বাস্তবতার জাদু : প্রথম অধ্যায়

13220876_266553483732879_5795876853880578261_n

[ ভূমিকা : ২০১১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রিচার্ড ডকিন্স, শিল্পী ডেভ ম্যাককিনের অলঙ্করণসহ প্রকাশ করেছিলেন The Magic of Reality: How We Know What’s Really True; বইটি মূলত কিশোর আর অল্প বয়সী তরুণদের জন্য লেখা। বইটির হৃদয়স্পর্শী একটি অংশ হলো বইটি তিনি তার প্রিয় বাবা Clinton John Dawkins কে উৎসর্গ করেছিলেন। কৃষিবিজ্ঞানী বাবাই তার মনে প্রকৃতি আর বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার বীজটি বপন করেছিলেন পূর্ব আফ্রিকায় কাটানো তার শৈশবে। প্রাচীন মিসরীয়রা ভাবতো দেবী নুট (বা নিউথ) রোজ রাতে যখন সূর্যকে গিলে ফেলে তখন রাত হয়। ভাইকিংরা রঙধনুকে মনে করতো দেবতাদের বানানো সেতু যা দিয়ে তারা পৃথিবীতে নেমে আসে। এইসব কিছুতেই জাদুময়তা আছে, অপার্থিব বিস্ময়কর সব কাহিনী। কিন্তু আরো এক ধরনের জাদু আছে, আর সেই জাদুটি থাকে এই সব প্রশ্নগুলোর সত্যিকারের উত্তর আবিষ্কার করার আনন্দের মধ্যে। আর এটাই হচ্ছে বাস্তবতার জাদু – বিজ্ঞান। – কাজী মাহবুব হাসান ( পোষ্টে ব্যবহৃত অলঙ্করণগুলো মূল বই থেকে সংগ্রহ করা, যার শিল্পী ডেভ ম্যাককিন)]

রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় 

বাস্তবতা কি ? জাদু কি ?

বাস্তবতা হচ্ছে সেই সবকিছু যার অস্তিত্ব আছে। বেশ সহজবোধ্য মনে হয় কথাটি, তাই না? আসলে বিষয়টি এত সহজবোধ্য নয়। বেশ কিছু সমস্যা আছে। ডায়নোসরদের ব্যাপারটি তাহলে কি, তাদের একসময় অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর তো তাদের অস্তিত্ব নেই? আর নক্ষত্রগুলো, এত দূরে যাদের অবস্থান যে, যখন তাদের আলো আমাদের কাছে এসে পৌছায়, আর আমরা তাদের দেখতে পারি, তখন তাদের হয়তো আর কোনো অস্তিত্বই নেই ?

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ডায়নোসর আর নক্ষত্রদের নিয়ে আলোচনা করবো। কিন্তু যাই হোক না কেন, কিভাবে আমরা জানি যে, কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে, এমনকি বর্তমানেও? বেশ, আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় – দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্পর্শ, শ্রবণ আর স্বাদ – তারা বেশ ভালোই দ্বায়িত্ব পালন করে বহু জিনিসের বাস্তব অস্তিত্ব আমাদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে: যেমন, কোনো পাথরের টুকরো কিংবা উট, নতুন কাটা ঘাস আর কেবলমাত্র বানানো কফি, শিরিস কাগজ আর মখমল, জলপ্রপাত এবং দরজার ঘন্টি, চিনি এবং লবন। কিন্তু আমরা কি শুধুমাত্র এমন কিছুকেই ‘বাস্তব’ বলবো, যদি সেগুলোকে আমরা আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের যে কোনো একটি দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে শনাক্ত করতে পারি?

তাহলে দূরের ছায়াপথগুলোর ক্ষেত্রে কি হবে, খালি চোখে দেখার মত দূরত্বে যারা অবস্থান করে না? একটি ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেই বা কি হবে, যা এতই ক্ষুদ্র যে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া যাদের দেখাই সম্ভব নয়? তাহলে আমাদের কি অবশ্যই বলতে হবে যে, তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই কারণ আমরা তাদের দেখতে পাইনা? না, অবশ্যই আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে শক্তিশালী করতে পারি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে: ছায়াপথ দেখার জন্য দূরবীক্ষণ যন্ত্র আর ব্যাকটেরিয়া দেখার অণুবীক্ষণ যন্ত্র। যেহেতু আমরা জানি ও বুঝি দূরবীক্ষণ যন্ত্র আর অণুবীক্ষণ যন্ত্র কিভাবে কাজ করে, আমরা তাদের ব্যবহার করতে পারি আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সীমানা বৃদ্ধি করতে – এই ক্ষেত্রে – আমাদের দৃষ্টিশক্তি – এবং সেগুলো যা দেখতে আমাদের সক্ষম করে তোলে, তা ছায়াপথ আর ব্যকটেরিয়ার অস্তিত্ব আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

তাহলে বেতার তরঙ্গ? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? আমাদের চোখতো তাদের শনাক্ত করতে পারেনা, আমাদের কানও সেটি করতে পারেনা. কিন্তু আবারো বিশেষ কিছু যন্ত্র – যেমন, টেলিভিশন সেট – তাদের এমন একটি সংকেতে রুপান্তর করে, যা আমরা দেখতে আর শুনতে পারি। সুতরাং যদিও আমরা বেতার তরঙ্গ দেখতে ও শুনতে পাইনা, আমরা জানি যে, তারা বাস্তবতারেই একটি অংশ। দূরবীক্ষণ এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মতই, আমরা জানি কিভাবে রেডিও আর টেলিভিশন কাজ করে। সুতরাং তারা আমাদের ইন্দ্রিয়কে সাহায্য করে যার অস্তিত্ব আছে তার একটি চিত্র নির্মাণ করার জন্য: বাস্তব পৃথিবী – বাস্তবতা। রেডিও দূরবীক্ষণ যন্ত্র ( এবং এক্স রে দূরবীক্ষণ যন্ত্র) আমাদের নক্ষত্র আর ছায়াপথদের দেখার সুযোগ করে দেয় আরো ভিন্ন চোখ দিয়ে দেখার মাধ্যমে: বাস্তবতা সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করার অন্য আরেকটি উপায় হচ্ছে সেগুলো।

ডায়নোসরদের কথায় ফিরে আসি। আমরা কিভাবে জানি যে তারা একসময় এই পৃথিবীতে বাস করতো? আমরা তাদের কখনো দেখিনি অথবা শুনিনি বা তাদের আক্রমন থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করিনি। দূর্ভাগ্য, যে আমাদের কোনো টাইম মেশিন নেই যা কিনা আমাদের ডায়নোসরদের সরাসরি দেখাতে পারতো। এখানে আমাদের ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করার জন্য আছে ভিন্ন ধরনের একটি সহায়ক: আমাদের কাছে আছে জীবাশ্ম, এবং তাদের আমরা খালি চোখেই দেখতে পারি। জীবাশ্মরা দৌড়ায় না বা লাফিয়ে বেড়ায়না ঠিকই, কিন্তু, যেহেতু আমরা জানি কিভাবে জীবাশ্ম তৈরী হয়,তারা আমাদের কিছু বলতে পারে বহু মিলিয়ন বছর আগে কি ঘটেছিল।

আমরা এখন বুঝি কিভাবে পানি, এর মধ্যে দ্রবীভূত খনিজসহ কাদা ও শিলার স্তরের নিচে সমাহিত মৃতদেহর মধ্যে চুইয়ে চুইয়ে প্রবেশ করে। আমরা জানি কিভাবে খনিজ পদার্থগুলো স্ফটিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পানি থেকে স্ফটিক হিসাবে বের হয়ে আসে এবং মৃতদেহের খনিজ পদার্থগুলোর একের পর এক প্রতিটি অণুকে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত করে, পাথরে উপর ছাপের মত শুধুমাত্র মূল জীবের আকৃতি আর কাঠামোর প্রামাণিক সাক্ষ্য রেখে যায়। সুতরাং, ইন্দ্রিয় দিয়ে সরাসরি ডায়নোসরদের আমরা দেখতে না পারলেও, অবশেষে আমাদের সেই ইন্দ্রিয়গুলোর (আমরা সেই প্রাচীন জীবনের চিহ্ন দেখতে ও স্পর্শ করে দেখি) কাছে পৌছানো এইসব পরোক্ষ প্রমাণগুলো ব্যবহার করে আমরা ঠিকই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, তাদের অবশ্যই অস্তিত্ব ছিল।

একটি ভিন্ন অর্থে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র এক ধরনের টাইম মেশিন হিসাবে কাজ করতে পারে। আমরা যখন কোনো কিছুর দিকে তাকাই আমরা আসলে যা দেখি সেটি হচ্ছে আলো, আর আলোর সময় লাগে কোনো দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য। এমনকি যখন আপনি আপনার বন্ধুর মুখের দিকে তাকান, আপনি সেই মুখটি অতীতের কোনো একটি সময়ে দেখছেন, কারণ তাদের মুখ থেকে ফিরে আসা আলো আপনার চোখে এসে পৌছাতে এক সেকেণ্ডের খুব ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ পরিমান সময় নেয়। শব্দ দূরত্ব অতিক্রম করে আরো অনেক ধীরে, সে কারণে আপনি লক্ষ্য করার মত আগেই আকাশে আতশ বাজির বিস্ফোরণ দেখতে পান, এর শব্দ শোনার আগে। যখন দূর থেকে কাউকে গাছ কাটতে দেখেন, গাছের উপরে কুঠারের আঘাত এবং তার কারণে সৃষ্ট শব্দের মধ্যে বেমানান একটি বিলম্ব থাকে।

আলো এত দ্রুত দূরত্ব অতিক্রম করে যে আমরা সাধারণত মনে করি আমরা যা কিছু দেখি সেটি ঘটছে ঠিক যে মুহূর্তে আমরা তা দেখছি। কিন্তু নক্ষত্রদের ব্যপার আলাদা। এমনকি সূর্যও আট লাইট-মিনিট দূরে। যদি সূর্য কখনো বিস্ফোরিত হয়, সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি আমাদের বাস্তবতার অংশ হবে না, আট মিনিট অতিক্রান্ত হবার আগে। এবং সেটি আমাদের জন্যও চুড়ান্ত সময়! আর যদি সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটির কথা ভাবি, প্রক্সিমা সেন্টরি, আপনি যদি এটির দিকে ২০১২ সালের কোনো সময় তাকান, আপনি যা দেখবেন সেটি ঘটেছিল ২০০৮ এ। ছায়াপথগুলো হচ্ছে অসংখ্য নক্ষত্রের সম্ভার। মিল্কি ওয়ে নামের একটি ছায়াপথে আমাদের অবস্থান। যখন আপনি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের নিকট প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের দিকে তাকাবেন, আপনার দূরবীক্ষণ যন্ত্র তখন টাইম মেশিন যা আপনাকে আড়াই মিলিয়ন বছর আগে নিয়ে যাবে। পাঁচটি ছায়াপথের একটি গুচ্ছ আছে, যার নাম স্টেফানস কুইন্টেট, যাদের আমরা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে পারি, বিস্ময়করভাবে তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। কিন্তু আমরা তাদের পরস্পরের সাথে ধাক্কা খেতে দেখছি ২৮০ মিলিয়ন বছর আগের কোনো একটি সময়ে। পরস্পরের সাথে ধাক্কা খাওয়া ছায়াপথে বাস করা যদি কোনো ভীনগ্রহী আমাদেরকে দেখার মত শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতো, পৃথিবীতে তারা কি দেখতো ঠিক এই মুহূর্তে, এখানে এবং এখন, ডায়নোসরদেরও আদি পূর্বসূরিদের।

আসলেই কি মহাশূন্যে ভীনগ্রহীরা বাস করে? আমরা তাদের দেখিনি এবং তাদের কোনো কিছু শুনিনি। তারা কি বাস্তবতার অংশ? কেউ জানেনা, কিন্তু আমরা জানি কোন জিনিসগুলো আমাদের তা বলতে পারবে, যদি তাদের অস্তিত্ব থাকে। যদি আমরা কোনো অ্যালিয়েনের কাছে যাই, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো সেটি সম্বন্ধে আমাদের বলতে পারবে। হয়তো কেউ একদিন এমন একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করবে যা যথেষ্ট শক্তিশালী হবে এখান থেকেই অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব শনাক্ত করার জন্য। অথবা হয়তো আমাদের রেডিও টেলিস্কোপ সেই বার্তা পাবে, যা কেবলমাত্র ভীনগ্রহী কোনো বুদ্ধিমান সত্তারই হতে পারে। কারণ বাস্তবতা শুধুমাত্র আমরা ইতিমধ্যে যা কিছু জানি সেই সবকিছুই দিয়ে তৈরী নয়, এখানে সেই সব কিছুই আছে যাদের সম্বন্ধে আমরা এখনও কিছু জানি না বা ভবিষ্যতে কোনো সময় ছাড়া তাদের আমরা জানতেও পারবোনা, হয়তো যখন আমরা আরো বেশী শক্তিশালী যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারবো যা আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করবে।

পরমাণুদের অস্তিত্ব ছিল সবসময়ই, কিন্তু আমরা বরং খুব সাম্প্রতিক সময়ে নিশ্চিৎ হয়েছি তাদের অস্তিত্বের ব্যপারে। এবং সম্ভাবনা বেশী যে আমাদের উত্তরসূরীরা আমাদের চেয়ে আরো অনেক কিছু সম্বন্ধে জানবে, বর্তমানে যা আমাদের জানা নেই। আর এটাই বিজ্ঞানের বিস্ময় আর আনন্দ: এটি চলমান একটি পক্রিয়া যা একে পর এক নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলে। এর মানে এই না যে, আমাদের যে কোনো কিছুই বিশ্বাস করা উচিৎ যা হয়তো কেউই কল্পনা করতে পারেন। বহু মিলিয়ন জিনিস আছে যা আমরা কল্পনা করতে পারি, কিন্তু যাদের বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম – যেমন পরী বা হবগবলিন, লেপরেকন আর হিপপোগ্রিফ। আমাদের সবসময়ই খোলা মনের হওয়া উচিৎ, কিন্তু কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে এমন কিছু বিশ্বাস করার একমাত্র ভালো কারণ হচ্ছে, যদি সত্যিকারের প্রমাণ থাকে যে, এর আসলেই অস্তিত্ব আছে।

মডেলস: আমাদের কল্পনাগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা

একটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত উপায় আছে যা সাধারণত বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন কোনটি সত্য সেটি নির্ধারণে, যখন আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় সেটি সরাসরি শনাক্ত করতে পারেনা। এটি হচ্ছে যা ঘটছে বা ঘটতে পারে, তার একটি মডেল ব্যবহার করে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। এরপর আমরা খুঁজে বের করি ( প্রায়শই গানিতিক হিসাব নিকাশ করে) সত্যিকারভাবে কোনটি আমাদের দেখা অথবা শোনা উচিৎ ইত্যাদি (প্রায়শই কোনো পরিমাপক ব্যবহার করে) ও আমাদের প্রস্তাবিত মডেলটি সত্য কিনা। এরপর আমরা পরীক্ষা করে দেখি, এটাই কি আমরা আসলে দেখছি কিনা বাস্তবে। আক্ষরিকভাবে কোনো মডেল হতে পারে কোনো রেপ্লিকা বা অনুলিপি, যা বানানো হয়েছে কাঠ কিংবা প্লাস্টিক দিয়ে। অথবা এটি হতে পারে কাগজের উপর কিছু গণিত অথবা কোনো কম্পিউটারে একটি সিমুলেশন বা কাল্পনিক সেই একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আমরা খুব সতর্কতার সাথে মডেলটি লক্ষ্য করি এবং ভবিষ্যদ্বাণী করি আমাদের কি দেখা বা শোনা উচিৎ ইত্যাদি, যদি মডেলটি সঠিক হয়। এরপর আমরা দেখবো আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক নাকি মিথ্যা। যদি সেগুলো সঠিক হয়, এটি আমাদের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দেবে যে মডেলটি আসলেই বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করছে। এরপর আমরা আরো কিছু বাড়তি পরীক্ষা পরিকল্পনা করি, হয়তো মডেলটিকে আরো সূক্ষ্মতর করে তুলি, আমাদের ফলাফলগুলোকে আবারো পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিৎ করার জন্য। যদি আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল হয়, আমরা মডেলটি প্রত্যাখান করি অথবা পরিবর্তন করি এবং তারপর আবার চেষ্টা করি।

একটি উদাহরণ আলোচনা করা যাক, এখন যেমন আমরা জানি যে, জিন – বংশগতির একক – ডিএনএ নামক একটি জিনিস দিয়ে যারা তৈরী। আমরা ডিএনএ সম্বন্ধে এখন অনেক কিছু জানি, যেমন কিভাবে এটি কাজ করে। কিন্তু আপনি বিস্তারিতভাবে দেখতে পারবেনা ডিএনএ আসলে কেমন দেখতে, এমনকি শক্তিশালী কোনো অণুবীক্ষন যন্ত্র দিয়েও। ডিএনএ সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি তা সব এসেছে পরোক্ষভাবে মডেল তৈরী ও পরে সেটি পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে।

13241229_273754683012759_8025642027048250097_n

আসলেই, ডিএনএ সম্বন্ধে কেউ কিছু জানার বহুদিন আগেই, বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই জিন সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতেন শুধুমাত্র মডেলে তাদের ভবিষ্যদ্বাণীকে পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে। উনবিংশ শতাব্দীর সেই সময়ে, একজন অস্ট্রীয় যাজক, যার নাম গ্রেগর মেণ্ডেল তার সন্ন্যাসশ্রমের বাগানে কিছু পরীক্ষা করেছিলেন, তিনি প্রচুর পরিমানে মটরশুটি আর ফুলের চাষ করেছিলেন। তিনি একের পর এক প্রজন্মের গাছদের সংখ্যা গণনা করেন যাদের ফুলের রঙগুলো ভিন্ন অথবা যাদের মটরশুটি বীজর চামড়া মসৃন অথবা কুচকানো। মেণ্ডেল কখনোই কোনো জিন স্পর্শ করেননি, তিনি শুধু মটরশুটি আর ফুলদের দেখেছেন, এবং তিনি তার চোখ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন ভিন্ন এই প্রকারগুলো গণনা করার জন্য। তিনি একটি মডেল আবিষ্কার করেছিলেন। যার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ছিল সেটি, যাকে আমরা এখন জিন বলছি (যদিও মেণ্ডেল তাদের সে নামে ডাকেননি কখনো) এবং তিনি হিসাব করেছিলেন যে, যদি তার মডেল সঠিক থাকে, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজনন পরীক্ষায়, সেখানে কুচকানো মটরশুটি বীজের চেয়ে তিনগুণ বেশী মসৃণ মটরশুটি বীজ পাওয়া যাবে। এবং সেটাই তিনি পেয়েছিলেন গণনা করার পর।

বিস্তারিত বিষয়গুলো উহ্য রেখে, এখানে মূল বক্তব্যটি হচ্ছে মেণ্ডেলের জিন তার কল্পনার একটি সৃষ্টি: তিনি তার নিজের চোখে সেটি দেখেননি, এমনকি অনুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেও না। কিন্তু তিনি মসৃণ আর কুচকানো মটরশুটি দেখেছিলেন এবং সেগুলো গণনা করার মাধ্যমে তিনি পরোক্ষ প্রমাণ পেয়েছিলেন তার বংশগতির মডেল বাস্তব পৃথিবীর কোনো কিছুর বেশ ভালোই প্রতিনিধিত্ব করছে। পরে বিজ্ঞানীরা মেণ্ডেলের পদ্ধতির সামান্য কিছু পরিবর্তন করে, এবং অন্যান্য প্রাণীদের উপর গবেষণা করেন, যেমন মটরশুটির বদলে ফ্রুট ফ্লাই, দেখাতে যে জিনরা একটি নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত থাকে ক্রোমোজোমের সুতায় (আমরা মানুষদের ৪৬ টি ক্রোমোজোনম আছে, ফ্রুট ফ্লাইয়ের যেমন আছে আটটি)। এমনকি এই মডেলটি পরীক্ষা করে বলা সম্ভব, কোন সজ্জায় জিনগুলো ক্রোমোজোমে সজ্জিত থাকে। এই সবই সম্ভব হয়েছিল জিনরা যে ডিএনএ দিয়ে তৈরী সেটা জানার বহু আগেই।

এখন আমরা সেটি জানি এবং আমরা সঠিকভাবেই জানি কিভাবে ডিএনএ কাজ করে, জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক এবং আরো বহু বিজ্ঞানীদের কল্যাণে যারা তাদের পরে এসেছেন। ওয়াটসন আর ক্রিক তাদের নিজেদের চোখে ডিএনএ কে দেখেননি, আবারো তারা তাদের আবিষ্কার করেছেন একটি মডেল কল্পনা করে এবং সেগুলো পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে। তাদের ক্ষেত্রে তারা আক্ষরিকার্থে লোহা আর কার্ডবোর্ডের মডেল তৈরী করেছিলেন ডিএনএ কেমন দেখতে হতে পারে তা ধারণা করে, এবং তারা কিছু সুনির্দিষ্ট পরিমাপ হিসাব করেছিলেন, যদি সেই মডেলটি সঠিক হয়ে থাকে। একটি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী, ডাবল হেলিক্স মডেল সঠিকভাবে মিলে গিয়েছিল রোজালিণ্ড ফ্র্যাঙ্কলিন আর মরিস উইলকিন্স এর পরিমাপ করা মডেলে, যারা বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন বিশুদ্ধ ডিএনএ স্ফটিকের উপর এক্সরে রশ্মি ফেলে ছবি তোলার জন্য। ওয়াটসন এবং ক্রিক সাথে সাথেই বুঝতে পেরেছিলেন তাদের ডিএনএ মডেল ঠিক সেই একই ধরণের ফলাফল দেবে, তার সন্ন্যাসশ্রমের বাগানে গ্রেগর মেণ্ডেল যা দেখেছিলেন।

কোনটি বাস্তব সত্য, আমরা এখন জেনেছি যে সেটি, মোট তিনটি উপায়ের যে কোনো একটি ব্যবহার করে আমরা জানতে পারি। আমরা এটি শনাক্ত করতে পারি, সরাসরি আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে, অথবা পরোক্ষভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়দের বিশেষ যন্ত্র যেমন দূরবীক্ষণ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র, দ্বারা সহায়তা করে। অথবা এমনকি আরো পরোক্ষভাবে, মডেল তৈরী করে যা বাস্তব সত্য হতে পারে এবং তারপর সেই মডেলগুলো পরীক্ষা করে দেখে যে, তারা কি সফলভাবে কোনো কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে কিনা সেই জিনিসগুলো যা আমরা দেখতে ( অথবা শুনতে ইত্যাদি) পাই কেনো যন্ত্র ব্যবহার করে অথবা না করে। পরিশেষে এটি সবসময় আমাদের ইন্দ্রিয়েই ফিরে আসে, কোনো না কোনো উপায়ে।

এর মানে কি তাহলে বাস্তবতা শুধুমাত্র সেই সব জিনিসগুলো ধারণ করে যা শনাক্ত করা যেতে পারে, সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে, আমাদের ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অথবা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে? কিন্তু ঈর্ষা বা আনন্দ, সুখ বা ভালোবাসা, এগুলো তাহলে কি? এরা কি বাস্তব নয়?

হ্যা, এরাও বাস্তব সত্য, কিন্তু এদের অস্তিত্বের জন্য এরা নির্ভরশীল মস্তিষ্কের উপর: মানব মস্তিষ্ক, অবশ্যই এবং সম্ভবত অন্যান্য অগ্রসর প্রাণী প্রজাতিরও মস্তিষ্ক, যেমন শিম্পাঞ্জি, কুকুর এবং তিমি। পাথররা কোনো আনন্দ অনুভব করেনা এবং পর্বতমালা কাউকে ভালোবাসে না। এই আবেগগুলো তীব্রভাবে বাস্তব যারা তা অনুভব করেন, এর অভিজ্ঞতা অনুভব করেন, কিন্তু মস্তিষ্কের অস্তিত্বের আগে তাদের অস্তিত্ব ছিল না। এটা সম্ভব যে এই ধরনের আবেগগুলো – এবং হয়তো অন্য আবেগগুলো যা আমরা এমনকি কল্পনা করতেও শুরু করিনি- তাদের অস্তিত্ব হয়তো থাকতে পারে অন্য কোনো গ্রহে, কিন্তু শুধুমাত্র যদি সেই সব গ্রহে মস্তিষ্কও থাকে- অথবা মস্তিষ্কের সমতুল্য কোনো কিছু : কারণ কে জানে কি অদ্ভুত চিন্তা করা অঙ্গ অথবা অনুভব করা যন্ত্র হয়তো লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের অন্য কোথাও?

বিজ্ঞান এবং অতিপ্রাকৃত: ব্যাখ্যা এবং তার শত্রু 

সুতরাং এটাই হচ্ছে বাস্তবতা, আর এভাবেই আমরা জানতে পারি কোনো কিছু বাস্তব কিনা। এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় হবে বাস্তবতার কোনো একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় – যেমন সূর্য, অথবা ভূমিকম্প অথবা রঙধণু অথবা বিভিন্ন ধরনের প্রাণী। এবার শিরোনামে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অন্য শব্দটি নিয়ে আলোচনা করবো আমি, শব্দটি হচ্ছে: ম্যাজিক বা জাদু। জাদু খুব পিচ্ছিল শব্দ: এটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় তিনটি ভিন্ন উপায়ে, এবং প্রথমে আমি অবশ্যই যা করবো তাহচ্ছে এগুলোর মধ্যকার পার্থক্যগুলোকে ব্যাখ্যা করবো। আমি প্রথমটিকে ডাকবো, ‘অতিপ্রাকৃত জাদু’, দ্বিতীয়টি ‘মঞ্চের জাদু’ এবং তৃতীয়টি ( যেটার অর্থ আমার সবচেয়ে প্রিয়, আমার শিরোনামে ব্যবহৃত জাদু শব্দটি যে উদ্দেশ্যে আমি ব্যবহার করেছি), ‘কাব্যিক জাদু’।

‘অতিপ্রাকৃত জাদু’ হচ্ছে এক ধরনের জাদু যা আমরা খুঁজে পাই পুরাণ কাহিনী ও রুপকথায়। ( মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা, যদিও আমি সেই জাদুগুলোর কথা আপাতত আলোচনা করবো না, এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে সেই বিষয়গুলো আবার আলোচনায় ফিরে আসবে); এটি আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগের জাদু, জাদুকরদের জাদু, গ্রিম ভাতৃদ্বয়, হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাাণ্ডারসন, জে. কে. রলিঙস এর জাদু। এটি কাল্পনিক গল্পের সেই ডাইনীর জাদু, যারা মন্ত্র পড়ে কোনো রাজকুমারকে ব্যাঙে রুপান্তরিত করতে পারে, অথবা সেই পরী গড মাদার যে কুমড়োকে রুপান্তরিত করে ঝকমকে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে। আমাদের শৈশবের এইসব গল্পগুলো হচ্ছে সেইসব কাহিনী, যাদের আমরা এখনও ভালোবাসার সাথে সবাই মনে করতে পারি, এখনও অনেকেই তা উপভোগ করেন যখন ঐতিহ্যবাহী ক্রিসমাসের অনুষ্ঠানে কাহিনী হিসাবে তারা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমরা সবাই জানি এই ধরনের জাদু হচ্ছে শুধুমাত্র কাহিনী, বাস্তবে যা ঘটে না।

মঞ্চের জাদু, এর ব্যতিক্রম, আসলেই বাস্তবে ঘটে এবং এটি দারুণ উপভোগ্যও হতে পারে। অথবা অন্ততপক্ষে, কোনোকিছু সেখানে আসলেই ঘটে, যদিও দর্শকরা যা মনে করেন সেটি তা নয়। মঞ্চে কোনো মানুষ (সাধারণত একজন পুরুষ, কোনো না কোনো কারণে) আমাদের ছলনা করে বিশ্বাস করাতে, আসলে আমরা যা দেখছি তা ঘটছে সেখানে – বিস্ময়কর কোনো কিছু ( ‘মনে’ হতে পারে এমনকি অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটছে), যখন সেখানে আসলেই যা ঘটে সেটি খুবই ভিন্ন। রেশমী রুমাল কিন্তু কখনো খরগোশে রুপান্তরিত হতে পারেনা, যেমন ব্যঙ রুপান্তরিত হতে পারেনা রাজপুত্রে। আমরা মঞ্চে যা দেখি সেটি শুধুমাত্র একটি কৌশল। আমাদের চোখ আমাদের সাথে ছলনা করে – অথবা, বরং জাদুকর অত্যন্ত পরিশ্রম করেন আমাদের চোখকে ফাকি দিতে, হয়তো বুদ্ধিমত্ত্বাপূর্ণ কোনো শব্দ ব্যবহার করে, যা আমাদের অন্যমনস্ক করে, আর আমরাও ঠিক মত খেয়াল করতে পারি না তার হাত দিয়ে সে আসলেই কি করছে।

কিছু জাদুকর খুবই সৎ এবং তারা আসলেই আপ্রাণ চেষ্টা করেন নিশ্চিৎ করতে যে, তাদের দর্শকরা যেন আগে থেকেই জানেন, তারা শুধুমাত্র একটি হাতসাফাই বা কৌশল দেখাচ্ছেন। আমি সেই সব জাদুকরদেও কথা ভাবছি, যেমন জেমস ‘অ্যামেজিং’ র‌্যাণ্ডি অথবা পেন অ্যাণ্ড টেলার অথবা ড্যারেন ব্রাউন। এমনকি যদি এইসব অসাধারণ জাদুকররা সাধারণত দর্শকদের বলেন না যে ঠিক কিভাবে তারা তাদের কৌশলটি দেখাচ্ছেন – কারণ সেটি করলে তাদেরকে ম্যাজিক সার্কেল ( জাদুকরদের ক্লাব) থেকে বের করে দেয়া হবে, কিন্তু তারা তাদের দর্শকদের নিশ্চিৎ করেন, সেখানে অতিপ্রাকৃত জাদুর কোনো উপস্থিতি নেই। অন্যরাও সক্রিয়ভাবে যদিও বলেন না, তারা যা করছেন তা একধরনের কৌশল মাত্র, কিন্তু তারা এমন কিছু বাড়তি দাবীও করেন না, তারা কি করেছেন সেই বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কোনো মিথ্যা কথা বলে, তারা শুধুমাত্র দর্শকদের মনে একটি আনন্দময় অনুভূতি রেখে যান, এইমাত্র তারা খুব রহস্যময় কিছু একটা দেখলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে বেশ কিছু জাদুকর আছেন তারা খুব পরিকল্পিতভাবেই অসৎ এবং তারা ভান করেন তাদের সত্যিকারভাবে ‘অতিপ্রাকৃতিক অথবা অস্বাভাবিক কোনো ক্ষমতা আছে: হয়তো তারা দাবী করেন তারা আসলেই লোহা বাঁকাতে পারেন বা ঘড়ি বন্ধ করে দিতে পারেন শুধুমাত্র তাদের চিন্তার শক্তি ব্যবহার করে। এদের মধ্যে কিছু অসৎ ভানকারী ( প্রতারক, একটা উপযুক্ত শব্দ তাদের বর্ণনা করার জন্য) প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারেন খনি বা তেল কোম্পানীর কাছ থেকে দাবী করে যে তারা তাদের ‘সাইকিক শক্তি’ ব্যবহার করে বলতে পারবেন কোথায় খনন বা ড্রিল করা সবচেয়ে ভালো হবে। অন্য প্রতারকরা সেই সব মানুষদের ব্যবহার করে যারা শোকাহত, দাবী করে যে তারা মৃতদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। যখন এটি ঘটে, এটি আর শুধুমাত্র কৌতুক বা আমোদপ্রমোদময় অনুষ্ঠান থাকেনা, বরং মানুষের বিশ্বাসপ্রবণতা আর হতাশার সুযোগ নেয়া হয় স্বার্থপর উদ্দেশ্যে। নিরপেক্ষভাবে বললে, হতে পারে যে এই সব মানুষগুলো সবাই অসৎ প্রতারক নয়, তাদের কেউ কেউ হয়তো আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন তারা মৃতদের সাথে কথা বলছেন।

13307210_282584312129796_2137038836727144391_n

জাদুর তৃতীয় অর্থ হচ্ছে সেটি যা আমি শিরোনামে ব্যবহার করেছি, ‘কাব্যিক জাদু’। কোনো সুন্দর সঙ্গীত শুনলে আমাদের আবেগের অশ্রু চলে আসে চোখে। আমরা নক্ষত্রদের দিকে তাকাই অন্ধকার রাতে যখন কোনো চাঁদ থাকেনা, শহরের আলো থাকেনা এবং তীব্র আনন্দ আমাদের শ্বাসরুদ্ধ করে প্রায়, আমরা এই দৃশ্যকে বর্ণনা করি বিশুদ্ধ জাদু হিসাবে। আমরা হয়তো একই শব্দ ব্যবহার করি অসাধারণ কোনো সূর্যাস্ত অথবা কোনো পাহাড়ী ভূদৃশ্য বা আকাশে কোনো রঙধনু বর্ণনা করার জন্য। এই অর্থে জাদু, শুধুমাত্র মর্মস্পর্শী, গভীর আনন্দের উদ্রেককারী: এমন কিছু যা আমাদের শিহরিত করে, আমাদের আরো পূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অনুভূতি দেয়। আমি যা দেখাতে আশা করছি এই বইয়ে, সেটি এই বাস্তবতা – সেই বাস্তব জগত সম্বন্ধে সেই সত্যগুলো যা আমরা অনুধাবণ করেছি বিজ্ঞানের নানা পদ্ধতির মাধ্যমে – যা জাদুময় এই তৃতীয় অর্থে, কাব্যিক অর্থে, বেঁচে থাকার আনন্দের অর্থে।

এখন আমি সেই অতিপ্রাকৃত ধারণায় ফিরতে চাই এবং ব্যাখ্যা করতে চাই কেন এটি কখনোই আমাদের সত্যিকারের কোনো ব্যাখ্যা প্রদাণ করেনা সেই সব জিনিসগুলো সম্বন্ধে যাদের আমার এই পৃথিবীতে ও আমাদের চারপাশের মহাবিশ্বে দেখি। বাস্তবিকভাবেই কোনো কিছুর অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা দাবী করার মানে আসলেই সেটি ব্যাখ্যা না করা, এমনকি আরো খারাপ, এটিকে কখনো ব্যাখ্যা করা যেতে পারে সেই সম্ভাবনাও বাতিল করে দেয়া। কেন আমি এ কথাটি বললাম? কারণ যে কোনো কিছু অতিপ্রাকৃত, সংজ্ঞানুযায়ী অবশ্যই প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার ক্ষমতার বাইরে। অবশ্যই এটিকে বিজ্ঞানের এবং সুপ্রতিষ্ঠিত, বহুপরীক্ষিত এবং প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নাগালের বাইরে হতে হবে, যে পদ্ধতি গত চারশত বছরে বা তারও বেশী সময় ধরে আমাদের উপভোগ করা অর্জিত জ্ঞানের অবিশ্বাস্য বিশাল অগ্রগতির জন্য দায়ী। কোনো কিছু অতিপ্রাকৃত কোনো উপায়ে ঘটেছে এটি বলা শুধুমাত্র এই না যে, ‘আমরা এটি বুঝি না’, বরং বলা. ‘আমরা কখনোই এটি বুঝতে পারবো না, সুতরাং এমনকি কোনো চেষ্টা করার দরকার নেই’।

বিজ্ঞান ঠিক এর বীপরিত দৃষ্টিভঙ্গিটি ধারণ করে। এখনও অবধি বিজ্ঞান আরো সমৃদ্ধ হয় কোনো কিছু ব্যাখ্যা না করতে পারার আপাত অক্ষমতায়, এবং এই অক্ষমতাকেই সে প্রেরণা আর উদ্দীপনা হিসাবে ব্যবহার করে আরো প্রশ্ন করা অব্যহত রাখার জন্য, সম্ভাব্য মডেল তৈরী করে তাদের পরীক্ষা করে দেখার জন্য। যেন আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌছাতে আমাদের পথ খুজে পাই ধীরে এবং ধাপে ধাপে।

সেই গোয়েন্দা পুলিশ সম্বন্ধে আপনি কি ভাববেন, যিনি কিনা একটি হত্যাকাণ্ড দেখে হতভম্ব হয়ে যান, যিনি এতই অলস যে সমস্যাটির সমাধান করা চেষ্টায় কোনো কাজই করেননা, বরং রহস্যটি সমাধান করে এটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করে? বিজ্ঞানের সামগ্রিক ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যা একসময় কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির পরিণতি ভাবা হতো – যার কারণ দেবতারা (সন্তুষ্ট এবং অসন্তুষ্ট উভয়েই), দানবরা, ডাইনীরা, আত্মা, অভিশাপ এবং জাদুমন্ত্র, আসলে তাদের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা আছে: যে ব্যাখ্যাগুলো আমরা বুঝতে পারি, পরীক্ষা করে দেখতে পারি, যার উপর বিশ্বাস রাখতে পারি। কোনো কারণই নেই বিশ্বাস করা যে বিজ্ঞান এখনো যে সব কিছুর কোনো প্রাকৃতিক কারণ খুজে পায়নি সেগুলো ঘটছে কোনো অতিপ্রাকৃত কারণে, যেমন করে মনে করা হয় ক্ষুদ্ধ দেবতাদের কারণে ঘটে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং নানা অসুখ কিংবা মহামারী, যেমন মানুষ একসময় বিশ্বাস করতো।

অবশ্যই, কেউ আসলেই বিশ্বাস করেন না, কোনো ব্যঙকে রাজকুমারে রুপান্তরিত করা সম্ভব হতে পারে ( অথবা কোনো রাজকুমারকে ব্যঙে, আমি কখনোই মনে করতে পারিনা) অথবা একটি কুমড়াকে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, কিন্তু আপনি কি কখনো বিষয়টি ভেবে দেখেছেন যে, কেন এই ধরনের বিষয়গুলো অসম্ভব? বেশ কিছু উপায় আছে সেটি ব্যাখ্যা করা। আমার পছন্দের উপায়টি হচ্ছে এটি।

বেশ, সেই ফেয়ারী বা পরী গডমাদারের জন্য বিষয়টি খানিকটা সহজ করে দেয়া যাক এমন কোনো ধারণা করে – কুমড়ো যোগাড় করে দিতে না বলে, তিনি সেই সব যন্ত্রাংশগুলো নিয়ে আসতে বললেন, যেগুলো ঘোড়ায় টানা একটি গাড়ি বা কোচ বানানোর জন্য জরুরী, সেগুলো একটি বাক্সে এলোমেলোভাবে স্তুপাকারে সাজানো আছে : ঘোড়ায় টানা গাড়ী বানানো জন্য এক ধরনের ‘নির্দেশ অনুসরণ করে নিজে বানাও’ কিট ( Ikea v সাথে যাদের পরিচিতি আছে, তারা ভাবুন আইকিয়া কিটের মত কিছু)। কোনো একটি ঘোড়ায় টানা গাড়ি নির্মানের এ ধরনের সম্ভাব্য সম্ভারে থাকে শত খানেক কাঠের টুকরো, কাঁচের পাত, লোহার রড, গদি বানানো সরঞ্জাম, চামড়ার টুকরো, পেরেক, স্ক্র এবং গ্লুর পাত্র সহ, যা তাদের একসাথে জড়ো করে ধরে রাখার জন্য দরকার।

13260100_278264015895159_7178205390042982678_n

এখন কল্পনা করুন, ধাপে ধাপে নিয়মমাফিক যন্ত্রাংশগুলো কিভাবে জোড়া লাগাতে হবে সেই নির্দেশাবলী না পড়ে, পরী গডমাদার সবগুলোকে একসাথে বিশাল একটি থলের মধ্যে রেখে, বেশ জোরেই একটা ঝাকুনি দিলেন। যদি জানতে চাওয়া হয়, কি পরিমান সম্ভাবনা সেখানে আছে যে, সব যন্ত্রাংশগুলো নিজে থেকেই সঠিকভাবে জড়ো হয়ে একটি কার্যকরী কোচ তৈরী করে ফেলবে? এর উত্তর হচ্ছে – কার্যত শূন্য। আংশিকভাবে এর কারণ, অসংখ্য সম্ভাব্য উপায় আছে যেখানে আপনি ভালো করে যন্ত্রাংশগুলো নাড়াচড়া যুক্ত করতে পারেন, কিন্তু তার কোনোটাই কার্যক্ষম ঘোড়ায় টানা গাড়ি তৈরী করতে পারবে না – এমনকি কাজ করে এমন কোনো কিছুই নির্মান সম্ভব নয় এই প্রক্রিয়ায়।

যদি আপনি বহু যন্ত্রাংশ পূর্ণ থলেটিকে ঝাকুনী দেন যে কোনো ভাবেই, হতে পারে কখনো হয়তো তার এমন কোনো একটি সজ্জায় গড়তে পারে যা উপযোগি অথবা যাকে অন্যথায় আমরা হয়তো শনাক্ত করতে পারি বিশেষ কোনো কিছু হিসাবে। কিন্তু এমন কিছু ঘটার উপায়গুলোর সংখ্যা খুবই কম: আসলেই খুব কম যদি তুলনা করা হয় সেই মিলিয়ন সংখ্যক উপায়ের সাথে, যখন সেগুলো এমন একটি সজ্জায় সজ্জিত হবে যে তাদের জঞ্জালের স্তুপ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। বহু মিলিয়ন উপায় আছে নানা টুকরা যন্ত্রাংশকে অদলবদল এবং পুনঅদলবদল করার: মিলিয়ন উপায় আছে তাদেরকে আরেকটি নানা টুকরা আর যন্ত্রাংশের স্তুপে পরিণত করার। যতবারই আপনি তাদের অদলবদল করবেন, প্রতিবারই অনন্য একটি জঞ্জালের স্তুপ পাবেন যা আগে কখনোই দেখা যায়নি। কিন্তু এইসব সম্ভাব্য স্তুপের মধ্যে খুব সামান্য কয়টি হয়তো উপযোগি কিছু হতে পারে ( যেমন আপনাকে কোনো বল নাচের আসরে নিয়ে যেতে পারে) অথবা উল্লেখযোগ্য অথবা কোনো না কোনোভাবে স্মরণযোগ্য হতে পারে।

কখনো আমরা আক্ষরিকভাবে গুনতে পারি কত সংখ্যক উপায়ে টুকরোগুলোকে অদলবদল করে সাজাতে পারি, যেমন এক প্যাকেট তাশের সাথে করতে পারি, যেখানে টুকরোগুলো হচ্ছে একক কার্ডগুলো। ধরুন, তাশ খেলার সময় ডিলার বা তাশ বন্টনকারী এক প্যাকেট তাশ অদলবদল করে আমি সহ আরও তিনজন খেলোয়াড়ের মধ্যে এমনভাবে ভাগ করে দেয় যেন তাদের প্রত্যেকেই ১৩টি করে তাশ হাতে পায়। আমি যখন আমাকে দেয়া তাশগুলো হাতে নেই দেখা জন্য, আমি বিস্ময়ে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে লক্ষ্য করি আমার হাতে ১৩ টি স্পেড এর পুরো হাত.. সবগুলো স্পেড। আমি বেশ হতভম্ব সেই খেলাটি চালিয়ে যাবার জন্য, হাতের তাশগুলো আমি অন্য তিনজন খেলোয়াড়কে দেখালাম, জানতাম তারাও আমার মত অবাক হবে। কিন্তু তারপর প্রত্যেকটি খেলোয়াড় একে একে করে তাদের হাতের তাশগুলো টেবিলে রাখেন, এবং সবাই বিস্ময়ে অবাক হন, প্রত্যেকেরই একটি নিঁখুত হাত, একজন ১৩ টি হার্ট,অন্যজনের ১৩টি ডায়মন্ড ও শেষ জনের ১৩ টি ক্লাব।

এটা কি অতিপ্রাকৃত কোনো জাদু হবে? আমরা হয়তো তেমন ভাবতে প্ররোচিত হতে পারি। কিন্তু গণিতবিদরা গণনা করতে পারবেন এই ধরনের বিস্ময়কর তাশের হাত একেবারে বিশুদ্ধভাবেই ঘটনাচক্রে বা চান্সের মাধ্যমে হতে পারে। যদিও এমন সম্ভাবনা প্রায় অসম্ভাব্য রকমের ক্ষুদ্র: প্রতি ৫৩,৬৪৪,৭৩৭,৭৬৫, ৪৮৮, ৭৯২, ৮৩৯, ২৩৭, ৪৪০, ০০০ সংখ্যক বারে ১ বার। যদি আপনি তাশ খেলতে বসেন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বছর ধরে, আপনি হয়তো হাতে একবার এই ধরনের তাশের হাত পেতে পারেন। কিন্তু – বিষয়টি হলো, এই তাশের দানটি কোনো অংশেই কম সম্ভাব্য নয়, এ যাবত যত তাশের হাত দেখা গেছে তার চেয়ে। এবং ৫২ টি তাশের কোনো হাতে এমনটি ঘটার সম্ভাবনা ৫৩,৬৪৪,৭৩৭,৭৬৫, ৪৮৮, ৭৯২, ৮৩৯, ২৩৭, ৪৪০, ০০০ সংখ্যক বারে ১ বার। কারণ বড় সংখ্যাটি তাশে সম্ভাব্য সকল হাতের সর্বমোট সংখ্যা। শুধুমাত্র আমরা কোনো বিশেষ সজ্জা তাশের হাত লক্ষ্য করিনা এই সুবিশাল সংখ্যক দানে যা ঘটতে পারে। সুতরাং সে কারণে সেই সব দানগুলো আমাদের বিশেষ নজরে পড়ে অসাধারণ কোনো ঘটনা হিসাবে। আমরা শুধু লক্ষ্য করি সেই ডিলগুলো যা কোনো না কোনো ভাবে আমাদের চোখে বিশেষ নজরে আসে।

এক রাজকুমারকে বহু হাজার কোটি রুপের যে কোনো একটিতে রুপান্তরিত করা যেতে পারে। আপনি যদি বিশেষ নিষ্ঠুর হন তার টুকরোগুলোকে হাজার কোটি সজ্জায় সাজানো যেতে পারে। কিন্তু বেশীর ভাগ সেই সজ্জাগুলো হবে জঞ্জাল, যেমন সেই হাজার কোটি অর্থহীন, তাশের হাত যা আমরা অদলবদল করার পর ভাগে পাই। শুধুমাত্র রাজকুমার-টুকরোর সেই সব সম্ভাব্য সজ্জার খুব সামান্যতম অংশই নজরে আসবে যা শনাক্তযোগ্য বা কোনোভাবে উপযোগি হতে পারে, ব্যাঙ তো দূরের কথা।

রাজকুমাররা ব্যঙে রুপান্তরিত হয়না, কুমড়ো রুপান্তরিত হয়না ঘোড়ায় টানা কোনো গাড়িতে, কারণ ব্যাঙ আর কোচ দুটোই জটিল জিনিশ, যাদের অংশগুলো সাজানো যেতে পারে প্রায় অসীম সংখ্যক টুকরার অনুপযোগী সমাবেশে। এবং তারপরও বাস্তব সত্য হিসাবে আমরা জানি, প্রতিটি জীবিত প্রাণী, প্রতিটি মানুষ., প্রতিটি কুমির, প্রতিটি ব্ল্যাক বার্ড, প্রতিটি গাছ, এমনকি প্রতিটি বাধাকপি, বিবর্তিত হয়েছে অন্য, মূলত সরল কোনো রুপ থেকে। সুতরাং এটি কি ভাগ্য নির্ভর প্রক্রিয়াই নয় শুধু বা এক ধরনের জাদু? না, অবশ্যই না। এটাই খুব পরিচিত ভ্রান্ত একটি ধারণা। সুতরাং আমি ব্যাখ্যা করতে চাই কেন বাস্তব জীবনে আমরা যা কিছু দেখিনা কেন, তারা ঘটনা চক্রে, ভাগ্যক্রমে বা চান্স বা অাপতনের, অথবা সামান্যতম জাদুর কোনো অবকাশ নেই ( শুধুমাত্র, অবশ্যই, সেই কঠোরভাবে কাব্যিক অর্থে এমন কিছু যা আমাদের আনন্দ আর বিস্ময়ে পূর্ণ করে)।

বিবর্তনের মন্হর জাদু

একটি জটিল কোনো জীবকে এক ধাপে আরেকটি জটিল কোনো জীবে রুপান্তর করার বিষয়টি – যেমন রুপকথায় ঘটে – আসলেই বাস্তবতা নির্ভর সকল সম্ভাবনার নাগালের বাইরে। এবং তারপরও জটিল প্রাণীদের অস্তিত্ব আছে। কিভাবে তাদের উদ্ভব হয়েছিল? কিভাবে, বাস্তবেই, জটিল জিনিস, যেমন ব্যঙ, সিংহ, বেবুন আর বটগাছ, রাজকুমার আর কুমড়ো, আপনি এবং আমি অস্তিত্বশীল হয়েছি?

ইতিহাসের বেশীরভাগ সময় ধরে এটি ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়ার মত একটি প্রশ্ন ছিল, সঠিকভাবে যার উত্তর কেউই দিতে পারেননি। মানুষ সেকারণে নানা ধরনের গল্প উদ্ভাবন করেছে সেটি ব্যাখা করার চেষ্টায়। কিন্তু তারপর এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন- এবং দারুণ বুদ্ধিমত্তার সাথে – উনবিংশ শতাব্দীতে, এযাবৎ কালের শ্রেষ্ঠতম একজন বিজ্ঞানী, চার্লস ডারউইন। আমি এই অধ্যায়ের বাকী অংশটি ব্যবহার করবো তার সেই উত্তরটি ব্যাখ্যা করার জন্য, তবে ডারউইনের ব্যবহৃত শব্দগুলোর চেয়ে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে।

উত্তর হচ্ছে – জটিল জীবন – যেমন মানুষ, কুমির, বাধাকপি, হঠাৎ করেই উদ্ভব হয়নি এক ধাক্কায়, বরং ধীরে ধীরে, ছোট ছোট ধাপ পার হয়ে এমনভাবে, যেন প্রতিটি ধাপের পরের পরিস্থিতি এর আগেই থেকে যা বিদ্যমান তার থেকে সামান্য একটু ভিন্ন হয়। কল্পনা করুন আপনি লম্বা পা সহ একটি ব্যাঙ সৃষ্টি করতে চান । কাজটির শুরুতেই সবচেয়ে ভালো যে পদক্ষেপটি আপনি নিতে পারেন, সেটি হচ্ছে এমন কিছু দিয়ে কাজটি শুরু করা, ইতিমধ্যেই যাদের সেরকম খানিকটা বৈশিষ্ট্য আছে, যা কিনা আপনি অর্জন করতে চাইছেন: যেমন ধরুন ছোট পা সহ ব্যাঙ। আপনি আপনার ছোট পা সহ ব্যাঙগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখবেন এবং তাদের পায়ের মাপ নেবেন। আপনি সেখান থেকে কিছু পুরুষ আর স্ত্রী ব্যাঙ বাছাই করে নেবেন যাদের পায়ের দৈর্ঘ্য গড়পড়তা অন্য সব ব্যাঙগুলোর চেয়ে লম্বা, এরপর আপনি শুধু তাদের মধ্যে প্রজননের ব্যবস্থা করে দেবেন, এবং খেয়াল রাখবেন যেন তাদের ছোট পা সহ বন্ধুরা প্রজননের কোনো সুযোগ না পায়।

13406808_291445937910300_8253257833164430536_n

অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ পায়ের পুরুষ এবং স্ত্রী ব্যঙরা একসাথে ব্যাঙাচি তৈরী করবে, এবং তাদের একসময় পা গজাবে এবং ব্যাঙে পরিণত হবে। এরপর আপনি নতুন প্রজন্মের ব্যাঙদের পা মেপে দেখবেনে, আবারো পুরুষ আর স্ত্রী ব্যাঙ্গদের বাছাই করবেন যাদের পা বাকীদের চেয়ে খানিকটা বড় এবং তাদের প্রজনন করতে সুযোগ করে দেয়া হয়।

প্রায় ১০ টি প্রজন্ম এমন করার পর, আপনি হয়তো কিছু কৌতুহলোদ্দীপক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করবেন। গড় পায়ের দৈর্ঘ আপনার সেই বাছাই করা ব্যাঙ জনগোষ্ঠিতে এখন লক্ষ্য করার মতই দীর্ঘ হবে শুরুর সেই জনগোষ্ঠীর গড় পায়ের দৈর্ঘ অপেক্ষা। আপনি হয়তো দেখতে পারেন, দশম প্রজন্মের সব ব্যাঙের পা, প্রথম প্রজন্মের পায়ের দৈর্ঘের তুলনায় বেশ লম্বা। অথবা ১০ টি প্রজন্ম হয়তো যথেষ্ট না এমন কিছু অর্জন করার জন্য: আপনাকে হয়তো ২০ তম প্রজন্ম অথবা আরো বেশী প্রজন্ম অবধি পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অবশেষে আপনি গর্বের সাথে বলতে পারবেন, ‘আমি একটি নতুন ধরনের ব্যাঙ তৈরী করেছি যাদের পা পুরোনো ব্যাঙের চেয়ে দীর্ঘতর’।

13450889_291445947910299_8975518374953942898_n

কোনো জাদুর কাঠির প্রয়োজন নেই, কোনো ধরনের জাদুর দরকার নেই। এখানে যে প্রক্রিয়াটি আমরা দেখতে পাই সেটি হচ্ছে সিলেকটিভ ব্রিডিং, বা বাছাইকৃত প্রজনন। আমি সেই বাস্তব তথ্যটি ব্যবহার করেছি শুরুতেই, ব্যাঙদের নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা (পায়ের দৈর্ঘ) আছে এবং এই সব ভিন্নতা বংশগত হবার প্রবণতা আছে – তার মানে এটি পিতামাতা থেকে সন্তানে বিস্তার করে জিনের মাধ্যমে। শুধুমাত্র কোন ব্যাঙগুলো প্রজনন করতে পারবে আর কোনগুলো পারবেনা, সেটি নিয়ন্ত্রণ করেই আমরা নতুন ধরনের ব্যাঙ তৈরী করতে পারবো।

খুব সহজ, তাই না?

কিন্তু শুধুমাত্র পা দীর্ঘতর করা খুব বেশী চিত্তাকর্ষক কোনো বিষয় নয়। সর্বোপরি আমরা তো ব্যাঙ নিয়ে শুরু করে করেছিলাম, তারা শুধুমাত্র ছিল ছোট পায়ের ব্যাঙ এর রুপ। ধরুন আপনি শুরু করলেন, ছোট পায়ের এক প্রকার ব্যাঙ থেকে না বরং এমন কিছু দিয়ে সেগুলো আদৌ ব্যাঙ নয়। ধরুন তারা খানিকটা দেখতে নিউটদের মত ( নিউটরা একধরনের উভচরী প্রাণি)। যদি তুলনা করা হয় ব্যাঙের পায়ের তুলনায় নিউটদের খুব ছোট পা থাকে ( অন্তত ব্যঙের পেছনের পায়ের তুলনা করলে অবশ্যই ) আর তারা সেটি ব্যবহার করে লাফানোর জন্য নয়, বরং হাটার জন্য। নিউটদের এছাড়া লম্বা লেজ থাকে, যেখানে ব্যাঙদের কোনো লেজ থাকেনা, এবং নিউটরা আকারে বেশীর ভাগ ব্যাঙদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সরু আর লম্বা। কিন্তু আপনি দেখতে পারবেন যে, যদি যথেষ্ঠ হাজার পরিমান প্রজন্ম দেয়া হয়, আপনি নিউটদের একটি জনগোষ্ঠীকে ব্যাঙের একটি জনগোষ্ঠীতে রুপান্তরিত করতে পারবেন, শুধুমাত্র ধৈর্য ধরে বাছাই করতে হবে, ঐসব বহু মিলিয়ন প্রজাতির প্রত্যেকটিতে, পুরুষ আর স্ত্রী নিউটরা, যারা খানিকটা বেশী ব্যঙের মত, তাদের শুধুমাত্র প্রজনন করতে সুযোগ দিয়ে, এবং যাদের সাথে ব্যঙের সদৃশ্যতা কম তাদের প্রজননে বাধা দেবার মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনো পর্যায়ে আপনি কোনো নাটকীয় পরিবর্তন দেখবেন পাবেন না। প্রতিটি প্রজন্ম তাদের আগের প্রজন্মের মতই মোটামুটি দেখতে হবে, কিন্তু তাসত্তেও, যখন যথেষ্ঠ পরিমান প্রজন্ম অতিক্রান্ত হবে, আপনি লক্ষ্য করতে শুরু করবেন গড় লেজের দৈর্ঘ্য খানিক কম, এবং গড় পেছনের পায়ের দৈর্ঘ খানিকটা লম্বা। অনেক বড় সংখ্যার প্রজন্ম অতিক্রান্ত হতে লম্বা পায়ের, ছোট লেজের সদস্যদের জন্য হয়তো সহজ হবে তাদের লম্বা পা হামাগুড়ি দেবার বদলে লাফ দেবার জন্য ব্যবহার করতে। এবং এভাবে আরো কিছু পরিবর্তনও আমরা দেখবো।

অবশ্যই, আমি যে দৃশ্যকল্পটি এই মাত্র বর্ণনা করলাম, সেখানে আমি আমাদেরকে প্রজনন নিয়ন্ত্রণকারী হিসাবে কল্পনা করেছি, সেই সব স্ত্রী ও পুরুষ সদস্যদের বাছাই করেছি যাদের আমরা চেয়েছি নিজেদের মধ্যে প্রজনন করুক সেই ফলাফলটি পাওয়ার জন্য, যা আমরা নির্বাচন করেছিলাম। কৃষকরা এই কৌশল ব্যবহার করছেন বেশ কয়েক হাজার বছর ধরে গবাদী পশু আর খাদ্যশস্য উৎপাদনে, যাদের ফলন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী, এবং ইত্যাদি। ডারউইন হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রক্রিয়াটি কাজ করে, এমনকি যখন কোনো কৃত্রিম প্রজননকারী ( যেমন মানুষ) সেখানে থাকেন না নির্বাচন করার জন্য। ডারউইন দেখেছিলেন যে, পুরো বিষয়টি ঘটবে প্রাকৃতিকভাবে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়, শুধুমাত্র সরল কারণ যে কিছু সদস্য যথেষ্ঠ দীর্ঘসময় অবধি বেঁচে থাকে প্রজনন করার জন্য এবং অন্যরা বাঁচে না। এবং যারা টিকে থাকে সেটি করার জন্য কারণ তারা বাকীদের চেয়ে সেই কাজটি করার আরো দক্ষভাবে নানা বৈশিষ্ট্যে সজ্জিত। সুতরাং যে টিকে থাকে তার সন্তান সেই জিনগুলো পায় যা তাদের পিতা অথবা মাতাকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। সেটি নিউট হোক কিংবা ব্যাঙ হোক, সজারু অথবা কোনো আগাছা হোক, সবসময়ই কিছু সদস্য থাকবে যারা অন্যদের চেয়ে বেশী দক্ষ বেঁচে থাকার জন্য।

যদি লম্বা পা সেটি করার জন্য ঘটনাচক্রে সহযোগিতা করে ( ব্যাঙ অথবা ঘাসফড়িং, যারা লাফ দিয়ে বিপদ থেকে সরে যেতে পারে, যেমন ধরুন, গ্যাজেল শিকার করা চিতা বা চিতার আক্রমন থেকে পালানোর জন্য), লম্বা পা সহ সদস্যদের মারা যাবার সম্ভাবনা কম। প্রজনন করার জন্য তাদের বেশী দিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশী । এছাড়াও, বেশীর ভাগ একক সদস্যদের লম্বা পা থাকবে যাদের প্রজননের জন্য পাওয়া যাবে। সুতরাং প্রতিটি প্রজন্মে অপেক্ষাকৃত একটি বড় সম্ভাবনা আছে লম্বা পায়ের জিনদের জন্য পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবার ক্ষেত্রে। এবং সময়ের সাথে আমরা দেখবো কোনো একটি জনগোষ্ঠীতে ক্রমশ আরো বেশী সদস্যরা লম্বা পায়ের জিন বহন করবে। সুতরাং প্রভাবটি পড়ে ঠিক যেন মনে হয় বুদ্ধিমান কোনো ডিজাইনার, যেমন মানব কৃত্রিম প্রজননকারী, লম্বা পায়ের সদস্যদের বাছাই করেছেন প্রজনন করার জন্য – কিন্তু শুধুমাত্র এ ধরনের কোনো ডিজাইনারের আসলেই কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই : এটি ঘটছে, প্রাকৃতিক ভাবেই, একা একাই,একটি স্বয়ংক্রিয় পরিণতি হিসাবে সেই পরিস্থিতির – যেখানে কোনো কোনো সদস্যরা যথেষ্ঠ পরিমান দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে প্রজনন করার জন্য, এবং কোনো কোনো সদস্যরা সেটি করতে পারেনা। এ কারণে এই প্রক্রিয়াটির নাম প্রাকৃতিক নির্বাচন। যথেষ্ট পরিমান প্রজন্ম যদি পার করতে পারি, নিউটদের মত দেখতে কোনো পূর্বসূরি পরিবর্তিত হতে পারে এমন উত্তরসূরিদের যাদের দেখলে ব্যঙের মত মন হবে। আরো যদি প্রজন্ম পার হওয়া যায়, মাছদের মত দেখতে কোনো পূর্বসূরি সেই উত্তরসূরিতে পরিবর্তিত হতে পারে, যারা বানরে মত দেখতে হয়। এবং আরো যদি প্রজন্ম অতিক্রম করার সুযোগ দেয়া হয়, ব্যকটেরিয়াদের মত দেখতে পূর্বসূরিরা সেই উত্তরসূরিতে পরিবর্তিত হতে পারে যারা দেখতে মানুষদের মত। এবং ঠিক এটাই ঘটেছিল। এটা হচ্ছে সেই ধরনের বিষয় যা প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদের ইতিহাসে ঘটেছিল, যারা বেঁচে ছিল কোনোদিনও। এবং যে পরিমান প্রজন্ম সংখ্যার দরকার হয় এমন পরিবর্তনের জন্য সেটি আমার ও আপনার সম্ভাব্য কল্পনার চেয়ে বেশী, কিন্তু পৃথিবী হাজার কোটি বছর প্রাচীন এবং আমরা জীবাশ্ম থেকে জানি জীবনের সূচনা হয়েছিল সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর ( সাড়ে তিন হাজার কোটি) আগে, সুতরাং বিবর্তন হবার জন্য যথেষ্ট সময় ছিল।

13445382_291445944576966_1337612349137914134_n

এটাই ডারউইনের অসাধারণ ধারণাটি, এবং এটিকে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন। মানব মনে আবির্ভূত হওয়া শ্রেষ্ঠতম ধারণাগুলোর গুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে জীবন সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি এটি সবকিছুই ব্যাখ্যা করে। যেহেতু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমি পরের অধ্যায়গুলোয় আমি আবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় ফিরে আসবো।

আপাতত, এটুকু যথেষ্ঠ বোঝার জন্য যে, বিবর্তন খুব ধীর আর ক্রমশ ঘটা একটি প্রক্রিয়া। বাস্তবিকভাবেই, এই বিবর্তনের ক্রমে ক্রমে ঘটার বিষয়টি বিবর্তনকে সহায়তা করে ব্যাঙ কিংবা রাজকুমারদের মত জটিল কিছু তৈরী করা। জাদুর বলে কোনো ব্যাঙের রাজকুমারে রুপান্তরিত হবার ঘটনা কখনোই ক্রমে ক্রমে ঘটবে না, এটি ঘটবে হঠাৎ করেই। আর এটাই এই সব জিনিসকে বাস্তবতা জগতে অসম্ভব বলেই চিহ্নিত করেছে। বিবর্তন হচ্ছে একটি সত্যিকারের ব্যাখ্যা, যা আসলেই কাজ করে এবং এর সত্যিকারের প্রমাণ আছে এর সত্যতা প্রদর্শন করার জন্য। যা কিছু, যারা দাবী করে, জটিল জীবনের নানা রুপের আবির্ভাব হয়েছে হঠাৎ করেই, একসাথে ( ধীরে ধীরে ক্রমশ বিবর্তিত হবার বদলে), সেগুলো আসলেই অসল কাহিনী মাত্র, রুপকথার সেই পরী মায়ের জাদুর কাঠির কল্পনার চেয়ে আদৌ ভালো কিছু না।

আর কুমড়োদের ঘোড়া টানা গাড়ির কোচে রুপান্তর হবার ব্যাপারে, জাদুর মন্ত্র অবশ্যই কিছু করে না যেমন তারা ব্যাঙকে রাজকুমারে রুপান্তর করতে পারেনা। ঘোড়ায় টানা গাড়ি বা কোচ বিবর্তিত হয় না – অন্তত প্রাকৃতিকভাবে, যেভাবে ব্যাঙ আর রাজকুমাররা বিবর্তিত হয়। কিন্ত কোচ, উড়োজাহাজ আর কুড়াল, কম্পিউটার আর ফ্লিন্ট পাথরের তীরের মাথা – তৈরী করে মানুষ, যারা বিবর্তিত হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক আর হাত বিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, ঠিক যেভাবে হয়েছে নিউটদের লেজ আর ব্যাঙদের পেছনের দুটি পা। এবং মানব মস্তিষ্ক, একবার যখন তা বিবর্তিত হয়েছে, তারা গাড়ি কিংবা কোচ, কাচি কিংবা সঙ্গীত, ওয়াশিং মেশিন এবং ঘড়ি, সবকিছু পরিকল্পনা করতে ও বানাতে সক্ষম হয়। আরো একবার, কোনো জাদু না। আরো একবার কোনো চালাকির কৌশল না। আরো একবার, সবকিছু সুন্দরভাবে এবং সরলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

13321970_282584318796462_7492480539710269066_n

এই বইটির বাকী অংশে আমি আপনাদের দেখাবো যে সত্যিকারের পৃথিবী, বৈজ্ঞানিকভাবে যা বোঝা হয়েছে, তার নিজস্ব একটি জাদু আছে – সেই জাদুকে আমি বলে কাব্যিক জাদু: যার অনুপ্রেরণা দেবার মত সৌন্দর্য, যা আরো বেশী জাদুময় কারণ এটি বাস্তব এবং কারণ আমরা বুঝতে সক্ষম কিভাবে এটি কাজ করছে। বাস্তব পৃথিবীর সত্যিকারের সৌন্দর্য এবং জাদুর সাথে অতিপ্রাকৃত মন্ত্র আর জাদুর মঞ্চের খেলা তুলনা করলে মনে হতে পারে অনেক শস্তা আর রুচিহীনভাবেই চটকদার। বাস্তবতার জাদু অতিপ্রাকৃত না আবার হাতসাফাইও না, কিন্তু – খুব স্পষ্টভাবেই – বিস্ময়কর। বিস্ময়কর এবং বাস্তব। বিস্ময়কর কারণ এটি বাস্তব।

Advertisements
বাস্তবতার জাদু : প্রথম অধ্যায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s