আর্ট, নাকি আর্ট না

দার্শনিক ডেমন ইয়ং এবং গ্রাহাম প্রিস্টের একটি লেখা অবলম্বনে: 
কাজী মাহবুব হাসান ও আসমা সুলতানা

মার্সেল দ্যুশাঁর ফাউন্টেইন (১৯১৭)

শিল্পকলা এবং দর্শনের জন্যএকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল ১৯১৭ সালে: শিল্পী মার্সেল দুশ্যাঁ, আলফ্রেড স্টাইগলিৎসের নিউ ইয়র্ক স্টুডিওতে প্রথমবারের মত জনসমক্ষে প্রদর্শন করেছিলেন তাঁর অভূতপূর্ব শিল্পকর্ম, ‘ফাউন্টেইন’। আর সেটি ছিল, শুধুমাত্র একটি ইউরিনাল, চীনামাটির একটি মূত্রাধার, যেখানে শুধু স্বাক্ষর করা ছিল ‘R. Mutt’। এইশিল্পকর্মটি খুবই কুখ্যাত এর পরিচিতিতে। এমনকি আভোঁ-গার্ড শিল্পিদের মানদণ্ডেও। এটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত একটি শিল্পকর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল। সোসাইটি অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্টিস্টস এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যদিও প্রদর্শনী ফি দিয়েছে এমন সব শিল্পীদের শিল্পকর্ম সেখানে প্রদর্শন করার কথা ছিল।


Marcel Duchamp Fountain, 1917, photograph by Alfred Stieglitz at 291 (art gallery) following the 1917 Society of Independent Artists exhibit, with entry tag visible

প্রায় এক শতাব্দী ধরেই,  জটিল দুর্বোধ্য একটি শিল্পকর্ম হিসাবে এটি এর অবস্থান ধরে রেখেছে। ‘ফাউন্টেইন’ শিল্পকর্মটিকে, যেমন, দার্শনিক জন পাসমোর সারসংক্ষেপ করেছিলেন এভাবে: ‘শিল্পের নামে একটুকরো দুষ্টামি’।যদিও বহু দর্শক এই শিল্পকর্মটিকে খুব গুরুত্বের সাথে গ্রহন করেছিলেন, কিন্তু  কোনো সন্দেহ নেই কিছু স্থূল রসিকতা অবশ্যই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। দুশ্যাঁ এই ইউরিনালটিকে একেবারে উদ্দেশ্যহীনভাবে নির্বাচন করেননি। ‘ফাউন্টেইন’ নামের শিল্পকর্মটিতে শুধুমাত্র অশ্রদ্ধা প্রদর্শন ছাড়াও আরো অনেক কিছু অর্ন্তভুক্ত ছিল। এই শিল্পকর্মটিকে যা আকর্ষণীয় করেছিল, সেটি হচ্ছে, দর্শনে এর অবদান। ধারণাসংক্রান্ত বা কনসেপচুয়াল শিল্পকর্মের এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান নিয়ে আলোচনা করেছেন অনেক আলোচক; আর রবার্ট হিউজের ভাষায় সবচেয়ে ভয়ানক ‌‘আগ্রাসী’ পূর্বনির্মিত এই বস্তুটির অবশ্যই স্থায়ী একটি উত্তরাধিকার আছে।  

২০০৪ সালে, বহু শত শিল্পবোদ্ধাদের ভোটে এটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল। এই ইউরিনালটি অ্যান্ডি ওয়ারহল থেকে ইয়োজেফ বোউস থেকে ট্রেসি এমিন সহ বহু শিল্পীকে প্রথাগত শিল্পকর্মের ধারণাটিকে পুনর্বিবেচনা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্যের বদলে হঠাৎ করে ব্রিলো বক্স, অগোছালো বিছানা, একটি লেবুর সাথে যুক্ত লাইট-বাল্ব শিল্পকলা হয়ে উঠেছিল: আটপৌরে দ্রব্য, কিছু পূর্বনির্মিত, মূল ব্যবহার আর প্রাসঙ্গিকতা থেকে বিচ্যুত, শিল্পকলার গ্যালারীতে প্রদর্শনের জন্যে উপস্থাপিত। শিল্প সমালোচক রবার্টা স্মিথ পুরো বিষয়টি সারসংক্ষেপ করেছিলেন এভাবে: ‘(দুশ্যাঁ) সৃজনশীল শিল্পকলার কর্মটিকে একটি বিস্ময়কর রূপান্তরিত আদিম কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছিলেন। এটি কিংবা অন্য কোনো দ্রব্য বা কর্মকাণ্ডকে শিল্পকলা হিসাবে নাম দেবার সেই একক, বৌদ্ধিক, এবং মূলত নির্বিকার একটি সিদ্ধান্ত।’ আমরা পরেই দেখবো, দুশ্যাঁর সিদ্ধান্তটি উদ্দেশ্যহীন ছিলনা মোটেও, কিন্তু স্মিথের বর্ণনা আরো ব্যপক একটি ধাক্কার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দুশ্যাঁর কাজটি  এর দর্শকদের এমন কিছু ভাবতে প্ররোচিত করেছিল: এটি যদি শিল্পকলা হতে পারে, তাহলে যেকোনো কিছুই শিল্পকলা হতে পারে।

তারপর থেকে গবেষকরা ফাউন্টেইন নিয়ে আলোচনা করেছেন, নন্দনতত্ত্ব থকে চিন্তার জগতের দিকে এর দিক পরিবর্তন প্রদর্শন করতে। যেমন, দার্শনিক নোয়েল ক্যারোল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, ‘দুশ্যাঁর কাজটির দিকে আসলেই না তাকিয়ে কাজটি নিয়ে চিন্তা করাই বেশী উপভোগ্য হতে পারে।’ অঁরি মাতিসের উজ্জ্বল চিত্রকর্ম কিংবা বারবারা হেপওয়ার্থের পাথরের মার্জিত সম্ভ্রান্ত ভাস্কর্য নিয়ে  কিন্তু একই কথা বলা যাবেনা। এইসব প্রথাগত ধারণা, যেমন আমরা পরে দেখবো, সবই ফাউন্টেইনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট পরিমানে গভীরে প্রবেশ করেনা। তারা ফাউন্টেইনকে শিল্পকলা মনে করেন, খানিকটা উপহাসমূলক: উত্ত্যক্ত করার একধরনের বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা, তাদের স্বক্ষেত্রে  অ্যাকাডেমিক ঘরানার সহকর্মীদের প্রতি বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতে যা শিল্পীদের প্ররোচিত করেছিল। কিন্তু কিছু দার্শনিক এই শিল্পকর্মটি মূল শক্তির বেশ কিছু বিতর্কিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাদের মতে ফাইন্টেইন হচ্ছে ‘একটি শিল্পকর্ম, যতটুকু এটি শিল্পকর্ম নয়।’ এটি যা নয়, এটি আসলে সেটি, আর সেকারণে এটি যা, এটি তাই।  

অন্যার্থে এই শিল্পকর্মটি সত্যিকারের একটি স্ববিরোধিতা উপস্থাপন করে, যাকে বলা একটি ডায়ালেথিয়া (dialetheia), ফাউন্টেইন শুধুমাত্র কনসেপচুয়াল শিল্পকর্মেরই সূচনা করেনি, এটি আমাদের একটি অদ্ভুত এবং কৌতূহলোদ্দীপক ধারণাকে নিয়ে ভাবতে সুযোগ করে দিয়েছে: একটি শিল্পকর্ম, যা আসলে শিল্পকর্ম নয়, প্রাত্যহিক ব্যবহার্য একটি দ্রব্য, যা শুধুমাত্র প্রাত্যহিক ব্যবহার্য কোনো দ্রব্য নয়। কিন্তু কিভাবে এটি সম্ভব হতে পারে?

Andy Warhol Brillo Box (Soap Pads) 1964
Tracey Emin’s My Bed (1998)

খুব স্পষ্ট বিষয়টি দিয়ে শুরু করা যাক: দুশ্যাঁর ফাউন্টেইন হচ্ছে একটি ইউরিনাল বা মূত্রাধার, এটি কোনো ইউরিনালের চিত্রকর্ম কিংবা ভাষ্কর্য নয়, যদি পরের বিষয়টি এটি হতো, তাহলে ফাউন্টেইন হয়তো আরো কিছু কৌতূহলোদ্দীপক দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করতো, বরং এটি আসলেই ইউরিনাল, নির্দিষ্ট ধরনের ইউরিনালের একটি নমুনা, শুধু চোখ দিয়ে থেকে পৃথক করা সম্ভব নয় এমন অসংখ্য ইউরিনালের প্রোডাকশন লাইন থেকে নেয়া একটি নমুনা। এবং ঠিক একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এই ইউরিনালের নকশা বা শিল্পকর্মের কাঁচামাল থেকে এমন কিছু নির্মাণে দুশ্যাঁর কোনো ধরনের অংশগ্রহন ছিলনা। তাঁর অবদানটুকু ছিল শুধুমাত্র এই ইউরিনালের উপর স্বাক্ষর করে সেটিকে শিল্পকর্ম হিসাবে প্রদর্শন করা। দার্শনিক আর্থার ডান্টো, তাঁর ‘আর্ট, ফিলোসফি এবং দ্য ফিলোসফি অব আর্ট’ (১৯৮৩) প্রবন্ধে দুশ্যাঁ যখন এই কাজটি করেছিলেন তার একটি উপযোগী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ডান্টো বলেন যে এই ইউরিনালটি রূপান্তরিত হয়েছিল ‘কোনো একটি বিষয়ে’। এটি আর প্রাথমিক স্তরে ব্যবহার উপযোগী কোনো বস্তু ছিল না, এটি মূলত ছিল একটি ‘অর্থবহ’ বস্তু। আর এর কারণ, ‘এটি এখন’, ১৯৬৪ সালে একই নামে একটি নিবন্ধে ডান্টোর ভাষায় ‘শিল্পকলার জগতের অংশ।’  

খুব সরলভাবে শিল্পকলার জগৎ হচ্ছে, একটি পরিবেশ যেখানে, যেকোনো বস্তু একটি নতুন শক্তি অর্জন করতে পারে: তাদের সাধারণ উপযোগিতা ছাড়িয়ে অন্য কোনোকিছু প্রকাশ করে। তারা একটি নতুন শ্রেণীর অংশ, শিল্পকলা আর এটি এমন একটি বার্তা অর্জন করে যা তাদের বিনিয়ম মূল্য এবং সেই নতুন শ্রেণী থেকে পৃথক করা যেতে পারে (যে পার্থক্যে আমরা পরে আলোচনায় আসছি)। এটাই শিল্পকলার সেই বিখ্যাত অংশটি যা ডান্টোর ভাষায় ‘চোখ দেখতে পারেনা’ (ডান্টোর শব্দটি ছিল descry), ঐক্ষিক শিল্পকলায় দৃশ্যমান নয় এমন কিছু বিষয়গুলো।

Joseph Beuys, Capri-Batterie, 1985

এর মানে কিন্তু এই না যেশিল্পকলার জগতের বাইরের বস্তুগুলোর কোনো বার্তা থাকতে পারেনা, যেমন, পাবলিক টয়লেটেরসাইনগুলোও সরাসরিভাবে কোনো ‘বিষয়ের’ প্রতি ইঙ্গিত দেয়। তবে মূল বক্তব্যটি হচ্ছে, যখন তারা শিল্পকলার জগতের মধ্যে, বস্তুগুলো তাদের সাধারণ আটপৌরে ব্যবহারের বাইরেও একটি তাৎপর্য অর্জন করে। এটি শুধুমাত্র কোনো একটি দ্রব্যকে চিহ্নিত বা এর কাজ প্রদর্শন করেনা: এটি এক ধরনের বক্তব্য প্রদান করে।

দুশ্যাঁর ফাউন্টেইন শিল্পকলার নিজস্ব বিষয় সংশ্লিষ্ট বার্তার মূর্ত একটি প্রকাশ।  আমরা পরে দেখবো, এটি এই কারণে ‘ডায়ালেথিক’। ডান্টো ওয়ারহলের সোপ বক্সের উদাহরণ দিয়ে (দুশ্যাঁর ইউরিনালের শৈল্পিক দৌহিত্র) প্রস্তাব করেছিলেন, সেগুলো ‘শিল্পকলা সম্বন্ধে এক ধরনের বক্তব্য প্রদান করে, এবং নিজস্ব স্বরূপতার মধ্যে যেগুলো একত্রীভূত করেছে, সেই স্বরুপতাটি আসলেই কি সেই প্রশ্নটিও । দুশ্যাঁর ইউরিনালের ক্ষেত্রে বিষয়টি একইভাবে সত্য, যদিও অনুধাবন করা জরুরী যে, ওয়ারহল প্লাইউড ব্যবহার করে ‘ব্রিলো’ বক্সের খুবই বাস্তবসম্মত অনুলিপি সৃষ্টি করেছিলেন, কোনো দোকান থেকে কেনা বক্সগুলো প্রদর্শন না করে। আর এর ব্যতিক্রম দুশ্যাঁ সেই ইউরিনালটি নিজে সৃষ্টি করেননি, শুধুমাত্র একটি নতুন প্রাসঙ্গিকতায় এটি প্রদর্শন করেছিলেন।

দুশ্যাঁর বার্তার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে হলে, এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে বর্ণনা করা সহায়ক হতে পারে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঐক্ষিক শিল্পকলা তখনও প্রধানত সংশ্লিষ্ট ছিল ক্র্যাফ্ট বা শিল্প-কৌশল: কাদা, রঙ এবং ইত্যাদি নানা কিছুর শারীরিক রুপান্তর। কিন্তু সেই কাজগুলোকে প্রায়শই দেখা হতো সাধারণ ক্র্যাফটের চেয়ে অধিকতর মূল্যবান হিসাবে: সৌন্দর্যের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক সত্যগুলোর কিছু অনুকরণ। সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুরদিউ যেমন লক্ষ করেছিলেন, ‘শিল্পী কোনো পদার্থের সাথে বা এর বিরুদ্ধে কাজ করে, কিছু নৈতিক, অধিবিদ্যামূলক অথবা কমপক্ষে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা উদ্দেশ্যে, যা সাধারণ বাণিজ্য আর শ্রমের চেয়ে ‘উচ্চতর’।

Marcel Duchamp, L.H.O.O.Q, 1919

দুশ্যাঁর  ফাউন্টেইন এইসব কিছুর অ্যান্টিথিসিস, পরস্পরবিরোধী।  কোনো সুস্পষ্ট ক্র্যাফট এখানে নেই , অবশ্যই কোনো সূক্ষ্ম শিল্পীজনোচিত দক্ষতা নেই। ইউরিনালটি ডিজাইন এবং নির্মাণ করা হয়েছে কোনো মানদণ্ড অনুসরণ করে, কিন্তু মানদণ্ডটি উপযোগিতার, নন্দনতাত্ত্বিক নয়। দুশ্যাঁ খুবই স্পষ্টভাবে বিষয়টি প্রকাশ করেছিলেন, তিনি সমালোচকদের বিদ্রুপ করেছিলেন, পরে যখন তারা তার ফাউন্টেইনে সৌন্দর্য খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন, ১৯৬১ সালে তিনি অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘আমি তাদের মুখের উপর ইউরিনালটা ছুড়ে দিয়েছিলাম……..এখন তারা এটিকে এর সৌন্দর্যের জন্যে প্রশংসা করতে এসেছে।’

এটি এটাও প্রস্তাব করছে, এই ইউরিনাল একইসাথে  ‘নিম্ম’ মানের একটি দ্রব্য। যেখানে প্রস্রাব করা হয়, এর সৌন্দর্য কিংবা আধ্যাত্মিক সত্যের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকানোর কিছু নেই। এটি ছিল, ই. এইচ. গমব্রিখের ভাষায়, ‘শিল্পকলার আত্মম্ভরিতা আর গাম্ভীর্যের প্রতি ভেংচি কেটে অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করার একটি প্রচেষ্টা।’ অন্যার্থে ফাউন্টেইনের বার্তাটি ছিল উপহাসের: শিল্পকলার আধুনিক আদর্শগুলোর প্রতি। এটি উপহাস করেছিল, তবে সূক্ষ্ম শিল্পকলাকে প্যারোডি করে নয়, বরং নগ্নভাবে এর ঠিক বিপরীত রুপ ধারণ করার মাধ্যমে : শিল্পীর দ্বারা সৃষ্ট নয়, কুৎসিৎ, উপযোগবাদী, অমার্জিত, সর্বব্যাপী ইত্যাদি।

এই সুনির্দিষ্ট বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সেই চিন্তার বিরুদ্ধে আমাদের একটি যুক্তি প্রদান করে, যা দাবী করে শিল্পকলা হচ্ছে শুধুমাত্র সেই সবকিছুই যাদের আমরা সেই নামে ডাকবো। যেমন, আমরা দেখেছি দুশ্যাঁর ইউরিনালটি শিল্পীর  অযৌক্তিক আবেগনির্ভর নির্বাচন ছিল না। দ্রব্যটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোই এর বার্তাকে অর্থবহ করেছে। এবং এটি অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল খুব সুনির্দিষ্ট একটি ঐতিহাসিক যুগে। খুব বেশী আগে যদি এটি প্রদর্শিত হতো, ফাউন্টেইন  শিল্পকর্ম হিসাবে অবোধ্য বিবেচিত হতো, এমনকি যারা আভোঁ গার্ড, তাদের কাছেও। আর যদি বেশী বিলম্বে এটি প্রদর্শিত হতো, ততদিনে এটি হয়ে যেতো সেকেলে, যা আর ফ্যাশনদুরস্ত নয়। ইতিমধ্যে তখন দুশ্যাঁর শিল্পকলা জগতের উপর কিছুটা প্রভাব ছিল, যাকে বুরদিউ বলেছিলেন শিল্পকলার ক্ষেত্রে তার ‘মূলধন’।

এই বাস্তবতায়, এমন কোনো যুক্তি দেখানো সম্ভব নয় যে, কোনো কিছুকে আর্ট বা শিল্পকলা বলা হবে, শুধুমাত্র যার কারণ শিল্পকলার জগতের সদস্যরা এটি আর্ট বা শিল্পকলা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। বরং, এটিকে শিল্পকলা বলা হচ্ছে কারণ, এটি সঠিক সময় আর স্থানে অবস্থিত একটি বস্তু, এবং এটি প্রদর্শন করেছিল সঠিক ধরনের একজন শিল্পী।

সুতরাং আমরা হয়তো বলতে পারি যে কোনো বস্তুই শিল্পকলা হবার সম্ভাবনা বহন করে, কিন্তু আসলেই কখনো সেটি ঘটে না: শিল্পকলার জগৎ সবসময়ই একটি সুনির্দিষ্ট পরিবেশ যা কিছু শিল্পী,বার্তা আর বস্তুদের সেই অধিকার দেয়, অন্যদের দেয় না। সুতরাং ফাউন্টেইন শিল্পকর্ম নয় কারণ শুধুমাত্র এটিকে ‘শিল্পকর্ম’ বলা হয়েছে। এটি শিল্পকর্ম কারণ দুশ্যাঁ এটিকে সেভাবেই বিবেচনা করেছিলেন তার স্বাক্ষর আর এটি প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করে, আর এটি শিল্পকর্ম হিসাবে তার সেই ‘বিবেচনা’করার বার্তাটিকে শনাক্ত করা হয়েছিল, এবং সময়ের পরিক্রমায় শিল্পকলাজগতের সদস্যদের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল।

MARCEL DUCHAMP, NU DESCENDANT L’ESCALIER N°2

কিন্তু গুরুত্বের সাথে বীপরিত সেই দাবীটাকেও আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে: সেটি হচ্ছে ফাউন্টেইন কোনোভাবেই শিল্পকর্ম হতে পারে না। এখন, এটি আসলেই শিল্পকর্ম নয়, কিন্তু এটি শিল্পকলা নয়, এমন কিছু বলা মানে মূল বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। সত্যি, আসলেই ইউরিনালের নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য ছিল খুব নিম্মমানের, যা সংজ্ঞায়িত করেছিলেন দার্শনিক মনরো বিয়ার্ডসলে। এটি কোনো ধরনের ‘নান্দনিক অভিজ্ঞতা’ দান করবে এমন সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ। কারণ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধ করা সম্ভব এমন গুণাবলী এর উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু এর মানে এই না যে, ফাউন্টেইন  কোনোভাবেই শিল্পকলা নয়। দুশ্যাঁর কাজ শিল্পকর্ম, যার নান্দনিক মূল্যের চেয়ে ধারণাগত মূল্য অনেক বেশী। কিন্তু এমন কোনো বিচার সম্ভব কারণ শুধুমাত্র এটি শিল্পকর্ম; কারণ এটি শিল্পকলা জগতের এটি অংশ, এবং যেটিকে, অন্য আরো নীরিক্ষাসহ, এর নান্দনিক মূল্যের জন্যে মূল্যায়নযোগ্য।

এই মূল্যায়নকে যা দার্শনিকভাবে কৌতূহলোদ্দীপক করে তোলে তাহচ্ছে যে, ফাউন্টেইন, শিল্পকর্ম হিসাবে এর একটি বার্তা আছে, আর সেটি হচ্ছে: ‘এটি শিল্পকলা নয়।’ এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, এবং প্রায়শই এই কাজটি নিয়ে প্রথাগত ব্যাখ্যা যা স্পর্শ করতে পারেনা। ফাউন্টেইন আসলেই চিৎকার করে বলছে, ‘আমি শিল্পকলা নই’, কিন্তু সেটি সে করছে একটি শিল্পকলা প্রদর্শনীর স্তম্ভপীঠ বা মূর্তির বেদিকা থেকে। এটি এর বার্তা বহন করছে নিহিতভাবে শিল্পকলার শ্রেণী সব প্রথাগত চিহ্নিতকারী বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে: সৌন্দর্য, শিল্পনৈপুন্য, স্বকীয়তা, শৈল্পিক ব্যক্তিত্ব, সেই সাথে মানসিক আর নৈতিক উন্নতির স্বীকৃত মানদণ্ড, অভিব্যক্তি অথবা নান্দনিক সুখ। এই বার্তাটি তথাকথিত সেই ‘শিল্পকলা বিরোধী’। এই কাজটিকে যা এত ক্ষমতা দিয়ে সেটি হচ্ছে: এটি শিল্পকলা নয়, কিন্তু একইসাথে, এটি শিল্পকলাও।

Marcel Duchamp, The Bride Stripped Bare by Her Bachelors, Even (The Large Glass), 1915-23

ইউরিনালটি, যেমন আমরা দেখেছি, দুশ্যাঁ এটিকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্বাচন করেছিলেন, কারণ এটি বিংশ শতাব্দীর সূচনাপর্বের শিল্পকলার মৌলিক ধারণাগুলোর পুরোপুরি বিপরীত ছিল। সহজভাবে বলতে গেলে: যেহেতু ইউরিনালটি শিল্পকলা নয়, সেহেতু এর একটি সুনির্দিষ্ট শৈল্পিক বার্তা আছে, এবং শুধুমাত্র যেহেতু এটি শিল্পকলা, সেকারণেই এটি আদৌ কোনো বার্তা বহন করছে। অবশ্যই এটি একাধিক বার্তা বহন করতে পারে, যেমন, শিল্পকলার সাম্প্রতিক ধারণাগুলো বিভ্রান্ত, বিপথগামী, এবং কারুশিল্প শিল্পকলার জন্যে আবশ্যিক নয়, এছাড়া, শিল্পকলায় সৌন্দর্যের উপস্থিতি ঐচ্ছিক একটি বিষয়। কিন্তু এই ধরনের বার্তাগুলো এটি বহন করছে শুধুমাত্র যার কারণ, তার সময়ে শিল্পকলা জগতে, এটি শিল্পকলা ছিলনা।

সুতরাং আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে দুশ্যাঁর অবদানটি এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে: ‘একই সাথে এটি শিল্পকলা এবং শিল্পকলা নয়।’ এটি খুবই স্পষ্ট এবং নিরাভরণভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ, পরস্পরবিরোধী। কিন্তু শিল্পকলা জগতে অনেকের জন্যে, এই প্রস্তাবনাটি ছিল,  ইঙ্গিতে অথবা সুস্পষ্টভাবে, সত্য। আর সেটাই ফাউন্টেইনকে তাৎক্ষণিকভাবে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছিল, যা বহু নিবন্ধ লিখতে, শিল্পকর্ম সৃষ্টি, গ্যালারীতে দর্শকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।  দুশ্যাঁর ইউরিনালটি সঠিক কারণে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কারণ এর ভিত্তি একটি ডায়ালেথিয়া, একটি সত্যিকারের পরস্পরবিরোধী, এমন কিছু যা প্রথাগত যুক্তিবিদরা বিশ্বাস করেন অসম্ভব একটি বিষয় হিসাবে।

ডায়ালেথিজম হচ্ছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি, কিছু পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো সত্য, সুতরাং দার্শনিকরা যাকে principle of non-contradiction বলেন এটি তার বিরোধীতা করে: মোটামুটিভাবে এই মূলনীতিটি বলছে, কোনো একটি বার্তা একই সাথে সত্য আর মিথ্যা দুটোই হতে পারেনা। যদিও পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসে কেউ কেউ এই মূলনীতিটিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তর্কসাপেক্ষ ধারণাটির সবচেয়ে বিখ্যাত ভিন্নমতাবলম্বী ছিলেন জার্মান দার্শনিক হেগেল। পশ্চিমা দর্শনে এটি মূল প্রচলিত ধারণা ছিল সেই অ্যারিস্টোটলের সময় থেকে, যখন তিনি তাঁর মেটাফিজিক্স ফোর বইতে এই ধারণার পক্ষে জটিল আর সংশয়পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। গত ৩০ বছরে ডায়ালেথিজমের নতুন সমর্থকদের আমরা আবির্ভূত হতে দেখেছি। আধুনিক ফরমাল লজিকে এই সমর্থনের ভিত্তি আছে ( কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা যা দেখবো), এর সব উপকরণই এটিকে সমর্থন জানিয়েছে। হয়তো বিস্ময়করভাবেই এখনও এই বিষয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক আমরা দেখি, কারণ এই নন-কন্ট্রাডিকশনের মূলনীতিটিকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন সাধারণ কান্ডজ্ঞানের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। কোনো একটি প্রাণী যদি বিড়াল হয়, একই সাথে এটি বিড়াল নয়, এমন হতে পারেনা। এটি হয় বৃহস্পতিবার নয়তো বৃহস্পতিবার নয়। একই দিন একই সাথে বৃহস্পতিবার হবে, আর বৃহস্পতিবার হবে না, এমন হতে পারেনা। কিন্তু লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন যেমন বলেছিলেন, উদাহরণের অপর্যাপ্ততার ব্যপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

এই ক্ষেত্রে ( দুশ্যাঁর ফাউন্টেইন) ডায়ালেথিজম কাজ করে এভাবে, বস্তুটির ‘শিল্পকলা’ হিসাবে শ্রেণীভুক্ত। এবং ‘শিল্পকলা’ হিসাবে, এর একটি বার্তা আছে। এইক্ষেত্রে, এই বার্তাটি তার নিজের শ্রেণী সংশ্লিষ্ট: এটি এর দর্শকদের বলছে, সত্যিকারভাবে, ‘এটি শিল্পকলা নয়।’ ডায়ালেথিয়ার বিষয়টি এখানে সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ এই বার্তাটির ঠিক সেই শ্রেণীটির দরকার, যে শ্রেণীটিকে এটি প্রত্যাখ্যান করে, শিল্পকলা; এবং এই শ্রেণীর মধ্যে তার বার্তাটি হচ্ছে এই প্রত্যাখ্যানটি। একটি শিল্পকর্ম হিসাবে নিজেকে শ্রেণীভুক্ত করতে এর এই প্রত্যাখ্যানটিই মূল কারণ যা এটিকে রূপান্তর করেছে একটি শিল্পকর্ম হিসাবে, যা এটি প্রত্যাখ্যান করে এবং এভাবেই যুক্তিটি অগ্রসর হয়।

এটি সেই প্রত্যুত্তরও আহবান করে, যা বলে ফাউন্টেইন  শিল্পকর্ম নয় এমন কিছু বলা শুধুমাত্র মিথ্যা। এটি শুধু সেই বার্তা বহন করে যে এটি তা নয়। এভাবে, একটি সাইন হয়তো এই বার্তাটি প্রদর্শন করতে পারে: ‘এটি লেখা হয়েছে লাল রঙ দিয়ে’, যখন বাস্তবিকভাবে এটি লেখা হয়েছে কালো রং দিয়ে। সংক্ষেপে দুশ্যাঁর শিল্পকর্ম হয়তো নিজের সম্বন্ধে ভুল ধারণা পোষণ করছে? হয়তো এটি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছে, এমন কিছু বলে, ‘আমি হয়তো আসলে শিল্পকলা নাও হতে পারি।’

কিন্তু ফাউন্টেইন সেই বার্তাটি বহন করতে পারে যে, এটি শিল্পকলা নয় শুধুমাত্র যার ‘কারণ’ এটি শিল্পকলা নয় – কারণ শিল্পকলাকে এটির প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে শিল্পকলা জগতে এর প্রবেশটিকে সংজ্ঞায়িত হয়েছে । যদি এটি সমস্যাহীনভাবে একটি শিল্পকলা হতো, যেমন, ধরুন, এই ইউরিনালটির গায়ে দুশ্যাঁ এটি তৈলচিত্র আঁকার সিদ্ধান্ত নিলেন; তখন কিন্তু এটি আর সেই বার্তাটি বহন করতে পারবে না। এটি সেই সাইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে যা দাবী করছে এটি সেটি কারণ এর উপর সেই বার্তাটি লেখা আছে।

‘Ceci n’est pas une pipe’, René Magritte (‘La trahison des images’, 1928-1929).

আসুন রেনে মাগ্রিটের ১৯২৮-২৯ এ আঁকা একটি পাইপের চিত্রকর্মটির কথা ভাবি। আক্ষরিকভাবে এখানে বার্তা আছে, এটি একটি পাইপ নয় (Ceci n’est pas une pipe)। এই শব্দগুলোই একটি বার্তা বহন করে। এর ব্যতিক্রম ফাউন্টেনের উপর কোনো সুস্পষ্ট বার্তা নেই। এটি সেই বার্তাটি বহন করছে শুধুমাত্র এটি যা, সেটি হয়ে। এটি শিল্পকলা নয়, আর সেভাবেই এটি তার বার্তাটি প্রকাশ করছে। আর সুনির্দিষ্টভাবে সেকারণেই এটি শিল্পকলা। অন্যভাবে যদি বলা হয়, ‘পরস্পরবিরোধিতা’ শিল্পকর্ম হিসাবে ফাউন্টেইনের অপরিহার্য একটি অংশ, এটি যদি এই পরস্পরবিরোধিতার মূর্ত প্রকাশ না হতো, এটি আদৌ কৌতূহল সৃষ্টি করতো না, আমরা আজো এটি নিয়ে কথা বলতাম না।

মনে হতে পারে যে ইউরিনালের আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী এই কূটাভাস একটি সাংস্কৃতিক অস্বাভাবিকতা: এমনকিছু যা শুধুমাত্র হতে পারে কনটেম্পরারি (সমকালীন) শিল্পকলার অদ্ভুত জগতে। কিন্তু আসলেই, এটি আরো বড় একটি পরিকল্পনার সাথে মানানসই, এমনকিছু যা আসলে সেটি, কারণ আসলে এটি তা নয়: ক, কারণ, এটি ক নয়।

ডায়ালেথিয়ার হয়তো সচরাচর ব্যবহৃত উদাহরণ হচ্ছে সেল্ফ-রেফারেন্স এর লজিকাল প্যারাডক্সগুলো, যেমন, সেই বিখ্যাত liar paradox ( সেই বাক্যটি সংক্রান্ত : ‘এই বাক্যটি সত্য নয়’)। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো নির্ভেজাল যুক্তি যার পরস্পরবিরোধীতায় সমাপ্ত হয়, এর লজিকাল ফর্মের সাথে। ক এবং এটি ক নয়। কূটাভাস নির্ভর এই যুক্তিগুলো যা এইসব পরস্পরবিরোধীতাকে প্রকাশ করে তারা নানা ধরনের হতে পারে, কিন্তু সেগুরোর একটি সেই রুপের, যা নিয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করছি। কনিগ প্যারাডক্সের কথা ধরুন। এর সাথে জড়িত অর্ডিনাল বা পূরণবাচক সংখ্যা। অর্ডিনাল হচ্ছে সেই সংখ্যাগুলো, সংখ্যা গণনা করার জন্যে যা পরিচিত.. ০ ১ ২ … থেকে অসীমে। সব সসীম বা ফিনিট সংখ্যার পর, এর পরবর্তী একটি সংখ্যা আছে, তারপর এরপরের সংখ্যা ১ যোগ এবং এভাবে চলতে থাকে।

গুরুত্বপূর্ণভাবে এই সংখ্যাগুলো সংখ্যাবাচক সংখ্যার গুণাবলী রক্ষা করে, এবং এদের যেকোনো সম্ভারে (সেটে) একটি সর্বনিম্ন সংখ্যা থাকবে। তবে ঠিক কতদূর, অর্ডিনালরা যেতে পারে সেটি খানিকটা সমস্যাজনক একটি প্রশ্ন, গাণিতিকভাবে এবং দার্শনিকভাবে, কিন্তু যা নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই সেটি হচ্ছে কোনো ভাষার সীমাবদ্ধ শব্দভাণ্ডারে শব্দ দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করা যেতে পারে তার চেয়ে বহু সংখ্যক অর্ডিনাল সংখ্যা আছে, যেমন. ইংলিশ ভাষা ( বাংলাও)। এটি খুব ক্রটিহীন গাণিতিক প্রমাণের সাথে দেখানো যেতে পারে। এখন যদি এমন অর্ডিনালরা থাকে যাদের এভাবে তথ্যনির্দেশ করা যায় না, তাহলে, অর্ডিনালদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, অবশ্যই একটি সর্বনিম্ন পরিমানের এমন কোনো অর্ডিনাল থাকবে। এই বাক্যটি বিবেচনা করুন, সবচেয়ে কম পরিমান অর্ডিনালের প্রতি তথ্য নির্দেশ করা যাবে না। এটি অবশ্যই একটি সংখ্যার প্রতি দিক নির্দেশ করছে। এই সংখ্যা, তাহলে একই সাথে তথ্যনির্দেশ করা যাবে আর তথ্যনির্দেশ করা যাবে না। কিন্তু লক্ষ করুন, এটিকে তথ্য নির্দেশ করা যাবে না ঠিক এই বাস্তব সত্যের কারণে সেটি আমাদের অনুমতি দেয় এর প্রতি তথ্য নির্দেশ করতে। এটি নির্দেশ্য কারণ এটি নির্দেশ্য নয়। ক কারণ এটি ক নয়। একইভাবে, ফাউন্টেইন শিল্পকলা কারণ এটি শিল্পকলা নয়।

ফাউন্টেইন প্যারাডক্স আর কিছু স্ব-নির্দেশ্য প্যারাডক্সের সদৃশ্যতা সেই প্রশ্নটিকে আমন্ত্রণ করে যে, এই স্ব-নির্দেশ কি এর আগেরটির সাথে সংশ্লিষ্ট। খানিকটা চিন্তা উন্মোচন করে এটি তাই। এই শিল্পকর্ম একটি বার্তা বহন করে, ‘এটি শিল্পকর্ম নয়’, আর এভাবে এটি নিজেকে নির্দেশ করে।

Man Ray, 1920-21, Portrait of Marcel Duchamp, gelatin silver print,

যদিও সব ডায়ালেথিয়া এই স্ব-নির্দেশ্য সংশ্লিষ্ট নয়, তবে এটি অবশ্যই সমৃদ্ধ নানা উদাহরণে। স্ব-নির্দেশ্য নিয়ে প্রথাগত আলোচনা কথিত ও লিখিত ভাষার উপর মূলত ঘনীভূত। আমাদের এই আলোচনা প্রদর্শন করে যে এমন কিছু ঘটতে পারে অন্য মাধ্যমেও, যেমন, ঐক্ষিক মাধ্যমে। এসব কিছুই, সাধারণ ভাষার মতই, তথ্য বহন করতে পারে। সেই তথ্য হতে পারে স্ব- আভিসম্বন্ধিক এবং স্ব- অভিসম্বন্ধ প্যারাডক্সেরও জন্ম দিতে পারে। দুশ্যাঁর প্রতিভাই একটি বস্তুকে উপস্থাপন করতে এমন একটি পথ খুঁজে পেয়েছিল, যা একইসাথে শিল্পকলা এবং শিল্পকলা নয়। সুতরাং আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে দুশ্যাঁর অবদান ছিল গভীরভাবে এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবেই আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী ।

Advertisements
আর্ট, নাকি আর্ট না

2 thoughts on “আর্ট, নাকি আর্ট না

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s