দর্শনের সহজ পাঠ – ৩৯ : অ্যালান ট্যুরিং এবং জন সার্ল

5078571576_f484153d3f_b-jpg__800x600_q85_crop
(ছবি: Slate Statue of Alan Turing, Bletchley Park, Milton Keynes, Britain)

কম্পিউটার কি চিন্তা করতে পারে?

আপনি একটি ঘরের মধ্যে বসে আছেন, সেই ঘরটির দরজায় ভিতরে চিঠি ঢুকিয়ে দেবার জন্য একটি ছিদ্র আছে । আর  সেই ছিদ্র দিয়ে মাঝে মাঝে আঁকাবাঁকা অক্ষরের কিছু লেখা সহ কার্ড ভিতরে ঢুকে মেঝের উপর পড়ছে। আর আপনার কাজ হচ্ছে সেই আঁকাবাঁকা অক্ষরসহ কার্ডগুলোয় যে প্রতীক আছে সেটি ঘরের ভিতরে টেবিলের উপর রাখা একটি বইয়ের মধ্যে কোনো প্রতীকের সাথে জোড় করে মেলাতে হবে, মানে বইটির  মধ্যে আপনাকে প্রথম সেই আঁকাবাঁকা দাগটা আগে খুজে বের করতে হবে তারপর সেই প্রতীকটাকে খুঁজে দেখতে হবে এর সাথে যার জোড় বাধা আছে, তারপর ঘরে রাখা এক বাক্স কার্ড থেকে সেই কার্ডটা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে যার উপরে বইয়ের জোড় বাধা সেই প্রতীক চিহ্নটি আছে, তারপর সতর্কতার সাথে সেই কার্ডের টুকরোটিকে দরজার ছিদ্র দিয়ে আবার বাইরে ঠেলে দিতে হবে আপনাকে।

এটাই চাইনিজ রুম চিন্তার পরীক্ষা, এটি আবিষ্কার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক জন সার্লে ( জন্ম ১৯৩২)। এটি একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি যা পরিকল্পিত হয়েছিল দেখাতে যে, একটি কম্পিউটার আসলে চিন্তা করতে পারে না, এমনকি যদিও মনে হয় এটি চিন্তা করছে। আর এটা বোঝার জন্য আপনার প্রয়োজন আছে ট্যুরিং টেস্ট বোঝা।

অ্যালান ট্যুরিং (১৯১২-১৯৫৪) ছিলেন অসাধারণ এক গণিতজ্ঞ, যিনি সাহায্য করেছিলেন আধুনিক কম্পিউটার উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায়। সেই মেশিনটি তৈরী করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্লেচলি পার্কে, যা জার্মান সাবমেরিন কম্যাণ্ডারদের ব্যবহৃত এনিগমা কোড এর সাংকেতিক অর্থ খুজে বের করেছিল। এরপর মিত্রবাহিনীরা নানা বার্তা গোপনে আড়ি পেতে সংগ্রহ করতে শুরু করেছিল নাৎসিরা কি পরিকল্পনা করছে তার মর্মোদ্ধার করা জন্য।

শুধুমাত্র সাংকেতিক ভাষার মর্মোদ্ধার না, কম্পিউটার অনেক কিছু করবে এবং আসলে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ হবে এমন ধারণায় উৎসাহী হয়ে, ১৯৫০ সালে তিনি একটি টেস্ট প্রস্তাব করেন, যা এই ধরনের কম্পিউটারকে পাশ করতে হবে, যদি দাবী করা হয় কম্পিউটারটি বুদ্ধিমান। এটাই পরিচিত হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ট্যুরিং টেস্ট হিসাবে, কিন্তু মূলত তিনি এটির নাম দিয়েছিলেন Imitation Game; এর উৎস ছিল তার বিশ্বাস যে, আমাদের মগজের সবচেয়ে কৌতুহদ্দেীপক বৈশিষ্ট্য কিন্তু  ঠান্ডা পরিজের মত এর ঘণত্ব নয়, এর কাজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যদিও আমাদের মাথা থেকে এটি বের করে আনলে এটি কাঁপতে থাকে বা এর অদ্ভুত ধূসর রঙ সত্ত্বেও। গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারটি হচ্ছে এটি কিভাবে কাজ করে, কম্পিউটার আমাদের মস্তিষ্কের মত দেখতে না হলেও মস্তিষ্ক যা করে কম্পিউটারও সেটি করতে পারে।

কোনো মানুষ বুদ্ধিমান কিনা সেটি যখন আমরা বিচার করার চেষ্টা করি, আমরা কিছু প্রশ্নের উত্তর তারা কিভাবে দিচ্ছে সেটির উপর ভরসা করি, আমরা কিন্তু  তাদের মস্তিষ্ক খুলে দেখিনা কিভাবে তাদের মাথার নিউরোনগুলো সংযুক্ত আছে। সুতরাং নিরপেক্ষ হবে বিষয়টি যখন আমরা কম্পিউটারদের পরীক্ষা করার সময়েও কিভাবে তাদের তৈরী করা হয়েছে সেটি না দেখে, শুধু এর বাইরের প্রমাণটি দেখবো । আমাদের দেখা উচিৎ হবে ইনপুট আর আউটপুট, রক্ত কিংবা স্নায়ু বা তার কিংবা ভেতরের ট্রানজিস্টরগুলো নয়।

ট্যুরিং যা প্রস্তাব করেছিলেন সেটি হচ্ছে এমন: একজন পরীক্ষক থাকবেন একটি ঘরে বসে, তিনি একটি কম্পিউটার পর্দায় টাইপ করে কোনো কথপোকথন লিখবেন, সেই পরীক্ষক জানেন না তিনি কি অন্য ঘরে বসে থাকা কোনো মানুষের সাথে পর্দার মাধ্যমে কথা বলছেন, নাকি – কম্পিউটার তার উত্তর নিজে নিজেই তৈরী করছে তার প্রশ্নের বীপরিতে। এই কথোপকথনের সময় পরীক্ষক যদি নিজে বলতে না পারেন  কোনো ব্যক্তি বা মানুষ  তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে কিনা, সেই কম্পিউটার তাহলে ট্যুরিং টেস্ট পাশ করেছে। যদি কোনো কম্পিউটার সেই টেস্টটা পাশ করে তাহলে যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যাবে এটি বুদ্ধিমান, শুধুমাত্র রুপকার্থে না, যেভাবে কোনো মানুষ বুদ্ধিমান হয়ে থাকে।

maxresdefault
(ছবি: John Rogers Searle, American philosopher)

আর সার্লের চাইনিজ রুমে উদহারণটি যা বলছে – আঁকাবাঁকা দাগের প্রতীক সহ কার্ডে দৃশ্যটি – সেটি হচ্ছে দেখানো যে এমনকি যদিও কম্পিউটার ট্যুরিং টেস্ট পাশ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায়, সেটি কিন্তু প্রমাণ করবে না যে এটি আসলেই কি করছে সেটি বুঝতে পারছে। ভেবে দেখুন আপনি সেই ঘরে বসে, অদ্ভুত সব প্রতীক লেটার বক্সের মধ্যে দিয়ে ঘরের মধ্যে আসছে আর আপনি পরিচালিত হচ্ছেন একটি রুল বুক দ্বারা। আপনার জন্য এটি অর্থহীন কাজ এবং আপনার কোনো ধারণা নেই যে আপনি কি করছেন, কিন্তু কোনো কিছু অনুধাবন না করেই, আপনি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন চীনা ভাষায়। আপনি শুধু ইংরেজীতে কথা বলতে পারেন, এবং কোনো চীনা ভাষা আপনার জানা নেই। কিন্তু যে চিহ্নগুলো ভিতরে আসছে সেগুলো চীনা ভাষায় প্রশ্ন আর যে প্রতীক সহ কার্ডগুলো আপনি তাকে ফেরত দিচ্ছেন সেগুলো সেই প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য উত্তর। আপনি সহ এই চাইনীজ রুমটি ইমিটেশন গেমে জয় লাভ করবে। আপনি এমনভাবে উত্তর দিয়ে যাবেন যে, বাইরের লোকটিকে বোকা বানাবে এমন ভাবিয়ে যে আপনি আসলেই বুঝতে পারছেন আপনি কি বলছেন। সুতরাং এটি প্রস্তাব করছে একটি কম্পিউটার যা ট্যুরিং টেস্ট পাশ করে, সেটি আসলে বুদ্ধিমান নয়, কারণ রুমের ভিতর থেকে আপনার কোনো ধারণা নেই কি বিষয়ে কথা বা আলোচনা হচ্ছে।

সার্লে মনে করেন যে কম্পিউটার হচ্ছে এমন কেউ যে চাইনীজ রুমে বসে আসে: তাদের আসলে বুদ্ধিমত্তা নেই এবং তারা আসলে চিন্তা করতে পারে না। তারা যা করে, সেটি হলো নিয়ম মেনে প্রতীকগুলো মেলায়, যা তাদের নির্মাতারা তাদের মধ্যে প্রোগ্রাম করে দিয়েছেন। যে প্রক্রিয়া তারা ব্যবহার করে সেগুলো সফটওয়্যারের মধ্যে নির্দিষ্ট করা থাকে। কিন্তু সেটি খুবই ভিন্ন কোনো কিছু বোঝা অথবা সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা থাকার চেয়ে। অন্যভাবে বিষয়টি বলা যেতে পারে যে মানুষগুলো কম্পিউটার প্রোগ্রাম করে তারা একটিকে একটি সিনট্যাক্স দেয়: তার মানে তারা কিছু নিয়ম বেধে দেয় সঠিক কি অনুক্রমে প্রতীকগুলো প্রক্রিয়াজাত করতে হবে কিন্তু তারা কোনো সেমানটিকস তাদের দেয়না, অর্থাৎ তারা এই প্রতীকগুলোর অর্থ দেয় না। মানুষ যখন কথা বলে তারা কিছু বোঝাতে চায়, তার চিন্তাগুলো নানা ভাবে পৃথিবীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। কম্পিউটার যা মনে হয় কিছু বোঝাচ্ছে সেটি শুধুমাত্র মানব চিন্তাকে অনুকরণ করছে, কিছুটা কোনো তোতাপাখির মত। যদিও তোতাপাখি মানুষের কথা অনুকরণ করতে পারে, এটি কখনোই আসলে বুঝতে পারেনা শব্দগুলো দিয়ে কি বোঝাচ্ছে। একইভাবে, সার্লের মতে কম্পিউটারও আসলে বুঝতে পারে বা বা কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করতে পারেনা। আপনি সেমানটিকস পাবেন না শুধুমাত্র সিনট্যাক্স থেকে।

সার্লের এই চিন্তার পরীক্ষাটির একটি সমালোচনা ছিল যে এটি শুধুমাত্র সেই ঘরে বসে থাকা মানুষটি কি ঘটছে সেটি বুঝতে পারছে কিনা সেই প্রশ্নটির দিকে নজর দিয়েছে। কিন্তু এটি ভুল। মানুষটি পুরো সিস্টেমের একটি অংশ। এমনকি যদি সেই মানুষটি নাও বুঝতে পারে কি ঘটছে, হয়তো পুরো সিস্টেম ( যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ঘর,কোড বুক, প্রতীক ইত্যাদি) বিষয়টি বুঝতে পারছে। এই অভিযোগের উত্তরে সার্লে তার চিন্তার পরীক্ষাটা খানিকটা পরিবর্তন করেছিলেন। কোনো একটি ঘরে একটি ব্যক্তিকে কল্পনা করে, যে কিনা প্রতীকগুলো নাড়াচাড়া করছে, কল্পনা করুন এই মানুষটি পুরো নিয়মের বইটি মুখস্থ করেছে, এবং তারপর বাইরের একটি মাঠের মধ্যে দাড়িয়ে সঠিক প্রতীক সহ কার্ডটি হস্তান্তর করছে। তখনও এই ব্যক্তিটি বুঝবেনা প্রতিটি প্রশ্ন কি বোঝাচ্ছে, এমনকি যখন চীনা ভাষায় তাকে জিজ্ঞাসা করা প্রশ্নের সে সঠিক উত্তরটি দিচ্ছে। সুতরাং বোঝার ব্যপারটি তাই শুধুমাত্র সঠিক উত্তর দেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

যদিও কিছু দার্শনিক, বিশ্বাস করেন যে মানুষের মন হচ্ছে শুধুমাত্র একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের মত। তারা বিশ্বাস করেন যে কম্পিউটার সত্যি চিন্তা করতে পারে ও চিন্তা করে। যদি তারা সঠিক হয়ে থাকেন, তাহলে হয়তো একদিন মানুষের মস্তিষ্কগুলোকে কম্পিউটারে স্থানান্তর করা সম্ভব হতে পারে। যদি আপনার মন একটি প্রোগ্রাম হয়, তাহলে শুধুমাত্র আপনার মাথার খুলির মধ্যে থাকা আর্দ্র মগজে চলছে মানে এই না যে ভবিষ্যতে কোনো সময় এটি কোনো বিশাল চকচকে কম্পিউটারেও চলতে পারবে না। যদি, অতি-বুদ্ধিমান সুপার কম্পিউপটারের সহায়তায়, কেউ ম্যাপ করতে সক্ষম হয় হাজার কোটি সংযোগকে যা দিয়ে আপনার মন তৈরী, তাহলে হয়তো একদিন সম্ভব হবে মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকা। আপনার মনকে কোনো একটি কম্পিউপটারে আপলোড করা যেতে পারে যেন আপনার শরীরকে কবরে সমাহিত বা দাহ করার অনেক পরেও সেটি তার কাজ করা অব্যহত রাখতে পারে। কিন্তু সেটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আদৌ কোনো ভালো উপায় কিনা সেটি আরেকটি প্রশ্ন। যদিও সার্লে সঠিক , কোনো নিশ্চয়তা নেই যে এই আপলোড করা মন আপনি এখন ঠিক যেমন,ঠিক সেভাবে সচেতনতা ধারণ করবে, এমনকি যখন সেটি এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, যে দেখে মনে পারে সেটি সচেতন।

ষাট বছর আগে লেখার সময় ট্যুরিং অবশ্য বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন যে কম্পিউটার চিন্তা করতে পারবে। যদি তিনি সঠিক হয়ে থাকেন, খুব বেশী দিন সময় নেই আমরা তাদের দর্শন নিয়ে ভাবতে দেখবো। আমাদের মনকে মৃত্যুর পরও তারা বেঁচে থাকার সুযোগ দেবে এমন কিছু হবার চেয়ে বরং সেটি হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী। আমাদের কিভাবে বাঁচা উচিৎ বা বাস্তবতার প্রকৃতি সম্বন্ধে মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে হয়তো একদিন কম্পিউটারদের কৌতুহলোদ্দীপক কিছু বলার থাকবে, যে প্রশ্নগুলো নিয়ে দার্শনিকরা ভাবছেন কয়েক হাজার বছর ধরে। যদিও, সেটি হবার আগে, রক্ত মাংসের দার্শনিকদের উপর আমাদের নির্ভর করার প্রয়োজন আছে, যারা এই বিষয়গুলো সম্বন্ধে আমাদের চিন্তাগুলোকে জটমুক্ত করতে পারবেন।

Advertisements
দর্শনের সহজ পাঠ – ৩৯ : অ্যালান ট্যুরিং এবং জন সার্ল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s