ডা. সমার এবং ভিটামিন এ

ডা. আলফ্রেড সমার আবিষ্কার করেছিলেন শরীরে ‘এ’ ভিটামিনের ঘাটতি শিশুদের মৃত্যু ও তাদের অসুস্থতার হার বৃদ্ধিতে নাটকীয় একটি প্রভাব রাখতে পারে। সমার তার গবেষণায় দেখিয়েছিলেন যদি শিশুদের, বিশেষ করে যারা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বাস করে, তাদের যদি বছরে দুইবার ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো যায় তাহলে শিশু মৃত্যু এবং অন্ধত্বের হার ব্যাপকভাবেই কমানো যেতে পারে ( প্রায় ৩৪ শতাংশ)। ধারণা করা হয় সমারের এই আবিষ্কার এবং চিকিৎসা প্রায় ১২ মিলিয়ন শিশুকে অসময়ে মৃত্যুর হার থেকে বাঁচিয়েছে এবং এটি এখনও প্রতি বছরই বহু লক্ষ জীবন বাঁচানো অব্যাহত রেখেছে।


১৯৪২ সালের ২ অক্টোবর আলফ্রেড সমার নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহন করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল থেকে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক হয়েছিলেন। ডাক্তারী পাশ করার পর দুই বছরের ইন্টার্নশীপ শেষে ১৯৬৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের এপিডেমিক ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসে যোগ দেন এবং কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরীতে (তখন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে এটি আইসিডিআরবি) যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। তার প্রথম রোগতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ছিল ১৯৭০ সালের বাংলাদেশের সেই ভয়াবহ সাইক্লোন, যা সিকি মিলিয়ন মানুষকে এক রাতেই ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি আমাদের স্বাধীনতারও মিত্র ছিলেন, ২০১৩ সালে তাকে Friends of Liberation War Honour প্রদান করেছিল বাংলাদেশ সরকার।


১৯৭২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসেছিলেন, রোগতত্ত্ব ছাড়াও তিনি চক্ষু বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষ করেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর ১৯৭৬ সালে জন হপকিন্সের উইলমার আই ইন্সস্টিটিউটে কাজ শুরু করেন। এখানে থাকতেই তিনি ভিটামিন ‘এ’ অভাবের কারণ এবং এর অভাবজনিত প্রভাবগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।


১৯৭৬ সালে বিষয়টি আরো গভীরভাবে আর কাছ থেকে অনুসন্ধান করতে তিনি বাল্টিমোর থেকে ইন্দোনেশিয়ায় আসেন, ইন্দোনেশিয়ার পাডজাডজারান বিশ্ববিদ্যালয়ে চক্ষুরোগের অধ্যাপক হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। তার সহকর্মীরা তাকে সবাই বাল্টিমোর থেকে ইন্দোনেশিয়া যেতে নিষেধ করেছিলেন কারণ এমন কিছু তার পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে তিনি তাদের উপদেশ অগ্রাহ্য করেছিলেন। মানবতার জন্যে এই মুহূর্তটি ছিল খুব সৌভাগ্যের। এখানেই খুব শীঘ্রই তিনি আবিষ্কার করেন যে ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের মধ্যে প্রতিষেধযোগ্য অন্ধত্বের প্রধান কারণ। এছাড়াও তিনি আবিষ্কার করেন যে ভিটামিন এ’র অভাব শিশু মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে সংক্রামক ব্যধির বিরুদ্ধে শিশুদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেবার মাধ্যমে। আর এই আবিষ্কারগুলোর পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন খুব সস্তায় এবং কার্যকরভাবে এই ভিটামিনটির ঘাটতি পূরণ সম্ভব হতে পারে বছরে দুইবার উচ্চমাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট মুখে খাওয়ানোর মাধ্যমে।


আর ভিটামিন ‘এ’র গুরুত্ব বৈজ্ঞানিক সমাজকে বোঝাতে, সমার ও তার সহকর্মীরা বেশ কয়েকটি গবেষণা পরিচালন করেছিলেন, এবং পরে তিনি ইটালীতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। এই সম্মেলনে বিজ্ঞাীরা উপসংহারে পৌছেছিলেন যে, বছরে দুইবার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের ব্যবহার এই ভিটামিনের অভাবে ভুগছে এমন শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৩৪ শতাংশ কমানো সম্ভব হতে পারে এবং যা প্রতি বছর এক মিলিয়ন শিশুকে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করা সম্ভব। একইভাবে এর কিছুদিন পর নেপালে একটি গবেষষণায় প্রমাণ মেলে যে, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট যদি সন্তানধারণযোগ্য নারীদের দেয়া যায়, সেটি এমনকি মাতৃ-মৃত্যুর হারও কমাতে পারে ৪৫ শতাংশ। আর বছরে দুই বার এমন কোনো স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনা যেহেতু খুবই ব্যয়সাশ্রয়ী এবং সহজ, এটিকে স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী একটি স্বাস্থ্য-সেবা কর্মসূচি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।


১৯৮০ সালে তিনি জন হপকিন্স উইলমার আই ইন্সস্টিটিউটে ডানা সেন্টার ফর প্রিভেন্টিভ অপথ্যালমোলজির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসাবে ফিরে আসেন। পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্যে অবদানের জন্য তিনি বহু সন্মানজনক পুরষ্কারে পুরষ্কৃত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড হাইজিনে এপিডেমিলজি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হেলথের অধ্যাপক এবং ডিন এমিরেটাস।

ডা. সমার এবং ভিটামিন এ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s