আইজাইয়া বার্লিনের স্বাধীনতা

Everything is what it is: liberty is liberty, not equality or fairness or justice or culture, or human happiness or a quiet conscience..

(গ্রেট থিংকার্স সিরিজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কাজী মাহবুব হাসান)

Political theorist and historian of ideas Isaiah Berlin on Oct. 23, 1992. (Sophie Bassouls/Sygma via Getty Images)

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম একজন সেরা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, কুটনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিক স্যার আইজাইয়া বার্লিন ১৯০৯ সালের ৬ জুন জন্মগ্রহন করেছিলে রিগা-লাটভিয়ায় (তখন সেটি রুশ সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল) একটি বিত্তশালী রুশ- ইহুদী পরিবারে । তার পরিবারটি বাল্টিক অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ টিম্বার কোম্পানী নিয়ন্ত্রণ করতো। রুশ বিপ্লেবের পরে পরিবারটি ইংল্যান্ডে বসতি গড়েছিল। পরে তিনি অক্সফোর্ডে পড়াশুনা করেছিলেন। তাকে বলা হয় ইনটেলেকচুলায় হিস্টরী বা হিস্ট্রি অব আইডিয়া ক্ষেত্রটির জনক। যে ক্ষেত্রটির মূল বিষয়টি হচ্ছে, ধারণাগুলো একক বা বিচ্ছিন্নভাবে সৃষ্টি হয়না মানষ থেকে যারা এটি বিকশিত করেন এবং ব্যবহার করেন, আর সেকারণে কোনো একটি ধারণাকে শুধুমাত্র বিমূর্ত কোনো প্রস্তাব হিসাবে না ভেবে সেটিকে এর সংস্কৃতি, জীবন আর ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতায় বিচার করতে হবে। বার্লিন বিশেষভাবে পরিচিত ১৯৫৮ সালে অক্সফোর্ডে দেয়া একটি লেকচার, Two Concepts of Liberty, তিনি এখানে রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে অ্যানালাইটিক দর্শনের পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ভাষা দর্শনে তার দক্ষতাই তাকে প্ররোচিত করেছিল রাজনৈতিক শব্দগুলো সম্বন্ধে আমাদের বোঝাপড়ার সূক্ষ্ম বিষয়গুলো যাচাই করে দেখতে। সাধারণ রাজনৈতিক সংজ্ঞায় যে শব্দগুলোকে মনে হয় একটি একক ধারণা হিসাবে আসলে সেগুলো বহু ব্যবহারযোগ্য বহুত্ববাদ এবং সেই সাথে নানা অর্থ ধারণ করে। যেমন, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, দুটি ধারণা, নেগেটিভ ফ্রিডম বা কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা, আর পজিটিভ ফ্রিডম, অথবা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা, যা জিজ্ঞাসা করে না যে আমরা কি থেকে স্বাধীন বরং আমরা কি করতে স্বাধীন। বার্লিন বলেন এ্‌ই দু্টি ভিন্ন ধারণা পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক।

স্বাধীনতা খুবই শক্তিশালী একটি শব্দ। আমরা প্রায় সবাই ইতিবাচকভাবে এই শব্দটির প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করি, এবং এই স্বাধীনতার পতাকাতলে বিপ্লবের সূচনা হয়ছে, বহু যুদ্ধ লড়া হয়েছে, নিরন্তর এটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চলেছে, কিন্তু স্বাধীনতা শব্দটি দিয়ে আসলেই আমরা কি বোঝাতে চাই? আর একটি বাস্তবতা হচ্ছে সব ধরনের রাজনীতিবিদদের আমরা যখন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন বলে দাবী করতে শুনি, সেটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে, আসলে যখন আমরা এই বিষয়টি কথা বলি, সবার মনে আসলে এটি সম্বন্ধে সবসময় একই ধরনের ধারণার উপস্থিতি থাকে না। তাহলে কি বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতা হতে পারে? আর যদি তাই হয়, এই ভিন্ন ধরনের স্বাধীনতাগুলো কি পারস্পরিক সংঘর্ষে জড়াতে পারে? এক ধরনের স্বাধীনতার সমর্থন কি অন্য ধরনের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে? এমনকি মানুষকে স্বাধীনতার নামে তাহলে কোনো কিছু করতে বাধ্যও করা যেতে পারে?

বিংশ শতাব্দীর রুশ-ইংলিশ রাজনৈতিক দার্শনিক আইজা্ইয়া বার্লিন (১৯০৯-১৯৯৭) ভেবেছিলেন এই সব প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’। ১৯৫৮ সালে ‘টু কনসেপ্ট অব লিবার্টি’ (১৯৫৮) শীর্ষক তার একটি প্রবন্ধে দুই ধরনের স্বাধীনতার মধ্যে তিনি পার্থক্য করেছিলেন ( ফ্রিডম ,এখানে যেটি আমি স্বাধীনতা হিসাবে উল্লেখ করছি অথবা ‘লিবার্টি’, দুটো শব্দই তিনি পরস্পর পরিবর্তনীয় হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন), যাদের তিনি নাম দিয়েছিলেন নেগেটিভ ফ্রিডম আর পজিটিভ ফ্রিডম ( নেগেটিভ স্বাধীনতা আর পজিটিভ স্বাধীনতা)। নেগেটিভ ফ্রিডম বা স্বাধীনতা হচ্ছে অনাহূত বা অন্যদের অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা। আপনি নেগেটিভভাবে স্বাধীন সেই পর্যায় অবধি, যতদূর অবধি অন্য কেউ ব(বা অন্যরা) আপনি কি করতে পারবেন সেখানে কোনো সীমাবদ্ধ আরোপ করছে না। যদি অন্যরা কিছু করতে আপনাকে বাধা দেয়, প্রত্যক্ষভাবে তারা যা করে তার মাধ্যমে অথবা পরোক্ষভাবে সেই সামাজিক আর অর্থনৈতিক বন্দোবস্তকে সমর্থন করে যা আপনার জন্যে প্রতিকূল। তাহলে যে পর্যায় অবধি অন্যরা তাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করে, বার্লিন জোর দিয়েছিলেন, শুধুমাত্র অন্য মানুষ যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সেটাই কারো স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। প্রাকৃতিক কোনো কারণ কিন্তু এখানে বিবেচ্য নয়। আমি নিজে চাইলে শূন্যে ভাসতে হতে পারবোনা, সেটি ভৌত সীমাবদ্ধতা কিন্তু এটি আমার স্বাধীনতার জন্যে প্রতিবন্ধকতা নয়।

কার্যত সবাই একমত যে নেগেটিভ স্বাধীনতার উপর খানিকটা সীমাবদ্ধতা আমাদের অবশ্যই মেনে নিতে হবে, যদি আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে চাই। সব রাষ্ট্রেরই প্রয়োজন যেন তাদের নাগরিকরা আইন ও নিয়ম অনুসরণ করে, যা পরিকল্পিত হয়েছে যেন সবাই সমাজে একসাথে বসবাস করতে পারে এবং সমাজ মসৃণভাবে পরিচালিত হয়। আমরা আমাদের স্বাধীনতার উপর এইসব সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেই অন্য সুবিধাগুলোর একটি ‘বিনিময়-মূল্য’ হিসাবে, যেমন, শান্তি, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ইত্যাদি। একই সাথে আমরা অনেকেই দাবী করি প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু কিছু এলাকা আছে যেখানে কারো (সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের) নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়, যেখানে প্রত্যেকেরই যথেষ্ট পরিমান, যদি পূর্ণ নাও হয়. স্বাধীনতা থাকা উচিত। রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের একটি বিষয় মূলত এই ব্যক্তিগত নেগেটিভ স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সীমানা কি হওয়া উচিত সেটি নিয়ে। যেমন, রাষ্ট্র কি এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, কোন বইটি আমরা পড়তে পারবো আর কোনটি পারবো না অথবা আমাদের যৌনজীবন কেমন হওয়া উচিত ইত্যাদি বিষয়ে?
যখন নেগেটিভ স্বাধীনতা হচ্ছে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকার স্বাধীনতা, তখন পজিটিভ স্বাধীনতা হচ্ছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধীনতা। পজিটিভলি স্বাধীন হওয়া মানে নিজের ”মনিব” হওয়া, যৌক্তিকভাবে আচরণ করা এবং নিজের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নির্বাচন ও সিদ্ধান্তের ব্যপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া। এটি মনে হতে পারে নেগেটিভ স্বাধীনতার বিপরীত কোনো কিছু, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি সেই মাত্রায় যেন অন্য কেউ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। তবে, পজিটিভ আর নেগেটিভ স্বাধীনতার মধ্যে একটি ফাটল বের করা যেতে পারে, যেমন, একজন ব্যক্তির হয়তো আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অভাব আছে এমন কি যখন তাকে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না। ভাবুন, যেমন, একজন মাদকাসক্ত যে তার আসক্তি ছাড়তে পারছে না, যা তাকে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে অবশ্যই পজিটিভভাবে স্বাধীন নয় ( অর্থাৎ তার আচরণ যৌক্তিক নয়, তার নিজের ভালোর জন্যে যা করা উচিত সেটি কিন্তু সে করছে না) এমনকি যদিও তার নেগেটিভ স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হচ্ছে না ( কেউ তাকে মাদক নিতে বাধ্য করছে না)। এইসব পরিস্থিতিতে, বার্লিন লিখেছিলেন, খুব স্বাভাবিক কোনো কিছুর দুটি সত্তা ( সেলফ) আছে এমন কিছু ভাবা, একটি নীচু সত্তা, যা অযৌক্তিক,আবেগপ্রবৃত্ত এবং আরেকটি উচ্চ সত্তা, যা যৌক্তিক এবং দূরদর্শী।

আর প্রস্তাবনাটি হচ্ছে যে একজন ব্যক্তি পজিটিভভাবে স্বাধীন শুধুমাত্র যখন তার উচ্চ সত্তাটি প্রাধান্য বিস্তার করে। যদি এটি সঠিক হয়, তাহলে আমরা হয়তো কোনো একজন ব্যক্তিকে আরো স্বাধীন করে তুলতে পারবো তার উপর চাপ প্রয়োগ করে। আমরা যদি কোনো মাদকাসক্তকে মাদক নেয়া থেকে দূরে রাখতে পারি, আমরা হয়তো তার উচ্চতর সত্তাকে সহায়তা করতে পারি তার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে। তার নেগেটিভ স্বাধীনতাকে সীমিত করে, আমরা তার পজিটিভ স্বাধীনতাকে বাড়াতে পারি। আর এখানে কিন্তু খুব সহজে একটি বিষয় অনুধাবন করতে পারি, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীকে খুব সহজেই অপব্যবহার করা যেতে পারে নানা ধরনের ক্ষতিকর, বিভ্রান্তিমূলক হস্তক্ষেপ আর পদক্ষেপ নেবার মাধ্যমে। বার্লিন যুক্তি দিয়েছিলেন, পজিটিভ আর নেগেটিভ স্বাধীনতার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটি, এবং এটি অপব্যবহারের ঝুকি আরো বেড়ে যায় যদি আমরা উচ্চ সত্তাকে কোনো একটি সামাজিক গোষ্ঠীর পরিচয় হিসাবে স্বীকৃতি দেই (একটি গোত্র, বর্ণ, একটি চার্চ, একটি রাষ্ট্র)। কারণ তাহলে হয়তো আমরা সেই উপসংহারে পৌছাবো যে প্রতিটি ব্যাক্তি স্বাধীন যখন একটি গোষ্ঠী একক ব্যক্তির কামনাকে দমন করে রাখে ( যা উদ্ভুত হয় নীচু, অসামাজিক সত্তা থেকে), এবং এটি এর ইচ্ছা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়। আর এই দিক পরিবর্তনের যে বিষয়টি বার্লিনকে বিশেষভাবে চিন্তিত করেছিল সেটি হচ্ছে এটি একক ব্যক্তির উপর নির্যাতন বা জোরপূর্বক কিছু করতে বাধ্য করার বিষয়টিকে যুক্তিযুক্ত করে, আর সেটি শুধুমাত্র সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসাবে নয়, যেমন, নিরাপত্তা আর সহযোগিতা, বরং সেই ব্যক্তিদের নিজেদের স্বাধীন করার একটি উপায় হিসাবে।

এই জোর করার বিষয়টি আসলেই জোর করার মত কোনো বিষয় হিসাবে দেখা হয়না, বরং দেখা হয় মুক্ত করা হচ্ছে এমন একটি হস্তক্ষেপ হিসাবে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদকে বাতিল করে দেয়া হয় নীচু সত্তার একটি অভিব্যক্তি হিসাবে, যেমন, মাদকের জন্যে আসক্তির তীব্র তৃষ্ণা। বার্লিন এটিকে বলেছিলেন, ”মনস্ট্রাস ইমপারসোনেশন” ( ভয়ঙ্কর ছদ্মবেশিতা) । ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের যা সুযোগ দেয়, মানুষ এবং সমাজের সত্যিকার ইচ্ছাগুলো অবজ্ঞা করতে, তাদের উপর জোর খাটাতে, নির্যাতন করতে তাদের ‘আসল’ সত্তার নামে এবং সেটি পক্ষ হয়ে। জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস নাইনটিন এইটি ফোরের (১৯৪৯) কথা হয়তো এটি স্মরণ করিয়ে দেবে, যা দেখিয়েছিল কিভাবে একটি স্ট্যালিনবাদী রাজনৈতিক দল, সত্য সম্বন্ধে এর নিজস্ব ধারণা ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেয়, দলের নেতাকে ভালোবাসতে তাকে স্বাধীন করার মাধ্যমে)। নাৎসি জার্মানীর এবং স্ট্যালিনবাদী রাশিয়ার কতৃত্ববাদী সরকারগুলো কিভাবে স্বাধীনতার ধারণাকে অপব্যবহার করেছিল সেই বিষয়ে বার্লিন ভেবেছিলেন । আর তিনি সঠিক ছিলেন এধরনের চিন্তা করার প্রক্রিয়াগুলোর বিপদ সবার নজরে এনে।

কিন্তু এর মানে এই না পজিটিভ স্বাধীনতার প্রবর্ধন সবসময়ই ভুল। বার্লিন নিজেও এমন কোনো দাবী করেননি, এবং তিনি লক্ষ করেছিলেন যে নেগেটিভ স্বাধীনতাকেও ঠিক একইভাবে অপব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু মানুষের হয়তো আসলে সাহায্য লাগতে পারে বুঝতে, তাদের নিজেদের জন্যে কোনটি ভালো পদক্ষেপ এবং কিভাবে তারা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগতে পারবেন। এবং আমরা এমনকি বিশ্বাসও করতে পারি যে, তাদের সেটি করতে সহায়তা করা রাষ্ট্রেরও একটি দায়িত্ব হতে পারে। আর আসলেই, বাধ্যতামূলক শিক্ষার নেপথ্যে এটাই প্রধান যুক্তি। আমাদের অবশ্যই দরকার আছে যে শিশুরা স্কুলে যাবে ( তাদের নেগেটিভ স্বাধীনতাকে যা খুব কঠেোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে) কারণ আমরা বিশ্বাস করি স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি আসলেই তাদের নিজেদের জন্যেই প্রয়োজনীয়। শিশুরা নিজেরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে এমন একটি কোনো পরিস্থিতিতে ছেড়ে দেয়া, তর্কসাপেক্ষ, অবহেলা আর নির্যাতনের সমতুল্য। প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রেও, এমনকি যুক্তি দেয়া যায় যে, এর নাগরিকদের একটি সমৃদ্ধ আর পরিপূর্ণ জীবন কাটাতে সহায়তা করা রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব। আর এই ধরনের সহায়তা বিশেষভাবে জরুরী মুক্তবাজার অর্থনীতির সমাজগুলোয়,যেখানে, বিজ্ঞাপনদাতারা বিরতিহীনভাবে নীচু সত্তার চাহিদা মেটাতে আমাদের প্রলোভিত করে যাচ্ছে)। এছাড়াও হতে পারে যে কিছু মানুষ তাদের জীবনের অর্থ আর লক্ষ্য খুজে পায় আরো ব্যপক কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে, যেমন, নারীবাদ, আর তাদের সেটি করতে সহায়তা করে আমরা তাদের নিজেদের মুক্ত করতে সহায়তা করি।

অবশ্যই এইসব আরো বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আসলেই কাজ করে শিশুদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে অথবা একটি তাদের গড়ে পিটে এমন একটি রুপে তৈরী করে, যা সামাজিক আর অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী। কে তাহলে সিদ্ধান্ত নেবে কোনটি সমৃদ্ধ আর পরিপূর্ণ জীবন? কিভাবে কোনো রাষ্ট্র বৈধ উপায়ে অন্য মানুষদের সহায়তা করতে পারে ভালো একটি জীবন কাটাতে? আসলেই কি জোর করে কোনো কিছু করতে বাধ্য করা গ্রহনযোগ্য হতে পারে কোনো সময়? এইসব প্রশ্নগুলো আসলেই আমরা কোন ধরনের সমাজে বাস করতে চাই সেই বিষয়ে, এবং কোনো সহজ উত্তরও নেই এই প্রশ্নগুলোর। কিন্তু নেগেটিভ আর পজিটিভ স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য কি, এটি বুঝতে দেবার মাধ্যমে বার্লিন আমাদের একটি শক্তিশালী উপায় দিয়ে গেছেন এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার জন্যে।

আইজাইয়া বার্লিনের স্বাধীনতা

পল ভ্যান হয়ডঙ্ক ও নিঃসঙ্গ নভোচারী

(কাজী মাহবুব হাসান | আসমা সুলতানা )

কল্পনা করুন আপনি একজন শিল্পী আর আপনার শিল্পকর্মটি সত্যিকারভাবে ‘আউট অব দিস ওয়ার্ল্ড’ অর্থাৎ পৃথিবীর বাইরে কোনো উন্মুক্ত গ্যালারীতে প্রদর্শিত হচ্ছে, শুধুমাত্র একটি শিল্পকর্মই সেখানে আছে, অবশ্য আক্ষেপও আছে, কারণ গ্যালারীটি দর্শকশূন্য ( নাকি দর্শক আছে !)। মধ্যযুগীয় নাইটদের সাহসী অভিযান আর রুশ-মার্কিন শীতল-যুদ্ধ চলাকালীন মহাশূন্য জয়ের প্রতিযোগিতায় নভোচারীদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সমন্বয় সৃষ্টির করার ভাবনার বেলজিয়ান শিল্পী পল ভ্যান হয়ডঙ্ক হচ্ছেন আপাতত পৃথিবীতে এমনই একমাত্র শিল্পী, এবং তার আক্ষেপের কারণ বেশ বিস্তারিত। চাঁদের ধুলায় শুয়ে আছে নিঃসঙ্গ নভোচারী, ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, প্রায় সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের ছোট এই ভাস্কর্যটি সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পী পল ভ্যান হয়ডঙ্ক।

১৯৬৯ সালের মার্চের এক সকালে শিল্পী হয়ডঙ্ক ম্যানহাটানে তার গ্যালারীতে গিয়েছিলেন, গ্যালারী ডিরেক্টর লুইস ডয়েসম্যান, আর ম্যালিক ডিক ওয়াডলের মধ্যে চলমান বিস্ময়কর একটি কথোপকথনের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। ”কেন আমরা পলের একটি ভাস্কর্য চাঁদে প্রতিস্থাপন করছি না?” লুইসের আজব এই প্রশ্নের ওয়াডেলের উত্তর দেবার আগেই হয়ডঙ্ক এই কথোপকথনে প্রবেশ করে মন্তব্য করেছিলেন, ”তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে’? কিভাবে আমরা সেই কাজটি করবো?” ডয়েসম্যান তার অবস্থানে অটল থেকেই বলেন, ”আমি জানিনা, তবে একটা উপায় আমি বের করবো”। এবং তিনি আসলেই সেটি করেছিলেন। ১৯৭১ সালে অগাস্ট মাসের ২ তারিখ, গ্রিনিচ স্ট্যান্ডার্ড সময় ১২:১৮ য় অ্যাপোলো -১৫ কম্যান্ডার স্কট সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা আলুমিনিয়ামের একটি ভাস্কর্য তার পার্ক করা ল্যুনার রোভারে কাছে ধূলার উপর শুইয়ে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে চাঁদ বাতাসহীন একটি পাথর খণ্ড থেকে রুপান্তরিত হয়েছিল আমাদের জানা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী স্থলে। স্কট সেই মুহূর্তটিকে মহাশূন্য অভিযানের প্রতিযোগিতায় জীবন বিসর্জন দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ বীর নভোচারীদের প্রতি একটি নিবেদন হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। ভাস্কর্যটির সাথে ছিল একটি ফলক, যেখানে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি মোট চৌদ্দজন ( আটজন যুক্তরাষ্ট্রের আর ছয় জন রুশ নভোচারী) নিহত নভোচারীর নাম লেখা ছিল।

আর ভ্যান হয়ডঙ্ক শিহরিত হয়েছিলেন তার শিল্পকলা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মানব-নিয়তির নতুন সূচনার দিক নির্দেশ করছে, এবং আশা করেছিলেন তিনি খুব শীঘ্রই ”পিকাসোর চেয়ে আরো বড়” কিছুতে পরিণত হবেন। কিন্তু বাস্তবে তার চাঁদের ভাস্কর্যটি, ফলেন অ্যাস্ট্রোনট, উচ্ছাস নয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে ওয়াডেল গ্যালারী বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। নাসা ছাড়তে হয় নভোচারী স্কটকে। জনগনের প্রকল্প থেকে ব্যবসা করে লাভবান হবার জন্যে হয়ডঙ্ককে অভিযুক্ত করা হয়, যিনি তার জন্মস্থান বেলজিয়ামে স্বল্প পরিচিত একটি শিল্পী জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন । প্রায় বিস্মরিত একটি ভাস্কর্য আর তিরষ্কৃত আশির দশকের এই শিল্পী এখনও ভাবেন তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমাদের মাথার উপর ২৩৮০০০ মাইল উঁচুতে এখনও ফলেন অ্যাস্ট্রোনট আমাদের নক্ষত্র ছোয়ার স্বপ্নকে ধারণ করে শুয়ে আছে। হয়ডঙ্ক অবশ্য অতীতে বেঁচে থাকেননি। অ্যান্টওয়ার্পের কাছে একটি শহরতলীতে তিনি তার কাজ অব্যহত রেখেছিলেন, এবং তার শিল্পকর্মে মহাশূন্য, গ্রহ, নক্ষত্র আর নভোচারী চিরন্তন থিমটি তিনি অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।

১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কে একবার বেড়াতে আসার পর তিনি ওয়াডেল গ্যালারীর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে বেলজিয়ামে তিনি তার প্রথম স্পেস থিম একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন, জুল ভার্নের প্রতি মুগ্ধতা, আর্ট অ্যাকাডেমির স্থবিরতার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেই তিনি মহাশূন্য অভিযানের থিমে ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে নিউ ইয়র্কের ওয়াডেল গ্যালারীতে প্রথম প্রদর্শনীতে তার আর্টিস্ট স্টেটমেন্ট ঘোষণা করেছিল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক জায়গা হচ্ছে কেপ কেনেডি’। আর মহাশূন্য নিয়ে তার এই উন্মাদনাই ডয়েসম্যানকে উচ্চাভিলাষী সেই মন্তব্যটি করার জন্যে উদ্দীপ্ত করেছিল। তার প্রাথমিক অবিশ্বাসের পর, খুব সহজে তাকে রাজী করানো সম্ভব হয়েছিল এবং এক মাসের মধ্য তিনি সম্ভাব্য চাঁদের ভাস্কর্যটির কনসেপ্ট ড্রইং করতে শুরু করেন।

ধারণাটি মূলত ছিল প্রাক্তন বিজ্ঞাপন-বিপনন কর্মী ও গ্যালারি পরিচালক লুইস ডয়েসম্যানের, তিনি বিশ্বাস করতেন চাঁদে শুধু ভাস্কর্যই স্থাপন করা যাবে না, এটি আবশ্যিকও, তার স্মৃতিকথায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তখন স্পেস-এজ, নক্ষত্রে যাবার প্রতিযোগিতা চলছে, আমি বহু মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করি, কিন্তু একটি উপায় খুঁজে না পাওয়া অবধি আমি থামিনি’। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু ঘটনা এবং একজন মধ্যস্তকারীর সহায়তা হয়ডঙ্ক ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে নিজেকে নভোচারী ডেভিড স্কট ও তার সহকর্মীদের সাথে এক টেবিলে বসে নৈশভোজ করতে আবিষ্কার করেছিলেন। তখনও অ্যাপোলো ১৫ র মিশন শুরু হতে আট সপ্তাহ বাকী। স্পষ্টতই স্কট আর হয়ডঙ্কের পছন্দের কিছু বিষয় মিলেছিল, যেমন, প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা আর মধ্য-আমেরিকার মায়াদের পূরাণ, এবং একটি পর্যায়ে স্কট তার সহকর্মীদের জানান, ‘দেখো, এই ভদ্রলোক কি বলছেন, আসো, আমরা ওর একটা ভাস্কর্য চাঁদে নিয়ে যাই’।

হয়ডঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরেই কাজে লেগে যান, তার ছেলে শিল্পী প্যাট্রিককে নিয়ে একটি প্লাস্টার আর প্লেক্সিগ্লাসের মডেল তৈরী করে ফেলেন, মানব-ভবিষ্যৎ যার বিষয়। কিন্তু হয়ডঙ্কের ভবিষ্যতবাদী নান্দনিকতা আর স্কটের গম্ভীর দার্শনিক উদ্দেশ্য সমন্বয় করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি বেশ কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। শিল্পী হিসাবে তিনি একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, তিনি তার শিল্পকর্মের মূলভাবনায় রেখেছিলে মহাশূন্য অভিযাত্রীদের ঐতিহাসিক সেই যাত্রার উত্তেজনা আর বীরোচিত সাহস, ‘আমাদের সন্তানদের কাছে তারা হয়তো স্বাভাবিক, তবে তামাদের পৌত্রদের কাছে তারা পুরাণের চরিত্র’। কিন্তু স্কট ও তার সহযাত্রীরা ভেবেছিলেন আরো ব্যক্তিগত স্মারকসূচক কোনো কিছু হবে সেই শিল্পকর্মটি, ‘আমরা একমত হয়েছিলাম আমাদের সেইসব সহকর্মীদের সন্মান জানাতে, যারা মহাশূন্য অভিযানের প্রচেষ্টায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন, এই তালিকায় আমাদের সোভিয়েত সহকর্মীদেরও আমরা স্মরণ করতে চেয়েছিলাম’। তখন শীতল যুদ্ধের সময়, এটি অবশ্যই লক্ষণীয় একটি সিদ্ধান্ত, বিশেষ রুশ-মার্কিন মহাশূন্য জয়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার সময়।
লুনার মডিউলে নভোচারীরা কি সাথে নিতে পারবেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। এছাড়া এমন উপাদানে সেই ভাস্কর্যটি বানাতে হবে, যেন সেটি চাঁদে টিকে থাকার মত যথেষ্ট শক্তিশালী হবে, যেখানে দিনের তাপমাত্রা প্রায় ২৫০ ডিগ্রী স্পর্শ করে আর রাতে যা নেমে যায় শূন্যের ২৫০ ডিগ্রী নীচে। হয়ডঙ্ক এই নন্দনতাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে ব্রুকলিনের একটি ঢালাই প্রতিষ্ঠান, মিলগো/বাফকিনের সাথে যোগাযোগ করেন । ভাস্কর্যটিকে অবশ্যই আকারে ছোটো হতে হবে, এবং স্কটের নির্দেশ অনুযায়ী এটি যেন বিশেষ কোনো জাতি বা বর্ণ এবং লিঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব না করে, যা তাপমাত্রার চরম তারতম্য সহ্য করতে পারবে। সুতরাং হয়ডঙ্ককে এমন কিছু ডিজাইন করতে হবে যেখানে তার অতীতমূখী ভবিষ্যতবাদ আর আধ্যাত্মিক প্রকটতা, যা তার অন্য ভাস্কর্যে বৈশিষ্ট্যসূচক, মূলত এই প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়ে যাবে। ‘আমি এর চেয়ে ভালো কাজ করেছি, এটি সেরা ভ্যান হয়ডঙ্ক নয়’। ব্রুস গিটিনের বানানো ছাঁচে অবশেষে তৈরী হয় মানবসদৃশ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, যার নির্মাণ উপাদান ছিল অ্যালুমিনিয়াম, কারণ এটিকে শক্তিশালী, আর হালকা হতে হবে। শিল্পী চেয়েছিলেন তার এই অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষুদ্র মূর্তিটি সোজা হয়ে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে।



অ্যাপোলো ১৫ যাত্রা শুরু হবার কথা ছিল জুলাই ২৬ তারিখে (১৯৭১)। ৮১ বছর বয়সে যখন তাকে স্মরণ করতে বলা হয় কিভাবে বিশাল একটি নিবেদিত টিমের কড়া নজরদারীর মধ্যে স্কট মূর্তিটিকে গোপনে চাঁদ অবধি নিয়েগিয়েছেন, তিনি স্বীকার করেছিলেন, বিষয়টি তার তার নিজেরই মনে নেই। কিন্তু চাঁদেরযেদিন তিনি পা দিয়েছিলেন তিনি জানতেন তার পকেটে মূর্তিটি আছে। জুলাই ৩০ তারিখে তাদের লুনার মডিউলটি চাঁদে নেমেছিল, স্কট এবং আরইউন সেখানে ৩ দিন কাটান। টান টান নিয়মবদ্ধ সময়ের হিসাবে তারা তাদের কাজগুলো সম্পাদন করেন।

একেবারের শেষ মূহূর্তে তিনি ফলেন অ্যাষ্ট্রোনেটের জন্য সময় বের করেছিলেন, এবং সেটির একটি ছবি তুলেছিলেন। আর তখনও পর্যন্ত কারোরই সেটি অস্তিত্ব জানা ছিলনা। নিয়মমাফিক পুরো চাঁদ অভিযানে তারা ১১০০ ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে হিউস্টনের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে মনোযোগ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন আরউইন আর স্কট ফলেন অ্যাস্ট্রোনটকে চাঁদের প্রথম নাগরিক হিসাবে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি তার পকেট থেকে মূর্তিটি বের করেন, চাঁদের ধুলোর উপর সরাসরি সেটি স্থাপন করেন, এর পাশে সেই স্মারক ফলকটি রাখেন যেখানে মৃত নভোচারীদের নামের একটি তালিকা ছিল। নিজের ধর্মবিশ্বাসকে তিনি প্রকাশ করেননি, তবে স্কট আধ্যাত্মিকভাবে তার এই নিবেদনটিকে একটি নীরব অন্তেষ্টিক্রিয়া হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। সামান্য একটি মিনিট, তারপর আবার দ্রুত তারা তাদের রুটিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর পাঁচ ঘন্টা পর লুনার মডিউল চাঁদকে পেছনে ফেলে চলে যায় অরবিটিং মডিউলের সাথে যুক্ত হবার জন্যে। তাকে সেই মুহূর্তটি, যখন তিনি প্রথম শিল্পকলাটিকে চাঁদে মাটিতে রেখেছিলেন, যখন মনে করতে বলা হয়েছিল, তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, যেন আমরা ভুলে না যাই কেন আমরা সেটি সেখানে রেখেছিলাম।

এটি ভূলে যাবার পর্বটি শুরু হয় পৃথিবীতে ফিরে আসার পর থেকে। ডেভিড স্কট সংবাদ সন্মেলনে এটি প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু বিষয়টি আসলেই সেভাবে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। আর নভোচারীদের মনে হয়ছিল এই কাজটি মৃত নভোচারীদের স্মরণেই তারা করেছিলেন। তিনি তার বার্তায় যোগ করেছিলেন, ‘দুঃখজনকভাবে দুটি নাম এখানে বাদ পড়েছে ( প্লেক থেকে, ভ্যালেন্টাইন বন্ডারেঙ্কো, গ্রিগরি নেলইয়ুবভ’। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের মৃত্যু সম্বন্ধে পরে জানতে পেরেছে কারণ সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচীকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তা, আরো একজন মৃত্যুবরণ করা নভোচারীর নাম বাদ পড়েছিল, রবার্ট হেনরী লরেন্স জুনিয়র, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী, বিমান-বাহিনীর অফিসার, যিনি ১৯৬৭ সালে তার মহাশূন্য যাত্রার প্রশিক্ষণের সময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। নভোচারীরা এরপর তাদের তারকা খ্যাতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর শিল্পী ভ্যান হয়ডঙ্ক অদ্ভুত নীরবতায় তার কাজে ফিরে যান। মানব জাতিকে নক্ষত্রের জগতের দিকে নির্দেশিত করার সেই বিষয়টি ক্রমশ তার কাছে আরো বেশী স্বপ্নের মত অনুভূত হতে শুরু করেছিল।
নাসার মিশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্কট শিল্পী ভাস্করের নাম উচ্চারণ করেননি, অনেকটাই অজ্ঞাতনামা একটি স্মারক হিসাবে তিন সেটি চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন, আর স্কট ( খুব অদ্ভতভাবেই) ধারণা করেছিলেন, শিল্পী নিজেও সেটাই চেয়েছেন। শুরুর দিকে এটি মেনে নেয়া ছাড়া হয়ডঙ্কের আর কিছু করার ছিলনা, যদিও তার বোঝাপড়া সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন ছিল। তিনি অ্যাপোলো ১৫ নভোচারীদের লিখেছিলেন, ‘এই শতাব্দীতে মানুষের মহাকাশ অভিযানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন’। স্কটকে লেখা আলাদা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘দুঃখিত তুমি চাঁদে পুরোনো মন্দির পাওনি, তবে নিশ্চয়ই চাঁদের উপর হাটার অভিজ্ঞতা তোমাকে ভিন্ন মাত্রার একটি বাস্তবতায় নিশ্চয়ই নিয়ে গিয়েছিল’। কিন্তু ক্রমশ ভ্যান হয়ডঙ্ক অস্থির হতে শুরু করেছিলেন এই কৃতিত্বটি না দাবী করতে পেরে, যা তিনি আসলেই মনে করেছিলেন তার ঐতিহাসিক একটি সৃষ্টি। এই মতবিরোধটি স্পষ্ট প্রকাশ পায় সেপ্টেম্বর মাসে, বেলজিয়ামে একটি কনফারেন্সে যখন নভোচারী স্কটের সাথে দেখা হয়েছিল তার, সেখানে তাকে বলা হয়, আরো একবছর এই ভাস্কর্য বিষয়ে কারো কাছে কিছু না বলতে।
এছাড়াও তিনি ‘ফলেন অ্যাস্ট্রেনট’ নামটি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার মনে এটি মহাকাশ অভিযানের উদ্দেশ্য বীরযাত্রা এমন কিছু নির্দেশ করে না।। নভোচারী, বিশেষ করে স্কট তার অনুমতি ছাড়াই এই নামটি ব্যবহার করেছিলেন। নভোচারী স্কট অবশ্য পরে মনে করতে পারেননি কিভাবে নামটি এসেছিল, তবে সম্ভবত সেই সময়ে সয়ুজে অভিযানে মারা যাওয়া তিনজন কসমোনটের কথা মনে করেই এই নামটি তার মনে এসেছিল। নভোচারীদের কাছে হয়ডঙ্কের শিল্পকর্মটি ছিল মূলত একটি নামফলকসহ স্মারক।

কিন্তু পরে যখন এই অভিযান সংক্রান্ত নাসার প্রকাশিত বুকলেটে ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’ এর ভাস্কর হিসাবে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, তখন হয়ডঙ্ক আর সহ্য করতে পারেননি। তাকে নীরব রাখার একটাই কারণ তিনি ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন, আর সেটি হচ্ছে ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যাবার একক কৃতিত্ব দাবী করার লক্ষ্যে নভোচারীদের একটি চাল। এবং এই ফাটলটি আরো প্রশস্ত হয়েছিল যখন নভেম্বরে তিনি নভোচারীদের কাছ থেকে একটি চিঠি পান যে, স্মিথসোনিয়ান ইন্সস্টিটিউট চাঁদে রাখা ভাস্কর্যটির একটি অনুলিপি রাখার অনুমতি চাইছে। এবং তারা মনে করেন যে এই প্রস্তাবে তার রাজি হওয়া উচিৎ। এবং অবশ্যই তাদের একটি হুবহু অনুলিপি দরকার, একই উপাদান, একই রকম দেখতে এবং একটি শিল্পীর সৃষ্টি অনুলিপি। ‘তারা এটি কিনতেও রাজী আছে যদি তুমি আরো দুটো বানাও’। তবে ভান হয়ডঙ্ক দ্বিগুণভাবে অপমানিত বোধ করেছিলেন, প্রথমত, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম শিল্পী হিসাবে তার সাথে না বরং নভোচারীদের সাথে যোগাযোগ করেছিল, কারণ শিল্পীর নাম তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কাছে গোপন রেখেছিলেন, এবং সেই আমন্ত্রণপত্রে তাকে ভাস্কর হিসাবে উল্লেখ না করে বলা হয়েছে ‘কারিগর’। আর তিনি কখনোই এই অপমান ভুলতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কারিগর না আমি শিল্পী, তোমরা যদি চাঁদে গিয়ে গর্ব করতে পারো, আমিও গর্ব করতে পারি সেখানে আমার একটি ভাস্কর্য আছে’।

পরিশেষে অবশ্য তার অহংকার হার মানে ভবিষ্যতের অমরত্বের আশায়। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামের জন্যে তিনি দুটি রেপ্লিকা নির্মাণ করেন । যাদের একটি তাদের স্থায়ী জায়গা পায় National Air and Space Museum এ, অন্যটি শিল্পী উপহার দেন বেলজিয়ামের রাজাকে। আর হিউস্টনের একই নির্মাতার কাছ থেকে সেই স্মৃতি ফলকটির একটি অনুলিপি তৈরী করার ব্যবস্থা করেছিলেন স্কট।

স্মিথসোনিয়ান থেকে আসা অনুরোধ হয়ডঙ্ককে তার নীরবতা ভাঙ্গতে প্ররোচিত করেছিল। নিউ ইয়র্কে তার প্রতিনিধি ওয়াডেল গ্যালারীর মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল যে, এটি প্রথম প্রচার হবে সিবিএস নিউজের অ্যাঙ্কর ওয়াল্টার ক্রংকাইটের মাধ্যমে, যিনি অ্যাপোলো ১৬ মিশনের আগে ঘোষণা করবেন চাঁদে ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী কে ।

১৯৭২ সালে মার্চে হয়ডঙ্ক স্কটকে সতর্ক করে দেন তিনি টিভি সাক্ষাৎকার দেবেন, চাঁদে প্রথম শিল্পকর্ম নিয়ে। এর উত্তর স্কট জানান, ‘হয়তো তোমাকে এর উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করা হবে, যে প্রশ্নটি অর্থপূর্ণ উত্তর শুধু আমরা নভোচারীরা দিতে পারি’। কিন্তু হয়ডঙ্ক তার চূড়ান্ত মন্তব্য করেন হাতে লেখা একটি নোটে, ‘সিবিএস যে যাওয়ার একমাত্র কারণ সেটি ঘোষণা দেয়া যে, এই শিল্পকর্মটি আমার ডিজাইন করা, যা আপনি স্বাভাবিক বলে মনে করবেন। একজন শিল্পীর কোনো শিল্পকর্মের স্রষ্টা হিসাবে পরিচিত হবার অধিকার আছে। আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি একমাত্র শিল্পী যার কাজ পুরোপুরিভাবে সে মহাশূন্যের প্রতি নিবেদিন হিসাবে পরিচিত, এবং শিল্পকলার জগতে এই বিষয়ে ক্রমশ কথাবার্তা হচ্ছে। আমি আপনার বার্তা পুরোপুরি বুঝতে পারছি, কিন্তু কোনোভাবে এই স্মারকটিকে আমি খাটো করছিনা’।

কিন্তু স্কট এটি পছন্দ করেননি, কারণ তার মনে হয়েছিল এই অজ্ঞাত থাকার ব্যপারটি তাদের সহকর্মী আত্মত্যাগের প্রতি নিবেদিত স্মারকটিকে আরো মহৎ করে তুলেছে। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ভাবনা বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। ১৯৭২ সালের এপ্রিলের ১৬ তারিখ হয়ডঙ্ক টিভিতে ঘোষণা করেন, হাতে একটি রেপ্লিকা নিয়ে, ‘আমি মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলাম, নক্ষত্রের জগতই মানুষের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ’, তিনি বলেন, ‘এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্মারক ভাস্কর্য’, কিন্তু কংক্রাইট স্মরণ করিয়ে দেন, ‘না, পৃথিবী নয়, এই মহাবিশ্বে, আর চাঁদে সেখানে এটি রাখা হয়েছে’।

শিল্পী হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবার পর, তার আশাবাদ ফিরে এসেছিল। এবার নিশ্চয়ই তিনি তার ভাস্কর্যগুলোর জন্যে পরিচিতি পাবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন বেশীদিন টেকেনি। অবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেই সময় মানুষ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনেট’ পছন্দ করেনি, তারা ভাবতে পারেননি চাঁদে এই ভাস্কর্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি কারণ ছিল হয়ডঙ্ক যে বিদেশী সেটা নিউ ইয়র্কের শিল্পীরা পছন্দ করেননি, একজন বিদেশী, বিত্তশালী তবে দ্বিতীয় শ্রেণীর গ্যালারী যাকে প্রতিনিধিত্ব করে চাঁদে ভাস্কর্য স্থাপন করার কোনো যোগ্যতা তার নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমস সমালোচনা করে বলে এটি স্ফীত টিউনিং ফর্ক ছাড়া আর কিছু না। ততদিনে চাঁদে অভিযানের আগ্রহ কমে গেছে সরকারী পর্যায়ে, বেশ কিছূ মিশন বাতিল ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।

ডিক ওয়াডেল শিল্পীর সম্মতিতে একটি নিয়তিনির্ধারক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ৯৫০ টি শিল্পীর সাক্ষরিত রেপ্লিকা ৭৫০ ডলার করে বিশেষ আগ্রহী সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এবারে তারা বিজ্ঞাপনও দেন। শিল্পী জানতেন নভোচারীরা বিষয়টি পছন্দ করবেন না, কিন্তু এই কাজটি থামানোর কোনো ইচ্ছাও তার ছিলনা। স্কট আর হয়ডঙ্কের মধ্যে চিঠি আদান প্রদান হয়, কিন্তু হয়ডঙ্ক এর হাতে আসলেই আর কোনো উপায় ছিলনা। কিন্তু তাদের এই ভিন্নমতটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকতো। কিন্তু এখানে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, অ্যাপোলো ১৫ -র নভোচারীরা কিছু কভার স্ট্যাম্প নিয়ে গিয়েছিল, যাদের চাঁদের পোস্টমার্ক সহ ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কথা ছিল এর ১০০ টি এমন কভার স্ট্যাম্প ২১০০০ ডলার দিয়ে জার্মান কালেকটর হেরমান কিনে নেবেন, যে টাকাটি ব্যবহার করা হবে নভোচারীদের সন্তানদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট সৃষ্টি করতে। কথা ছিল এগুলো বিক্রি করা হবে পরে যখন নভোচারীরা নাসার সাথে যুক্ত থাকবেন না। কিন্তু হেরমান প্রায় সাথে সাথে তার বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। এর জন্যে বিপদে পড়েছিলেন নভোচারীরা, তাদের কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তদন্ত কমিটির কাছে এই রেপ্লিকা বিক্রিও গ্রহনযোগ্য ছিলনা। এর পরের বছরগুলোয় বেশ কিছূ তদন্ত হয়, এছাড়া চাঁদের মিশন নিয়ে আগ্রহ কমে যেতে শুরু করে।

জেরার মুখে স্কট স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে এই প্রকল্পে নভোচারীদের কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু মাত্র ৫০ টি কপি তৈরী করার পর ওয়াডেল গ্যালারী প্রকল্পটি বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনাগুলো শিল্পী এবং গ্যালারীর জন্যে নেতিবাচক প্রচারণা ছিল, কংক্রাইটের ইন্টারভিউর পর একটি প্রমাণ্য চিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল ‘স্পেস চাইল্ড’ নামে, কিন্তু সেটি কখনোই প্রদর্শন করা হয়নি। আর ওয়াডেল গ্যালারীর ব্যবসাও মুখ থুবড়ে পড়েছিল, ডিক ওয়াডেল হতাশায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫০ বছরের মারা যান। হয়ডঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরে যান এবং তার কাজ অব্যহত রাখেন মূলত সবার অগোচরে। নভোচারী তিনজনও একপর্যায়ে নাসা থেকে চাকরী ছেড়ে দেন। বেশ পরে নাসা পুনতদন্ত কভার-স্ট্যাম্প সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে নভোচারীদের দায়মুক্তি দিয়েছিল।


ইতিহাদবিদরা ফলেন অ্যাস্ট্রোনটের দিকে নজর না দিলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে ঘটনাটির চল্লিশ বছর পর শিল্পীকে মিউজিয়ামে বক্তৃতা দেবার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। স্কটের সাথে যোগাযোগ করেন, তিনিও সেই অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা, কিন্তু বিস্ময়ের সাথে জানতে পারেন স্কটদের সেই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণই করা হয়নি। এর কারণ পরে অবশ্য বলা হয়েছিল বাজেটের অভাব। তবে যাই হোক স্কটের ক্ষোভ একটুও কমেনি, তিনি বলেন, ‘আমি একমাত্র মানুষ যে কিনা ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যেতে পারতো, আর সেটি কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা’। সেদিন উপস্থিত প্রায় ৪০ জন, এছাড়া অ্যান্ডি ওয়ারহোল, অ্যানি লেইবোভিৎস, নরমান রকওয়েলের কাজের পাশে সাজানো তার ফলেন অ্যাস্ট্রোনেট, কিন্তু একমাত্র তারই একটি শিল্পকর্ম পৃথিবীর বাইরে আছে। তিনি পুরো কাহিনীটি বলেন এবং নভোচারীদের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমার মত ভীতু মানুষ কখনোই মহাশূন্যে যেতে পারতো না’।

(সমাপ্ত)

পল ভ্যান হয়ডঙ্ক ও নিঃসঙ্গ নভোচারী