরই ক্ষতি করছে, ক্ষতি করছে সাধারণ মানুষ কিভাবে বিজ্ঞানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, এবং সাধারণ মানুষের বিজ্ঞান আমাদের কি বলতে পারবে আর পারবে না সেই ধারণাও ক্ষতি করে। আমি আরো যুক্তি দেবো যে ধর্ম আর বিজ্ঞান পরস্পর সম্পুরক ‘জানার উপায়গুলোর একটি’ দাবীটি ধর্মবিশ্বাসকে অতিমাত্রায় অনায্য বিশ্বাসযোগ্যতা দিচ্ছে, এর চুড়ান্ত পর্যায়ে, যা বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ এবং হয়তো অবশেষে আমাদের নিজেদের প্রজাতি ও পৃথিবীতে অন্য বহু জীবনের ধ্বংসে ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞান এবং ধর্ম, তাহলে, আমাদের এই মহাবিশ্ব সম্বন্ধে কোনটি সত্য, সেটি খোজার ব্যবসায় পরস্পর প্রতিদ্বন্দী। এই লক্ষ্যে ধর্ম চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ, সত্য নির্ণয়ে এর কৌশলগুলো আদৌ উপযোগি নয়। এই দুটি ক্ষেত্র পরস্পর অসঙ্গতিপূর্ণ ঠিক একই ভাবে, এবং ঠিক একই অর্থে, যেভাবে যৌক্তিকতা সঙ্গতিপূর্ণ নয় অযৌক্তিকতার সাথে।

বেশ..দ্রুত কিছু আগাম সতর্কবাণী আমি যোগ করছি যদিও।

প্রথমত, কিছু ধর্ম, যেমন জৈনবাদ এবং বৌদ্ধ ধর্মের কিছুটা বেশী মেডিটেশন-ভিত্তিক সংস্করণ মহাবিশ্বে কিসের অস্তিত্ব আছে সেই বিষয়ে খুব সামান্য অথবা কোনো দাবীই করেনা। ( আমি কিছুক্ষণের মধ্যে ধর্ম বা রেলিজিয়ন শব্দটি সংজ্ঞায়িত করবো যেন আমার বইটির মূল বক্তব্যটি সুস্পষ্ট হয়) অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা, যেমন কোয়েকার বা ইউনিটারিয়ান ইউনিভার্সালিষ্টরা, মূলত বিষম তাদের বিশ্বাসে, যেখানে কিছু বিশ্বাসী আছেন যাদের অজ্ঞেয়বাদী বা অবিশ্বাসীদের থেকে যাদের পৃথক করা কঠিন, যারা মূলত বায়বীয় কিন্তু ঈশ্বরহীন আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন করেন। যেহেতু এই ধরনের মানুষদের বিশ্বাসগুলো প্রায়শই ঈশ্বরবাদী নয় ( অর্থাৎ তাদের কোনো স্বর্গীয় সত্তায় বিশ্বাস নেই যিনি কিনা পৃথিবীর সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করেন), সেখানে বিজ্ঞানের সাথে তাদের দ্বন্দ হবার সম্ভাবনা কম। এই বইটি মূলত আলোচনা করবে – ঈশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বাসগুলোর সাথে। অবশ্যই তারা সব ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করছেনা, কিন্তু তারাই মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ধর্ম – এবং বিশ্বাসীদের প্রতিনিধিত্ব করছে।

বেশ কিছু কারণে আমি মনোযোগ দিয়েছি আব্রাহামিক ধর্মগুলোর উপর: ইহুদীবাদ, খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম।এই ধর্মগুলো সম্বন্ধেই আমার জানার পরিধি বেশী এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ, এগুলোই হচ্ছে সেই ধর্ম, বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম -সবচেয়ে বেশী উদগ্রীব তাদের বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলার ব্যাপারে। যদিও আমি অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসগুলো নিয়ে আলোচনা করবো এর পাশাপাশি, মূলত এই বই খ্রিস্টধর্মের নানা রুপই নিয়ে আলোচনায় বেশী সময় দেবে। একইভাবে, আমি যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও ধর্ম নিয়েই বেশী কথা বলবো, কারণ এখানেই দ্বন্দটি সবচেয়ে বেশী দৃশ্যমান। ইউরোপে এখনও এটি তীব্র সমস্যায় পরিণত হয়নি কারণ ঈশ্বরবাদীদের সংখ্যার জন্য, বিশেষ করে উত্তর ইউরোপে, এটি এখনও অনেক কম যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়। মধ্যপ্রাচ্যে, অন্যদিকে যেখানে ইসলাম সত্যিকার এবং গভীরভাবে বিজ্ঞানের সাথে যুদ্ধরত, সেখানে এই ধরনের আলোচনা প্রায়শই দেখা হয় ধর্মদ্রোহীতা হিসাবে।

পরিশেষে, এমনকি আব্রাহামিক ধর্মগুলোর কিছু সংস্করণ যাদের মূলনীতিগুলো এতই অস্পষ্ট যে এটি পুরোপুরি অস্পষ্ট যে তাদের কি বিজ্ঞানের সাথে আদৌ কোনো দ্বন্দ আছে। অ্যাপোপ্যাথিক অথবা নেগেটিভ ধর্মতত্ত্ব, যেমন, প্রকৃতির ব্যপারে কোনো ধরনের বা এমনকি কোনো এক ঈশ্বরের অস্তিত্ব সংক্রান্ত কোনো দাবী করতে অনিচ্ছুক। কিছু উদারনৈতিক খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ঈশ^রের কথা বলেন ‘অস্তিত্ব বা বেঁচে থাকার ক্ষেত্র’ হিসাবে, তারা এটিকে মানবীয় অনুভূতি আর বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কোনো সত্তা হিসাবে ভাবেন না যারা একটি নির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করে। যদিও কিছু ধর্মতাত্ত্বিক দাবী করেন এগুলোই ঈশ^রের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারণা, তাদের সেই বিশেষণের উপর দাবী আছে কারণ তারা সবচেয়ে কম সংখ্যক দাবী করে আর সেকারণে ভ্রান্ত প্রমাণিত হবার অথবা এমনকি আলোচনারও অপেক্ষাকৃত কম ঝুকি থাকে। ধর্ম সম্বন্ধে সামান্যতম পরিচয় আছে এমন যে কারোর জন্য, বলার প্রয়োজন নেই যে ধর্মবিশ্বাস এই ধরনের লঘুকৃত সংস্করণ বেশীরভাগ মানুষই ধারণ করেন না, এর পরিবর্তে তারা একটি ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারণা গ্রহন করেন, যে ঈশ্বর পৃথিবীর সবকিছুতেই হস্তক্ষেপ করেন।

বিষয়টি এবার আলোচনায় ধর্ম সমালোচকদের বিরুদ্ধে খুব সাধারণ সেই দাবীটিতে নিয়ে এসেছে, এটি দাবি করে ধর্মের সমালোচকরা একটি স্ট্র ম্যান ফ্যালাসি গ্রহন করেছেন, যারা সকল বিশ্বাসীকে দেখেন মৌলবাদী অথবা ধর্মগ্রন্থকে যারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করেন এবং তারা উপেক্ষা করেন বিশ্বাসের শক্তিশালী আর সভ্য সংস্করণটি যা উদারনৈতিক ধর্মতাত্ত্বিকরা ধারণ ও প্রচার করেন। একটি বিশ্বাস/বিজ্ঞান এর সামঞ্জষ্যপূর্ণতা নিয়ে সত্যিকারের কোনো আলোচনায়, এই যুক্তিটি দাবী করে, যে আমরা বিশ্বাসের সেই সভ্য অভিজাত সংস্করণটি নিয়ে আলোচনা করি শুধুমাত্র। কারণ যদি আমরা ধর্মকে ব্যাখ্যা করি শুধুমাত্র গড়পড়তা বিশ্বাসীদের বিশ্বাস হিসাবে, তাহলে এমন কোনো যুক্তি দেখানো যে ঐ বিশ্বাসগুলো বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় সেটিও কোনো অর্থবহ হয় না ঠিক যেমন বিজ্ঞানকে যদি ব্যাখ্যা করা হয় অপরিণত এবং প্রায়শই সাধারণ নাগরিকদের ধারণ করা বিজ্ঞান সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা হিসাবে।

কিন্তু এই সমান্তরাল উদহারণ ভুল অনেকভাবেই, প্রথমত, যদিও বহু সাধারণ মানুষই বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন ঠিকেই, তবে তারা যেমন বিজ্ঞান চর্চা করেন না, তেমনি তাদের বৈজ্ঞানিক সমাজের অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়না। এর ব্যতিক্রম গড়পড়তা বিশ্বাসীরা শুধুমাত্র ধর্মচর্চা করেন না, এছাড়াও তারা হয়তো কোনো একটি ধর্মীয় সমাজের অংশও হতে পারেন, যারা বৃহত্তর সমাজে তাদের বিশ্বাস প্রচারিত করার প্রচেষ্টা করতে পারেন। উপরন্তু ধর্মতাত্ত্বিকরা যদিও হয়তোবা ধর্মের ইতিহাস সম্বন্ধে অনেক বেশী জ্ঞান রাখতে পারেন, কিন্তু তাদের কোনো বিশেষ দক্ষতা নেই ঈশ্বরের প্রকৃতি নির্ধারণে, তিনি কি চান, অথবা পৃথিবীর সাথে তিনি কিভাবে ক্রিয়া-প্রতিক্রয়া করেন। তাদের বিশ্বাসের দাবী বোঝার প্রক্রিয়ায়, নিয়মিত ধর্মীয় বিশ্বাসীরা ধর্মতাত্ত্বিকদের বেশী নিকটবর্তী, বিজ্ঞানপ্রেমী সাধারণ মানুষরা যতটা না তাদের পছন্দের পদার্থবিদ্যা আর জীববিজ্ঞানের নিকটবর্তী হয়ে থাকে।

পুরো বই জুড়ে এই বইয়ে আমি সাধারণ বিশ্বাসী এবং ধর্মতাত্ত্বিক উভয় গ্রুপের দাবী বিবেচনা করবো, কারণ যদিও বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের সমস্যা সাধারণ বিশ্বাসীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি ধর্মতাত্ত্বিকরা, যারা অ্যকাডেমিক যুক্তি দিয়ে সাধারণ বিশ্বাসীদের বিশ্বাস করান যে ধর্ম ও বিজ্ঞান অসামঞ্জষ্যপূর্ণ – এর অর্থ এই না যে বেশীর ভাগ ধার্মিক ব্যক্তিরাই বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করবেন। এমনকি বিবর্তন, যে বিজ্ঞানকে বিশ্বাসীরা সবচেয়ে ঘৃণা করেন, সেটি গ্রহন করেছেন বহু ইহুদী, খ্রিস্টান এবং উদারনৈতিক মুসলিমরা। এবং অবশ্যই, বেশীরভাগ বিশ্বাসীদের কোনো সমস্যা নেই সুপারনোভা, সালোক সংশ্লেষণ অথবা মাধ্যাকর্ষণের ধারণার সাথে। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সংঘর্ষটি ঘটে বিজ্ঞানের কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, কিন্তু সাধারণভাবে বিশ্বাসের সত্যতা প্রমাণ করার প্রক্রিয়ায়। অসঙ্গতির স্বপক্ষে আমরা যুক্তি শুধুমাত্র মানুষের যে ধারণা নিয়েই শুধু না, বরং যে স্ববিরোধী উপায়ে বিজ্ঞান ও ধর্ম বাস্তবতা সম্বন্ধে তাদের দাবিকে সমর্থন করে।

আমি শুরু করেছিলাম ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যে দ্বন্দ যে উল্লেখযোগ্য পরিমানের এবং ব্যপক, সেই প্রমাণ দেখিয়ে। এই প্রমাণে অন্তর্ভুক্ত আছে বিরতিহীন ভাবে প্রকাশিত নানা বই ও প্রকাশনা এবং বিজ্ঞানী এবং ধর্মতাত্ত্বিকদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি যা চেষ্টা করেছে আমাদের আশ্বস্ত করতে যে আসলেই দুটি ক্ষেত্রের মধ্যে সঙ্গতি আছে, কিন্তু তারা ভিন্ন ও কখনো স্ববিরোধী যুক্তি ব্যবহার করেছে তাদের প্রস্তাবনার স্বপক্ষে। এই সব আশ্বস্ততা প্রকাশ করা বাণীগুলোর সংখ্যা এবং বৈচিত্রতা প্রস্তাব করে যে একটি সমস্যা আছে এবং সেটি এখনও সমাধান হয়নি। সংঘর্ষের আরো প্রমাণের মধ্যে আছে বিজ্ঞানীদের অনেক বড় একটি অংশেই, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে, নিরীশ্বরবাদী, সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় তাদের মধ্যে অবিশ্বাসীদের সংখ্যা মোটামুটি দশ গুণ বেশী। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য দেশগুলোয়, এমন আইন আছে যা বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মবিশ্বাসকে অগ্রাধিকার ও বিশেষ সুবিধা দিয়েছে, যেমন কারো সন্তানের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবার ব্যপারে। পরিশেষে, সর্বব্যপি সৃষ্টিতত্ত্ববাদের উপস্থিতি, সেই সাথে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নিরাময়ের উপর ব্যপক বিশ্বাস, সুস্পষ্টভাবে বিজ্ঞান ও ধর্মের অথবা বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে বিদ্যমান সংঘর্ষটিকে প্রদর্শন করে। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই দ্বন্দ্বের শর্তগুলো আলোচনা করেছি: যেভাবে আমি বিজ্ঞান ও ধর্মকে ব্যাখ্যা করেছি এবং অসঙ্গতি বলতে আমি আসলে কি বোঝাতে চাইছি। আমি যুক্তি দেবো যে এই অসামঞ্জষ্যতা কাজ করে তিনি স্তরে: কর্ম পদ্ধতি বা মেথোডোলজী, ফলাফলগুলো এবং দর্শন – বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস, কোন সত্যগুলোকে তারা উন্মোচন করে।

তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনার বিষয় অ্যাকোমোডেশনিজম বা সমঝোতাবাদ, ধর্মীয় ব্যক্তি ও বৈজ্ঞানিক সংস্থাগুলোর বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে সঙ্গতির অস্তিত্বের স্বপক্ষে সমর্থন জানানো কিছু নমুনা যুক্তির বিশ্লেষণ। দুটি সবচেয়ে পরিচিত যুক্তি ধর্মীয় বিজ্ঞানীদের অস্তিত্ব এবং স্টিফেন জে গুল্ড এর সুপরিচিত সেই ধারণা ব্যাপারে দুটি সবচেয়ে পরিচিত যুক্তি – নন ওভ্যারল্যাপিং ম্যাজিস্টেরিয়া (NOMA), যেখানে বিজ্ঞানে অন্তর্ভুক্ত মহাবিশ্ব সংক্রান্ত ফ্যাক্ট বা বাস্তব সত্যের ডোমেইন বা ক্ষেত্র, অন্যদিকে ধর্ম দখল করে আছে জীবনের অর্থ, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের খুব ভিন্ন জগত। পরিশেষে সমঝোতাবাদীদের সব কৌশলগুলোই ব্যর্থ হয় কারণ তারা যুক্তি বনাম বিশ্বাসের দ্বারা সত্য নির্ধারণের মধ্যে অনেক বিশাল বৈষম্য সমাধান করতে পারেনা। আমি সেই সব সমস্যাগুলোর তিনটি উদহারণ ব্যাখ্যা করবো যখন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিগুলো সরাসরি ধর্মীয় মতবাদকে বিরোধিতা করে: ঈশ্বরবাদী ( ঈশ্বর পরিচালিত) বিবর্তন, অ্যাডাম ও ইভের অস্তিত্ব সংক্রান্ত দাবীগুলো, আদিবাসী আমেরিকানদের নিয়ে মরমনদের বিশ্বাসগুলো।

চতুর্থ অধ্যায়ে, বিশ্বাসের পাল্টা আক্রমন অধ্যায়ে শধুমাত্র সেই উপায়গুলোর অসারতা নিয়ে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেভাবে বলা হয় ধর্ম বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অবদান রাখছে, এছাড়াও কিভাবে বিশ্বাসীরা বিজ্ঞানকে হেয় করে তাদের নিজেদের ক্ষেত্রকে সমর্থন করতে গিয়ে। যুক্তিগুলো বৈচিত্রময়, এবং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সেই দাবীগুলো যে বিজ্ঞান আসলেই ঈশ্বরের ধারণাকে সমর্থন করে সেই সব প্রশ্নগুলোর উত্তর সরবরাহ করে, যে উত্তরগুলো মনে করা হতো বিজ্ঞানের ক্ষমতার বাইরে। আমি এইসব প্রচেষ্টার নাম দিয়েছি – নিউ ন্যাচারাল থিওলজি বা নব্য প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর সেই যুক্তির আধুনিক সংস্করণ, যা প্রকৃতিতে ঈশ্বরের হাত আছে প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

হালনাগাদকৃত যুক্তিটি দাবী করে এই মহাবিশ্বের ফাইন টিউনিং বা সূক্ষ্মভাবে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণের, দাবীকৃত সেই অসম্ভাব্যতা যা পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো অনুমতি দেয় জীবনের আবির্ভাবের জন্য – এবং মানব বিবর্তনের দাবীকৃত অবশ্যম্ভাবিতা ও মানব নৈতিকতার বিস্তারিত বিষয় সম্বন্ধে, যার সম্বন্ধে প্রস্তাবনা হচ্ছে, এটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে ফাকি দিলেও ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে পারেনা। আমি জানার অন্য উপায়গুলো – এই ধারণা নিয়েও আলোচনা করেছি, সেই বিতর্কটি, প্রকৃতির সত্যকে খুজে বের করার উপায় একমাত্র বিজ্ঞান নয়। আমি যুক্তি দেবো যে বাস্তব সত্য হচ্ছে বিজ্ঞানই হচ্ছে একমাত্র উপায় এই সত্যগুলোকে খুজে বের করার জন্য – যদি আপনি বিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করেন ব্যপকভাবে। পরিশেষে, আমি বিশ্বাসীদের tu quequo বা বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করবো,যারা দাবী করে বিজ্ঞান হয় ধর্ম থেকে বিবর্তিত হয়েছে, নতুবা ধর্মের মত একই সমস্যায় এটি আক্রান্ত। এই অভিযোগ গুলো খুবই বৈচিত্রময়: বিজ্ঞান আসলে খ্রিস্টধর্মের একটি ফসল, বিজ্ঞান পরীক্ষা করার সম্ভব না এমন ধারণা সংশ্লিষ্ট এবং সেকারণে এর ভিত্তি বিশ্বাস – বিজ্ঞান ভ্রম প্রবণ, বিজ্ঞান জন্ম দেয় সায়েন্টিজম বা বিজ্ঞানবাদিতার, যে দৃষ্টিভঙ্গি দাবী করে, অবৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলো কৌতুহলোদ্দীপক নয়। এবং – বিশ্বাসীদের চুড়ান্ত পুনসন্দেহ। সেই দাবী যে যদিও ধর্ম প্রায়শই ক্ষতিকর ছিল, বিজ্ঞানও তাই, যা আমাদের ইউজেনিক্স এবং পারমানবিক যুদ্ধাস্ত্র দিয়েছে।

বিজ্ঞান আর ধর্ম সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সেটি নিয়ে কেন আমাদের ভাবা উচিৎ? এই বইটির শেষ অধ্যায় সেটি আলোচনা করেছে। এটি দেখিয়েছে যে বিশ্বাসের উপর ভরসা, যখন কিনা যুক্তি ও প্রমাণ বিদ্যমান, অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, বহু মৃত্যুও তার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। ধর্ম ভিত্তির নিরাময় সংক্রান্ত আচার সংশ্লিষ্ট দেখবো আমরা সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদহারণটির, যা সুরক্ষিত আমেরিকার আইন দ্বারা, বহু মানুষকেই হত্যা করেছেন, এর মধ্যে আছে শিশুরা, যাদের চিকিৎসা কি হবে সেই বিষয়ে কোনো নিজস্ব বাছাই করার বা সিদ্ধান্ত দেবার সুযোগ নেই। একইভাবে স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা ও ভ্যাক্সিনেশন, এছাড়া বিশ^ উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার করার ভিত্তি কখনো ধর্মীয় বিশ^াস। আমি যুক্তি দেখাবো যে কোনো একটি পৃথিবীতে যেখানে মানুষ অবশ্যই তাদের মতামতের পক্ষে অবশ্যই প্রমাণ ও যুক্তি দেবে, শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ^াস ছাড়া। আমরা তাহলে অনেক কম সংঘর্ষ দেখতে পারবো সেই সব প্রসঙ্গগুলোতে, যেমন চিকৎসকের সহায়তায় আত্মহত্যা, সমকামীদের অধিকার, জন্ম নিয়ন্ত্রণ এবং যৌন নৈতিকতা। অবশেষে, আমি আলোচনা করেছি, আসলেই কোনো ধর্মীয় বিশ^াস কখনো উপযোগি হতে পারে কিনা। এমন কি কোনো সময় আছে যখন সামান্যতম অথবা কোনো প্রমাণ ছাড়াই শক্তিশালী বিশ্বাস ধারণ করা যায়? এমনকি যদিও আমরা ধর্মের কোনো দাবী প্রমাণ করতে পারবো না, কিন্তু ধর্ম কি এক ধরনের সামাজিক বন্ধন সৃষ্টিকারী বা জনগনের নৈতিকতার উৎস হতে পারে? বিজ্ঞান ও ধর্মের কি এই সব বিষয় নিয়ে কখনো গঠনমূলক আলোচনা বা সংলাপ হওয়া সম্ভব?

আমি সচেতন আছি যে ধর্মকে সমালোচনা করা বেশ স্পর্শকাতর একটি বিষয় ( ডিনার টেবিলে যা পুরোপুরি নিষিদ্ধ), যা শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, এমনকি এমন মানুষদের কাছ থেকে যারা বিশ্বাসী নয়, কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসকে দেখে সামাজিক কল্যাণকর একটি বিষয় হিসাবে। এই বইটি কি সেটি ব্যাখ্যা করা ছাড়া, আমার এখন ব্যাখ্যা করা উচিৎ এই বইটি আসলে কি নয়। যদিও আমি মূলত ধর্ম নিয়েই কথা বলেছি, আমার উদ্দেশ্য কিন্তু দেখানো না যে, ধর্মের, যদি ভারসাম্য মেনে বিচার করা হয়, সমাজের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এসেছে। যদিও আমি নিজে তা বিশ্বাস করি, এবং শেষ অধ্যায়ে বেশ কিছু বিষয়কে আমি গুরুত্ব দিয়েছি যেগুলো ধর্ম বিশ্বাসের সমস্যা। খুবই বোকামী হবে অস্বীকার করা যে, ধর্ম বহু ভালো কাজে মানুষকে প্ররোচিত করেছে। অবশ্যম্ভাবীভাবে দূঃখী মানব জীবনের জন্য এটি একটি সান্ত্বনা ছিল, অন্যকে সাহায্য করার একটি চালিকা শক্তি ছিল। পরিশেষে ইতিহাস জুড়ে ধর্ম ভালো বনাম খারাপ ক্যালকুলাস করা অসম্ভব।

আমার মূল বক্তব্য কিন্তু আরো সীমিত বিষয়ে এবং, আমি মনে করে, আরো বেশী সমর্থনযোগ্য – যুক্তি দ্বারা সুরক্ষাযোগ্য: বাস্তবতাকে বোঝা – সেই অর্থে আমরা যা জানি ব্যবহার করতে এবং যা জানিনা তার পূর্বাভাষ দেবার জন্য – কাজটি সবচেয়ে উত্তমভাবে করতে পারে বিজ্ঞানের নানা কৌশল এবং সেটি কখনই অর্জন করা সম্ভব না ধর্মবিশ্বাস নির্ভর কোনো উপায় ব্যবহার করে। এটি সত্যায়িত হয়েছে বিজ্ঞানের বহু স্বীকৃত সাফল্যগুলো দ্বারা – বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে ক্ষুদ্রমত পরমাণু থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি বিষয়ে – এর সাথে তুলনা করুন ধর্মের চুড়ান্ত ব্যর্থতাগুলো, এটি ব্যর্থ হয়েছে ঈশ্বরদের সম্বন্ধে আমাদের কিছু বলতে, তাদের অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা সে বিষয়ে। যখন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান সমাধানের লক্ষ্যে ধাবিত, ধর্মীয় অনুসন্ধাণ সমাধান থেকে দুরে সরে যাবার পথ তৈরী করে, এছাড়া তৈরী করে অসংখ্য সম্প্রদায়, যাদের প্রত্যেকেরই আছে সাংঘর্ষিক এবং অসমাধানযোগ্য দাবীগুলো। বিজ্ঞানের ভবিষ্যদ্বাণী ব্যবহার করে, আমরা এখন দুর গ্রহেই কেবল প্রোব পাঠাতে সক্ষম হইনি, বহু দূরের ধুমকেতুর উপরও অনুসন্ধাণী রকেট নামিয়েছি। আমরা এখন ডিজাইনার ড্রাগ তৈরী করতে পারি, বিশেষ ভাবে কোনো ব্যক্তির শরীরের ক্যান্সারের জন্য, সিদ্ধান্ত নিতে পারি কোন ফ্লু ভ্যাক্সিন আগামী মওসুমে কার্যকরী হতে পারে, সমাধান করতে পারি কিভাবে আমরা অবশেষে এই পৃথিবী থেকে স্মল পক্স আর পোলিওর মত অভিশাপ দূর করতে পারবো। এর বীপরিতে ধর্ম, আমাদের এমনকি বলতেও পারবে না আসলেই মৃত্যুর পর কোনো জীবন আছে কিনা, এর প্রকৃতি সম্বন্ধে তো আরো কম।

সমঝোতাবাদের সত্যিকার ক্ষতি হচ্ছে আমাদের যুক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতাকে হ্রাস করা সত্য অনুসন্ধানে অকার্যকর সব পদ্ধতিগুলোকে সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে – বিশেষ করে ধর্মবিশ্বাস। স্যাম হ্যারিস যেমন বলেছিলেন: বিষয়টা কিন্তু এমন না যে আমরা নিরীশ্বরবাদীরা প্রমাণ করতে পারি যে ভালোর চেয়ে অনেক বেশী খারাপের কারণ হচ্ছে ধর্ম ( যদিও আমি মনে করি এই বিষয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে এবং প্রতিদিনই ভারসাম্যটা খারাপের দিয়ে আরো ঝুকে পড়ছে)। বক্তব্যটি হচ্ছে ধর্ম এখনও একমাত্র আলোচনার উপায় যা প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষকে প্ররোচিত করে সেই সব বিষয়গুলো জানার ভান করতে, যা স্পষ্টতই তারা জানেন না ( জানতে পারেনও না)। যদি কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানের বীপরিত হয়ে থাকে, তবে সেটি হবে এটি। এবং বিশ্বাসীদের সাথে যাদেরই দেখা হয় তারা উৎসাহ দেয় এই অদ্ভুত মিথ্যা আর আত্মপ্রচঞ্চনার ভার বহন করার জন্য। তাদের সহধর্মবিশ্বাসীরা, অবশ্যই এবং অন্য ধর্মে বিশ্বাসী মানুষরাও এবং এখন, বিস্ময়কর একটি হারে, বিজ্ঞানীরা, যারা নিজেদের কোনো ধর্মবিশ্বাস নেই বলে দাবী করেন।

আমাদের এই মহাবিশ্বে সত্যিকারভাবে কিছু জানার উপায় একমাত্র বিজ্ঞান এমন যুক্তি প্রস্তাবনায় আমি এমন কোনো সমাজ চাইছি না যেখানে বিজ্ঞান সব কিছুর উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে, যা বেশীর ভাগ মানুষই দেখেন রোবোটের মত একটি জগৎ হিসাবে যেখানে কোনো আবেগের জায়গা নেই, শিল্পকলা ও সাহিত্যের কোনো জায়গায় নেই, এবং মানবিক সেই প্রয়োজনের জায়গা নেই, যেখানে আমরা নিজেদের আমাদের চেয়ে আরো বড় কিছুর অংশ হিসাবে মনে করি – যে প্রয়োজনীয়তা অনেককেই ধর্মের দিকে প্ররোচিত করে। এমন একটি পৃথিবী আসলেই প্রাণহীন আর আনন্দহীন হবে, বরং, আমি দাবী করেছি আরো ব্যপক একটি বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করলে তা শুধুমাত্র আমাদের, নিজেদের ও সার্বিকভাবে সমাজের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নিতেই সহায়তা করবে না, এছাড়াও বিজ্ঞানের বহু বিস্ময়কে এটি জীবন্ত করবে বহু মানুষের কাজে যারা এটিকে দূরের আর ভীতিকর শত্রুভাবাপন্ন কিছু বলে মনে করেন (এটি আদৌ তা নয়),আর কিইবা এত আকর্ষণীয় হতে পারে অবশেষে সেই অনুধাবনে পৌছানো যে আমরা ( এবং সব প্রজাতিরা) কোথা থেকে এসেছি, এমন একটি বিষয় যা আমি আমার সারা জীবন ধরে পড়েছি? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের আবেগীয় প্রয়োজনীয়তাকে কোনো অবমূল্যায়ন করা হবে না। আমি আমার জীবন কাটিয়েছি সেই মূলনীতি অনুসরণ করে, যা আমি এই বইয়ে প্রস্তাব করেছি। কিন্তু যদি আমার সাথে আপনার কোনো পার্টিতে দেখা হয়, আপনি কখনো হয়তো অনুমানও করতে পারবেন না যে আমি একজন বিজ্ঞানী। আমিও অন্য যে কোনো মানুষের চেয়ে কম আবেগপ্রবণ বা শিল্পকলাপ্রেমী নই, ভালো বই কিংবা সিনেমা আমার চোখেও খুব সহজে জল আনে, আমি সর্বোত চেষ্টা করি আমার চেয়ে দূর্ভাগা মানুষকে সাহায্য করার জন্য। আমার যা নেই তা হলো ধর্মবিশ্বাস। ধর্মীয় কোনো কুসংস্কার ছাড়া মানুষ হবার সব আবেগীয় প্রয়োজন মেটাতে পারে যে কেউ, শুধুমাত্র সেই নিশ্চয়তা ছাড়া যে আপনি মৃত্যুর পর একটি জীবন পাবেন।

যাইহোক আমি আলোচনা করবো না কিভাবে ধর্মকে প্রতিস্থাপিত করা যায় যখন- আমি বিশ্বাস করি যে অবশ্যম্ভাবীভাবে এটি ঘটবে – এটি মূলত পৃথিবী থেকে অপসারিত হবে। সমাধানগুলো আবশ্যিকভাবেই নির্ভর করবে ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিত্বের আবেগীয় প্রয়োজনীতাগুলোর উপর এবং যারা এই সব সমাধানে আগ্রহী তাদের উচিৎ হবে ফিলিপ কিচারের চমৎকার বই, ‘লাইফ আফটার ডেথ: দ্য কেস ফর সেক্যুলার হিউমানিজম’ বইটি পড়া। অবশেষে, আমি ধর্মের ঐতিহাসিক, বিবর্তনীয় এবং মনোবৈজ্ঞানিক উৎপত্তি নিয়েও আলোচনা করিনি। বহু হাইপোথিসিস আছে কিভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের সূচনা হয়েছিল এবং কেনই বা সব সমাজে এটি টিকে ছিল। কিছু প্রস্তাবনা সরাসরি বিবর্তনীয় অভিযোজনের দাবী করে, অন্যরা, কিছু বৈশিষ্ট্যের উপজাত হিসাবে, যেমন আমাদের কোনো ঘটনার পেছনে একটি সচেতন সত্তার যোগসূত্রতা দাবী করার প্রবণতা। এবং কিছু অন্যরা সামাজিক বন্ধন হিসাবে ধর্ম বিশ্বাসের উপযোগিতা সংক্রান্ত। সূনির্দিষ্ট উত্তরগুলো সুস্পষ্ট নয়, এবং আসলেই কখনোই হয়তো বিষয়টি জানা যাবে না। ধর্মের উৎপত্তি সংক্রান্ত বহু সেক্যুলার তত্ত্ব অনুসন্ধান করতে আগ্রহী পাঠকের শুরু করা উচিৎ ‘রেলিজিয়ন এক্সপ্লেইনড’ ও ড্যানিয়েল ডেনেট এর ‘ব্রেকিং দ্য স্পেল’ পড়া উচিৎ।

আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো, যদি এই বইটির শেষে আপনি দাবী করেন যে মানুষ কি বিশ্বাস করে তার জন্য ভালো কারণ প্রদর্শন করুক – শুধুমাত্র ধর্মেই না, বরং যে কোনো ক্ষেত্রে, যে প্রমাণ উপস্থাপন করা যেতে পারে। আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করবো যদি মানুষ কোনো একটি বিশ্বাস কাঠামো বাছাই করার আগে মানুষ ততটাই সময় আর চিন্তা ব্যয় করে যেমন করে তারা তাদের চিকিৎসক বাছাই করেন। আমি অমার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো, যদি জনগণ মহাবিশ্ব আর মানব পরিস্থিতির উপর যাজক, ইমাম ও ধর্মীয় কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা প্রদান বন্ধ করবে, কারণ শুধুমাত্র তারা ধর্মীয় ব্যক্তি। এবং সর্বোপরি আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো যখন আপনি কাউকে ‘পারসন অব ফেইথ’ বলে সম্বোধন করলে, আপনি সেই প্রশংসা নয় বরং সমালোচনা হিসাবে দেখবেন।

ভূমিকা সমাপ্ত

জেরি কয়েনের ফেইথ ভার্সেস ফ্যাক্ট

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s