সিদ্ধার্থ গৌতমের মধ্যপন্থা


Meditating Buddha. 5th cent AC. at Jaulian archaeological site. Molding in Taxila museum. Punjab Province. Pakistan.

গৌতম বুদ্ধের জীবনের গল্প, পুরো বৌদ্ধবাদের মতই মূলত দুঃখের মুখোমুখি হয়ে একে মোকাবেলা করার একটি গল্প। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ এবং চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো একটি সময়ে সক্রিয় ছিলেন। অবশ্য বৌদ্ধ সূত্রগুলো জানাচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দে এক শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে লুম্বিনি কাননে (বর্তমান নেপাল) জন্ম নেন সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ)। মায়াদেবী ও শুদ্ধোধনের পুত্র ছিলেন তিনি। শাক্যদের প্রধান ছিলেন তার বাবা, কপিলাবস্তুকে যার রাজধানী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে । তাঁর জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই মহামায়া মারা যান। কথিত আছে তার জন্মের পরপরই সন্ন্যাসী কপিল সিদ্ধার্থকে দেখে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, সিদ্ধার্থ ভবিষ্যতে হয় চারদিকজয়ী (চক্রবর্তী রাজা) রাজা হবেন, নয়ত একজন মহামানব হবেন। সৎ মা মহাপ্রজাপতি গৌতমী তাকে প্রতিপালন করেছিলেন, তাই তার অপর নাম গৌতম। সিদ্ধার্থের বাবা যেহেতু একান্তভাবেই চেয়েছিলেন তার ছেলে সম্রাটই হবেন, তিনি সদ্য মাতৃহীন পুত্রকে রাজ প্রাসাদে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন সম্ভাব্য সব বিলাসিতার ব্যবস্থা করে: রত্ন, দাস, পদ্মপুকুর এমনকি সুন্দরী নর্তকী। জীবনের প্রথম ২৯ বছর, বাইরের পৃথিবীর সামান্যতম দুর্দশা থেকে সুরক্ষিত হয়ে গৌতম মহাসুখেই কাটিয়েছিলেন, ”একটি সাদা ছাতা দিন-রাত আমার উপর ধরে রাখা হয়েছিল ঠাণ্ডা,গরম,ধুলা,ময়লা আর শিশির থেকে আমাকে রক্ষা করতে।’ সিদ্ধার্থকে সংসারী করানোর লক্ষ্যে ১৬ বছর বয়সে যশোধরার সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছিল। সিদ্ধার্থ এবং যশোধরার পুত্র রাহুলের জন্ম হয়েছিল।

ছেলের সুখের জন্য রাজা শুদ্ধোধন চার ঋতুর জন্য চারটি প্রাসাদ তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাসাদের উচুঁ দেয়ালের বাইরের জীবন কেমন তা জানতে তিনি খুবই ইচ্ছুক ছিলেন। অনেকটা বাধ্য হয়েই তার পিতা তাকে প্রাসাদের বাইরে বের হবার অনুমতি দিয়েছিলেন, তবে তিনি সেদিন পুরো নগরীর সকল অংশে আনন্দ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং ত্রিশ বছর বয়সে প্রথমবারের মত তিনি প্রাসাদ থেকে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। তিনি যা দেখেছিলেন তা তাকে বিস্মিত করেছিল: প্রথম দিন নগরী ঘুরতে গিয়ে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি, দ্বিতীয় দিন একজন অসুস্থ মানুষ, তৃতীয় দিন একজন মৃত ব্যক্তিকে দেখেছিলেন। সারথি ছন্দককে প্রশ্ন করে জানতে পারেন জগৎ দুঃখময়। তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন আবিষ্কার করে যে, এইসব দুর্ভাগা মানুষগুলোই মানব জীবনের স্বাভাবিক অবস্থারই প্রতিনিধিত্ব করছে – আসলেই অবশ্যম্ভাবী একটি প্রক্রিয়া- মানব জীবনের যে পর্বগুলো একদিন তাকেও স্পর্শ করবে। শঙ্কিত এবং বিস্মিত কৌতূহল নিয়ে চতুর্থবারের মত যখন তিনি প্রাসাদের বাইরে আসেন- তার সাথে দেখা হয়েছিল এক সন্ন্যাসীর, যিনি মানব অস্তিত্বের এই অতলস্পর্শী দুঃখময়তার মাঝে আধ্যাত্মিক জীবন কিভাবে অনুসন্ধান করতে হয় সেটি শিখেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন সংসারের মায়া, রাজ্য, ধন-সম্পদ কিছুই স্থায়ী নয়। তাই দুঃখের কারণ খুঁজতে গিয়ে একদিন গৌতম তার ঘুমন্ত স্ত্রী আর পুত্র পরিত্যাগ করে প্রাসাদ ছেড়ে বের হয়ে আসেন।

Sleeping Buddha, Cave 26, Ajanta Caves

অন্য সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে শেখার জন্যে গৌতম চেষ্টা করেছিলেন। সব ধরনের শারীরিক সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে – প্রায় অনাহারে নিজেকে মেরে ফেলার উপক্রম করেছিলেন, ঠিক যেমন করে অনেক সাধুরাই সিদ্ধি লাভের আশায় করেন। আর বিষয়টি বিস্ময়কর নয়, এ ধরনের কোন অনুশীলন দুঃখ উপশম করতে পারেনি। তারপর তিনি তার শৈশবে একটি দিনের কথা স্মরণ করেছিলেন: নদীর পাড়ে তিনি বসে ছিলেন, তিনি লক্ষ করেছিলেন, যখন ঘাস কাটা হচ্ছে, কীটপতঙ্গ এবং তাদের ডিমগুলোও সব পিষ্ট হচ্ছে – ধ্বংস হচ্ছে। এটা দেখে তিনি ক্ষুদ্র সব কীটপতঙ্গদের প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করেছিলেন।


শৈশবের তার সহমর্মিতার অনুভূতি নিয়ে ধ্যান করার সময় তিনি প্রথমবারের মত গভীরতম প্রশান্তি অনুভব করেছিলেন। তিনি খাদ্য গ্রহন করেছিলেন, তারপর একটি অশ্বত্থ গাছের নীচে গভীর ধ্যানে মগ্ন হন, পরিশেষে তিনি বোধিলাভ করার সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছান, নির্বান লাভ করেন । বুদ্ধের দর্শনের প্রধান অংশ হচ্ছে দুঃখের কারণ ও তা নিরসনের উপায়। বাসনা হল সর্ব দুঃখের মূল। বৌদ্ধমতে সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য- এটাকে নির্বাণ বলা হয়। নির্বাণ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিভে যাওয়া, বিলুপ্তি, বিলয়, অবসান। কিন্তু বৌদ্ধ মতে নির্বাণ হল সকল প্রকার দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা, খুব সাধারণ অর্থে ”নির্বাণ” মানে জেগে ওঠা। এই সম্বন্ধে বুদ্ধদেবের চারটি উপদেশ যা চারি আর্য সত্য (পালিঃ চত্বারি আর্য্য সত্যানি) নামে পরিচিত। তিনি অষ্টবিধ উপায়ের মাধ্যমে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি বুদ্ধে পরিণত হয়েছিলেন – যিনি জাগ্রত, উদ্বোধিত।


সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ হয়ে জেগে উঠেছিলেন শনাক্ত করে যে, সব সৃষ্টিকে – জীবন বাচাতে উন্মত্তপ্রায় পিপড়া থেকে মুত্যুপথযাত্রী মানুষ – একীভুত করে দুঃখ। এটি শনাক্ত করার পর বুদ্ধ উদ্ভাবন করে কিভাবে আমরা এই দুঃখের মোকাবেলা করতে পারি। প্রথমত, কারোরই বিসালিতায় জীবন কাটানো উচিত নয় যেমন, তেমনি খাদ্য কিংবা ন্যুনতম স্বস্তি আর আরাম পরিত্যাগ করাও উচিত না। বরং উচিত হবে পরিমিতিবোধসহ সংযত একটি জীবন যাপন করা ( বুদ্ধ এটির নাম দিয়েছিলেন মধ্যপন্হা); কারণ অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা অনুশীলন ও বোধিপ্রাপ্ত হবার পথ অনুসন্ধান করার উপর সবচয়ে বেশী গুরুত্ব দেয় । এরপর কিভাবে আমরা দুঃখকে আমাদের অস্তিত্বের সীমানা দিয়ে অতিক্রম করতে পারি সেটি বর্ণনা করেছিলেন, চারটি মহান সত্য বা চতুরার্য সত্য নামে যা পরিচিত (দুঃখ, দুঃখ সমুদয়: দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ: দুঃখ নিরোধের সত্য, দুঃখ নিরোধ মার্গ: দুঃখ নিরোধের পথ)। এই সম্বন্ধে বুদ্ধদেবের চারটি উপদেশ যা চারি আর্য সত্য (পালি: চত্বারি আর্য্য সত্যানি) নামে পরিচিত। তিনি অষ্টবিধ উপায়ের মাধ্যমে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন।


বুদ্ধের প্রথম মহান সত্যটি হচ্ছে সেই উপলদ্ধি, যা বুদ্ধকে তাঁর জীবনের লক্ষ্য খোঁজার যাত্রায় একদিন গৃহত্যাগী হতে প্ররোচিত করেছিল: পৃথিবীতে দুঃখ আর চিরন্তন অসন্তুষ্টি বিদ্যমান: ”জীবন কঠিন, সংক্ষিপ্ত এবং দুঃখ আর যন্ত্রণার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা”। দ্বিতীয় সত্যটি হচ্ছে, এই দুঃখের কারণ হচ্ছে আমাদের বাসনাগুলো; এবং এভাবেই ”কোনো কিছুর প্রতি আসক্তি দুঃখের মূল কারণ”। তৃতীয় সত্যটি হচ্ছে এইসব বাসনাগুলো নিয়ন্ত্রণ বা দূর করার মাধ্যমে এই দুঃখকে আমাদের অস্তিত্বের সীমা দিয়ে আমরা অতিক্রম করতে পারি। এভাবেই প্রথমবারের মত গৌতম বুদ্ধ বিস্ময়করভাবে সেটি দাবীটি করেছিলেন, আমাদের পরিস্থিতি নয়, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আমরা অসুখী তার কারণ কিন্তু এমন না যে আমাদের সম্পদ নেই, কিংবা ভালোবাসার মানুষ নেই কিংবা ফেসবুক কিংবা টুইটারে আমাদের যথেষ্ট সংখ্যক ফলোয়ার নেই, বরং এর কারণ আমরা লোভী, আত্মাভিমানী এবং আত্মবিশ্বাসহীনতা জনিত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমদের মনকে নতুন করে পথ দেখানোর মাধ্যমে আমরা সন্তুষ্ট হবার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক বৃদ্ধিটি অর্জন করতে পারি।


চতুর্থ এবং শেষ মহান সত্যটি যা বুদ্ধ আবিষ্কার করেছিলেন সেটি হচ্ছে কিভাবে আমরা আমাদের দুঃখময় এই অস্তিত্ব থেকে সামনে অগ্রসর হতে পারি একটি প্রক্রিয়ায়, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা অষ্টবিধ পথ (the eightfold path)। এই আটটি পথ মূলত সঠিক এবং বিজ্ঞতার সাথে আচরণ করার নানা দিক সংশ্লিষ্ট : সঠিক দৃষ্টি ( সম্যক দৃষ্টি/সম্যক ধারণা বা চিন্তা), সঠিক উদ্দেশ্য ( সম্যক সংকল্প), সঠিক শব্দ ব্যবহার (সম্যক বাক্য), সঠিক কর্ম (সম্যক আচরণ), সঠিক জীবিকা (সম্যক জীবিকা), সঠিক প্রচেষ্টা (সম্যক প্রচেষ্টা), সঠিক মাইন্ডফুলনেস ( সম্যক মনন/স্মৃতি, বলা যেতে পারে সঠিক সচেতনতা বা কোনো একটি মুহূর্তে পূর্ণ উপস্থিতি , কোনো একটি কাজে পূর্ণ মনোসংযোগের উপস্থিতি), সঠিক একাগ্রতা (সম্যক সামাধি, ধ্যানের মাধ্যমে প্রাপ্ত তীব্র একাগ্রতার একটি পরিস্থিতি)। বৌদ্ধ প্রতিকীরুপ ধর্মচক্রের আটটি স্পোক এই পথের আটটি উপাদানের প্রতিনিধিত্ব করছে। যে বিষয়টি পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে লক্ষণীয় ছিল সেটি হচ্ছে সেই ধারণাটি যে, প্রজ্ঞা হচ্ছে অভ্যাস, শুধুমাত্র কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতা পাবার কোনো প্রচেষ্টা নয়। প্রত্যেককেই তাদের নিজেদের মহতী তাড়নাগুলো অবশ্যই অনুশীলন করতে হবে। কোনো কিছু ”বুঝতে পারা” ভালো মানুষে পরিণত হবার প্রক্রিয়ায় শুধু একটি অংশ মাত্র।

আচরণ আর সচেতনতার এইসব সঠিক পথ অনুসন্ধান করে বুদ্ধ শিখিয়েছিলেন যে, মানুষ তাদের অধিকাংশ নেতিবাচক ব্যক্তিকেন্দ্রীকতাবাদ অতিক্রম করতে পারে – তাদের অহঙ্কার, দুশ্চিন্তা, বাসনাগুলো যা তাদের এত অসুখী করে – এর বিনিময়ে তারা সজ জীবের প্রতি সেই সহমর্মিতা অর্জন করতে পারবে যারা তাদের মতই একই ভাবে দুঃখ অনুভব করে। সঠিক আচরণ এবং যাকে বর্তমানে মাইন্ডফুল অ্যাটিচিউড বলা হয়, এদের দ্বারা মানুষ তাদের নেতিবাচক আবেগ ও মানসিক অবস্থাগুলো উলটে দিতে পারে, অজ্ঞতাকে জ্ঞানে, ক্রোধকে সহমর্মিতায় এবং লোভকে উদারতায় রূপান্তরিত করতে পারে।

বুদ্ধ উত্তর ভারত ও দক্ষিণ নেপালের বহু এলাকা ভ্রমণ করেছিলেন তার এই দর্শন, নৈতিকতা এবং ধ্যান বিষয়ে শিক্ষা দান করে । পরকাল এবং স্বর্গীয় অশরীরি সত্তা নিয়ে তিনি মূলত নীরবই ছিলেন। বরং জীবিত থাকা এই অবস্থাটাই সবচেয়ে পবিত্রতম বিষয় বলে মনে করতেন।

বুদ্ধের মৃত্যুর পর, তার অনুসারীরা তার ”সূত্রগুলো” ( তার বক্তৃতা আর বাণী) সংগ্রহ করে একটি ধর্মগ্রন্হে রূপান্তরিত করেছিলেন। এছাড়াও অনুসারীদের ধ্যান, নৈতিকতা এবং সঠিক মনোসংযোগ করে বেঁচে থাকা শেখানোর উদ্দেশ্য জন্য বেশ কিছু সহায়ক গ্রন্হ সৃষ্টি করা হয়েছিল। বুদ্ধের জীবদ্দশায় যে সন্ন্যাশ্রম গড়ে উঠেছিল, পুর্ব এশিয়া ও চীনে সেগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তাদের সংখ্যা আর পরিসরে আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু একটি সময়ব্যাপী ভারতে এটি মূলত অপরিচিত ছিল, গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো, নীরবে প্রকৃতিতে বসে ধ্যান করা অল্প কিছু শান্ত হলুদ কাপড় পরা সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনী ছাড়া আর কিছু ছিলনা। কিন্তু তারপর খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে, অশোক নামে একজন ভারতীয় রাজা তার রক্তক্ষয়ী নানা যুদ্ধের কারণে ক্লান্ত আর উদ্বিগ্ন হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। তিনি সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসীনিদের বহু দূর দূরান্তে পাঠিয়েছিলেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে, তার পৃষ্ঠপোষকতায় এটি ভারতেবর্ষে আরো ছড়িয়ে যায়।

Buddha, Ajanta cave


বুদ্ধের আধ্যাত্মিক এই দর্শন পুরো এশিয়া এবং সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। বুদ্ধের অনুসারীরা আজ প্রধারণত দুটি মূল ধারণায় বিভক্ত: থেরাভাদা বৌদ্ধবাদ (আক্ষরিকভাবে যার অর্থ “school of the elder monks, থেরবাদ আদি ও মৌলিক বৌদ্ধ ধর্মদর্শন। পালি ‘থের’ শব্দ থেকে এর নামকরণ হয়েছে। ‘থের’ শব্দের অর্থ স্থবির, স্থিত, স্থিতধী, স্থিতিশীল ইত্যাদি), যা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় এর ভিত্তি গড়েছিল এবং মহাযান ( অর্থ- “মহৎ পন্থা”) বৌদ্ধবাদ ( মহাযান হল বৌদ্ধধর্মের প্রধান দুটি অধুনা-প্রচলিত শাখার একটি। “মহাযান” বলতে বৌদ্ধ দর্শন ও সাধনা-পদ্ধতির একটি বিশেষ ধারাকে বোঝায়), যে ধারাটি চীন এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় এর ভিত্তি গড়েছে। এই দুটি গ্রুপই মাঝে মাঝে পরস্পরের শাস্ত্রকে অবিশ্বাস করে এবং নিজেদেরটাই শ্রেয়তর মনে করে। কিন্তু তারা একই কেন্দ্রীয় নীতিগুলো অনুসরণ করেন যা দুই হাজার বছর ধরে তার ধারবাহিকতা বজায় রেখেছে। আজ পৃথিবীতে অর্ধ থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন মানুষ বুদ্ধের শিক্ষার অনুসারী হয়ে বোধি আর আরো সহমর্মিতাপূর্ণ মানসিক অবস্থার অনুসন্ধান করছেন।


কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই, আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সে কম্পাসই অনুসরণ করুক না কেন, গৌতম বুদ্ধ আমাদের কিছু অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে গিয়েছেন। বুদ্ধের মতই, আমাদের সবারই এই পৃথিবীতে জন্ম হয় এটি কি পরিমান দুঃখে পূর্ণ সেটি উপলদ্ধি না করেই। আর জ্বরা, অসুখ আর মৃত্যু নিশ্চিত নিয়তি, সেই দুর্ভাগ্যটি পুরোপুরি বুঝতে আমরা অক্ষম হয়েই এই পৃথিবীতে চোখ মেলি। আমরা যতই বয়স বাড়ে, এই বাস্তবতাটি মাঝে মাঝে অসহনীয় একটি অনুভূতি নিয়ে আমাদের নিপীড়ন করে। আমরা হয়তো এটি পুরোপুরি এড়িয়ে বাঁচার চেষ্টাও করি। কিন্তু বুদ্ধের শিক্ষা সরাসরি দুঃখের মুখোমুখি হবার প্রয়োজনীয়তাটিকে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের অবশই এইসব নিপীড়ক বাসনাগুলোর অত্যাচার থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করতে হবে এবং অন্যদের সাথে আমাদের সাধারণ সংযোগ হিসাবে দুঃখকে শনাক্ত করতে হবে, যা আমাদের আরো সহমর্মী, নম্র আর দয়ালু হয়ে উঠতে প্রেরণা যোগাবে।



((অ্যালান দ্য বোতো, নাইজেল ওয়ারবার্টন এবং গ্রাহাম প্রিস্টের কথোপকথন থেকে সংক্ষেপিত রুপে – কাজী মাহবুব হাসান))

সিদ্ধার্থ গৌতমের মধ্যপন্থা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s