কসের হিপোক্রাতিস

2017-02-18_21-38-13
(ছবি: গ্রীসে কস দ্বীপে হিপোক্রাতিস স্মারক ভাষ্কর্য)

এর পরে আপনি যখন কোনো চিকিৎসকের কাছে যাবেন, তাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখবেন তিনি কি তাদের গ্রাজুয়েশন অনুষ্ঠানে হিপোক্রাতিস এর ওথ বা প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন কিনা ( আমাদের দেশে সে রেওয়াজ নেই)। আধুনিক যুগের বহু মেডিকেল স্কুলে অবশ্য এই প্রতিজ্ঞা পাঠ করার আচারটির আর প্রচলন নেই,তবে এখনও কিছু স্কুলে সেটি টিকে আছে, এই প্রতিজ্ঞাটি লেখা হয়েছিল ২০০০ বছর আগে, এখনও এই শব্দগুলোর ভাবনা পুরোনো হয়ে যায়নি – আর কেনই বা সেটা হয়নি?

যদিও হিপোক্রাতিসের নাম জড়িয়ে আছে এই বিখ্যাত প্রতিজ্ঞাটির সাথে, তিনি সম্ভবত এটির লেখক নন। বাস্তবিকভাবেই তিনি মোটামুটি ৬০ টির মত ট্রিটিস ( কোন বিশেষ বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত বই) লিখেছিলেন, অন্তত এই ছোট বইগুলোর উপর তার নাম আমরা খুঁজে পাই। মানুষ হিপোক্রাতিস সম্বন্ধে আমাদের কাছে খুব বেশী তথ্য নেই। ধারণা করা হয় ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কস (Cos) নামের একটি দ্বীপে জন্মগ্রহন করেছিলেন, কস দ্বীপটি বর্তমান তুরস্ক থেকে খুব একটা দুরে নয়। চিকিৎসা ছিল তার পেশা এবং তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়াতেন ( হ্যা ..অর্থের বিনিময়ে) এবং সম্ভবত তাঁর দুটি ছেলে ও মেয়ের জামাই ছিলো চিকিৎসক। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসাবে চিকিৎসা পেশা বেশ পুরোনো স্পষ্টতই।

Hippocratic Corpus (corpus বেশ কিছু লেখার একটি সংকলন) আসলে একাধিক লেখকের দীর্ঘ সময়ব্যাপী লেখা (সম্ভবত ২৫০ বছর ধরে) ; করপাসে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ট্রিটিসগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বিতর্ক করেছে, এবং বহু বিষয় নিয়েই সেখানেই লেখা হয়েছে, কিভাবে রোগ শনাক্ত আর চিকিৎসা করতে হয় , কিভাবে ভাঙ্গা হাড়, স্থানচ্যুত অস্থিসন্ধি ঠিক করতে হয়, মহামারি কি, কিভাবে সুস্থ থাকতে হয়, কি খেতে হয়, কিভাবে স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে পরিবেশ ইত্যাদি নানা বিষয়। এই ট্রিটিসগুলোয় এমনও বিষয় ছিল যেমন, সেখানে ডাক্তারদের কিভাবে আচরণ করা উচিৎ সেই বিষয়ে পরামর্শ আছে, রোগীদের সাথে তো বটেই, অন্য চিকিৎসকদের সাথেও। মোটকথা হিপোক্রাতিস করপাসে মূলত সেই সময়ের চিকিৎসা পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই ছিল।

এর বিষয়ের ব্যপ্তি যেমন বিস্ময়কর তেমনি বিস্ময়কর এটি লেখার সময়কালও। হিপোক্রাতিস সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টোটলের আগে বেঁচে ছিলেন। এবং ছোট, বহু দূরে একটি দ্বীপ কস এ। এখনও বিস্ময়কর যে এত আগের লেখা এমন কিছু এখনও আদৌ টিকে আছে। তখন কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছিল না, পার্চমেন্ট, স্ক্রল, কাদামাটির প্লেট অথবা অন্য কোনো পরিতলের উপর হাতে প্রতিটি অক্ষর অনুলিপি করে লেখা হতো প্ররিশ্রম ও সময়সাধ্য একটি উপায়ে। তারপর এটি মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়তো। কালি হালকা হয়ে যাওয়া, যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া কিংবা আবহাওয়ার উপাদান বা পোকামাকড় এই সব কিছুই এর স্থায়ীত্ব কমিয়ে দিতো। সেই লেখাগুলোর অনুলিপি এখন যা অবশিষ্ট আছে সেগুলো অনুপিলি করেছে অনেক পরের প্রজন্মের আগ্রহী ব্যক্তিরা। যত বেশী অনুলিপি করা হয়, সম্ভাবনা থাকে সেই অনুলিপিগুলোর কিছু না কিছু অবশ্যই টিকে যায়।

হিপোক্রাতিস এর ট্রিটিসগুলো পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছিল। আর সে কারণেই হিপোক্রাতিস একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। প্রধাণত তিনটি মূল নীতি বহু শতাব্দী ধরেই চিকিৎসা পেশাকে পথ দেখিয়েছে। প্রথমটি এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি: সেটি হচ্ছে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে আমারা অসুস্থ হই প্রাকৃতিক কারণে যার যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু হিপোক্রাতিসের আগে গ্রীস এবং এর আশে পাশে মানুষের ধারণা ছিল অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুর কারণেই আমরা অসুস্থ হই। আমরা অসুস্থ হই কারণ কোনো দেবতাকে অপমান করলে অথবা কারো বিশেষ অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বলে আরোপিত যাদুকরী শাপের কারণে। এবং যদি ডাইনী, যাদুকর আর দেবতারাই অসুখের কারণ হয়, তাহলে চিকিৎসার ভারটাও পুরোহিত বা যাদুকরদের হাতে ছেড়ে দেয়াই তখন উত্তম মনে করা হতো। বহু মানুষ অবশ্য আজও তথাকথিত যাদুকরী চিকিৎসা গ্রহন করেন, সেই সব যাদুকরী আর বিশ্বাস নির্ভর চিকিৎসা এখনও আমাদের সাথে আছে।

হিপোক্রাতিস ও তাঁর অনুসারী কিন্তু এধরনের কোনো পুরোহিত চিকিৎসক ছিলেন না, তারা ছিলেন চিকিৎসক, তারা বিশ্বাস করতেন অসুখের কারণ প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক একটা ঘটনা। একটি ট্রিটিস On the Sacred Disease, খুব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছিল এই বিষয়টি।  হিপোক্রাতিস এর একটি ট্রিটিস On the Sacred Disease, খুব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছিল এই বিষয়টি। এই সংক্ষিপ্ত রচনাটির বিষয় এপিলেপসি বা মৃগী রোগ, আগে এবং এখনও রোগটির প্রাদুর্ভাব আছে। মনে করা হয় আলেক্সজান্ডার দ্য গ্রেট এবং জুলিয়াস সিজার দুজনেই এই রোগে ভুগেছিলেন। এপিলেপসিতে আক্রান্ত রোগীরা খিঁচুনীতে আক্রান্ত হন, যে সময় তারা জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং সাথে আরো কিছু উপসর্গ আছে। ধীরে ধীরে তাদের খিচুনী কমে আসলে তারা আবার তাদের শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। যার বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত তারা জানেন এই রোগের কারণ প্রাকৃতিক, যদি অসুবিধা সৃষ্টিকারী তবে স্বাভাবিক একটি পরিস্থিতি। কিন্তু আমরা যখন কাউকে খিচুনীতে আক্রান্ত হতে দেখি সেই দৃশ্যটা আমাদের ভীষন বিচলিত করে। এবং এটি এত বেশী নাটকীয় এবং রহস্যময় যে প্রাচীন গ্রীকরা মনে করতেন এই অসুখের কারণ স্বর্গীয়। সুতরাং তারা এটিকে পবিত্র অসুখ বলতেন।

তবে এই ট্রিটিজ এর লেখক স্পষ্টতই এমন ভাবতেন না। তাঁর বিখ্যাত সূচনা বাক্যটি সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিল: ‘আমি বিশ্বাস করি যে, পবিত্র অসুখটি আদৌ বেশী যেমন স্বর্গীয় না অথবা পবিত্রও না। বরং এর সুস্পষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন আছে, তেমনি সুনির্দিষ্ট কিছু কারণও আছে। যাই হোক, এটি যেহেতু সম্পুর্ন ভিন্ন অন্য অসুখগুলো থেকে, এটিকে গণ্য করা হয়েছে স্বর্গীয় কোন শক্তির প্রভাব হিসাবে সেই সব মানুষদের দ্বারা, যারা শুধুমাত্র মানুষ হবার কারণে, এটিকে দেখেছেন অজ্ঞতা আর বিস্ময়ের সাথে’। এপিলেপসির কারণ হিসাবে তার নিজের তত্ত্বটি ছিল – মস্তিষ্কে ফ্লেম (phlegm) বা শ্লেষা জমার কারণে এটা ঘটে। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বেশীরভাগ তত্ত্বের মত এটাও আরো যুক্তিযুক্ত তত্ত্ব দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে এর পরে এবং বর্তমানে আমার যেমন জানি কেন এটি হয়। কিন্তু ২০০০ বছর আগে তার সেই দৃঢ় প্রস্তাবনাটি – ‘আমরা কোনো রোগের কারণ অতিপ্রাকৃত বলতে পারিনা শুধুমাত্র এটা অস্বাভাবিক কিংবা রহস্যময় বা ব্যাখ্যা করা কঠিন – এটাকে বলা যেতে পারে যুগ যুগান্তরে বিজ্ঞানের পথ দেখানো নীতি । আমরা হয়তো এখন বুঝতে পারবো না, কিন্তু ধৈর্য আর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা এর কারণটি বুঝতে পারবো’। এই যুক্তিটি সবচেয়ে চিরস্থায়ী প্রস্তাবনা যা হিপোক্রাতিস আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন। তার কাছে একারণেই আমরা ঋণী।

হিপোক্রাতিসের দ্বিতীয় মূলনীতি হলো সুস্বাস্থ্য এবং অসুস্থ্যতা দুটি বিষয়ই ঘটে আমাদের শরীরের হিউমরদের বা humours এর ভারসাম্যর অভাবে ( পুরোনো একটা প্রচলিত কথায় যেমন আছে কারো ভালো কিংবা খারাপ হিউমর – মানে তার মেজাজ ভালো কিংবা খারাপ)। হিপোক্রাতিসের এই ধারণাটি খুব সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে On the Nature of Man ট্রিটিসে, এটির লেখক সম্ভবত হিপোক্রাতিস এর মেয়ের জামাই। হিপোক্রাতিসের অন্যান্য লেখায় এর আগে রোগের কারণ হিসাবে তিনি দুটি হিউমরের কথা বলেছিলেন, শ্লেষা এবং হলুদ পিত্ত – । On the Nature of Man আরো দুটি হিউমর যুক্ত করে রক্ত এবং কালো পিত্ত। সেখানে প্রস্তাব করা হয় এই চারটি হিউমর আমাদের স্বাস্থ্যে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে আর যখন সেগুলো ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ( মানে যখন কমে যায় বা বেড়ে যায় বা অন্য কিছু) তখন অসুখ হয়।

আপনি সম্ভবত নিজেও আপনার শরীরের নানা তরলগুলো দেখেছেন যখন অসুস্থ হয়েছেন, যেমন যখন আমাদের জর হয়, জ্বর নেমে গেলে আমদের ঘাম হয়, আমাদের যখন ঠান্ডা লাগে আর বুকে সংক্রমন হয় আমাদের নাক দিয়ে পানি পড়ে, আমরা কাশির সাথে শ্লেষা বের করি। যখন আমাদের পেট খারাপ হয়, আমরা বমি করি বা আমাদের ডায়রিয়া হয়। কেটে ছিড়ে গেলে আমাদের রক্ত বের হয়। বর্তমানে যদি কম হয় যেমন জন্ডিস, যখন চামড়ার রঙ হলদেটে হয়, চোখে যে রঙটা গাঢ় রঙ এর চামড়ার মানুষদের ক্ষেত্রে ডাক্তাররা দেখেন। জন্ডিস নানা কারণেই হতে পারে, যেমন ম্যালেরিয়া, প্রাচীন গ্রীসে যার প্রকোপ ছিল অনেক বেশী। হিপোক্রাতিস এই প্রত্যেকটি হিউমরের সাথে শরীরের কোনো অঙ্গকে সংশ্লিষ্ট করেছিলেন, যেমন হৃৎপিন্ডের সাথে রক্ত, যকৃতের সাথে হলুদ পিত্ত, প্লীহার সাথে কালো পিত্ত এবং মস্তিষ্কের সাথে শ্লেষা।

On the Sacred Disease ট্রিটিসে হিপোক্রাতিস প্রস্তাব করেছিলেন এপিলেপসি বা মৃগী রোগের কারণ মস্তিষ্কে আটকে থাকা শ্লেষা। শুধুমাত্র সর্দিজ্বর বা ডায়ারিয়া নয়, যেখানে আমরা শরীরের তরল সুস্পষ্টভাবে পরিবর্তিত হতে দেখি, অন্য সব অসুখগুলোর কারণও এইসব হিউমরের তারতম্য। সেখানে প্রস্তাবনা প্রতিটি হিউমরের নিজস্ব গুণাবলী আছে: রক্ত উষ্ণ ও আর্দ্র; শ্লেষা, শীতল ও আর্দ্র, হলুদ পিত্ত শীতল ও শুষ্ক, কালো পিত্ত, শীতল ও শুষ্ক। এই ধরনের উপসর্গগুলো দেখা যায় তাদের মধ্যে যারা অসুস্থ। যখন কোনো ক্ষত প্রদাহে পূর্ণ হয় রক্তে, তখন এটি উষ্ণ, যখন আমাদের সর্দি লাগে, আমাদের ঠান্ডা লাগে, কাপুনি হয় ( আরেক চিকিৎসক গ্যালেন, ৬০০ বছর পর যিনি হিপোক্রাতিসের ধারণাগুলোকে আরো বিস্তারিত করেছিলেন, একই ভাবে বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছিলেন আমাদের গ্রহন করা খাদ্যগুলোর উপর – উষ্ণ, শীতল, আর্দ্র, শুষ্ক ইত্যাদি)।

হিপোক্রাতিস প্রস্তাব করেন যে সব রোগের জন্য চিকিৎসা হচ্ছে এই হিউমরগুলোর মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, প্রতিটি রোগীর জন্য যে ভারাসাম্যটি সবচেয়ে বেশী কার্যকরী। এর মানে হচ্ছে হিপোক্রাতিসের চিকিৎসা শুধুমাত্র হিউমরদের তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ মানা নয়, প্রতিটি রোগীর জন্য সুনির্দিষ্ট আলাদা ভাবে হিউমরের ভারসাম্য আছে, তাই ডাক্তারদের প্রথমেই রোগীদের সম্বন্ধে জানতে হবে: কোথায় তারা থাকেন, তারা কি খেয়েছেন, কিভাবে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন ইত্যাদি। শুধুমাত্র তার রোগীকে ভালোভাবে জানার মাধ্যমে একজন ডাক্তার বলতে পারেন কি হতে পারে, এর মানে তার prognosis কি। যখন আমরা অসুস্থ্, আমরা সবার আগে যেটা জানতে চাই, আমরা এই রোগের নিরাময় ব্যপারে কি আশা করতে পারি এবং কিভাবে আমরা সুস্থ হয়ে উঠতে পারি। হিপোক্রাটিস ও তার অনুসারী ডাক্তাররা কোনো রোগীর সাথে কি হতে পারে এই বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। কারণ সেটি সঠিক বলার মাধ্যমে তারা তাদের সুনাম বৃদ্ধি করতেন, আর সুনাম মানে আরো বেশী রোগী।

হিপোক্রাতিস তার ছাত্রদের শিক্ষা দিয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানে যা কিছু তিনি শিখেছিলেন। তার শিক্ষা দানের ভিত্তি ছিল সরাসরি পর্যবেক্ষণ, তারা তাদের অভিজ্ঞতাগুলো নোট করে রাখতেন, প্রায়শই সংক্ষিপ্ত আকারে যা পরিচিত aphorisms নামে। আর aphorisms গুলোই পরবর্তীতে চিকিৎসকরা ব্যবহার করেছেন সবচেয়ে বেশী। হিপোক্রাতিস এর তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে, স্বাস্থ্য আর অসুস্থ্যতা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী – যা সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছে ল্যাটিন বাক্যটি – vis medicatrix naturae যার অর্থ the healing power of nature বা প্রকৃতির নিরাময় করার ক্ষমতা। হিপোক্রাতিস ও তার অনুসারীরা হিউমরের গতিবিধি লক্ষ্য করতে অসুখের সময় শরীরের নিজেকে সুস্থ্য করে তোলার প্রচেষ্টার চিহ্ন হিসাবে। সুতরাং ঘাম, শ্লেষা সহ কাশি, বমি, ফোড়ার পুঁজ সবই দেখা হতো শরীরের দ্বারা হিউমরগুলো পরিত্যাগ – অথবা – রান্না করা হিসাবে (সেই সময় তারা রান্নাঘরের নানা রুপক ব্যবহার করতেন প্রায়শই) । শরীর এটি করতো অতিরিক্ত হিউমর পরিত্যাগ, পরিবর্তন বা বিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া হিসাবে, যা পরিবর্তিত হয়েছে অসুখের মাধ্যমে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের কাজ হবে প্রকৃতির এই রোগ নিরাময় প্রক্রিয়াকে সাহায্য করা। ডাক্তার হচ্ছেন প্রকৃতির সেবক, মনিব নয়। এবং রোগের প্রক্রিয়া বুঝতে হলে রোগের সময় কি ঘটে সেই বিষয়ে খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করতে হবে।

8312d0ee2a7c9b4e5936d02edc587c3aছবি: Hippocrates Refusing the Presents of Artaxerxes. 1792. Anne Louis Girodet de Roussy – হিপোক্রাটিস পারস্যের সম্রাটের উপহার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন No. I have enough food, clothing, shelter and everything else I need for life, and I don’t want all that Persian opulence. I will not help those who are the enemies of the Greeks বলে। সেই দৃশ্যটি একেছিলেন শিল্পী জিরোদে।

অনেক বছর পরে চিকিৎসা বিজ্ঞান অবশ্য self-limited disease শব্দটি উদ্ভাবন করেছিল এই বিষয়টিকে চিহ্নিত করার জন্য। বহু অসুখেই আমরা জানি নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। ডাক্তারদের একটা কৌতুক আছে নিজেদের মধ্যে বলার জন্য, যদি তারা এই রোগের চিকিৎসা করেন তাহলে এক সম্পাহের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে আর যদি তারা চিকিৎসা না করে তাহলে সময় লাগবে সাত দিন। হিপোক্রাতিসের অনুসারীরা এর সাথে একমত হতেন।

এছাড়া মেডিসিন, সার্জারী, হাইজিন এবং এপিডেমিক্স এর উপর নানা ট্রিটিস ছাড়াও হিপোক্রাতিস তার বিখ্যাত প্রতিজ্ঞা, ওথ আমাদের জন্য রেখে গেছেন, যা আজো চিকিৎসকদের মনে করিয়ে দেয় তারা কেন চিকিৎসক হয়েছে, অনুপ্রাণিত করে। খুব সংক্ষিপ্ত সেই ডকুমেন্টটি কিছু অংশ শিক্ষার্থী এবং তাদের শিক্ষকদের এবং চিকিৎসকদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে। কিন্তু বেশীর ভাগই মূলত আলোচনা করেছে রোগীদের সাথে ডাক্তারদের আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ – যেমন তাদের কখনোই উচিৎ না রোগীর কোন দূর্বলতার সুযোগ নেয়া, রোগীর কাছ থেকে শোনা গোপন কথা নিয়ে সবার সাথে আলোচনা করা, কিংবা রোগীকে বিষ প্রদান করা ইত্যাদি। মেডিকেল এথিক্স এ যা আজো অর্থবহ। কিন্তু হিপোক্রাতিসের একটি প্রতিজ্ঞা এখনও চিরন্তন:

I will use my power to help the sick to the best of my ability and judgement;

I will abstain from harming or wrongdoing any man by it

আর রোগীদের কোনো ক্ষতি না করাই এখনও প্রতিটি চিকিৎসকের লক্ষ্য হওয়াই উচিৎ।

Advertisements
কসের হিপোক্রাতিস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s