সাই টম্বলি: সাংবেশিক আঁচড়ের বিমূর্ত ইশারা

গ্রেট থিংকার্স প্রজেক্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

বিমূর্ত শিল্পকলা সম পরিমান বিরক্ত আর সংশয় উদ্রেক করা অব্যাহত রেখেছে। আপনি হয়তো জানেন বিমূর্ত শিল্পকলা কেমন: শূন্য সাদা একটি ক্যানভাস, ঠিক মাঝখানে গভীর কালো একটি , হলুদ পটভূমির উপর  বেগুনী রঙের একটি ছোপ, আটটি ইস্পাতের দণ্ড এলোমেলো স্তুপাকারে সাজানো, এর মানে কি হতে পারে ? কেউ কি ঠাট্টা করছে আমাদের সাথে? একটা শিশুও তো পারে …..

(Rose Series)

আরো খানিকটা সহমর্মিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করতে (যা উপযোগী আর পক্ষপাতহীন হবে) আমাদের প্রথম মূলনীতিতে ফিরে যেতে হবে এবং জিজ্ঞাসা করতে হবে:  কোনো কিছু আসলেই যেমন দেখতে সেটি সেভাবে না দেখানোর মধ্যে ভালো কি বিষয় থাকতে পারে? বিমূর্ত শিল্পকলার কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্যটি হচ্ছে সব ধরনের প্রতিনিধিত্বকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি আবেগের কাছে পৌছানো। সঙ্গীতের মত, বিমূর্ত শিল্পকলাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ইকোইং হিসাবে (অর্থাৎ মূল শব্দ শেষ হবার পর সেটির প্রতিধ্বনি) অথবা, আমাদের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অথবা মেজাজের একটি রুপ দেয়া। কিছু কিছু বিষয় হয়তো আপেক্ষিকভাবে সহজবোধ্য, যেমন, প্রশান্তি অথবা ক্রোধ, অন্যগুলো ভাষায় সহজে সংজ্ঞায়িত করার অসম্ভব। সেকারণে এমন কিছু বলা খুব একটা সহায়ক নয়: এই পেইন্টিংটা তো কোনো কিছুর মত দেখতে না। সত্যি, এটি বাইরের পৃথিবীর কোনো কিছুর মত দেখতে নয় ঠিকই, কিন্তু তার কারণ অভ্যন্তরের জগতকে প্রতিনিধিত্ব করাই এটির মূল উদ্দেশ্য। বরং যে প্রশ্নটি আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিৎ হবে: এই পেইন্টিংটি দেখে ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছে?  এটি কি আমার কোনো আবেগীয় অবস্থাকে জাগিয়ে তুলছে? মানব জাতির কোন আভ্যন্তরীণ দৃশ্যপটকে এখানে হাজির হবার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে?

বিমূর্ত ধারার শিল্পীদের অন্যতম মহান শিল্পী সাই টম্বলির জন্ম হয়েছিল ১৯২৮ সালের ভার্জিনিয়ার সুন্দর তবে অতিরক্ষণশীল শহর লেক্সিঙটনে। তার বাবা ছিলেন শিকাগো হোয়াই সক্স বেসবল টিমের একজন পিচার (বেসবলে যিনি বল নিক্ষেপ করেন) , বাংলাদেশের সমতুল্য কিছু ভাবলে ভাবা যেতে পারে জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ক্রিকেটারের মত কেউ। খ্রিস্টিয় নামকরণ অনুষ্ঠানে তার নাম দেয়া হয়েছিল এডউইন পার্কার টম্বলি, কিন্তু তিনি পরে পরিচিত হয়েছিলেন শুধু সাই বা Cy  নামে, বেসবলের ইতিহাসে খুব প্রখ্যাত এক ব্যক্তিত্ব, সাই ইয়ং এর নামানুসারে। তিনি ডার্লিঙটন স্কুলে পড়াশুনা করেন, বেশ ব্যয়বহুল বেসরকারী একটি স্কুল। এক পর্যায়ে, ১৯৫০ এর দশকের শুরুতে শিল্পকলা পড়তে তিনি নিউ ইয়র্কে উপস্থিত হয়েছিলেন, পরে তিনি এক বছরের জন্যে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় ঘুরতে বের হয়েছিলেন। আর এই ভ্রমণটি তার জীবনকে বদলে দিয়েছিল। এই সময় তার প্রেমিকার সাথে সাথে তার পরিচয় হয়েছিল, সম্ভ্রান্ত অভিজাত পরিবারের একজন সদস্য, রোমে বসতি গড়েন এবং তার বৈশিষ্ট্যসূচক ও পরিচায়ক বিমূর্ত শৈলীতে কাজ শুরু করেন।

যদি তিনি খুব সুস্পষ্টভাবে কোনো কারণ ‍উল্লেখ করেননি, তবে রোম এবং রেনেসাঁর শিল্পকলার গভীরতম শিক্ষাটি তিনি গ্রহন করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র মানব জাতির আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিগুলোর রুপ দিতে চেয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে তার প্রিয় অতীতের মাস্টাররা বাইরের পৃথিবীটির প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলেন।

১৯৫৫ সালে তার আঁকা অ্যাকাডেমির কথা ধরুন, যেটি এখন আছে নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে । আমরা খুব সূক্ষ্মভাবে আঁচড়গুলো দেখতে পারবো না ঠিকই তবে সেগুলো সারা ক্যানভাস জুড়ে বিস্তৃত, যেন কোনো ব্ল্যাকবোর্ডের উপর লেখা রহস্যময় একটি লিপি। আমরা সেই মুহূর্তে স্থির হয়ে থাকি, যেন কোনো কিছুর ঠিক সূচনাপর্বে আটকে আছি। আমরা এখনই হয়তো কিছু বুঝতে পারবো, কিন্তু এখনও আমরা যা বুঝে উঠতে পারিনি।

Cy-Twombly-Academy(Academia, 1955)

টম্বলির কাজগুলো বিশেষভাবে পরিকল্পিত আয়নার মত, যা আমাদের অভ্যন্তরস্থ জীবনের কোনো অংশকে প্রতিফলিত করছে। এটির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে, এটিকে আরো সুস্পষ্ট এবং সহজে শনাক্ত করার জন্যে বিশেষভাবে যা নির্মিত। তার কাজগুলো ঠিক সেই জিনিসটিকে স্পর্শ করে যা অনেকটা সেই মুহূর্তের মত, যখন আপনি প্রায় বুঝতে শুরু করেন আপনি কিছু নিয়ে ভাবছেন, তবে ঠিক পুরোপুরিভাবে সেই পর্যায়ে তখনও পৌছানো সম্ভব হয়নি। এটি চিন্তাশীল জীবনের একটি মুহূর্তকে চিত্রে বিধৃত করে,  উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর সংশয়ে যা ইঙ্গিতপূর্ণ।

 কোনোভাবেই আমাদের বিস্মিত করা উচিৎ না জেনে যে, টম্বলি ফিগারেটিভ আর রিপ্রেজেন্টেশনাল আর্ট ভালোবাসতেন। তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর শিল্পী পুস্যাঁ ( যিনি নিজেও রোমে বসবাস করতেন)। কিন্তু টম্বলি নিজের কাজে অন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন।

Hero and Leandro, 1984 (part I to III)

যেমন ধরুন তার হিরো অ্যান্ড লিয়ানডার, যে চিত্রকর্মটি  ক্ল্যাসিকাল গ্রিসে সেই ট্র্যাজিক যুগলের কাহিনীর প্রতি তথ্যনির্দেশ করছে। প্রেমিকার সাথে দেখা করতে প্রতি রাতে লিয়ান্ডার তিন কিলোমিটার সাঁতার কেটে হেলেসপন্ট অতিক্রম করতেন ( কবি লর্ড বায়রনও সেটি করার চেষ্টা করেছিলেন , এবং এখানে একটি ক্লাবও আছে)। কিন্তু টম্বলি আমাদের পানিতে ভেজা শরীরে উর্ধাংশ অথবা প্রতারক জ্যোস্নাস্নাত ঢেউ দেখাতে চাননি, যেমন করে ‍পুস্যাঁ হয়তো করতেন। এর পরিবর্তে তিনি এই ধরনের ভালোবাসার একটি নির্দিষ্ট অনুভূতি কেমন অনুভূত হতে পারে তার একটি চিত্র আঁকতে চেয়েছিলেন, হয়তো সেই জানার অনুভূতিটি, যে মানুষটিকে আপনি ভালোবাসেন, সে আপনার কাছে আসতে তীব্র প্রচেষ্টা করছে অথবা সেই বোধটি, যাকে আপনি ভালোবাসেন সে মরিয়া হয়ে আপনার সাথে যোগাযোগ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার দহন অনুভব করছেন। এটি নাটকীয়তা আর  তীব্রতম আবেগীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, কোনো কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন কিছু প্রদর্শন না করে। এই দুর্বোধ্য, পেলব, ঘূর্ণি তোলা পৃষ্ঠদেশের দিকে তাকালে, ভালোবাসার মূল্য সক্রান্ত অতিমূল্যবান একটি ধারণার প্রতি আমরা আমাদের চিরন্তন আকর্ষণটি অনুভব করি।

ct1

 আভ্যন্তরীণ জীবনের এধরনের প্রতিকৃতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে টম্বলি তার পুরো পেশাগত জীবন নিবেদন করেছিলেন, যেন আমরা এর পরিণতিগুলো অন্য মানুষের সাথে সংযোগ করতে শিখতে পারি। অন্যদের সাথে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার কাজটি কুখ্যাতভাবেই কঠিন। শব্দ খুব বেমানান অনুভূত হতে পারে। কেউ হয়তো তার কাছের বন্ধুকে শুধুমাত্র বলতে পারে, ভিতরে, আমার খানিকটা ঠিক এমনই একটি অনুভূতি হচ্ছে। এবং তারা সেটি বুঝতে পারে।

1978: Goethe in Italy

বিমূর্ত ছাড়াও, টম্বলির খুব সাধারণ দেখতে নানা লেখালেখির খণ্ডাংশ ব্যবহার করা প্রবণতা ছিল। সেগুলো দেখতে নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া লেখা কোনো নোটের মত, কোম্পানীর রিপোর্টের পেছনে অর্থহীন আঁকিবুকি, কোনো অসমাপ্ত বাক্য, কোনো ধারণা, যা হয়তো কারো মনে এসেছে কিন্তু এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট ভাবনার শরীর খুঁজে পায়নি। দেখতে গ্রাফিটির মত, কাউকে অপমান করতে প্রতিবেশীর দেয়ালের উপর কিছু লেখা, অসামাজিক আগ্রাসনের প্রকাশ। কিন্তু টম্বলির হাতে, ঐ তাড়না, ঐ উত্তেজনা আর সাহস আর ঝুকি নেয়া, অসন্তোষ সৃষ্টি করার জন্যে প্রস্তুতি, মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যময় প্রত্যাশাগুলো ওলটপালট করার ইচ্ছা, প্রজ্ঞাপূর্ণ শৈল্পিক অনুশীলন, সত্যিকারের আত্ম-উন্নয়নে প্রাণশক্তির সম্প্রসারণ আর পরিশুদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়েছে ( সেই সব কিছু গ্যেটে ইন ইটালির’ যার সংক্ষিপ্ত রুপ)। সারাক্ষণই মুখোমুখি হওয়া শ্লোগান আর ব্র্যান্ড নেমের চেয়েও আরো বেশী এটি স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের কি নিয়ে চিন্তা করা উচিৎ, কোথায় মনোযোগ দেয়া উচিৎ ।

২০১১ সালে সাই টম্বলি তার প্রিয় রোম থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। তার বয়স তখন ৮৩, তবে তিনি ততদিন বেঁচে ছিলেন দেখতে যে, তার কাজ অনেক সুখ্যাতি অর্জন করেছে এবং যাদের মতামত তিনি শ্রদ্ধা করতেন, তাদেরও যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছে।

একইসাথে তার চিত্রকর্মগুলো যেমন কোনো বিষয় সংশ্লিষ্ট না, তেমনি সবকিছু বিষয়ক, যা কিছু সবচেয়ে শক্তিশালী, ব্যক্তিগত, অনির্বচনীয়, কিন্তু আমাদের অন্তর্জগতে গুরুত্বপূর্ণ। তিনিও টিকে থাকবেন, যতদিন সেই মহান রোমানদের কিছু টিকে থাকবে, যাদের তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন।

Advertisements
সাই টম্বলি: সাংবেশিক আঁচড়ের বিমূর্ত ইশারা

One thought on “সাই টম্বলি: সাংবেশিক আঁচড়ের বিমূর্ত ইশারা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s