স্টয়িসিজমের সহজ পাঠ

স্টয়িসিজম, বলা হয় বাস্তবতায় যারা জীবন কাটাতে চান তাদের জন্যে দর্শনের একই শাখাটি সৃষ্টি করা হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে জিনো অব কিটিয়াম ( বর্তমান সাইপ্রাসের লারনাকা) স্টয়িসিজম দর্শনের ধারণাগুলোর সূচনা করেছিলেন। কিন্তু এর তিনজন বিখ্যাত অনুশীলনকারীর জন্যে এই দর্শনটি মূলত পরিচিত, এপিকটিটাস, সেনেকা এবং মার্কাস অরেলিয়াস। দর্শনটি দাবী করে যে ভার্চু বা সদগুণ (যেমন, প্রাজ্ঞতা) হচ্ছে সুখ এবং কথা নয় কাজ বা আচরণ সুবিবেচনার ভিত্তি হওয়া উচিত, বাহ্যিক কোনো ঘটনা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, শুধুমাত্র সেই ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়া আর আমাদের নিজেদের উপরে নিয়ন্ত্রণ আছে। দর্শনটির খুব অল্প কিছু কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল। এটি চেষ্টা করে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে ঠিক কতটা অনিশ্চিৎ এই জগতটি হতে পারে। আমাদের জীবনের এই মুহূর্ত কত সংক্ষিপ্ত হতে পারে। কিভাবে আমরা নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দৃঢ়, অবিচলিত ও শক্তিশালী হতে পারি। এবং পরিশেষে, যুক্তি নয়, বরং সচেতন চিন্তা ছাড়াই ইচ্ছানিরপেক্ষ ইন্দ্রিয়ের উপর আবেগতাড়িত নির্ভরশীলতাই আমাদের সব অসন্তুষ্টির উৎস।

পৃথিবী সম্বন্ধে জটিল কোনো তত্ত্ব দিতে ব্যস্ত নয় এই দর্শন, বরং এটি আমাদের সহায়তা করতে চায় কিভাবে আমরা ক্ষতিকর আবেগগুলো থেকে নিজেদের মূক্ত করতে পারি, আর আসলেই যে কাজটি করা যায় সেই কাজটি যেন করতে পারি। এটি অন্তহীন বিতর্ক নয় বরং কাজের উপর প্রতিষ্ঠিত। দর্শনটির তিনজন অগ্রদূত ছিলেন। মার্কাস অরেলিয়াস, রোম সম্রাট ছিলেন তিনি, তার সময়ে পৃথিবী সবচেয়ে ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি, যিনি প্রায় সারাটি জীবন সাম্রাজ্যের সীমান্তে যুদ্ধ করেছিলেন রোম কেন্দ্রিক সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে, এবং তারপরও প্রতিদিন তিনি নিজের জন্যে ডায়েরী লিখেছেন, সংযম, সহমর্মিতা আর মানবতা ইত্যাদি নানা বিষয়ে। যা ছিল তার ধ্যান বা মেডিটেশন। এপিকটিটাস ছিলেন ক্রীতদাস, দাসত্বের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল, এবং তিনি তার নিজের একটি শিক্ষাকেন্দ্র খুলেছিলেন, যেখানে রোমের অনেক সেরা মন শিক্ষিত হয়েছিল এই দর্শনে। আর সেনেকা, প্রচুর চিঠিতে তিনি তার জীবনের দর্শন লিখে গেছেন, পরবর্তীতে রোম সম্রাট নিরোর নির্দেশে তাকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল।

কিন্তু এই পরিচিত তিনজন ছাড়াও এই দর্শন অনুশীলন করেছেন বহু রাজা, প্রেসিডেন্ট, শিল্পী, লেখক আর উদ্যোক্তারাও। বহু ঐতিহাসিক আর আধুনিক মানুষই তাদের জীবন দিয়ে প্রদর্শন করেছেন স্টয়িসিজম দর্শন কিভাবে জীবনে বাঁচার একটি উপায় হতে পারে। প্রাশিয়ার রাজা ফ্রেডেরিখ দ্য গ্রেট তার ঘোড়ার স্যাডেল-ব্যাগের মধ্যে এই দর্শনের বই রাখতেন, কারণ তিনি মনে করতেন, বিপদে এই বইগুলো তাকে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষা করবে। মনতাইন, রাজনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক দার্শনিক, সারাক্ষণ যেন দেখা যায় এভাবে তার চোখের সামনে এপিকটিটাসের একটি বাক্য খোদাই করে রেখেছিলেন। সতেরো বছরের জর্জ ওয়াশিংটনকে এই দর্শন সম্বন্ধে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তার এক প্রতিবেশী, পরে ভ্যালি ফর্জে সেই ভয়ঙ্কর শীতে তিনি কাটোকে নিয়ে একটি নাটক পরিচালনা করেছিলেন তার সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করতে। মারা যাবার সময় টমাস জেফারসনের বিছানার পাশেই ছিল সেনেকার একটি বই। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের বিশ্বের পারস্পরিক-নির্ভরশীল সংযোগ সংক্রান্ত তত্ত্বকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এই দর্শন – যা তার এক স্কুল শিক্ষক তাকে পরিচয় করিয়েছিলেন, তার সেই শিক্ষকটি মার্কাস অরিলিয়াসের লেখা অনুবাদ করেছিলেন। রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, জন স্টুয়ার্ট মিল, মার্কাস অরিলিয়াস আর স্টয়িসিজমের কথা উল্লেখ করেছিলেন তার ‘অন লিবার্টি’ বইটিতে, বলেছিলেন – প্রাচীন মনের এটি সর্বোচ্চ নৈতিক সৃষ্টি।

অন্য অনেক দর্শন ভাবনা থেকে স্টয়িসিজম ভিন্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থে: এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রায়োগিক, দৈনন্দিন দিনে যা ব্যবহার করা যাবে। এটি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়। এটি একটি উপকরণ যা আমরা ব্যবহার করতে পারি আমাদের দক্ষতাকে আরো শাণিত করতে, যেন আমরা আরো উত্তম মানুষে পরিণত হই। এটি একটি জীবন দর্শন, দর্শনের ধারণাপুষ্ট একটি জীবনের প্রস্তুতি, যেখানে মনে সঠিক অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনের অনুসারীরা কিছু অনুশীলন করেন, আধ্যাত্মিক অনুশীলন, সেখান থেকে তারা মানসিক শক্তি সংগ্রহ করেন। এই অনুশীলনের একটি হচ্ছে স্টয়িক মেডিটেশন।

যেমন :

স্টয়িক মেডিটেশন ১ : নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচন

”জীবনে প্রধান কাজ হচ্ছে শুধু এটাই: সেই বিষয়গুলোকে শনাক্ত ও পৃথক করা, যেন আমি নিজেকে খুব স্পষ্টভাবে বলতে পারি কোনগুলো বাহ্যিক, যা আমার নিয়ন্ত্রণে নে্ই এবং কোনগুলো আমার সেই বাছাইয়ের সাথে যুক্ত, যা আমি আসলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। তাহলে কোথায় আমি ভালো আর খারাপ খুজবো? অনিয়ন্ত্রণযোগ্য বাহ্যিক বিষয়গুলোয় নয়, বরং আমার নিজের মধ্য, সেই নির্বাচনগুলোয় যা আমার নিজের.. – (এপিকটিটাস, ডিসকোর্সেস, ২.৫,৪-৫))

স্টয়িক দর্শনে এককভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হচ্ছে যা আমরা পরিবর্তন করতে পারবো এবং যা আমরা পারবো না তার মধ্যে পার্থক্য করা। কিসের উপরে আমাদের প্রভাব আছে আর কিসের উপর নেই। ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হচ্ছে আবহাওয়ার জন্যে, বিমান বন্দরের সেই বিমান সংস্থার কর্মচারীদের সাথে আপনি যতই চিৎকার করুন না কেন, সেই ঝড় থেমে যাবে না। আপনি যতই কামনা করুন না, সেটি আপনাকে আরো লম্বা বা খাটো কিংবা ভিন্ন কোনো দেশে জন্ম নেবার সুযোগ করে দেবে না। আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, কাউকে জোর করে আপনাকে পছন্দ করাতে পারবেন না। আর এছাড়া, এইসব অপরিবর্তনযোগ্য জিনিসগুলো পরিবর্তন করতে ব্যয় করা সময় এমন কোথায় ব্যয় করা যেত, যা আমরা পরিবর্তন করতে পারি।
মাদক থেকে মুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টায় কাজ করে এমন গোষ্ঠীগুলোর একটি অনুশীলন আছে, যাকে বলা হয় সেরেনিটি (প্রশান্তি প্রার্থনা) প্রেয়ার: ‘ঈশ্বর, আমাকে সেই প্রশান্তি দান করো, যা আমি পরিবর্তন করতে পারবো না তা যেন মেনে নিতে পারি, আমি পারবো এমন জিনিস পরিবর্তন করার সাহস দান করো, আর সেই জ্ঞান দান করো যেন আমি এই দুটির মধ্যে পার্থক্যটি বুঝতে পারি।

কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি পারবেন না তার শৈশবে বা জীবনের নানা সমস্যা আর নির্যাতন যা সে সহ্য করেছে সেই অভিজ্ঞতাটিকে পরিবর্তন করতে। তারা সেই সিদ্ধান্তগুলো বদলে ফেলতে পারবে না যা তারা একসময় নিয়েছিল, এবং যার জন্যে তারা কষ্ট সহ্য করেছে। কিন্তু বর্তমান মুহূর্তে তাদের যা ক্ষমতা আছে সেটি ব্যবহার করে সে তার ভবিষ্যতকে বদলাতে পারে। যেমন, এপিকটিটাস বলেছেন, তারা এই মুহূর্তে কি সিদ্ধান্ত নেবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমাদের সবার জন্যে একই জিনিস সত্য আজও। আমরা যদি সেই বিষয়টি পরিষ্কার করে বোঝার জন্যে মনোযোগ নিবদ্ধ করি যে, আমাদের দিনের মধ্যে কোন অংশটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, আর কোন অংশটি নয়, আমরা শুধু সুখীই হবো না, অন্য সেই মানুষগুলো থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবো, যারা বুঝতে ব্যর্থ হন যে জয়ী হওয়া সম্ভব নয় এমন একটি যুদ্ধ তারা লড়ছেন।

স্টয়িসিজমের কাহিনির সূচনা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, যখন জিনো অব সিটিয়াম নামের একজন ফোনিসিয়ান বণিক জাহাজডুবির কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে এথেন্সে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।

ডাওজিনিস লেয়ার্শিয়াস আমাদের বলেছিলেন এর পরে কি হয়েছিল :

‘(জিনো) ফোনিশিয়া থেকে পিরাইউসে পথে পার্পল** নিয়ে যাবার সময় জাহাজডুবির শিকার হয়েছিলেন। এরপর তিনি এথেন্সে এসেছিলেন, এবং একদিন এক বই বিক্রেতার দোকানে এসে বসেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ত্রিশ। যখন তিনি জোনোফনের ‘মেমোরেবিলিয়া’ বইটির দ্বিতীয় খণ্ড পড়তে শুরু করেছিলেন, তিনি এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সক্রেটিসের মত মানুষদের কোথায় পাওয়া যেতে পারে। ঠিক সেই সময় ঐদিক দিয়ে ক্রেটিস যাচ্ছিলেন, বই বিক্রেতা তার প্রতি নির্দেশ করে জিনোকে বলেছিলেন, ‘ঐ ব্যক্তিকে অনুসরন করুন’। সেই দিন থেকেই তিনি ক্রেটিসে ছাত্রে পরিণত হয়েছিলেন’। {{**টাইরিয়ান পার্পল (রয়্যাল পার্পল) হচ্ছে লালচে-বেগুনি প্রাকৃতিক রঞ্জক ( টাইরিয়ান, হচ্ছে টায়ার বা লেবানন), মিউরিসিডি পরিবারের কিছু সামুদ্রিক শামুকের শরীর থেকে নিঃসৃত রস। প্রাচীন কালের একটি মূল্যবান এই পণ্যটি মূল রাসায়নিক উপাদান, 6,6′-dibromoindigo}}

জেনোফনের মেমোরেবিলিয়া বইটি ছিল সক্রেটিসের জীবন নিয়ে লেখা, এবং ক্রেটিস অব থিবস ছিল বিখ্যাত ‘সিনিক’ দার্শনিক। এই ‘সিনিক’ শব্দটির আজ যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, এর আসলে সেই অর্থ ছিল না ( ঠিক যেভাবে ‘স্টয়িক’ শব্দটা এখন সাধারণত ভ্রান্তভাবেই ব্যবহার করা হয়), বরং এটি একটি দর্শনকে ইঙ্গিত করতো যা ন্যুনতম চাহিদাপূর্ণ একটি জীবনাচরণ এবং সদগুণ প্রতিপালন করার প্রশিক্ষণ, অথবা নৈতিক চরিত্র শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার প্রচেষ্টায় নিবেদিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ নাগাদ নিজের স্বতন্ত্র একটি দর্শনের স্কুল প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেবার আগে, জিনো ক্রেটিস এবং বেশ কিছু দার্শনিকে অধীনে শিক্ষা গ্রহন করেছিলেন। তিনি পরিকল্পিতভাবেই স্তম্ভের সারি দিয়ে ঘেরা একটি উন্মুক্ত স্থানকে তার দর্শন শিক্ষা দেবার স্থান হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন। এটি অবস্থান ছিল এথেন্সে মূল বাজারের বেশ নিকটে। এই স্থানটি পরিচিত ছিল ‘স্টোয়া পয়কিলে’ নামে বা রঞ্জিত পোর্চ ( ভবনসংলগ্ন ছাদযুক্ত বারান্দা, রোয়াক বা দেউড়ি)। আর এখানে থেকেই এসেছিল ‘স্টয়িসিজম’ নামটি।

জিনোর নতুন দর্শন শিখিয়েছিল আমাদের সবার ‘প্রকৃতি (নেচার) অনুসারে’ জীবন কাটানো উচিত, এর অর্থ কিন্তু এমন নয় যে আমাদের সবাইকে উলঙ্গ হয়ে জঙ্গলে গিয়ে গাছ জড়িয়ে ধরতে হবে ( যদিও সম্ভবত এমন কিছু করা একবারেই দোষের কিছু নয়), বরং এটি বলেছিল, আমাদের মানব প্রকৃতিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। স্টয়িকদের মতে, মানব প্রজাতিকে যে বৈশিষ্ট্যটি এই পৃথিবীর অন্য সব প্রজাতি থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে, সেটি হচ্ছে আমরা যুক্তি ব্যবহার করতে পারি (এর মানে এই না যে আমরা সবসময় বা এমনকি প্রায়শই যৌক্তিকভাবে আচরণ করি) এবং আমরা খুবই সামাজিক একটি প্রাণি। এইসব পর্যবেক্ষণ থেকে তারা তাদের দর্শনের মৌলিক স্বতঃসিদ্ধটি পেয়েছিলেন: একটি ‘ভালো’ মানব জীবন, প্রাচীনরা যাকে বলতেন ‘ইউডামোনিক’ জীবন ( বলা যেতে পারে পরিপূর্ণ জীবন), সেটি হচ্ছে যুক্তির প্রয়োগ করে যে জীবনটি কাটানো হয় সমাজে কল্যাণে।
পরিণতিতে, স্টয়িকরা ছিলেন ( এবং এখনো) কসমোপলিটান অর্থাৎ স্বাদেশিকতা সংকীর্ণমুক্ত বিশ্বজনীন, যারা সামগ্রিকভাবে মানব জাতিকে একটি বিশাল পরিবার মনে করেন। তাদের সেই সময়ের অন্য দর্শনের ধারাগুলোর ব্যতিক্রম স্টয়িকরা বিশ্বাস করতেন যে নারীরা বৌদ্ধিক ক্ষমতা পুরুষের সমতূল্য। এভাবেই তারা খুবই প্রায়োগিক একটি জীবন দর্শন গড়ে তুলেছিলেন, যে দৃষ্টিভঙ্গিটিকে মাঝে মাঝে জীবন যাপনের একটি ‘শিল্প’ হিসাবে তথ্য নির্দেশ করা হয়ে থাকে।

একজন স্টয়িকের মত চিন্তা এবং কাজ শুরু করার একটি উপায় হচ্ছে, আপনি যা কিছু করবেন সেটি করার সময় মুখ্য কয়েকটি ভার্চু বা সদগুণগুলোকে একধরনের নৈতিক কম্পাস হিসাবে ব্যবহার করা । মোট চারটি মুখ্য সদগুণ আছে: ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক প্রাজ্ঞতা ( উইজডম), সাহস ( কারেজ), ন্যায়পরায়ণতা ( জাস্টিস) এবং সংযম ( টেম্পারেন্স)। আমরা এই সদগুণগুলোকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি:

** ব্যবহারিক প্রাজ্ঞতা হচ্ছে আমাদের জন্য সত্যিকারভাবে কোনটি ভালো সেই সংক্রান্ত জ্ঞান, এবং সেই সাথে কোনটি আমাদের জন্য আসলেই খারাপ সেটিও জানা।স্টয়িকদের জন্য, এটি মূলত সেই উপলব্ধি যে, শুধুমাত্র যা ভালো সেটি সদগুণ, অথবা চারিত্রিক শ্রেষ্ঠতা বা উৎকর্ষ, এবং শুধুমাত্র যা খারাপ সেটি হচ্ছে কুঅভ্যাস বা অনাচার (ভাইস) অথবা চারিত্রিক ক্রটি। আর বাকী অন্য সব কিছু – যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সেই সব জিনিসগুলো যা অধিকাংশ মানুষই কামনা করেন, যেমন স্বাস্থ্য, সম্পদ, খ্যাতি ইত্যাদি এগুলো সব কিছু হচ্ছে ‘ইনডিফারেন্ট’ বা নিস্পৃহ, এর মানে হচ্ছে এগুলোকে যুক্তিসঙ্গতভাবেই ‘নির্বাচন’ বা পছন্দ করা যেতে পারে, কিন্তু এগুলো নৈতিকভাবে ‘নিরপেক্ষ’। অন্য ভাবে যদি বলা হয়, সম্পদের মালিক হওয়া হয়তো বেশ সুখকর হতে পারে, কিন্তু আপনার যে প্রচুর সম্পদ আছে সেই বাস্তবতাটি কিন্তু আপনাকে একটি ‘ভালো’ মানুষে পরিণত করছে না; দরিদ্র হওয়া যেমন সুখকর নয়, কিন্তু এই বাস্তবতাটি আপনাকে একটি ‘খারাপ’ মানুষে পরিণত করছে না – বিষয়টি উভয় দিকেই প্রযোজ্য।

**সাহস হচ্ছে বিপদ কিংবা এমন কোনো পরিস্থিতিতে নৈতিকভাবে আচরণ করার প্রবণতা – যেখানে অন্য কেউ হয়তো নীরব থেকে নিজেকে সমালোচনা এবং প্রতিশোধ থেকে রক্ষা করেন।

**ন্যায়পরায়ণতা হচ্ছে অন্য মানুষের সাথে এমনভাবে আচরণ করা যা পক্ষপাতহীন এবং নায্য। তাদের প্রতি এমনভাবে আচরণ করা, যে আচরণ আপনি অন্যদের কাছে থেকে প্রত্যাশা করেন, এবং সবসময়ই মানুষ হিসাবে তাদের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

**সংযম বা মিতাচার হচ্ছে পরিমিত বা সঠিক মাত্রায় কোনো কিছু করার অভ্যাস, যা খুব বেশি নয় আবার খুব কমও নয়।

স্টয়িক মূলনীতিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই চারটি সদগুণই গভীরভাবেই পারস্পরিক-নির্ভরশীল, কারণ এগুলো আরো বেশি মৌলিক একটি ভার্চু বা সদগুণেরই নানা দিক, যাকে সাধারণভাবে বলা যেতে পারে প্রাজ্ঞতা ( উইজডম, যেভাবে ব্যাপক একটি অর্থে এটি ব্যবহার করা হয়)। যেমন, কেউ সাহসী হতে পারবেন না, যদি তিনি ন্যায়বিরুদ্ধ হন। আপনি যদি ভুল কোনো কারণের জন্য কোনো বিপজ্জনক অথবা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সাহসের সাথে মোকাবেলা করেন, তাহলে আপনি নৈতিকভাবে সাহসী নন, আপনি শুধু দাম্ভিকতা কিংবা আরো খারাপ কিছু প্রদর্শন করছেন।
উদহারণ হিসাবে ধরুন আপনি দেখলেন কাজে আপনার ‘বস’ আপনার একজন সহকর্মীর সাথে অন্যায় আচরণ করছেন। এই পরিস্থিতিতে আপনি কি কোনো পদক্ষেপ নেবেন? স্টয়িক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে একই সাথে উপরের চারটি সদগুণকে প্রয়োগ করা। ব্যাবহারিক প্রাজ্ঞতা হয়তো আপনাকে বলবে এই ধরনের পরিস্থিতিকে এগিয়ে যাওয়া আপনার চরিত্রের জন্য ভালো, এবং প্রতিবাদ না করা আপনার চরিত্রের জন্য খারাপ, সুতরাং এখানে আপনি ‘হ্যাঁ’ ভোট পেলেন। সাহস দাবী করছে আপনি এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করবেন, যদিও আপনি জানেন যে আপনার বস হয়তো এজন্য আপনার উপর প্রতিশোধ নিতে পারে। ন্যায়পরায়ণতা বলছে আপনি নিজে এভাবে কখনো নিগৃহীত হতে চাইবেন না, এবং কেউ যদি এমন পরিস্থিতিতে আপনার পাশে এসে দাড়াতো আপনি কৃতজ্ঞবোধ করতেন। সুতরাং যুক্তি দাবী করছে যে আপনি অন্যদের ক্ষেত্রেও একটি কাজ করবেন। পরিশেষ, সংযম বা মিতাচার প্রস্তাব করছে আপনার বসের সাথে আচরণ করার সঠিক উপায়টি কি? এটি যেমন নীরবে আপনার প্রতিবাদ প্রকাশ করা নয় ( খুবই কম), তেমনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মুখে একটি ঘুষি মারাও নয় ( খুব বেশি)।

স্টয়িকরা বেশ কিছু সংখ্যক সুনির্দিষ্ট প্রায়োগিক অনুশীলন উদ্ভাবন করেছেন, যে অনুশীলনগুলো এই দর্শনের ছাত্রদের আরো ভালো মানুষ হতে সহায়তা করে – জার্নালিং ( প্রতিদিন দিনের নানা বিষয়গুলো লেখা), ধ্যান করা, সাময়িকভাবে মৃদু আকারে আত্ম-বঞ্চনার অনুশীলন করা ইত্যাদি। এই সবকিছু মূলত সর্বদা মনোযোগসহ চারটি প্রধান সদগুণ ব্যবহার করার অনুশীলন যা আপনাকে আপনার চরিত্র উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে বহুদূর নিয়ে যাবে এবং স্টয়িকরা যাকে বলেন ‘মানব বিশ্বজগত’, তার কল্যাণে একজন সহায়কে পরিণত করবে।

স্টয়িক মেডিটেশন ২

শিক্ষাই স্বাধীনতা

”এইসব শিক্ষার পরিণতি কি? সত্যিকার শিক্ষার সবচেয়ে সুন্দর আর যথার্থ ফলাফল হচ্ছে – প্রশান্তি, শঙ্কাহীনতা আর স্বাধীনতা। আমাদের সেই গণ মতামতকে বিশ্বাস করা উচিত না, যা বলে শুধুমাত্র স্বাধীন মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা যেতে পারে, বরং জ্ঞানপ্রেমীদের কথাই বিশ্বাস করা উচিত, যারা বলেন শুধুমাত্র শিক্ষিতরাই স্বাধীন’। এপিকটিটাস, ডিসকোর্সেস, ২.১-২১-২৩এ

কেন আপনি কোনো একটি বই হাতে তুলে নেন? অবশ্যই নিজেকে বুদ্ধিমান হিসাবে উপস্থাপন করার জন্য নয়, কিংবা অলস অবসর কাটানোর কোনো উপায় হিসাবে নয়, কিংবা আপনি যা শুনতে চান শুধুমাত্র সেটি শোনার জন্য নয়, বই পড়ার মত কঠিন কাজ করার চেয়ে আরো বহু সহজ বিকল্প আছে।
কিন্তু আপনি বই হাতে নিয়েছেন কারণ কিভাবে বাঁচতে হয় সেটি আপনি শিখতে চাইছেন এবং শিখছেন। কারণ আপনি আরো স্বাধীন হতে চান, আরো নির্ভীক, এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জন করতে চান। শিক্ষা – মহান চিন্তাবিদদের বই পড়া ও তাদের বক্তব্যগুলো নিয়ে ভাবা – শুধুমাত্র পড়ার খাতিরেই পড়া না, এর একটি লক্ষ্য আছে।

যেদিন নিজেকে বেশ দিকভ্রান্ত মনে হবে.. সেই দিনগুলোয় এই নির্দেশনাটি স্মরণ করুন, যখন টেলিভিশন দেখা, আড্ডা মেরে সময় কাটানোকে মনে হতে পারে আপনার মূল্যবান সময়ের অপচয়, ভালো কোনো বই পড়ে যে সময়ে আপনি জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, হতে পারে সেটি কোনো দর্শনের বই।
জ্ঞান – বিশেষ করে নিজের সম্বন্ধে জ্ঞান – হচ্ছে স্বাধীনতা।

(ডেভ কাটলার)

স্টয়িক মেডিটেশন ৩

অর্থহীন বিষয়গুলোর ব্যপারে নির্দয় হয়ে উঠুন

** কি হারাচ্ছেন সে বিষয়ে যখন আপনি সচেতন ছিলেন না, তখন অনেকেই আপনার জীবনে বড় ক্ষতি করে গেছে… অর্থহীন দুঃখ, নির্বোধ আনন্দ আর লোভাতুর কামনা, সামাজিক আমোদ-প্রমোদে কত সময়ই না আপনি অপচয় করেছেন – নিজস্ব কোনো কিছু খুব সামান্যই এখন আপনার কাছে আছে। আপনি উপলব্ধি করবেন.. সময় আসার আগেই আপনি মৃত্যুপথযাত্রী **। – সেনেকা, অন ব্রেভিটি অব লাইফ।

আমাদের জীবনের কঠিনতম কাজগুলোর একটি হচ্ছে ‘না’ বলা। কোনো আমন্ত্রণে, অনুরোধে, বাধ্যবাধকতায়, সে সব জিনিসগুলোর প্রতি, যা স্পষ্টতই বাকি সবাই করছেন। সময় অপচয় করার মত কিছু সুনির্দিষ্ট আবেগগুলোর প্রতি না বলা এমনকি আরো বেশি কঠিন, যেমন: রাগ, উত্তেজনা, অমনযোগ, উন্মত্ততা, লালসা। এককভাবে এই তাড়নাগুলো তেমন বিশাল কিছু মনে হয় না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন..তারা ভয়ানক, বাকি সবকিছুর মত একটি বাধ্যবাধকতায় এটি আমাদের বন্দি করে রাখার ক্ষমতা রাখে।

যদি আপনি সতর্ক না হন, এগুলো সেই সত্যিকারের বাধ্যবাধকতা যা আপনার জীবনকে ভারাবনত করে তুলতে পারে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কিভাবে হারানো সময়গুলো আপনি খুঁজে পেতে পারেন, কিভাবে নিজেকে কম ব্যস্ত অনুভূত করাতে পারেন? ‘না’ বলার শক্তি শিখে শুরু করুন। যেমন, ”না ধন্যবাদ”, ‘না, আমি এর মধ্যে নিজেকে জড়াতে চাইছি না’ এবং ‘না, আমি ঠিক এখন এই কাজটি করতে পারবো না’। হয়তো কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কিছু মানুষকে এটি বিরক্ত করবে। কাজটি করতে বেশ পরিশ্রমেরও প্রয়োজন। কিন্তু যতই আপনি না বলতে পারবেন, এমন কিছুর প্রতি, যেগুলো গুরুত্বহীন, ততই আপনি যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর প্রতি ‘হ্যাঁ’ বলতে পারবেন । এটি আপনাকে ঠিক সেভাবে বাঁচতে ও জীবনকে উপভোগ করতে সহায়তা করবে, যে জীবন আপনি চান।

(সের্গিও ইঙ্গারভাল)

এপিকটিটাসের সংস্করণ

জিনোর বেশ কয়েক শতাব্দী পরে এপিকটিটাস বেঁচে ছিলেন, এবং তিনি স্টয়িসিজমে বেশ কিছু নতুনত্ব যুক্ত করেছিলেন- বিশেষ করে এই দর্শনটি অনুশীলন করার সম্পূর্ণ নতুন একটি উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি বিস্ময়কর নয়, কারণ দর্শন (এবং বাস্তবিকভাবেই এমনকি ধর্মও) একগুচ্ছ গতিশীল ধারণা, যা অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক, উভয় ক্ষেত্রেই সারাক্ষণই প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। পরিণতিতে, সব দর্শনই পরিবর্তিত হয়, তাদের নিজের সময়ে প্রাসঙ্গিকতা এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের কথা বিবেচনা করে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে ।


বাস্তবিকভাবেই জিনোর মাত্র দুই প্রজন্ম পরে, প্রাচীন যুগের অন্যতম সেরা একজন তর্কশাস্ত্রবিদ ক্রাইসিপাস (ক্রাইসিপ্পাস) অব সোলি মূল স্টয়িসিজমে এত বেশি সংখ্যক সমন্বয় করেছিলেন যে ডায়োজিনিজ লেইয়ার্শাস মন্তব্য করেছিলেন, ‘ক্রাইসিপ্পাসের কারণে আর কোনো পোর্চ (স্টোয়া) অবশিষ্ট ছিল না’, অর্থাৎ তিনি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্টয়িক পদ্ধতিটির রূপান্তর ও উন্নয়ন করেছিলেন। স্টয়িক দার্শনিকদের আগেও যেমন এপিকিউরিয়ানরা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, পরবর্তীতে বিদ্যায়তনিক সংশয়বাদীরাও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং পরিণতিতে স্টয়িকরা তাদের দর্শনটির তিনটি পর্বে বিবর্তন দেখেছিলেন ( খানিকটা বেরসিকভাবে এ পর্বগুলোকে আদি, মধ্য এবং শেষ স্টোয়া নামে চিহ্নিত করা হয়। বর্তমান সময়ের স্টয়িক পুনরুজ্জীবনকে কেউ কেউ বলছে স্টোয়া নোভা)।

স্টয়িসিজমের দর্শনে যে নতুনত্বগুলো এপিকটিটাস নিয়ে এসেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘রোল এথিক্স’ ধারণটির বিকাশ। নৈতিকতার প্রতি একটি দৃষ্টিভঙ্গি যার ভিত্তিতে ছিল জীবনে আমরা যে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকাগুলো পালন করে থাকি সেটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা: একটি সমাজে মানুষ হিসাবে সাধারণ ভূমিকা; যে ভূমিকাগুলো আমরা আমাদের নিজেদের জন্য নির্বাচন করি, যেমন বাবা অথবা বন্ধুর ভূমিকা; এবং সেই ভূমিকাগুলো যা পরিস্থিতি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়, যেমন পুত্র অথবা কন্যা হিসাবে ভূমিকা। এপিকটিটাসের ভূমিকা বা কর্তব্য সংক্রান্ত নৈতিকতাগুলো মূলত মধ্য স্টোয়া পর্বের একজন দার্শনিক পানেটিয়াসের (১৮৫-১০৯ খ্রিষ্টপূর্ব) উদ্ভাবিত একই ধরনের কিছু ধারণার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন।
এপিকটিটাসের দর্শনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে – এবং যেগুলো স্টয়িসিজম বুঝতে ও এর অনুশীলনগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সহায়ক –
‘ডাইকোটোমি অব কন্ট্রোল’ ( নিয়ন্ত্রণের দ্বি-বিভাজন) এবং স্টয়িক অনুশীলনের তিন শৃঙ্খলা।

‘নিয়ন্ত্রণের দ্বি-বিভাজন’ ধারণাটি এপিকটিটাস প্রস্তাব করেছিলেন তার এনকিরিডিয়ন বইটির শুরুতে ( বইটি মূলত এপিকটিটাসের একগুচ্ছ উপদেশ-নির্দেশ, যা সংকলন করেছিলেন তার ছাত্র আরিয়ান। এটি একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকার মত):

কিছু জিনিস আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন, এবং কিছু জিনিস আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমাদের ক্ষমতার মধ্যে আছে আমাদের মতামত, প্রণোদনা, কামনা এবং ঘৃণা, অর্থাৎ যা কিছু আমাদের নিজেদেরই করণ। আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই আমাদের শরীর, আমাদের সম্পত্তি, সুনাম, কার্যালয়, অর্থাৎ যা কিছু যা আমাদের নিজস্ব করণ নয়।

আধুনিক ভাষায় এটি হচ্ছে সেই ধারণা – শুধুমাত্র আমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার-বিবেচনা, অভিমত, যে মতামত আর মূল্যবোধগুলো আমরা সমর্থন করি, এবং কোনো কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্তগুলোর দায়িত্বে আছি। আর কোনো কিছুর উপরে নয়। আমরা এমনকি আমাদের মানসিক জীবন বেশির ভাগ অংশের উপরেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, যা প্রধানত স্বয়ংক্রিয়, আধুনিক কগনিটিভ বিজ্ঞান এখন যে রায় দিয়েছে। বাকি সব কিছু বিশেষ করে স্বাস্থ্য, বিত্ত, খ্যাতি ইত্যাদি বিষয়গুলো আমরা প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু এসব কিছু অন্য মানুষগুলোর ক্রিয়ার একটি সম্মলিন এবং অবশ্যই পরিস্থিতির উপরেও নির্ভর করে, ঠিক যেমন সেই ‘সেরেনিটি’ প্রার্থনা বলেছিল, তাহলে সবচেয়ে মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি এখানে হচ্ছে – আমাদের প্রাজ্ঞতার চর্চা করা প্রয়োজন, যেন আমরা পার্থক্য করতে সক্ষম হই, কোনটি আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং কোনটি আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আর সাহস হচ্ছে প্রথম ক্ষেত্রটিতে মোকাবেলা করা এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে মেনে নেবার মত স্থিরতা ধারণ করা।

নিয়ন্ত্রণের দ্বিবিভাজনের এই ধারণাটি এপিকটিটাসের মূল আবিষ্কার নয়, যদিও তিনি এটিকে তার নিজস্ব মোড়কের স্টয়িসিজমের মূল বিষয়ে পরিণত করেছিলেন। তার পূর্বসূরিদের তুলনায় এপিকটিটাস এই নিয়ন্ত্রণের দ্বিবিভাজন নিয়ে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা, এর পরিণতিগুলো অনুসন্ধানে সময় বিনিয়োগ এর এবং নিয়মিতভাবেই এটি তিনি তার শিক্ষায় ব্যবহার করেছেন। কিন্তু আমরা এই ধারণার আদি একটি সংস্করণ দেখতে পাবো সেনেকার কাজেও, যখন তিনি সদগুণ বা ভার্চু ( যা আমাদের নির্ভর করে) এবং বাহ্যিক বিষযগুলো ( যা ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল) মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। এই নিয়ন্ত্রণের দ্বিবিভাজন এছাড়াও সিসেরোর ‘অন দ্য এন্ডস অব গুড অ্যান্ড ইভিল’ শিরোনামের রচনাটিতে আমরা দেখতে পাই। সিসেরো, যিনি ১০৬ থেকে ৪৩ খ্রিষ্টপূর্ব অবধি জীবিত ছিলেন, তিনি ছিলেন অ্যাকাডেমিক স্কেপটিক (বিদ্যায়তনিক সংশয়বাদী), তিনি স্টয়িক ছিলেন না, কিন্তু স্টয়িসিজমের ব্যাপারে তার সহানুভূতি ছিল, এবং তিনি মধ্য স্টোয়া পর্বের দার্শনিক পসিডোনিয়াসের কাছে এ বিষয়ে হাতেকলমে শিখেছিলেন। সম্ভবত সিসেরোই সবচয়ে সেরা রূপকটি প্রস্তাব করেছিল এই নিয়ন্ত্রণের দ্বিবিভাজনটিকে বুঝতে :

”যদি কেউ সিদ্ধান্ত নেয় যে তার লক্ষ্য হচ্ছে বর্শা বা তীরধনুক ব্যবহার কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দু বরাবর নিক্ষেপ করার চেষ্টা করবেন। আর ঠিক নিশানাটি ভেদ করাই হচ্ছে তাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য – যা স্টয়িকরা চূড়ান্ত ভালো বলে চিহ্নিত করেছেন – হবে তাদের পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব সেভাবে লক্ষ্য অভিমূখে তাদের নিশানা নির্দিষ্ট করা:এই উদাহরণে বর্ণিত মানুষটির পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব সে তাই করবে লক্ষ্য ভেদ করতে, কিন্তু তারপরও যদিও উদ্দেশ্য পূরণে সে সব কিছুই করছে, তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য হবে সেই বিষয়টি যাবে আমরা বলবো জীবন পরিচালনার জন্য প্রধান ভালো বিষয়, এবং যখন কিনা সত্যিকার লক্ষ্য ভেদ করা হবে আমাদের বাক্য, ‘যা নির্বাচিন করতে হবে’, কিন্তু ‘ যা কামনা করা যাবে না”।

এবার সতর্কভাবে বিবেচনা করুন কোনটি তীরন্দাজের নিয়ন্ত্রণে এবং কোনটি তীরন্দাজের নিয়ন্ত্রণে নয়। ধনুক নির্বাচন এবং এটি রক্ষণাবেক্ষণ করার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার আছে, এছাড়া কোনো একটি নিশানা ভেদ করার অনুশীলন, সঠিক সেই মুহূর্তটিকে চিহ্নিত করা যখন তীরটি তিনি ছেড়ে দিচ্ছেন এসব কিছু তার নিয়ন্ত্রণে। তবে এরপর, আর কিছুই তার নিয়ন্ত্রণে নেই, নিশানা, ধরুন শক্র সেনা, হয়তো তীরটি ধেয়ে আসার ব্যপারে সচেতন হয়ে উঠতে পারেন এবং এর সীমানার বাইরে সরে যেতে পারেন, অথবা আকস্মিক কোনো প্রবল বাতাস হয়তো সবচেয়ে নির্ভূল নিক্ষেপকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে এই দ্বিবিভাজন খুব কঠোর। নিশ্চয়ই কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য আর নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয় এমন দুটি শ্রেণির মাঝামাঝি অবস্থান করে। এটি আধুনিক স্টয়িক উইলিয়াম আর্ভিনকে প্ররোচিত করেছিল একটি ত্রি-বিভাজন প্রস্তাব করতে, যার মধ্যে আছে নিয়ন্ত্রণ, প্রভাবিতকরণ, এবং নিয়ন্ত্রণহীন। হয়তো এই প্রস্তাবনাটি ভ্রান্ত, এমন কিছু যা কিনা স্টয়িসিজমের মূল ভিত্তিটাকেই ধ্বংস করতে পারে। বিষয়টিকে এভাবে ভাবতে পারেন, যেভাবে সুস্পষ্টভাবে সিসেরোর অনুচ্ছেদটিতে বর্ণিত হয়েছে, যা কিছু আমরা প্রভাবিত করি সেটি আবার দুটি অংশে বিভাজন করা যেতে পারে, নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তীর ছোড়ার অনুশীলন করা প্রথমটির মধ্যে, দমকা বাতাস দ্বিতীয় শ্রেণিতে। আর ঠিক কখন তীরটিকে জ্যাঁ মুক্ত করা হবে সেই সিদ্ধান্তটি যাচ্ছে প্রথম শ্রেণিতে, এবং নিশানাটির দ্রুত তীর থেকে পালিয়ে যাবার কৌশল দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। এবং এভাবেই যখন আমরা বলি আমরা কোনো পরিণতি কি হবে সেটি ‘প্রভাবিত’ করতে পারি, আমরা যা বোঝাতে চাইছি সেটি হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে আমাদের কাজের কিছু অংশ আমাদের উপর নির্ভরশীল এবং কিছু আমাদের উপরে নয়। আর সবকিছু নিয়ে আমাদের বোঝাপড়াগুলোকে বিভাজিত করলে আমরা দেখবো এপিকটিটাস যা বলেছিলেন সেটি সত্য।

সিসেরোর এই রূপকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদটি হচ্ছে সর্বশেষ অনুচ্ছেদটি: নিশানায় আঘাত করার ব্যপারটি নির্বাচন করতে হবে, কিন্তু এটি কামনা করা যাবে না। অবশ্যই, তীরন্দাজের উদ্দেশ্য হচ্ছে তার লক্ষ্য ভেদ করা, আর সেটাই মূল বক্তব্য। একইভাবে, আমরা অসুস্থ নয় সুস্থ থাকতে চাই, দরিদ্র নয় স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে চাই .. ইত্যাদি। কিন্তু এইসব পরিণতিগুলো সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, এবং যদি ধরে নেই আমাদের পক্ষে সর্বোচ্চ যা কিছু করা সম্ভব (আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন) সেগুলো আমরা সব করেছি তাহলে আমাদের আত্মমর্যাদা নিশানা স্পর্শ করার উপর নির্ভর করা উচিত নয় (অথবা সুস্থ কিংবা বিত্তবান ইত্যাদি)। জীবনে, মাঝে মাঝে আমরা জিতি এবং মাঝে মাঝে আমরা হারি, সুতরাং পরিণতি যা-ই হোক না কেন সেই বিষয়ে আমাদের মানসিক স্থিরতা ( আমরা তাদের নির্বাচন করেছি, কিন্তু আমরা সেগুলো কামনা করিনি) বিকাশ করাই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি।
এপিকটিটাসের দর্শনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে তার ‘তিন শৃঙ্খলা’, যা মূলত আমাদের জীবনের নৈতিক কম্পাস হিসাবে ইতোপূর্ব বর্ণিত চারটি সদগুণকে প্রতিস্থাপন করেছে। এই তিনটি শৃঙ্খলা হচ্ছে :

** কামনার শৃঙ্খলা ( এবং ঘৃণার)

স্টয়িকদের মতে, আমাদের ভুল জিনিসগুলো কামনা ( অথবা ঘৃণা বা অপছন্দ) করার প্রবণতা আছে, এবং এটি আমাদের অসুখী হবার গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। বিশেষ করে, আমরা কামনা করি, ইতোমধ্যেই সেই পরিচিত বাহ্যিক বিষয়গুলো – যার মধ্যে আছে স্বাস্থ্য, বিত্ত, খ্যাতি ইত্যাদি। অর্থাৎ আমরা সেই জিনিসগুলো কামনা করি যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। একইভাবে ঐসব একই জিনিসগুলো হারাতেও আমরা অপছন্দ করি। সেনেকা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এমন কিছু কামনা করে আমরা আমাদের সুখী হবার সম্ভাবনাটি ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেই।

এটি বুদ্ধিমানের মত জুয়ার দান নয়। আরো বেশি উত্তম হচ্ছে আমাদের কামনাগুলো পুননির্দেশিত করা সেই সব জিনিসগুলোর প্রতি যা আসলেই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। অন্যার্থে আমাদের বিচক্ষণ বিবেচনাগুলোর প্রতি। কেন? কারণ একটি ‘ইউডাইমোনিক’ বা পরিপূর্ণ জীবন কাটানো সুযোগের উপায় হচ্ছে এমন একটি জীব্ন, যা আমরা পুরোপুরিভাবে আমাদের নিজেদের প্রচেষ্টায় তৈরি করি, এটি ভাগ্যের খামখেয়ালি আচরণের উপর ছেড়ে দেই না। আমরা তারপরও যুক্তিসঙ্গতভাবে সুস্থ্য, বিত্তবান ইত্যাদি হতে চাইতে পারি কিন্তু আমরা সেই মৌলিক বাস্তবতাটিকে গ্রহন করে নেই – আমাদের প্রচেষ্টা যাই হোক না কেন, আমরা মাঝে মাঝে ঐসব জিনিসগুলো পাই, মাঝে মাঝে আমরা সেটি পাই না। এবং এমনকি যখন আমরা সেগুলো পাই, এই পাওয়াটাও সাময়িক, কারণ সময়ের সাথে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়।

কিন্তু কীভাবে আমরা আমাদের এই পছন্দ আর অপছন্দগুলোকে নাটকীয়ভাবে পনুর্বিন্যস্ত করতে পারি? স্টয়িক অনুশীলনের মৌলিক দুটি ধাপ ব্যবহার করে, যে পদ্ধতিগুলো আধুনিক ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি’র অনুপ্রেরণা ছিল: একটি পরিকল্পিত, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত ( বৌদ্ধিক / অবধারণগত/ কগনিটিভ ধাপ) এবং আমাদের জীবনে পরিবর্তনগুলোর বাস্তবায়ন যেগুলোর লক্ষ্য নতুন বিন্যাসের সাথে আমাদের অভ্যস্ত করে তোলা ( আচরণের ধাপ)। যেমন, প্রতিবার যখন আপনি কোনো কঠিন কাজ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, অভ্যাস করুন যে আপনি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবেন, এবং সেই কাজ আর পরিস্থিতির নানা দিক নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করবেন যা কিনা আপনার নিয়ন্ত্রণে, এবং সেই সাথে আরেকটি তালিকাও প্রস্তুত করবেন – যা আপনার নিয়ন্ত্রণে নয়। তারপর এই তালিকাদুটি ব্যবহার করুন – প্রথম তালিকার বিষয়গুলোর উপরে আপনার মনোযোগ, সময় আর প্রচেষ্টাকে নির্দেশিত করুন। নিজেকে একটি সংক্ষিপ্ত মন্ত্রের মত করিয়ে দিতে পারেন, যদি প্রয়োজন হয়, যে জিনিসগুলো দ্বিতীয় তালিকায় আপনি উল্লেখ করেছেন – সেগুলো আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। অন্য আর সব কিছুর মতই, গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো, ব্যায়াম করা – মনোযোগ সহকারে করা কাজগুলো সময়ের সাথে ভালো ফলাফল দেবে, আর আপনি যত বেশি কাজগুলো করবেন, ততই কাজগুলো সহজ হয়ে উঠবে।

**কর্মের শৃঙ্খলা ..

মানব প্রকৃতির একটি মৌলিক দিক হচ্ছে, স্টয়িক দার্শনিকদের মতে, আমরা প্রধাণত একটি সামাজিক প্রাণী। চরম কোনো পরিস্থিতিতে আমরা একাকী – নিজের উপর নির্ভর করে – টিকে থাকতে পারি, কিন্তু অন্যদের সাথে সম্পর্কের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া আমরা আসলেই পরিপূর্ণ কোনো জীবন কাটাতে পারি না। আসলেই এই বিশ্বনগরীতে (বিশ্বব্যাপী সব মানুষকে নিয়ে তৈরি একটি সমাজ) অন্য সদস্যদের সাথে আমাদের অর্থবহ সম্পর্কগুলোর মধ্যে মানুষের কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস খুঁজে পাওয়া যায় – বিশেষ করে আমাদের পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে। কর্মের শৃঙ্খলা, তাহলে হচ্ছে আমাদের নিজেদের প্রতি এবং অন্যদের প্রতি কীভাবে সঠিকভাবে এই পৃথিবীতে আচরণ করতে হয় সেটি শেখা।

এখানে আমরা উপরে বর্ণিত এপিকটিটাসের ‘ভূমিকা নৈতিকতা’ বিষয়টিকে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে দেখি, সমাজের যে বিভিন্ন ভূমিকাগুলো আমরা পালন করে থাকি – সেখানে কীভাবে ভারসাম্য আনতে হয় সেটি শিখেই আমরা জীবন কাটাই। একটি প্রাসঙ্গিক স্টয়িক অনুশীলন হচ্ছে প্রতি সন্ধ্যায় দার্শনিক রোজনামচা লেখা, একটি উপায় গড়ে তোলা যেখানে আমরা চিন্তা করতে পারি – কি ভুল করেছিলাম, কি ভালো করেছিলাম, এবং কোন ক্ষেত্রে আমরা আরো উন্নতি করতে পারি।

এ বিষয়ে এপিকটিটাস আমাদের সুস্পষ্টভাবে উপদেশ দিয়েছিলেন: ‘প্রতিজ্ঞা করুন, নিদ্রায় কাতর চোখের পর্দায় আপনি ঘুম প্রবেশ করতে দেবেন না, যতক্ষণ না আপনি আপনার পুরো দিনের প্রতি কাজ যাচাই করে না দেখছেন – কী ভুল করেছি, কী করা হয়েছে আর কী করা বাকি আছে? সুতরাং আপনার কর্মগুলো পর্যালোচনা করা শুরু করুন, এবং খারাপ কাজগুলোর জন্য নিজেকে তিরষ্কার করুন, এবং ভালো কাজগুলোর জন্য আনন্দ অনুভব করুন’। উদ্দেশ্য হচ্ছে আরো উন্নত একজন মানুষ হবার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে এই দুটি ধাপের বাস্তবায়ন করা, বৌদ্ধিক এবং আচরণগত, যার মানে বৃহত্তর সমাজে – মানব বিশ্বজগত – আরো বেশি চিন্তাশীল এবং সহযোগিতপূর্ণ হয়ে ওঠা।

**সম্মতির শৃঙ্খলা

গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায়ে কামনা আর কাজের শৃঙ্খলা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়: উভয় কাজের জন্য আমাদের সুবিবেচনার পরিচয় দেয়া আবশ্যক। আর এভাবেই তৃতীয় শৃঙ্খলাটি, সম্মতির শৃঙ্খলার মানে হচ্ছে আমদের বিচার-বিবেচনা করার ক্ষমতার উন্নয়ন করা, যাকে এপিকটিটাস ‘প্রোহাইরেসিস’ শব্দটি দিয়ে তথ্যনির্দেশ করেছিলেন। বাস্তবিকভাবে একটি অর্থে স্টয়িক প্রশিক্ষণে এপিকটিটাসের সংস্করণটি মূল লক্ষ্য হচ্ছে সুবিবেচনা করার ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষতার উন্নয়ন। আর এর কারণটির সূচনা আদি স্টোয়া পর্বে। ক্লিয়ানথেস ( স্টয়িক স্কুলের দ্বিতীয় প্রধান) এবং ক্রাইসিপাস ( এবং তৃতীয় প্রধান) দুজনেই প্রস্তাব করেছিলেন, ‘প্রাজ্ঞতা হচ্ছে আমাদের ধারণাগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা’। ‘ধারণা’ স্টয়িকদের জন্য একটি কারিগরী শব্দ যার অর্থ হতে পারে আমাদের সংবেদন-সংক্রান্ত বা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে করা উপলব্ধিগুলো অথবা আমাদের অভ্যন্তরীণ চিন্তা আর অনুভূতি।

ধরুন আপনি দিন শেষে অফিস থেকে বের হয়েছেন, রাস্তা দিয়ে হাটছেন, হঠাৎ কাবাব কিংবা বিরিয়ানির সুগন্ধ টের পেলেন, আপনি এর উৎস খুঁজে পেলেন, হয়তো খানিকটা ক্ষুধার্ত আপনি অনুভব করতে পারবেন সেই খাদ্যটির স্বাদ নেবার একটি তাড়না খুব তীব্র হয়ে উঠছে। হয়তো আপনি জানেনও এটি সুস্বাদু, এবং আপনি অনুভব করবেন খানিকটা প্রয়োজন আপনার একটু স্বাদ নেবার। কিন্তু স্টয়িক অনুশীলনে এখানে সাথে সাথেই প্রোহাইরেসিস সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং আপনার এই প্রাথমিক তাড়নাটি সেটি বলবে, ‘দাড়াও, এক মিনিট, আপনি যে এ মুহূর্তে যা কামনা করছেন বলে মনে করছেন, সেটি হয়তো ঠিক নয়, কোনো কিছু করা আগে পরিস্থিতি খানিকটা বিবেচনা করে দেখা যাক’। এবং আপনি যদি বিষয়টি পক্ষে-বিপক্ষে ভাবেন এই প্রলোভনের কাছে নতি শিকার না করার জন্য আপনি কিছু কারণ খুঁজে পাবেন – হয়তো এই ধরনের খাবারে আপনার শরীরের জন্য ভালো নয়, মেদ কিংবা কোনো অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের মানা আছে, স্বজনের অনুরোধ আছে। হয়তো এমন কিছু খেলে আপনার শরীর খারাপ হতে পারে এখনই, সেই সাথে কিছু বাড়তি খরচ। হয়তো বাড়িতে স্বজন অপেক্ষা করছে আপনার জন্য, রাতে একসাথে খাবে বলে, ক্ষুধা নষ্ট করা ঠিক হবে না ……………..। প্রাথমিক অনুভূতিটি নিয়ে সতর্ক পর্যালোচনার একটি পরিণতি হিসাবে, আপনি সে মুহূর্তে হয়তো আপনার জন্য সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারবেন ( অবশ্যই কখনো প্রাথমিক ধারণাগুলো প্রোহাইরেসিসিকে পরাজিত করতে পারে, বেশ, অসুবিধা নেই, স্টয়িক অনুশীলনই ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন আনবে।)

আমাদের বিবেচনাগুলোকে পরিশীলত করতে আমরা এভাবেই চিন্তার অনুশীলন করতে পারি। সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপনের বার্তাটির – জাস্ট ডু ইট – ঠিক বিপরীত পথটাই নির্বাচন করব। আমরা বিবেচনা ছাড়া কিছু করবো না, আমরা ভাবার জন্য বিরতি নেব এবং সম্ভবত দেখবো যে আমাদের আসলেই সেটি করার প্রয়োজন নেই। আবারও, এই চিন্তার ধাপগুলোকে নিরন্তরভাবে অনুশীলন করে যেতে হবে এবং আমরা বিবেচনা করার ক্ষেত্রে আরো বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারবো। যা আমাদের ইচ্ছাগুলোকে পুনর্বিন্যাস করার কাজটি এবং একই সাথে সঠিকভাবে অন্যদের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করার বিষয়টিকেও সহজতর করে তুলবে। এই তিনটি শৃঙ্খলা, যদিও একটি ধারাক্রমে এগুলো বর্ণনা করা হয়েছে শিক্ষা-সংক্রান্ত কারণে, বাস্তবে এই তিনটি শৃঙ্খলাই একই সাথে কাজ করে।এই পৃথিবীতে আচরণ করতে এবং আপনার পক্ষে যতটা সম্ভবত ততটা বিবেচনার সাথে সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে জীবনে যুগপতভাবেই আপনাকে আপনার কামনা আর ঘৃণার (পছন্দ আর অপছন্দ) সাথে মোকাবেলা করতে হবে।

স্টয়িক মেডিটেশন – ৪

”আপনার শুধু দরকার এগুলো: বর্তমান মুহূর্তের পরিস্থিতিটি সম্বন্ধে সঠিক ধারণা, সাধারণ কল্যাণের জন্যে বর্তমান মুহূর্তের কর্ম, এবং বর্তমান সময়ে যা কিছুর মুখোমুখি আপনি হোন না কেন সেই বিষয়ে একটি কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিভঙ্গি।” মার্কাস অরেলিয়াস, মেডিটেশন ৯.৬

উপলদ্ধি, কর্ম, ইচ্ছাশক্তি। স্টয়িসিজমের তিনটি পরস্পর অধিক্রমণকারী তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পৃথক শৃঙ্খলা। অবশ্যই দর্শনটির আরো অনেক অংশ আছে। এবং আমরা সারাদিন ধরেই বিভিন্ন স্টয়িক দার্শনিকদের অনন্য বিশ্বাসগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি। যেমন, ”এটা হেরাক্লিটাস ভেবেছিলেন..’ ” সাইপ্রাসের সিটিয়ামের জেনো বিশ্বাস করতেন…” ইত্যাদি। কিন্তু এই সব তথ্যগুলো আপনার প্রাত্যহিক জীবনে কোনো কাজে লাগবে না। এই তথ্যগুলো আমাদের চিন্তায় কোনো স্বচ্ছতা দেবেনা। বরং নীচের তিনটি স্মারক স্টয়িক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় সারসংক্ষেপ করছে যা প্রতিদিনই আপনার চিন্তা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের অংশ হবার যোগ্যতা রাখে:

কোনো পরিস্থিতি সম্বন্ধে আপনার উপলব্ধি আর ধারণা নিয়ন্ত্রণ করুন।
সঠিকভাবে আপনার কর্ম পরিচালিত করুন।
আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিষয়গুলো স্বেচ্ছায় মেনে নিন।
শুধু এটুকু আপনার করা প্রয়োজন।

(ব্র্যাড হল্যান্ড)


(মাসিমো পিলিউচ্চি এবং রায়ান হলিডের লেখা অবলম্বনে)




স্টয়িসিজমের সহজ পাঠ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s