বাস্তবতার জাদু : দ্বিতীয় অধ্যায়

13450772_295027890885438_5741499724979303664_n

দ্বিতীয় অধ্যায়: রিচার্ড ডকিন্সের দ্য ম্যাজিক অব রিয়েলিটি 

কে ছিল প্রথম মানুষ ?

এই বইয়ে বেশীর ভাগ অধ্যায়ের শিরোনামে একটি প্রশ্ন আছে। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই প্রশ্নটির উত্তর দেয়া, অথবা, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য সবচেয়ে সেরা উত্তরটি দেবার চেষ্টা করা, যেটি হচ্ছে বিজ্ঞানের উত্তর। কিন্তু সাধারণ আমি শুরু করবো কিছু পৌরাণিক উত্তর দিয়ে কারণ তার বেশ কৌতুহলোদ্দীপক এবং বর্ণিল, এবং সত্যিকারের বাস্তব মানুষরা সেগুলো বিশ্বাস করেছিল, কিছু মানুষ এখনও তা করেন।

পৃথিবীর সব দেশের মানুষদেরই সৃষ্টি সংক্রান্ত পুরাণ কাহিনী আছে, তারা কোথা থেকে এসেছে সেটি ব্যাখ্যা দেবার জন্য। বহু গোত্র ভিত্তিক সৃষ্টি সংক্রান্ত পুরাণ মূলত একটি সুনির্দিষ্ট গোত্র সংশ্লিষ্ট – যেন অন্য কোনো গোত্র ধর্তব্যের মধ্যেই পড়েনা! একই ভাবে, বহু গোত্রের আইন আছে যে তারা মানব হত্যা করবে না – কিন্তু দেখা যায় এই মানব বলতে শুধুমাত্র আপনার নিজের গোত্রের অন্যদেরকেই বোঝায়। অন্য গোত্রের সদস্যদের হত্যা করলে কোনো সমস্যা নেই।

একটি বৈশিষ্ট্যসূচক সৃষ্টি পুরাণের কথা ধরুন, এটি তাসমানিয়ার আদিবাসীদের একটি গ্রুপের। মহাকাশে নক্ষত্রের মধ্যে একটি ভয়াবহ যুদ্ধে মইনি বলে একজন দেবতাকে পরাজিত করে প্রতিদ্বন্দী এক দেবতা যার নাম ড্রোমেরডিনার। মইনি নক্ষত্র থেকে ছিটকে তাসমানিয়ায় এসে পড়েন তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য। তবে তিনি মারা যাবার আগে, তার চিরন্তিম শয্যার এই জায়গাটি আশীর্বাদপুষ্ট করতে তিনি একটি ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, এর পরিণতিতে সুতরাং, তিনি মানুষদের সৃষ্টি করেন। যেহেতু তিনি মারা যাচ্ছেন বলে তার এমন তাড়া ছিল, তিনি তার সৃষ্ট মানুষদের হাটু দিতে ভুলে গিয়েছিলেন ( কোনো সন্দেহ নেই নিজের সমস্যা তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করেছিল), তিনি অন্যমনস্ক হয়ে তাদের ক্যাঙারুর মত লম্বা একটি লেজও দিয়েছিলেন, তার মানে তার ঠিক মত বসতে পারতোনা। এরপর তিনি মারা যান। মানুষরা লম্বা ক্যাঙারু লেজ আর কোনো হাটু না থাকার ব্যপারটি নিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে, এবং স্বর্গের উদ্দেশ্যে আর্তি জানায় তাদের সাহায্য করার জন্য।

13445244_295027894218771_7427676887303170770_n

অসীম শক্তিশালী ড্রমেরডিনার, যিনি তখনও সারা আকাশ জুড়ে গর্জন করে ঘুরে বেড়াছে তার বিজয় শোভাযাত্রায়, তাদের সেই আর্তি শুনতে পান, এবং তিনি তাসমানিয়ায় আসেন সমস্যাটা কি সেটি দেখার জন্য। মানুষের অবস্থা দেখে তার বেশ করুনা হয়, এবং তিনি তাদের ভাজ করা সম্ভব এমন হাটু প্রদান করেন আর সমস্যা সৃষ্টিকারী ক্যাঙারু লেজটা কেটে দেন, যেন তারা অবশেয়ে ঠিকমত বসতে পারে। এবং এরপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।

প্রায়শই আমরা একই উপকথার ভিন্ন সংস্করণের দেখা পাই। এটি খুব বিস্ময়কর নয়, কারণ মানুষ প্রায়শই খুটিনাটি বিষয়গুলো বদলে ফেলে যখন ক্যাম্প ফায়ারের সামনে বসে গল্পগুজব করে। সুতরাং কাহিনীর স্থানীয় সংস্করণগুলো ক্রমেই নিজেদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। সেই একই তাসমানিয়ার পুরাণের একটি সংস্করণে, মইনি প্রথম মানুষকে সৃষ্টি করেন আকাশে, যার নাম পারলেভার। পারলেভার বসতে পারতো না কারণ তার ক্যাঙারুর মত লেজ আর ভাজ করার মত কোনো হাটু ছিলনা। আগের মত প্রতিদ্বন্দী দেবতা ড্রোমেরডিনার সাহায্যের জন্য হাজির হন। তিনি পারলেভারকে সত্যিকারের হাটু দেন এবং লেজ কেটে বাদ দেন, চর্বি দিয়ে তার ক্ষতটা সুস্থ করেন। পারলেভার এরপর তাসমানিয়া এসেছে আকাশের পথে হেটে ( মিল্কি ওয়ে)।

মধ্যপ্রাচ্যে হিব্রু গোত্রের একটি মাত্র মাত্র দেবতা, যাদেরকে তারা গন্য করে প্রতিদ্বন্দী সব গোত্রের দেবতাদের চেয়ে আরো উচ্চতম অবস্থানে। তার নানা ধরনের নাম আছে, যাদের কোনোটাই ব্যবহার করার জন্য তাদের অনুমতি নেই। তিনি প্রথম মানুষকে ধুলা থেকে তৈরী করেন এবং তার নাম দেন অ্যাডাম (যার মানে শুধু মানুষ)। তিনি ইচ্ছা করেই অ্যাডামকে তার মত দেখতে যেন হয় সেভাবেই বানিয়েছেন। আসলেই ইতিহাসে বেশীর ভাগ দেবতাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে পুরুষরা (অথবা কখনো নারীরা), প্রায়শই দানবাকৃতির এবং অবশ্যই অতিপ্রাকৃত শক্তিসহ।

ঈশ্বর অ্যাডামকে রাখেন একটি সুন্দর বাগানে, যার নাম ইডেন, যেখানে বহু গাছ ছিল, যাদের ফল খাওয়ার জন্য অ্যাডামকে উৎসাহিত করা হয়েছিল – একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এই নিষিদ্ধ বৃক্ষটি ছিল, ভালো আর মন্দের বিভেদ জানার জ্ঞানবৃক্ষ। ঈশ্বর অ্যাডামকে একা রেখে গেলেন মনে কোনো সন্দেহ ছাড়াই যে অবশ্যই সে কখনো এই গাছটির ফল খাবে না।

কিছুদিন পর ঈশ্বরের মনে হলো অ্যাডাম একা একা হয়তো নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে, তিনি বিষয়টি নিয়ে কিছু করার কথা ভাবলেন। এ অবধি, মইনি আর ড্রোমেরদিনার এর কাহিনীর ক্ষেত্রে যা হয়োিছল – এই পুরাণেরও দুটি সংস্করণ আছে, দুটোই পাওয়া যায় বাইবেলের বুক অব জেনেসিসে। বেশী বর্ণিল সংস্করণে, ঈশ্বর সব প্রাণীকে অ্যাডামের সহযোগী হিসাবে সৃষ্টি করেন, তারপর তার মনে হয়েছিল যেন এখনও কিছু বাকি আছে: একজন নারী! সুতরাং তিনি অ্যাডামকে পুরোপুরি অচেতন করে তাকে কেটে উন্মুক্ত করলেন, বুকের একটি পাজর বের করে, তার ক্ষতস্থান সেলাই করে দেন। এরপর সেই পাজর থেকে তিনি একটি নারী সৃষ্টি করেন, যেমন করে কোনো ফুল গাছের কাটা অংশ বা কলম থেকে ফুল ফোটানো সম্ভব এমন গাছের জন্ম দেয় যায়। তার নাম তিনি দিলেন ইভ, এবং অ্যাডামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তার স্ত্রী হিসাবে।

13450772_295027890885438_5741499724979303664_n

দূর্ভাগ্যজনভাবে, বাগানে একটি দুষ্ট সাপ ছিল, সে ইভের কাছে যায় ও তাকে প্ররোচিত করে শুভ অশুভ জানার সেই জ্ঞানবৃক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ফল পেড়ে অ্যাডামকে দিতে। অ্যাডাম ও ইভ দুজনেই সেই ফল খান, দ্রুত তারা সেই জ্ঞানটি অর্জন করেন – তারা দুজনেই আসলে নগ্ন। বিষয়টি তাদের অপ্রস্তুত করে এবং তারা ডুমুর পাতা দিয়ে নিজেদের আচ্ছাদন বানায়। যখন বিষয়টি ঈশ্বরে নজরে আসে, তিনি অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হন, এই ফলটি খাওয়ার জন্য ও জ্ঞান অর্জন করার জন্য – তাদের নিষ্পাপতা হারানোর জন্য, যেমনটা আমার মনে হয়। তিনি তাদের বাগান থেকে বের করে দেন, এবং তাদের ও তাদের সব বংশধরদের অভিশপ্ত করেন একটি কঠোর পরিশ্রম আর যন্ত্রণার জীবনের শাস্তি দিয়ে। আজ অবধি, অ্যাডাম ও ইভের সেই ভয়ঙ্কর অবাধ্যতাকে বহু মানুষই গভীরভাবেই বিশ্বাস করেন, আদি পাপ বা ‘অরিজিনাল সিন’ নামে। কিছু মানুষ এমনকি বিশ্বাস করেন যে আমরা সবাই সেই আদি পাপ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি অ্যাডামের কাছ থেকে ( যদিও তাদের অনেকেই স্বীকার করেন অ্যাডামের আসলেই কোনো অস্তিত্ব ছিলনা) এবং তার অপরাধের ভাগীদার।

স্ক্যানডেনেভিয়ার নর্সদের, যারা ভাইকিং সমুদ্র অভিযাত্রী হিসাবে বিখ্যাত, বহু দেবতা ছিল, যেমন গ্রীক ও রোমানদের ছিল। তাদের প্রধান দেবতা হলেন ওডিন, কখনো যাকে বলা হয় ওটান অথবা ওডেন। যেখান থেকে আমরা আমাদের বুধবার এর ইংরেজী ওয়েডনেসডে পেয়েছি ( থার্সডে এসেছে আরেক নর্স দেবতা, থর, বজ্রপাতের দেবতা, যে বজ্রপাত তিনি সৃষ্টি করেন তার শক্তিশালী হাতুড়ী দিয়ে।)

একদিন ওডিন সমুদ্রের বেলাভূমিতে তার ভাইদের নিয়ে হাটছিলেন, তারা সবাইও দেবতা, এবং তারা দুটি গাছের গুড়ি দেখতে পান।

এই গাছের গুড়ির একটিকে তারা রুপান্তর করলে প্রথম মানুষে, যাকে তারা নাম দিলেন আস্ক, এবং অন্য গুড়িটাকে প্রথম রমনীতে রুপান্তরিত করেন, যাকে তারা নাম দেন এমবালা। প্রথম পুরুষ ও প্রথম নারীর শরীর দুটি তৈরী করার পর, দেবতা ভাইরা তাদের জীবন দিলেন, এরপর যথাক্রমে তাদের দিলেন – সচেতনতা, চেহারা, এবং কথা বলার ক্ষমতা।

13432366_295027897552104_739713234234628667_n

কেন গাছের গুড়ি, আমি ভাবি? কেন বরফ টুকরো বা বালিয়াড়ি নয়? খুব বিস্ময়কর না যদি ভাবেন, কে এই গল্পগুলো বানিয়েছিল? এবং কেন? সম্ভবত এই সব পুরাণ কাহিনীর প্রথম আবিষ্কারকরা জানতো এগুলো সব কাহিনী – যে মুহূর্তে তারা এসব কাহিনী উদ্ভাবন করতো। অথবা আপনি কি মনে করেন বিভিন্ন মানুষ গল্পগুলোর বিভিন্ন অংশ বানিয়েছে, ভিন্ন সময়ে এবং ভিন্ন জায়গায়, এবং অন্য মানুষরা তাদের সব একসাথে জড়ো করেছে, হয়তো তাদের কিছুটা রদবদল করে, হয়তো না জেনেই যে কাহিনীর নানা অংশগুলো মূলত বানানো?

গল্প শুনতে বেশ মজা লাগে, আমরা সবাই সেগুলো বার বার বলতেও ভালোবাসি। কিন্তু যখনই আমরা বেশী বর্ণিল কোনো কাহিনী শুনি, সেটি প্রাচীণ কোনো পুরাণ হোন অথবা কোনো আধুনিক আর্বান লিজেণ্ড বা শহুরে রুপকথাই হোক না কেন, যা ইন্টারনেটে দ্রুত হাত বদল হচ্ছে, বিশ্বাস করার আগে এটি পুরোপুরি – অথবা এর কোনো অংশ সত্য কিনা, সেটা জানতে চাওয়া সময়ের অপচয় নয়।

সুতরাং আমরা আবার সেই প্রশ্নটাই আমাদের করি – প্রথম মানুষ তাহলে কে ছিল? এবরা এর সত্যিকার এবং বৈজ্ঞানিক উত্তরটা পড়ে দেখুন।

আসলেই, কে ছিল প্রথম মানুষ?

খবু অবাক হতে পারেন, কিন্তু আসলেই কখনোই একজন প্রথম মানুষ বলে কেউ ছিল না – কারণ প্রতিটি মানুষের পিতা মাতা থাকতে হবে, এবং সেই পিতামাতারাও মানুষ! একই ঘটনা খরগোশদের ক্ষেত্রেও ঘটে। কখনোই একটি প্রথম খরগোশ বলে কিছু ছিল না, কখানোই প্রথম কুমির ছিল না, কখনোই প্রথম ড্রাগন ফ্লাই বা গঙ্গা ফড়িং ছিল না। প্রতিটি জীবই যার জন্ম হয়েছে তারা এর পিতামাতা যে প্রজাতির সেই প্রজাতির সদস্য ( হয়তো খুব সামান্য কিছু ব্যতিক্রম সহ, যা আমি আপাতত এই আলোচনায় উহ্য রাখলাম)। সুতরাং এর মানে অবশ্যই প্রতিটি জীব যাদের জন্ম হয়েছে তারা তাদের পিতামহ/মহী / মাতামহ/মহী যে প্রজাতির সেই প্রজাতির সদস্য হবে। এমনকি প্রপিতামহ/মহী যে প্রজাতির সেই প্রজাতিরও। এবং এভাবেই চলতে থাকবে চিরকালের জন্য।

13528716_301709716883922_8623318473853062338_n

চিরকালের জন্য ? বেশ, না এটি এত বেশী সরল নয় যেমন ভাবে বলা হলো। কিছুটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। এবং আমি শুরু করবে একটি চিন্তার পরীক্ষা দিয়ে। থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তার পরীক্ষা হচ্ছে আপনার কল্পনায় একটি পরীক্ষা। আমরা যা কিছু কল্পনা করবো, সেটি আক্ষরিক অর্থে সম্ভব নয় কারণ এটি আমাদের সময়ে অনেকে অতীতের দিকে নিয়ে যাবে, সেই সময় যখন আমাদের জন্ম হয়নি। কিন্তু এটি কল্পনা করা আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

বেশ, এটা হচ্ছে আমাদের চিন্তার পরীক্ষা। আমাদের শুধু যা করতে হবে তা হলো নির্দেশগুলো অনুসরণ করে নিজে নিজে কল্পনা করা।

নিজের একটি ছবি খুঁজে বের করুন। এরপর আপনার বাবার একটি ছবি নিন, এবং ছবিটিকে আপনার ছবির উপর রাখুন। এবার আপনার বাবার বাবা, মানে আপনার দাদার একটি ছবি সংগ্রহ করুন, এবার সেটি আপনার বাবার ছবির উপর রাখুন। এরপর আপনার দাদার বাবা আপনার প্রপিতামহের একটি ছবি রাখুন তার উপর। আপনি হয়তো আপনার প্রপিতা/মাতামহদের কাউকেই কখনোই দেখেননি। যেমন আমার নিজের প্রপিতা/মাতামহ কারোর সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু আমি জানি তাদের একজন ছিলেন কাউন্টির স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অন্য একজন একটি কাউন্টির ডাক্তার। বৃটিশ ভারতে একজন বন সংরক্ষক ছিলেন, অন্য জন ছিলেন আইনজীবি, ক্রিম খুব পছন্দ করতেন, বৃদ্ধ বয়সে যিনি পাহাড়ের ওঠার সময় মারা যান। যাই হোক এমনকি যদি আপনি নাও জানেন – আপনার বাবার বাবার বাবা কেমন দেখতে ছিলেন, আপনি তাকে অস্পষ্ট একটি চেহারার মানুষ হিসাবে কল্পনা করতে পারেন, চামড়ার ফ্রেমে বাধানো অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া কোনো বাদামী রঙের আলোকচিত্রের মত। এবং একই কাজ করুন তারও বাবার ব্যাপারেও। আপনার প্র-প্র- পিতামহ। এভাবে একটার উপর একটা ছবি জমা করতে থাকুন আরো পেছনে গিয়ে আরো প্র প্র প্র পিতামহদের ছবিগুলো।

আপনি এভাবে পিছনে যেতে পারবেন এমনকি যখন আলোকচিত্রও আবিষ্কার হয়নি সেই সময়েও, কারণ এটি তো চিন্তার পরীক্ষা।

কত জন প্র প্র প্র … পিতামহদের দরকার হবে আমাদের চিন্তার পরীক্ষার জন্য? ওহ, মাত্র ১৮৫ মিলিয়ন বা তার আশে পাশে, এমন সংখ্যক হলেই হবে। শুধু ? শুধুমাত্র ? ১৮৫ মিলিয়ন ছবির কোনো স্তুপের কথা কল্পনার করা সহজ নয়। কত উচু হবে সেটি ? বেশ, যদি প্রতিটি ছবি প্রিন্ট করা হয় সাধারণ পিকচার পোস্টকার্ড হিসাবে, ১৮৫ মিলিয়ন ছবি তাহলে ২২০,০০০ ফুট উচু হবে, সেটি একটার পর একটা দাড়ানো ১৮০ টি নিউ ইয়র্কের স্কাই স্ক্র্যাপারদের সমান হবে। বেয়ে ওঠার জন্য অনেক লম্বা, এমন কি যদিও এটি ওঠার সময় পড়ে না যায় (যদিও পড়ে যাবারই কথা), ঠিক আছে এটাকে নিরাপদে একপাশে কাত করে শুইয়ে দেয়া যাক, একটি মাত্র বুক শেলফের মত – ছবিগুলো সাজানো হোক। বুক শেলফটি কত লম্বা হবে ? প্রায় চল্লিশ মাইল।

বুক শেলফটির সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রান্তে আপনার ছবি। এর সবচেয়ে দূরের অংশে আপনার ১৮৫ মিলিয়ন তম- প্র – পিতামহ। তিনি কেমন দেখতে ছিলেন? তিনি কি একজন বৃদ্ধ মানুষ – পাতলা চুল আর সাদা জুলফি সহ? একজন চিতাবাঘের চামড়া গায়ে কোনো গুহামানব? এমন কোনে চিন্তা পুরোপুরি ভুলে যান। আমাদের জানা নেই আসলেই তিনি কেমন দেখতে ছিলেন, কিন্তু জীবাশ্ম আমাদের সে বিষয়ে বেশ ভালো ধারণা দিয়েছে। বিশ্বাস করুন বা না করুন, আপনার ১৮৫-মিলিয়ন তম-প্র- পিতামহ ছিলেন – একটি মাছ। একই ছিলেন ১৮৫-মিলিয়ন তম-প্র- পিতামহীও, তাদের তাই হতে হবে নয়তো তারা প্রজনন করতে পারতেন না পরস্পরের সাথে এবং আপনিও এখন এখানে থাকতেন না।

13466226_301709713550589_7512229688136090049_n

আসুন এবার আমরা এই চল্লিশ মাইল লম্বা বইয়ের শেলফটি ধরে হাটি, একটার পর একটা ছবি সেখানে থেকে বের করে দেখি। প্রতিটি ছবিই দেখাবে একটি প্রাণির ছবি, যে তার দুইপাশের ছবির প্রাণিদের একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেকেই দেখতে এই সারিতে তাদের প্রতিবেশীদের মত – অথবা যথেষ্ট সদৃশ যেমন করে কোনো মানুষ তার পিতা ও পুত্রের মত দেখতে হয়। কিন্তু তারপরও আপনি যদি স্থিরভাবে বইয়ের শেলফটির এক প্রান্ত থেকে হাটা শুরু করেন, আপনি এর এক প্রান্তে দেখবেন একজন মানুষ আর অন্য প্রান্তে একটি মাছ। এবং তার মধ্যে বহু ধরনের মজার সব প্র ….. প্র-পিতামহরা, যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যেমনটি আমরা একটু পরেই দেখবো কিছু প্রাণি যারা দেখতে নরবানরের মত , অন্যরা দেখতে বানরের মত, অন্যরা দেখতে শ্রিউর মত এবং এভাবে আরো। প্রত্যেকেই সেই সারিতে তাদের প্রতিবেশীর মত, তারপরও আপনি যদি যে কোনো দুটি ছবি বাছাই করেন যারা সেই সারিতে দুরে অবস্থান করছে, তারা বেশ ভিন্ন পরস্পরের চেয়ে। এবং আপনি যদি মানুষ থেকে সেই সারিটি অনুসরণ করেন যথেষ্ট পরিমান পশ্চাৎমুখে আপনি একটি মাছের দেখা পাবেন। কিভাবে এমন হতে পারে?

আসলেই ব্যপারটা বোঝা কিন্তু খুব কঠিন না। আমার ধীর পরিবর্তনের সাথে বেশ অভ্যস্ত, যা ছোট ছোট ধাপে, একের পর এক, অনেক বড় ধরনের পরিবর্তন সৃষ্টি করে। আপনি একসময় একটি মায়ের কোলের শিশু ছিলেন, এখন আর সেই শিশু নন। আপনার বয়স যখন আরো বেশী হবে আপনি দেখতেও ভিন্ন হবেন আবারও। কিন্তু প্রতিদিন আপনার জীবনে, যখন আপনার ঘুম ভাঙ্গে, আপনি কিন্তু সেই একই মানুষ যে গত রাতে এই বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন- একটি শিশু, ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে, শৈশব পেরিয়ে বয়ঃসন্ধি কাল, এরপর তরুণ, পরে মধ্যবয়স্ক, এবং পরিশেষে একজন বৃদ্ধ। এবং পরিবর্তন এত ধীরে হয় যে এমন কোনো দিন আসেনা যখন কিনা আপনি বলতে পারবেন, এই মানুষটি হঠাৎ করেই আর শিশু নেই এবং এখন যে বড় হয়ে গেছে। এবং পরে এমন কোনো দিন আসবে না যখন আপনি বলতে পারবেন এই মানুষটি আর শিশু নয় এখন সে তার কৈশোরে। এমন কোনো দিন আসবে না যখন আপনি বলতে পারবেন, গতকাল এই মানুষটি মধ্যবয়সী ছিল, এখন তিনি বৃদ্ধ।

আমাদের চিন্তার পরীক্ষাটি এটি বুঝতে সহায়তা করে, যা আমাদের নিয়ে যায় ১৮৫ মিলিয়ন প্রজন্ম আগে, পিতামাতা, পিতামহ, মাতামহ, প্র পিতামহ মাতামহ হয়ে অতীতের দিকে যতক্ষণ না আমরা মুখোমুখি হই একটি মাছের। এবং এরপর আবার ঘুরে সময়ের সাথে সামনে দেলে যা ঘটে যখন আপনার মাছ পূর্বসূরি মাছ শিশুর জন্ম হয়, তারও সন্তান হয় – যে ১৮৫ ( ধীরে ধীরে কম মাছ জাতীয় হয়ে) প্রজন্ম পরে রুপান্তরিত হয় আপনি হিসাবে।

সুতরাং পুরো প্রক্রিয়াটি ধীর, এত ধীর যে আপনি কোনো পার্থক্যই লক্ষ্য করতে পারবেন না আপনি যদি হাজার বছর পিছনের দিকে হেটে যান অথবা এমনকি দশ হাজার বছর আগে, যা আপনাকে আপনার ৪০০ তম প্র পিতামহের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। অথবা, বরং আপনি হয়তো বহু ছোটখাটো পরিবর্তন সারা পথ জুড়েই লক্ষ্য করবেন, কারণ কেউই হুবুহু তার বাবার মত দেখতে হয়না, কিন্তু আপনি কোনো সাধারণ প্রবণতা লক্ষ্য করতে পারবেনা। আধুনিক মানুষ থেকে দশ হাজার বছর পূর্বে আসলে যথেষ্ঠ লম্বা সময় না কোনো প্রবণতা লক্ষ্য করার জন্য। দশ হাজার বছর আগের আপনার পূর্বপুরষেদের ছবি আধুনিক মানুষ থেকে ভিন্ন হবে না, যদি আমরা পরিচ্ছদ, চুল আর গোফের রীতির উপরি পার্থক্যগুলো উপেক্ষা করতে পারি। আধুনিক মানুষ থেকে আরেকজন আধুনিক মানুষের যে পার্থক্য, তার চেয়ে আমাদের থেকে সে বেশী ভিন্ন হবেনা।

তাহলে কিভাবে এক লক্ষ বছর আগে, যেখানে আমরা হয়তো দেখা পাবো আপনার ৪০০০ তম প্র পিতামহের? বেশ, এখন লক্ষ্য করার মত কিছু পার্থক্য আমরা দেখেেত পাবো। হয়তো মাথার খুলি কিছুটা বাড়তি পূরুত্ব,বিশেষ করে ভ্রুর নীচে, কিন্তু তারপরও সেই পার্থক্যটা খুব বেশী হবে না । এখন সময়ে আরো পিছনে যাওয়া যাক। আপনি যদি সেই শেলফের প্রথম এক মিলিয়ন বছর পেছনে যান, আপনার ৫০,০০০ তম প্র পিতামহ যথেষ্ট ভিন্ন হবে তাদের ভিন্ন প্রজাতি হিসাবে চিহ্নিত হবার জন্য, যে প্রজাতিকে আমরা নাম দিয়েছি Homo erectus আজ আমরা, আপনি যেমন জানেন, Homo sapiens; Homo erectus আর Homo sapiens সম্ভবত পরস্পরের সাথে প্রজনন করতে চাইতো না, অথবা, এমনকি যদিও তারা সেটি করে, তাদের সন্তানদের সম্ভবত নিজের সন্তান উৎপাদন করার ক্ষমতা থাকতো না – ঠিক যেমন হয় মিউলদের ক্ষেত্রে, যাদের গাধা বাবা আর ঘোড়া মা থাকে, এরা প্রায় সবসময়ই সন্তান উৎপাদন করতে অক্ষম (পরের অধ্যায়ে আমরা দেখবো কেন)।

আরো একবার, যদিও, সবকিছুই ধীর, ধাপে ধাপে। আপনি হোমো সেপিয়েন্স এবং আপনার ৫০০০০ তম প্র পিতামহ ছিলেন হোমো ইরেকটাস। কিন্তু কখনোই এমন কোনো হোমো ইরেকটাস ছিল না যে হঠাৎ করেই হোমো সেপিয়েন্স শিশুর জন্ম দিয়েছিল।

সুতরাং, কে ছিল প্রথম মানুষ এবং কখন কোথায় তারা বসবাস করতো এই প্রশ্নটির কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। এটি কিছুটা অস্পষ্ট, যেমন এই প্রশ্নের উত্তরের মত : কখন থেকে আপনি কোলের শিশু হওয়া বন্ধ করলেন এবং হাটতে সক্ষম শৈশবে প্রবেশ করলেন- এরপর কৈশোরে ? কোনো একটি পর্যায়ে, সম্ভবত এক মিলিয়ন বছরের কম সময় আগে কিন্তু এক লক্ষ বছরের বেশী সময় পরে, আমাদের পূর্বসূরিরা যথেষ্ঠ পরিমান ভিন্ন ছিল আমাদের থেকে যে কোনো আধুনিক ব্যক্তি তাদের সাথে প্রজনন করতে সক্ষম হতেন না যদি তাদের কখনো দেখা হতো।

হোমো ইরেকটাসকে আমাদের একজন ব্যক্তি, একজন মানুষ হিসাবে ডাকবো কিনা সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কিভাবে আপনি আপনার শব্দ বাছাই করেছেন এটি সেই প্রশ্ন – যাকে বলা যেতে পারে সেমানটিক বা শব্দার্থগত প্রশ্ন। কিছু মানুষ হয়তো একটি জেব্রাকে ডাকতে পারে ডোরাকাটা ঘোড়া, অন্যরা হয়তো ঘোড়া শব্দটি সংরক্ষণ করবেন সেই প্রজাতির জন্য যাদের উপর আমরা সওয়ার হই চড়ার জন্য। এটি আরেকটি সেমানটিক প্রশ্ন। আপনি হয়তো ব্যক্তি, পুরুষ এবং নারী এই শব্দগুলো রাখতে চান হোমো সেপিয়েন্সদের জন্য। আপনার উপর সেটি নির্ভর করবে। তবে কেউ আপনার মাছের মত ১৮৫ মিলিয়ন তম প্র – পিতামহকে মানুষ বলে ডাকবে না। কারণ সেটি আসলেই বোকামী, যদিও আপনার সাথে তাকে একটি অবিচ্ছিন্ন প্রজন্মের শৃঙ্খল যুক্ত করে রেখেছে, যে শৃঙ্খলের প্রতিটি সংযোগই তার দুই প্রতিবেশী সংযোগের মত একই প্রজাতির।

যে ইতিহাস লেখা পাথরে

বেশ, কিভাবে আমরা জেনেছি যে আমাদের দূরের পূর্বসূরিরা কেমন ছিল দেখতে, আর কিভাবেই বা আমরা জেনেছি যে তারা কখন বেঁচে ছিল? মূলত জীবাশ্ম থেকে। জীবাশ্মগুলো তৈরী হয় পাথর দিয়ে। এরা হচ্ছে সেই পাথর যারা মৃত প্রাণি বা উদ্ভিদের মূল আকৃতিটি ধারণ করে। বেশীর ভাগ প্রাণি মারা যায় কখনোই জীবাশ্ম হতে পারবে না এমন সম্ভাবনা নিয়েই। কৌশলটি হচ্ছে, যদি আপনি জীবাশ্ম হতে চান, তাহলে আমরা সঠিক ধরনের কাদায় বা পলিতে সমাহিত হতে হবে, যে ধরনের কাদা পরবর্তীতে হয়তো শক্ত হয়ে ‘পাললিক শিলা’ তৈরী করতে পারে।

13465948_306510336403860_498541137390253068_n

এর মানে কি? শিলা বা পাথর তিন ধরনের হতে পারে: আগ্নেয়, পাললিক, মেটামরফিক বা রুপান্তরিত। আমি মেটামরফিক শিলা এখানে আলোচনায় আনবো না কারণ সেগুলো মূলত অন্য দুটি প্রকারের যে কোনো একটি: আগ্নেয় এবং পাললিক, যা পরিবর্তিত হয় চাপ এবং/অথবা তাপে।

আগ্নেয় বা ইগনিয়াস শিলা ( ল্যাটিন ইগনিস শব্দ থেকে, যার অর্থ আগুন), একসময় গলিত ছিল, তপ্ত লাভার মত যা আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বের হয়ে এসেছিল এবং এটি ঘনীভূত হয়ে শক্ত শিলায় রুপান্তরিত করে যখন তারা শীতল হয়। যে কোনো ধরনের শক্ত শিলা ক্ষয় হয়, বাতাসে অথবা পানিতে, তারপর এটি সাগর, হৃদ কিংবা নদীর তলদেশে তলানী হয়ে জমা হয়। অনেক দীর্ঘ সময় ধরে এই তলানী শক্ত হয়ে স্তর ( বা স্ট্র্যাটা) তৈরী করে। যদিও সব স্তরই আনুভূমিক হয়ে শুরু হয়, কিন্তু প্রায়শই তারা কাত হয়ে যায় বা পুরোটা উল্টে কিংবা বিকৃত হয়ে যায় যখন আমরা তাদের দেখি বহু মিলিয়ন বছর পর ( দশম অধ্যায়ে আমরা দেখবো কেমন করে এটি ঘটতে পারে ভুমিকম্পের সময়)।

এখন মনে করুন যে একটি মৃত প্রাণি কোনোভাবে ভেসে এসে কাদায় এসে পড়ে, হয়তো কোনো একটি নদীর মোহনায় । যদি কাদা পরে শক্ত হয়ে পাললিক শিলায় রুপান্তরিত হয়, প্রাণির শরীর হয়তো পচে যাবে, শুধু অবশিষ্ট থাকবে শক্ত পাথর, এর আকারের একটি ছাপ, যা আমরা পরে একসময় খুজে পাই। এটি একধরনের জীবাশ্ম – প্রাণির এক ধরনের নেগেটিভ চিত্র। অথবা সেই প্রাণির ফাপা ছাপটি ছাঁচ হিসাবে কাজ করতে করে যেখানে নতুন তলানী পড়ে, পরে শক্ত হয়ে প্রাণি শরীরের একটি পজিটিভ অনুলিপি তৈরী করে। এটি দ্বিতীয় ধরনের জীবাশ্ম। এবং তৃতীয় এক ধরনের জীবাশ্ম আছে, যেখানে প্রাণি শরীরের প্রতিটি অণু পরমাণুকে প্রতিস্থাপিত করে পানিতে থাকা খনিজ, যা পরে স্ফটিকীকরণ প্রক্রিয়া পাথরে রুপান্তরিত করে। এটি সবচেয়ে সেরা ধরনের জীবাশ্ম কারণ, ভাগ্য ভালো থাকলে কোনো প্রাণির আভ্যন্তরীণ খুটিনাটি বিষয়গুলোর চিরস্থায়ী অনুলিপি করে, ঠিক এর ভিতর থেকে।

জীবাশ্মদের সময় নিরুপন করা যেতে পারে। মূলত তেজষ্ক্রিয় আইসোটোপগুলো পাথরে পরিমাপ করার মাধ্যমে আমরা বলতে পারি তারা কতটা প্রাচীন। আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে আইসোটোপ আর পরমাণু সম্বন্ধে জানবো। তবে সংক্ষেপে, একটি তেজষ্ক্রিয় আইসোটোপ হচ্ছে এক ধরেনের পরমাণু, যা ক্ষয়ীভূত হয়ে ভিন্ন ধরনের একটি পরমাণু তৈরী করে: যেমন একটি, ইউরেনিয়াম – ২৩৮ রুপান্তরিত হয় সীসা-২০৬ এ। যেহেতু আমরা জানি কতক্ষণ সময় লাগে এমন কিছু ঘটতে, আমরা আইসোটোপকে ভাবতে পারি তেজষ্ক্রিয় ঘড়ি হিসাবে। তেজষ্ক্রিয় ঘড়িগুলো সেই পানির ঘড়ি, মোম ঘড়ির মতই, যে ঘড়িগুলো মানুষ ব্যবহার করতো পেন্ডুলাম ঘড়ি আবিষ্কারের আগে। একটা পানির ট্যাঙ্কের একটি ছিদ্র থাকে, যেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য হারে পানি বের হয়ে যায়। যদি ট্যাঙ্কটি ভোরে পূর্ণ করা হয়, আপনি বলতে পারবেন দিনের কতটা সময় অতিক্রম হয়েছে পানির বর্তমান স্তর পরিমাপ করে। একইভাবে সময় পরিমাপ করা হয় মোম ঘড়ি দিয়ে। মোম একটি নির্দিষ্ট হারে গলতে থাকে, সুতরাং আপনি বলতে পারবেন কতটা সময় অতিক্রান্ত হয়েছে কতটুকু মোমবাতি এখন গলেনি সেটি পরিমাপ করে। ইউরেনিয়াম ২৩৮ ঘড়ির ক্ষেত্রেও, আমরা জানি যে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর সময় লাগে অর্ধেক ইউরেনিয়াম-২৩৮ ক্ষয় হয়ে সীসা-২০৬ এ পরিণত হবার জন্য। এটাকেই বলা হয় ইউরেনিয়াম-২৩৮ এর হাফ লাইফ। সুতরাং, কত পরিমান সীসা-২০৬ আছে পাথরে সেটি পরিমাপ করে, ইরেনিয়াম-২৩৮ এর পরিমানের সাথে তুলনা করা হয়। এখান থেকে আপনি পরিমাপ করতে পারবেন কতটা সময় পার হয়েছে সেই সময় থেকে যখন কোনো সীসা-২০৬ ছিল না, শুধু ছিল ইউরেনিয়াম-২৩৮। অন্যভাবে যদি বলি, কতটা সময় অতিক্রান্ত হয়েছে ঘড়িটি যখন শূন্যে স্থির হয়েছিল।

আর কখন ঘড়িটি শূন্যে স্থির হয়েছিল? বেশ, এটি ঘটে শুধুমাত্র আগ্নেয় শিলার সাখে, যার ঘড়িগুলো সব এক মুহূর্তে শূন্যে স্থির হয় যখন গলিত শিলা শক্ত হয় ঘনীভূত হয়ে। পাললিক শিলার এটি ঘটে না, সেখানে কোনো সেই শূন্যে স্থির হবার মুহূর্ত নেই, খুব দূঃখজনক, কারণ জীবাশ্মদের পাওয়া যায় শুধুমাত্র পাললিক শিলার স্তরে। সুতরাং আমরা পাললিক শিলা স্তরের নিকটবর্তী আগ্নেয় শিলা খুজে বের করতে হয়, এবং সেটাকেই ঘড়ি হিসাবে আমাদের ব্যবহার করতে হয়। যেমন, যদি একটি জীবাশ্ম এমন পাললিক শিলা স্তরে থাকে যার উপরে ১২০ মিলিয়ন পুরোনো আগ্নেয় শিলা এবং নীচে ১৩০ মিলিয়ন বছর প্রাচীন আগ্নেয় শিলা থাকে। আপনি বলতে পারবেন যে এই জীবাশ্মটির বয়স ১২০ মিলিয়ন থেকে ১৩০ মিলিয়ন বছরের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ের। এই অধ্যায়ে উল্লেখিত সব সময়গুলো পরিমাপ করা হয়েছে এভাবে। এই সবগুলো মূলত একটি নিকটবর্তী একটা সময়, একেবারে খুব সুনির্দিষ্টভাবে তাদের গ্রহন করা যাবেনা।

ইউরেনিয়াম-২৩৮ একমাত্র তেজস্ত্রিয় আইসোটোপ নয়, যা আমরা ঘড়ি হিসাবে ব্যবহার করতে পারি। আরো অনেক এমন ঘড়ি চমৎকারভাবে বিস্তৃত অর্ধ জীবন সহ। যেমন, কার্বন ১৪ র অর্ধজীবন ৫৭৩০ বছর, যা প্রত্নতত্ত্ববিদদের জন্য উপযোগী, মানব ইতিহাস সংক্রান্ত সময় পরিমাপ করার জন্য। একটি সুন্দর বাস্তব তথ্য হচ্ছে বহু ভিন্ন ধরনের তেজষ্ক্রিয় ঘড়িগুলোর পরস্পরের সম্পূরক সময় মাপার স্কেল আছে, সুতরাং আমরা তাদের ব্যবহার করতে পারি পারস্পরিক ফলাফল যাচাই করার জন্য। এবং সবসময়ই আমরা একই ফলাফল পেয়েছি।

কার্বন ১৪ ঘড়ি কাজ করে অন্য ঘড়িগুলো থেকে খানিকটা ভিন্ন উপায়ে। এখানে আমাদের আগ্নেয় শিলার দরকার পড়ে না, বরং জীবিত শরীরের অবশিষ্ঠাংশ ব্যবহার করে, যেমন পুরোনো কাঠ। এটি আমাদের সবচেয়ে দ্রুততম তেজষ্ক্রিয় ঘড়ি, কিন্তু ৫৭৩০ বছর তারপরও অনেক দীর্ঘ সময় কোনো মানুষের জীবনকালের চেয়ে, সুতরাং আপনি হয়তো জানতে চাইবেন, কিভাবে আমরা জানি কার্বন ১৪ এর অর্ধ জীবন এটাই বা কিভাবেই বা জানি ইরেনিয়াম ২৩৮ এর অর্ধ জীবন ৪.৫ বিলিয়ন বছর ! এর উত্তরটা সহজ। অর্ধেক পরিমান পরমাণুর ক্ষয় হবার জন্য সেই সময় অবধি আমাদের অপেক্ষা করার দরকার নেই। আমরা খুব সামান্য পরিমান পরমাণুর ক্ষয়ের হার পরিমাপ করতে পারি এবং সেখান থেকে অর্ধ জীবন আমরা গণনা করে বের করতে পারি ( এক চতুর্থাংশ জীবন, শতভাগের এক অংশ জীবন ইত্যাদি)।

সময়ের সাথে অতীতে ..

আসুন আরেকটি চিন্তার পরীক্ষা করি। আপনার কিছু সঙ্গীদের একটি টাইম মেশিনে উঠুন। মেশিনটি চালু করুন এবং প্রায় দশ হাজার বছর অতীতের দিকে যাওয়া যাক। দরজা খুলুন, এবং যে মানুষদের সাথে আপনাদের দেখা হবে তাদের ভালো করে লক্ষ্য করুন। যদি না ঘটনাক্রমে এখন যেটি ইরাকে আপনি সেখানে গিয়ে থামেন, যারা তখন কেবল কৃষিকাজ আবিষ্কার করার পক্রিয়ায় আছে, বেশীর ভাগ জায়গায় আমরা শিকারী-সংগ্রহকারীদের (হান্টার গ্যাদারারদের) দেখবো, যারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাযাবরের মত স্থান পরিবর্তন করতো বুনো প্রাণি শিকার আর বুনো ফল সংগ্রহ করতে করতে। তারা যা বলবে তা আপনি বুঝতে পারবেন না, এবং তাদের পরনের কাপড়ও হবে খুব ভিন্ন ( যদি কিছু থেকে থাকে)। যাইহোক, আপনি যদি তাদের আধুনিক কাপড় পরিয়ে দেন ও আধুনিকভাবে চুল কেটে দেন, বর্তমান মানুষ থেকে তাদের পৃথক করা সম্ভব হবে না ( অথবা আধুনিক মানুষরা যেমন আজ পরস্পর থেকে ভিন্ন তার চেয়ে বেশী ভিন্ন তারা হবে না), এবং তারা আপনার সেই টাইম মেশিনে যাত্রী যে কোনো আধুনিক মানুষের সাথে প্রজননও করতে পারবে। এবং তাদের মধ্যে থেকে একজন স্বেচ্ছাসেবককে বাছাই করুন ( হয়তো তিনি আপনার ৪০০ তম প্র পিতামহ, কারণ এটাই আনুমানিক সময় যখন তিনি হয়তো জীবিত ছিলেন), এবং আবার টাইম মেশিন নিয়ে আরো দশ হাজার বছর আগে চলে যান, মোট বিশ হাজার বছর আগে, যেখানে আপনার সুযোগ আছে আপনার ৮০০ তম প্র পিতামহ/মাতামহের সাথে দেখা হবার। এবার আপনি যাদের দেখবেন তারা সাবাই শিকারী সংগ্রাহক, কিন্তু আবারো তাদের শরীর হবে আধুনিক মানুষের মত, এবং আধুনিক মানুষের সাথে তারা পুরোপুরিভাবে প্রজননক্ষম, তারা প্রজননক্ষম উর্বর সন্তানও উৎপাদন করতে পারবে। এদের একজনকে আবারও টাইম মেশিনে নিয়ে নিন আপনার সাথে এবং এরপর আরো দশহাজার বছর অতীতের দিকে যাওয়া যাক। এভাবে চালিয়ে যান, দশ হাজার বছর ব্যবধান দিয়ে অতীতের দিকে, প্রতিটি বিরতিতে একজন নতুন করে একজন আরোহীকে তুলুন, তাকে আরো অতীতের দিকে নিয়ে যান।

13599800_308446836210210_6732738730647005803_n

মূল বিষয়টি হচ্ছে যে এক সময়, এধরনের অনেক দশ হাজার বছর অবধি বিরতির পর, হয়তো যখন আপনি অতীতে মিলিয়ন বছর যাবেন, আপনি লক্ষ্য করতে শুরু করবেন যে টাইম মেশিন থেকে বের হবার পর যে মানুষগুলোর সাথে আপনার দেখা হচ্ছে তারা সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের চেয়ে ভিন্ন, এবং তারা আপনার টাইম মেশিনে যাত্রা শুরু করা কোনো আরোহীর সাথে প্রজনন করতে পারবেনা। কিন্তু তারা তারা প্রজনন করতে সক্ষম হবে সেই সব সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হওয়া আরোহীদের সাথে, যারা নিজেরাও প্রায় তাদের মতই প্রাচীন। আমি সেই একই বিষয়টি আবার উল্লেখ করছি, যা আগেও করেছি – ধীর ধাপে ধাপে পরিবর্তন সহজে নির্নয় করা সম্ভব না, অদৃশ্য অনির্ণেয়, অনেকটা ঘড়ির ঘন্টার কাটার মত, কিন্তু একটি ভিন্ন চিন্তার পরীক্ষা ব্যবহার করে। এবং দুটি ভিন্ন উপায়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার যৌক্তিকতা আছে, কারণ এটি এমন বেশী গুরুত্বপূর্ণ অথচ – এবং বোধগম্য কারণে – বিষয়টি বেশ কিছু মানুষের জন্য অনুধাবন করা বেশ কঠিন।

আবার আমাদের অতীতমুখী যাত্রা শুরু করা যাক, আর সেই অতীতের যাত্রায় কিছু বিরতি স্থানের দিকে লক্ষ্য করা যাক সেই মাছের কাছে পৌছানোর আগ পর্যন্ত। ধরুন আমাদের টাইমমেশিন নিয়ে আমরা এই মাত্র একটি বিরতিস্থানে এসে পৌছালাম, যার নাম ছয় মিলিয়ন বছর আগে। আমরা সেখানে কি খুজে পাবো? যতক্ষণ আমাদের উদ্দেশ্য থাকবে আফ্রিকায় থাকা, আমরা সেখানে আমাদের ২৫০,০০০ তম প্র পিতামহ/মহী, প্র মাতামহ/মহীদের দেখা পাবো ( কিছু প্রজন্ম কম বেশী হতে পারে)। তারা সবাই নরবানর হবে এবং তারা কিছুটা শিম্পাঞ্জিদের মত দেখতে হবে, কিন্তু তারা শিম্পাঞ্জি নয়। বরং, তারা হবে সেই পূর্বসূরি, যাদের আমরা ভাগ করে নেই শিম্পাঞ্জীদের সাথে। কিন্তু তারা প্রজনন করতে পারবে সেই আরোহীদের সাথে যাদের আমার টাইমমেশিনে নিয়েছিলাম পাচ মিলিয়ন নয়শ নব্বই হাজার বছর আগের বিরতিস্থান থেকে এবং হয়তো পাচ মিলিয়ন নয়শ হাজার বছর আগে বিরতি থেকে তোলা আরোহীদের সাথেও প্রজনন করতে পারে। কিন্তু সম্ভবত তাদের সাথে না যারা আমাদের সাথে যোগ দিয়ে চার মিলিয়ন বছর আগের বিরতি স্থান থেকে।

আবার আমাদের সেই দশ হাজার বছরের লাফ দিয়ে অতীতমুখী যাত্রা শুরু করা যাক, সেই পচিশ মিলিয়ন বছর আগের বিরতিতে। সেখানে আপনি আপনার (এবং আমার) দেড় মিলিয়ন তম প্র-পিতামহদের খুজে পাবেন – একটি বেশ নিকটবর্তী আনুমানিক পরিমান। তারা এপ হবে না কারণ তাদের লেজ থাকবে, আমরা তাদের বানর বলে ডাকতাম, যদিও তারা আধুনিক বানরদের সাথে আমাদের সাথে যতটা তার চেয়ে বেশী সম্পর্কযুক্ত হতো না। যদি আমাদের থেকে খুবই ভিন্ন, আধুনিক বানর কিংবা আমাদের সাথে প্রজনন অক্ষম, তারা খুব সহজেই প্রজনন করতে পারবে তাদের প্রায় কাছাকাছি সদৃশ আরোহীর সাথে যারা আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে চব্বিশ মিলিয়ন নয়শ নব্বই হাজার বছর আগে। ধীর পরিবর্তন পুরোটা সময় জুড়ে।

আবার আমরা পেছনে যাই, আরো আগে, দশ হাজার বছর লাফ দিয়ে, প্রতিটি বিরতিতে লক্ষ্য করার মত কোনো পরিবর্তন ছাড়াই। আসুন থামি, দেখি কে আমাদের শুভেচ্ছা জানাতে আসে তেষট্টি মিলিয়ন বছর আগের বিরতি স্থলে। এখানে আমরা করমর্দন করতে পারবো ( বা সেটি কি থাবা বলা উচিৎ হবে) সত্তর মিলিয়ন প্র পিতামহের। তারা দেখতে খানিকটা লেমুর বা বুশ বেশীদের মত, এবং তারা আসলে সব আধুনিক লেমুর ও বুশবেশীদের পূর্বসূরি, এবং সব আধুনিক বানর,নরবানর এবং আমাদেরও। আধুনিক মানুষদের সাথে তারা যতটা সম্পর্কযুক্ত ততটাই তারা কাছের আধুনিক বানরদের, এবং তারচেয়ে বেশী নিকট নয় আধুনিক লেমুর বা বুশবেবীদের। তারা কোনো আধুনিক প্রাণির সাথে প্রজনন করতে পারবেনা, কিন্তু তারা প্রজনন করতে পারবে বাষট্টি মিলিয়ন নয়শ নয় নব্বই হাজার বছর আগের বিরতি থেকে তোলা আরোহীর সাথে। আসুন তাদের টাইম মেশিনে আমন্ত্রন জানাই এবং আবার দ্রুত অতীত মুখে যাত্রা করি।

একশ পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর আগের বিরতিস্থলে আমরা আমাদের ৪৫ মিলিয়ন তম প্র পিতামহের সাথে দেখা হবে। তিনি মারসুপিয়াল (যাদের এখন মূলত অষ্ট্রেলিয়ায় ও আমেরিকায় কিছু পাওয়া যায়) ও মনোট্রিম ( ডাক বিলড প্লাটিপাস ও স্পাইন অ্যান্টইটার, যাদের দেখা যায় অষ্ট্রেলিয়া/ নিউ গিনিতে) ছাড়া সব স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মহা পূর্বসূরিও। তিনি সমানভাবে সকল আধুনিক স্তন্যপায়ীর আত্মীয়, যদিও তিনি তাদের মধ্যে কারো সাথে একটু বেশী সদৃশ্য অন্যদের চেয়ে।

13524435_308446842876876_3471092047324800163_n (1)

তিন শত আর দশ মিলিয়র বছর আগের বিরতিটি আমাদের ১৭০ তম প্র পিতামহের প্রতিনিধিত্ব করছে। তিনিও সব আধুনিক স্তন্যপায়ী, সব আধুনিক সরীসৃপ – সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ, কুমির – ও সব ডায়নোসররা ( পাখিরাও, কারণ পাখিদের বিবর্তন হয়েছে বিশেষ ধরনের ডায়নোসরদের থেকে)। সে সমানভাবে ঐসব আধুনিক প্রাণিদের আত্মীয়, যদি তিনি দেখতে গিরগিটির এর মতই বেশী। এর মানে হচ্ছে গিরগিটিরা তার সেই সময় থেকে অনেক কম পরিবর্তিত হয়েছে, যেমনটা, স্তন্যপায়ীরা হয়েছে। এতক্ষণে টাইম ট্রাভেলে আমরা বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, আর বেশী দুরে নয় যে আমরা মাছের দেখা পাবো যার কথা আমি আগে উল্লেখ করেছি। তার আগে আরেকটা বিরতি নেয়া যাক: তিনশ চল্লিশ মিলিয়ন বছর আগের বিরতি স্থানে আমরা আমাদের ১৭৫ তম প্র পিতামহের দেখা পাবো। তিনি দেখতে কিছুটা নিউটের মত, আধুনিক সব উভচরী ( নিউট ও ব্যাঙ) ছাড়াও সে স্থলবাসী সব মেরুদণ্ডী প্রাণিরও উত্তরসূরি।

13590255_308446839543543_2911009880402193990_n

সুতরাং চারশত সতের মিলিয়ন বছর আগের বিরতিতে আপনার সাথে দেখা হবে আপনার ১৮৫ মিলিয়ন তম প্র পিতামহের, যে মাছের সাথে ইতিমধ্যে আমাদের পরিচয় হয়েছে। সেখান থেকে আমরা সময়ের আরো পেছনের দিতে যেতে পারি, আরো অনেক দূরবর্তী প্র পিতামহের সাথে দেখা করতে পারি, যাদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত নানা ধরনের চোয়াল সহ মাছ, এরপর চোয়াল ছাড়া মাছ, তারপর … বেশ, তারপর আমাদের জ্ঞান একধরনের অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ম্লান হয়ে যায়, কারণ এইসব খুব প্রাচীন সময় হচ্ছে সেই সময় যখন আমাদের হাতে কোনো জীবাশ্ম থাকে না।

ডিএনএ জানাচ্ছে আমরা সবাই আত্মীয় ..

যদিও আমাদের কাছে সেই সব জীবাশ্মগুলো নাও থাকতে পারে যেগুলো কিনা জানাতে পারে আমাদের আরো প্রাচীন পূর্বসূরিরা কেমন দেখতে ছিল, কিন্তু আমাদের মনে কোনো সন্দেহ নেই যে সব জীবিত জীবই পরস্পরের এবং আমাদের আত্মীয়। এবং আমরা আরো জানি কোন আধুনিক প্রাণিগুলো পরস্পরের একটি বেশী নিকটাত্মীয় (যেমন মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি অথবা ইদুর) আর কারাই বা পরস্পরের বেশ দূরের আত্মীয় ( যেমন মানুষ আর কোকিল, অথবা ইদুর আর কুমির) কিন্তু কিভাবে আমরা সেটি জানতে পারলাম? পদ্ধতিগতভাবে তাদের তুলনা করে – সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণগুলো এসেছে তাদের ডিএনএ তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে।

13510860_308509466203947_1123972644600273003_n

ডিএনএ হচ্ছে সেই জিনগত তথ্যভাণ্ডার যা প্রতিটি জীবিত জীব তাদের প্রতিটি কোষে বহন করে। এই ডিএনএ তথ্যগুলো সজ্জিত থাকে অত্যন্ত জটিলভাবে কুণ্ডলী পাকানো উপাত্ত বা ডাটার ফিতায় বা টেপে, যাদের বলা হয় ক্রোমোজোম। এই ক্রোমোজোমগুলো আসলে অনেকটা সেই ধরনের ডাটা টেপের মত দেখতে যাদের পুরোনো আমলের কম্পিউটারে ব্যবহার করা হতো, কারণ যে তথ্য এটি বহন করছে সেটি ডিজিটাল, এবং সেটি ক্রমানুসারে এর দৈর্ঘ বরাবর সজ্জিত। সেগুলো দীর্ঘ সাংকেতিক বা কোড ‘অক্ষরের’ সুতার মত, যা আপনি পড়তে ও গণনা করতে পারবেন। প্রতিটি অক্ষর সেখানে আছে অথবা সেখানে নেই, এর কোনো মধ্যবর্তী অবস্থান নেই, আর সেটাই এটিকে ডিজিটাল বৈশিষ্ট্য দেয় এবং সে কারণেই আমরা বলি ডিএনএ ‘অক্ষর’ দিয়ে লেখা।

প্রতিটি জিন, প্রতিটি প্রাণি, উদ্ভিদ আর ব্যাকটেরিয়ায়,যেখানেই তাদের আমরা দেখেছি, সেগুলো হচ্ছে সাংকেতিক বার্তা কিভাবে সেই জীবটিকে তৈরী করা যায়, যা লেখা হয়েছে ‘অক্ষর’ দিয়ে। এই বর্ণমানায় চারটি মাত্র বর্ণ আছে বাছাই করার জন্য (ইংরেজী বর্ণমালায় যেমন আছে ২৬টি), আমরা ডিএনএ বর্ণগুলো লিখি A, T, C এবং G , এই চারটি বর্ণ ব্যবহার করে। একই জিনের দেখা মেলে বহু ভিন্ন ভিন্ন জীবের শরীরে, খুব সামান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছাড়া। যেমন একটি জিন, যার নাম FoxP2, সব স্তন্যপায়ীদের শরীরে সেটি আছে তো বটেই, এছাড়া আরো অন্য অনেক জীবের শরীরেও এটি দেখা যায়। এই জিনটি ২০০০ এর বেশী অক্ষর দিয়ে সাজানো একটি সুতা। আপনি বলতে পারে FoxP2 জিনটি সব স্তন্যপায়ী প্রাণির শরীরে একই রকম কারণ সংকেতটির বেশীর ভাগ বর্ণ একই। শিম্পাঞ্জিদের সব বর্ণগুলো পুরোপুরি এক নয় আমাদের সাথে, এবং ইদুরের সাথে যতটা ভিন্নতা আছে, তার থেকে অবশ্যই কম।

শিম্পাঞ্জিদের এই জিনটির আমাদের জিনটি তুলনা করলে দেখা যাবে, FoxP2 জিনের ২০৭৬ টি অক্ষরের মধ্যে মাত্র নয়টি অক্ষর আলাদা, আর ইদুরের মাত্র ১৩৯ টি বর্ণ ভিন্ন। অন্য জিনদের ক্ষেত্রে এই একই ধরনের সজ্জা আমরা লক্ষ্য করবো। এটাই ব্যাখ্যা করে কেন শিম্পাঞ্জিরা আমাদের এত নিকটাত্মীয়, আর ইদুর অপেক্ষা কৃত দূরের। শিম্পাঞ্জিরা হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়, আমাদের কাজিন, আর ইদুররা আরো কিছুটা দূরের। দূরের আত্মীয় মানে আমাদের দুটি প্রজাতির সবচেয়ে সাম্প্রতিক সাধারণ পূর্বসূরি বহুদিন আগে বেঁচে ছিল। বানররা ইদুরদের চেয়ে আমাদের বেশী নিকটবর্তী, কিন্তু শিম্পাঞ্জিদের চেয়ে, আমাদের চেয়ে দূরের আত্মীয়। বেবুন আর রিসাস ম্যাকাক উভয়ই বানর, পরস্পরের নিকটাত্মীয়, প্রায় হুবুহু তাদের FoxP2 জিনটি। তারা শিম্পাঞ্জি থেকে যতটা দূরের ঠিক ততটাই আমাদের দূরের আত্মীয়। FoxP2 জিনে ডিএনএ অক্ষরগুলোর মোট ভিন্নতা যা শিম্পাঞ্জি আর বেবুনের মধ্যে পার্থক্য করে তা প্রায় হুবুহু একই রকম (২৪) আমাদের সাথে যে সংখ্যক ডিএনএ বর্ণ বেবুনদের সাথে আমাদের বিভেদ করে এই জিনটিতে (২৩)। খুব সহজেই সব কিছু সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে যখন আমরা ডিএনএ তে উত্তর খুঁজি।

 

আর এই ভাবনাটা শেষ করার আগে আরো একটি বিষয়, ব্যাঙরা সব স্তন্যপায়ীদের চেয়ে অনেক দূরবর্তী জিনগতভাবে। প্রত্যেক স্তন্যপায়ীদের এই জিনটি ব্যঙ থেকে একই সংখ্যক ডিএনএ অক্ষরে ভিন্ন ( প্রায় ১৪০), এবং খুব সরল কারণে তারা সবাই ঠিক সমপরিমান দূরের আত্মীয়। সব স্তন্যপায়ীরা ব্যঙের সাথে যে সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছিল (৩৪০ মিলিয়ন) তার চেয়ে পরস্পরের সাথে অপেক্ষাকৃত কম সাম্প্রতিকতম সময়ে এক সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছিল (প্রায় ১৮০ মিলিয়ন বছর আগে)। কিন্তু অবশ্যই সব মানুষই অন্য সব মানুষদের মত একই না, এবং সব বেবুনও অন্য সব বেবুনদের মত একই না, সব ইদুররাই অন্য সব ইদুরের মত না। আমরা আমার জিনের সাথে আপনার জিনের তুলনা করে দেখতে পারি, প্রতিটি অক্ষরের সাথে প্রতিটি অক্ষরের। এবং ফলাফল? আমাদের দুজনের আরো বেশী অক্ষর একই হবে, যদি শিম্পাঞ্জির সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু তারপরও আমাদের দুজনের মধ্যে অক্ষরের কিছু ভিন্নতা আমরা পাবো। খুব বেশী না।

FoxP2 জিনটাকে আলোচনার জন্য আলাদা করে বেছে নেবার পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু যদি আপনি যদি আমাদের সব জিনে সব ডিএনএ অক্ষরগুলোকে গণনা করেন, আমাদের যে কেউই শিম্পাঞ্জিদের সাথে যতটা অক্ষর ভাগ করি, তার চেয়ে বেশী হবে। এবং আপনি আমার সাথে যতটা অক্ষর ভাগাভাগি করেন তার চেয়ে বেশী অক্ষর আপনার কাজিনের সাথে ভাগাভাগি করেন। আপনি এমনকি আরো বেশী অক্ষর ভাগ করে নেন আপনার মা ও আপনার বাবার সাথে এবং ভাই ও বোনদের সাথে ( যদি আপনার তা থাকে)। বাস্তবিকভাবে, আপনি সমাধান করতে পারবেন যে কোনো দুটি মানুষ কতটা নিকট আত্মীয় পরস্পরের তারা যতটা সংখ্যক ডিএনএ অক্ষর ভাগাভাগি করে তা গণনা করার মাধ্যমে। বিষয়টি খুব কৌতুহলোদ্দীপক এবং ভবিষ্যতে আমরা এই বিষয়ে সম্ভবত আরো অনেক বেশী কিছু শুনবো। যেমন, পুলিশ হয়তো কাউকে খুজে বের করতে পারবে যদি তাদের কাছে তার ভাইয়ের ডিএনএ ফিংগারপ্রিন্ট থাকে।

সব স্তন্যপায়ীদের মধ্যে কিছু জিন আছে তারা শনাক্তযোগ্যভাবেই একই ( খুব সামান্য কিছু পার্থক্য ছাড়া)। এই সব জিনে কতটা অক্ষর ভিন্ন সেটি গণনা করা বেশ উপযোগী একটি উপায় বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রজাতিরা কতটা নিকটাত্মীয় সেটি নির্ণয় করা। অন্য জিনগুলো বেশ উপযোগী দূরবর্তী সম্পর্কগুলো নিরুপনে, যেমন মেরুদণ্ডী ও কেঁচোদের মধ্যে। অন্য জিনগুলো আবার দেখার উপযোগী একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক নিরুপনে, যেমন ধরুন আপনি আমার কতটা নিকটাত্মীয় সেটি নির্ণয়ে। যদি আপনি আগ্রহী হন, এবং যদি আপনি ইংল্যাণ্ডের হন, আমাদের সবচেয়ে নিকটতম সাধারণ পূর্বসূরি সম্ভবত বেঁচে ছিল মাত্র কয়েক শতাব্দী আগেই। যদি আপনি তাসমানিয়ার স্থানীয় হন, অথবা আমেরিকার আদিবাসী হন, তাহলে আমাদের কয়েক লক্ষ বছর আগে যেতে হবে কোনো সাধারণ পূর্বসূরি খুঁজে বের করার জন্য। যদি আপনি কালাহারি মরুভূমির !কুঙ সান হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের আরো অতীতে যেতে হবে।

13592768_308509486203945_928565933605550032_n

সব সন্দেহের উর্ধে বাস্তব সত্যটি হচ্ছে, এই গ্রহে প্রতিটি প্রাণি ও উদ্ভিদ প্রজাতির সাথে আমরা একটি সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছি। এর কারণ কিছু জিন শনাক্তযোগ্যভাবে একই সব জীবে, প্রাণি, উদ্ভিদ আর ব্যাকটেরিয়ায়। আর সর্বোপরি, জেনেটিক কোডটি – যে অভিধান ব্যবহার করে সব জিন অনূদিত হয় – সমস্ত জীবে, এ যাবত যে কয়টি জীবে দেখা হয়েছে, প্রতিটি জীবেই এটি একই ভাবে কাজ করে। প্রতিটি জীবই, আমরা সবাই পরস্পরের আত্মীয়। আপনার পারিবারিক বৃক্ষ সুস্পষ্ট নিকটাত্মীয় যেমন শিম্পাঞ্জি বা বানরই থাকবে, সেখানে থাকবে ইদুররা, বাফালো, ইগুয়ানা, ওয়ালবি, শামুক, ড্যা-েলিয়ন, সোনালী ঈগল, ছত্রাক, তিমি, ওমব্যাট ও ব্যাকটেরিয়ারাও। প্রত্যেকেই আমাদের আত্মীয়, যে কোনো প্রজাতির তা হোক না কেন। যে কোনো পূরাণ বা কিংবদন্তীর চেয়ে এটি কি আরো বিস্ময়কর একটি ভাবনা নয়? আর সবচেয়ে চমৎকার বিষয়টি হচ্ছে আমরা নিশ্চিৎভাবে জানি যে এটি আক্ষরিকভাবেই সত্য।

Advertisements
বাস্তবতার জাদু : দ্বিতীয় অধ্যায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s