বাস্তবতার জাদু : তৃতীয় অধ্যায়

13567361_313356975719196_2705950465496234074_n

রিচার্ড ডকিন্স : দ্য ম্যাজিক অব রিয়েলিটি 

কেন এত বেশী বিচিত্র ধরনের জীব?

কোনো প্রাণি যেমন দেখতে, কেন তারা তেমন দেখতে হয় সেটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে নানা ধরনের পূরাণ কাহিনী – কিংবদন্তীর সেই গল্পগুলো ‘ব্যাখ্যা’ করেছে যেমন, কেন চিতাবাঘের গায়ে ফোটা ফোটা দাগ থাকে, কেন খরগোশের সাদা লেজ থাকে । কিন্তু খুব বেশী কোনো পূরাণ কাহিনী নেই যা কিনা পৃথিবীতে এই অসংখ্য ধরনের বৈচিত্রময় জীবদের অস্তিত্বের কারণের ব্যপারে কিছু ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছে। টাওয়ার অব বাবেল এর সেই ইহুদী পুরাণ কাহিনীর সমতুল্য আমি কোনো কিছু পাইনি, যা বহু ধরনের বৈচিত্রময় ভাষার উপস্থিতি ‘ব্যাখ্যা’ করেছিল। বহু দিন আগে, এই কাহিনী অনুযায়ী, সারা পৃখিবীর মানুষ একই ভাষায় কথা বলতো। সুতরাং তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে অনেক উচু একটি টাওয়ার নির্মাণ করেছিল, তারা আশা করেছিল সেই টাওয়ারটি যেন আকাশ স্পর্শ করে। কিন্তু ঈশ্বর ব্যপারটি লক্ষ্য করেছিলেন, এবং সবাই যে অন্য সবাইকে বুঝতে সক্ষম হচ্ছে বিষয়টি তার বিশেষ পছন্দ হয়নি। কারণ মানুষরা যদি সবাই সবার ভাষা বোঝে আর একসাথে কাজ করে, এরপরে তাহলে তারা কি না করতে পারে? সুতরাং তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের ভাষাগুলোকে ‘বিশৃঙ্খল আর তালগোল পাকিয়ে’ দেবেন, যেন তারা একে অপরের কথা বুঝতে না পারে। সুতরাং এই পূরাণ কাহিনীটি বলছে, কেন পৃথিবীতে এত ভিন্ন ভিন্ন ভাষা আমরা দেখতে পাই এবং কেন, যখন মানুষ অন্য গোত্র বা দেশের মানুষের সাথে কথা বলতে চায়, তাদের কথা শুনলে পরস্পরের কাছে মনে মনে হয় অর্থহীন বকবকানী। যথেষ্ট অদ্ভুত ব্যপার ইংরেজী ব্যবল ( যার অর্থ অসংলগ্ন বা অর্থহীন কথা বলা বা বকবক করা) আর টাওয়ার অব বাবেল এর মধ্যে কোনে শব্দের উৎপত্তিগত যোগসূত্রতা নেই।

আমি একই ধরনের পূরাণ খুজে পাবো বলে আশা করেছিলাম, যা কিনা পৃথিবীতে নানা ধরনের বৈচিত্রময় জীবদের উপস্থিতি ব্যাখ্যা করবে, কারণ প্রাণি ও ভাষা বিবর্তনের মধ্যে খানিকটা সদৃশ্যতা আছে, যেমনটি আমরা দেখবো। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এমন কোনো পুরাণ নেই যা সুনির্দিষ্টভাবে বহু বিচিত্র প্রাণিদের অতি বিশাল সংখ্যাটি ব্যাখ্যা করেছে। এটি বেশ বিস্ময়কর, কারণ পরোক্ষ প্রমাণ আছে যে আদিবাসী মানুষরা সেই বাস্তব সত্যটি সম্বন্ধে সচেতন ছিল যে বহু ধরনের প্রাণি আছে। ১৯২০ এর দশকে, এখন অত্যন্ত বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী, আর্নস্ট মায়ার পাপুয়া নিউ গিনির হাইল্যাণ্ডে পাখিদের নিয়ে যুগান্তকারী একটি গবেষণা করেছিলেন। তিনি প্রায় ১৩৭ প্রজাতির বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন, এবং এরপর তিনি আবিষ্কার করেন, অবশ্যই বিস্ময়ের সাথে, স্থানীয় পাপুয়া আদিবাসীদের কাছে এই ১৩৬ পাখির জন্য আলাদা আলাদা নাম আছে।

Continue reading “বাস্তবতার জাদু : তৃতীয় অধ্যায়”

বাস্তবতার জাদু : তৃতীয় অধ্যায়

দ্য হিরো অ্যাস আর্টিস্ট

close-up-face-statue-of-david-in-florence-david-smith(ডেভিড, মাইকেলেঞ্জেলো)

কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন থেকে অনুবাদ – আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান

‘কখনো কখনো মানুষ ভেবেছে যে রেনেসাঁ পর্বের ইতালীয়রা তাদের বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুহলতা থাকা সত্ত্বেও কেন চিন্তা বা দর্শনের ইতিহাসে আরো অনেক বেশী অবদান রেখে যায়নি। এর কারণ হচ্ছে সেই সময়ের সবচয়ে গভীরম ভাবনা শব্দে প্রকাশিত হয়নি বরং সেটি প্রকাশিত হয়েছিল দৃশ্যমান চিত্রকলায়।’ কেনেথ ক্লার্ক

The-Creation-of-Adam-1512-Michelangelo(ছবি: মাইকেলেঞ্জেলো, মানব সৃষ্টি)

ফ্লোরেন্স থেকে রোম, দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয় অনেকটাই, একরোখা, দ্রুতবুদ্ধির, ধীর আর সুন্দর গতিময় মানুষদের শহর থেকে গুরুগম্ভীর ভারী এমন একটি শহরে, যা মানুষের আশা আর উচ্চাকাঙ্খার সুবিশাল একটি কম্পোষ্ট বা জৈবসারের স্তুপের মত; সব অলঙ্কার থেকে বঞ্চিত, প্রায় দূর্ভেদ্য রহস্যাবৃত, রাজকীয় চাকচিক্যময়তার একটি জঙ্গল, যেখানে শুধুমাত্র একজন প্রাচীন সম্রাট, মারকাস অরেলিয়াস (১), দাড়িয়ে আছেন মাটির উপরে, বহু শতাব্দী জুড়ে সুর্যের আলোয়। মানদণ্ডও পরিবর্তিত হয়েছে। আমি ভ্যাটিকানের কোর্টইয়ার্ডে বা প্রাঙ্গনে দাড়িয়ে আছি, যার শেষ প্রান্তে স্থপতি ব্রামান্টে (২) একটি সান-ট্র্যাপ (৩) তৈরী করেছিলেন, যা পরিচিত বেলভেদেয়ার (৪) নামে, যেখান থেকে পোপ প্রাচীন এই শহরটির দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এর আকৃতি যদিও কোনো নিশের (৫) মত, তবে কোনো বিশাল আকারের ভাস্কর্যকে ধারণ করার বদলে, এটি আকারে ছিল সুবিশাল- আসলেই সবসময় এটি পরিচিত ছিল ‘ইল নিককিওনে’ নামেই- যার অর্থ ‘দানবাকৃতির নিশ’- এটি সুবিশাল পরিবর্তনের একটি বহির্মূখি এবং দৃশ্যমান প্রতীক, যা রেনেসাঁর সভ্যতাকে গ্রাস করেছিল ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো একটি সময়ে। স্বাধীন আর সক্রিয় মানুষদের পৃথিবী ছিল না সেটি আর বরং দানব আর বীরদের একটি পৃথিবী।

এই নিশের মধ্যে একটি মানুষকে ধারণ করতে পারে এমন বড় আকারের ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরী একটি পাইন-কোনের ভাস্কর্য আছে। এটি এসেছে এর আগের দানবদের জগত থেকে, প্রাচীন রোমের সেই পৃথিবী থেকে, এবং এটি সম্ভবত হেড্রিয়ানের (৫) সমাধির ফিনিয়াল (৬) ছিল; কিন্তু মধ্যযুগে মনে করা হতো এটি হিপপোড্রোমের (৭) সেই বিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করছে, রথ বা চ্যারিওট প্রতিযোগিতার সময় যেখান থেকে রথ চালকরা তাদের ঘোড়া ঘুরিয়ে আনতেন। এবং যেহেতু এই হিপপোড্রোমে বহু খ্রিস্টীয় শহীদদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, এই জায়গাটাকেই খ্রিস্টীয় চার্চ তাদের প্রধান কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য নির্বাচন করেছিল। বিশাল, অস্পষ্ট একটি ধারণা, যদি ফ্লোরেন্স এর তীক্ষ্ম সুস্পষ্ট ধারণাগুলোর সাথে এর তুলনা করা হয়। কিন্তু রোমে এই সব ধারণাগুলো খুব একটা অস্পষ্ট ছিলনা, কারণ প্রাচীনকালের সুবিশাল আকারের ভবনগুলো সেখানে ছিল (৮০), আজ আমরা যতটা দেখি, সেই সময় তার চেয়ে আরো অনেক বেশী ছিল তাদের সংখ্যা। এমনকি তিন শতাব্দী পরও, যখন এই সব ভবনগুলোকে মার্বেল পাথরের খনির মত ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখানেই আমাদের অনুপাত ও মাত্রাবোধটি আরো বেশী সম্প্রসারিত হয়েছিল, বিস্ময়করভাবেই তারা এখনও আকারে অনেক বড়। মধ্যযুগে মানুষ এই দানবীয় আকার ও মাত্রায় নিষ্পেষিত বোধ করেছে নিজেদের। তারা দাবী করেছে এই সব ভবনগুলো নিশ্চয়ই নির্মাণ করেছে দানবরা অথবা বড় জোর, তারা এদের মনে করে নিয়েছে প্রাকৃতিক কোন প্রপঞ্চ হিসাবে – যেমন কোনো পর্বত – এবং এই সব দানবাকৃতির ভবনের মধ্যে তারা তাদের কুড়ে ঘর নির্মাণ করেছিল, ঠিক যেমন করে কেউ উপত্যাকা বা আশ্রয়দানকারী পাহাড়ের ঢালের সুযোগ নেয় তাদের বসতি বানাতে। রোম ছিল গরুর পাল আর ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো ছাগলদের শহর, অল্প কিছু দূর্গসদৃশ টাওয়ার ছাড়া যেখানে কোন কিছুই নির্মাণ করা হয়নি, যেখান থেকে প্রাচীন পরিবারগুলো তাদের অর্থহীন ও বিরাহীন দ্বন্দ চালিয়ে যেত – যে দ্বন্দ আক্ষরিকার্থেই সমাপ্তিহীন, কারণ তারা এখনও তাদের কলহ অব্যাহত রেখেছে।

Continue reading “দ্য হিরো অ্যাস আর্টিস্ট”

দ্য হিরো অ্যাস আর্টিস্ট

বাস্তবতার জাদু : দ্বিতীয় অধ্যায়

13450772_295027890885438_5741499724979303664_n

দ্বিতীয় অধ্যায়: রিচার্ড ডকিন্সের দ্য ম্যাজিক অব রিয়েলিটি 

কে ছিল প্রথম মানুষ ?

এই বইয়ে বেশীর ভাগ অধ্যায়ের শিরোনামে একটি প্রশ্ন আছে। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই প্রশ্নটির উত্তর দেয়া, অথবা, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য সবচেয়ে সেরা উত্তরটি দেবার চেষ্টা করা, যেটি হচ্ছে বিজ্ঞানের উত্তর। কিন্তু সাধারণ আমি শুরু করবো কিছু পৌরাণিক উত্তর দিয়ে কারণ তার বেশ কৌতুহলোদ্দীপক এবং বর্ণিল, এবং সত্যিকারের বাস্তব মানুষরা সেগুলো বিশ্বাস করেছিল, কিছু মানুষ এখনও তা করেন।

পৃথিবীর সব দেশের মানুষদেরই সৃষ্টি সংক্রান্ত পুরাণ কাহিনী আছে, তারা কোথা থেকে এসেছে সেটি ব্যাখ্যা দেবার জন্য। বহু গোত্র ভিত্তিক সৃষ্টি সংক্রান্ত পুরাণ মূলত একটি সুনির্দিষ্ট গোত্র সংশ্লিষ্ট – যেন অন্য কোনো গোত্র ধর্তব্যের মধ্যেই পড়েনা! একই ভাবে, বহু গোত্রের আইন আছে যে তারা মানব হত্যা করবে না – কিন্তু দেখা যায় এই মানব বলতে শুধুমাত্র আপনার নিজের গোত্রের অন্যদেরকেই বোঝায়। অন্য গোত্রের সদস্যদের হত্যা করলে কোনো সমস্যা নেই।

একটি বৈশিষ্ট্যসূচক সৃষ্টি পুরাণের কথা ধরুন, এটি তাসমানিয়ার আদিবাসীদের একটি গ্রুপের। মহাকাশে নক্ষত্রের মধ্যে একটি ভয়াবহ যুদ্ধে মইনি বলে একজন দেবতাকে পরাজিত করে প্রতিদ্বন্দী এক দেবতা যার নাম ড্রোমেরডিনার। মইনি নক্ষত্র থেকে ছিটকে তাসমানিয়ায় এসে পড়েন তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য। তবে তিনি মারা যাবার আগে, তার চিরন্তিম শয্যার এই জায়গাটি আশীর্বাদপুষ্ট করতে তিনি একটি ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, এর পরিণতিতে সুতরাং, তিনি মানুষদের সৃষ্টি করেন। যেহেতু তিনি মারা যাচ্ছেন বলে তার এমন তাড়া ছিল, তিনি তার সৃষ্ট মানুষদের হাটু দিতে ভুলে গিয়েছিলেন ( কোনো সন্দেহ নেই নিজের সমস্যা তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করেছিল), তিনি অন্যমনস্ক হয়ে তাদের ক্যাঙারুর মত লম্বা একটি লেজও দিয়েছিলেন, তার মানে তার ঠিক মত বসতে পারতোনা। এরপর তিনি মারা যান। মানুষরা লম্বা ক্যাঙারু লেজ আর কোনো হাটু না থাকার ব্যপারটি নিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে, এবং স্বর্গের উদ্দেশ্যে আর্তি জানায় তাদের সাহায্য করার জন্য।

Continue reading “বাস্তবতার জাদু : দ্বিতীয় অধ্যায়”

বাস্তবতার জাদু : দ্বিতীয় অধ্যায়

দর্শনের সহজ পাঠ : ডায়োজেনিস

ডায়োজেনিস – প্রাচীন সিনিক দর্শন
(আমি সিনিকের অনুবাদ করছি না কারণ হতাশাবাদ শব্দটি সিনিক দার্শনিকদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না)

LUKEORAM_Diogenes_and_Alexander_GandolfiWEB-1024x826(Diogenes and Alexander Master study of the the original by Gaetano Gandolfi, 1792)

১৯৬৭ সালে ডিজনীর অ্যানিমেটেড ফিল্ম ‘দ্য জাঙ্গল বুক’ এ ভালুক বালু গানে গানে একটি দার্শনিক ম্যানিফেস্টো ঘোষণা করেছিলো – শুধুমাত্র অবশ্য প্রয়োজনীয় কিছুর উপর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বালু দর্শকদের ভুলে যেতে বলেছিল সব চিন্তা আর কষ্ট।বালু তাদের শুধুমাত্র অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে জীবন কাটাতে বলেছিল, কারণ বালু সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, প্রকৃতি মায়ের রেসিপিগুলোই জীবনের অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে বের করে আনে। অবশ্যই বালু কোনো দর্শন পড়েনি, তার জীবনের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে আমরা যেমন দেখি, আর যদি সে দর্শন পড়তো তাহলে, অবশ্যই সে তার দর্শনের সাথে মিল পেতো ডায়োজেনিস অব সিনোপে’র দর্শনের।

ডায়োজিনিস ভালুক ছিলেন না যদিও – তিনি ছিলেন কুকুর ( হ্যা তাকে সে নামে ডাকা হতো)। কুকুরের গ্রীক শব্দ kuon, আর ডায়োজিনিস ও তার সেই দর্শনের অনুসারী দার্শনিকদের বলা হতো, সিনিক, Cynics, নামটি এসেছে এই প্রাণিটির সন্মানে, মনে রাখা দরকার যে, গ্রীক বিশ্বে তেমন পছন্দের কোনো প্রাণি ছিল না কুকুররা ( প্রাচীন গ্রীক ভাষায় kynikos যার অর্থ কুকুর সদৃশ)। অবশ্য তাদের এই নামে ডাকার আরেকটি কারণ মনে করা হয় প্রথম সিনিক দার্শনিক অ্যান্টিসথেনিস ( Antisthenes) এথেন্সে যে জিমনেশিয়ামে পড়াতেন, তার নাম ছিল Cynosarges, যে নামটি অর্থ place of the white dog; এছাড়াও নিশ্চিৎভাবে বলা যায় যে, প্রথম সিনিকদের অপমান সূচক অর্থে কুকুর বলা হতো, কারণ তারা তাদের মতে নির্লজ্জভাবেই সামাজিক সব রীতিনীতি অস্বীকার করতেন, এবং রাস্তায় বসবাস করতেন বলে।

Continue reading “দর্শনের সহজ পাঠ : ডায়োজেনিস”

দর্শনের সহজ পাঠ : ডায়োজেনিস

মৃত্যুর আয়নায় জীবনের নক্ষত্র

2017-03-11_18-02-49

আবুল আলা আল-মারি ছিলেন ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায় জন্ম নেয়া একজন আরব দার্শনিক ও কবি। কর্ম জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি সেই সময়ের পৃথিবীর সেরা শহর বাগদাদে কাটিয়েছিলেন। অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনোই তাঁর কোনো লেখা অর্থের মূল্যে বিক্রি করতে রাজী হননি। ১০১০ এ তিনি আবার সিরিয়ায় ফিরে এসেছিলেন। নৈরাশ্যবাদী মুক্তচিন্তার যুক্তিবাদী দার্শনিক হিসাবে পরিচিত আল-মারি নিজেকে দুই জগতের বন্দী হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন… তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা- অন্ধত্ব এবং তার একাকীত্বের জগত।

চার বছর বয়সে গুটি বসন্তের কারণে তিনি তার দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছিলেন। তবে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে তার অন্ধত্ব কোনো বড় বাধা হয়ে দাড়ায়নি। আল-মারি মূলত বিতর্কিত ছিলেন তার যুক্তিবাদী দর্শনের কারণে। তিনি ধর্মের মতবাদ নির্ভর ভাবজড়তা আর ইসলামকে অস্বীকার করেছিলেন – ইসলামের কিছু কেন্দ্রীয় মতবাদ যেমন হজ্জ্ব, মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে তিনি সমালোচনা করেছিলেন। তার শ্লেষাত্মক মন্তব্য অন্যান্য ধর্মগুলোকেও রেহাই দেয়নি। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলতেন, কঠোরভাবে নিরামিশাষী ছিলেন, কারণ জবাই করে হত্যা করা কোন মাংস তিনি খাদ্য হিসাবে গ্রহন করতে অস্বীকার করেছিলেন। নৈরাশ্যবাদী হিসাবে তাকে যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছিল, সেটি হলো তার অ্যান্টি-ন্যাটালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গী, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার জন্য কোনো শিশুরই জন্ম দেয়া অন্যায়। তার তিনটি প্রকাশনা খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল তার সময়েই “The Tinder Spark”, “Unnecessary Necessity”, এবং “The Epistle of Forgiveness”;

Continue reading “মৃত্যুর আয়নায় জীবনের নক্ষত্র”

মৃত্যুর আয়নায় জীবনের নক্ষত্র

বাস্তবতার জাদু : প্রথম অধ্যায়

13220876_266553483732879_5795876853880578261_n

[ ভূমিকা : ২০১১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রিচার্ড ডকিন্স, শিল্পী ডেভ ম্যাককিনের অলঙ্করণসহ প্রকাশ করেছিলেন The Magic of Reality: How We Know What’s Really True; বইটি মূলত কিশোর আর অল্প বয়সী তরুণদের জন্য লেখা। বইটির হৃদয়স্পর্শী একটি অংশ হলো বইটি তিনি তার প্রিয় বাবা Clinton John Dawkins কে উৎসর্গ করেছিলেন। কৃষিবিজ্ঞানী বাবাই তার মনে প্রকৃতি আর বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার বীজটি বপন করেছিলেন পূর্ব আফ্রিকায় কাটানো তার শৈশবে। প্রাচীন মিসরীয়রা ভাবতো দেবী নুট (বা নিউথ) রোজ রাতে যখন সূর্যকে গিলে ফেলে তখন রাত হয়। ভাইকিংরা রঙধনুকে মনে করতো দেবতাদের বানানো সেতু যা দিয়ে তারা পৃথিবীতে নেমে আসে। এইসব কিছুতেই জাদুময়তা আছে, অপার্থিব বিস্ময়কর সব কাহিনী। কিন্তু আরো এক ধরনের জাদু আছে, আর সেই জাদুটি থাকে এই সব প্রশ্নগুলোর সত্যিকারের উত্তর আবিষ্কার করার আনন্দের মধ্যে। আর এটাই হচ্ছে বাস্তবতার জাদু – বিজ্ঞান। – কাজী মাহবুব হাসান ( পোষ্টে ব্যবহৃত অলঙ্করণগুলো মূল বই থেকে সংগ্রহ করা, যার শিল্পী ডেভ ম্যাককিন)]

রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় 

বাস্তবতা কি ? জাদু কি ?

বাস্তবতা হচ্ছে সেই সবকিছু যার অস্তিত্ব আছে। বেশ সহজবোধ্য মনে হয় কথাটি, তাই না? আসলে বিষয়টি এত সহজবোধ্য নয়। বেশ কিছু সমস্যা আছে। ডায়নোসরদের ব্যাপারটি তাহলে কি, তাদের একসময় অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর তো তাদের অস্তিত্ব নেই? আর নক্ষত্রগুলো, এত দূরে যাদের অবস্থান যে, যখন তাদের আলো আমাদের কাছে এসে পৌছায়, আর আমরা তাদের দেখতে পারি, তখন তাদের হয়তো আর কোনো অস্তিত্বই নেই ?

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ডায়নোসর আর নক্ষত্রদের নিয়ে আলোচনা করবো। কিন্তু যাই হোক না কেন, কিভাবে আমরা জানি যে, কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে, এমনকি বর্তমানেও? বেশ, আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় – দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্পর্শ, শ্রবণ আর স্বাদ – তারা বেশ ভালোই দ্বায়িত্ব পালন করে বহু জিনিসের বাস্তব অস্তিত্ব আমাদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে: যেমন, কোনো পাথরের টুকরো কিংবা উট, নতুন কাটা ঘাস আর কেবলমাত্র বানানো কফি, শিরিস কাগজ আর মখমল, জলপ্রপাত এবং দরজার ঘন্টি, চিনি এবং লবন। কিন্তু আমরা কি শুধুমাত্র এমন কিছুকেই ‘বাস্তব’ বলবো, যদি সেগুলোকে আমরা আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের যে কোনো একটি দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে শনাক্ত করতে পারি?

তাহলে দূরের ছায়াপথগুলোর ক্ষেত্রে কি হবে, খালি চোখে দেখার মত দূরত্বে যারা অবস্থান করে না? একটি ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেই বা কি হবে, যা এতই ক্ষুদ্র যে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া যাদের দেখাই সম্ভব নয়? তাহলে আমাদের কি অবশ্যই বলতে হবে যে, তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই কারণ আমরা তাদের দেখতে পাইনা? না, অবশ্যই আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে শক্তিশালী করতে পারি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে: ছায়াপথ দেখার জন্য দূরবীক্ষণ যন্ত্র আর ব্যাকটেরিয়া দেখার অণুবীক্ষণ যন্ত্র। যেহেতু আমরা জানি ও বুঝি দূরবীক্ষণ যন্ত্র আর অণুবীক্ষণ যন্ত্র কিভাবে কাজ করে, আমরা তাদের ব্যবহার করতে পারি আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সীমানা বৃদ্ধি করতে – এই ক্ষেত্রে – আমাদের দৃষ্টিশক্তি – এবং সেগুলো যা দেখতে আমাদের সক্ষম করে তোলে, তা ছায়াপথ আর ব্যকটেরিয়ার অস্তিত্ব আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

Continue reading “বাস্তবতার জাদু : প্রথম অধ্যায়”

বাস্তবতার জাদু : প্রথম অধ্যায়