নৈনসুখ

20 nainsukh 01
(আত্মপ্রতিকৃতি, নৈনসুখ, ১৭৭০)

রাজহংসীকে দেখে অসাড় এক মালিক
নৈনসুখ (১৭১০-১৭৮৪)

(পরবর্তী প্রজেক্টের একটি অধ্যায়, পাহাড়ী রীতির মিনিয়েচার শিল্পী গুলেরের নৈনসুখকে নিয়ে কিছু কথা :
  কাজী মাহবুব হাসান  এবং আসমা সুলতানা)

শত শত ভারতীয় মিনিয়েচার চিত্রকর্ম দেখে একটি খেলা আপনি শুরু করতে পারেন, এর নাম দিতে পারেন, মোগল মিনিয়েচার বিংগো। সেখানে কি দাম্ভিক কোনো রাজকুমার আছে খুব ঋজু শিরদাড়াসহ? চেক। বিশাল তাবু বা বড় আকারের কোনো শিবির? চেক। সঙ্গীত আর বাদ্যশিল্পীরা? রাজসভায় জমায়েত সদস্যরা? চমৎকার বাগান? চেক, চেক, চেক। এইসব চিত্রকর্মগুলোর বেশীরভাগই নিখুঁত সুন্দর, দক্ষতা ও কারিগরী দিক থেকে, তবে সেগুলো নিয়ন্ত্রিত, এমনকি হিসাব নিকাশ করে উপস্থাপিত চিত্রকর্ম। আপনি অনুভব করতে শুরু করবেন এইসব চিত্রকর্মগুলো কোনো চিন্তাভাবনা না করেই আঁকা নিয়মমাফিক কাজ, এবং এই কাজগুলো যারা করার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের প্রতি শিল্পীদের আনুগত্য এবং বশ্যতার বিষয়টিও আপনি অনুভব করতে পারবেন।


মোগল আমলে, বহু চিত্রকর্মই মূলত রাজপরিবারের সদস্যদের জন্যে এক ধরনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মত কিছু ছিল। সুতরাং বলবন্ত সিং এর প্রতিকৃতির দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমরা আসলেই নতুন কিছু দেখি। বলবন্ত সিংহ ছোটখাটো রাজবংশীয় একজন ব্যক্তি ছিলেন, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতের রাজবংশীয় প্রাধান্যপরম্পরায় গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র ছিলেন না তিনি। তবে তিনি ভারতীয় চিত্রকর্মে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী কৌতুহলোদ্দীপক বিষয়গুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিলেন। আজ আমরা তার সম্বন্ধে জানি শুধুমাত্র সেটির কারণ নৈনসুখ নামের গুলেরের একজন শিল্পীর সাথে তার অন্তরঙ্গ এবং প্রগাঢ়ভাবে সৃজনশীল একটি সম্পর্ক ছিল।

হিমালয় পাদদেশে একটি ছোট রাজ্য ছিল গুলের, তবে সেটি সুপ্রতিষ্ঠিত মিনিয়েচার চিত্রকর্মের পাহাড়ী স্কুল বা শৈলীর সূচনাস্থলগুলোর একটি ছিল। যদিও, নৈনসুখ, তার পূর্বসূরি শিল্পীদের থেকে ভিন্ন ছিলেন, তার রেখার অসাধারণ শুদ্ধতায়, তার কম্পোজিশনগুলোয় শূন্যস্থানের সাহসী ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আর তার প্রতিকৃতিগুলোর আবেগপূর্ণ ভারসাম্যতায়। কিন্তু নৈনসুখের চিত্রকর্মের যে বিষয়টি অসাধারণ ছিল, সেটি হচ্ছে, তার সময়ের দৈনন্দিন ভাবনাগুলো তার চিত্রকর্মের ফ্রেম থেকে নির্বাসিত হয়ে যায়নি।

2013GL0908_2500
রাজা বলবন্ত সিং নৃত্য আর সঙ্গীত শিল্পীদের পরিবেশনা দেখছেন, নৈনসুখ ১৭৫০

লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে, যেখানে এক ডজনের মত নৈনসুখের কাজ সংরক্ষিত আছে, সেখানে একটি লক্ষণীয় চিত্রকর্ম আছে যার বিষয়বস্তু বলবন্ত সিং, যেখানে তাকে বিনোদন দিচ্ছে একদল বাদ্যযন্ত্রী এবং সঙ্গীত শিল্পীরা। রাজা যখন হুক্কায় ধূমপান করছে, একজন অভিনেতা তাকে অনুকরণ করছে, গোল করে পাকানো একটি দীর্ঘ কাগজে টান দিয়ে যে ধূমপান করার ভান করছে। আরো কাছে এসে একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে যদি আপনি প্রধান গায়কটিকে লক্ষ্য করেন, পরিচ্ছন্ন সাদা আর কমলা রঙের পাগড়ী পরা এই রোগা মানুষটির গালে খুব ছোট ছোট দাগ আছে, গুটি বসন্তে আক্রান্ত হবার চিহ্ন, অষ্টাদশ শতাব্দী মৃত্যু অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যে রোগটি।

2018-05-11_23-20-58
উপরের ছবিটির ডিটেইল

প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে ভারতে জীবন এতই বিশৃঙ্খল, ইন্দ্রিয় উদ্দীপকে এতই পরিপূর্ণ যে ভারতীয়রা তাদের চারপাশে কি আছে সেগুলো দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে, নৈনসুখ, অনেক কিছু দেখেছিলেন, গৃহস্থালী, প্রাকৃতিক, এবং তিনি রাজসভার আনুষ্ঠানিক জীবনেও হাস্যরসাত্মক বিষয়গুলো খুঁজে পেয়েছিলেন। বলবন্ত সিং-এর মধ্যে তিনি এমন একজন পৃষ্ঠপোষককে পেয়েছিলেন, নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে যার যথেষ্ট পরিমান আত্মবিশ্বাস নৈনসুখকে মিনিয়েচার জনরায় সচরাচর খুঁজে পাওয়া অনমনীয় আনুষ্ঠানিকতা থেকে পালাতে, আর অপেক্ষাকৃত আরো বেশী মৌলিক একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছিল। তার প্রায়োগিক কৌশলগত দক্ষতা, তার দৃষ্টিশক্তির স্পষ্টতা, রাজা কিংবা সাধারণ কোনো গায়ক কিংবা তিনি নিজে, যে কোনো ক্ষেত্রেই, একক ব্যক্তির অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যগুলো, আর এভাবেই মানবিকতার প্রতি কেন্দ্রীভূত ছিল।

CQwor9vWgAAv5ot
ঠান্ডা সকাল, নৈনসুখ, ১৭৫৫

ভারতীয় চিত্রকলার একজন সমঝদার এবং নৈনসুখের কাজের একজন সংগ্রাহক শিল্পী হাওয়ার্ড হজকিন বলেন, ‘‘তিনি আসলেই অসাধারণ একজন শিল্পী ছিলেন,অবশ্যই তিনি প্রথম নয়, কারণ বহু মোগল শিল্পীর নিজস্ব পরিচিতি ছিল এবং তাদের নিয়ে লেখা হয়েছে, কিন্তু আমি বলবো তিনি সম্ভবত ভারতে প্রথম মহান ‘আধুনিক’ শিল্পী’’।

খুবই দক্ষ চিত্রকরদের এক পরিবারে ১৭১০ সালে নৈনসুখ জন্মগ্রহন করেছিলেন। তার বাবা এবং ভাই, দুজনেই তাকে উত্তর ভারতের পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী রীতিতে ছবি আঁকায় প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, যে রীতির বৈশিষ্ট্য ছিল সরলীকৃত ভূদৃশ্য অথবা ঘরের অভ্যন্তরের দৃশ্য, এক রঙের পটভূমি এবং ছবির পুরোভূমিতে শৈলীবদ্ধ,এবং প্রায়শই স্থবির প্রতিকৃতি অঙ্কন। কিন্তু নৈনসুখ শিল্পকলায় তার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন শৈলীগত ক্রান্তিকালের একটি পর্বে, যখন মোগল চিত্রকর্মের উপদানগুলো পাহাড়ী শৈল্পিক জগতে চুইয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল। প্রাকৃতিক স্বভাববাদী আনুপাঙ্খিক বিষয়গুলো নিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশী মাত্রায় আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল আরো সূক্ষ্মতর রঙের ব্যবহারের পাশাপাশি, সেই যুক্ত হয়েছিল রেখাগুলোর বাড়ন্ত পরিমার্জনা। এটাই নৈনসুখকে সুযোগ করে দিয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তার শিল্পকলার সীমানাটিকে বিস্তৃত করার জন্যে।

তার প্রায় বিশ বছর বয়সে আঁকা একটি আত্মপ্রতিকৃতি প্রদর্শন করছে হালকা গোফসহ একটি কৃশকায় চেহারা, খুব তীর্যকভাবে হেলানো পাগড়ীর নীচে কামানো মাথাটিকে অলংকৃত করে আছে চুলের একটি মাত্র গুচ্ছ, এবং সহজলক্ষ্য সামনের দাঁতের সারি। সততা এখানে স্পষ্টতই দম্ভ অপেক্ষা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তার বাম হাত ধরা একটি ‘তখতি’, বা কাঠের ছবি আঁকার বোর্ড, তার ডান হাত একটি তুলি হাতে ফাঁকা একটি কাগজের উপর অপেক্ষমান। ছবি আঁকা শুরু করার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি এবং তার অভিব্যক্তিতে একাগ্রতা, যেন কোনো একটি দৃশ্যকে তিনি তার মনের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছেন।
এই প্রতিকৃতিটি যে সময়ে তিনি এঁকেছিলেন তার আশে পাশে কোনো একটি সময়ে জাসরোটায় বলবন্ত সিং এর সাথে নৈনসুখের দেখা হয়েছিল, জাসরোটা ছিল বর্তমান হিমাচল প্রদেশে একটি ছোট রাজ্যের দূর্গ। নৈনসুখ গুলেরে তার নিজের বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন পৃষ্ঠপোষকের অনুসন্ধানে এবং শুরুতে তিনি বলবন্তের বাবার সাথে কাজ করেছিলেন, যিনি জাসরোটার মহারাজার একজন রাজকীয় আত্মীয় ছিলেন।

5e52212db71d74289c951646219fe07b
রাজা বলবন্ত সিং তার বাঁজপাখি সহ, নৈনসুখ, ১৭৪০?

নতুন পৃষ্ঠপোষকের জন্যে নৈনসুখের আঁকা প্রথম প্রতিকৃতিগুলোর সময়কাল ১৭৪০ এর দশকের শুরুর দিকে, যখন বলবন্ত সিং-এর বয়স ছিল সতেরোর কাছাকাছি। এই চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো কাজগুলির একটি পুনআবিষ্কৃত হয়েছে এক দশকের খানিকটা বেশী সময় আগে, লাহোরের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে। এটি প্রদর্শন করছে বলবন্ত, তখনও দাড়ি হয়নি একজন কিশোর, অভিজাত নকশি করা মোগল-শৈলীর জামা পরা, তাকিয়া পাশবালিশসহ একটি ছাদ বারান্দায় তিনি বসে আছেন, তার হাতে একটি হুক্কা, এবং পাশেই একটি তলোয়ার। এটাই সবচেয়ে বেশী আনুষ্ঠানিক আর প্রথাগত প্রতিকৃতিগুলো একটি যা নৈনসুখ এঁকেছিলেন তার জীবনে। কিন্তু তারপরও তিনি এই আড়ষ্টতাকে ভাঙ্গতে সক্ষম হয়েছিলেন যা প্রত্যাশিত ছিল তার পরিবর্তে তিনি যা দেখেছিলেন বরং সেটি আমাদের সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে। এমনকি যখন সিং কে দেখানো হয়েছে প্রথাগত ভঙ্গিমায়, তার বাম হাতটি, যা যথেষ্ট ভালোভাবে আঁকা হয়নি, যা, অপ্রচলিতভাবেই কবজির কাছ থেকে পেছন দিকে ফেরানো।

2006BE9871_jpg_l
ছাদ বারান্দায় রাজা বলবন্ত সিং, ঘোড়া পরীক্ষা করছেন

খুব শীঘ্রই, নৈনসুখ আরো সাহসের সাথে পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। তিনি মাত্রা নিয়ে খেলেছিলেন, ছবির প্রেক্ষাপটে তিনি গভীরতা দিয়েছিলেন একটি মাত্র আনুভূমিক রেখা ব্যবহার করে। তার রঙের ব্যবহার সংযত রেখে, তিনি কাগজের সাদা আর কালো বিস্তৃতি উৎযাপন করেছিলেন। তার বহু চিত্রকর্মই সাহসী কম্পোজিশনের স্বাক্ষ্য বহন করে, এবং তার পৃষ্ঠপোষকের প্রতিকৃতি অঙ্কনে সমভাবেই এই কাজগুলোয় উদ্বেগহীনতামুক্ত একটি স্বাচ্ছন্দ্যতার বোধ লক্ষণীয় এবং এমনকি সেই সমযোগ্যতাও। নৈনসুখ দেখিয়েছিলেন সিং বাধ্যতার সাথে নাপিতের হাতে তার দাড়ির পরিচর্যা করাচ্ছেন, অসুস্থ আর বিষণœকার সাথে মোটা একটি কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন, কিংবা খালি গায়েই চিঠি লিখছেন তার তাবুর মধ্যে, যখন তার ব্যক্তিগত ভৃত্য মাছি তাড়ানোর বিশেষ ঝাড়ু হাতে গরম বিকেলে তন্দ্রাচ্ছন্ন।

nainsukh_02
রাজা বলবন্ত সিং তার তাবুতে বসে খালি গায়ে চিঠি লিখছেন

সেই সময়ের এই ধরনের কোনো প্রতিকৃতি খুবই দূর্লভ, বিশেষ করে পৃষ্ঠপোষক এবং রাজসভার শিল্পীর মধ্য বিদ্যমান অসমতার সম্পর্কটি যদি আমরা বিবেচনা করি। এই ছবিতে আমরা প্রায় ইনস্টাগ্রাম সদৃশ একটি অনানুষ্ঠানিকতা লক্ষ করতে পারি। ভারতের অন্যতম সেরা শিল্পকলার ইতিহাসবিদ এবং নৈনসুখ বিশেষজ্ঞ বি. এন. গোস্বামীর মতে, ‘তিনি বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই রাজার সাথে, যিনি এমনকি মূল শাসক রাজপরিবারের সদস্যও ছিলেন না, হয়তো সিংহাসনের একজন দাবীদার হতে পারেন, কিন্তু নৈনসুখ তার সাথে ছিলেন। বিশ বছরের বেশী সময় ধরে তিনি তার সাথেই ছিলেন। আমি বোঝাতে চাইছি, তিনি ছিলেন ছায়ার মত অথবা হয়তো বলবন্ত সিং ছিলেন নৈনসুখেরই ছায়া’।

20 nainsukh 02
( নৈনসুখ, রাজা বলবন্ত সিং এবং একটি রাজহংসী, ১৭৫০-৫৫ সালের আশে পাশে)

হাওয়ার্ড হজকিনে’র প্রিয় চিত্রকর্মগুলোর একটি যেখানে বলবন্ত সিং, গোলাপী চটি পায়ে হাতের একটি তলোয়ার ধরে আছেন এবং স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার পোষা রাজহংসীর দিকে। এটি হাস্যকর এবং হৃদয়স্পর্শী একটি উপস্থাপন যা প্রথাগত পদ্ধতিটিকেই নিজের প্রয়োজনে তিনি ব্যবহার করেছিলেন। ‘অবশ্যই মূল কেন্দ্রে ছবিটি অবশ্যই আনুষ্ঠানিক’ হজকিন বলেন, ‘এমনকি হাসটিও, পুরোপুরি স্থির হয়ে আছে তার অবস্থানে তার মালিকের তরফ থেকে একই ধরনের দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হয়ে’। তিনি হাসতে হাসতেই বলেন, ‘যতদূর আমি বলতে পারি, এটি পুরোপুরিভাবে অনন্য ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে। বলবন্ত সিং নিঃসন্দেহে সত্যিকারের সংবেদনশীল একজন মানুষ, বেশ, তারা দুজনেই তেমন ছিলেন’।

Ca-083-Attrib-to-Nainsukh-Raja-Balwant-Singh-of-Jasrota-Viewing-Painting-Presented-by-Artist
রাজা বলবন্ত সিং একটি চিত্রকর্ম দেখছেন, পেছনে দাড়িয়ে নৈনসুখ

গোস্বামী মনে করেন এই দুই ব্যক্তির মধ্যে অবশ্যই নিয়মিত সংলাপের আদান প্রদান হতো নৈনসুখের কাজ নিয়ে, কিন্তু সিং তাকে কি আঁকতে হবে বা কোন দৃশ্য আঁকতে হবে সেই বিষয়ে কোনো নির্দেশ কখনো দেননি। এবং এর পরিণতিতে, ভারতীয় ইতিহাসে রাজসভার খুব কম শিল্পীই যা পেরেছিলেন. নৈনসুখ সেটি লিপিবদ্ধ করতে পেরেছিলেন, এবং আমার জানা মতে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে আর কোনো পৃষ্ঠপোষকই এমন কিছু আঁকার জন্যে তার শিল্পীকে অনুমতিও দিতেন না। নৈনসুখ এবং বলবন্ত সিং দুজনেরই সঙ্গীত এবং নৃত্য ভালোবাসতেন, এবং নৈনসুখের সবচেয়ে জীবন্ত কিছু চিত্রকর্ম মূলত সভায় পরিবেশিত নানা অনুষ্ঠানের দৃশ্য। তার অন্যতম সেরা একটি কাজ, আমার দৃষ্টিতে, যেখানে সঙ্গীত, পৃষ্ঠপোষক এবং শিল্পী সবাই একত্রে উপস্থিত হয়েছিলেন, এই চিত্রকর্মটিতে আমরা দেখি সিং তার ‘তখত’ বা সিংহাসনের উপর বসে আছেন, এবং এক হাতে, তার যেমন নিয়ম ছিল, একটি হুক্কা। অন্য হাতে একটি চিত্রকর্ম। যা দেখার জন্যে তার হাতে দিয়েছেন শিল্পী নৈনসুখ, যিনি তার পৃষ্ঠপোষকের পেছনেই দাড়িয়ে, সামনের দিকে খানিকটা ঝুকে, হাত ভাজ করে, তার উপরের পাটির উঁচু দাঁতগুলো বাইরে বের করে। তিনি অপেক্ষা করছেন রাজার মতামতের জন্যে।

Shiva_and_Parvati,_Seated_on_Mount_Kailasa_(6125134372)
কৈলাসে নীলকন্ঠী শিব এবং পার্বতী, নৈনসুখ, ১৭৭০?

চিত্রকর্মের অন্যদিকে, এই শিল্পী এবং তার পৃষ্ঠপোষকের দিকে তাকিয়ে আছে একদল বাদ্যযন্ত্রী আর গায়করা। যেখানে প্রতি চেহারাই স্বতন্ত্র। তাদের অভিব্যক্তি, বৈশিষ্ট্য, চামড়ার রং ধারাবাহিক ইতিহাস, অনুক্ত বহু কাহিনীর ইঙ্গিত দেয়। এই মানুষগুলো সেই ধরনের মানুষ যাদের সাথে নৈনসুখ খুব সম্ভবতা সখ্যতা করতেন, গোস্বামী বলেন, ‘যে মানুষটি ঢোল বাজাচ্ছে তা আঙ্গুলগুলো দেখুন, যে মানুষটি জিউস হার্প বাদ্যযন্ত্রটি মুখে দিয়ে বাজাচ্ছে, বিস্ময়কর। আমার অনুমান হচ্ছে কিছু সময় পর নৈনসুখের মনোযোগ চলে গিয়েছিল প্রতিকৃতির গৌণ পাত্রপাত্রীদের দিকে, বাদ্যযন্ত্রী, গায়ক, নর্তকীরা এবং উপস্থিত ভৃত্যরা। খুবই বিশ্লেষণী এবং সহমর্মিতাপূর্ণ অনুশীলন ছিল এগুলো, নৈনসুখের কাজে এই মানবিকতাই অসাধারণভাবে আকৃষ্ট করে এর দর্শকদের’।

The_Dancer_Zafar___her_Musicians._Nainsukh__1740
নৃত্যশিল্পী জাফর এবং তার বাদ্যযন্ত্রীরা, নৈনসুখ, ১৭৪০

ভারতীয় চিত্রকর্ম সম্বন্ধে সাধারণত কিছু বলার সময় ঐতিহ্য বা বিশেষ ধারার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অভ্যাসগত উল্লেখ করা হয়, কোনো একক প্রতিভা বা ব্যক্তিত্ব হিসাবে নয় (ঠিক যেভাবে টি. এস. এলিয়ট, যিনি লিখেছিলেন, শিল্পকলা মানে ব্যক্তিত্ব থেকে পলায়ন, হয়তো বিষয়টি মূল্যায়ন করতে পারতেন)। কিন্তু নৈনসুখের ক্ষেত্রে, আমরা এমন কাজের মুখোমুখি হই যেগুলো ঠিক ‘তার সময়ের কাজই’ শুধুমাত্র নয়,বরং এছাড়াও সেগুলো পুরোপুরিভাবেই তার নিজস্ব। আগের পাহাড়ী শৈলীর স্থবির উজ্জ্বলতার পরিবর্তে আমরা অন্তরঙ্গতা ও উষ্ণতা, রহস্য আর বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরস খুঁজে পাই, যা ব্যক্তিতা বা প্রাতিস্বিকতা, একটি অনন্য স্বকীয় সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। যা আমরা পাইনা সেটি হচ্ছে ভাবপ্রবণতা। নৈনসুখের কাজে আবেগ সংযত। শুধুমাত্র এক ঝলক আক্রম্যতা, অথবা উপহাস হয়তো প্রদর্শিত হতে পারে। তার হাতে, সেই ঝলকটি যথেষ্ট। গোস্বামী যেমন বলেন, ‘নৈনসুখের কাজে এক ধরনের স্পন্দিত বা কম্পমান ধ্বণি সদৃশ গুণ আছে, স্পর্শের লঘুতা, বুদ্ধিমত্তা, এবং একই সাথে প্রথার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার একটি ক্ষমতা, ধ্রুপদী এবং তারপর সব বন্ধনমুক্ত।

24d4940a726c3c94e78e2231aba95b19
রাগীনি গৌরি, নৈনসুখ, ১৭৭০

তার জীবনের শেষ দুটি দশকে, নৈনসুখ আরো প্রথাগত বিষয়গুলো আঁকার ক্ষেত্রে ফিরে এসেছিলেন: রাগমালা চিত্রকর্মগুলো সঙ্গীতের মেজাজগুলোকে চিত্রায়িত করেছিল, এছাড়া ধর্মীয় কাহিনী এবং মহাকাব্য থেকে নেয়া দৃশ্যাবলী, কৃষ্ণ এবং গোপীরা, তার অনুরক্ত রাখাল নারীদের দল, সব কিছুই উজ্জ্বল রঙের এবং প্রথাগত পাহাড়ী রীতিতে। ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে, অন্তত একবারের জন্যে এর ব্যাখ্যাটি খুব সাধারণ: বলবন্ত সিং মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১৭৬৩ সালে এবং নৈনসুখকে একজন নতুন পৃষ্ঠপোষক খুঁজতে হয়েছিল। আরেকটি পাহাড়ী রাজ্য বাশোলিতে, তিনি একজন রাজাকে পৃষ্ঠপোষক হিসাবে পেয়েছিলেন, যার রুচি ছিল বেশ প্রথাগতভাবেই সংবেদনশীল।

যদিও এই পরবর্তী পর্যায়ের চিত্রকর্মগুলো তার আগের কাজের তুলনায় বেশী রক্ষণশীল মনে হয়, তাসত্ত্বেও তার প্রভিভার দ্যুতি মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে। তার শেষের দিকে মাস্টারপিসগুলোর একটি যেমন, দৃশ্যপটটি রাতের, গ্রামবাসীরা সবাই আগুন ঘিরে বসে আছেন, হুক্কা ও ছিলিমে ধূমপান করছেন, কাউকে শুধুমাত্র দেখা যাচ্ছে ছায়া হিসাবে, আর কেউ কেউ আগুনের শিখার আলোয় দৃশ্যমান। একটি শিশু, অবশ্যই তার ঘুমের সময় অনেক আগেই অতিক্রম করেছে, বয়স্ক একজনের বাহুতে আশ্রয় নিয়ে বসে আছে। একজন রমনী দরজার সামনে দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। উজ্জ্বল স্ফুলিঙ্গ আগুন থেকে উপরে উড়ে যাচ্ছে একটি গাছের শাখা প্রশাখার দিকে, যা মিশে গেছে বহু দূরে নক্ষত্রের সাথে। গোস্বামী বলেন, যেভাবে নৈনসুখ ছায়া এবং প্রতিফলনগুলো অনুশীলন করেছিলেন, এটি রাতের কোনো দৃশ্য নয়, এটি আপনাকে উদ্দেশ্য করেই তার মত করে বলা যে, এভাবেই রাত নামে। সূক্ষ্মতা, সূক্ষ্মতাই এখানে মূল বিষয়।

3
আগুনের পাশে গ্রামবাসীরা , নৈনসুখ, ১৭৬৫-৭৫

(সমাপ্ত)

 

 

নৈনসুখ

One thought on “নৈনসুখ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s