এটাই আমি : অমৃতা শের-গিল

 

185N09318_7ZKB2 (2)

Self-portrait by Amrita Sher-Gil (1933)

 

অমৃতা শের-গিল : এটাই আমি
১৯১৩-১৯৪১

(সুনীল খিলনানীর একটি লেখা অবলম্বনে: কাজী মাহবুব হাসান এবং আসমা সুলতানা)

‘ঈশ্বর! এই যাত্রার চৌম্বকীয় আকর্ষণ থেকে অনুগ্রহ করে আমাকে রক্ষা করো’। (১) ( অমৃতা শের-গিল, ১৯৩৩)

ভ্যান গো থেকে ড্যাস স্নো, কোনো শিল্পীর অকালমৃত্যু তাকে ঘিরে বেশ লাভজনক একটি অলৌকিক আভা প্রদান করে, বিশেষ করে যদি মৃতদেহের ব্যক্তিত্ব ক্যানভাসগুলোর মতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে থাকে। শিল্পী অমৃতা শের-গিল, বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শিল্পকলার প্রথম তারকা – খুবই আরাধ্য পণ্যদ্রব্যে রুপান্তরিত হয়েছিলেন, যখন মাত্র আঠাশ বছর বয়সে প্রথাবিরোধী একটি জীবন কাটানোর পর রহস্যময় একটি পরিস্থিতিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।  শিল্পী এম এফ হুসেইন পরে যখন তার অবস্থানকে চিহ্নিত করেছিলেন ‌‌’ভারতীয় শিল্পকলার রাণী’ হিসাবে, তবে এই বিশেষণটি অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে ধারমুক্ত ছিল না (২)। যখন বেঁচে ছিলেন, তার সমসাময়িক  পুরুষ শিল্পীরা প্রায়শই শের-গিলের মর্যাদা হানি করেছিলেন শুধুমাত্র একজন ‘উচ্চাকাঙ্খী প্ররোচনাদায়ী শিল্পী’ হিসাবে তাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে। সাংবাদিক ম্যালকম মাগেরিজ, যার সাথে শের-গিলের সংক্ষিপ্ত এবং তীব্র প্রেমের সম্পর্ক ছিল, মন্তব্য করেছিলেন, শের-গিল, ‌’বরং অতি আত্ম-সচেতন আত্মাম্ভরিতাপূর্ণভাবেই শৈল্পিক’ (৩)।  যে বাক্যটি শুনলে একটি প্রশ্নের কথা মনে হয়, একজন কর্মরত শিল্পী এরচেয়ে অন্যকিছু কি হতে পারে? আমার মনে হয়, তার মোহনীয়তা, এবং তার জীবনের দূঃখজনক পরিণতি শুধুমাত্রই একটি পাদটীকা – যদিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ সেই পাদটিকাটি – সেই সত্যটির, তিনি আসলেই ছবি আঁকতে জানতেন, এবং আধুনিক ভারতের অমসৃন আর ক্রটিপূর্ণ সত্তার মহান একজন চিত্রকর ছিলেন।

2018-04-22_9-31-43

জনগণের ইচ্ছা কিংবা প্রবণতা, যা কোনো সমাজের ব্যক্তি সত্তাকে সাধারণত মুছে দেয়, এমন ধারণাগুলোয় হতাশ হয়ে শের-গিল তার পুরো পেশাগত জীবনে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন দরিদ্র মানুষদের প্রতি, যেমন হাঙ্গেরীয় জিপসী থেকে প্যারিসের যক্ষায় আক্রান্ত রোগী থেকে ভারতের কৃষক। কিন্তু তিনি কঠোরভাবে বিশ্বাস করতেন যে বিষয়বস্তু নয়, বরং শিল্পকলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা শিল্পী যেমন সেজান,গগ্যা এবং ব্রানকুসি, ভারতীয় শিল্পী যেমন অজন্তার দেয়ালচিত্রগুলোর চিত্রকর, ভারতের মিনিয়েচার ঘরানার চিত্রকর্ম, বিশেষ করে পাহাড়ী শৈলী থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি এমন কিছু করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা ভারতে ছিল দ্বিগুণ পরিমানে বৈপ্লবিক : প্রথমত, শিল্পকলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ তার নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি, এবং সেটি তিনি করেছিলেন একজন নারী হিসাবে। এভাবে তিনি পরবর্তী ভারতীয় প্রজন্মকে আশীর্বাদপুষ্ট করেছিলেন সেই সংস্কৃতির দূর্লভ একটি উত্তরাধিকারে : স্বাধীন সৃজনশীল একজন নারীর উদাহরণ।

যদিও কিছু নারী শিল্পী এবং লেখক হতাশার এই অন্ধকূপে সংগ্রাম করেছিলেন তাদের কণ্ঠ খুজে পাওয়ার আগে, শের-গিল কাজ করেছিলেন আপাতদৃষ্টিতে তার প্রথম প্রতিক্রিয়াগুলোর সত্যতার উপর একটি সহজাত বিশ্বাস থেকে, ‘তুমি হয়তো বলতে পারো যে, আমি স্বমমতে দৃঢ় বিশ্বাসী একগুঁয়ে একটি বানর, কিন্তু আমি আমার ‌’অসহিষ্ণু’ ধারণা এবং বিশ্বাসের প্রতি অনুগত থাকবো’ (৪)। তিনি তার মাকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, যখন তার বয়স একুশ এবং ইতিমধ্যে শিল্পী হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করার প্রক্রিয়ায় এবং বৌদ্ধিকভাবে কৌতুহলী ছিলেন। নিজেকে সন্তুষ্ট করতেই তিনি নিজেকে পরিশ্রম করিয়েছিলেন।

ভারতে সাধারণত যেমন হয়ে থাকে  প্রতিভা বাস্তবায়নে তাকে সক্ষম করেছিল  সুবিধাজনক সামাজিক অবস্থান। অভিজাত সম্ভ্রান্ত শিখ পিতার কন্যা, শিল্পী হিসাবে তিনি বিকশিত হয়েছিলেন তার হাঙ্গেরীয় মায়ের তত্ত্বাবধানে, বিয়ের পরে যার নিজের শিল্পী হবার কামনা সীমিত হয়েছিল পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিনোদন দেয়ার মধ্যে। হাঙ্গেরি এবং ভারত, দুই দেশেই তিনি প্রতিপালিত হয়েছিলেন, তবে শের-গিলের শিল্পী প্রতিভা পরিশীলিত হয়েছিল প্যারিসে, এবং শুরু থেকেই তিনি নারীদের বৈশিষ্ট্যসূচক অনুভূতি, শ্রম আর পরস্পরের সাথে সম্পর্কগুলোকে বেছে নিয়েছিলেন তার চিত্রকর্মের বিষয় হিসাবে। শুরুর দিকে আঁকা তার বহু আত্মপ্রতিকৃতি, প্রায়শই নগ্ন, অন্যদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছবি হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল, এবং সেগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিল এমন একটি সময়ে যখন নারীদের জীবন এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতি ( যার মধ্যে যৌনানুভূতি অন্তর্ভুক্ত) পদ্ধতিগতভাবে অস্বীকার করা হয়েছিল এবং নির্লজ্জতা হিসাবে চিহ্নিত করা হতো। শের-গিলের জীবনকে পরিবেষ্টন করে থাকা নানা কাহিনী এবং কিংবদন্তীগুলো সম্বন্ধে একজন পরিচিত বর্তমান সময়ের শিল্পী ভারতী খের বলেন, ‘আপনি যদি চান, সেই গল্পগুলো নিয়ে আমি অনেকদূর যেতে পারবেন, কিন্তু যদি আপনি তার কাজের দিকে তাকান, এটি অবশ্যই শক্তিশালী, কারণ তিনি একজন শক্তিশালী সাহসী নারী ছিলেন, কিন্তু তারপরও তিনি তার নিজের দূর্বলতা, আক্রম্যতার বিষয়গুলো সেখানে প্রকাশিত হতে অনুমতি দিয়েছিলেন। তার আত্মপ্রতিকৃতিগুলোয়, আপনি তার চোখে গভীর আকাঙ্ক্ষা দেখতে পারবেন। তার ভিতরে কিছু একটি অনুসন্ধান করার তাড়না ছিল, এবং তিন ভয় পাননি সেটি প্রকাশ করার জন্যে, আসলেই তার শরীর দেখাতে, অরক্ষিত এবং আক্রম্য হিসাবে নিজেকে উন্মুক্ত করতে। বলতে, আমি নগ্ন, এটাই আমি।’

একটি বিয়ের অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে বারো বছর বয়সে অমৃতা শের-গিল তার ডায়েরীতে লিখেছিলেন, ‘অসহায় ছোট কনে, তুমি তো জানোনা যে হয়তো তুমি আর মাত্র একবছর বাঁচবে, তুমি অভিশপ্ত, কিন্তু তারপরও তুমি সেটি বুঝতে পারোনা..’ (৫)। এমনকি শৈশবে নারী জীবনের অন্তর্নিহিত সব সংগ্রামের প্রতি তার সংবেদনশীলতার সত্ত্বেও শের-গিল নিজেকে কখনো কোনো গোষ্ঠীর সদস্য হিসাবে দেখতেন না এবং পরিচিত ছিলেন অন্য নারী শিল্পীদের ‘ভাবপ্রবণ’ , যাদের ‘আবেগপূর্ণ কোনো আত্মা’ নেই বলে সমালোচনা করার জন্যে (৬)। একইভাবে নিজেকে আদর্শ অনুকরণীয় কোনো চরিত্র অথবা সাহসী কোনো সাংস্কৃতিক বীর হিসাবে উপস্থাপন এবং পরিচিতি অর্জন করতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। ‘আড়ম্বরপূর্ণতা’ অথবা ‘প্রদর্শনীবাদ’, এভাবে তিনি তার বন্ধু, জওহরলাল নেহরুকে লেখা একটি চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চরিত্রগুলোর দৃষ্টান্তমূলক গল্পগুলো বাতিল করে দিয়েছিলেন (৭)। সুতরাং বিষয়টি নিয়তি বক্রাঘাত যে তার খ্যাতি এত বৃদ্ধি পেয়েছিল তার মৃত্যুর পর, তিনি এত বেশী আদর্শায়িত রুপে খ্যতিমান হয়েছিলেন, আজকের বেশ কিছু শিল্পী তাকে নিপীড়ক, প্রায় প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র হিসাবে অনুভব করেন।

শের-গিল তার পিতামাতার কাছ থেকে শৈল্পিক সংবেদনশীলতা ছাড়াও প্রথাগত মানুষদের নিষেধাজ্ঞামূলক প্রতিক্রিয়ার প্রতি একটি প্রকৃতিগত উদ্বেগশূন্যতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। তার বাবা, উমরাও সিং, মাঝে মাঝেই তার বিতর্কিত ইতিহাস ভুলে যেতেন যখন পরিবারের উপর অসন্মান বয়ে আনার জন্যে তার মেয়েকে তিরস্কার করতেন। মুহাম্মদ ইকবালের (৭) একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সিং সংস্কৃত বিশেষজ্ঞ, দার্শনিক, এবং মাঝে মাঝে শালীনতাবোধে আঘাত দিতে পারে এমন কিছু বিষয়ের পরীক্ষামূলক আলোকচিত্রী ছিলেন। এছাড়াও তিনি বৈপ্লবিক মাত্রায় ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতি সমর্থন করতেন, এবং রাজনৈতিক মতাদর্শে সমাজতন্ত্র এবং টলস্টয়ের মত নৈরাজ্যবাদের মধ্যে দোদুল্যমান ছিলেন। অন্যদিকে তার অতি আবেগময়তায় উপদ্রুত স্ত্রী, মারি আন্তোয়ানেত গটেসমান-এরডোবাকটে, বুর্জোয়া বিলাসিতা ভালোবাসতেন, এবং প্রায়শই প্রকাশ্যে তাকে নাটকীয় আচরণ করতে দেখা যেত। মানুষকে অসন্তুষ্ট করা ছবি আঁকার মত স্বাভাবিক ছিল শের-গিলের শৈশব। প্রতিভাবান, এবং অল্প বয়স থেকেই প্রকটমাত্রায় বিশ্লেষণী, তিনি তার জীবনের প্রথম সাত বছর কাটান বুডাপেস্ট এবং এর আশে পাশেই। এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়টি তিনি অতিবাহিত করেন একটি সাংস্কৃতির পরিবেশে, যেখানে তিনি নিজেই ছিলেন শিল্পকলার বিষয় (তার বাবার আলোকচিত্র) এবং শিল্প নির্মাতা। আধুনিক সময়ের শিল্পী শিল্পা গুপ্তা শের-গিলের জুভেনিলিয়া বা তার অপরিণত বয়সের কাজের সম্ভারে রেখাচিত্র আকার অসাধারণ দক্ষতা লক্ষ্য করেন, এবং তিনি বিশ্বাস করেন, বহুসংস্কৃতির আবহে প্রতিপালিত হবার বিষয়টি তার জন্যে বৌদ্ধিকভাবে বিকশিত হতে সহায়তা করেছিল, ‌’কোন ধরনের বাছাই বা নির্বাচন আপনি করতে চান? আপনার শিকড় আসলে কোথায়? আপনি কি স্থানীয়, নাকি আন্তর্জাতিক? যে পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল, সেই সূত্রে, তিনি এমন একটি পরিস্থিতিতে জন্ম নিয়েছিলেন, যেখানে তার আগ্রহের বিষয় কি হতে পারে সেটি  তিনি তার  ইচ্ছামত পছন্দ অপছন্দ করতে পারতেন’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন হাঙ্গেরি দেশভাগ, অর্থনৈতিক ধ্বস এবং সহিংস চরমপন্হাসহ নানা দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল, তখন শের-গিলের বাবা বারবার ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন ভারতে ফিরে যাবার অনুমতির জন্যে। ব্রিটিশ রাজ তার গোপন রাজনৈতিক সম্পর্কগুলো নিয়ে চিন্তিত ছিল, কিন্তু অবশেষে তার পরিবার অনুমতি পেয়েছিল ভারতে ফিরে যাবার জন্যে। শের-গিলের পরিবার ব্রিটিশ রাজের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী সিমলায় বসতি স্থাপন করেন একটি বাড়িতে, যা নির্মান করা হয়েছিল একজন ভাইসরয়ের জন্যে, এবং সেখানেই পরিবারটি তাদের সুখী পারিবারিক জীবনের জন্যে স্থানীয় মহলে সুপরিচিত হয়েছিল। সন্ধ্যায় তার মা পিয়ানোতে বসতেন, রিমস্কি-কোরসাকভ গাইতেন, তার বাবা ছবি তুলতেন। বয়স যখন এগারো, অমৃতা তার জীবনের প্রথম পুরষ্কারটি জিতেছিলেন একটি চিত্রকর্মের জন্যে, পঞ্চাশ রুপি। খুব শীঘ্রই তার বাবামাকে খুব নিশ্চিতভাবেই তিনি বলতে শুরু করেছিলেন, তার অন্য বহু প্রতিভাগুলো ত্যাগ করবেন শুধু একটির উপর বেশী মনোযোগ দেবার জন্যে, যেক্ষেত্রে তিনি মনে করেন ভবিষ্যতে অসাধারণ কিছু হতে পারবেন।

তার শিল্পকলায় যৌনতা এবং বিষন্নতা ছিল শুরু থেকেই। মাত্র বারো বছর বয়সে, তিনি একজন ক্রুদ্ধ নারীর ছবি এঁকেছিলেন, যার পরনের পাতলা গাউনটি ছিন্ন হয়ে তার উন্মুক্ত স্তন প্রদর্শন করছে এবং হাতে শক্ত করে ধরা একটি ছুরি। প্রতিবার যখনই আমি চিত্রকর্মটি দেখি, এই ছুরিটি কি অন্য কারো হৃদপিণ্ড নাকি তার নিজের হৃদপিণ্ডের প্রতি নির্দেশিত এই বিষয়টি নিয়ে আমার মন পরিবর্তন করতে বাধ্য হই। তার কৈশোরের আরেকটি চিত্রকর্ম প্রদর্শন করছে বিছানায় শায়তি একজন নগ্ন তরুণী, যে একটি খ্রিস্টীয় ক্রুশ থেকে তার মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছে। ইউরোপীয় ক্যাথোলিসিজমের প্রতি একটি তীব্র ঘৃণা জন্মেছিল তার মনে, সেই সাথে ইতালীর রেনেসাঁ পর্বের মাস্টারদের জন্যে জন্মেছিল ভালোবাসা, বিশেষ করে যখন অমৃতা আর বোনকে সঙ্গে নিয়ে তার মা যখন ফ্লোরেন্সে একজন ভাস্কর প্রেমিককে অনুসরণ করেছিলেন। ক্যাথলিক কনভেন্ট স্কুলে বসবাস তার জন্যে ছিল নির্যাতনের সমান, অমৃতা স্বস্তি পেয়েছিলেন যখন তার মায়ের এই প্রেম সমাপ্তি হয়েছিল এবং তারা দেশে ফিরে এসেছিলেন।

 

nd1
Nude, 1933

 

‘সব শিল্পকলাই, ধর্মীয় শিল্পকলাও যার ব্যতিক্রম নয়, এসেছে ইন্দ্রিয়সুখানুভূতি থেকে, ইন্দ্রিয়সূখানুভূতি এতই তীব্র যে শরীরের সীমানা ছাপিয়ে তা প্রবাহিত হয়’ (৯)। পরে তার এক বন্ধুকে তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন। অমৃতার মত একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিল্পীর জন্যে সিমলা উপযুক্ত নয় সেটি তার মা বুঝতে পেরেছিলেন। সেকারণে তার ষোল বছর বয়সে, যখন নাস্তিকতার কারণে সিমলার একটি কনভেন্ট স্কুল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তিনি সেই দূর্লভ ভারতীয় নারীদের একজনে পরিণত হয়েছিলেন, যার জন্য তার পরিবার সবকিছু ফেলে তাকে ইউরোপে নিয়ে এসেছিল শিল্পকলা বিষয়ে শিক্ষা নেবার জন্যে। প্যারিসে ইকোল দে বোজার্টে, ইমপ্রেজনিজম পরবর্তী চিত্রকর লুসিয়েন সিমনের সংযত প্রশিক্ষণের অধীনে, যৌনানুভূতি এবং তরুণীদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংক্রান্ত  মূলভাবনাগুলো তার কাজে অনুসন্ধান করতে শুরু করেছিলেন। শিল্পী কৃষেন খান্না, এখন যার বয়স নব্বইয়ের ঘরে বলেন ‘প্যারিসের স্টুডিও ভিত্তিক প্রশিক্ষণ শের-গিলের কাজ গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যেখানে শিক্ষার্থী মডেল এবং নানা দ্রব্যের সজ্জা এবং কম্পোজিশন আঁকেন, সেখানে চোখ আর হাতের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অন্যদিকে ভারতে, আপনি কিছু দেখবেন, আপনি সেটি নিয়ে ভাববেন, এটি আপনার মনের ভিতরে অবস্থান করবে, এবং সেখানেই যার বিকৃতি আর পরিবর্তনগুলো ঘটে’।

 

tw
Young Girls, 1932

 

১৯৩২ সালে, প্যারিসে আসার তিন বছর পর শের-গিল প্রথম একটি বড় ক্যানভাস শেষ করেন, ব্যক্তিগত কক্ষ বা বুদোয়ায় দুইজন তরুণী ( ইয়ং গার্লস,১৯৩২)। এটির কম্পোজিশন এবং উত্তেজনা আমাকে বালথাসের (বালথাজার ক্লসোভস্কি দে রোলা, ১৯০৮-২০০১) কথা মনে করিয়ে দেয়, যদিও শের-গিলের কাজে দুই তরুণীর মধ্যে পরিচিত অন্তরঙ্গতা, একজন নগ্ন, খোলা ঢেউ খেলানো সোনালী চুল, অন্যজনের কালো চুল চমৎকার করে বাধা এবং সুন্দর করে কাপড় পরা, যার কোলে চেরী ফল ভর্তি একটি বাটি, দেখলে খুব স্বাভাবিক মনে হয়, গোপন কোনো স্থান থেকে লুকিয়ে দেখে তৃপ্তি পাবার মত দৃশ্য  মনে হয়না। এই কাজটির জন্য পাওয়া প্রশংসা শের-গিলকে সবচেয়ে অল্পবয়সী, এবং কেউ বলতে পারেন প্রথম এশিয়, চিত্রশিল্পী হিসাবে গ্রাণ্ড সালোনের একজন অ্যাসোসিয়েট হিসাবে নির্বাচিত করেছিল। কিন্তু তার গভীর তীব্র অনুভূতিপূর্ণ কাজগুলো যা তিনি করেছিলেন এই বছরগুলোয় সেটি মাঝে মাঝে বাধাগ্রস্থ হয়েছিল ব্যক্তিগত দূর্ঘটনার দ্বারা।

প্রাণোচ্ছল এবং শিল্পী এবং বৌদ্ধিক চক্রে যার উপস্থিতি বিশেষভাবে কাম্য ছিল, তিনি অভিজাত বিত্তশালী মুসলিম পরিবারের এক ব্যক্তির মাধ্যমে যৌনরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যে লোকটিকে তার অস্থির ভারসাম্যহীন মা সম্ভাব্য জামাতা হিসাবে বিবেচনা করছিলেন সেই সময়ে। শের-গিলেরই আত্মীয়, এবং  সেই সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রশিক্ষণরত ভিক্টরকে ডাকা হয়েছিল তার চিকিৎসার এবং পরে একটি গর্ভপাত করানোর জন্যে। এই সময়ে অমৃতা তাকে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু চিঠি লিখেছিলেন, সেগুলো পড়লে মনে হতে পারে যে চিঠিগুলো আসলেই তার নিজের প্রতি লেখা। যার একটি চিঠি বিষয় কেন্দ্রীভূত ছিল সেই বিষয়টি নিয়ে, তাকে নিয়ে পিতামাতার করা একটি ভবিষ্যদ্বাণী বলে যা তিনি উল্লেখ করেছিলেন: তার নিষ্ঠুর, অকৃতজ্ঞ, বিচ্ছেদসৃষ্টিকারী, অন্যভাবে যদি বলা হয় ‌’ঘৃণ্য’ চরিত্রের কারণে সে কখনোই ভালোবাসায় সুখ পাবে না (১০)। ইতিমধ্যেই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে শিল্পী হিসাবে একটি জীবনের সাথে কোনো স্থিতিশীল সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার বিষয়টি কত কঠিন প্রমাণিত হতে পারে। অন্য একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘কিন্তু অল্প অল্প করে আমি অনুধাবন করেছি যে প্রতিটি মানুষই তার ভিতরে সেই গভীর আহবানটি বহন করে যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অর্থহীন’ (১১)।

ভারতী খের শের-গিলের কৈশোরে আঁকা কাজগুলোয় একজন তরুণীর সংগ্রাম দেখেছিলেন যে তার নিজের শরীর এবং নিজের যৌনতাকে মরিয়া হয়ে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন তার নিজের চিত্রকর্মের মাধ্যমে। শের-গিল যেভাবে তার শরীরকে দেখেছিলেন সেটি নিয়ে ভেবেছিলেন শিল্পা গুপ্তা: ‘খুবই স্থির সেগুলো, কিন্তু এটি অতি-রোমান্টিকতায় আবৃত নয়, একধরনের নৈর্ব্যক্তিকতা লক্ষ্য করা সম্ভব। একটি পরিসর সেখানে আছে, বাহিরের রেখাগুলো খুবই পুরু। বিষয়বস্তুটি সেখানে অস্পষ্ট হয়ে যায়। আমি সেজানের কাজের শৈলীটি পছন্দ করি, অমৃতার কাজে আমি সেই শৈলীর খানিকটা উপস্থিতি লক্ষ্য করি। আপনি বাইরে দিয়ে বিষয়বস্তুটির দিকে তাকাতে পারবেন, যাই হোক না কেন, ভিতরটি সেখানে উপস্থিত, কিন্তু এর বাইরের একটি অংশও সেখানে আছে’।

সেজান, ব্রুগেল এবং গগ্যাঁ, বিশেষ করে গগ্যাঁর সমসাময়িক উপায়ে প্রাচীন কাজ পুনসৃষ্টি করার ক্ষমতার বিষয়টির প্রতি শের-গিলের সব ভালোবাসা সত্ত্বেও, তার বিশ বছর বয়সে ইউরোপ এবং এর সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ ম্লান হতে শুরু করেছিল। পরে তিনি স্মরণ করেছিলেন, ‘সময়ে ভারতে ফিরে যাবার তীব্র একটি আকাঙ্ক্ষা আমি অনুভব করেছিলাম’ (১২)। কিন্তু দেশে ফিরে আসতে তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন তার বাবা, আংশিকভাবে তার একটি কারণ ছিল শের-গিলের উন্মুক্ত যৌনতা পরিবারের জন্যে লজ্জা ও অসন্মানের কারণ হতে পারে এবং আংশিকভাবে তিনি অনুভব করেছিলেন ভারতের সংস্কৃতি সম্বন্ধে শের-গিলের জ্ঞান খুবই হালকা। কিন্তু ঠিক এটাই ছিল সেই তাড়না যার প্রয়োজন ছিল তার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে। ‘আধুনিক শিল্পকলাই ভারতীয় চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্যগুলো আমাকে বুঝতে ও মূল্যায়ন করতে সাহায্য করেছে।’ তিনি তার বাড়িতে লেখা একটি চিঠিতে প্রতিবাদ করেই লিখেছিলেন, ‘বিষয়টি স্পষ্টই আপাতবিরোধী, কিন্তু আমি নিশ্চিৎভাবেই জানি, আমরা যদি ইউরোপে না আসতাম, আমি হয়তো কখনোই অনুধাবন করতে পারতাম না যে, অজন্তার একটি দেয়ালচিত্র অথবা মুজে গিমের একটি ছোট ভাস্কর্য পুরো রেনেসাঁর চেয়েও মূল্যবান(১৩)’!

খুব শীঘ্রই  নিজের ভারতীয় পরিকল্পনা এবং প্রকল্প নিয়ে অতিআত্মবিশ্বাসে প্রায় মত্ত শের-গিল সেই যুগের অন্যসব ভারতীয় শিল্পীদের বিবেচনা করার অযোগ্য হিসাবে বাতিল করতে শুরু করেছিলেন।  ১৯৩৪ সালে তিনি তার বিখ্যাত একটি উসকানীমূলক মন্তব্যে বলেছিলেন, ‌’ইউরোপ হচ্ছে পিকাসো,মাতিস,ব্রাক এবং অন্য বহু শিল্পীদের, কিন্তু ভারত শুধু আমার (১৪)।’ শুধুমাত্র যখন তিনি অজন্তা গুহার দেয়াল চিত্রগুলো আবার দেখতে গিয়েছিলেন, তিনি সত্যিকারভাবে নীরব হয়ে গিয়েছিলেন সেই ঐতিহ্য দেখে, যেখানে তিনি পুনপ্রবেশ করেছিলেন। তিনি তার বাবামাকে লিখেছিলেন, ‌’ভারতে আমার ফিরে আসার পর প্রথম বারের মত আমি কারো কাজ থেকে কিছু শিখতে পেরেছি (১৫)।’

 

HG
Haldi grinders (1940)

 

‘মহান সম্ভাবনাময়’ হিসাবে চিহ্নিত হওয়া সবসময়ই খানিকটা বিরক্তিকর… (১৬)( অমৃতা শের-গিল, ১৯৩৭)। শের-গিল একবার লিখেছিলেন তিনি দূঃখ আর বিষন্নতার প্রতি শিল্পী হিসাবে যেভাবে সাড়া দেন, সেভাবে তিনি সন্তুষ্টি আর সুখে সাড়া দিতে পারেন না, কিন্তু সেই পত্যুত্তরে ভারতে তিনি যা সৃষ্টি করেছিলেন তার সেরাগুলো বিষন্ন ছিলনা। ভারতে তার চিত্রকর্মগুলোর মধ্য আমার প্রিয় একটি হলুদ পেষাইকারী ( হলদি গ্রাইণ্ডার, ১৯৪০), তার শেষের দিকে করা একটি কাজ, যদি শেষের দিকে শব্দটি ব্যবহার করা খুব অদ্ভুত এমন কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে যিনি মাত্র আটাশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। নিস্তেজ, উজ্জ্বল রঙ, আলোর পতন সম্বন্ধে বিস্ময়কর সংবেদনশীলতাসহ, তিনি একটি দৃশ্য একেছিলেন যার প্রান্তগুলো তৈরী করেছিল গাঢ় রঙের কিছু গাছ: নারীরা কাজ করছে, হলুদ পিষছে, পেছনে ক্ষেত্রে আমরা এক বৃদ্ধা নারী ঘুমাতে দেখি, আর সামনে উজ্জ্বল লাল রঙের কাপড় পরা এক অল্পবয়সী মেয়ে বসে আছে। কোনোমতে আমরা তাদের মুখের রেখাগুলো শনাক্ত করতে পারি, যদিও তাদের রঙ করা পায়ের নোখে যৌনতাবোধের ঝলকও আমরা দেখতে পাই। এই চিত্রকর্মটির শক্তি বাস করে যে নারীরা যাতাকলে হলুদ পেষণ করছেন তাদের শারীরিক ভঙ্গিমায়, তাদের প্রসারণসাধ্য শক্তিতে। যে কাজটি নারীরা করছে সেটি ব্যক্তি হিসাবে তাদের মূলসারটিকেও উন্মোচন করেছে।

 

amrita_sher-gil_-_south_indian_villagers_going_to_market
South Indian villagers going to market, 1937

 

তার কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল শ্রমিক, ভিক্ষুক এবং আদিবাসী নারীদের দৃশ্য আঁকা, কারণ এর আগেই তিনি জিপসী এবং যক্ষায় আক্রান্ত রুগ্ন মডেলদের এঁকেছেন। তার শিল্পকর্ম বিক্রি হয়নি, এমনকি সমালোচকদের মনও জয় করতে পারেনি, এবং পরের কিছু শিল্পী সাধারণ ভারতীয়দের নিয়ে আকা এইসব চিত্রকর্মে একটি শূন্য ইউরোপীয় ভাবপ্রবণতার আভাসও লক্ষ্য করেছিলেন, যে ভাবপ্রবণতাকে তিনি চুড়ান্তভাবে ঘৃণা করতেন বলে দাবী করেছিলেন। কৃষেন খান্না তার সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর সমালোচনা করেছিলেন, ‌’দক্ষিন ভারতীয় গ্রামবাসীরা বাজারে যাচ্ছে’ ( সাউথ ইণ্ডিয়ান ভিলেজার্স গোয়িং টু মার্কেট) মূলত একটি মিথ্যা কাজ বলে। তার গৃহভৃত্যরা স্টুডিওতে এভাবে দাড়িয়েছিল, যেন তিনি দৃশ্যটি আঁকতে পারেন।’

তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে, তিনি বেঙ্গল স্কুলের সমালোচনার উত্তর দিচ্ছিলেন। লোকজ শিল্পকলা এবং মোগল মিনিয়েচার চিত্রকর্ম, এবং সেই সাথে পারস্য থেকে জাপান অবধি শিল্পকলার ঐতিহ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত বেঙ্গল স্কুলের নেতৃত্বে ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নন্দলাল বসু। বহু দশক ধরেই বেঙ্গল স্কুল ভারতীয় শিল্পকলার জগতে প্রাধান্য বিস্তার করে এসেছিল, এবং স্বাধীনতার পর এটি নতুন এই জাতির নিজস্ব ঘরানার শৈলীতে রুপান্তরিত হয়েছিল ( নন্দলাল বসুকে সংবিধানের আধেয়কে অলঙ্কৃত করতে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল)। শের-গিলের মনে করতেন তাদের বহু চিত্রকর্মের রোমান্টিকতা এবং অতি-জটিলতা বিষয়টির শিল্পীর সৃজনশীল সত্তার উপর ‘সংকীর্ণতায় রুদ্ধ এবং ‘পঙ্গু’ করে দেবার মত একটি প্রভাব আছে (১৭)। অনেক কিছু যা আঁকা হয়েছে তা প্রয়োজনীয় নয়, তিনি অনুভব করেছিলেন, তার সার্বিক ধারণা ছিল এই কাজগুলো মূলত শূন্য খোলসের মত, যদি অজন্তা চিত্রকর্মের মত প্রাচীন কাজ কিংবা তার ১৯৩৭ সালে দক্ষিণ ভারতে তার অধ্যয়ন করা দেয়ালচিত্রগুলোর মত ‘শস্যদানা বা ফলের ভিতরকার শাঁসের’ সাথে সেগুলো তুলনা করা হয়।

 

bt
Bride’s Toilet, 1937

 

কোচিনের মাটানচেরী প্রাসাদের কিছু দেয়ালচিত্রের রুপ আর কৌশল দেখে তিনি তার বোনকে লিখেছিলেন, ‘এই রেখাচিত্রগুলো সম্ভবত আমার দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রকর্ম। এই চিত্রকর্মগুলোকে পরিচালিত করেছিলে অজানা শিল্পীদের তীব্র পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং তাদের ভাস্কর সূলভ প্রতিসম আত্মবিশ্বাস’ (১৮)। সেগুলো অনুলিপি করে, তিনি অনুভব করেছিলেন যেন তিনি প্রাচীন কোনো সম্পদ পুনরাবিষ্কার করেছেন যার মূল্য রাজা রবি বর্মা স্কুলের চিরন্তনভাবে জনপ্রিয় ভারী চকচকে প্রতিকৃতি, পূরাণের চিত্র এবং দোলনায় আরক্তিম স্বাস্থোজ্জ্বল তরুণীসহ তৈল চিত্রের কাজগুলো থেকে অসীমভাবেই বেশী। কনের সাজ ( ব্রাইড’স টয়লেট, ১৯৩৭), যা শের-গিল পরে বলেছিলেন এ পর্যন্ত করা তার সেরা কাজ (১৯), শেষ করেছিলেন এর পরের কয়েক মাসের মধ্যে, যা পরে বিখ্যাত সাউথ ইণ্ডিয়ান ট্রিলজীর অংশ হয়েছিল। একটি নতুন ধরনের সরলতায় খোঁজার তীব্র প্রচেষ্টায়, সেই সাথে স্থানীয় রঙের প্যালেটকে আত্মীকরণ করার সংগ্রাম করেছিলেন তিনি চিত্রকর্মটি আঁকার সময়, এবং কাজটি শেষ হয়েছে ভাবার পরও তিনি সেখানে ভুল খুঁজে বের করেছিলেন, এবং বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমানে তিনি কাজটি পুনসৃষ্টি করেছিলেন প্রথমবার আঁকা শেষ করার পরে। কিন্তু দৃশ্যটি, গাড় লাল শাড়ি পরা একজন ফর্সা, বিষন্ন রমনী, যার চুল বেনী করে বাধা, হাতের তালুতে মেহদীর নকশা, আসলেই গঠনশৈলীর ক্ষেত্রে একটি বিজয় ছিল তার জন্যে, যে বিষয়টি শের-গিলের কাছে সবচেয়ে বেশী আরাধ্য ছিল।

যখন কিনা আগের চেয়ে তিনি অনেক বেশী নিজের ভিতর থেকে প্রেরণা অনুভব করতে শুরু করেছিলেন, তখন খুব অল্প সংগ্রাহকই তার কাজ কিনতে আগ্রহী বোধ করেছিল। ম্যালকম মাগেরিজ, মধ্য ১৯৩০ এর দশকে তার ক্ষণস্থায়ী প্রেমিক, তার আগে আরো অনেকের মতই শের-গিল দেখে যিনি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন, বিশেষ করে জীবনের প্রতি তার প্রাণবন্ত, শক্তিশালী আর সরাসরি প্রতিক্রিয়াগুলো দেখে। কিন্তু তিনি তারপরও সেই সময়ের অমৃতার বিবরণ দিয়েছিলেন, যতটা সফল হওয়া উচিৎ ছিল বলে তিনি অনুভব করতেন ততটা সফল হননি এমন একজন নারী হিসাবে, যিনি ক্লান্তিকরভাবেই বিরক্তিকর, আত্মকেন্দ্রিক এবং দাম্ভিক (২০)। যখনই তার কোনো না কোনো একটি চিত্রকর্ম স্বীকৃতি পেতো, তিনি অবধারিতভাবেই অভিযোগ করতেন যে, সেটাই তার সবচেয়ে কম কৌতুহল-উদ্দীপক কাজ। তার হতাশা খানিকটা শিথিল হয়েছিল ১৯৩৬ সালে একটি একক প্রদর্শনীর খানিকটা সময় পরে। বোম্বেতে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীটি ভারতে তাকে তার প্রথম সত্যিকারের সফলতা দিয়েছিল শিল্পী-সমালোচকদের মধ্যে। তার নতুন সমর্থনকারীদের একজন ছিলেন কার্ল খাণ্ডালাভালা, একজন প্রভাবশালী শিল্পসমালোচক এবং সংগ্রাহক ( এছাড়া একজন সুপরিচিত আইনজীবীও বটে), তার চিত্রকর্মগুলোর মৌলিকতার উপর যার বিশ্বাস শের-গিলের জীবনের শেষ বছরগুলোয় তার মানসিক স্থৈর্যের উৎস ছিল।

 

sp1
Self-Portrait, 1932

 

এই পর্যায়ে যখন তার পিতামাতার আর্থিক অবস্থা পড়তির দিকে, তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ‘সুগারি’ আত্ম-প্রকৃতি আঁকতে, সেই ‌’রটেন পেপার’, ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইণ্ডিয়া থেকে প্রতিকৃতি আকার কমিশন পাবার আশায় (২১)। ১৯৩৮ সালে, তিনি অবশেষে তার আত্মীয় ভিক্টরকে বিয়ে করেন, তখন যে অনিশ্চিৎ ভবিষ্যতসহ সদ্য পাশ করা একজন চিকিৎসক। শের-গিল তাকে পছন্দ করেছিলেন কারণ ভিক্টরের কাছে তার কোনকিছু গোপন করার ছিলনা, এবং যে শিল্পী জীবন তিনি কাটাতে চান, সেটি তিনি করতে পারবেন এই সম্পর্কে কোনো বাধা ছাড়াই। তার এই পছন্দ তার মাকে আবারো বেশ ভারসাম্যহীন করে তুলেছিল। নিজের কন্যার প্রতিভাকে লালন করার জন্যে ব্যপক পরিমান সময় এবং অর্থ বিনিয়োগ করার পর, মারি অানতোয়ানেত মনে করতেন অমৃতার কর্তব্য ছিল বিত্তবান একজন স্বামীকে অন্তত খুঁজে বের করা।

নিজেদের পারিবারিক বাড়িতে অনাকাঙ্খিত হয়ে  ভিক্টরের নিজস্ব একটি প্র্যাকটিস শুরু করার জায়গা খুঁজতে শের-গিল এবং ভিক্টর হাঙ্গেরি এবং ভারতের নানা জায়গায় বসতি স্থাপন করার চেষ্টা করেন । স্থান বিচ্যুত হবার এই সময়টিতে এবং নানা চাপে তিনি আর নির্ভরযোগ্য কোনো উপায়ে হাতে তুলি নিতে পারেননি তার একমাত্র জীবনদায়ী কাজ হিসাবে। শৈল্পিক সৃজনশীলতায় আটকে পড়া শের-গিল মাঝে মাঝেই তার ক্ষোভের নিশানা করেছিলেন ভিক্টরকে, তার কাজ সম্বন্ধে ভিক্টরের খুব হালকা উদাসীন আগ্রহের জন্যে। তার এই নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনুপ্রেরণার যে কারণই থাকুক না কেন, এটি আসলেই একটি বড় বিপর্যয় ছিল সেই নারীর জন্যে যিনি প্রায় শ্বাস নেবার মতই তার সারাটি জীবন ছবি এঁকেছেন। এই সময় পর্বে লেখা তার বিলাপপূর্ণ চিঠিগুলো পড়লে মনে হতে পারে এগুলোর লেখক সম্ভবত একজন নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শিল্পী যিনি তার মধ্যজীবনের সংকটে আটকা পড়েছেন। কিন্তু আসলেই হতভম্ব হতে হয় যখন আমরা স্মরণ করি তখন তার বয়স তখন বিশের ঘরে। ইউনাটেড প্রদেশে একটি ছোট গ্রাম সারায়াতে কিছুদিন অবস্থান তার ছবি আঁকার প্রবৃত্তিটি পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করেছিল। হলদি গ্রাইণ্ডারের শ্রমকে মূল্যায়ন করার বীপরিতে আমার প্রায়ই মনে পড়ে তার আরো প্রশংসিত তবে অস্বস্তিকর কাজগুলোর একটিকে: একজন অলস, অবসন্নতাপূর্ণ একজন নারী একটি চারপায়র উপর, নিষ্ক্রিয়ভাবে তার পেটের উপর হাতগুলো শুয়ে আছে, যখন তার গৃহভৃত্য তাকে পাখা দিয়ে বাতাস করছে (উওম্যান অন চারপাই,১৯৪০)।

 

wc
Woman on Charpai, 1940

 

১৯৪১ সালের হেমন্তে, শের-গিল এবং ভিক্টর অবশেষে লাহোরে বসতি গড়তে সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে আগে অনুষ্ঠিত হওয়া তার একটি প্রদর্শনী সেখানকার প্রাণবন্ত শিল্পী সমাজে আলোড়ন তুলেছিল। যদিও বছর শেষ হবার আগেই, তিনি হঠাৎ করে তার বাসায় মৃত্যুবরণ করেন, ভিক্টরের তত্ত্বাবধানে, হয় কোনো খাদ্যে বিষক্রিয়া অথবা সঠিকভাবে না করতে পারা একটি গর্ভপাতের পরিণতি হিসাবে। ভারতি খের দুঃখ প্রকাশ করেন সেই বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ করে যে শের-গিল টিকে ছিলেন সেই সময়টিতে, যে পর্বটি প্রায়শই কোনো একজন নারী শিল্পীর জন্যে সবচেয়ে দুরূহ বছর ছিল। পরুষ প্রাধান্য শিল্পকলার জগতে একজন তরুণী নারী হিসাবে তার নিজের আত্মপরিচয়টি খোঁজা, এবং তারপর তার পারিবারিক জীবনে খানিকটা স্থিতিশীলতা অর্জন, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন সেই মনোযোগসম্পন্ন সৃজনশীলতার পর্বে পৌছাতে, কোনো নারী শিল্পীর শৈল্পিক জীবনের শেষ অর্ধাংশ প্রায়শই যেখানে পৌছানোর অনুমতি দেয়। শের-গিল তার নিজের সৃজনশীলতায় প্রত্যাবর্তন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন তার অকাল মৃত্যু হবে এমন একটি অস্বস্তিকর পূর্ববোধ তার মনে ছিল, কিন্ত আমার সংশয় আছে। সব শিল্পীরই মৃত্যু নিয়ে ভাবনা অাছে। তার শেষ কাজগুলোয় যদিও প্রকৃতির শক্তি নিয়ে আমি একটি নতুন শ্রদ্ধা অনুভব করতে পারি।

 

ep
Elephant promenade, 1940

 

তার এলিফ্যান্ট প্রমেনাডে ( এলিফ্যান্ট প্রমেনাড,১৯৪০), যার প্রেক্ষাপটে মুগল মিনিয়েচার চিত্রকর্মের মত আনুষ্ঠানিকতা আছে: একটি খোলা চত্ত্বর, সাদা ছত্রি এবং প্রতিরক্ষা প্রাচীর, কিন্তু এই মানুষের তৈরী পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে অপ্রশম্য হাতিরা, যেন তারাই উজ্জ্বল বর্ণের কাপড় পরা মানুষগুলো যারা তাদের উপর চড়ে আর দেখাশুনা করে তাদেরই একদিকে পরিচালিত করছে, এর বীপরিতটি নয়, যখন ভয়ঙ্কর কোনো ঝড়ের আশংকায় কম্পমান আকাশ।

 

 

তথ্যসূত্র :

(১) ভিক্টর এগানকে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি, অক্টোবর, ১৯৩৩ ( অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ ( নিউ দিল্লী ২০০৬), ইয়াশোধারা ডালমিয়ার লেখা অমৃতা শের-গিলের জীবনী, পৃষ্ঠা ৫২)।

(২) ভারতীয় শিল্পকলার রাণী: এম এফ হুসেইন উইথ খালিদ মোহাম্মদ, হোয়ার আর্ট দাউ: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি (মুম্বাই,২০০২), পৃষ্ঠা ১৬।

(৩) ম্যালকম মাগেরিজ, লাইক ইট ওয়াস: দ্য ডায়ারীজ অব ম্যালকম মাগেরিজ (লণ্ডন, ১৯৮১), পৃষ্ঠা ১২৮, অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ বইটিতে উল্লেখিত (পৃষ্ঠা ৬৮-৬৯)

(৪) ১৯৩৪ সালে ৮ ফেব্রুয়ারী তার মাকে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি: ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিত, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ২৯)

(৫) অমৃতা শের-গিলের ডায়েরীর পাতা থেকে, ১ আগষ্ট, ১৯২৫ ( ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিক, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ২৯)

(৬) ডালমিয়ার লেখা  অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ বইটিতে উল্লেখিত (পৃষ্ঠা ১৪৫)

(৭) ১৯৩৭ সালে নেহরুকে লেখা শের-গিলের চিঠি, জওহরলাল নেহরু সম্পাদিত এ বাঞ্চ অব ওল্ড লেটার্স: বিইং মোস্টলি রিটেন টু জওহরলাল নেহরু অ্যাণ্ড সাম রিটেন বাই হিম, সম্পাদিত সংস্ককরণ (নিউ দিল্লী, ২০০৫, পৃষ্ঠা ২৫৭)

(৮) মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮), আল্লামা ইকবাল নামেও সুপরিচিত, কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ, পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক পিতা হিসাবে পরিচিত।

(৯) কার্ল খাণ্ডালাভালাকে লেখা শের-গিলের চিঠি, ৬ মার্চ,১৯৩৭,  ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিক, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ৩৪৭)

(১০) ভিক্টর ইগানকে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি, ইয়াশোধারা ডালমিয়ার লেখা অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ বইটিতে উল্লেখিত (পৃষ্ঠা ৪৭)

(১১)  ভিক্টর ইগানকে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি, ইয়াশোধারা ডালমিয়ার লেখা অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ বইটিতে উল্লেখিত (পৃষ্ঠা ৪৮-৪৯)

(১২) এন ইকবাল সিং এর লেখা, অমৃতা শের-গিল, ইণ্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার কোয়ার্টারলী, খণ্ড ২, নং ৩ (জুলাই ১৯৭৫), পৃষ্ঠা ২১৩

(১৩) বাবামার কাছে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি, ১৯৩৪ সেপ্টেম্বর,  ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিত, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ১৬৫)

(১৪)  ইয়াশোধারা ডালমিয়ার লেখা অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ বইটিতে (পৃষ্ঠা ১৩) এবং  ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিত, অমৃতা শের-গিল: এসেজ ( বোম্বে ১৯৭২, পৃষ্ঠা ১৫)

(১৫) বাবামার কাছে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি, ১৯৩৬ ডিসেম্বর,  ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিত, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ২৬৭)

(১৬) কার্ল খাণ্ডালাভালাকে লেখা শের-গিলের চিঠি, ১৫ জুন,১৯৩৭,  ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিক, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ৩৮৩)

(১৭) ইকবাল সিং এর লেখা অমৃতা শের-গিল: এ বায়োগ্রাফি বইটিতে উল্লেখিত (দিল্লী,১৯৮৪) পৃষ্ঠা ৭১-৭২

(১৮) বোনের কাছে লেখা অমৃতা শের-গিলের চিঠি, ২৫ জানুয়ারী,১৯৩৭,  ভিভান সুন্দরমের সম্পাদিত, অমৃতা শের-গিল: এ সেলফ পোর্ট্রেট ইন লেটারস অ্যাণ্ড রাইটিংস ( প্রথম খণ্ড, নিউ দিল্লী, ২০১০, পৃষ্ঠা ৩০৭)

(১৯) ইকবাল সিং এর লেখা অমৃতা শের-গিল: এ বায়োগ্রাফি বইটিতে উল্লেখিত (দিল্লী,১৯৮৪) পৃষ্ঠা ১০২

(২০) ম্যালকম মাগেরিজ, ক্রনিকলস অব ওয়েস্টেড টাইম, ভলিউম টু: দ্য ইনফারনাল গ্রোভ (লণ্ডন, ১৯৭৩),  ইয়াশোধারা ডালমিয়ার লেখা অমৃতা শের-গিল: এ লাইফ বইটিতে উল্লেখিত (পৃষ্ঠা ৭২)

(২১)  ইকবাল সিং এর লেখা অমৃতা শের-গিল: এ বায়োগ্রাফি বইটিতে উল্লেখিত (দিল্লী,১৯৮৪) পৃষ্ঠা ১০৩

 

এটাই আমি : অমৃতা শের-গিল

One thought on “এটাই আমি : অমৃতা শের-গিল

Asma Sultana শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s