অসকার নিয়েমায়ের: শ্রদ্ধাহীন বক্রতায় কংক্রীটের সাম্বা

( গ্রেট থিংকার্স প্রজেক্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে : আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান)

1_aqoN9Vo1nlZ5kv45_t5buQঅসকার নিয়েমায়ের

ভ্রমণের  হতাশাজনক দিকগুলোর একটি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন বহু এলাকায় পৃথিবীকে দেখতে আসলে একই রকম মনে হয়। টোকিওর ডাউনটাউনের উচু ভবনগুলোকে থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট অথবা সিয়াটলের উঁচু ভবনগুলো থেকে আলাদা করা খুবই কঠিন। আর বিষয়টি কাকতলীয় নয়। আধুনিক স্থাপত্যকলার ভিত্তিতে আছে সেই ধারণাটি: সর্বত্র দালানগুলো যৌক্তিকভাবে একই রকম দেখতে হওয়া উচিৎ। আধুনিকতাবাদের সূচনাপর্বের গুরুত্বপূর্ণ দিশারীরা যেকোনো ধরনের আঞ্চলিকতাবাদের বিরুদ্ধে  তাদের তিক্ত বিরোধীতায় সবাই মূলত একতাবদ্ধ ছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে যা প্রতিক্রিয়াশীললোকাচারে দূষিত, আর পুরোপুরিভাবেই সাদামাটা ছিল। যদি বাইসাইকেল, টেলিফোন, উড়োজাহাজ (নতুন যুগের অগ্রদূত সব) স্থানীয় কোনো শৈলীতে সংগঠিত করা না যায়, তাহলে দালানের ক্ষেত্রেই বা সেটি কেন করতে হবে? সুতরাং শ্যালে, উইগওয়াম আর গারগয়েল, সব কিছু নিপাত যাক। 

Gustavo Capanema Palace, Ministry of Education and Health, Rio

প্রচলিত ধারার আধুনিকতাবাদী স্থপতি হিসাবেই তার পেশাগত জীবন সূচনা করেছিলেন ব্রাজিলের স্থপতি অস্কার নিয়েমায়ের (Oscar Niemeyer), যিনি পুরোপুরিভাবেই আধুনিকতাবাদী স্থাপত্যকলার দিশারীদের প্রস্তাবিত বিশ্বজনীনতার মতবাদটির অনুসারী ছিলেন। তার জন্ম হয়েছিল ১৯০৭ সালে, রিও ডি জানেরিওতে, আর কৈশোর থেকেই স্থাপত্যের প্রতি তার সুতীব্র একটি আগ্রহের সূচনা হয়েছিল। পরে যখন তিনি ন্যাশনাল স্কুল অব ফাইন আর্টসে পড়তে গিয়েছিলেন তখন তিনি একটি গ্রুপের সাথে জড়িয়ে পড়েন,যারা ইউরোপ তথা বিশ্বের অন্যতম মহান আধুনিকতাবাদী স্থপতিদের, বিশেষ করে লো করবুজিয়েকে ( Le Corbusier) বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করতেন; যিনি বিশেষ প্রচণ্ডতা ও দৃঢ়তার সাথে দাবী করতেন কোনো স্থাপত্যের অবস্থান যে সংস্কৃতির মধ্যেই থাকুক না কেন, ভবন পরিকল্পনা করার সময় সেই সংস্কৃতিকে কোনো বিশেষ ছাড় না বিষয়টি  স্থপতিরা যেন নিশ্চিৎ করেন।

Church of Saint Francis of Assisi

নিয়েমায়ের পেশাগত জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার প্রথম পরিণতি পেয়েছিল ১৯৩৬ সালে, যখন তার আদর্শ লো করবুজিয়েকে ব্রাজিল সরকার রিওতে এসে শিক্ষা আর স্থাস্ব্য মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবন পরিকল্পনা করে দেবার জন্যে কমিশন দিয়েছিল । ব্রাজিলের স্থপতিদের যে দলটিকে মহান এই ইউরোপীয় স্থপতিকে এই বিশাল আর সন্মানজনক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেখানে অংশ নিতে নিইয়েমায়েরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আর তার সাথে কাজ করার সময়, নিয়েমায়ের লো করবুজিয়ের প্রতি চূড়ান্ত শ্রদ্ধা অটুট রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু একই সময়ে ব্রাজিলে এই আমন্ত্রিত অতিথি দেশটির সংস্কৃতি আর জলবায়ুর প্রতি ঠিক কতটা অন্ধ সেই বিষয়টি তিনি লক্ষ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অসকার তার বিখ্যাত বৈশিষ্ট্যসূচক ব্যক্তিত্বের আকর্ষণীয়তার (পরবর্তীতে যা কিংবদন্তীর রুপ নিয়েছিল) পূর্ণ ব্যবহার করে করবুজিয়েকে প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যেন ভবনগুলো পরিকল্পনায় তিনি যেন তার খুব বেশী মাত্রায় অনমনীয় সুতীক্ষ্ম বিশ্বজনীনতাবাদী ইচ্ছাগুলো পরিত্যাগ করেন ও স্থানীয় সংস্কৃতি আর জলবায়ুর প্রতি কিছু প্রয়োজনীয় ছাড় দেন। তার প্রভাবেই সেই ভবনগুলোর জানালাগুলো সূর্যের তীব্র আলো প্রতিরোধকারঅলুভের‘ (আমেরিকান ইংরেজীতে louver  আর বৃটিশ ইংরেজীতে louvre মূলত জানালার ব্লাইন্ড বা সাটার যা তৈরী হয়  আনুভূমিক পাতকাঠ, ধাতু বা প্লাস্টিকের লম্বা, সরু পাত ভিনিশীয় জানালার খড়খড়িতে এ রকম পাত ব্যবহার করা হয়, যার খানিকটা কোণ করে নির্মাণ করা যা আলো আর বাতাসকে ঘরে প্রবেশ করতে দেয় কিন্তু সরাসরি সুর্যের আলো আর বৃষ্টিকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়না।) অর্জন করতে পেরেছিল, সেই সাথে নীচতলায় উন্মুক্ত এলাকাটি একটি প্রথাগত পর্তুগীজ শৈলীতে বিমূর্ত মোটিফের একটি বিশাল টাইল নির্মিত শিল্পকর্ম পেয়েছিল। 

এই সাফল্যে সাহসী হয়ে, ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ থেকে নিজেকে স্বাধীন করে নেবার তাগিদ অনুভব করেছিলেন নিয়েমায়ের । স্থাপত্যে তার অসাধারণ অবদানের একটি অবশ্যই, তিনিই হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম স্থপতি যিনি একধরনের আঞ্চলিক আধুনিকতাবাদের ব্যবহার করেছিলেন: তার ক্ষেত্রে এটি ছিল ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি আর জলবায়ু দ্বারা পরিপৃক্ত একটি আধুনিকতাবাদ।

পুরোপুরিভাবে তার নিজস্ব মৌলিক ভবনটি সমাপ্ত হয়েছিল তার ছত্রিশ বছর বয়সে, ১৯৪৩ সালে, যার জন্যে তাকে কমিশন দিয়েছিলেন বেলো হরিজোন্টের মেয়র ও ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি জুসেনিলো কুবিটশেক। এটি ছিল বেশ কিছু ভবনের একটি কমপ্লেক্স, যেখানে ছিল একটি রেস্ট্যুরেন্ট, একটি নাচবার হল, একটি ইয়ট ক্লাব, এবং সবচেয়ে বিখ্যাত প্রার্থনা করার একটি জায়গা, যা এখন পরিচিত চার্চ অব সেইন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসি ইন বেলো হরিজোন্টে। যদিও স্থানীয় ধর্মযাজকটা এটিকে দেখামাত্রই ঘৃণা করতে শরু করেছিলেন ( রিও তৎকালীন আর্চবিশপ আন্তোনিও ডোস সানতোস কাবরাল এটিকে বলেছিলেন, ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী শয়তানের বোমা থেকে বাঁচার আশ্রয় কেন্দ্র), কিন্তু খুব শীঘ্রই এটি শনাক্ত হয়েছিল স্থাপত্যের একটি মাস্টারপিসে। 

Reinterpretating-Religious-Architecture-Church-of-Saint-Francis-of-Assisi-by-Oscar-Niemeyer-Homesthetics-1 (1)

এই কমপ্লেক্সটিকে কোনো সমতলেই সরল কোনো রেখার কারো নজরে পড়বে না, কারণ নিয়েমার তখন সেই ধরনের সরলরেখার ব্যবহারকে ইউরোপীয় এবং (ফ্যাসিজমের সেই স্বর্ণযুগে) বিতৃষ্ণা জাগানো কর্তৃত্ববাদী বাধ্যবাধকতা হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে স্থাপত্য এর অসহনীয় কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেয়েছিল রিইনফোর্সড কনক্রিট আবিষ্কারের সাথে এবং নিয়েমায়ের প্রস্তাব করেছিলেন, স্হপতিদের উচিৎ হবে নতুন এই স্বাধীনতাটিকে আরো সৃজনশীল উপায়ে ব্যবহার করা। এরপর থেকে নিইয়েমায়ের তার বৈশিষ্ট্যসূচক কার্ভ বা বক্রতাগুলো ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন তার সব নির্মাণে, এবং সেটিকে তিনি দেখেছিল জাতীয়তাবাদী একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যা তার মতে এর প্রকৃতিতে ব্রাজিলের একান্তভাবেই নিজস্ব।

55910rm-nunes-museu-oscar-niemeyer-shutterstock-361054295

মানুষের সৃষ্ট, কঠোর আর অনমনীয় সমকোণ কিংবা কোনো সরল রেখা আমাকে আকর্ষণ করেনা, তিনি বলেছিলেন, আমাকে আকর্ষণ করে স্বাধীন ও ইন্দ্রিয়পরবশ বক্রতা, যে বক্রতাগুলো আমি পাই আমার দেশের পর্বতমালায়, এর নদীর আঁকাবাঁকা পথে, আর প্রিয়তম রমণীদের শরীরে। অবশ্যই পরে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, সারা জীবন ধরেই নারীর সৌন্দর্যের প্রতি তিনি গভীরভাবে সংবেদনশীল ছিলেন। তার নানা সম্পর্কের জন্যে রিওতে তিনি বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তার প্রেমিকাদের অনেকের সাথেই তার বয়সের একটি নাটকীয় ব্যবধান ছিল। যেমন ৯২ বছর বয়সে তার একজন প্রেমিকার বয়স ছিল মাত্র ২৫।

on_1Illustration by Stuart Patience

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভবনটির মতই পামপুলহা চার্চের দেয়ালে টাইলের কাজ ছিল। এটি দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল একই সাথে ঐতিহ্যের মধ্যে এর শিকড় সুরক্ষিত করেও অত্যন্ত আধুনিক কিছু হতে পারে, একটি চার্চও ভবিষ্যবাদী উড়োজাহাজ রাখার হ্যাঙ্গার সদৃশ হতে পারে, কিন্তু তারপরও এটি একই সাথে সেইন্ট ফ্রান্সিস এবং কিছু (সুনির্দিষ্টভাবে চিত্তাকর্ষক) মুরগীর দৃশ্য ধারণ করার জন্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

কাসা দাস কানোয়া

ইন্দ্রিয়সুখ যা নিয়েমায়ের তার জীবনে উপভোগ করেছিলেন সেটি তার পরিকল্পিত ভবনগুলোকে পরিপৃক্ত করেছিল। তার বিখ্যাত বাসভবন, কাসা দাস কানোয়াস Casa das Canoas (১৯৫১), একটি অভিজাতপূর্ণবিকশিত প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অংশ হিসাবে ইন্দ্রিয়সুখাসক্তিকে পুনস্থাপন করেছিল। ইন্দ্রিয়সুখাসক্তিকে তরুণ, সব দ্বায়িত্বমূক্ত, অশোভন আর সুন্দরীদের বিশেষ ক্ষেত্র হিসাবে প্রস্তাবনা করার পরিবর্তে তিনি এমন একটি বাড়ী নির্মাণ করেছিলেন যেখানে কেউ হয়তো কল্পনা করতে পারেন, যে তিনি কোনো হিসাবরক্ষক হতে পারেন কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা হতে পারেন ( অর্থাৎ যে কিনা দ্বায়িত্ববান, পরিশ্রমী মানুষ, যিনি প্রশাসনিক আর কারিগরী নানা সমস্যা নিয়ে বেশ ব্যস্ত) এবং আপনার শরীরের স্বাদও নিতে পারেন।

architectural-design-Casa-Canoas-reproduced-VisualARQ

এখানে আপনি এমন কোনো কথোপকথনে নিমজ্জিত হতে পারবেন যা আপনার মনকে প্রসারিত করবে, এবং একই সাথে আপনি আপনার প্রেমিকার হাটুর পেছনের মৃদৃভাবে হাত বোলাতেও পারবেন, আর আঞ্চলিক সেলস প্রজেকশন নিয়ে চিন্তা বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কনফারেন্স কল নেবার আগে এর উষ্ণ কোনো ছায়ায় আপনি চুমুও খেতে পারবেন। এই বাড়িটি খানিকটা আত্মবিশ্বাসী আর অনুপ্রেরণাদায়ী বন্ধুর মত যিনি সঠিক সময়ে আশ্বস্ত করার মত মৃদু স্বরে হুমম বলেন। কেউ হয়তো কল্পনা করতে পারেন কোনো যুগল এই বাড়িতে এমন একটি উপায়ে যৌনতায় রোমাঞ্চাভিলাষী হতে যথেষ্ট পরিমান নিরাপদ অনুভব করবেন, তাদের সাধারণ বাড়িতে বহু বছর ধরে যা হয়ে ওঠা অসম্ভব ছিল। 

ব্রাজিলীয় আত্মপরিচয়কে সংঙ্গায়িত করতে স্থাপত্য ব্যবহার করতে তার সবচেয়ে দুঃসাহসী প্রচেষ্টা ছিল ব্রাজিলের নতুন রাজধানী ব্রাসিলিয়ার জন্যে তার পরিকল্পনায়। ১৯৫৬ সালে কুবিটশেক যখন তার সাহায্য চেয়েছিল দেশের কেন্দ্রে পুরোপুরিভাবে একটি নতুন শহর পরিকল্পনা করার জন্যে, যা হবে পুরানো রাজধানীর রিও থেকে পুরোপুরিভাবে ভিন্ন ও কলুষতামুক্ত। নিয়েমায়ের ন্যাশনাল কংগ্রেস, একটি ক্যাথিড্রাল, একটি কালচারাল কমপ্লেক্স, বহু মন্ত্রণালয় ভবন, বাণিজ্যিক আর আবাসিক ভবনের পরিকল্পনা একেছিলেন। পুরো পরিবেশটি সৃষ্টি করা হয়েছিল মর্যাদাপূর্ণ, আশাবাদী, স্থানীয় প্রকৃতির সাথে সংপৃক্ত করে। আমরা দেখি তিনি আবাসিক ভবনগুলো স্তম্ভের উপর (প্রায়শই ভি আকৃতির) তুলে ধরেছেন যেন এর প্রকৃতি নীচের জায়গাটির দখল নিতে পারে, ক্রান্তীয় জলবায়ু আর স্থানীয় পরিবেশের সাথে একটি যোগসূত্রতার সৃষ্টি করে।

অবশ্যই তার কাজে আমরা সেই ব্রাজিলকে দেখি না, যা আসলেই সেই ব্রাজিল ছিল, কিন্তু তিনি আশা আর বিশ্বাস করতেন ব্রাজিল একদিন এমন হবে। তিনি জানতেন স্থাপত্য আর স্থপতিরা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিকে আশাবাদ আর উৎসাহব্যঞ্জক একটি উপায়ে নুতন আর উত্তম পথের দিকে নির্দেশনা গ্রহন করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। ব্রাজিল এখন উন্মত্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি দেশ, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান রেইনফরেস্ট (ক্রান্তীয় বনাঞ্চল), আমাজোনিয়ার গ্রাম, ফাভেলা বা বস্তি আর ফুটবল, সমূদ্রের বেলাভূমি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারকারগুলো নিয়ে তীব্র মতানৈক্যের একটি দেশ।

projetado-por-oscar-niemeyer-o-congresso-nacional-promove-visitas-guiadas-que-contam-um-pouco-da-historia-do-poder-legislativo-no-pais-percorrendo-salas-galerias-e-plenarios-das-duas-ca

কিন্তু এসব কিছুই স্পষ্ট নয় ব্রাসিলিয়ার ন্যাশনাল কংগ্রেসের ধ্যানমগ্নতায়। বরং এই ভবনটি যেন ভবিষ্যতের একটি ব্রাজিলের স্বপ্ন দেখছে। দেশটির জন্যে এটি কাঁচ আর রিইনফোর্সড কংক্রিটের আদর্শ, যা উন্নয়নের দিকনের্দশনা, যেদিকে দেশটি অগ্রসর হচ্ছে। ভবিষ্যতে, এভাবেই ভবনটি যুক্তি দিচ্ছে, ব্রাজিল এমন একটি দেশ হবে যেখানে যৌক্তিকতা শক্তিশালী হবে। যেখানে শৃঙ্খলা আর সম্প্রীতি রাজত্ব করবে।  যেখানে অভিজাত্য আর প্রশান্তি স্বাভাবিক। শান্ত, চিন্তাশীল মানুষ সতর্কভাবে পরিশ্রম করবে এবং আইন নিয়ে সঠিকভাবে ভাববে, এর অফিস আর টাওয়ারে দক্ষ সেক্রেটারীরা বিচক্ষণ সব ব্রিফিং নোট লিখবে, যেখানে ফাইলিং সিস্টেম হবে নিখুঁত, কোনো কিছুই হারিয়ে যাবেনা, উপেক্ষা, অবহেলা আর ভুল জায়গায় রাখা হবে না। নৈর্ব্যক্তিক প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিবেশে আলোচনাগুলো হবে। দেশটি ব্যবস্থাপনা হবে ক্রটিহীন।

সুতরাং ভবনগুলো দেখা যেতে পারে নিয়েমায়েরের সৃষ্ট স্তাবকতার একগুচ্ছ প্রবন্ধ হিসাবে, যা ইঙ্গিত দেয় এইসব আরাধ্য গুণগুলো ইতিমধ্যে খানিকটা মাত্রায় দেশটি ও এর শাসকশ্রেণী ধারণ করছেন। আদর্শ আমাদের মধ্যে শ্লাঘা উদ্রিক্ত করে। কারণ আমরা সেগুলোকে শুধুমাত্র দূর ভবিষ্যসূচক কোনো বিজ্ঞপ্তি হিসাবে দেখি না বরং আমরা কেমন তার একটি বিবরণ হিসাবেও ভাবতে শুরু করি। আমরা তোষামদিকে খারাপ কিছু হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, কিন্তু বাস্তবিকভাবে এটি সহায়কও হতে পারে, কারণ এটি আমাদের প্ররোচিত করে এর উপস্থাপিত সেই আকর্ষণীয় ইমেজটিকে বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হবার জন্যে। অনেকটাই কোনো শিশুর প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করার মত এবং পরিণতিতে যাকে বুদ্ধিমান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, এবং সে বর্তমানে যা তার চেয়ে বেশী কিছু হয়ে ওঠার জন্যে সে সহায়তা ও নির্দেশনা পায়। তারা সেই ব্যক্তিটিতে রূপান্তরিত হয়, যা ইতিমধ্যে সে রূপান্তরিত হয়েছে বলে প্রশংসা করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের উত্তম বিকাশের ক্ষেত্রে প্রায়শই অন্তরায় সাধারণত আমাদের অহংকার নয় বরং আত্মবিশ্বাসের অভাব। নিয়েমায়ের তার শেষ জীবন অবধি প্রচুর উৎপাদনশীল ছিলেন, পৃথিবীব্যাপী তিনি শিক্ষক হিসাবে ঘুরেছেন, লিখেছেন, ভাস্কর্য আর আসবাব পরিকল্পনা করেছেন। 

১০৪ বছর বয়সে ২০১২ সালে তিনি মারা যান। তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় বিদায় জানানো হয় ।  অসংখ্য মানুষ তার শবযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। সেদিন এই জাতিটি সন্মান করছিল একজন স্থপতিকে, যিনি দেশটিকে এর একটি অর্জনযোগ্য আদর্শ প্রতিকৃতি দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ব্রাজিলকে সাহায্য করেছিলেন নির্বীজ ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, সেই ভবনগুলো নির্মাণ করতে যা জাতি হিসাবে ব্রাজিলের অনন্যতার প্রতিফলন করবে। নিয়েমায়ের এখনও সব স্থপতির জন্যে দৃষ্টান্ত হিসাবে রয়ে গেছেন যারা সেই ধরনের ভবন নির্মাণ করতে চান যা তাদের নিজস্ব এলাকার স্বতন্ত্রতার সাক্ষ্য বহন করবে, সেই স্হপতিরা যারা হয়তো তাদের ফোনগুলো বিশ্বজনীন ডিজাইন হলে কিছু মনে করবেন না, কিন্তু যারা তীব্রভাবে সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট করে তাদের ভবনগুলো বানাতে চাইবেন।

 

অসকার নিয়েমায়ের: শ্রদ্ধাহীন বক্রতায় কংক্রীটের সাম্বা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s