এডওয়ার্ড হপার: নিঃসঙ্গ সূর্যমুখী

গ্রেট থিংকার্স প্রজেক্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে – আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

If you could say it in words, there would be no reason to paint.  Edward Hopper

Self-portraits: Edward Hopper

এডওয়ার্ড হপার সেই সব বিষণ্ন দেখতে বহু চিত্রকর্মের চিত্রকর, যেগুলো আমাদের বিষণ্ন করে তোলেনা। এর পরিবর্তে , সেগুলো আমাদের নিঃসঙ্গতাকে শনাক্ত করতে আর মেনে নিতে সহায়তা করে যা প্রায়শই সব বিষণ্নতার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে।

automatAutomat (1927)

তার বিখ্যাত ‘অটোম্যাট’ চিত্রকর্মে, আমরা একটি রমণীকে একাকী বসে কফি পান করতে দেখি। স্পষ্টতই অনেক রাত, আর তার গরম কাপড়ের কোট, মাথার হ্যাট দেখে আমরা বলতে পারি বাইরে বেশ ঠাণ্ডাও। ঘরটিকে মনে হয় বেশ বড়, উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত এবং সেখানে আর কাউকে আমাদের চোখে পড়েনা। অন্দরসজ্জাও খুবই ব্যবহারিক, রমনীটি দেখতে মনে হয় আত্ম-সচেতন, অপ্রতিভ, খানিকটা ভীত। হয়তো এভাবে বাইরে কোথায় একাকী বসে থাকতে সে অভ্যস্ত নয়। স্পষ্টতই যেন মনে হয় কোনো খারাপ কিছু ঘটেছে। সে দর্শককে আমন্ত্রণ জানায় তাকে নিয়ে কাহিনী কল্পনা করতে, বিশ্বাসঘাতকতা অথবা কোনো কিছু হারানোর। মনে হয় যেন সে চেষ্টা করছে তার হাত যেন না কাপে, যখন যে কফির কাপ তার ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসছে। উত্তর আমেরিকার যে কোনো অন্ধকার বড় শহরের ফেব্রুয়ারীর রাত এগারোটার দৃশ্য হতে পারে এটি।

1024px-Nighthawks_by_Edward_Hopper_1942Nighthawks (1942)

অটোম্যাট বিষণ্নতার একটি চিত্র, কিন্তু তারপরও এটি বিষণ্ন ছবি নয়। অজানা অপরিচিত কোনো ডাইনারে প্ররোচিত করার মত কিছু, এমনকি আকর্ষণীয় কিছু থাকতে। গার্হস্থ্য জীবনের সব চিহ্ন মুক্ত, উজ্জ্বল আলো, অপরিচিত আসবাব একধরনের স্বস্তি নিবেদন করতে পারে সেই মিথ্যা স্বাচ্ছন্দ্য থেকে যা হয়তো নিজের ঘরে কেউ অনুভব করতে পারেন। এমন কোনো পরিবেশে বিষণ্ন হওয়াটাই হয়তো সহজতর, প্রিয়জনের ছবিসহ বাধানো ফ্রেম, পছন্দের আসবাব আর আরামদায়ক কোনো বসার ঘরের চেয়ে। ঘর স্পষ্টতই প্রায়শই হপারের চরিত্রগুলোর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সেখানে কিছু ঘটেছে যা তাদের বাধ্য করেছে রাতে বাইরে বের হয়ে আসার জন্যে। চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকা ডাইনার, ট্রেন স্টেশনের ওয়েটিং রুম অথবা মোটেল হচ্ছে তাদের আশ্রয়স্থল, যারা খুব সঙ্গত কারণেই সম্পর্ক আর সমাজের সাধারণ জগতে নিজেদের জায়গা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।

Hopper, Excursion into Philosophy 1959Excursion into Philosophy (1959)

summer-in-the-city-1950Summer in the City (1950)

হপারের ক্যানভাসে নিঃসঙ্গতার প্রতিকৃতি আঁকার দক্ষতাটির জন্ম হয়েছে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় এর সাথে ঘনিষ্ঠতা থেকে। নিউ ইয়র্কের জাহাজ নির্মাণ করার শহর আপার নিয়াকে তার জন্ম হয়েছিল ১৮৮২ সালে। একজন ব্যবসায়ী ছেলে হিসাবে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময় মধ্যবিত্তের শৈশব তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু নিজের অন্তর্জগতে, হপার প্রায়শই নিজেকে খুব বেমানান অনুভব করেছে, খানিকটা একজন বহিরাগতের মত।

not_detected_235607(1)Room in New York (1932)

তিনি শুধুমাত্র শিল্পী হতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু তার বাবা মা, তাকে বাণিজ্যিক শিল্পকলায় প্রশিক্ষিত হওয়ার উপর চাপ দিয়েছিলেন, যেন অর্থনৈতিকভাবে বড় কোনো সমস্যার মুখে তাকে না পড়তে হয়। স্পষ্টতই যা তিনি ঘৃণা করতেন, এবং পালানো জন্যে ফরাসী শিল্পকলা অধ্যয়ন করবেন এমন অজুহাত দিয়ে বেশ কয়েকবার প্যারিসেও যান। কিন্তু বাস্তবিকভাবে ফরাসী আর্ট সালোনের প্রতি কোনো টান তিনি অনুভব করেননি। কয়েকজন ইম্প্রেশনিষ্টকে তিনি আত্মীকরণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পিকাসোকে পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি বাইরে থাকতেই বেশী পছন্দ করতেন, লুক্সেমবর্গ বাগানে শিশুদের খেলা দেখতে অথবা, টুইলেরি প্যালেসে কনসার্ট শুনতে, নৌকায় করে সাইন নদীর উপর সময় কাটাতে।

not_detected_235598(1)New York Movie, (1939)

১৯১৩ সালে তার বয়স যখন একত্রিশ, হপার  নিউ ইয়র্ক সিটির গ্রিনউইচ ভিলেজে তার বসতি গড়েছিলেন, যেখানেই তিনি তার বাকী জীবন কাটিয়েছিলেন। এখানেই তিনি আবিষ্কার করেন, এত জনাকীর্ণ হয়েও কিভাবে নগর জীবন এত বিচ্ছিন্ন হতে পারে। সেই সময়ে আমেরিকার শহরগুলোয় জনসংখ্যা উর্ধমূখী, কিন্তু তাসত্ত্বেও সেখানে বাস করে মুলত পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া আগন্তুকরা, যারা  পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। হপার সেই সময় এল-ট্রেইন নিতেন অফিসে যেতে, এবং অফিস অভ্যন্তরের অন্ধকার কিছু দৃশ্য দেখতেন, ‘যা এতটাই ক্ষণস্থায়ী, আমার মনে সজীব আর প্রাণবন্ত কিছুর ছাপ কখনোই রেখে যায়নি’। প্রতিটি কক্ষে ভিন্ন ভিন্ন নাটকের মঞ্চায়ন, অদৃশ্য, অপরিলক্ষিত, জনসমুদ্রের মধ্যে এক একটি বিস্মৃত দ্বীপ।

(Maybe I am not very human – all I ever wanted to do was
to paint sunlight on the side of a house. -E.H)

যদিও একদশক ধরে হপার নিউ ইয়র্কে ছবি এঁকেছিলেন, তার কাজ খুব একটা সাড়া জাগাতে পারেনি। কাজের অনুপ্রেরণা খুঁজে পেতে প্রায়শই তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তারপর তার বয়স যখন চল্লিশের দশকে, তার সাথে দেখা হয়েছিল একজন সুন্দর, আচরণ আর জীবনে হপারের তুলনায় সামাজিক একজন শিল্পী, জোসেফিনের সাথে (জো)। এডওয়ার্ড এবং জোসেফাইন দুজনই ছবি আঁকতে সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে যেতে শুরু করেছিলেন, সেই সাথে একত্রে সিনেমা আর থিয়েটারে সময় কাটানো। একপর্যায়ে তারা বিয়ে করেন, এবং অবেশেষে হপার আর একা ছিলেন না।

eleven-a-mEleven A.M., (1926)

কিন্তু অবশ্যই, যেমন অনেকেই আমরা আমাদের সম্পর্কগুলোয় আবিষ্কার করি, হপারের বিয়ে কিন্তু তার সেই বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব আর বিষণ্নতাকে স্থায়ীভাবে নিরাময় করতে পারেনি। মাঝে মাঝেই তিনি নিঃসঙ্গতা অনুভব করতেন। তিনি ও তার স্ত্রী তাদের যৌন জীবনটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি কখনো। প্রায়শই জো তার বিড়ালের সঙ্গই বেশী পছন্দ করতেন।

Jo in WyomingJo in Wyoming (1946)

হপার আবিষ্কার করেছিলেন, এমনকি যখন অন্যরা আমাদের খুব বেশী ভালোবাসে, তারপরও আমাদের আবশ্যিক কিছু অংশ সবসময়ই নিঃসঙ্গ থেকে যায়। আর এই বিষয়টিকে আত্মীকরণ হপারের কাজে সেই অদ্ভুত বিশ্বাসযোগ্যতাটিকে যুক্ত করেছে। আর আসলেই, একাকীত্বকে সরাসরি প্রদর্শন করে শিল্পকলা আসলেই সান্ত্বনাদায়ক প্রশান্তি, এমনকি নিরাময় করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে: যা আমাদের সান্ত্বনা দেয়, আশ্বস্ত করে যে বিচ্ছিন্নতা, বিচ্ছেদ আর বিষণ্নতা সবই স্বাভাবিক, আর এই ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের যেমন খুব অদ্ভুত করে না, তেমনি লজ্জিত হবারও কারণ নয়। বিষণ্ন আর একাকীত্বের শিল্পকলা এর দর্শকদের নিজেদের দুঃখ আর হতাশার একটি প্রতিধ্বনির সাক্ষী হতে সুযোগ করে দেয়, আর সেকারণে আমরা ব্যক্তিগতভাবে সেই অনুভূতির দ্বারা কম নিপীড়িত আর অবরুদ্ধ অনুভব করি।

হপারের শিল্পকলা আমাদের নিজেদের জীবনের নিঃসঙ্গতার প্রকৃতি আর ভূদৃশ্যটি লক্ষ করতে সহায়তা করে। কোনো মহান শিল্পীর সংস্পর্শে আসার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে আমরা আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে সেই বিষয়গুলো লক্ষ করতে শুরু করি, যে বিষয়গুলোর প্রতি শিল্পী নিজেই সংবেদী আর  গ্রহণোন্মুখ হতেন। ইদানীং, আমরা বেশী সংবেদনশীল সেই বিষয়টির প্রতি যাকে আমরা হয়তো বলতে পারি, হপারেস্ক, বা হপারসুলভ, একটি বৈশিষ্ট্য যা শুধু হপারের নিজের ভ্রমণ করা উত্তর আমেরিকার সেই জায়গাগুলোতেই পাওয়া যায়না, বরং তাদের পাওয়া যেতে পারে যে কোনো জায়গায়, যেখানে মোটেল আর সার্ভিস স্টেশন আছে, রাস্তার পাশে খাবারের হোটেল, বিমান বন্দর, বাস স্টেশন আর সারা রাত খোলা সুপারমার্কেট আছে।

6667820c7319fd5596d1191bb0903f41.1000x687x1Gas (1940)

অনেক জায়গায় সার্ভিস স্টেশনগুলো (পেট্রল পাম্প) খুব সহজে হপারের বিখ্যাত ‘গ্যাস’ চিত্রটির ‍দৃশ্য মনে জাগাতে পারে, যা ‘অটোম্যাট’ আঁকার প্রায় ১৩ বছর পর তিনি এঁকেছিলেন। এই চিত্রকর্মটিতে আমরা শুধু প্রত্যাসন্ন একটি অন্ধকারে একটি পেট্রল স্টেশন দেখতে পাই । এই নির্জনতা, বিচ্ছিন্নতাকে রূপান্তরিত করা হয়েছে মর্মভেদী আর প্ররোচিত করার মত একটি বৈশিষ্ট্যে। ক্যানভাসের ডানদিক থেকে কুয়াশার মত ছড়িয়ে পড়া অন্ধকার, স্টেশনের নিরাপত্তার চেয়ে যা খুবই ভিন্ন । রাত আর বনভূমির প্রেক্ষাপটে, মানবতার শেষ ঠিকানা, শহুরে দিনের আলোর চেয়ে যেখানে আত্মীয়তার অনুভূতি সৃষ্টিও দ্রুততর হয়।

compartment-carCompartiment C, voiture 293, 1938

হপার অন্তর্বীক্ষণপ্রবণ মেজাজ ভালোবাসতেন যা প্রায়শই ভ্রমণের সাথে আমরা অনুভব করতে পারি। তিনি অর্ধশূন্য টেনের কামরার অভ্যন্তর আঁকতে ভালোবাসতেন, একটি ভূদৃশ্যের মধ্যে দিয়ে যা ছুটে চলছে, যখন আমরা পরিচিত সত্তার বাইরে দাড়িয়ে নিজেদের জীবনের দিকে এমনভাবে তাকাতে পারি, আরো স্থিতিশীল কোনো পরিবেশ  যা আমরা কখনোই পারবো না। আমরা সবাই এমন পরিবেশ চিনি, হপারে ‘কম্পার্টমেন্ট সি, কার ২৯৩’, যদিও হয়তো আমরা কখনো এটি শনাক্ত করতে পারবো না এমনকি যখন হপার আমাদের সামনে আয়না মেলে ধরেন।

(Great art is the outward expression of an inner life in the artist, and this inner life will result in his personal vision of the world. E.H.)

হপারের বিয়ের পর, হঠাৎ করেই তার পেশাগত জীবনেও উন্নতি হয়েছিল। তখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার যুগ, কিন্তু তারপরও তার চিত্রকর্ম বিক্রী হতে শুরু করেছিল। সমালোচকদের অত্যুৎসাহ ছিল তার কাজ নিয়ে, জাদুঘরগুলো তার চিত্রকর্ম কিনতে শুরু করে, বেশ কিছু পুরষ্কারও তিনি পেতে শুরু করেন। কিন্তু তার সফলতা সত্ত্বেও, তিনি চিরকালই গভীরভাবে অন্তুর্মুখী রয়ে গিয়েছিলেন। নিঃসঙ্গতা থেকে না পালিয়ে, তিনি সেটি পুরোপুরিভাবে নিজের করে নিয়েছিলেন। বহু দশক ধরেই তিনি বহু পুরষ্কারের সন্মান প্রত্যাখ্যান, বক্তৃতা দেবার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে সাধারণভাবে তার জীবন কাটিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। ১৯৬৭ সালে তিনি মারা যান, কিন্তু এখনো তার চিত্রকর্মগুলো আরো প্রাজ্ঞ আর প্রাপ্তবয়স্ক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আমাদের নিজেদের জীবনের নিঃসঙ্গতাকে শনাক্ত করতে আমাদের সহায়তা করে যাচ্ছে ।

Hopper

অস্কার ওয়াইল্ড একবার মন্তব্য করেছিলেন, হুইসলার (জেমস অ্যাবট ম্যাকনেইল হুইসলার) না আঁকার আগে লন্ডনে কোনো কুয়াশা ছিলনা। অবশ্যই, লন্ডনে অনেক কুয়াশা ছিল, কিন্তু শুধুমাত্র হুইসলারের চিত্রকর্মের উদাহরণগুলো সেদিকে আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধ করার আগ অবধি ‍সেই কুয়াশার বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ করা খানিকটা কঠিন ছিল। হুইসলারকে ওয়াইল্ড যেমন বলেছিলেন, আমরা সেই কথা হপারকে নিয়েও বলতে পারি : পৃথিবীতে অনেক কম হৃদয়গ্রাহী, অদ্ভুত, ঘুরে ফিরে মনে হানা দেওয়ার মত আর সান্ত্বনাদায়ক সুন্দর সার্ভিস স্টেশন, ট্রেনের কামরা, মোটেল কিংবা ডাইনার কম দৃশ্যমান হতো হপারের আঁকা শুরু করার আগে।

 

এডওয়ার্ড হপার: নিঃসঙ্গ সূর্যমুখী

One thought on “এডওয়ার্ড হপার: নিঃসঙ্গ সূর্যমুখী

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s