র‍্যাচেল কার্সন – নীরব বসন্তের পাখি

Rachel Carson/photo: Irving Penn

”But man is a part of nature, and his war against nature is inevitably a war against himself”. ~ Rachel Carson

প্রকৃতির যত্ন নেয়া ও রক্ষণাবেক্ষণ করার বিষয়টির মধ্যে খুব বেশী প্রাকৃতিক কিছু নেই। সাধারণভাবে আমাদের স্বীকৃত তাড়নাটি হচ্ছে প্রকৃতিক জগতকে জয় ও বশীভূত করা: বনভূমির গাছ কেটে পরিষ্কার করা, প্রাণিদের শিকার করা, জলাভূমির পানি সেচ করে বের করে দেয়া, পৃথিবীর গভীরে যা কিছু খনিজ আছে সেগুলো বের করে আনা। বেশ দীর্ঘ একটি সময় ধরেই এই প্রবণতাকে বীরোচিত ও ঝুঁকিহীন একটি কর্মযজ্ঞ হিসাবেই দেখা হয়েছে, যার কিনা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই – মানুষের এই প্রচেষ্টাগুলো খুব সামান্য মাত্রার যদি আপাতদৃষ্টিতে পৃথিবীর সীমাহীন প্রাচুর্যের সাথে তুলনা করা হয়। শুধুমাত্র খুব সাম্প্রতিক সময়েই আমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি – সমষ্ঠিগতভাবে – এর বেশ কিছু সম্পদকে নিঃশেষ করে দেবার মাধ্যমে আমরা আসলেই গ্রহটির ক্ষতি করছি । আমরা প্রকৃতির প্রতি ভিন্ন ধরনের অনুভূতি আর উদ্বেগ অনুভব করতে শিখেছি যখন সেই আবেগগুলোকে সঠিক পথ দেখানোর মত কেউ একজন আমাদের কাছেই ছিলেন : প্রজাপতির সৌন্দর্য আর জটিলতা, সমুদ্রের অসাধারণ শক্তি আর বিশুদ্ধতা, একটি ওক গাছের অর্থনীতি আর এর লাবণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে…।

পৃথিবীর সবচেয়ে সবচেয়ে বেশী বিধ্বংসী আর দূষণকারী দেশে একটি প্রজন্মের জন্যে সেই মানুষটি ছিলেন, র‍্যাচেল কার্সন। একজন বিজ্ঞানী এবং লেখক। প্রায় এককভাবেই, কার্সন তার দেশবাসীকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে প্রকৃতিকে সন্মান করতে হয়, এবং তিনি তাদের বুঝতে সাহায্য করেছিলেন যে তারা অতীতের অন্য যে-কোনো সভ্যতার চেয়ে আরো অনেক বেশি দ্রুত গতিতে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় আছেন, এবং তিনি তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, যতটা দ্রুত সম্ভব, তারা যদি তাদের এই উদ্ধত নির্বিকার আচরণ পরির্ব্তন না করেন তাহলে তারা ভয়ঙ্কর বিপদে পড়বেন।
প্রথম দৃষ্টিতে কার্সনের কাজ দেখলে মনে হতে পারে খুব সাধারণ এবং কৃষিকাজের নতুন একটি পদ্ধতির বিপজ্জনক ঝুঁকিগুলো সংক্রান্ত জরুরী একটি সতর্ক সংকেত (বিশেষ করে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ সংক্রান্ত), কিন্তু তার লেখা প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা নিয়ে শুষ্ক বাদানুবাদ আর তর্ক-বিতর্কের চেয়েও আরো অনেক বেশী কিছু ছিল।

কার্সন বুঝতে পেরেছিলেন – তার আগে ও পরের খুব অল্প কিছু পরিবেশ-বিশেষজ্ঞের মত – গণতান্ত্রিক ভোক্তা সমাজে কোনো প্রস্তাবনাগুলো দিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে হলে, তাকে তার দর্শকদের প্রথমে মুগ্ধ করতে হবে, তাদের শেখাতে হবে কিভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হয়। তাদের ভোগবাদীতা আর লোভ পৃথিবীর কি ক্ষতি করছে, সেটি দেখিয়ে তাদের মধ্যে অপরাধবোধের জন্ম দেয়াই যথেষ্ট নয়, তাদের জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়ায় সফল হবার কোনো সুযোগ সৃষ্টি করতে হলে প্রথমেই তাকে যা করতে হবে, সেটি হলো তাদের মনে সমুদ্র, বনভূমি ও প্রেইরীর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে। তার জীবনের প্রায় শেষের দিকে, কার্সন শিশুদের উদ্দেশ্য করেই প্রকৃতির নানা আলোকচিত্র ও অলঙ্করণসহ একটি বই লিখেছিলেন, বইটির নাম তিনি দিয়েছিলেন The Sense of Wonder এবং চেষ্টা করেছিলেন তাদের বাবা-মাদের পথ দেখাতে কিভাবে খুব অল্প বয়স থেকেই শিশুদের পৃথিবী ও এর বিস্ময়কর সৃষ্টিসম্ভারের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হয়:

“একটি শিশুর জগত সজীব, প্রাণবন্ত, নতুন এবং সুন্দর, বিস্ময় আর উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। দূর্ভাগ্য যে, আমাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই, সেই স্বচ্ছ দৃষ্টি, সেই সত্যিকারের সহজাত প্রবৃত্তি , সব সুন্দর আর বিস্ময়-অনুপ্রাণিত করে এমন কিছু দেখতে যা আমাদের সাহায্য করতো সেটি নিস্প্রভ হয়ে গেছে, এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগেই যা হারিয়ে গেছে। আমার যদি সেই ভালো পরীকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকতো যে কিনা সব শিশুদের দীক্ষা দেবার বিষয়টি দেখাশুনা করে থাকে, পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর জন্যে তার কাছে আমার সেই আশীর্বাদটি চাওয়া উচিত, যেন তাদের বিস্ময় অনুভব করার ক্ষমতাটি অবিনশ্বর হয়, যেন সেটি তাদের সারাজীবন ধরেই অম্লান থাকে, পরের জীবনের হতাশাবোধ আর মোহমুক্তি, যা কিছু কৃত্রিম সেই সব কিছুর প্রতি প্রাণহীন সার্বক্ষণিক ভাবনা, আমাদের শক্তির উৎসগুলো থেকে বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে অব্যর্থ এক প্রতিশেধক হিসাবে।”

র‍্যাচেল লুইস কার্সনের (১৯০৭-১৯৬৪) জন্ম আর শৈশব কেটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার একটি ছোট পারিবারিক খামারে, তিনি জীবনের সূচনালগ্ন থেকে যেখানে তিনি প্রকৃতি আর জীবজগতকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। এমন একটি সময়ে, যখন নারীরা উচ্চ শিক্ষায় আসতেন না, তিনি চ্যাটহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব স্বাতন্ত্রসূচক মিশ্রণ, ইংলিশ আর জীববিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। এরপর তিনি পিএচডি করতে আসেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানে পিট-ভাইপার আর কাঠবিড়ালী নিয়ে কিছু হতাশাপূর্ণ আর নিষ্ফল গবেষণা শেষে, তিনি অবশেষে মাছের রেচনতন্ত্র নিয়ে তার মাস্টার্সের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তবে, তার এই গবেষণার বিষয়টি (এবং পুরোপুরিভাবে শিক্ষাও) তার অর্থনৈতিকভাবে সংগ্রামরত পরিবারকে সাহায্য করার জন্য তাকে ছাড়তে হয়েছিল, যখন খুব দ্রুত, অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে তার বাবা, বোন ও শেষে ভাইঝি সবাই দুঃখজনকভাবে খুব অল্পবয়সেই মারা গিয়েছিল।

সময়টি ছিল ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশনের’ সেই তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার সময়, যখন বেশ কিছু সরকারী প্রতিষ্ঠান ভাতা দাবী করা বেকারদের দীর্ঘ লাইন সংক্ষিপ্ত করতে নতুন কিছু পদ সৃষ্টি করেছিল, যাদের কিছু ছিল খুবই অদ্ভুত। সৌভাগ্যক্রমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মৎস ব্যুরোর রেডিও সম্প্রচারের জন্যেএ পাণ্ডুলিপি লেখার একটি চাকরি নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। রেডিওতে প্রচারের জন্যে নির্মিতব্য সেই ধারাবাহিক অনুষ্ঠানটির নাম ছিল, Romance Under the Water; অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রবাসীদের মেরিন বায়োলজী বা সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষিত করে তোলা ও মৎস ব্যুরো প্রতিষ্ঠানটির নেয়া নানা পদক্ষেপের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা। এই অদ্ভুত কাজটি করতে গিয়েই তিনি খুব শীঘ্রই সাধারণ মানুষের জন্য জলজ প্রাণীদের জীবন চমৎকার আর আগ্রহ উদ্দীপক করেই উপস্থাপন করার খুবই অসাধারণ একটি আগ্রহ নিজের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন।

তিনি ইল, হোয়েল্ক আর কাকড়াদের নিয়ে লিখেছিলেন, এছাড়াও আটলান্টিক স্টারগেজার, গাল্ফ পাইপফিশ, রেমো ফ্লাউণ্ডার নিয়েও লিখেছিলেন, শ্রোতাদের যা মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। ”সমুদ্র নিয়ে লেখা আমার বইয়ে যদি কোনো কবিতা থেকে থাকে, এর কারণ কিন্তু এমন নয় যে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে সেটি সেখানে যোগ করেছি”, তিনি বিনয়ের সাথে লিখেছিলেন, ” বরং এর কারণ কেউই সততার সাথে সমুদ্র নিয়ে লিখতে পারবেন না কবিতা বাদ দিয়ে”।


অবশ্যই কবিতা সেখানে ছিল – কিন্তু তার প্রতিভাই মূলত জানতো সেটি কিভাবে প্রকাশ করতে হয়: ” সমুদ্রকে কে চিনতে পেরেছে? না আমি কিংবা আপনি, পৃথিবীর সাথে বাধা আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো দিয়ে, জানতে পারি ফেনা আর জোয়ারের ঢেউয়ের টান, যা সমুদ্র শৈবালের নিচে লুকিয়ে থাকা কাকড়াগুলোকে তাদের সমুদ্র তীরের পাথুরে জলাশয়ের বাড়িতে স্পর্শ করে দ্রুত যাওয়া আসা করে, অথবা মধ্য সাগরের দীর্ঘ অনুচ্চ ঢেউয়ের সেই গুঞ্জনধ্বনি, যেখানে ঝাকে ঝাকে ঘুরে বেড়ানো মাছ শিকার করে অথবা শিকারে পরিণত হয়, এবং বায়ুমণ্ডলে শ্বাস নিতে ডলফিন যেখানে ঢেউ ভাঙ্গে। একইভাবে আমরা জানতে পারিনা সমুদ্র তলদেশে জীবনের উত্থানপতনগুলো (..) যেখানে ঝাক ঝাক ক্ষুদ্র মাছ সন্ধ্যায় ঝকমক করে উল্কাপিণ্ডের রুপালি বৃষ্টির মত, ইল অপেক্ষায় থাকে পাথরের ভাজে। এমনকি মানুষকে আরো কম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সমুদ্র তলের গভীর খাদে সেই অবোধ্য আরো ছয় মাইল নীচে অতল গহবরের গুপ্তস্থানগুলোয় নামতে, যেখানে রাজত্ব করে সম্পূর্ণ নীরবতা আর অপরিবর্তনীয় শীতলতা আর চিরন্তন রাত্রি।” পরবর্তীতে কারসন সমুদ্র নিয়ে তিনটি বই লিখেছিলেন। যার একটি বিশেষভাবে কাব্যিক ধ্যান, Under the Sea Wind (১৯৪১), এবং দ্বিতীয়টি The Sea Around Us (১৯৫১) সামুদ্রিক প্রাণীদের অভিপ্রয়াণ আর ঋতু পরিবর্তনের সাথে ঘটা পরিবর্তনগুলো বর্ণনা করেছিল। আরেকটি, The Edge of the Sea এর বিষয়বস্তু মূলত ছিল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও তাদের সহিষ্ণুতা আর গুরুত্ব।

পাঠকদের অনুপ্রাণিত করার মত তার একটি প্রতিভা ছিল, যেন তারা তাদের হ্রস্বদৃষ্টির মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে কোনো সামুদ্রিক পাউট আর পেইন্টেড গোবির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অস্তিত্বটিকে দেখতে পারেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাণিজ্যিক টেলিভিশন আর কর্মব্যস্ত জীবনে বিক্ষিপ্ত অমনোযোগী সাধারণ জনগোষ্ঠীকে উদ্দীপ্ত করতে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত কখনোই যথেষ্ট নয়, এবং আসলেই এই গ্রহটি বাঁচাতে হলে মহান কোনো লেখকের লেখনীর সব প্রতিভা তার একান্তই প্রয়োজন। তিনি চেয়েছিলেন পুরো পৃথিবীর সাথে আমরা যেন একাত্ম অনুভব করতে শিখি: সুতরাং মানুষ যেন নিজেদের শুধুমাত্র প্রকৃতির ‘সম্পদ’ দেখাশুনা করার জন্যে নিয়োগপ্রাপ্ত মনিব আর ধ্বংসকারী চরিত্র হিসাবে নয়, বরং সেই অমূল্য আর অপরিমেয় কিছুর অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে পারে, যা সুন্দর আর ভঙ্গুর। তার সেই অসাধারণ প্রতিভা এর শীর্ষ স্পর্শ করেছিল তার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, আবেগময় আর মর্মস্পর্শী সৃষ্টি, Silent Spring বইটিতে (১৯৬২)।দূর থেকে দেখলে তার বইয়ের বিষয়টি খুব একটা আগ্রহ সৃষ্টি নাও করতে পারে: ‘কীটনাশক’, কিন্তু তাসত্ত্বেও এটি এমন একটি বই ছিল যার মোট ২০ মিলিয়ন কপি বিক্রয় হয়েছিল এবং ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল।

১৯৫০ এর দশকের শেষে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সামরিক সহায়তাপুষ্ট ল্যাবরেটরীগুলোয় রাসায়নিক কীটনাশক দ্রব্যের ব্যপক গণউৎপাদন শুরু করেছিল। সবচেয়ে জনপ্রিয় কীটনাশকটি ছিল ডাইক্লোরোডাইফিনাইলট্রাইক্লোরোইথেন (dichlorodiphenlytrichloroethane-DDT) (ডিডিটি), মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোয় ম্যালেরিয়ার জীবানুবহনকারী মশা নির্মূল করার জন্যে এটি পরিকল্পিত হয়েছিল । এটি এত বেশী কার্যকরী এবং উপকারী ছিল যে এটি আবিষ্কারের জন্যে রসায়নবিদ পল হেরমান মুলারকে নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছিল।

তবে, পরে প্রমাণিত হয়েছিল যে ডিডিটি আসলে একটি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-সুলভ আবিষ্কার। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছিল এটি শুধু ক্ষতিকর মশাই মারছে না, বরং ব্যবহার শুরু হবার বহু মাস পরেও এটি নানা ধরনের কীটপতঙ্গ হত্যা করা অব্যহত রাখে। এছাড়াও, ডিডিটি বৃষ্টির পানির সাথে মিশে, নালা, নদী ও নানা জলাশয়ে প্রবেশ করে এর বিষক্রিয়ায় মাছ, মোল, শিয়াল, খরগোশ এমনকি জীবিত এমন প্রায় সব প্রাণীকেই আক্রান্ত করতে পারে। ডিডিটি ব্যবহার পৃথিবীর খাদ্য সরবরাহ দূষিত করারও শক্তি ছিল, এছাড়াও মানুষের শরীরে স্নেহপদার্থ সংগ্রহকারী কোষগুলোয় এটি জমা হতে পারতো, যা পরে ক্যানসার হবার সম্ভাবনাও বাড়াতো। এই বইটা তীব্র একটি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। যদিও কার্সন প্রতিষ্ঠিত একজন লেখক ছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজগুলো তার মতামত বর্জন করতে শুরু করেছিল। যে বিজ্ঞানীরা ডিডিটি আবিষ্কার করতে সহায়তা করেছিলেন আর যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তারা যুক্ত ছিলেন, তারা ক্রুদ্ধ হয়ে কীটনাশকের ঝুঁকি নিয়ে কার্সনের সাবধানবাণীর বিরুদ্ধে তাদের পাল্টা যুক্তি প্রস্তাব করেছিলেন। মনসান্টোর মত কোম্পানীগুলো কার্সনের বইটির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদসহ লেখা প্রকাশ করেছিল, এবং একই সাথে কার্সন নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করাও অব্যহত রেখেছিল। কোম্পানীর একজন কর্মকর্তার ক্ষুদ্ধ মন্তব্য ছিল, ”যদি সবাই বিশ্বাসের সাথে মিস কারসনের শিক্ষা অনুসরণ করেন, আমরা তাহলে আবার অন্ধকার যুগে ফিরে যাবো, এবং পোকামাকড়, অসুখ আর জীবাণুরা আরো একবার পৃথিবী রাজত্ব করবে”। এজরা টাফট বেনসন, যুক্তরাষ্টের তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের কাছে পাঠানো একটি মেমোতে লিখেছিলেন, যেহেতু মিস কারসন শারীরিকভাবে অনাকর্ষণীয় এবং এখনও অবিবাহিত, তিনি ”সম্ভবত একজন কমিউনিষ্ট” ( বাস্তবিকভাবে তিনি হয়তো শুধুমাত্র খুব বেশী ব্যস্ত ছিলেন বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখার কাজে অথবা, সম্ভবত, ঘনিষ্ট একজন বান্ধবীর সাথে তার একটি রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল)।

কর্পোরেশন আর তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, Silent Spring সব দেয়ালই ভাঙ্গতে পেরেছিল। শক্তিশালী রাসায়নিক করপোরেশগুলো থেকে সমালোচনা প্রত্যাশা করেই তিনি তার বইটি এমনভাবে প্রস্তুত করেছিলেন যেন এটি কোনো আইনি লড়াই। এর সাথে তিনি যুক্ত করা হয়েছিল ৫৫ পাতার একটি নোট, যেখানে তার যুক্তিগুলোর পক্ষে অকাট্য সব প্রমাণ ছিল। Silent spring শিরোনামটি একটি ভয়ানক ছবি আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিল, এমন একটি পৃথিবী যেখানে কোনো গানের পাখি নেই, আসলেই প্রায় কোনো প্রাকৃতিক জীবনই সেখানে নেই। এটি শুরু হয়েছিল একটি নামহীন ছোট আমেরিকান শহরের বর্ণনা দিয়ে, যা পূর্ণ ভোক্তাদের জন্য সুবিধায়, চোখ ধাঁধানো যন্ত্র আর সস্তা খাদ্যের দোকানে কিন্তু সেখানে কোনো রবিন বা লেডিবার্ড নেই, লার্ক বা কাঠবিড়ালী নেই। একটি পৃথিবী যা স্পষ্টতই মানুষের সুবিধার্থে পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু পরিণতিতে সেটি আর মানুষের পৃথিবী থাকে না। কারসন আমাদের তাগিদ দেন প্রকৃতিকে মুক্তি দিতে। এটিকে এর নিজের মত করে থাকতে দিতে, প্রকৃতি নিজেই এর কীটপতঙ্গদের অতিবংশবৃদ্ধি তার নিজের মত করেই মোকাবেলা করে। কিন্তু যদি মানুষ সেখানে হস্তক্ষেপ করে, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো প্রাণীগোষ্ঠী একপর্যায়ে সব বিষের বিরুদ্ধেই তাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং তারপর খুব দ্রুত এটি আকারে বৃদ্ধি পাবে। কারণ যে কীটগুলো ক্ষতিকর অন্য কীটগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখে তাদের খাদ্যে পরিণত করে, তারাও কীটনাশকের কল্যাণে অজ্ঞাতসারে তারাও মৃত।

তার উপসংহার ছিল যে. বিজ্ঞানীরা ( এবং সাধারণভাবে আধুনিক মানুষরা) প্রকৃতিকে তীব্রভাবেই হিংস্র, জটিল, আর বিশাল কোনো সত্তা – যা মানব কর্মকাণ্ডের পরিণতে পূর্বধারণা করা সম্ভব নয় এমন উপায়ে আচরণ করতে পারে – না ভেবে দার্শনিকভাবে যথেষ্ট অর্বাচীনের মতই ধারণা করেন যে, প্রকৃতি একটি শক্তি, যাকে উপর বল প্রয়োগ করে আমাদের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে মানুষের উচিত আরো বেশী সৃজনশীল উপায়ে ভাবা কিভাবে ক্ষতিকর পোকামাকড় থেকে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি, যেমন, পোকাদের নির্বীজন বা তাদের প্রজনন করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে অথবা ঠিক সেই রাসায়নিক ‘ প্রলোভন’ ব্যবহার করে যা পতঙ্গরা পরস্পরকে ধরার ব্যবহার করে। অথবা কোনো একটি কম্পাঙ্কের শব্দ ব্যবহার করে, যা লার্ভাদের ধ্বংস করবে। মানুষ এবং তার পরিবেশ সংক্রান্ত আরো বড় প্রসঙ্গে, তিনি তারপর তার পাঠকের স্মরণ করিয়ে দেন, প্রকৃতি নিয়ে কোনো কিছু করার আগেই সবসময়ই আমাদের সেটি মূল্যায়ন, শ্রদ্ধা আর এর প্রতি সেই বিস্ময় থাকা দরকার, সেই বোঝাপড়া যে, এটি আসলেই একটি বড় শক্তি, যা মূলত মানব নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং এখনও যা আমরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

তার কাব্যিক লেখার শৈলী, আদি অকৃত্রিম প্রকৃতির প্রতি সমর্থন আর ভালোবাসায়, কারসন, সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক যুগে, ডেভিড হেনরি থরোর একজন উত্তরাসূরী ছিলেন। থরোর মতই কার্সনের কাজ পরিচালিত হয়েছিল পৃথিবী, সমুদ্র আর আকাশের প্রতি তার দায়িত্বশীলতার একটি অনুভূতি থেকে। থরোর মতই, কার্সনও প্রকৃতিকে মনোজাগতিক স্বাস্থ্য আর ্প্রজ্ঞার উৎস হিসাবে দেখেছিলেন। এবং প্রাকৃতিক চক্রগুলো, এর সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলো আর শুধুমাত্র এর সরলতার সাথে আরো ঘনিষ্ঠভাবে তাল মিলিয়ে বাঁচতে শেখার মাধ্যমে, পরিপুষ্ট করার মত একটি প্রজ্ঞার সন্ধান পাবে মানুষ এবং আধুনিক জীবনের মনোজাগতিক অসুখগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিষেধকের মতই যা কাজ করবে।

Silent Spring প্রকাশের দুই বছরের মধ্যেই র‍্যাচেল কার্সন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন । কিন্তু তার কাজ কালোত্তীর্ণ হয়েছিল। বইটি খুব দ্রুত জায়মান পরিবেশ আন্দোলনের উপর এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। ডিডিটি শুধুমাত্র কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণই করা হয়নি, এটি একপর্যায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল (সারা পৃথিবীব্যাপী)। প্রকৃতির নিয়ে কার্সনের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সাধারণ সচেতনার একটি অংশে পরিণত হয়েছিল। আমরা, মূলত তার কল্যাণে, এখন নিজেদের আরো বড় একটি বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসাবে চিন্তা করতে পারি, যা খুব বেশী ভয়ঙ্করভাবে আমাদের কর্মকাণ্ড আর প্রয়োজনের কারণে হুমকির মুখে, এবং সেটির সাথে আমাদের সতর্কতা আর চূড়ান্ত বিনম্রতার সাথে আচরণ করতে হবে।

তিনি প্রদর্শন করেছিলেন, যা হয়তো মনে হতে পারে রহস্যময় একটি প্রযুক্তিগত বিষয় (যেমন, মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের ভুট্টা ক্ষেতে ক্ষতিকর পতঙ্গ নির্মূল কর্মসূচী) , সেটি অবশেষে একটি অধিবিদ্যামূলক এবং নৈতিক একটি বিষয়। হৃদয়ে, পৃথিবীর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমাদের শুধু বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো বোঝাই প্রয়োজনীয় নয় , আমাদের বৈশিষ্ট্যসূচক নৈতিক নির্বুদ্ধিতা আর কল্পনাপ্রবণ অদূরদর্শিতাও বোঝাও প্রয়োজন।

মৃত্যুর পর প্রকাশিত শিশুদের জন্যে লেখা The Sense of Wonder বইয়ে কার্সন তার বিজ্ঞানীর পোষাক গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিলেন এবং খুব সাধারণতম ভাষায় আমাদের সাথে কথা বলেছিলেন, খুব আবেগময় হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বলেছিলেন, কিভাবে এই নীল মাদারশিপ, যা আমাদের প্রতিপালন করছে, সেটিকে ভালোবাসতে হয়: ”এক ঝড়ো হাওয়ার হেমন্ত দিনে, যখন আমার ভাগ্নি বিশ মাস বয়সের রজারকে ভালো করে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে কোলে করে নিয়ে আমি বেলাভূমিতে গিয়েছিলাম বৃষ্টিস্নাত অন্ধকারে। ওখানে, তখন কোনোকিছু-দেখতে-পারছিলাম-না এমন অন্ধকারে, বড় ঢেউগুলো বজ্রপাতের মত আছড়ে পড়েছিল, অস্পষ্টভাবে দেখা সাদা সেই রুপগুলো যা প্রচণ্ড শব্দ করে চিৎকার করে আমাদের দিকে মুঠো মুঠো ফেনা ছুড়ে দিয়েছিল। আমরা বিশুদ্ধ আনন্দে দুজনেই হেসেছিলাম – সে একজন শিশু, যে প্রথমবারের সাগরের বন্য উন্মাদনার সাথে পরিচিত হলো, আর সমুদ্রের প্রতি অর্ধজীবনের ভালোবাসা অন্তরে নিয়ে আমি। কিন্তু আমি মনে করি আমরা দুজনেই এই বিশাল, গর্জনরত সমুদ্র আর আমাদের চারপাশে বন্য রাত্রি দেখে শিরদাড়ায় শিহরণ জাগানো সেই একই প্রতিক্রিয়াই অনুভব করেছিলাম।”

হয়তো এটিই ছিল তার সবচেয়ে বেশী বৈপ্লবিক একটি ধারণা: অপরাধবোধ নয় বরং ভালোবাসা, পরিবেশের সাথে মানবতার সম্পর্কের প্রকৃতিটি চিরন্তনভাবে রুপান্তরের জন্যে এটাই মূল চালিকা শক্তি।


(**(গ্রেট থিংকার্স থেকে পরীক্ষামূলকভাবে))

র‍্যাচেল কার্সন – নীরব বসন্তের পাখি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s