দর্শনের সহজ পাঠ – ৩৮ : জন রলজ

130723123817-john-rawls-horizontal-large-gallery-1(ছবি:John Bordley Rawls, February 21, 1921 – November 24, 2002)

অজ্ঞতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার

হতে পারে আপনি হয়তো বিত্তবান কেউ, হয়তো আপনি অতি-ধনী বা যাদের বলা হয় সুপার-রিচ। কিন্তু আমরা বেশীর ভাগ মানুষই তা নই, আর কিছু মানুষ খুবই দরিদ্র। এতই দরিদ্র যে তারা তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনের বেশীর ভাগ অংশই কাটায় অনাহার, ক্ষুধা আর অসুখে আক্রান্ত হয়ে। স্পষ্টতই যা মনে হয় না ন্যায়বিচার অথবা নৈতিকভাবে সঠিক কোনো কাজ, আর অবশ্যই সেটি তা নয়। পৃথিবীতে যদি আসলেই সত্যিকারের ন্যায়বিচার থাকতো,  তাহলে কোনো শিশুরই অভুক্ত থাকতো না যখন কিনা কিছু মানুষের এত বেশী পরিমান বিত্ত আছে যে তারা জানেই না সেটি দিয়ে তারা কি করবেন। অসুস্থ্য হলে সবারই ভালো চিকিৎসা সেবার পাবার অধিকার আছে।  যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যের দরিদ্রদের চেয়ে আফ্রিকার দরিদ্ররা এত বেশী খারাপ অবস্থায় থাকতো না। পশ্চিমের ধনীরা বহু হাজার গুণ ধনী হতেন না সেই সব মানুষদের তুলনায়, যারা নিজেদের কোনো দোষ ছাড়াই জন্ম নিয়েছেন নানা প্রতিবন্ধকতা আর অসুবিধার মধ্যে। ন্যায়বিচার হচ্ছে সব মানুষের সাথে পক্ষপাতহীনভাবে আচরণ করা। আমাদের চারপাশে বহু মানুষ আছে, যাদের জীবন পরিপূর্ণ নানা ভালো জিনিস দিয়ে, আর অন্যরাও আছে, যাদের জীবন, তাদের নিজেদের কোনো অপরাধের কারণে নয়, খুব সামান্যই যাদের সুযোগ থাকে বেছে নেবার জন্য, কিভাবে তারা বাঁচবেন সেই সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে : যে কাজ তারা করেন তারা সেই কাজ নিজেরা বাছাই করতে পারেন না, অথবা এমনকি সেই শহরটিও না, যেখানে তারা বসবাস করেন। কিছু মানুষ যারা এই অসমতা নিয়ে ভাবেন তারা হয়তো শুধু বলেন, ‘বেশ, জীবন তো এরকরমই, এটি ন্যায়বিচার করেনা’ এবং তারা কাঝ ঝাকান। এরা সাধারণত সেই সব মানুষগুলো যারা বিশেষভাবে ভাগ্যবান, অন্যরা অবশ্য তাদের সময় ব্যয় করেন ভাবতে কিভাবে সমাজকে আরো ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব এবং হয়তো চেষ্টাও করেন এটিকে আরো ন্যায়বিচারপূর্ণ করে তোলার জন্য।

জন রলজ ( ১৯২১-২০০২), ছিলেন তেমনই একজন নম্র, ভদ্র হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি একটি বই লিখেছিলেন, যা এইসব বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের ভাবনাগুলো আমূল বদলে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সেই বইটির নাম A Theory of Justice এবং এটি তাঁর দীর্ঘ বিশ বছরের গভীর ভাবনার ফসল।  সত্যিকারভাবে বইটি আসলেই অধ্যাপকদের বই, যা লেখা হয়েছিল অধ্যাপকদের জন্য, খানিকটা শুষ্ক পাঠ্যপুস্তক শৈলীতে। তবে এই ধরনের অন্য বইগুলোর ব্যতিক্রম, যদিও, এটি লাইব্রেরীর তাকে অবহেলায় ধুলো সংগ্রহ করেনি – বরং এটি বহুল পঠিত, বহু বিক্রীত বই হিসাবে খ্যাতি পেয়েছিল। এবং একটি উপায়ে এটি এত বেশী অসাধারণ যে বহু মানুষই বইটি পড়েছেন আর ভেবেছেন, আর এর মূল ধারণাগুলো এত বেশী কৌতুহলোদ্দীপক যে খুব শীঘ্রই বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী বইগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি সেরা বই হিসাবে সেটি বিবেচিত হতে শুরু করে, যার পাঠক ছিলেন দার্শনিক, আইনজীবি, রাজনীতিবিদ এবং বহু মানুষ – এমন কিছু রলজ নিজেই কখনো কল্পনা করেননি সম্ভব হতে পারে।

রলজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ছিলেন ১৯৪৫ সালে ৬ আগষ্ট, যখন জাপানের হিরোশিমা শহরে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং বিশ্বাস করেছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা ভুল ছিল। সেই সময়ে অনেকের মত যারা সেই সময় বেঁচেছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন একটি আরো ভালো পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য, একটি উত্তম সমাজ। কিন্ত পরিবর্তন আনার জন্য তাঁর বাছাইকৃত পথটি ছিল চিন্তা ও লেখার মাধ্যমে কিছু করা, কোনো রাজনৈতিক দল বা আন্দোলন নয়। যখন তিনি এ থিওরি অব জাস্টিস লিখছিলেন, তখন ভিয়েতনামে যুদ্ধ হচ্ছে, সারা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে তখন যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ মিছিল। তাদের প্রত্যেকটি শান্তিপূর্ণ ছিল না। রলজ সেই মুহূর্তের সমস্যাগুলো না নিয়ে, বরং আরো বিমূর্ত ন্যায় বিচার সংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নগুলো নিয়ে লিখতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার কাজের কেন্দ্রে ছিল সেই ধারণাটি যে, আমাদের স্পষ্ট করে ভাবতে হবে কিভাবে আমরা একসাথে বাস করবো সেই বিষয় নিয়ে, আমাদের জীবনে রাষ্ট্রে প্রভাব ফেলার উপায়গুলো। কারণ আমাদের অস্তিত্ব সহনযোগ্য করতে হলে আমাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন, কিন্তু কিভাবে?

কল্পনা করুন আপনাকে একটি নতুন আরো বেশী উত্তম কোনো সমাজ পরিকল্পনা করতে হবে। একটি প্রশ্ন হয়তো আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, কে কি পাবে? যদি আপনি কোনো সুন্দর প্রাসাদে বাস করেন, যেখানে বাসার মধ্যেই সুইমিং পুল আছে, গৃহভৃত্য আছে এবং ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ আছে, যা আপনি চাওয়া মাত্র কোনো ক্রান্তীয় দ্বীপে আপনাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে, আপনি হয়তো এমন কোনো পৃথিবীকে কল্পনা করতে পারেন যেখানে কিছু মানুষ খুবই বিত্তশালী – হয়তো তারা যারা সবচেয়ে পরিশ্রম করে, অন্যরা অনেক দরিদ্র। আর আপনি যদি এখন দরিদ্র পরিবেশে বাস করেন, আপনি হয়তো এমন একটি সমাজ পরিকল্পনা করবেন যেখানে কারোরই অতিমাত্রায় ধনী হবার সুযোগ নেই, যেখানে সবারই সমান ভাগ থাকবে যা কিছু আছে সম্পদ হিসাবে। কোনো ব্যক্তিগত প্লেন থাকার সুযোগ নেই সেখানে, বরং দূর্ভাগা মানুষদের জন্য ভালো একটি সুযোগ। মানুষের প্রকৃতি এরকমই : মানুষ সাধারণত নিজেদের অবস্থানের কথা ভাবে যখন তারা একটি উত্তম পৃথিবীর বিবরণ দেয়, তারা সেটি অনুধাবন করুক বা না করুক। এই পূর্বসংস্কার আর পক্ষপাতগুলো রাজনৈতিক চিন্তাকেও বিকৃত করে।

রলজ এর প্রতিভার সুস্পষ্ট প্রকাশ ছিল একটি চিন্তার পরীক্ষা উদ্ভাবন – তিনি যার নাম দিয়েছিলেন The Original Position, সেটি কিছু স্বার্থপর পক্ষপাতকে দমিয়ে রাখে যা আমাদের সবার মধ্যে বিদ্যমান। তার মূল ধারণাটি ছিল খুব সরল: একটি উত্তম সমাজ পরিকল্পনা করা, কিন্তু সেটি করতে হবে না জেনেই, যে সেই সমাজে আপনি কোনো অবস্থানটি পূর্ণ করবেন বা আপনার অবস্থানটি কোথায় হবে। আপনি জানেন না যে আপনি কি ধনী হবেন, না দরিদ্র, আপনার কি কোনো শারিরীক সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধীতা থাকবে, কিংবা সুদর্শন হবেন;  পুরুষ, নারী, কুৎসিৎ, বুদ্ধিমান অথবা বোকা, প্রতিভাবান, দক্ষ অথবা অদক্ষ, সমকামী, উভকামী অথবা বিষমকামী ইত্যাদি নানা অবস্থান। তিনি মনে করেন আপনি আরো পক্ষপাতহীন মূলনীতি বাছাই করবেন এই কাল্পনিক veil of ignorance বা অজ্ঞতার পর্দার পেছনে দাড়িয়ে, কারণ আপনি জানেন না আপনার নিজের অবস্থান কোথায় হবে, কি ধরনের মানুষ আপনি হবেন সেই সমাজে। নির্বাচন করার এই সরল কৌশল যেখানে আপনার নিজের অবস্থান কি হবে সেটি জানা থাকবে না,  তার উপর ভিত্তি করে রলজ তার ন্যায়বিচারের তত্ত্বটি গড়ে তোলেন। আর সেটি দুটি মূলনিতির উপর দাড়িয়ে, যেগুলোকে তিনি মনে করেন সব যুক্তিসংঙ্গত মানুষ গ্রহন করে নেবে:  স্বাধীনতা ও সাম্যতার মূলনীতি।

প্রথম মূলনীতিটি হচ্ছে লিবার্টি প্রিন্সিপাল । এটি দাবী করছে সবারই মৌলিক কিছু স্বাধীনতা থাকতে হবে এবং যা অবশ্যই কেড়ে নেয়া যাবে না, যেমন, বিশ্বাসের স্বাধীনতা, তাদের নেতা নির্বাচনে ভোট দেবার স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের ব্যপক স্বাধীনতা। এমনকি যখন এইসব কিছু স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করলে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানষের জীবন উন্নত হয়, রলজ মনে করতেন, এটি এত বেশী গুরুত্বপূর্ণ যে এই স্বাধীনতাকে সুরক্ষা করা উচিৎ। সব উদারনীতিবাদীদের মতই রলজ এইসব মৌলিক স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন অনেক বেশী, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে প্রত্যেকেরই এই অধিকার থাকা উচিৎ, কারোই সেটি কেড়ে নেয়া উচিৎ না।

রলজ এর দ্বিতীয় মূলনীতি, দ্য ডিফারেন্স প্রিন্সিপাল, মূলত সাম্যতা বিষয়ক। সমাজকে এমনভাবে সংগঠিত করতে হবে যেন সেটি আরো সমপরিমান সম্পদ আর সুযোগ দেয় তাদেরকে যারা সবচেয়ে বেশী সুযোগ বঞ্চিত। যদি মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পরিমান অর্থ পায়, তাহলে সেই অসাম্যতাকে কেবল তখনই অনুমতি দেয়া যায় যদি এটি সরাসরি যারা খারাপ আছে তাদেরকে সাহায্য করে। সর্বনিম্ন বেতন পায় এমন কোনো শ্রমিকের চেয়ে কোনো একজন ব্যাঙ্কার ১০,০০০ গুণ বেশী বেতন পেতে পারেন  শুধুমাত্র তখনই যদি সেই সবচেয়ে কম বেতন পাওয়া শ্রমিক সরাসরি উপকৃত হয়, এবং বেশী পরিমান অর্থ পায় তার পক্ষে কখনো যা আয় করা সম্ভব হতো না যদি ব্যাঙ্কারকে এর চেয়ে কম দেয়া হতো। যদি রলজ দ্বায়িত্বে থাকতেন, তাহলে কারোরই আর অস্বাভাবিক মাত্রার বোনাস পাওয়া লাগতো না, যদি না সবচেয়ে দরিদ্রতমরা সেই পরিণতিতে বেশী টাকা না পেতেন। রলজ মনে করতে এমনই একটি পৃথিবী কোনো যুক্তিসঙ্গত মানুষের বেছে নেবার কথা, যদি তারা না জানেন তারা নিজেরা কি ধনী না গরীব হবে। রলজ এর আগে, দার্শনিক আর রাজনীতিবিদরা, যারা ভাবতেন কার কি পাওয়া উচিৎ, তারা প্রায়শই এমন কোনো পরিস্থিতির সমর্থন করেছেন যা সর্ব্বোচ্চ গড়পড়তা সম্পদ উৎপাদন করে। এর মানে হতে পারে যে, কিছু মানুষ সুপার রিচ হতে পারে, বহু মাঝারী ধনী হবে এবং অল্প কিছু খুব গরীব হতে পারে। কিন্তু রলজ মনে করতেন, এই পরিস্থিতি আরো খারাপ সেই পরিস্থিতির চেয়ে যেখানে কোনো সুপার রিচ নেই, কিন্তু সবাই অপেক্ষাকৃত কম বেশী সমান ভাগ আছে, যদিও গড় সম্পদের পরিমান অপেক্ষাকৃত কম।

এটা বেশ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া একটি ধারণা, বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা পৃথিবী যেভাবে আছে সেখানে অনেক ব্শেী বেতন আয় করতে পারেন। রবার্ট নজিক (১৯৩৮-২০০২), আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন রাজনৈতিক দার্শনিক, রলজ এর চেয়ে বেশী ডানপন্হী ছিলেন যিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। নিশ্চয়ই কোনো একজন ভক্ত যিনি খুব ভালো একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড়কে দেখতে আসেন, টিকিটের মূল্য থেকে একটি অংশ সেই খেলোয়াড়কে দান করার স্বাধীনতা থাকা উচিৎ। এভাবে তাদের নিজেদের টাকা খরচ করার অধিকার তাদের আছে। আর যদি মিলিয়ন সংখ্যক দর্শক তাকে দেখতে আসেন, তবে নজিক মনে করতেন ,সেই খেলোয়াড় মিলিয়ন ডলারই আয় করবে ন্যায় সঙ্গতভাবে। রলজ পুরোপুরিভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ছিলেন। এই ধরনের কোনো সমঝোতার কারণে যতক্ষণ না গরিবরা আরো বেশী ধনী হবে, রলজ যুক্তি দেন, তাহলে বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত আয়কে এত উচ্চ মাত্রায় বাড়তে দেয়ার অনুমতি দেয়া উচিৎ না। বিতর্কিতভাবে, রলজ বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিভাবান কোনো ক্রীড়াবিদ বা খুবই বুদ্ধিমান কোনো মানুষ হওয়া মানে এই না যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের অনেক বেশী টাকা আয় করার অধিকার আছে। আংশিকভাবে এর কারণ ছিল, তিনি বিশ্বাস করতে এই দক্ষতা আর যোগ্যতাগুলো শুধুমাত্র ভাগ্যের ব্যপার। শুধুমাত্র আপনি বেশী কিছু পাবার যোগ্যতা রাখেন না কারণ আপনি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে দ্রুত দৌড়াতে পারেন বা খুব ভালো বল খেলতে পারেন। অথবা আপনি খুবই মেধাবী। খেলোয়াড়ী বা বুদ্ধিমত্তার প্রতিভা হচ্ছে প্রাকৃতিক লটারীতে জেতার পরিণতি মাত্র। বহু মানুষ অবশ্যে দৃঢ়ভাবেই দ্বিমত পোষণ করবেন রলজ এর সাথে এবং  তারা মনে করেন যে এমন কিছু শ্রেষ্ঠত্বকে বিশেষভাবে পুরষ্কৃত করা উচিৎ। কিন্তু রলজ ভাবতেন কোনো কিছু খুব ভালো হওয়া আর আরো বেশী প্রারিশ্রমিক পাবার দাবীর মধ্যে কোনো বাধ্যতামূলক স্বয়ংক্রিয় যোগসূত্রতা নেই।

কিন্তু কি হতে পারে যদি অজ্ঞতার সেই পর্দার পেছনে দাড়িয়ে কিছু মানুষ কেউ বাজী রাখা শ্রেয়তর মনে করেন? কি হতে পারে যদি সেই মানুষগুলো ভাবেন জীবন এমন একটি লটারী এবং তারা নিশ্চিৎ করতে চান সমাজে বেশ কিছু সমাজে আকর্ষণীয় কিছু পদ থাকবে সেগুলো যেন দখল করা যেতে পারে? জুয়াড়ীরা স্পষ্টতই সেই ঝুকিও নিচ্ছে যে তারা সমাজে দরিদ্র অবস্থানটিও পেতে পারেন, যদি তাদের একটি সুযোগ থাকে অত্যন্ত ধনী হবারও। সুতরাং তারা এমন একটি পৃথিবী চাইবেন যেখানে বৈচিত্রময় ব্যপ্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকবে, রলজ যেমন চাইছেন তারচেয়েও বেশী। রলজ বিশ্বাস করতেন যে যুক্তিসঙ্গত মানুষ তাদের জীবন নিয়ে বাজি খেলতে চায়না এভাবে। হয়তো তার এই ধারণাটি ভুল ছিল।

আমরা অনেকেই অনুভব করি যে আমাদের সমাজ খানিকটা, অথবা এমনকি পুরোটাই, অন্যায়ভাবেই পুক্ষপাতদুষ্ট। কিন্তু আমাদের বেশ কষ্টকর হয়ে যায় যখন আমরা আমাদের সেই অবিচারের ধারণাটিকে ক্ষমতাবানদের কাছে এমন কোনো উপায়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যা শুনলে যৌক্তিক মনে হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত তিক্ততা বা ঘৃণা নেই। সেজন্যই আমাদের জন রলজকে দরকার, বিংশ শতাব্দীর এই মার্কিন দার্শনিক আমাদের একটি চমৎকার আটসাট মডেল দিয়েছিলেন সেগুলো শনাক্ত করার জন্য যা আসলেই অনায্য হতে পারে। এবং কিভাবে আমরা আমাদের পক্ষে সমর্থন যোগাড় করতে পারি সেগুলো সমাধান করার জন্য । ১৯২১ সালে বাল্টিমোরে জন্ম নেয়া – রলজ- ডাক নাম জ্যাক, খুব অল্পবয়স থেকে আধুনিক পৃথিবীর অন্যায় আর অবিচারগুলো দেখেছিলেন ও প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছিলেন। শৈশবে তিনি দেখেছিলেন কিভাবে মেইনে, দরিদ্র অঞ্চলে তার স্বদেশী আমেরিকাবাসীরা স্পষ্টতই কিভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সেই সব সুযোগ থেকে যে সুযোগ তার আইনজীবি বাবা আর সমাজকর্মী মা তাকে দিয়েছিল । রলজ একই সাথে যন্ত্রণার বা কষ্টের সেই স্বেচ্ছাচারী অযৌক্তিতায় অভিজ্ঞ হয়েছিলেন যখন তার দুই ভাই সংক্রমনে মারা যায়, যে অসুখ তাদের সংক্রমিত করেছিলেন তার কাছে থেকেই, তার নিজের অজান্তে । এটিও যদি যথেষ্ট না হয়ে থাকে, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছিলেন তিনি সৈন্য হিসাবে, বিশেষ করে মিত্র বাহিনীর ইউরোপীয় ক্যামপেইনে দ্বিতীয় পর্যায়ে। এই সব কিছুই তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন একটি আদৌ রহস্যময় না এমন মিশন নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার পেশাগত জীবন গড়ে ‍তুলতে: তিনি চেয়েছিলেন চিন্তা আর ধারণার শক্তি ব্যবহার করে যে অন্যায় পৃথিবীতে তিনি বাস করেন সেটি পরিবর্তন করতে। হার্ভার্ড আর কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় পড়া মেধাবী রলজ তার সময়ের একজন বাস্তবমুখি দার্শনিকে রুপান্তরিত হন, ইসাইয়া বার্লিন, এইচ এল এ হার্ট ও স্টুয়ার্ট হ্যাম্পশায়ার সহ তারা পৃথিবীকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন তাদের কাজ দিয়ে (তারা পরস্পরের বন্ধুতেও পরিণত হন)। ১৯৭১ সালে এ থিওরী অব জাস্টিস প্রকাশিত হবার পর রলজ মূলত সুপরিচিত হয়ে ওঠেন, আর তিনি সেকারণে এখনও শ্রদ্ধেয়। ব্যক্তিগতভাবে সফলতা কখনো প্রভাবিত করেনি রলজকে। তিনি খুব বিনয়ী আর দয়ালু মানুষ ছিলেন, তিনি অন্যদের ভাবনাগুলোকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দুটি স্তরেই গুরুত্বের সাথে গ্রহন করেছিলেন। বোস্টনে তরুণ ও শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন। আধুনিক বিশ্বের ন্যায় বিচার সম্বন্ধে তিনি কি ভাবতেন :

১ সবকিছু এখন যেভাবে আছে সেটি পুরোপুরি অনায্য

সব পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দিচ্ছে সমাজে কাঠামোগত অবিচার আছে। আয়ুষ্কাল ও আয়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান আমাদের একটি অনস্বীকারর্য নীতিকথার দিকে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু তারপরও দিনের পর দিন, আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে এই অনায্যতাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহন করার জন্য, বিশেষ করে আমাদের নিজেদের জীবনের সংশ্লিষ্টতায়। এর কারণ শত কন্ঠ আমাদের সারাক্ষণই বলছে যে, আমরা যদি কাজ করি ও আমাদের উচ্চাকাঙ্খা থাকে, আমরা অবশ্যই পারবো। রলজ খুব ভালো করেই জানতেন যে কিভাবে আমেরিকান ড্রিম রাজনৈতিক পদ্ধতি আর কাঠামো থেকে প্রবেশ করেছি প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। এবং তিনি জানতেন যে এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলো। নিশ্চয়ই, বহু মানুষ আছে তারা এই নিখুত এই নীতিবাক্যের কাহিনীর উদহারণ হতে পারে, যেমন নিঃস্ব থেকে প্রেসিডেন্ট, ধনকুবের কোনো বড় ব্যবসায়ী যারা দরিদ্র অনাথ ছিলেন। আনন্দের সাথে গণমাধ্যমগুলো তাদের আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। তাহলে কেন আমরা আমাদের ভাগ্য নিয়ে অভিযোগ করতে পারি যখন তারা উন্নতির শিখরে উঠতে পেরেছে? রলজ বিষয়টি কখনোই মেনে নেননি। নিশ্চয় তিনি জানতেন অসাধারণ কিছু সফলতার গল্প, কিন্তু তিনি একজন পরিসংখ্যানবিদও ছিলেন, যিনি জানতেন কপর্দকশূন্য থেকে ধনী হবার কাহিনী সার্বিকভাবে এতটাই পরিসংখ্যানগতভাবে তুচ্ছ যে এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ প্রত্যাশা করেনা রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের। আসলেই, তাদের কথা বলা অব্যহত রাখা হচ্ছে শুধুমাত্র একটি ধূর্ত রাজনৈতিক চাল তার পরিকল্পনা করা হয়েছে যে ক্ষমতাবানতে সমাজকে সংস্কার করার প্রয়োজনীয় দ্বায়িত্ব নিতে না হয়। যেমন রল আমাদের জোর করে মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অনেক অংশেও, যদি আপনি দরিদ্র হয়ে জন্মগ্রহন করেন, আপনার দরিদ্র থাকার সম্ভাবনা ( এবং অল্প বয়সে মারা যাবার) অনেক বেশী আর তর্কাতীত। কিন্তু আমরা কি করতে পারি এই পরিস্থিতিতে? রলজ রাজনীতি সচেতন ছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অনায্যতার নিয়ে বিতর্কগুলো, এবং কি করা উচিৎ এমন প্রশ্নগুলো জটিলতা আর তুচ্ছ দ্বন্দে বছরের পর বছর থমকে থাকে, কোনো কিছুই করা হয়না। সুতরাং রলজ যা করতে চাচ্ছিলেন, সেটি খুব সরল, অর্থনৈতিকভাবে ও বিবাদকুশলতার মাধ্যমে মানুষকে দেখানো কিভাবে তাদের সমাজগুলো অনায্য এবং তারা কি করতে পারে। এমন ভাবে যা কোনো বিতর্কের সমাপ্তি করতে পারে মানুষের হৃদয় আর মনকে স্পর্শ করে ( কারণ তিনি জানতের রাজনীতিতে আবেগের জায়গা আছে)।

২ কল্পনা করুন আপনি যদি আপনি না হন

কেন সমাজগুলো নায্য হয়ে ওঠে না তার বড় একটি কারণ হচ্ছে বর্তমানের অবিচারের কারণে যারা সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তাদের সেই প্রয়োজনীয়তা নেই এই বিষয়টি গভীরভাবে ভাবা যে, কেমন হতো যদি তাদের জন্ম ভিন্ন পরিস্থিতে হতো। সব পরিবর্তনের বিরোধীতাকে করেন তারা, তার কারণ তাদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত সংস্কার আর পক্ষপাতের জন্য। রলজ সহজাতভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, আগে এই মানুষগুলোকে বোঝাতে হবে, তাদের দলে আনতে হবে, তারপর তাদের কল্পনা ও তাদের জন্মগত নৈতিকতার কাছে কোনো না কোনোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। সুতরাং তিনি একটি রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি চিন্তার পরীক্ষা উদ্ভাবন করেন, যা অনায়াসে হবস,রুমো আর কান্টের সমতূল্য। এই পরীক্ষাটি the veil of ignorance, এর মাধ্যে রলজ আমাদের কল্পনা করতে আহবান জানান আমাদের নিজেদের জন্মের আগে সচেতন, বুদ্ধিমান সত্ত্বা হিসাবে, কিন্তু আমাদের জানা থাকবে না যে কোনো ধরনের পরিবেশ ও পরিস্থিতে আমরা জন্ম নিতে যাচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যৎ ঢাকা অজ্ঞতার পর্দা দিয়ে। এই গ্রহের বাইরে দাড়িয়ে, আমাদের জানা থাকবে না, কি ধরনের বাবা মা আমরা পাবো, আমাদের পরিবেশটি কেমন হবে, কিভাবে স্কুলগুলো কাজ করবে বা স্থানীয় হাসপাতালে আমরা কিভাবে চিকিৎসা পাবো, কিভাবে পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থা আমাদের সাথে আচরণ করতে পারে ইত্যাদি। যে প্রশ্নটি রলজ আমাদের ভাবতে বলেছিলেন সবাইকে, সেটি হচ্ছে: যদি আমাদের কিছুই জানা থাকে না আমরা কোথায় জন্ম নেবো, কোন পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠবো, তাহলে কোন ধরনের সমাজে প্রবেশ করা জন্য আমরা নিরাপদ বোধ করবো? কোন ধরনের রাজনৈতিক পদ্ধতির যুক্তিসঙ্গত আর সুস্থ্য হতে পারে আমাদের বাচার জন্য, আর অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে যে চ্যালেঞ্জটি আছে সেটির মোকাবেলা করার জন্য? বেশ, অন্তত একটা বিষয় স্পষ্ট, অবশ্যই আমেরিকা নয়। আমেরিকায় বহু আর্থসামাজিক পরিস্থিতি আছে যেখানে জন্ম নেয়া সুখকর হতে পারে, দেশে বহু অংশেই ভালো স্কুল আছে, নিরাপদ পরিবেশ আছে, কলেজে যাবার সুযোগ আছে, ভালো চাকরী পাবার উপায় আছে এবং কিছু চমৎকার অভিজাত কান্ট্রি ক্লাবও আছে। খুব বাড়িয়ে যদি বলা হয়, তাহলে এই চমৎকার আর বিশাল সুযোগ সুবিধা পায়। বিস্ময়ের কারণ নেই কেন এই পদ্ধতিটি বদলায় না, কারণ তাহলে অনেক বেশী মানুষ, বহু মিলিয়ন মানুষ, এর থেকে উপকার পেত। এখানে veil of ignorance কাজে আসে। এটি আমাদের চিন্তা করতে বাধা দেয় সেই সব মানুষ সম্বন্ধে যারা ভালো করেছে বরং আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেই ভয়াবহ ঝুকিটার দিকে যা সংশ্লিষ্ট তাহলো কোনো লটারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে প্রবেশ করা, অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে – না জেনেই কোথায় আপনার জন্ম হবে কোনো শিল্পপতির ঘরে, নাকি পিতৃহীন কোনো বস্তিবাসী মায়ের ঘরে। আসলেই কোনো সুস্থ্য জন্ম লটারীর লেখোয়াড় আছে যে সেই বাজী খেলবে ভালো স্বাস্থ্য সুবিধা, আবাসন, আইন সুবিধা, শিক্ষা ব্যবস্থা বঞ্চিত দরিদ্র মানুষের ঘরে? নাকি সেই সুস্থ্য জুয়াড়ী দাবী করবে পুরো খেলার নিয়ম বদলাতে, যা সব্বোচ্চ সুবিধা দেবে ভালো কোনো ফলাফলের জন্য যেকোনো একক খেলোয়াড়ের জন্য?

দ্য ভেইল অব ইগনোরেন্স এর একটি ভিডিও (বিবিসি রেডিও ফোর)

৩ আপনি যা জানেন সেটি বদলাতে হবে

রলজ এই প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছেন আমাদের হয়ে, সে কোনো সুস্থ্য খেলোয়াড় যারা এই অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে চিন্তার খেলাটি খেলবে, তারা এমন একটি সমাজ চাইবে যে কিছু জিনিস অপরিবর্তনীয় – তারা চাইবে সব স্কুলগুলো যেন খুব ভালো হয় ( এমনকি সরকারী স্কুলগুলো), হাসপাতাল যেন চমৎকারে সেবা দেয় ( সবগুলো এমনকি যেগুলো বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়), তারা সবাই এমন আইন কাঠামো চাইবে যা নিরপেক্ষ, সবার জন্য উপযুক্ত বাসস্থান হবে। এই অজ্ঞতার পর্দা সবাইকে বাধ্য করে মেনে নিয়ে যে দেশ তারা আসলেই চাইছে জন্ম নিতে সেই দেশটি হয়তো ডেনমার্ক বা সুইজারল্যাণ্ডের মত কোনো দেশ হবে, এর মানে এমন কোনো দেশ যেখানে আপনার যেখানেই জন্ম হোক না কেন আপনি খুব খারাপ কোনো পরিস্থিতিতে পড়বেন না। সেখানে যানবাহন ব্যবস্থা, স্কুল, হাসপাতাল এবং রাজনৈতিক পদ্ধতি থাকবে যেটি যথেষ্ট পরিমান ভালো, আপনি সমাজের উপর তলায় জন্ম নেন কিংবা নীচের তলায়। অন্যার্থে, আপনি জানেন কোন ধরনের সমাজে আপনি বাস করতে চান। কিন্তু সেই বিষয়টির উপর আপনি শুধু নজর দেননি এখন অবধি।

রলজ এর পরীক্ষা আমাদের সুযোগ করে যে নৈর্বাক্তিকভাবে ভাবতে, কিভাবে একটি নায্য সমাজ দেখতে হয় বিস্তারিতভাবে। যখন আমরা সিদ্ধান্ত নেবো আমদের সম্পদ বন্টনে, আমাদের নিজেদের পক্ষপাতিত্ব অতিক্রম করে আমাদরে নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, এই বিষয়টি নিয়ে আমি কিভাবে অনুভব করতে যদি আমি অজ্ঞতার পর্দার পেছন থেকে আটকে থাকি? আর নায্য উত্তরটি আবির্ভূত হবে সরাসরি যখন আমরা ভাববো কি আমদের দরকার যদি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে আমরা স্বাচ্ছন্দে থাকতে পারবো।

৪ এর পরে কি করতে হবে

অনেক কিছু নির্ভর করে আপনার সমাজের যা সমস্যা আছে তার উপর। এই অর্থে রলজ উপযোগিভাবে অন্ধ বিশ্বাসী ছিলেন না, তিনি শনাক্ত করেছিলেন যে অজ্ঞতার পর্দার পরীক্ষা ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসবে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে: কারো জন্য, অগ্রাধিকার হবে বায়ু দূষণ বন্ধ করা, অন্যদের জন্য, স্কুল পদ্ধতি। কিন্তু যখন তিন বিংশ শতাব্দী শেষাংশে যুক্তরাষ্ট্রের কথা ভাবছিলেন, রলজ দেখতে পাচ্ছিলেন কিছু স্পষ্ট বিষয় আছে যেখানে কিছু করা প্রয়োজন: শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাতারাতি উন্নত করতে হবে। নির্বাচনের জন্য ধনী যেমন সুযোগ পাবে দরিদ্রদেরও তেমন সুযোগ থাকা উচিৎ, সব পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মাণ উন্নয়ন করতে হবে। রলজ আমাদের সেই উপকরণটি দিয়েছেন যা দিয়ে আমরা আমাদের সমাজকে সমালোচনা করতে পারি চমৎকার একটি সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে। আমরা জানতে পারবো কখন অবশেষে আমাদের সমাজকে ন্যায়বিচারের সমাজ করতে পারেবো যখন আমরা সব সততার সাথে একটি কাল্পনিক অজ্ঞতা থেকে বলতে পারবো আমাদের জন্মের আগে, যখন আমরা আদৌ চিন্তিত হবো না আমাদের ভবিষ্যৎ পিতামাতার পরিস্থিতি যেমন হোক না কেন, বা কোনো পরিবেশে জন্ম হোক না কেন। আর এখন আমরা সেই চ্যালেঞ্জটা কোনোভাবেই মানতে পারবো ঠিক কতটা অনায্য হতে পারে, আর সে কারণে আমাদের আরো অনেক কিছু অর্জন করা বাকী আছে।

বিংশ শতাব্দীর বহু দার্শনিক অতীতের মহান দার্শনিকদের সাথে তাদের সংযোগটি হারিয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু  রলজ এর থিওরী অব জাস্টিস সেই শতাব্দীতে রাজনৈতিক দর্শন সম্বন্ধে লেখা হয়েছে অল্প কিছু বইয়ের একটি, যা অ্যারিস্টোটল,হবস,লক, রুশো, হিউম ও কান্টের সাথে একই নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। রলজ নিজে অবশ্যই খুবই বিনয়ী ছিলেন এই বিষয়টিতে একমত হবার জন্য। তার উদহারণ যদিও অনুপ্রাণিত করেছে নতুন প্রজন্মের দার্শনিকদের যারা আজও লিখছেন, যেমন মাইকেল সান্ডেল, থমাজ পজ, মার্থা নাসবম এবং উইল কিমলিকা, তারা সবাই বিশ্বাস করেন যে দর্শনের দ্বায়িত্ব গভীর আর কঠিন প্রশ্নগুলোর মোকাবেলা করা কিভাবে আমরা একসাথে বাস করতে করতে পারে, কিভাবে আমাদের সবার একসাথে বাস করা উচিৎ, আর আগের প্রজন্মের কিছু দার্শনিকদের ব্যতিক্রম যে তারা ভীত নন সেগুলো উত্তর দেবার জন্য এবং সামাজিক পরিবর্তন আনার জন্য। তারা বিশ্বাস করতেন দর্শনের উচিৎ আমরা কেমন ভাবে বাঁচবো সেটি পরিবর্তন করা, শুধুমাত্র আমরা আমরা কিভাবে বাঁচবো তা নিয়ে আলোচনাটিকে পরিবর্তন না করে।

Advertisements
দর্শনের সহজ পাঠ – ৩৮ : জন রলজ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s