লুই কান: আলোর স্থপতি

গ্রেট থিংকার্স প্রজেক্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে: আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

Salk Institute at the Vernal Equinox

আধুনিক স্থাপত্য সত্যিকারভাবে বহু নতুন আর যুগান্তকারী সৃষ্টির দাবী করতে পারে: ঝলমলে, আকাশ ছোঁয়া উচু দালান, ভাঁজ করা অরিগামীর মত অপেরা হাউস, কিংবা এমনকি নভোযানের মত যাদুঘর। তবে সব কিছুরই নতুনত্বের সাক্ষ্য বহন করতেহবে এমনি একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করার ফলশ্রুতিতে স্থাপত্যকলার এই আধুনিকতাবাদভাবজড়তায় আক্রান্ত হয়, যে বিষয়গুলো কোনো একটি দালানকে সুন্দর করে তুলতো সেগুলো বেশীর ভাগই এখন পরিত্যাগ করা হয়েছে। তবে আধুনিক যুগের সেরা স্থপতিরা এইভ্রান্তিটাকে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন, পুরোনো, একঘেয়ে প্রচলিত ভাবনাগুলো পরিত্যাগ করলেও সফলভাবে তারা সেই ঐতিহ্যের অর্থবহ আর সুন্দর বিষয়গুলো তাদের সৃষ্টির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলেন। আর সম্ভবত এই ভারসাম্যটি সবচেয়ে সফলভাবে অর্জন করতে পেরেছিলেন খামখেয়ালী, আত্মভোলা এক আমেরিকান, যার নাম লুই কান (Louis Isadore Kahn (জন্ম নাম: Itze-Leib Schmuilowsky)।

লুই কান (এঁকেছেন শিল্পী স্টুয়ার্ট পেইশেন্স (https://www.stuartpatience.co.uk/)

কান জন্মগ্রহন করেছিলেন ১৯০১ সালে বর্তমান এস্তোনিয়ার একটি দরিদ্র ইহুদি পরিবারে। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি স্থাপত্যকলা পড়েন, কিন্তু ১৯৫০ এর দশকে রোম ভ্রমণ করার পর তার পেশার সবচেয়ে সৃজনশীল বহিঃপ্রকাশটি ঘটেছিল, যখন তিনি নতুন করে প্রাচীন স্থাপত্যকলার মূল সারটি অনুভব করতে পেরেছিলেন। আধুনিক স্থাপত্যকলায় খানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  অবদানটি হচ্ছে,  নতুনত্ব আর আধুনিকতাবাদের স্বচ্ছতাকে না হারিয়ে এই সব পুরোনো এবং এমনকি প্রাচীন ‍উপাদানগুলোকে তার কাজের মধ্যে নিয়ে আসা। তার এই সংশ্লেষণের একটি উদহারণ হচ্ছে প্রতিসাম্যতা বা সিমেট্রির প্রতি কানের বিশেষ আকর্ষণ, যা আধুনিক স্থাপত্যকলার দৃষ্টিতে ছিল কল্পনাবিবর্জিত এবং প্রথাগত ধারার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের চিহ্ন।

Atrium, Yale Center for British Art, New Haven, Connecticut

কান ক্যালিফোর্নিয়ার লাহয়ায় সল্ক ইন্সস্টিটিউটটি পরিকল্পনা করেছিলেন একটি কেন্দ্রীয় ফাউনন্টেন বা পানির ফোয়ার চারপাশে সুসমভাবে সজ্জিত দালানের একটি কমপ্লেক্স হিসাবে। এই ধরণের প্রতিসাম্যতা  বো’জার্ট (Beaux-Arts) শৈলীর বৈশিষ্ট্যসূচক। (যে অ্যাকাডেমিক স্থাপত্য শৈলীটি নিওক্ল্যাসিকাল স্থাপত্য শৈলীর অংশ যা প্যারিসে École des Beaux-Arts এ শেখানো হতো), কিন্তু কান তার এই পেছনমুখী সৃষ্টিতে আদৌ বিচলিত ছিলেন না, তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে যদি সবাই বোজার্ট দেখতে চায়, আমার কোনো অসুবিধা নেই তাতে, আমি আর সবার মত ভালো স্থাপতে আগ্রহী’।

The Esherick House in Philadelphia

হুবুহু দালানের সারি ব্যবহার করে কান দর্শকের দৃষ্টিকে তার ডিজাইনের কেন্দ্রের দিকে এবং সেটি পেরিয়ে সাগরের দিকে পরিচালিত করেন। ইনস্টিটিউটের ঠিক মাঝখানদিয়ে প্রবাহিত পানির ঝর্ণাধারা সুর্যের পথের সাথে এমনভাবে একই রেখায় এমন পরিকল্পিত হয়েছে যেন এটি ভারনাল (মহাবিষুব) এবং অটামনাল (জলবিষুব) ইকুইনক্স ( ২০ মার্চে এবং ২২ সেপ্টেম্বর, যেদিন পৃথিবীর বিষুবরেখা সূর্যের কেন্দ্র অতিক্রম করে, পৃথিবী সূর্যের দিকে যেমন ঝুকেও থাকেনা আবার দুরে হেলেও থাকেনা, যেদিন দিন ও রাতের পরিমান মোটামুটিভাবে সমান হয়) সুর্যের পথের সাথে মিলে যায়। কান তার সব সৃষ্টির মধ্যে এমন করে একটি মাহাত্ম সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন যা আধুনিক স্থাপত্যকলায় বলা যায় অনুপস্থিত।

Phillips Exeter Academy Library

আমরা হা হয়ে কোনো উঁচু স্কাইস্ক্রাপারের দিকে তাকাতে পারি ঠিকই কিন্তু কোন গথিক ক্যাথিড্রালের অভ্যন্তরে দাড়ালে যে প্রায় অতিপ্রাকৃত একটি বিস্মায়ানুভূতি সৃষ্টি করে আমাদের মনে সেটি তা কখনো সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু কান তার আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে সেই বিশালতাকে পুনউপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কানেকটিকাটে ইয়েল সেন্টার ফর ব্রিটিশ আর্ট এ তিনি দর্শকের চোখকে পরিচালিত করেন উপরের দিকে, উঁচু জানালাসহ ছাদের দিকে, চার্চের ডোম যে কাজটি করেছিল। দালানের প্রশস্ত কলামগুলো আমাদের মনে সমীহ জাগায়, এটি দর্শকের মনে শুধু শিল্পকলার প্রতি সন্মান জাগায় না, দালানটি, মিউজিয়ামএবং শিল্পকলার সাংস্কৃতিক গুরুত্বের ধারণার প্রতি সমীহ সৃষ্টি করে।

The Kimbell Art Museum in Fort Worth, Texas

আধুনিক সব স্থপতিরা যখন স্টিল, কংক্রীট এবং কাঁচের এর উপর নির্ভর করেছিলেন, কান চেষ্টা করেছিলেন আমাদের ইন্দ্রিয়কে স্পর্শ করে পারে এমন আরো কিছু উপাদানব্যবহার করার জন্য। তিনি নিয়মিত তার অফিসে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসতেন সিরামিক, তামা কিংবা নানা অপ্রচলিত উপাদান কিভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে তা জানতে। ইয়েলে শিক্ষক থাকাকালীন একবার তার ক্লাসকে ক্লে বা কাদামাটিকে কতভাবে ব্যবহার করাযেতে পারে সেটি খুঁজে বের করতে বলেছিলেন। মোটকথা তিনি সেই ধারণাটি বর্জন করেছিলেনযা দাবী করে একজন স্থপতিকে অবশ্যই সবচেয়ে কার্যকরী আর আধুনিকতম উপাদান নিয়ে কাজকরতে হবে। বরং তিনি তার ছাত্রদের বলতেন, নির্মাণ সামগ্রী আর উপাদানের কাছে উপদেশ চাইতে: ‘‌তোমরা কোন ইটকে জিজ্ঞাসা করো, ইট তুমি কি চাও? এবং ইট হয়তো উত্তরে বলবে, আমি একটাখিলান বা আর্চ পছন্দ করি। তখন আবার ইটকে জিজ্ঞাসা করো, বেশ, ইট,আমিও সেটাই চাই, কিন্তু আর্চ বানানো খরচের ব্যপার, আমি একটা বরং কংক্রিট এর লিন্টেল কাজে লাগাতে পারি। এবং তারপর তুমি বলবে, ইট,এ বিষয়ে তোমার কি মতামত? ইট বলবে, আমি আর্চ পছন্দ করি।’ অর্থাৎ সংক্ষেপে ইট যা বলবে তাই করা উচিৎ।

জাতীয় সংসদ ভবন, ঢাকা, বাংলাদেশ :

কান বিশেষভাবে পছন্দ করতেন অপ্রত্যাশিত দুটি উপাদানকে বুদ্ধিমত্তার সাথে পাশাপাশি ব্যবহার করতে, যেমন কংক্রীট এবং ওক কাঠ, যেমন তিনি ১৯৫৯ সালে সেটি করেছিলেন এশেরিক হাউজে। সাধারণ ওক কাঠের সাথে যে দৃশ্যটা ভেসে ওঠে সেটি গৃহের অভ্যন্তর, ভিক্টোরিয়‍যুগের ধূমপান করার কোন রুম, বা ধুলোয় ভরা কোন প্রাচীন লাইব্রেরী, অন্যদিকে কংক্রীট আমাদের মনে করিয়ে দেয় নৈর্ব্যক্তিক কারখানা কিংবা দূরবর্তী বিচ্ছিন্ন কোন ভবিষ্যতের দালানের কথা। কিন্তু একই সাথে, দুটিমাধ্যম দুটি খুবই আলাদা অথচ আকর্ষনীয়ভাবে সম্পুরক গুণাবলী প্রদর্শন করে। কাঠ সেইপরিসরকে দেয় উষ্ণতা, ঘরোয়া আবহ যা কোন কোন ঘরকে রুপান্তর করে বই পাগল কোন মানুষের জন্য সঠিক জায়গায়, অন্যদিকে কংক্রীট শক্তি আর স্থিতিশীলতার অনুভূতি সৃষ্টি করে যা বাইরের পৃথিবীকে আমাদের নিরাপদ একটি আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দেয়। এই উপাদানের সংমিশ্রণ খুব সুক্ষ্মভাবে জানান দেয় আমরা স্বাচ্ছন্দ্য আর দৃঢ়তা একসাথে পেতে পারি।

কিম্বল আর্ট মিউজিয়ামের অভ্যন্তর

স্থপতি হিসাবে কান চিরস্মরণীয় থাকবেন বিশাল মাপের একজন স্থপতি হিসাবে  যিনি একজন স্মারকসূলভ বা মনুমেন্টলাল স্থাপত্যসৃষ্টি করে গেছেন – যে সময় বেশীরভাগ আধুনিক স্থপতি মনুমেন্টস প্রত্যাখ্যান করেছেনঅপ্রয়োজনীয় আর আবেগপ্রবণ হিসাবে । ১৯৩৮ সালে স্থাপত্য সমালোচক লুইস মামফোর্ড দৃঢ়ভাবে দাবী করেছিলেন, ‘যদি এটি স্মারকসূচক হয় এটি আধুনিক হতে পারেনা, আর যদি আধুনিক হয় তাহলে সেটি স্মারকসূচক হতে পারেনা’। কিন্তু কান ভালোবাসতেন স্মারক সূচক স্থাপত্য। রোমে তার গুরুত্বপূর্ণ সেই ভ্রমনটির পর তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি অবশেষে অনুধাবন করতে পারছি, ইতালীতে স্থাপত্য ভবিষ্যতের সব কাজের জন্যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে – যারা এভাবে সেটি দেখতে পারছেন না, তাদের উচিৎ হবে আবার ভালো করেদেখা। আমাদের কাজ এর তুলনায় দেখতে খুবই সামান্য’।

জাতীয় সংসদ ভবন, ঢাকা, বাংলাদেশ

টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থ এ কিম্বেল আর্ট মিউজিয়াম, যে মার্বেলগুলো কান ব্যবহার করেছিলেন তা প্রাচীন দালানের প্রতি কানের সেই ভালোবাসার স্বাক্ষর বহন করছে। ১৯৭৪ সালে যখন কান মারা যান, তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থপতি,এবং এখনও তিনি প্রভাবশালী। কানের গুরুত্ব রয়ে গেছে ভাবজড়তায় আক্রান্ত আধুনিকতাবাদকে অতিক্রম করে সুন্দর ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য উপাদানে প্রত্যাবর্তনে, ডিজাইনের মুল ক্যানোনে তাদের যোগ্য অবস্থানকে নির্দেশ করারমাধ্যমে।যেখানে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্থাপত্য ভাবগম্ভীরতা, সৌন্দর্য, আভিজাত্য, বিস্ময়াভূত হবার ধারা অব্যাহত রাখে।

লুই কান ((Image property of ArchDaily)

(( ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত))

লুই কান: আলোর স্থপতি

One thought on “লুই কান: আলোর স্থপতি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s