গোগোলের গ্রেটকোট

 

detail-of-the-monument-to-nikolay-gogol-in-st-petersburg-1(সেইন্ট পিটার্সবুর্গে Malaya Konyushennaya রাস্তায় গোগোল স্মারক ভাস্কর্য, শিল্পী মিখাইল বেলোভ)

(ভূমিকা: নিকোলাই ভাসিলিয়েভিচ গোগোল (১৮০৯-১৮৫২) এর জন্ম ইউক্রেনের পলটাভায়। উনিশ বছর বয়সে তিনি সেইন্ট পিটার্সবুর্গে এসেছিলেন। সেখানে তিনি সরকারী চাকরী করেছিলেন, সর্বনিম্ম পদবী থেকে অষ্টম ধাপ অবধি অগ্রসর হয়েছিলেন তার পেশাগত জীবনে। এরপর তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করার চেষ্টা করেন, এমনকি ইতিহাস পড়াবার একটি অসফল প্রচেষ্টাও করেন সেইন্ট পিটার্সবুর্গ  বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮৩৭ থেকে ১৮৩৯, তিনি ছিলেন রোমে, এরপর তাঁর বাকী জীবন তিনি মূলত কাটিয়েছেন রাশিয়া আর পশ্চিম ইউরোপসহ নানা দেশ ভ্রমন করে। ইউক্রেনের গ্রামীন জীবন নিয়ে লেখা বর্ণিল আর কল্পাশ্রয়ী গল্পগুলোই প্রথম তাকে খ্যাতি দিয়েছিল, যা দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল : Evenings on a Farm near Dikanka এবং Mirgorod । এরপরে তিনি প্রকাশ করেছিলেন তার পিটার্সবুর্গের গল্পগুলো, যেখানে বাস্তবতা আর কল্পনার অসাধারণ এক মিশ্রণ ছিল। পুশকিন খুব দ্রুত তার প্রতিভাকে শনাক্ত করেছিলেন, আর গোগোলও পুশকিনের ঋণ স্বীকার করেছেন, যিনি তাকে তার বিখ্যাত প্রহসন নাটক দ্য গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর, এছাড়া তার বিখ্যাত উপন্যাস, ডেড সোলস এর প্রাথমিক ধারণাটি দিয়েছিলেন।

ডেড সোলস ( দ্য গ্রেটকোট এর মত প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪২ সালে) মূলত একটি রুশ ডিভাইন কমেডির প্রথম পর্ব হিসাবে তিনি লিখেছিলেন, কিন্তু তিনি পরের অধ্যায়গুলো – পারগাটারিও, কিংবা প্যারাডিসো, কোনো পর্বই ঠিক মত ভাবতে পারেননি, বিষয়টি তাকে আজীবন বিষন্নতায় ভুগিয়েছিল। ১৮৪৭ সালে তিনি প্রকাশ করেছিলেন Selected Passages from Correspondence with Friends, অত্যন্ত ক্লান্তিকর নৈতিক উপদেশ সংগ্রহ যা তাকে বিচ্ছিন্ন করেছিল উদারনীতিবাদীদের কাছ থেকে, একই সাথে এমনকি বহু রক্ষণশীলদের কাছ থেকেও, এবং বিখ্যাতভাবে প্রভাবশালী বৈপ্লবিক চিন্তাধারার লেখক ও তার সমালোচক ভিসারিওয়াস বেলিনিস্কি থেকেও। হতাশাগ্রস্থ গোগোল তীর্থযাত্রায় যান হলিল্যাণ্ডে (বর্তমান ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন) কিন্তু তার হতাশাবোধ আরো তীব্রতর হয়ে উঠেছিল। সত্যিকারের নৈতিক আধেয় না থাকার কারণে তিনি ডেড সোলস প্রায় পুরো দ্বিতীয় খণ্ডটি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। এর দশ দিন পর ১৮৫২ সালের মার্চে তিনি মারা যান। খুব সম্ভবত অভুক্ত থাকার কারণে। লেন্ট শুরু হবার পর থেকে তিনি কোনো খাদ্য গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

দ্য গ্রেটকোট (১) গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪২ সালে (মূল রুশ নাম – Шинель বা শিনেল, গ্রেটকোট ছাড়াও নামটিকে কখনো অনুবাদ করা হয়েছে ওভারকোট, বা ক্লোক হিসাবে)। গোগলের সেন্ট পিটার্সবুর্গ গল্পগুলোর শেষ এবং সবচেয়ে বিখ্যাত এই গল্পটির নায়কের অদ্ভুত একটি নাম ছিল, আকাকি আকাকিয়েভিচ। নামটি সম্ভব এসেছে kaka (শিশুতোষ একটি শব্দ যার অর্থ মল) এবং akakos থেকে, গ্রিক যে শব্দটির অর্থ নিরপরাধ। রুশ অর্থোডক্স ধর্মীয় ইতিহাসে সাধু Acacius নাম সহ আছেন বেশ কয়েজন যদিও, যেমন একজন সাধু ( এবং দর্জি) মারা যাবার আগে যাকে দীর্ঘদিন অত্যাচারিত হতে হয়েছিল উর্ধ্বতন এক ব্যক্তির কাছে, যিনি পরে অনুশোচনা করেছিলেন। পুশকিনের  The Queen of  Spades এর মত এই গল্পটি বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। কিছু সমালোচক এটিকে পড়েছিলেন, দমনমূলক ও শোষক আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসহায় ক্ষুদ্র মানুষদের প্রতিরক্ষায় লেখা একটি প্রতিবাদ হিসাবে । অন্যরা এটিকে দেখেছেন রুপক হিসাবে যেখানে যৌনতা আর বস্তুবাদী প্রলোভনের ইঙ্গিত আছে, গ্রেটকোট এখানে অশুভ শয়তানের টোপ। কিন্তু তারপরও অন্যরা দ্য গ্রেটকোটকে দেখেছেন জীবনের অর্থের অনুসন্ধানে মানবতার সংগ্রামের একটি মৌলিক কাঠামো হিসাবে, সমালোচক ক্যাথি পপকিন যেমন বলেছিলেন, আমাদের নিজেদের সেই সংগ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ আর অর্থবহ কোনো কিছুর জন্য, যা খুব নিবিড়ভাবে অভিনীত হয়েছে আকাকি আকাকিয়েভিচের কোটের জন্য তার দূর্ভাগ্যজনক অভিযানে। তার অনুসন্ধান আর সেই সূত্রটি হারানো, অর্থ এবং বেঁচে থাকার কারণে আমরা আমাদের নিজেদের অর্থহীন প্রচেষ্টা দেখতে পাই উদ্দেশ্য,গুরুত্বপূর্ণতা আর মূলসারের সন্ধানে। আকাকি অন্তর্মূখী আর নিরাশ একজন ব্যক্তি তবে কর্মী সত্তা, কোনো সামাজিক বা বস্তুগত সফলতার প্রত্যাশা তার ছিলনা, কিন্তু তার গ্রেটকোটটি তাকে দিয়েছিল আত্মমর্যাদা, সেই সাথে বাড়িয়ে দিয়েছিল তার প্রত্যাশাটাও। সুতরাং আমলাতন্ত্রের একটি যন্ত্র হবার বদলে এটি তাকে মানুষ হবার সুযোগ দিয়েছিল। তার বস্তুবাদী কামনা তাকে মানবতাও দান করেছিল।  রুশ সাহিত্যে গোগোলের প্রভাব খুব বিশাল, We have all come out of Gogol’s Greatcoat বা আমরা সবাই গোগোলের ওভারকোট থেকে এসেছি এই মন্তব্যটি অসংখ্যবার উল্লেখ করা হয়েছে, ধারণা করা হয় মন্তব্যটি দস্তয়েভস্কির, কখনো বা ‍তুর্গেনিভ, লেসকভ, বুলগাকভ, জোশচেনকো এবং প্লেটোনোভ, তারা প্রত্যেকেই গোগোলের উদহারণ অনুসরণ করেছিলেন কৌতুকময়তা আর দার্শনিকতার উপযোগী মিশ্রণের মাধ্যমে মানব চিত্র অংকনে। এই বাংলা অনুবাদটি রবার্ট শ্যাণ্ডলারের ইংরেজী অনুবাদ অনুসরণ করে করা হয়েছে  – কাজী মাহবুব হাসান)

দ্য  গ্রেটকোট: নিকোলাই ভাসিলিয়েভিচ গোগোল | রবার্ট শ্যান্ডলারের ইংরেজী অনুবাদ থেকে কাজী মাহবুব হাসান

… বিভাগে, কিন্তু বিভাগটির নাম উল্লেখ না করাই উত্তম হবে। এইসব বিভাগ, রেজিমেন্ট আর সরকারী দপ্তরগুলো – এক কথায় এইসব সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মত এত স্পর্শকাতর, বদমেজাজী আর কিছু নেই –ইদানীং আপনি যদি কোনো এক  ব্যক্তি সম্বন্ধে কিছু বলেন, তিনি এমনভাবে আচরণ করতে থাকেন, যেন পুরো সমাজটাকেই অপমানিত করা হয়েছে। খুব বেশী দিন আগে নয়, আমি শুনেছিলাম, এক পুলিশ অধিনায়কের কাছ থেকে একটি আর্জি এসেছিল, আমি মনে করতে পারছিনা ঠিক কোন শহর থেকে, সেখানে তিনি খুবই স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছিলেন যে, সরকারী ডিক্রিগুলো সব ধ্বংস করবে এবং তার নিজের পবিত্র নামটি নেয়া হয়েছে সন্দেহাতীতভাবে বিনা কারণে। এর সমর্থনে, তিনি তার আর্জির সাথে যুক্ত করেছিলেন অস্বাভাবিক রকম বিশাল একটি রোমান্টিক সাহিত্যকর্মের বই, যেখানে প্রতি দশ পাতা অন্তর একজন পুলিশ ক্যাপ্টেন আবির্ভুত হয়েছেন, কখনো পুরোপুরি মাতাল অবস্থায়। আর সেকারণে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে, সবচেয়ে ভালো হবে, যদি আমরা এই আলোচ্য এই বিভাগটিকে শুধুমাত্র একটি ‘নির্দিষ্ট বিভাগ’ বলেই উল্লেখ করি।

আর সেই, একটি ‘নির্দিষ্ট বিভাগে’ একজন ‘নির্দিষ্ট কেরানি’ কাজ করতেন – একজন কেরানি, যাকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এমন কেউ হিসাবে চিহ্নিত করা যাবে না: উচ্চতায় খানিকটা খাটো, মুখে কিছু গুটি বসন্তের দাগ, খানিকটা লালচে চুল, এবং এমনকি স্পষ্টতই হ্রস্ব দৃষ্টি সম্পন্ন, মাথার সামনে যার ছোট একটি টাক পড়ছে, দুই পাশের গালে বলি রেখার দাগ, পুরো চেহারাটি খানিকটা, যাকে বলা যেতে পারে অর্শরোগীর মত … এর জন্য আসলে কিছুই করার নেই: পিটার্সবুর্গের (২) জলবায়ুই এর জন্য দায়ী। আর তার পদমর্যাদার ক্ষেত্রে (কারণ রাশিয়ায় একজন মানুষের পদমর্যাদাই হচ্ছে প্রথম বিষয় যা অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে), তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যাকে লোকজন একজন চিরন্তন টিটুলার কাউন্সিলর (৩) বলে থাকেন; এই  পদটি, যেমন সবারই জানা আছে, বহু লেখকদের ব্যঙ্গ আর বিদ্রুপের নিশানা, যাদের সেই প্রশংসাযোগ্য স্বভাব আছে সেই সব মানুষের আক্রমন করা, যারা কিনা পাল্টা আক্রমন করতে পারেননা।

এই কেরানির বংশনাম ছিল বাশমাচকিন। তাৎক্ষনিকভাবে স্পষ্ট যে, এই বংশনামটি এসেছে কোনো না কোনো একসময় ‘বাশমাক’ অথবা ‘জুতা’ শব্দটি থেকে। কিন্তু কখন, কোন সময়ে আর কিভাবে এটি বাশমাক শব্দ থেকে এসেছে- তার কিছুই জানা নেই। তার বাবা,তার দাদা, এমনকি তার ভগ্নিপতি – অবশ্যই প্রতিটি বাশমাচকিন – বুট জুতো পরে হাটতেন, বছরে দুই তিনবার তারা সেই জুতার তলি পরিবর্তন করতেন। তার প্রথম নাম ও পিতার নামানুযায়ী নাম ছিল আকাকি আকাকিয়েভিচ।

বিষয়টি বিস্ময়কর আর অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু পাঠককে আশ্বস্ত করা যেতে পারে যে নামটি কোথা থেকে সংগ্রহ করে আনা হয়নি এবং পরিস্থিতিগুলো নিজে থেকেই এমনভাবে ঘটেছিল যে, তার ক্ষেত্রে অন্য নাম দেয়ার বিষয়টিকে পুরোপুরি অসম্ভব করে তুলেছিল – আর কিভাবে এই নাম দেবার ঘটনাটি ঘটেছিল তার নিখুত বিবরণ হচ্ছে এটি। আকাকি আকাকিয়েভিচ জন্মগ্রহন করেছিলেন, যদি স্মরণশক্তি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে, ২৩ মার্চ রাতে। তার পরলোকগত মা, তিনি ছিলেন একজন কেরানির স্ত্রী ও খুব ভালো একজন মহিলা ছিলেন, এবং তিনি চেয়েছিলেন, যেমনটি যথাযথ, শিশুটিকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য নামকরণ করতে। তিনি তখনও শয্যাশায়ী, দরজার বীপরিতে রাখা বিছানায়, তার ডান দিকে দাড়িয়ে, শিশুটির ধর্মপিতা, খুবই চমৎকার একজন মানুষ, ইভান ইভানোভিচ ইয়েরোশকিন(৪), যিনি সিনেটের (৫) প্রধান কেরাণি হিসাবে দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন, ধর্মমাতা আরিনা সেমেইয়োনভনা বেলোব্রুশকোভাকে (৬) সাথে নিয়ে, এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী, এবং সদগুণ সম্পন্ন দুর্লভ একজন মহিলা।

নতুন মাকে তিনটি নাম দেয়া হয়েছিল,  যার কোনো একটিকে তিনি যদি বেছে নিতে চান: মক্কিয়া, সোস্সিয়া, অথবা তিনি তার শিশুকে শহীদ খোজদাজাত (৭) এর  নামেও নামকরণ করতে পারেন। ‘না’, তার পরলোকগত মা ভেবেছিলেন, ‘এই নামগুলোর কোনোটাই ঠিক না’। সুতরাং তাকে সন্তুষ্ট করতে তারা কালেণ্ডারের ভিন্ন একটি পাতা খুলেছিলেন, সেখানে পাওয়া যায় আরো তিনটি  নাম, ত্রিফিলি, দুলা আর ভারাখাসি। ‘আমরা এমন কি দোষ করেছি যে, এইসব নামই কেবল খুঁজে পাচ্ছি’ – ভালো মহিলাটি বললেন, ‘কি যে সব নামগুলো, সত্যি, আমি কোনোদিনও এমন নাম শুনিনি, ভারাদাত বা ভারুখ হলে এক কথা কিন্তু ত্রিফিলি বা ভারাখাসি’। সুতরাং তারা আরো আরেকটি পাতা উল্টায়, এবার নাম আসে পাভসিকাখি আর ভাখতিসি। ‘বেশ’ – ভালো মহিলাটি বলেছিলেন – ‘স্পষ্টত বিষয়টি দেখতে হবে তার নিয়তি হিসাবে। আর যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে তাকে তার বাবার নামে নামকরণ করা হোক। তার বাবা ছিলেন আকাকি, সুতরাং ছেলেও হোক আকাকি’। আর এভাবেই তার আকাকি আকাকিয়েভিচ নামটি এসেছিল। শিশুটিকে নিয়মমত খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। অনুষ্ঠানটির সময় শিশুটি বেশ কেঁদেছিল এবং এমন মুখ ভঙ্গি করেছিল যেন সে বুঝতে পেরেছিল , একদিন সে একজন টিটুলার কাউন্সিলর হবে। হ্যা, এভাবেই ব্যপাারটি ঘটেছিল। বিষয়টি ব্যাখ্যা করলাম যেন পাঠকরা নিজেরাই বুঝতে সক্ষম হন যে, এটি ঘটেছিল পুরোপুরিভাবে প্রয়োজনীয়তার খাতিরে এবং আসলেই তাকে অন্য কোনো নাম দেয়া অসম্ভব ছিল।

কবে ও কখন তিনি সেই বিভাগে যোগদান করেছিলেন, এবং কেই বা তাকে নিয়োগ দিয়েছিল, এই বিষয়গুলো হচ্ছে এমন কিছু, যা কেউই মনে করতে পারবেন না। তবে বহু পরিচালক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসেছেন আর গেছেন, কিন্তু তাকে সবসময়েই সেই একই জায়গায় দেখা গিয়েছে, সেই একই পদে, একই কাজ করতে, সেই একই অনুলিপিকারী কেরানি হিসাবে; অবশেষে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, ইউনিফর্ম পরণে ও মাথার সামনে ক্রমশ বাড়তে থাকা টাকসহ তিনি এই কাজ করার জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত হয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন।

এই বিভাগে কোনো ধরনের শ্রদ্ধা তার প্রতি কখনো প্রদর্শিত হয়নি। যখন তিনি সামনে দিয়ে যেতেন বিভাগের পিয়নরা শুধুমাত্র বসেই থাকতো না, এমনকি তারা তার দিকে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করতো না,  যেন তিনি অভ্যর্থনা কক্ষের মধ্য দিয়ে উড়ে যাওয়া তুচ্ছ একটি মাছি মাত্র। এক ধরনের শীতল নিষ্ঠুরতার সাথে পরিচালকরা তার সাথে আচরণ করতেন । কিছু সহকারী প্রধান কেরানি তার নাকের সামনে একগাদা কাগজ ঠেলে দিয়ে, ‘এগুলো অনুলিপি করুন’ বা ‘আপনার জন্য একটা বেশ ভালো মজার কাজ’ বা অন্য কোনো প্রীতিকর মন্তব্য উচ্চারণ করার ন্যুনতম প্রয়োজনও বোধ করতেন না, সাধারণত ভদ্র দপ্তরগুলোয় যেমনটা নিয়ম। আর কোনো কিছুর দিকে না তাকিয়ে, কে সেখানে সেটি রেখেছে সেটি লক্ষ্য না করেই বা তাদের আদৌ সেই কাজটি করার অধিকার আছে কিনা সেটি না ভেবে, তিনি তাৎক্ষনিকভাবে কাগজগুলো নিয়ে সেগুলো অনুলিপি করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন।

তরুণ কেরানিরা তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতেন, যতদূর তাদের অফিসে এ ধরনের তামাশা করার অধিকারকে টেনে লম্বা করা যায়। সেখানে, তার সামনেই, তারা তাকে ও তার সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা বাড়িওয়ালীকে নিয়ে নানা ধরনের মুখরোচক গল্প বানিয়ে বলতেন, যেমন, তারা বলতেন তার বাড়িওয়ালী নাকি তাকে নিয়মিত মারধোর করেন, কবে তাদের বিয়ে হবে সেটি জিজ্ঞাসা করে, আর তার মাথায় কাগজের টুকরো ছড়িয়ে দিয়ে তারা বলতেন এখন বরফ পড়ছে। কিন্তু এর প্রত্যুত্তরে কোনো শব্দই আসতো না আকাকি আকাকিয়েভিচের কাছ থেকে, যিনি তার কাজ করে যেতেন যেন সেখানে অন্য কেউই উপস্থিত নেই। এমনকি এসব তার কাজেও কোনো প্রভাব ফেলতো না: কখনোই সহকর্মীদের এইসব বাড়াবাড়ি আচরণ তার অনুলিপি কাজে একটি ভুলেরও কারণ হয়নি । শুধুমাত্র যখন এই তামাশা খুব বেশী অসহ্য মনে হতো তার, যখন তারা তার কনুই ধরে টানাটানি করে তাকে তার কাজ করতে বাধা দিতো,  তিনি শুধু বলতেন, ‘আমাকে আমার মত থাকতে দিচ্ছেন না কেন, কেন আমাকে অত্যাচার করছেন’? তার উচ্চারিত এই শব্দগুলো আর যে কন্ঠস্বর সেগুলো উচ্চারণ করেছে, তার মধ্যে অদ্ভুত কিছু ছিল। সেই কন্ঠস্বরে এত তীব্র করুণার স্মৃতি জাগানিয়া কিছু ছিল যে এক তরুণ সহকর্মী, যিনি সম্প্রতি সেই বিভাগে যোগদান করেছিলেন, এবং অন্যদের উদহারণ অনুসরণ করে, প্রায় সেই পর্যায় অবধি উপস্থিত হয়েছিলেন যে নিজেকে অনুমতি দিয়েছিলেন আকাকি আকাকিয়েভিচকে নিয়ে ঠাট্টা করার জন্য, হঠাৎ করেই নিশ্চুপ হয়ে যান, যেন অসাঢ় হয়ে গেছেন এবং সেই মুহূর্ত থেকে সবকিছুই তার সামনে নতুন করে আবির্ভূত হয়, ভিন্ন আলোকে। যেন অদ্ভুত কোনো শক্তি তার সহকর্মীদের কাছ থেকে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় বহুদূরে, যাদের তিনি প্রথম দেখায় মনে করেছিলেন ভদ্র আর শিক্ষিত মানুষ। বহু দিন পরে, এমনকি তার আনন্দের চরমতম মুহূর্তেও তার সামনে এক খর্বকায়, মাথায় টাক পড়া একজন কেরানির চেহারা ভেসে উঠতো, যে তার মর্মস্পর্শী শব্দগুলো উচ্চারণ করছে, ‘আমাকে আমার মত থাকতে দেন, কেন আপনারা আমার উপর অত্যাচার করছেন বলুনতো’? আর এই মর্মভেদী শব্দগুলো আসলে অন্য শব্দগুলোর প্রতিধ্বণি: ‘আমি আপনাদেরই ভাই’। আর সেই অসহায় তরুণটি দুই হাত দিয়ে তার নিজের মুখ ঢাকতেন, তার জীবনে বহুবারই তিনি কেঁপে উঠেছেন মানুষের মধ্যে কি পরিমান অমানবিকতা আছে সেটি দেখে, কি পরিমান বন্য হিংস্র স্থুলতা লুকিয়ে থাকতে পারে পরিশীলিত সংস্কৃতিবানদের আচরণের পেছনে – হায় ঈশ্বর – এমনকি সেই সব মানুষগুলোর মধ্যেও, যাদের সমাজ মহান আর সন্মানিত  বলে বিবেচনা করে।

আকাকি আকাকিয়েভিচের মত এমন কাউকে খুঁজে বের করা আসলেই কঠিন হবে, যিনি তার কাজে এত গভীরভাবে মগ্ন হয়ে বেঁচে ছিলেন। তীব্র উৎসাহ আর আগ্রহের সাথে তিনি কাজ করতেন বললে আসলে যথেষ্ঠ হবে না। না, তিনি ভালোবাসার সাথে তার দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। অনুলিপি করার কাজটির মধ্যে তিনি চমৎকার আর বিচিত্র একটি জগৎ খুঁজে পেয়েছিলেন। তার চেহারাতেই স্পষ্ট দেখা যেতো সেই আনন্দ; বর্ণমালার কিছু বর্ণ ছিল তার বিশেষভাবে প্রিয়, আর যখনই লেখার সময় সেই বর্ণটি আসতো, তিনিও বদলে যেতেন : তিনি হাসতেন, বারবার পলক ফেলতেন, আর তার ঠোটগুলো দেখতে মনে হতো সেগুলো তার সেই বর্ণটি লেখার প্রক্রিয়ায় সাহায্য করছে, মনে হতো কেউ চাইলেই তার চেহারায় সেই বর্ণটি পড়তেও পারবেন, যা তিনি সেই মুহূর্তে তার কলম দিয়ে অনুলিপি করছেন।  এই বিশেষ উদ্দীপনার যোগ্য কোনো পুরষ্কার যদি তাকে দেয়া যেত, তাকে হয়তো, অবশ্যই তার নিজের বিস্ময়সহ, এমনকি স্টেট কাউন্সিলর (৮) পদে পদোন্নতি করা সম্ভব হতো, কিন্তু  তার এই পরিশ্রমের জন্য তিনি যা পেয়েছিলেন, তার এক চালাক সহকর্মীর ভাষায়, বোতামের ফুটোয় লাগানোর জন্য একটি স্মারক চিহ্ন আর পেছনের জন্য অর্শরোগ। তারপরও, এমন কিছু বলা ভুল হবে, আদৌ তাকে লক্ষ্য করা হয়নি। একজন পরিচালক, দয়ালু হবার সুবাদে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের জন্য তাকে পুরষ্কৃত করতে চেয়ে সাধারণ অনুলিপি কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।  বাস্তবিকভাবে, তাকে বলা হয়েছিল, ইতিমধ্যে প্রস্তুত একটি নথিকে অন্য আরেকটি সরকারী দপ্তর বরাবর পুনর্লিখন করার জন্য। তাকে যা করতে হতো তাহলো: শুধুমাত্র একটি নতুন শিরোনাম দেয়া, এখানে সেখানে কিছু ক্রিয়াপদ আর প্রথম থেকে তৃতীয় পুরুষে কিছু পরিবর্তন। কিন্তু তার জন্যে কাজটি এত বেশী সংগ্রামের ছিল যে তিনি গলদঘর্ম হয়েছিলেন, তার ভ্রু ঘষতে ঘষতে অবশেষে বলেছিলেন, ‘না, ভালো হয় যদি আপনি আমাকে কিছু কাগজ অনুলিপি করার কাজ খুঁজে দিতে পারেন’। এরপর থেকে তার বাকী কর্মজীবনে অনুলিপি করার কাজ ছাড়া আর কিছুই তাকে দেয়া হয়নি। অনুলিপি করার এই কাজের বাইরে, তার কাছে আর কোনো কিছুরই আসলে অস্তিত্ব ছিল না ।

তার নিজের কাপড়ের দিকে তিনি কখনোই নজর দেননি। তার ইউনিফর্মটি আর সবুজ রঙের ছিল না, বরং সেটি রুপান্তরিত হয়েছিল লালচে-বাদামী-সাদা রঙে। আর কলারটি এত বেশী সরু আর খাটো ছিল যে, তার ঘাড়, বাস্তবে যা খুব ছোট, দেখে মনে হতো অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ, ঘাড় নাড়ানো প্লাস্টার অব প্যারিস দিয়ে বানানো বিড়ালছানাগুলোর মত, মাথার উপর ঝুড়ি ভর্তি করে পিটার্সবুর্গের রাস্তায় বিদেশীরা যা ফেরী করতো, এছাড়াও সবসময়ই কিছু না কিছু তার ইউনিফর্মের লেগে থাকতো, কোনো খড়ের টুকরো বা সুতার একটি অংশ। উপরন্তু তার একটি বিশেষ অভ্যাস ছিল, যখন তিনি রাস্তা দিয়ে হেটে যেতেন, সেই সব জানালা নীচ দিয়ে যাওয়ার জন্য, ঠিক যে মুহূর্তে নানা ধরনের আবর্জনা সেখান থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে, আর সে কারণেই সবসময়ই কুমড়া বা তরমুজের খোসার টুকরো বা অন্য কোনো আবর্জনার অংশ তাকে তার টুপির উপরে বহন করতে দেখা যেত । একবারের জন্যেও তার জীবনে তিনি রাস্তায় তার চারপাশে দৈনন্দিন কি ঘটছে সে দিকে নজর দেননি, সেই সব নানা ঘটনা, যা আমরা জানি, কখনোই তার অন্য কেরানি সহকর্মী ভাইদের মনোযোগ এড়াতো না। তরুণরা তাদের তীক্ষ্ম দৃষ্টিকে এত তীক্ষ্মতর করে তুলেছিল যে, এমনকি তারা রাস্তার অপর পাশে কারো প্যান্টের গোড়ালী বন্ধনী ঠিক আছে কিনা তারা তা দেখতে পারতো – যে দৃষ্টি তাদের মুখে ধূর্ত হাসি আনতে কখোনোই ব্যর্থ হয়নি।

কিন্তু আকাকি আকাকিয়েভিচ যদি কখনো কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে থেকে থাকেন, তিনি সবজায়গায় শুধু যা দেখতেন, তাহলো তার পরিষ্কার, সমানভাবে লেখা অক্ষরের লাইনগুলো, এবং শুধুমাত্র হঠাৎ যদি কোনো ঘোড়ার মুখ – আর ঈশ্বরই জানেন কোথা থেকে – আবির্ভূত হয়, এবং সেটি তার কাধের উপর মুখ রেখে তার নাকের ছিদ্র দিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচের মুখ বরাবর আস্ত একটি ঝড় বইয়ে দেয়, শুধুমাত্র তখনই তিনি অনুধাবন করতে পারবেন , তিনি কোনো পংক্তি অনুলিপি করার কাজের মধ্যে নেই, বরং ঠিক রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে আছেন।

ঘরে ফেরা মাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে তিনি টেবিলে বসে চামচ দিয়ে বাধাকপির সুপ আর পেয়াজ দিয়ে একট টুকরো সিদ্ধ গুরুর মাংস দ্রুত গিলে ফেলতেন, কখনোই তাদের স্বাদ কেমন সেটি খেয়াল না করেই। তিনি আস্তই সব কিছু গিলে ফেলতেন এমনকি মাছিসহ, বা ঈশ্বর যা কিছু পাঠান সেই সময় তার খাবারের সাথে। পেট ফুলতে শুরু করছে সেটি লক্ষ্য করলে তিনি টেবিল থেকে উঠে দাড়াতেন, কালির একটি বোতল নিয়ে, কাগজ অনুলিপি করতে বসে যেতেন, যা তিনি দপ্তর থেকে তার সঙ্গে বাড়ি নিয়ে আসতেন। ঘটনাচক্রে যদি অনুলিপি করার মত কোনো কাগজ তার কাছে না থাকতো, তারপরও তিনি কিছু না কিছু অনুলিপি করতেন, শুধুমাত্র নিজের জন্যে, তার নিজের আনন্দের জন্য, বিশেষ করে যদি কাগজটি তার সৌন্দর্য বা শৈলীতে আকর্ষণীয় না হয়ে বরং সেটি নতুন অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির প্রতি নির্দেশিত হয়ে থাকে।

এমনকি সেই সময় অবধি তিনি কাজ করতেন, যখন পিটার্সবুর্গের ধূসর আকাশ পুরোপুরি ম্লান হয়ে যেত, সব কেরানিরা, প্রত্যেকেই তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, যে পরিমান বেতন তারা পান আর ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর নির্ভর করে তাদের উদরপূর্তি করে খাওয়া শেষ করতেন। তারপর যখন সবাই তাদের দাপ্তরিক কলম ঘষার কাজের পরে থমকে দাড়ান, সব তাড়াহুড়ো আর হট্টগোলের পরে, নিজের আর অন্যদের জন্যে করা সব প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডের পরে, সেই সব কর্মকাণ্ড যা অক্লান্ত মানুষ স্বেচ্ছায় করার জন্যে দ্বায়িত্ব নেয় নিজের উপর, যা তার করা দরকার তার চেয়েও বেশী, তখন দাপ্তরিক কর্মকর্তারা আনন্দ খোজার জন্য তাদের অবশিষ্ট সময়টি নিবেদন করতে তাড়াহুড়া করতে শুরু করেন ( কেউ হয়তো দ্রুত কোনো নাটক দেখতে দৌড়ে যান, অন্যজন হয়তো অদ্ভুত সব নানা ধরনের মাথার টুপির দিকে তাকানোর জন্য বের হন, কেউ হয়তো কোনো সুন্দর তরুণীর প্রশংসা করে সন্ধ্যাটা কাটাতে বের হন, যিনি কেরানিদের ছোট কোনো বৃত্তের তারকা, তখন অন্যজন হয়তো – আর এটাই প্রায়শই হয়, কোনো এক সহকর্মীকে সাথে দেখা করতে বের হন,  যে সহকর্মী হয়তো কোনো দালানের দোতালায় বা তিনতলায় ছোট দুটি ঘর, একটি বাড়তি সামনের ঘর অথবা একটি রান্নাঘর সহ নিয়ে বসবাস করেন অথবা কেতাদূরস্ত  কোনো না কোনো আকর্ষণীয় জিনিসসহ, হয়তো একটি ল্যাম্প অথবা কোনো ছোট বিলাসী দ্রব্য, যা সংগ্রহ করা হয়েছে বহু রাতের খাবার বিসর্জন  অথবা সন্ধ্যার বিনোদন বাদ দিয়ে)। এক কথায়, যখন সব কেরানিরা তাদের বন্ধুদের ছোট ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নকআউট হুইস্ট (৯) খেলছেন এক-কোপেকের বিস্কুটের সাথে কাচের গ্লাসে চা পান করতে করতে, কিংবা লম্বা চিবুকে (১০) তামাকের ধোয়া টানতে টানতে, তাশ খেলতে খেলতেই, ‍যখন সমাজের উচু তলা থেকে পরিস্রাবিত হয়ে নীচে নেমে আসা কোনো গুজব বা কেলেঙ্কারীর কথা পুনরায় বর্ণনা করছেন – কারণ কোনো রুশ, তার যে পরিস্থিতি থাকুক না কেন, তারা কখনোই তাদের অভিজাত উচ্চ শ্রেণীকে প্রত্যাখান করতে পারেননা – অথবা, এমনকি, যদি কিছু আলাপ করার নাও থাকে, এক সেনা অধিনায়ককে নিয়ে সেই বহু প্রাচীন কোনো কৌতুক পুনরায় বলা হয়, যিনি খবর পেয়েছিলেন ফ্যালকোনেটের পিটার দ্য গ্রেটের (১১) ঘোড়ার লেজ কেটে ফেলে হয়েছে। এক কথায়, এমনকি যখন সবকিছু এবং সবাই অতিআগ্রহী নিজেদের আনন্দ দেবার জন্য, আকাকি আকাকিয়েভিচ কখনোই কোনো আনন্দ লাভ করার প্রচেষ্টায় নিজেকে নিবেদিত করেননি। কেউ কখনো দাবী করতে পারবে না যে সন্ধ্যার কোনো অনুষ্ঠানে তাকে দেখেছে। মনের সাধ মিটিয়ে অনুলিপি করার পর, তিনি ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়তেন, আসন্ন দিনের কথা ভেবে মুখে হাসি নিয়ে,  কল্পনা করতে করতে যে, কাল ঈশ্বর না জানি কি নিয়ে আসবেন তার কাছে অনুলিপি করার জন্য। এভাবেই চলছিল এই মানুষটির শান্তিপূর্ণ জীবন, বছরে চারশ রুবল বেতন সহ যিনি খুব ভালো করেই জানতেন কিভাবে তার নিজের ভাগ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আর সেকারণে, হয়তো, তার জীবন হয়তো এভাবেই চলতো তার বৃদ্ধ হওয়া অবধি, যদি না বেশ কিছু বিপর্যয় ছড়িয়ে না থাকতো শুধুমাত্র টিটুলার নয়, প্রিভি, স্টেট, কোর্ট আর সব কাউন্সিলরদের পথেও, এমনকি তারাও, যারা কাউকে কোনোদিন উপদেশ যেমন দেননি, নিজেরাও কোনো উপদেশ পাননি।

পিটার্সবুর্গে যারা বছরে চারশ রুবল বা তার আশে পাশে বেতন পান, তাদের সবারই একটি শক্তিশালী শত্রু আছে। সেই শত্রুটি আর কেউ নয়, আমাদের উত্তরের শীত, উত্তরীয় হিম। যদিও কেউ কেউ আছেন, তারা হয়তো বলবেন, এই শীত স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। সকাল আটটা আর নয়টার মধ্যে, ঠিক যখন রাস্তা জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে কাজ অভিমুখী মানুষের ভীড়ে,  শীত এত তীব্র আর শক্তিশালী কামড় বসায় প্রতিটি নাকে, পুরোপুরি বৈষম্যহীনতার সাথে, অসহায় কেরানিরা আসলেই জানেন না তাদের নাক নিয়ে তারা কি করতে পারেন। এমন একটা সময় যখন এমনকি যারা উচ্চপদে আসীন, তাদেরও ভ্রূ, কপাল যন্ত্রণায় আক্রান্ত হয়, আর চোখে জমে ওঠে অশ্রু, অসহায় টিটুলার কাউন্সিলররা প্রায়শই কোনো প্রতিরোধ করতে পারেন না। শীতের এই আক্রমন থেকে তাদের মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে, যতটা দ্রুত সম্ভব ততটা দ্রুত দৌড়ানো, তাদের অকার্যকর ছোট গ্রেটকোট পড়ে, প্রায় পাঁচ ছয়টি বড় রাস্তার সমান পথ দৌড়ে তারপর দারোয়ানদের ঘরে ঢুকে প্রথমেই জোরে লাফালাফি ও মাটিতে পা ঠোকান, যতক্ষণ না দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের সব প্রতিভা আর দক্ষতা, আসার পথে যা এতক্ষণ ঠাণ্ডায় জমে শক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো আবার গলতে শুরু করে।

বেশ কিছুদিন ধরেই আকাকি আকাকিয়েভিচ বিশেষ করে তার পেছন আর কাধে বেশ তীব্রভাবে শীতের দংশন অনুভব করছিলেন, এমনকিও যদিও তিনি চেষ্টা করেছিলেন যে দূরত্ব তাকে অবশ্যই অতিক্রম করতে হবে সেটি তার পক্ষে যতটা সম্ভব ততটা দ্রুত অতিক্রম করার জন্য। অবশেষে তার মনে হয়েছিল, তার গ্রেটকোটটি এর জন্য দায়ী হতে পারে কিনা। ঘরে পৌছে খুব ভালোভাবে তিনি সেটি পরীক্ষা করে দেখেন, তিনি আবিষ্কার করেন যে, দুই তিনটি জায়গায় – যেমন পেছনে আর ঘাড়ের কাছে, এটি আর মোটা কাপড়ের কোট নেই, বরং রুপান্তরিত হয়েছে পাতা চিজক্লথে (১২): এটি এত বেশী ক্ষতিগ্রস্থ যে খুবই জীর্ণ, এবং এর ভিতরের কাপড়ের আস্তরণটিও টুকরো টুকরো হয়ে ছিড়ে গেছে। বিষয়টি অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে, আকাকি আকাকিয়েভিচের গ্রেটকোটটি তার অন্য সহকর্মীদের কাছে ছিল উপহাসের একটি বস্তু। এটি আসলে তার মহান খেতাব গ্রেটকোট থেকে বঞ্চিত হয়েছে ও পরিচিতি পেয়েছিল আকাকি আকাকিয়েভিচের ‘ড্রেসিং গাউন’ হিসাবে। আর এর গঠনটাও ছিল আসলেই খুব অদ্ভুত। কলারটি বছরপ্রতি ক্রমশ ছোট হয়েছে, কারণ এর কিছু টুকরো কোটের অন্য অংশে তালি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর সেই তালিগুলো কোনো দর্জির শিল্পের পরিচায়ক না এবং সার্বিক প্রভাবটি ছিল বাস্তবিকভাবে একটি থলের মত, সুন্দর হিসাবে যা চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। পুরো বিষয়টি জরিপ করার পর, আকাকি আকাকিয়েভিচ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তার গ্রেটকোটটিকে অবশ্য পেত্রোভিচের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

পেত্রোভিচ – একজন দর্জি, পেছনের সিড়ি বেয়ে উপরে তৃতীয় তলায় কোথাও তিনি থাকতেন, একটি কর্মক্ষম চোখ আর সারা মুখে গুটিবসন্তের দাগ থাকা সত্ত্বেও, পেত্রোভিচ বেশ ভালোই উপার্জন করতো কেরানিসহ ও সব ধরনের মানুষদের প্যান্ট আর ফ্রককোট মেরামত করে –অবশ্য যখন তিনি মাতাল অবস্থায় থাকতেন না কিংবা মাথায় অন্য আর কোনো পরিকল্পনাও কাজ করতো না। অবশ্যই, আমার উচিৎ নয় এই দর্জি সম্বন্ধে বেশী কিছু বলার, কিন্তু যেহেতু এখন নিয়ম, কোনো একটি কাহিনীর প্রতিটি চরিত্রকে পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। বেশ, তেমন কিছু বলারও নেই: আসুন পেত্রোভিচ কেমন সেটিও আমরা দেখি, প্রথম দিকে তিনি পরিচিত ছিল শুধুমাত্র গ্রিগোরি নামে, কোনো এক ভূস্বামীর সে সার্ফ বা ভূমিদাস ছিলেন, তিনি পেত্রোভিচ (১৩) নামটি বেছে নিয়েছিল যখন স্বাধীনতা পেয়েছিলেন, আর প্রতিটি ছুটিতে অত্যন্ত বেশী পরিমানে মদ পান করতেও শুরু করেছিলেন, প্রথম দিকে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ছুটির দিনগুলোয়, এরপর কোনো বাছবিচার ছাড়াই চার্চের সব ছুটির দিনে, যতক্ষণ ক্যালেণ্ডারে (১৪) একটা ছোট ক্রুশ চিহ্ন থাকবে। এই প্রসঙ্গে, তিনি তার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত ছিলেন, আর যখন তিনি তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করতেন, পেত্রোভিচ তাকে ভ্রষ্টচারী আর জার্মান মহিলা হিসাবে উল্লেখ করতেন। আর যেহেতু আমরা তার স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেছি এখন, তার সম্বন্ধেও দু একটা কথা বলা দরকার। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে খুব বেশী কিছু তার সম্বন্ধে কারোরই জানা নেই, শুধুমাত্র পেত্রোভিচের একজন স্ত্রী ছিলেন, এবং যিনি মাথায় চাদর দেবার বদলে বনেট (১৫) পরতেন। কিন্তু, তার সৌন্দর্য, স্পষ্টতই এমন কিছু ছিল না, যে সেটি নিয়ে কেউ গর্ব করতে পারে। অন্তত কিছু পাহারাদার সৈন্য, যাদের সাথে তার দেখা হয়েছিল ও যারা তার বনেটের নীচে উকি দিয়ে তার চেহারাটা দেখার চেষ্টা করেছে, তারা তাদের গোফ কাপিয়ে বরং অদ্ভুত কিছু শব্দ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছিল।

পেত্রোভিচের ঘরে যাবার সিড়ি বেয়ে ওঠার সময় – যে সিড়িগুলোর প্রতি সুবিচার করলে বলতে হবে, সেগুলো সবই পানি আর তরল আবর্জনায় সিক্ত, এবং স্পিরিটের গন্ধে এতই সম্পৃক্ত, যা আপনার চোখে জ্বালা ধরিয়ে দেবে, এবং যেমনটি সুপরিচিত, পিটার্সবুর্গের সব দালানের পেছনের সিড়িতে যাদের উপস্থিতি চিরস্থায়ী। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আকাকি আকাকিয়েভিচ ইতিমধ্যে ভাবতে শুরু করেছিলেন, পেত্রোভিচ কাজটি করার জন্য কি পরিমান পারিশ্রমিক দাবী করতে পারে, এবং তিনি মনস্থির করেছিলেন, যাই হোক না কেন তিনি তাকে দুই রুবলের বেশী কিছুতেই দেবেন না।

দরজা খোলাই ছিল, কারণ পেত্রোভিচের স্ত্রী, কোনো এক ধরনের মাছ রাধার সময় রান্নাঘর এতটাই ধোয়ায় পূর্ণ করেছিলেন, এমনকি তেলাপোকাদের দেখাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। আকাকি আকাকিয়েভিচ রান্নাঘর দিয়ে প্রবেশ করেন এমনকি গৃহকর্ত্রীর অলক্ষ্যেই, অবশেষে একটি ঘরে তিনি প্রবেশ করেন, যেখানে তিনি রঙহীন একটি চওড়া কাঠের টেবিলের উপর তুরস্কের পাশার মত পা ভাজ করে পেত্রোভিচকে বসে থাকতে দেখেন। পেত্রোভিচের পাগুলো, কাজে ব্যস্ত দর্জিদের যে নিয়ম, খালি ছিল। প্রথম যে জিনিসটা সেকারণে চোখে পড়বে, সেটি হচ্ছে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলগুলো, আকাকি আকাকিয়েভিচ ইতিমধ্যে যাদের সাথে খুব পরিচিত, খানিকটা বিকৃত নোখ, যা কচ্ছপের খোলশের মত মোটা আর শক্ত। পেত্রোভিচের ঘাড় থেকে ঝুলছে একটি রেশমী কাপড় আর কিছু তুলা, তার হাটুর উপরে বিছানো পুরোনো এক টুকরো  কাপড়। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সে তার সুইয়ে সুতো পরানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কিছুতে সফল হতে পারছিলেন না এবং খুব বেশী রেগে ছিলেন অন্ধকারের উপরেও, এমনকি সুতোর সাথেও, রেগে বিড়বিড় করছিলেন, ‘বেশ বেয়াড়া দেখছি, ভেতরে যেতে চাচ্ছিস না, কুত্তি কোথাকার, যথেষ্ট হয়েছে আর না’। সাথে সাথেই আকাকি আকাকিয়েভিচ অনুশোচনাবোধ করলেন এমন একটি মুহূর্তে সেখানে এসে পড়ার জন্যে, যখন কিনা ঠিক সেই মুহূর্তে পেত্রোভিচের মেজাজ বেশ গরম হতে শুরু করেছে। পেত্রোভিচকে তিনি এমন একটা সময় কাজ দিতে চাচ্ছিলেন যখন সে মদের প্রভাবে থাকে অথবা, যেমন তার স্ত্রী বলে থাকে, ‘এক চোখা শয়তানটা, বোতল টেনেছে’। সেই পরিস্থিতিতে পেত্রোভিচ সাধারণত, কোনো কিছু মেনে নেবার জন্য বেশ নমনীয় থাকেন এবং যৌক্তিক আচরণও করেন, এবং সারাক্ষণ কুর্নিশ করতে থাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে, অবশ্য সত্যি যে তার স্ত্রী এসে হাজির হবেন, চিৎকার করে অভিযোগ আর বিলাপ করে বলবেন যে তার স্বামী তখন নেশাগ্রস্থ ছিল, আর সেকারণে খুব কম পারিশ্রমিক সে দাবী করেছিল, কিন্তু আপনার যা করতে হবে তা হলো আরো দশ কোপেক ঢালতে হবে, আপনার সেলাইয়ের সব কাজ তাহলে সঠিক সময়ে তৈরী হয়ে যাবে।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পেত্রোভিচ সজ্ঞানে আছে- সেকারণে কঠোর আর অনমনীয় হবারই কথা, আর শয়তানই জানে কি পরিমান পারিশ্রমিকই না সে চেয়ে বসে তার কাজ করার জন্য। আকাকি আকাকিয়েভিচ বিষয়টি বুঝতে পেরে, যেমন বলা হয়, সেখান থেকে চম্পট দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। পেত্রোভিচ তার একটি ও একমাত্র চোখ সরু করে আকাকি আকাকিয়েভিচের দিকে মনোযোগ সহকারে তাকান  ; আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আকাকি আকাকিয়েভিচ উচ্চারণ করেন, ‘শুভদিন পেত্রোভিচ!’

‘আপনাকেও শুভদিন, স্যার!’ পেত্রোভিচ বলেন, তার দৃষ্টি অবশ্যই আকাকি আকাকিয়েভিচের হাতের দিকে আটকে আছে, তিনি অনুমান করতে চেষ্টা করছিলেন, কি পরিমান পারিশ্রমিক পাবার কাজ তিনি এনেছেন।

‘বেশ পেত্রোভিচ, এখানে, ইয়ে.. আমার কাছে একটা..’।

বলা প্রয়োজন যে আকাকি আকাকিয়েভিচ মূলত প্রসর্গ আর ক্রিয়া-বিশেষণ ব্যবহার করে নিজেকে প্রকাশ করে থাকতেন, আর,  পরিশেষে তার উচ্চারিত এই সব ছোট খাট অপ্রধান পদগুলো স্পষ্টতই কোনো অর্থ বহন করতে পারতো না। আর, যদিও বিষয়টি আসলেই খুবই বেশী অদ্ভুত, তার এমনকি অভ্যাস আছে কোনো কোনো বাক্য আদৌ শেষ না করারও। সুতরাং প্রায়শই যা ঘটতো, তিনি তার বাক্য শুরু করতেন এমন সব শব্দ দিয়ে, ‘এটা, আসলেই, ইয়ে, সব মিলিয়ে ..’, আর সেটাই এর শেষ। তিনি নিজেই বিস্মরিত হতেন এমন চিন্তা করে যে, সব কিছুই হয়তো ইতিমধ্যে বলা হয়ে গেছে।

‘কি বলছেন’? পেত্রোভিচ তাকে জিজ্ঞাসা করে, এবং একই সাথে তার এক চোখ পরীক্ষা করে দেখতে থাকে আকাকি আকাকিয়েভিচের ইউনিফর্মটি, কলার থেকে শুরু করে, হাতাগুলো, পেছনে, বোতামের ছিদ্রগুলো, সবকিছুই তার কাছে পরিচিত, কারণ এটা তার নিজেরই কাজ। দর্জিদের মধ্যে এমনই রীতির প্রচলন ছিল: এটাই তারা প্রথমে করে থাকেন যখন কারো সাথে তাদের দেখা হয়।

‘ইয়ে মানে, পেত্রোভিচ আমি এসেছি .. এই  গ্রেটকোট, কাপড়টা… তুমি দেখেছো, অন্য সব জায়গায় এটা বেশ শক্ত, শুধু কিছুটা ময়লা হয়েছে বলে পুরোনো মনে হয়, কিন্তু এটা নতুন, যদিও শুধুমাত্র একটি জায়গা আছে যেখানে, ইয়ে, খুব সামান্য, পেছনে আর এখানে কাধের উপর খানিকটা পুরোনো হয়ে পাতলা হয়ে গেছে, আর এই কাধের উপর এখানে, সব মিলিয়েই এটুকু, তুমি দেখেছো, খুব বেশী কাজ না’।

পেত্রোভিচ আকাকি আকাকিয়েভিচের ‘ড্রেসিং গাউনটা’ হাতে নেয়, আর সেটি টেবিলের উপর ছড়িয়ে বিছায়, অনেকক্ষণ ধরেই সেটি সে পরীক্ষা করে দেখে, পেত্রোভিচ মাথা নাড়ায়, তারপর জানালার তাকের উপর রাখা তার গোলাকৃতির, এক জেনারেলের প্রতিকৃতসহ তার নস্যির কৌটার দিকে হাত বাড়ান – ঠিক কোন জেনারেল সেটি অজানা, কারণ আঙ্গুল ঠিক সেই জায়গায় একটি ছিদ্র করেছে, যেখানে জেনারেলের মুখ ছিল এবং বর্তমানে ছোট আয়তাকার একটি কাগজ সেখানে সাটা আছে। এক চিমটি নস্যি নিয়ে, পেত্রোভিচ ড্রেসিং গাউনটিকে এবার তার দুই হাত দিয়ে তুলে ধরেন এবং আলোর বীপরিতে ভালো করে সেটি পরীক্ষা করে দেখেন, আরো একবার মাথা নাড়ান তিনি। তারপর ভিতরের কাপড়ের আস্তরণটি ধরে উপরে তুলে দেখে আবারো তিনি মাথা নাড়ান, আবারো  কাগজ দিয়ে ঢাকা জেনারেলের ছবিসহ নস্যির কৌটার মুখ খোলেন, নস্যি নেন নাকের ছিদ্রে, কৌটাটি বন্ধ করে সরিয়ে রেখে অবশেষে বলেন, ‘না, কাপড়ের অবস্থা খুবই করুন। এটা ঠিক করা আর সম্ভব না’।

এই কথা শুনে আকাকি আকাকিয়েভিচ বেশ দমে যান ।

‘কেন পেত্রোভিচ’?, শিশুর মত অনুনয়ের স্বরে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেন, শুধুমাত্র কাধের কাছটায় একটু পাতলা হয়ে গেছে – তোমার কাছে তো কত টুকরো আছে..  ’।

‘হ্যা, আমি কাপড়ের টুকরো ঠিকই খুজে পাবো, কাপড়ের টুকরো আছে ঠিকই’, পেত্রোভিচ বলেন, ‘কিন্তু কিভাবে আমি সেগুলো এর সাথে সেলাই করে জোড়া লাগাবো? পুরো জিনিসটাই তো পঁচে গেছে। এখানে একবার সুঁইয়ের ফোড় দিলে পুরো জিনিসটাই ছিড়ে যাবে’।

‘ইয়ে, ঠিক আছে, সোজা একটা তালি লাগিয়ে দাও তাহলে’।

‘কিন্তু তালি লাগানোর মত জায়গাতো আর নেই, কোনো জায়গায় ঠিক মতো কাপড় বসানো যাবে না, কাপড় খুবই পাতলা হয়ে গেছে, এত ফেসে গেছে যে এটাকে আর কাপড় বলা ঠিক হবে না। বাতাসের একটা ফু লাগলেই এটা উড়ে যাবে’।

‘তাহলে কোনোভাবে শক্ত করে নাও, মানে, আমি বলতে চাচ্ছি, ইয়ে, তুমিতো জানো’!

‘না’, বেশ দৃঢ়ভাবেই বলেন পেত্রোভিচ, ‘আমি কিছুই করতে পারবো না, এটার অবস্থা ভালো না, বরং ভালো হবে আপনার জন্য, পরের শীতের ঠাণ্ডার জন্য এটাকে পায়ের কাপড় বানিয়ে ফেললে। কারণ এইসব মোজায় তো আর বেশী পা গরম হবে না। এই বুদ্ধিটা জার্মানরা আবিষ্কার করেছে, যেন তারা বেশী করে টাকা আয় করতে পারে তাদের জন্য। ( পেত্রোভিচ জার্মানদের বিরুদ্ধে কিছু বলার জন্য কখনোই সুযোগ হাত ছাড়া করতেন না), আর গ্রেটকোট যদি বলেন, স্পষ্টতই অপনার দরকার একটা নতুন কোটের’।

‘নতুন’ শব্দটা শুনে আকাকি আকাকিয়েভিচের চোখগুলো ঝাপসা হয়ে ওঠে, আর যেন ঘরের সবকিছু তার সামনে ভাসতে শুরু করে। শুধুমাত্র তিনি যা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন – পেত্রোভিচের নস্যির কৌটার উপরে ঢাকনায় – কাগজ দিয়ে ঢাকা জেনারেলের মুখ।

‘কি বলছো তুমি – ‘নতুন’’? তিনি জিজ্ঞাসা করেন, যেন এখনও কোনো স্বপ্নে আছেন। ‘আমার কাছে তো সেটা করার মত কোনো টাকা হাতে নেই’।

‘হ্যা, নতুন’, পেত্রোভিচ নিষ্ঠুর শীতলতার সাথে আবার বলেন।

‘কিন্তু যদি, ধরো, ধরো একটা নতুন কোট হতে হয়, তাহলে সেটা..মানে ইয়ে?’

‘আপনি কি জানতে চাইছেন, কত টাকা লাগবে? ’

‘হ্যা’।

‘বেশ, দেড়শ রুবল আর কিছুটা বেশী হবে’, পেত্রোভিচ বলেন তার ঠোঁটগুলো যথেষ্ঠ গুরুত্ব সহকারে চেপে রাখেন। নাটকীয় প্রভাব সৃষ্টি করার প্রতি তার বিশেষ অনুরক্ততা আছে, তিনি পছন্দ করেন কোনো না কোনোভাবে একটি মানুষকে হঠাৎ করে পুরোপুরিভাবে সংশয়ে ফেলে দিতে, তারপর আড়চোখে তার মুখটা দেখতে,  যাকে কেবলই তিনি হতভম্ব করেছেন কিছু বলে।

‘একটা গ্রেটকোটের জন্য একশ পঞ্চাশ রুবল!’ অসহায় আকাকি আকাকিয়েভিচ চিৎকার করে ওঠেন – চিৎকার করে, তার জন্মের পর হয়তো এই প্রথমবারের মত, কারণ তিনি সবসময়েই তার কন্ঠস্বরে মৃদু সূক্ষ্মতার জন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলেন।

‘জ্বী স্যার, আর তারপরও সেটি খুবই সাধারণ কোট হবে, যদি আমরা কলারে মার্টেন (১৭) লাগাই আর রেশমী কাপড়ের লাইনিং সহ একটি মাথার ঢাকনী যোগ করি, তাহলে সেটি বানাতে আপনার খরচ নিয়ে যাবে প্রায় দুইশ রুবলের কাছাকাছি’।

‘দয়া করে, পেত্রোভিচ’, আকাকি আকাকিয়েভিচ আবারো অনুনয়ের স্বরে বলেন, পেত্রোভিচের কথা না শুনে কিংবা এমনকি তার সব নাটকীয় প্রভাবসহ কথাগুলো শোনার কোনো চেষ্টা না করেই, ‘কোনো না কোনোভাবে তুমি একটু ঠিক করে দাও, অন্ততপক্ষে আরো কিছুদিন যেন চালাতে পারি’।

‘না, সেটি ভালো হবে না, পরিশ্রমের অপচয় হবে শুধু, টাকা বাতাসে ওড়ানো হবে’, পেত্রোভিচ বলেন।

এই কথাগুলো বলার পর আকাকি আকাকিয়েভিচ প্রস্থান করেন পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে। তবে পেত্রোভিচ, দীর্ঘক্ষণ সেখানে দাড়িয়ে ছিলেন, ঠোট টিপে গম্ভীরভাবে তার কাজ শুরু না করেই, সন্তুষ্ট যে তিনি নিজেকে যেমন ছোট করেননি, তেমনি দর্জি শিল্পের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাও করেননি।

আকাকি আকাকিয়েভিচ যখন বাইরে বের হয়ে আসেন, তখন তিনি একটা স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ভাসছিলেন, ‘তাহলে…, অবস্থা এরকম তাহলে।’ তিনি স্বগোতক্তি করেন, ‘আমি সত্যিই কখোনো ভাবিনি, মানে, অনেকটা যেন..’ আর তারপর, বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর, তিনি যোগ করেন, ‘তাহলে অবস্থা হচ্ছে এটাই, অবশেষে পরিস্থিতি এমন হবে আমি কখনো ভাবিনি, আসলেই আমি কখনোই কল্পনা করতে পারিনি যে পরিস্থিতি এতটাই ..’; তারপর আরো একটি দীর্ঘবিরতি, এরপর তিনি উচ্চারণ করেন, ‘তাহলে সেটাই একমাত্র উপায়, আসলেই, পুরোপুরিভাবে, অপ্রত্যাশিত .. কে ভাবতে পেরেছিল .. কি অপ্রত্যাশিত ঘটনা’। এটি বলার পর, বাড়ি যাবার বদলে, তিনি পুরোপুরি বীপরিত দিক বরাবর হাটতে শুরু করেন, তিনি কি করছেন সেটি আদৌ খেয়াল না করে। যাবার পথে, একজন চিমনি পরিষ্কারক তার শরীরের অপরিষ্কার অংশের দিক দিয়ে তার গায়ে একটি ঘষা দিয়ে চলে যায়, তার কাধের অংশটা পুরোটাই কালো রঙ ধারণ করে চিমনীর কালো ঝুলে , এক টুপি ভর্তি চুন তার উপরে ঢেলে দেয়া হয় নির্মাণাধীন কোনো একটি দালানের উপর থেকে। তিনি এর কোনোটাই লক্ষ্য করেন না, আর শুধুমাত্র যখনই তিনি একজন নৈশ প্রহরীর সাথে ধাক্কা খান, যে কিনা তার হাতিয়ার, বল্লম আর বর্শার মিশ্রণ, পাশে হেলান দিয়ে রেখে, তার নস্যির কৌটা থেকে নস্যি ঝাকিয়ে বের করছিল তার শক্ত তালুতে, তখনই কেবল আকাকি আকাকিয়েভিচ তার সম্বিত ফিরে পান, কিন্তু তাও হতো না, কারণ প্রহরী তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘এভাবে সরাসরি আমার সাথে ধাক্কা দেবার কারণ কি? ফুটপাথে কি যথেষ্ট পরিমান জায়গা নেই আপনার জন্য?’ এই প্রশ্নটি তাকে পেছন ফিরে তাকাতে বাধ্য করে আর তিনি বাড়ি অভিমূখে ফিরতি যাত্রা শুরু করেন। শুধুমাত্র তখনই তিনি তার চিন্তাগুলো একসাথে জড়ো করতে শুরু করেন, স্পষ্টভাবে তার অবস্থান আসলে কোথায় সেটি তিনি দেখতে পান, নিজের সাথে তিনি কথা বলতে শুরু করেন, তবে ভাঙ্গা বাক্য বা অসংলগ্ন ভাবনায় নয়, বরং যুক্তিযুক্তভাবে, আর স্পষ্টভাবে, যেন কোনো বুদ্ধিমান পরিচিত এমন কারো সাথে তিনি কথা বলছেন, যার সাথে হৃদয়ের অন্তরঙ্গ সব বিষয়গুলো নিয়ে তিনি আলোচনা করতে পারেন। ‘না’, আকাকি আকাকিয়েভিচ বলে, ‘পেত্রোভিচের সাথে এখন কথা বলে কোনো লাভ নেই। এখন সে, ইয়ে.. মনে হয় তার স্ত্রী তাকে খানিকটা গালমন্দ করছে। ভালো হয় আমি তার সাথে যদি রোববার সকালে কোনো সময় দেখা করি। শনিবারের রাতের পর নিশ্চয় তার মাথা ভার থাকবে আগের রাতের অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য, এবং সকালে সেটি কাটানোর জন্য তার আরো খানিকটা মদ্য পান করার দরকার পড়বে, কিন্তু তার স্ত্রী যেহেতু আর তাকে কোনো টাকা দেবে না, সুতরাং ঠিক সেই সময়ে, আমি তার হাতে দশ কোপেক গুজে দেবো, এবং সে আরো বেশী নমনীয় হবে পারিশ্রমিকের ব্যপারে আর  গ্রেটকোটটি .. ’, এভাবে আকাকি আকাকিয়েভিচ যুক্তি দিচ্ছিলেন নিজেকে, তার মেজাজ খানিকটা উৎফুল্ল করার জন্য।

তিনি পরের রোববার অবধি অপেক্ষা করলেন। রোববার দূর থেকে লক্ষ্য করেন যখনই পেত্রোভিচের স্ত্রী কোথাও যাবার জন্য বের হয়েছে, তখনই সরাসরি পেত্রোভিচে ঘরে ভিতরে ঢুকলেন। পেত্রোভিচ তখন আসলেই শনিবার রাতের অতিমাত্রায় মদ্যপানের খেসারত দিতে হচ্ছে মাথার যন্ত্রণায়; তখনও সে আধো ঘুমে, তার পক্ষে কোনোমতে মাথাটা তোলা সম্ভব তখন, যাই হোক যখন সে বুঝতে পেরেছে আকাকি আকাকিয়েভিচ কেন এসেছেন, যেন শয়তান স্বয়ং তার পাশে এসে দাড়িয়েছে। ‘না, আমি পারবো না’, সে বলে, ‘দয়া করে নতুন একটা গ্রেটকোট বানানোর অর্ডার দেন।’ এই পর্যায়ে আকাকি আকাকিয়েভিচ তার হাতে দশ কোপেক হাতে গুজে দেয়। ‘আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি স্যার, আপনি আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করে এক ফোটা পান করবো’, পেত্রোভিচ বলে সাথে সাথে, ‘কিন্তু দয়া করে স্যার, আপনার গ্রেটকোট  নিয়ে আর ঝামেলায় যাবার দরকার নেই, ওটার দিন ফুরিয়ে গেছে, কোনো কাজে আর আসবে না। আপনাকে আমি নতুন একটা কোট সেলাই করে দেবো। হ্যা, স্যার, আমি আপনাকে কথা দিলাম!’

আকাকি আকাকিয়েভিচ আবার চেষ্টা করেন তালি দিয়ে আপাতত কাজ চালানোর মত কিছু করে দেয়া সংক্রান্ত কিছু বলতে, কিন্তু পেত্রোভিচ তা শুনতে অস্বীকার করেন, আর বলেন, ‘আমি অবশ্যই আপনাকে নতুন একটা কোট সেলাই করে দেবো, আমার কথার উপর ভরসা রাখুন, আমি সব চেষ্টাই করবো, আর যেহেতু এখন ফ্যাশন, আমরা এমনকি একটা রুপালী কাপড়ও লাগাতে পারবো কলারে’।

এই পর্যায়ে আকাকি আকাকিয়েভিচ অনুধাবন করেন তার এই নতুন গ্রেটকোট বানানো থেকে পালাবার আর কোনো উপায় নেই, পুরোপুরিভাবে হতাশা তাকে আচ্ছন্ন করে। আসলেই, সত্যি কিভাবে তিনি পারবেন? টাকা কোথা থেকে আসবে? অবশ্যই, আসন্ন ছুটির বোনাসের উপর তিনি ভরসা করতে পারেন, কিন্তু সেই টাকা বহুদিন আগে থেকেই ঠিক করা আছে কি কাজে লাগানো হবে। তার একটা নতুন প্যান্ট কেনা লাগবে, মুচির সাথে বহুদিনের ঋণ বোঝাপড়া করতে হবে, যে তার বুট জুতায় নতুন একটা তলা লাগিয়ে দেবে, দর্জির দোকান থেকে তার তিনটি শার্ট ও কয়েক জোড়া অন্তর্বাসের উপকরণ কিনতে হবে, ছাপার অক্ষরে যেগুলোর নাম প্রকাশ করাটা ভদ্রতা হবেনা। এক কথায়, পুরোপুরিভাবে সব টাকাই আগেই খরচ হয়ে গেছে, আর এমনকি যদি পরিচালক দয়াপরবশ হয়ে তাকে আরো একটি বোনাস দেয়, চল্লিশ রুবল না,পয়তাল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ, তারপরও খুব সামান্যই বাঁচবে সেখান থেকে-  গ্রেটকোট বানানোর জন্য যে মুলধন দরকার সেই সাগরের সেটি এক ফোটা মাত্র।

যদিও তিনি অবশ্য জানতেন, পেত্রোভিচের অভ্যাস আছে – কেউ জানে না কোথা থেকে  হঠাৎ করে সেই খেয়াল আসতো – অস্বাভাবিক দাম চেয়ে বসার, সে কারণে এমনকি তার স্ত্রীও চিৎকার না করে পারতো না, ‘তোমার কি কাণ্ডজ্ঞান সব লোপ পেয়েছে, গাধা কোথাকার? একদিন বিনাপয়সায় কাজ নেয়, পরের দিন কাধে শয়তান চাপে আর যা যোগ্যতা নেই তার চেয়ে বেশী দাম হেকে বসে।’ যদিও তিনি অবশ্য জানতেন যে, পেত্রোভিচ আশি রুবল হাতে পেলে কোট বানাবার কাজ হাতে নেবে, কিন্তু কোথায় পাবেন তিনি সেই আশি রুবল? এর অর্ধেক পরিমান টাকা তিনি হয়তো যোগাড় করতে পারবেন, অর্ধেক পরিমান হয়তো খুজে পাওয়া যাবে- বা হয়তো অর্ধেকের সামান্য কিছুটা বেশী। কিন্তু কোথায় তিনি বাকি অর্ধেকটা খুজে পাবেন? কিন্তু প্রথমে পাঠকদের জানা প্রয়োজন কিভাবে তিনি টাকাটির প্রথম অংশ যোগাড় করবেন। আকাকি আকাকিয়েভিচের একটা অভ্যাস ছিল, যখনই তিনি এক রুবল খরচ করতেন, তিনি আধা কোপেক সরিয়ে রাখতেন একটি ছোট তালা লাগানো বাক্সে, যার ঢাকনীতে একটা ছিদ্র আছে পয়সা ঢালার জন্য। প্রতি ছয় মাস পর পর তিনি জমানো তামার পয়সাগুলো গুনে জড়ো করে সেগুলো বদলে নিতেন রুপার মূদ্রা দিয়ে। এই কাজটি তিনি করছেন বহুদিন ধরেই, সুতরাং  জমানো টাকার পরিমানটাও কয়েক বছর ধরে বেড়েছে, যেখানে দেখা যায় চল্লিশ রুবলেরও বেশী আছে। সুতরাং অর্ধেক টাকা তার হাতে আছে, কিন্তু বাকী অর্ধেক তিনি কোথা থেকে যোগাড় করবেন? কোথা থেকে তিনি বাকী চল্লিশ রুবল যোগাড় করবেন? আকাকি আকাকিয়েভিচ অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অন্তত এক বছরের জন্য তিনি তার জীবনযাত্রার খরচ আরো কমাবেন: তার সন্ধ্যাবেলায় চা খাবার অভ্যাসটি বাদ দেবেন, সন্ধ্যাবেলায় মোমবাতি জ্বালানো বাদ দেবেন, যদি কিছু তাকে অবশ্যই করতে হয়, তাহলে বাড়িওয়ালীর ঘরে গিয়ে তার মোমবাতির আলোয় কাজ করবেন, খুব সাবধানে হালকাভাবে হাটবেন, প্রায় পায়ের আঙ্গুলে ভর করে, পাথর আর টালিপাথরের উপর, যেন তার জুতার তলি খুব দ্রত ক্ষয় না হয়ে যায়, যতটা কম সম্ভব কাপড় তিনি ধোপায় ধুতে পাঠাবেন, সেগুলো যেন বেশী ময়লা না হয়, বাসায় ফিরে সেগুলো দ্রুত খুলে ফেলবেন আর দিনের বাকী অংশে তিনি শুধু ঘরে পরার সুতির কাপড়টি পড়বেন, একটি হাউসকোট, যে কাপড়টি এতই প্রাচীন এমনকি সময়ও সেটি স্পর্শ করতে ভুলে গেছে।

সত্যি কথা যদি বলতে হয়, প্রথম দিকে এই সব বিধিনিষেধ মানা তার জন্য বেশ কষ্টকর মনে হয়েছিল, কিন্তু তারপর সবকিছুই তার অভ্যাসে পরিণত হয়, সব কিছুই মসৃণভাবেই চলতে শুরু করে। সন্ধ্যাবেলায় কোনো কিছু না খেয়ে নিজেকে অভুক্ত রাখার ক্ষেত্রে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে সফল হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অন্যদিকে আবার চিন্তায় ভবিষ্যৎ গ্রেটকোটের একটি চিরন্তন ধারণা সারাক্ষণ বহন করার মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক পুষ্টিও পেয়েছিলেন, আর তখন থেকেই যেন মনে হয়েছিল তার অস্তিত্বটাই কোনো না কোনোভাবে আরো বেশী পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, যেন তিনি কাউকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেয়েছেন, যেন তার পাশে সেখানে কেউ আছে, যেন তার একাকীত্বের দিন অবশেষে শেষ হয়েছে, আর চমৎকার কোনো আত্মার বান্ধব রাজী হয়ে হয়েছে তার পাশে জীবনের পথে হাটতে – আর এই সঙ্গীটি আর কেউ না তার সেই ভবিষ্যৎ গ্রেটকোটটি ছাড়া, যার সেলাই করা পুরু কাপড় এবং শক্তিশালী ভিতরের আবরণ কখনোই ক্ষয়ে যাবে না। তিনি কোনো না কোনোভাবে আরো বেশী জীবন্ত, এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন, সেই মানুষের মত যিনি তার নিজের জন্য একটি লক্ষ্য চিহ্নিত করেছেন এবং সেটি অর্জন করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়েছেন। সংশয় আর সিদ্ধান্তহীনতা, এক কথায় তার চরিত্রের সব অনিশ্চয়তা আর অনির্দিষ্টতা অদৃশ্য হয়েছিল  – তার চেহারা ও কাজ থেকেও, যেন স্বেচ্ছায়। একটি আগুন মাঝে মাঝে তার চোখে জ্বলতে দেখা যেত সেই সময়, এমনকি তার মনে আরো বেশী সাহসী আর উদ্ধত চিন্তা জ্বলে উঠতো: আসলেই তার কি উচিৎ ছিল একটি মার্টেন কলার নেবার, যত খরচই হোকনা কেন? আর এই ভাবনাগুলো প্রায়ই তাকে অন্যমনস্ক করে তুলতো। একবার, কিছু কাগজ অনুলিপি করার সময়, তিনি প্রায় একটি ভুল করে ফেলেছিলেন, যার ফলে তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলেন জোরে, ‘ওহ!’ বলে, তারপর সাথে সাথে নিজের উপর ক্রুশ চিহ্ন এঁকেছিলেন।

প্রতি মাসে তিনি অন্তত একবার করে পেত্রোভিচের সাথে দেখা করতেন তার গ্রেটকোটটি নিয়ে কথা বলার জন্য আর আলোচনা করার জন্য কোথা থেকে কাপড় কেনা উত্তম হবে, কাপড়ের কি রঙ হওয়া উচিৎ, আর দামই বা কেমন – আর, যদিও, কিছুটা চিন্তিত, তবে তিনি সবসময়ই বাড়ি ফিরতেন সন্তুষ্ট হয়ে এই ভেবে যে, অবশেষে একটি সময় আসবে যখন সব কিছু কেনা হয়ে যাবে এবং তার গ্রেটকোটটি বানানোও শেষ হবে। তার প্রত্যাশা যেমন ছিল সবকিছু তার চেয়ে দ্রুত সামনে অগ্রসর হতে থাকে। সব প্রত্যাশার বীপরিত, পরিচালক আকাকি আকাকিয়েভিচকে চল্লিশ বা পয়তাল্লিশ না বরং ষাট রুবলের কোনো অংশে কম নয় এমন একটি বোনাসের ব্যবস্থা করে দেন: তিনি হয়তো ধারণা করেছিলেন আকাকি আকাকিয়েভিচের একটি নতুন গ্রেটকোটের প্রয়োজন আছে অথবা শুধুমাত্র ঘটনাচক্রেই হতে পারে, কিন্তু যাই হোক এর ফলে, আকাকি আকাকিয়েভিচ বাড়তি বিশ রুবল হাতে পেয়েছিলেন। পরিস্থিতিটি তাই ঘটনা প্রবাহকে আরো তরান্বিত করেছিল।

আরো দুই তিন মাসের মোটামুটি অভুক্ত থাকার পর আকাকি আকাকিয়েভিচ সত্যিই আশি রুবল যোগাড় করেছিলেন। তার হৃৎপিণ্ড, এমনিতে যা খুব শান্ত, দ্রুত স্পন্দিত হতে থাকে। ঠিক পরের দিনই তিনি পেত্রোভিচকে সাথে নিয়ে দোকানের উদ্দেশ্যে বের হন। খুব দেখে শুনে ভালো মানের একটি কাপড় কেনেন তারা, আর সেটাই স্বাভাবিক, কারণ তারা এই কাপড় নিয়ে কথা বলছেন গত ছয় মাস ধরে। আর খুব কম মাসই অতিক্রম হয়েছে যে মাসে তারা নানা দোকানে ঘুরে বিভিন্ন কাপড়ের দাম তুলনা আর দরদাম করেননি। এখন পেত্রোভিচ নিজেই বলছেন, এর চেয়ে ভালো মানের কোনো কাপড় আর হবেনা । ভিতরের কাপড়ের আস্তরণের জন্য তারা ক্যালিকো কাপড় বেছে নেয়, কিন্তু এত শক্তিশালী, ভালো মানের ক্যালিকো, পেত্রোভিচের ভাষায় যা সিল্কের চেয়েও উত্তম, আরো বেশী চকচকে, আর দেখতেও অনেক ভালো। তারা অবশ্য মারটেন কেনেননি, কারণ আসলেই সেটির দাম ছিল বেশ চড়া, বরং এর বদলে তারা বিড়ালের ফার পছন্দ করেন, দোকানের সবচেয়ে সেরাটি, এমনই যে, দূর থেকে যা দেখে সবসময়ই মনে হবে যেন মার্টেন।

পেত্রোভিচ পুরো দুই সপ্তাহ ধরে কাজ করেন গ্রেটকোটটা নিয়ে, কারণ অনেক সেলাই করার কাজ ছিল, নয়তো অনেক আগেই এটি তৈরী হয়ে যেত। তার কাজের জন্য পেত্রোভিচ বারো রুবল পারিশ্রমিক দাবী করেছিলেন, এর চেয়ে কম নেবার প্রশ্নই ওঠেনা। সবকিছু বেশ শক্তভাবে রেশমী সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছে, সূক্ষ্ম জোড় সেলাই, তারপর পেত্রোভেচ প্রতিটি সেলাই তার নিজের দাঁত দিয়ে পরীক্ষা করেও দেখেছে, এছাড়াও নানা ধরনের নক্সাও সেলাই করেছিলেন তিনি।

 

অবশেষে একদিন … খুব কঠিন হবে সঠিক করে বলা ঠিক কোনদিন, তবে সম্ভবত সেটাই ছিল আকাকি আকাকিয়েভিচের জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম দিন, কারণ পেত্রোভিচ তার নতুন গ্রেটকোটটি নিয়ে এসেছিল সেদিন। সকালে, ঠিক যখন কাজে যাবার জন্য তিনি বের হচ্ছিলেন, তখনই পেত্রোভিচ তার নতুন গ্রেটকোটটি নিয়ে এসেছিল। আর গ্রেটকোটটি নিয়ে আসার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কোনো সময়ও হতে পারেনা, কারণ শীতের তীব্রতা কেবল শুরু হয়েছে, এবং আরো তীব্র হবে এমনিই হুমকি দিচ্ছে। এমন সময় পেত্রোভিচ তার গ্রেটকোটটি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন যেমন কোনো ভালো দর্জি করে থাকেন। পেত্রোভিচের চেহারায় গুরুত্বপূর্ণ কিছুর এমন একটি অর্থপূর্ণ অভিব্যক্তি ছিল যা আকাকি আকাকিয়েভিচ এর আগে কখনোই দেখেননি। স্পষ্টতই খুব ভালো করে তিনি জানতেন এটা কোনো সামান্য অর্জন নয় এবং হঠাৎ করেই যেন তার ব্যক্তিত্বে সে প্রকাশ করছিল সেই বিশাল ব্যবধানটি, যা বিভাজিত করে শুধু কাপড় টুকিটাকি ঠিক করা কিংবা ভিতরে আস্তরণ লাগানো দর্জিদের থেকে সব দর্জিদের, যারা নতুন কাপড় কেটে সম্পুর্ন জামা তৈরী করেন।

পেত্রোভিচ বড় একটা রুমালের আবরণ থেকে গ্রেটকোটটা বের করেন, যা দিয়ে তিনি এটি ঢেকে নিয়ে এসেছিলেন, সেই  রুমালটি কেবলই ধোপার বাড়ি থেকে এসেছে, খুব ভালো করে ভাজ করে পেত্রোভিচ সেটি তার পকেটে রেখে দেন পরে তার নাকের জন্য ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে। গ্রেটকোটটি বের করার পর, অনেক গর্বের সাথে তিনি সেটির দিকে তাকান, আর দুই হাতে সেটি তুলে ধরেন, এরপর পেত্রোভিচ খুব দক্ষতার সাথে আকাকি আকাকিয়েভিচের কাধের উপর সেটি বিছিয়ে দেন, তারপর বেশ আত্মবিশ্বাসী লঘুচিত্ততার সাথে নীচের দিকে একটি হ্যাচকা টান দিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচের পিঠের উপর ঠিক মত ছড়িয়ে দেন কোটটি, কেপ বা লম্বা ঝোলানো কাপড়ের মত। আকাকি আকাকিয়েভিচ আর যেহেতু অল্পবয়সী নন, তিনি সঠিকভাবে সেটি গায়ে পরে দেখতে চেয়েছিলেন। পেত্রোভিচ তাকে সাহায্য করেন জামার আস্তিনে হাত ঢোকানোর জন্য- ঠিক মাপমতই হয় সেটি। এককথায় গ্রেটকোটটি নিঁখুত আর সঠিকভাবে তার শরীরে সাথে মানানসই হয়। পেত্রোভিচও বিরত থাকেননি বিষয়টি উল্লেখ করতে যে, যেহেতু তিনি একটি ছোট রাস্তায় কোনো সাইনবোর্ড ছাড়া বাস করেন আর যেহেতু আকাকি আকাকিয়েভিচকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেনেন, সে কারণে তিনি খুব কম পারিশ্রমিক দাবী করেছেন। নেভস্কি প্রসপেক্টে আকাকি আকাকিয়েভিচকে পচাত্তর রুবল দিতে হতো শুধুমাত্র সেলাইয়ের কাজটি করার জন্য। আর এই বিষয়টি নিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচ পেত্রোভিচের সাথে আলোচনা করতে চাননি। কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন এত বড় অংক শুনে, যা পেত্রোভিচের জিহবা থেকে বের হয়ে এসেছিল যখন তিনি তাকে তার দক্ষতা দেখিয়ে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছিলেন।

আকাকি আকাকিয়েভিচ পেত্রোভিচের সাথে তার হিসাব মিটিয়ে ফেলেন, তাকে ধন্যবাদ জানান, এবং সাথে সাথে তার বিভাগের দিকে রওনা দেন তার নতুন গ্রেটকোটটি পরে। পেত্রোভিচও তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে আসেন, তিনি রাস্তায় কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকেন, দূর থেকে তারা বানানো গ্রেটকোটটি দেখার জন্য। তারপর একটি আঁকাবাঁকা ঘুরপথে তিনি হেটে আসেন, যেন তিনি আকাকি আকাকিয়েভিচকে অতিক্রম করে যেতে পারেন। রাস্তায় তার সামনে দৌড়ে যান, তার বানানো গ্রেটকোটটি আবার দেখার জন্য। এবার অন্যদিক থেকে, সেটি হলো, সরাসরি মুখোমুখি। অন্যদিকে আকাকি আকাকিয়েভিচ হাটছিলেন পুরোপুরি উৎসবের আনন্দময় মেজাজে। প্রতিটি মুহূর্তে তিনি তার নতুন গ্রেটকোটটিকে তার কাধের উপর অনুভব করছিলেন, এবং বেশ কয়েকবার তার মনের সন্তুষ্টিতে তিনি আপনমনে হাসেনও। কোটটি, আসলেই দ্বিগুণ সুবিধাজনক: প্রথমত, এটি উষ্ণ, দ্বিতীয় একটি ভালো। আদৌ তিনি খেয়াল করেননি অফিস অভিমূখে তার যাত্রাপথের দূরত্বটি, এবং, হঠাৎ করেই, তিনি নিজেকে তার বিভাগীয় দপ্তরে আবিষ্কার করেন। সামনের অভ্যর্থনা কক্ষে তার গ্রেটকোটট খুলে রাখেন তিনি, আবার ভালো করে লক্ষ্য করেন, এবং পাহারাদারের বিশেষ সুরক্ষায় সেটি রেখে আসেন।

ঠিক কিভাবে হয়েছিল সেটি অজানা, কিন্তু হঠাৎ করে বিভাগের সবাই জানতে পারেন যে, আকাকি আকাকিয়েভিচ নতুন একটি গ্রেটকোট সেলাই করিয়েছে, তার সেই অতিব্যবহারে জীর্ণ ‘ড্রেসিং গাউনটি’ আর নেই। সাথে সাথেই তারা সবাই দৌড়ে যান অভ্যর্থনা কক্ষে রাখা আকাকি আকাকিয়েভিচের নতুন গ্রেটকোটটি দেখতে। তারা সবাই তাকে সম্ভাষণ আর শুভেচ্ছা জানান, তিনি তার উত্তরে মৃদু হাসা ছাড়া আর কিছু করতে পারেন না, তারপর তিনি লজ্জা পেতে শুরু করেন। যখন সবাই তাকে ঘিরে ধরে এবং বলতে থাকে যে তার নতুন গ্রেটকোটটিকে অবশ্যই দীক্ষিত করতে হবে, আর কমপক্ষে তিনি যা করতে পারেন তা হলো সবাইকে নিমন্ত্রন করে খাওয়াতে হবে। আকাকি আকাকিয়েভিচ পুরোপুরি হতবাক হয়ে পড়েন, কোনো ধারণাই ছিল না তার কি করবেন সেই পরিস্থিতিতে, এর উত্তর দেবেন কিভাবে, কিভাবে নিজেকে এই সমস্যা থেকে বাঁচাতে ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। কয়েক মিনিট পর, লজ্জায় লাল হয়ে, সবাইকে সরলভাবে তিনি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন এই বলে যে, এটি আসলে নতুন গ্রেটকোট না, এটি শুধুমাত্র, শুধুমাত্র পুরোনো একটা গ্রেটকোট। অবশেষে একজন কর্মকর্তা, সম্ভবত প্রধানের সহকারী – যিনি সম্ভবত দেখাতে চাইছিলেন, তিনি নিজে কোনো ভাবেই নাক উঁচু কেউ নন, এমনকি তার অধস্তন কর্মকর্তাদের সাথেও তিনি স্বাচ্ছন্দে মেলামেশা করেন, তিনি বললেন, ‘বেশ তবে তাই হোক, আমি আকাকি আকাকিয়েভিচের পক্ষ হয়ে সবাইকে নিমন্ত্রণ দিচ্ছি, আমি আপনাদের নিমন্ত্রণ করছি আমার সাথে রাতে খাবার জন্যে। সৌভাগ্যক্রমে ও ঘটনাচক্রে, আজ আমার জন্মদিনও’। কেরানিরা অবশ্যই, সবাই একই সাথে শুভেচ্ছা জানান প্রধানের সহকারীকে ও তারা সেই নিমন্ত্রণ গ্রহন করলেন খুবই আগ্রহের সাথে। আকাকি আকাকিয়েভিচ অবশ্য সেখানে না যাবার জন্য অজুহাত উপস্থাপন করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু উপস্থিত সবাই তাকে মনে করে দেয়, এমন কিছু করা খুবই অভদ্রতা হবে, বেশ কয়েকবার আওয়াজও শোনা যায়, ‘খুব লজ্জার ব্যাপার!, খুব লজ্জার ব্যপার!’ সুতরাং নিমন্ত্রনটি প্রত্যাখান করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল ।

পরে, যদিও তিনি বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন অনুধাবন করে যে, এবার তিনি সন্ধ্যায় তার গ্রেটকোটটি পরে হাটতে বের হতে পারবেন। আকাকি আকাকিয়েভিচের জন্য সেই দিনটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর কোনো ছুটির দিনের মত। খুবই আনন্দপূ্র্ণ মেজাজ নিয়ে তিনি বাসায় ফিরেছিলেন সেদিন। তার গ্রেটকোটটি খুলে, দেয়ালে খুব সযত্নে ঝুলিয়ে রাখেন তিনি, আরো একবার এর কাপড় আর ভিতরের সেলাইয়ের প্রশংসা করেন তিনি, আর তারপর তুলনা করার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি তার পুরোনো ‘ড্রেসিং গাউনটি’ বের করেন। যা এখন প্রায় পুরোটাই নানা জায়গায় পাতলা হয়ে ছিড়ে গেছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে এমনকি তিনি হাসতে শুরু করেন: দুটির মধ্যে পার্থক্য কত বিশাল। আর অনেক সময় পরে, খাবার সময়ও, তিনি মনে মনে হাসছিলেন যখনই ড্রেসিং গাউনটির বর্তমান অবস্থার কথা তার মনে পড়েছে। খুব সতর্কতার সাথে তিনি কিছু খেয়ে নিলেন এবং খাবারের পর তিনি আজ আর কিছু লিখলেন না, একটি কাগজও না; বিলাসীভাবে তিনি তার বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন, যতক্ষণ না সন্ধ্যা হয়। তারপর, আর সময় নষ্ট না করে, তার গ্রেটকোটটি পরে রাস্তায় বের হন।  ঠিক কোথায় সেই সরকারী কর্মকর্তাটি বাস করেন যিনি তাকে নিমন্ত্রণ করেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি সেটি বলতে পারবো না। আমাদের স্মৃতি ভয়ানকভাবে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করেছে, আর পিটার্সবুর্গে কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাড়ি, সব মিলে মিশে আর অস্পষ্ট হয়ে গেছে আমাদের মস্তিষ্কে; সুশৃঙ্খল কোনো উপায়ে আমরা আদৌ কিছু মনে করতে পারবো না সেখানে থেকে।

তবে যাই হোক না কেন, অন্তত নিশ্চিৎভাবে বলা যেতে পারে বড় সরকারী কর্মকর্তারা সবাই শহরের উত্তম অংশে বাস করতেন, আর সেকারণে জায়গাটি অবশ্যই আকাকি আকাকিয়েভিচের যেখানে থাকেন, তার খুব কাছাকাছি কোথাও নয়। প্রথমে আকাকি আকাকিয়েভিচকে জনশূন্য রাস্তা পার হতে হয় বেশ কিছু, যেখানে খুব সামান্যই আলো জ্বলছিল, কিন্তু যখনই তিনি সরকারী কর্মকর্তার বাসার কাছাকাছি অগ্রসর হতে থাকেন, রাস্তাও ক্রমশ আরো প্রাণবন্ত, জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে, এবং আরো বেশী আলোকোজ্জ্বলও হয়ে ওঠে। পথচারীরা আরো নিয়মিত, সুন্দর কাপড় পরা রমণীদের সেখানে দেখা যায়, আর সেখানে বিভার (১৮) কলার ক্রমশ আবির্ভূত হতে থাকে পুরুষদের শরীরে, কৃষকদের পেরেক দিয়ে আটকে রাখা কাঠের তক্তার ঠেলাগাড়ী অনেক কম দেখা যেতে থাকে, বরং সেখানে দেখা যায়, লাল ভেলভেটের টুপি পরা কোচওয়ান, সোনালী চকচকে শ্লেড গাড়ীগুলো; ভালুকের চামড়ার কার্পেট আর ডোরা কাটা কাপড়ে মোড়া সেই গাড়িগুলো রাস্তা দিয়ে গড়াতে গড়াতে যাচ্ছে বরফের উপর তাদের চাকার শব্দ তুলে। আকাকি আকাকিয়েভিচ এইসব কিছু এমনভাবে দেখছিলেন যেন এরকম আর কিছু তিনি কোনোদিনও দেখেননি। বেশ কয়েক বছর হলো তিনি সন্ধ্যার পর বের হয়েছেন রাস্তায়।

কৌতুহল নিয়ে তিনি একটি আলোকোজ্জ্বল দোকানের জানালার সামনে এসে দাড়ান, খুব সুন্দরী একটি রমনী তার জুতো খুলছে এমন একটি চিত্রকর্ম দেখতে, ছবিতে রমনীর পুরো পা নগ্ন, খুব চমৎকার তার গড়ন, আর তার পেছনে জুলফি আর থুতনীতে পরিপাটি ইমপেরিয়াল শৈলীর দাড়িসহ একজন ভদ্রলোক দরজা দিয়ে উকি দিচ্ছেন। আকাকি আকাকিয়েভিচ তার মাথা নাড়ান ও হাসেন, তারপর তার গন্তব্য বরাবর হাটতে শুরু করেন। কেন তিনি হেসেছিলেন? হয়তো এর কারণ তিনি এমন কিছু দেখেছেন যার সাথে তিনি বেশ অপরিচিত, কিন্তু সেটির জন্য আমাদের সবারই, যাই হোক না কেন, কিছু না কিছু প্রবৃত্তিগত অনুভূতি আছে, অথবা এর কারণ অন্য অনেক কেরানির মত তিনি ভেবেছিলেন, ‘বেশ, আসলেই এই ফরাসী পুরুষগুলো, আর কি বলার আছে? যখন তারা কিছু চায়, পাগল হয়ে যায়, যেমন ঠিক যেন, ইয়ে, আসলে, ইয়ে…’। অথবা তিনি হয়তো এমন কিছু চিন্তাও করেননি –  যাই হোক এমন তো নয় যে, আপনি একটি মানুষের আত্মায় প্রবেশ করতে পারবেন আর তার সব চিন্তার কথাও জানতে পারবেন।

অবশেষে তিনি সেই ভবনটির কাছে পৌছান, যেখানে প্রধানের সহকারী বাস করেন। প্রধানের সহকারী বেশ বিলাসিতার সাথেই বসবাস করতেন: দোতালায়। তার বাসায় উপরে ওঠার সিড়ির পথটি বেশ আলোকিত, সামনের ঘরটিতে ঢোকার পর আকাকি আকাকিয়েভিচ এক সারি গালোশ বা রাবারের জুতা দেখতে পান, এই সারিগুলোর মধ্যে, ঘরের মাঝখানে, একটি সামোভার (১৯) রাখা, হিস হিস শব্দ করে সেটি বাষ্পের মেঘ উগরে দিচ্ছে। পুরো দেয়াল জুড়ে ঘণ হয়ে ঝুলে আছে বহু গ্রেটকোট আর ক্লোক, তাদের কোনো কোনোটার বিভার অথবা ভেলভেটের কলারও আছে। দেয়ালের পিছন থেকে আসা একটি সাধারণ হট্টোগোলের আওয়াজও তিনি শুনতে পান, যা হঠাৎ করেই স্পষ্ট ও আরো তীব্র হয়, যখন দরজাটি খুলে যায় আর খালি গ্লাস সাজানো একটি ট্রে , ক্রিম ভরা একটি জগ আর বিস্কুটের একটি ঝুড়িসহ একজন গৃহভৃত্য বের হয়ে আসেন সেই ঘরটি থেকে। স্পষ্টতই কেরানিরা সবাই সেখানে এসেছেন বেশ অনেকক্ষণ আগে এবং ইতিমধ্যেই তারা তাদের প্রথম গ্লাস চাও পান করে ফেলেছেন।

আকাকি আকাকিয়েভিচ, তার নিজের গ্রেটকোটটি দেয়ালে সাবধানে ঝুলিয়ে রাখার পর সেই ঘরটিতে প্রবেশ করেন, এবং তার চোখের সামনে একসাথে হঠাৎ করে আবির্ভুত হয় মোমাবাতি, কেরানিরা, পাইপ, তাশ খেলার টেবিল, আর কানের উপর হামলে পড়ে কথোপকথনের নানা সোরগোল, এদিক ওদিক চেয়ার সরানোর শব্দ,  চারিদিক থেকে যে শব্দগুলো ভেসে আসছিল; রুমের মাঝখানে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে দাড়িয়ে থাকেন তিনি, চারপাশে তাকিয়ে চেষ্টা করেন ভাবতে কি করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে অন্যরা লক্ষ্য করেছিলেন, সবাই উচ্চস্বরে তাকে শুভেচ্ছা জানান, এবং একসাথে সবাই আবার বাইরের রুমে এসে তার গ্রেটকোটটি পরীক্ষা করেও দেখেন। আকাকি আকাকিয়েভিচ কিছুটা বিব্রত হন, কিন্তু তারপরও, সরলমনা হবার কারণে খুশি না হয়ে পারছিলেন না যেভাবে সবাই তার গ্রেটকোটটির প্রশংসা করছিলেন। তারপর, অবশ্যই, সবাই তাকে ও তার গ্রেটকোটটিকে ছেড়ে মনোযোগ দেয়, স্বাভাবিকভাবেই, হুইস্ট তাশ খেলার টেবিলের দিকে। এইসব –  আওয়াজ, কথাবার্তা, মানুষের অতি ভীড়  সবকিছু আকাকি আকাকিয়েভিচের কাছে খুব বেশী অদ্ভুত মনে হয়। আসলেই তার জানা ছিল না তিনি কি করবেন সেখানে, কোথায় তিনি তার হাত, পা বা পুরো শরীরটাকে রাখবেন । অবশেষ তিনি একটি তাশের টেবিলে এসে বসেন, কার্ডের দিকে তাকান, একটার পর একটা মুখের দিকে গভীরভাবে তাকান, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই  তিনি হাই তুলতে আর ক্লান্তি অনুভব করতে শুরু করেন আরো বেশী করে কারণ ততক্ষণে অনেক আগেই পার হয়ে গেছে সেই সময়, যখন তিনি সাধারণত ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েন। তিনি সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে চান বিদায় নিয়ে, কিন্তু অন্যরা তাকে বাধা দেন, তারা বলেন নতুন গ্রেটকোটের সন্মানে তাকে অবশ্যই শ্যাম্পেন পান করতে হবে।

এক ঘন্টা পর রাতের খাবার পরিবশেন করা হয়: রুশ সালাদ, ঠাণ্ডা বাছুরের মাংস, পাতে বা মাংসের কিমার পেস্ট, মিস্টি পেস্ট্রি আর শ্যাম্পেন। আকাকি আকাকিয়েভিচকে দুই গ্লাস শ্যাম্পেন পান করতে বাধ্য করা হয়, এরপর পুরো ঘরটি আরো বেশী যেন আনন্দময় হয়ে উঠেছিল তার কাছে। কিন্তু তিনি ভুলতে পারেননি যে তখন রাত বারোটা বাজে, তার বাড়ি ফেরা কথা ছিল আরো অনেক আগে। তাকে যেন বাড়ির কর্তা আর আটকে রাখতে না পারেন, তিনি কাউকে কিছু না বলেই ঘর থেকে বের হয়ে আসেন, সামনের ঘরে এসে তার গ্রেটকোটটি খোঁজেন, আক্ষেপসহ লক্ষ্য করেন, সেটি মেঝেতে পড়ে আছে। শেষ ময়লাটুকু সরানোর জন্য গ্রেটকোটটিকে ভালো করে অনেকক্ষণ ধরে ঝেড়ে নেন তিনি, তারপর সেটি গায়ে পরে নিয়ে নীচে নেমে এসে রাস্তায় বের হয়ে আসেন।

তখনও বাইরে আলো জ্বলছে। অল্প কিছু ছোট মুদির দোকান– গৃহভৃত্য ও নানা ধরনের মানুষদের সর্বক্ষণ মিলিত হবার স্থান – তখনও খোলা ছিল, আর এমনকি যেগুলো বন্ধ, সেগুলোর দরজার পাল্লা অবধি আলোর লম্বা ফালি, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে সেগুলো এখনো পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়নি, আর গৃহভৃত্য কর্মচারীরা সম্ভবত এখনও তাদের গল্প আর আলোচনার জাল বুনছে, তাদের বিস্মিত মনিবদের কারোরই হয়তো জানা নেই এখন তারা ঠিক কোথায়। বেশ আনন্দপূর্ণ মেজাজ নিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচ হাটছিলেন। তিনি এমনকি প্রায় দৌড়াতে শুরু করেছিল, কোনো এক অজানা কারণে, যখন তার পাশ দিয়ে বিদ্যুৎচমকের মত একজন মহিলা অতিক্রম করেছিল, যার শরীর পূর্ণ অসাধারণ গতিময়তায়। তবে আবারো তিনি হঠাৎ করেই ধীরে চলতে শুরু করেন, আগের মন্থর গতি আবারো ফিরে আসে তার হাটায়, , হঠাৎ করে তার মধ্যে প্রাণশক্তির আগমন লক্ষ্য করে অন্য যে কারো মতই বিস্মিত হন তিনি, যেন সেটি এসেছে অন্য কোনো জায়গা থেকে।

শীঘ্রই তিনি সেই দীর্ঘ আর পরিত্যক্ত রাস্তাটিকে চলে আসেন, সকাল বেলার মত উচ্ছ্বলতা আর সেখানে অবশিষ্ট নেই, এমনকি সন্ধ্যার সেই কোলাহলও নেই। এখন সেই রাস্তা আরো বেশী নীরব আর নির্জন। রাস্তার বাতির সংখ্যাও অপেক্ষাকৃত কম আর তাদের অবস্থানও বহু দূরে দূরে। তেলের সরবরাহ কম আছে নিশ্চয়ই। রাস্তার পাশে বাসা আর তাদের প্রাচীরগুলো এখন কাঠের তৈরী, কাউকে কোথাও দেখা যায় না। কোনো আলো নেই রাস্তার বরফ থেকে আসা আভা ছাড়া। নীচু ঘুমন্ত কুটিরগুরো তাদের বন্ধ জানালাসহ দেখতে বিষন্ন আর কালো। তিনি এখন সেই জায়গাটির কাছে, যেখানে রাস্তায় বিরতি সৃষ্টি করেছে প্রায় অশেষ একটি চত্ত্বর, যার দূর প্রান্তের বাড়িগুলো প্রায় অদৃশ্য, দেখলে মনে হয় যেন ভয়ঙ্কর কোনো মরুভূমি।

বহু দূরে, ঈশ্বরই জানেন কোথায়, নৈশ প্রহরী পুলিশদের একটি ঘর থেকে আলোর অস্পষ্ট আভা দেখা যায়, মনে হয় যেন সেটি দাড়িয়ে আছে দূর পৃথিবীর প্রান্তে। এখানে, কোনো না কোনোভাবে, আকাকি আকাকিয়েভচের মেজাজে উৎফুল্লতা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পায়। তিনি চত্ত্বরে পা রাখেন, খানিকটা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনৈচ্ছিক ভয় সহ, যেন তার তার হৃদয় খারাপ কিছু ঘটার অমঙ্গল একটি আশংকা করছে। তিনি চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন, যেন চারদিকে বিস্তৃত হয়ে আছে একটি সাগর। ‘না, না তাকানোই উত্তম,’ তিনি ভাবেন, তার চোখ বন্ধ করেই তিনি হাটতে থাকেন, আর যখন তিনি চোখ খুলেছিলেন দেখার জন্য যে চত্ত্বরের শেষ প্রান্তটি এখনও অনেক দূরে কিনা, ঠিক তার সামনে, একেবারে নিজের নাকের সামনে তিনি যা দেখেছিলেন তা হলো, গোফওয়ালা কয়েকজন লোক দাড়িয়ে আছে। কিন্ত কি ধরনের লোক ছিল তারা সেটি তিনি শনাক্ত করতে পারেননি। তার চোখের দৃষ্টি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে ওঠে,  কেউ তার বুকের উপর যেন সজোরে আঘাত করছে, তার কলার চেপে ধরেছে, ‘আরে এই গ্রেটকোটটা আমার!’, বজ্রপাতের মত কন্ঠস্বরে তাদের একজন চিৎকার করে বলে। আকাকি আকাকিয়েভিচ প্রায় চিৎকার করার উপক্রম হয়েছিলেন, ‘বাঁচাও’, আর তখনই অন্য একজন, কোনো কেরানির মাথার মত বড় হাতের মুষ্ঠি তার মুখের ঠিক উপরে এনে বলে, ‘চিৎকার করার চেষ্টা করলে কিন্তু।’ আকাকি আকাকিয়েভিচ শুধু অনুভব করেছিলেন কেউ তার গা থেকে গ্রেটকোটটি খুলে নিচ্ছে, তারপর হাটু দিয়ে তারা তাকে একটা আঘাত করে, যা ফলে তিনি বরফের মধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে যান, আর কিছুই তিনি অনুভব করতে পারেন না।

কয়েক মিনিট পর তিনি জ্ঞান ফিরে পান, পায়ের উপর ভর করে উঠে দাড়ান, কিন্তু কাউকেই আর দেখা যায় না আশে পাশে, কোনো গ্রেটকোট ছাড়া এমন উন্মুক্ত জায়গায় তিনি তীব্র ঠাণ্ডা অনুভব করেন, আর তিনি চিৎকার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু স্পষ্টতই তার কন্ঠস্বরটির চত্ত্বরের অন্য প্রান্ত অবধি অতিক্রম করার সামান্যতম ইচ্ছাও ছিল না।

মরিয়া হয়ে তিনি ক্রমাগত চিৎকার করতে করতে পুলিশের ছাউনি অভিমূখে চত্ত্বরের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে যান, ছাউনির পাশে দাড়িয়ে ছিল একজন পুলিশ তার হাতিয়ারে হেলান দিয়ে এবং স্পষ্টতই কৌতুহলের সাথে পুলিশ প্রহরীটি লক্ষ্য করছিলেন, তিনি ভাবছিলেন কেন দূর থেকে একটি মানুষ তার দিকে চিৎকার করে দৌড়ে আসছে। আকাকি আকাকিয়েভিচ দৌড়ে তার কাছে যান, শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম তার, তারপরও তিনি  চিৎকার করতে থাকেন, কেন পুলিশ প্রহরীটি ঘুমাচ্ছিল, যখন তার কিনা পাহারা দেবার কথা? কেন সে দেখেনি একটি মানুষকে ছিনতাই করা হয়েছে? পুলিশটি উত্তর দেয় সে কিছুই দেখেনি, তবে দুজন মানুষকে আকাকি আকাকিয়েভিচের দিকে হেটে যেতে দেখেছিল চত্ত্বরের মাঝখানে, কিন্তু সে ভেবেছে তারা হয়তো পরস্পরের পরিচিত, তাকে বিনা কারণে গালমন্দ না করে প্রহরীটি আকাকি আকাকিয়েভিচকে পরের দিন সার্জেন্টের সাথে দেখা করার জন্য পরামর্শ দেয়, নিশ্চয়ই সার্জেন্ট খুজে বের করবেন কে তার গ্রেটকোটটি ছিনতাই করেছে। ভয়ঙ্কর শোচনীয় এক পরিস্থিতিতে আকাকি আকাকিয়েভিচ তার ঘর অবধি দৌড়ে আসেন, তার মাথায় যা সামান্য চুল অবশিষ্ট ছিল পেছনে ও দুপাশে পুরোপুরিভাবে সেগুলো ভেজা আর এলোমেলো, বুকে, পাশে ও পায়ে, তার সারা শরীর তার বরফে মাখামাখি।

দরজায় তীব্র আর ভীতিকর ধাক্কার আওয়াজ শুনে তার বৃদ্ধ বাড়িওয়ালী লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠেছিলেন,  বুকের উপর ভদ্রতার জন্য একটি চাদর চেপে ধরে একহাতে, এক পায়ে স্যান্ডেলসহ তিনি দৌড়ে নীচে নেমে এসে দরজা খোলেন, কিন্তু দরজা খুলে যে অবস্থায় তিনি আকাকি আকাকিয়েভিচকে দেখেন, হতবাক হয়ে পেছনে সরে আসেন। যখন আকাকি আকাকিয়েভিচ তাকে বলেন কি ঘটেছে তার সাথে, হতাশ হয়ে তিনি দুই হাত উপরে তুলে বলেন যে, তার সরাসরি ডিস্ট্রিক্ট সুপারইন্টেনডেন্টের কাছে যাওয়া উচিৎ। স্থানীয় সার্জেন্ট তাকে নিশ্চিৎ ঠকাবে, এমন কি তিনি নিজেও তাকে চেনেন। কারণ আনা, যে ফিনল্যাণ্ডবাসী মহিলাটি তার জন্য রান্না করতো একসময়, তাকে তিনি কাজে নিয়েছেন তার বাচ্চাদের দেখাশুনা করার জন্য, প্রায়ই তাকে তাদের বাসার সামনে দিয়ে যেতে দেখেন, আর তিনি প্রতি রোববারে চার্চেও আসেন। যেখানে তিনি  প্রার্থনা করেন আর একই সাথে সবার দিকে ভালোভাবে তাকানও, আর এটাই প্রদর্শন করে তিনি নিশ্চয়ই একজন ভালো মানুষ। এই বিচার শুনে আকাকি আকাকিয়েভিচ তার বিষন্ন শরীরটাকে তার ঘরের দিকে টেনে নিয়ে যান আর কিভাবে তিনি তার রাতটি কাটিয়েছিলেন সেটি অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে তাদের কল্পনার উপর যারা অন্যদের অনভূতির মধ্যে খানিকটা প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখেন।

পরের দিন খুব সকালে উঠেই তিনি সুপারইন্টেনডেন্টের সাথে দেখা করতে যান কিন্তু তাকে জানানো হয় যে, তিনি তখনও ঘুমাচ্ছেন। সকাল দশটার দিকে তিনি আবারো তার কাছে যান, আবারো তাকে বলা হয় যে তিনি ঘুমাচ্ছেন। আবারো এগারোটার দিকে তিনি সেখানে দেখা করতে যান, এবার তাকে বলা হয় তিনি বাইরে বের হয়ে গেছেন। দুপুরে খাবারের সময় আবার সেখানে হাজির হন তিনি, কিন্তু অভ্যর্থনা কক্ষে বসে থাকা কেরানিরা কোনোভাবেই তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয় না, এবং তারা জানতে চান, কেন তিনি এসেছেন, কোন কাজে নিয়ে তিনি সেখানে হাজির হয়েছেন, কি ঘটেছে ? সুতরাং, অবশেষে, জীবনে প্রথম ও একবারের মত, আকাকি আকাকিয়েভিচ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি যে ধাতু দিয়ে তৈরী সেটি দেখাবেন। তিনি সরাসরি তাদের বলেন, সুপারইন্টেনডেন্টের সাথে তার কথা বলতে হবে, শুধুমাত্র তার সাথে। এবং তারা যেন তার সাথে দেখা করা থেকে বিরত করতে কোনো সাহস না দেখায়, তিনি তার বিভাগ থেকে বিশেষ দাপ্তরিক কাজ নিয়ে এসেছেন, এবং তিনি যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগনামা দাখিল করেন তবে তারা নিজেদের সমস্যায় ফেলতে পারে। কেরানিরা এর পরে আর কিছু বলার সাহস পান না, এবং একজন ভিতরে যান সুপারইন্টেনডেন্টকে বাইরে ডেকে আনার জন্য। সুপারইন্টেনডেন্ট বরং বেশ অদ্ভুতভাবে তার প্রতিক্রয়া প্রদর্শন করেন গ্রেটকোট চুরি হবার ঘটনায়। যা জরুরী সেটি উল্লেখ না করে, তিনি বরং আকাকি আকাকিয়েভিচকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন, কেন তিনি এত রাত করে বাড়ি ফিরছিলেন? হয়তো, তিনি কি কোনো, সন্দেহজনক, দুর্নাম আছে এমন কোনো বাড়ি যাননি তো? আর এই প্রশ্নগুলো আকাকি আকাকিয়েভিচ পুরোপুরি সংশয়ে ফেলে দেয়, তার গ্রেটকোটের কেসটি সঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে তার স্পষ্টতই কোনো ধারণা ছিলনা।

সেদিন সারাদিন তিনি বিভাগীয় দপ্তরে অনুপস্থিত ছিলেন ( তার জীবনের প্রথমবারের মত)। পরের দিন তিনি অফিসে আসেন, পুরোপুরি ম্লান বিষন্ন তার পুরোনো ‘ড্রেসিং গাউন’ পরে, যা দেখতে আরো বেশী করুণ লাগছিল। যদিও কিছু কেরানি তাকে ঠাট্টা করার এই সুযোগটি হাত ছাড়া করেননি, তবে তার বহু সহকর্মীকে নাড়া দেয় গ্রেটকোট ছিনতাই হবার ঘটনাটি। সাথে সাথেই তারা সিদ্ধান্ত নেন যে তার জন্য একটি তহবিল সংগ্রহ করবেন, কিন্তু তারা খুব সামান্যই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়, কারণ কেরানিরা ইতিমধ্যে তাদের তহবিল নিঃশেষ করেছে, পরিচালকের একটি প্রতিকৃতির তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড় করতে, এছাড়াও, শাখা প্রধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, যার সাথে লেখকের পরিচিতি আছে, কিছু বই অথবা অন্য কিছুর জন্য অর্থ যোগান করতে। তাদের একজন, সহমর্মিতায় তাড়িত হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় অন্তত আকাকি আকাকিয়েভিচকে ভালো উপদেশ দিয়ে সাহায্য করার জন্য। তাকে তিনি নিষেধ করেন তিনি যেন স্থানীয় সার্জেন্টের কাছে না যান, কারণ যদিও সম্ভব  তিনি উপরের কর্মকর্তাদের সুনজরে পড়ার উদ্দেশ্যে কোনো না কোনো ভাবে গ্রেটকোটটি খুজে বের করবেন, তবে গ্রেটকোটটি যাই হোক না কেন পুলিশ স্টেশনেই থাকবে, যদিনা আকাকি আকাকিয়েভিচ সেটির মালিকানার আইনী প্রমাণ দাখিল না করতে পারেন। সেকারণে সবচেয়ে ভালো হবে একজন বিশেষ ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ প্রতি আবেদন করা, কারণ এই ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি’ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনা করে এই কেসটিকে অগ্রসর করতে পারবেন সফলতার সাথে।

 

আর কোনো পথ খোলা নেই, আকাকি আকাকিয়েভিচ সিদ্ধান্ত নেন তিনি এই বিশেষ ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির’ কাছেই যাবেন। ঠিক কোন দপ্তরের দ্বায়িত্বে ছিলেন এই ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি’ আর তার কাজটাই বা কি ছিল সেটি আজ অবধি সবার অজানা। আরো লক্ষ্য করা প্রয়োজন যে এই ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি’ শুধুমাত্র সাম্প্রতিক কোনো এক সময়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়েছিলেন, এর আগে তিনি একজন অগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। এমনকি তার এই অগ্রগতির পরেও, তার পদমর্যাদাটি অন্য আরো ‘গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের’ সাথে তুলনামূলকভাবে তেমন বেশী ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসাবে বিবেচিত হয়নি। তারপরও, যে কেউ সেই মানুষদের একটি বলয় সবসময়ই কিন্তু খুঁজে পান, যাদের জন্য সেটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’, যা কিনা অন্যদের চোখে ‘অগুরুত্বপূর্ণ’। উপরন্তু, তিনি চেষ্টা করেছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণতা বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করতে : যখন তিনি কাজে আসতেন, তখন তার অধস্তন কর্মচারীদের উপর নির্দেশ ছিল সিড়িতে দাড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য, সরাসরি তার সামনে হাজির হওয়ার জন্য কারোরই অনুমতি ছিল না, বরং সবকিছুর অনুসরণ করা হতো কঠোর দাপ্তরিক বিধি অনুযায়ী। একজন কলেজিয়েট রেজিস্ট্রার রিপোর্ট করবেন প্রভিন্সিয়াল সেক্রেটারীর কাছে, প্রভিন্সিয়াল সেক্রেটারী করবেন একজন টিট্যুলার কাউন্সিলরের কাছে অথবা যিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষ সেই ক্ষেত্রে তার কাছে। অন্য কোনোভাবেই যেন আর কিছু তার নজরে আনা না হয়। এভাবেই পবিত্র রাশিয়া পুরোটাই দুষিত হয়েছে অনুকরণের দ্বারা, প্রত্যেকে তাদের উর্ধতন কর্মকর্তাদের নকল আর অনুকরণ করে থাকেন।

এমনকি বলা হয়ে থাকে যে কিছু টিটুলার কাউন্সিলর, পৃথক, ছোট চ্যান্সেলারীর দ্বায়িত্ব পাবার সাথে সাথে নিজের জন্য একটি বিশেষ রুম আলাদা করে নেন, যাকে তিনি বলেন দর্শনার্থীদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখার করার জন্য নির্মিত দরবার কক্ষ, এবং এই কক্ষের বাইর তিনি সোনালী সুতার নকশা করা আর লাল কলারের ইউনিফর্ম পরা দ্বাররক্ষীদের নিয়োগ দেন বসে থাকা জন্য, যার প্রতি নির্দেশ থাকে প্রতিটি দর্শনার্থীর জন্য দরজা খুলে দেয়ার জন্য – এমনকি যখন তার এই দরবার কক্ষে সাধারণ একটি লেখার ডেস্ক রাখার মত যথেষ্ট পরিমান জায়গা নেই। ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির’ আচরণ ও অভ্যাস খুবই  অভিজাত ও রাজকীয়, কিন্তু কোনো বিশেষ জটিলতা সেখানে নেই। তার পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা। কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, ‘শৃঙ্খলা আর আনুগত্য’ –  তিনি মাঝে মাঝে বলেন, এবং শেষ শব্দটি বলার সময় তিনি যে মানুষটির সাথে কথা বলছেন তার মুখের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে তাকিয়ে সেটি বলেন। যদিও তার এই সব কিছু করার কোনো বিশেষ কারণ নেই, যাই হোক না কেন যে দশজন কর্মচারী যারা তার অফিসের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই এমনিতে যথেষ্ট পরিমান আতঙ্কিত আর সদাসন্ত্রস্ত কম্পমান থাকতেন তার উপস্থিতিতে। দূর থেকে তাকে দেখলে সাথে সাথেই তারা যা করছিলেন তা বন্ধ করে দিতেন আর স্থির আর সতর্ক হয়ে দাড়াতেন সবাই, যতক্ষণ না তাদের উর্ধতন কর্মকর্তা সেই কক্ষের ভিতর দিয়ে অতিক্রম না করেন। অধস্তন কর্মচারীদের সাথে তার সাধারণ কথপোকথন যতটা কঠোর হতে পারে ততটাই কঠোর ছিল, সাধারণত সেগুলো মোট তিনটি বাক্য দিয়ে মূলত গঠিত: কত বড় সাহস আপনার? আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কার সাথে কথা বলছেন? আপনি কি জানেন আপনার সামনে কে দাড়িয়ে আছে? তবে হৃদয়ে তিনি একজন ভালো ভানুষ ছিলেন, তার বন্ধুদের প্রতি অনুগত ছিলেন, তাদের সাহায্য করতে সদাপ্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু জেনারেল পদবীটি তাকে আমূল পরিবর্তন করেছিল।

তার পদোন্নতি কোনো না কোনোভাবে তাকে বেশ হতভম্ব করে দিয়েছিল, আর তিনি ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিভাবে তার আচরণ করা উচিৎ সে বিষয়ে আসলেই কোনো ধারণা ছিল না তার। যখন তিনি তার সমকক্ষদের মধ্যে থাকতেন, তখন তিনি খুবই ভদ্র মানুষ, আচরণে নম্র ও বাস্তবিকভাবে ভদ্র এবং বহু ক্ষেত্রেই এমনকি বেশ বুদ্ধিমানও। কিন্তু যখন তিনি সুযোগ পান সেই সব মানুষদের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করতে, এমনকি যারা পদবীতে তার চেয়ে মাত্র এক ধাপ নীচে, তিনি পুরোপুরিভাবে দিশেহারা একজন মানুষ : একটি শব্দও তিনি বলতে পারেন না এবং মানুষ তার জন্য করুণা অনুভব করতো। আরো বেশী কারণ, এমনকি তিনিও অনুভব করেছেন যে তার সময় তিনি অতুলনীয়ভাবে ভালো কাটাতে পারতেন। কখনো তার চোখ বিশ্বাসঘাতকতা করে কোনো মজার গ্রুপ অথবা কথোপকথনে জড়াতে তার তীব্র ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়ে, কিন্তু সবসময় তিনি নিজেকে সংযত করতেন এমন কিছু করতে, এই ভেবে যে বিষয়টি অনেক দূর গড়াতে পারে, আর এইসব বেশী বন্ধুভাবাপন্নতা তার গুরুত্বপূর্ণতাকে হ্রাস করবে। এবং এইসব বিবেচনার কারণে, তিনি চিরকালই নীরবতার একই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে থাকেন, শুধুমাত্র একাক্ষরিক শব্দ উচ্চারণ করে, আর এভাবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন আসাধারণভাবে ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর একজন মানুষ হিসাবে। ইনি হচ্ছেন সেই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি, যার কাছে আমাদের আকাকি আকাকিয়েভিচ আবেদন করেছিলেন, আর তিনি আবেদন করেছিলেন খুব দূর্ভাগ্যজনক একটি মুহূর্তে, যে মুহূর্তটি ছিল তার জন্যে খুবই অনুপযুক্ত। যদিও, অন্যদিকে, সেটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির’ জন্য বেশ উপযুক্ত মুহূর্ত। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি তখন ছিলেন তার অফিসে, পূর্বপরিচিত একজনের সাথে খুব ভালো মেজাজে গল্প করছিলেন। অতিথি তার শৈশবের একজন বন্ধু, যিনি সম্প্রতি রাজধানীতে এসেছেন. যার সাথে তার দেখা হয়নি বেশ কয়েক বছর। ঠিক তখনই তাকে অবহিত করা হয় জনৈক বাশমাচকিন তার সাথে দেখা করার আর্জি পেশ করেছেন। ‘কে তিনি?’ তিনি বেশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন। ‘কোনো একজন কেরানি অথবা তেমন কিছু’, উত্তর আসে। ‘ওহ, সে অপেক্ষা করতে পারবে, এটা ঠিক সময় না’, বলেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি।

এখানে আমাকে অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি নির্ল্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করেছেন: ঠিক এটাই ছিল সঠিক মুহূর্ত। তিনি ও তার বন্ধুর পরস্পরকে যা বলার ছিল তা বলা শেষ হয়ে গেছে বহুক্ষণ আগে, এখন তারা তাদের কথোপকথনকে বাধাগ্রস্ত করছেন অতিমাত্রায় দীর্ঘ নীরবতার বিরতি দ্বারা, যে সময়টিতে তার একে অপরের উরুতে হালকা চাপড় মেরে পুনরাবৃত্তি করছিলেন, ‘বেশ, বেশ, ইভান আব্রামোভিচ’ আর ‘তাহলে এই হলো অবস্থা স্টেপান ভারলামোভিচ!’ যাই হোক তিনি কেরানিকে অপেক্ষায় বসিয়ে রাখেন, যেন তিনি তার বন্ধুটিকে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেখাতে পারেন, যিনি কিছু দিন আগে সরকারী চাকরী ছেড়েছেন তার গ্রামের জমিদারীতে থিতু হয়ে বসার জন্য, যে কতক্ষণ কেরানিরা তার সামনের কক্ষে অপেক্ষা করে। পরিশেষে আরো কথা বলে, এবং আরো বেশী নীরব থেকে – মনের সাধ মিটিয়ে এবং হেলান পেছনসহ একটি অত্যন্ত আরামদায়ক আর্ম চেয়ারে সিগার ধূমপান করে তার যেন হঠাৎ করেই মনে হয়, এবং তিনি তার একজন সহকারীকে বলেন, যে দরজার কাছে কিছু কাগজ নিয়ে দাড়িয়ে ছিল, রিপোর্ট করার জন্য। ‘আহ, হ্যা, আমার মনে হয় একজন কেরানি অপেক্ষা করছেন আমার সাথে দেখার করার জন্য। তাকে ভিতরে আসতে বলুন’।

আকাকি আকাকিয়েভিচের সাদামাটা উপস্থিতি আর বহু পুরোনো ইউনিফর্ম দেখে, তিনি হঠাৎ করে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার জন্য আমি কি করতে পারি?’ তার কন্ঠ শুনতে রুঢ়, শীতল আর কঠোর শোনায়, যা তিনি বিশেষভাবে অনুশীলন করেছিলেন একাকী আয়নার সামনে দাড়িয়ে পুরো এক সপ্তাহ ধরে, জেনারেল র‌্যাঙ্কে পদোন্নতি ও তার বর্তমান পদে আসীন হবার আগে। আকাকি আকাকিয়েভিচের, যিনি উপযুক্তভাবেই লাজুক ও অন্তর্মুখী ছিলেন বেশ কিছুটা সময় ধরে, খানিকটা অস্থির হয়ে উঠলেন এবং তার পক্ষে যতটা ভালোভাবে সম্ভব, তার লাজুক চরিত্র তাকে যতটা অনুমতি দিয়েছিল, এমনকি সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশী মাত্রায় তার ইতস্ততামূলক অপ্রধান শব্দ ‘ইয়ে’ ব্যবহার করে, ‍তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন তার গ্রেটকোটটা পুরোপুরি নতুন এবং খুবই অমানবিকভাবে সেটি ছিনতাই করে নেয় হয়েছে তার কাছ থেকে, এবং তিনি এখন তার কাছে প্রার্থনা করছেন, তিনি যেন, ইয়ে, বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন এবং  সন্মানিত পুলিশ সুপারইন্টেনডেন্ট অথবা অন্য কারো কাছে একটি চিঠি লিখে দেন এবং তার গ্রেটকোটটি কোথায় আছে সেই বিষয়ে যেন তারা তথ্য উদ্ধার করতে তৎপর হয়।

তবে জেনারেল, অজানা কোনো একটি কারণে ভেবেছিলেন, তাকে যেন খুব বেশী পরিচিত এমন কেউ হিসাবে সম্বোধন করা হচ্ছে, ‘এটা কি, ‘আমার প্রিয় মহোদয়’? রুঢ় ভাবে তিনি বলেন, ‘আপনি কি সঠিক পদ্ধতি জানেন না? কেন আমার কাছে এসেছেন আপনি? আপনি জানেন না এই বিষয়ে সঠিকভাবে কিভাবে অগ্রসর হতে হয়? আপনার উচিৎ ছিল প্রথমে অফিসে একটি দরখাস্ত দাখিল করা, সেই দরখাস্ত প্রধান কেরানির কাছে যেত, তারপর সেটি আসতো শাখা প্রধানের কাছে, তারপর সেটি পাঠানো হতো সহকারীকে এবং সহকারী বিষয়টি আমার কাছে উপস্থাপন করতেন।’

আকাকি আকাকিয়েভিচ, তার শান্ত স্থির মেজাজের সবটুকু বিনম্রতা জড়ো করে এবং একই সাথে তিনি যে ভীষণভাবে ঘেমে উঠছেন বিষয়টি লক্ষ্য করেই বলেন,  ‘কিন্তু মাননীয় জেনারেল,  আপনার মত অতি মহামান্য ব্যক্তিকে আমি বিরক্ত করার সাহস করেছি, কারণ, ইয়ে, সহকারীরা খুব একটা নির্ভরযোগ্য মানুষ না…।’

‘কি, কি, কি?’ বললেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি, ‘কে আপনাকে এত ধৃষ্টতা শিখিয়েছে? এই সব ধারণা আপনি পেলেন কোথা থেকে? উর্ধর্তন কর্মকর্তা আর প্রধানদের বিরুদ্ধে তরুণদের সংক্রমণ করা এই বিদ্রোহ করার এই ইচ্ছা আসলে কি?’ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি স্পষ্টতই লক্ষ্য করার চেষ্টা করেননি যে, আকাকি আকাকিয়েভিচের বয়স ইতিমধ্যে পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। সেকারণে, আসলে কি সম্ভব তাকে তরুণ বলে তথ্য নির্দেশ করা, এটি হয়তো তুলনামূলকভাবে কিছু বলা হতে পারে, মানে, এমন কারো সাপেক্ষে যিনি কিনা অন্ততপক্ষে সত্তর। ‘আপনি জানেন কার সাথে কথা বলছেন? আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনার সামনে কে দাড়িয়ে আছেন? আপনি বিষয়টি বুঝতে পারছেন, আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি এই বিষয়টি কি বুঝতে পারছেন?’ এই পর্যায়ে তিনি বেশ জোরে তা পা দিয়ে মাটিতে লাথি মারতে শুরু করেন, আর তার গলার স্বর এত তীব্র উচ্চতায় ‍তুলে হুঙ্কার করেন যে আকাকি আকাকিয়েভিচের চেয়ে অনেক শক্ত মানুষও তা শুনে আতঙ্কিত হতেন।  আকাকি আকাকিয়েভিচ ভয়ে অসাড় হয়ে যান তাৎক্ষনিকভাবে।  তিনি এলোমেলোভাবে টলতে থাকেন, তার শরীর কাপতে শুরু করেছিল, সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকার আর কোনো ক্ষমতাই তার থাকে না, যদি দরজায় দাড়ানো দ্বাররক্ষীটি দৌড়ে এসে তাকে না ধরতো, তাহলে তিনি মেঝেতেই ধপাস করে পড়ে যেতেন। তার প্রায় অসাঢ় শরীরটাকে বাইরে বের করে আনা হয়। আর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন , কারণ তিনি যা আশা করেছিলেন তার চেয়ে বেশী প্রভাব তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছেন, এবং তিনি পুরোপুরি মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিলেন সেই ভাবনায় যে, তার ‍উচ্চারিত শব্দ কোনো মানুষকে অজ্ঞান করে ফেলতে পারে। এবং তিনি তার বন্ধুটির দিকে আড়চোখে তাকান এসব দেখে তার প্রতিক্রিয়াটি কি দেখতে, এবং খানিকটা অসন্তুষ্ট হয়েই তিনি লক্ষ্য করেন যে তার পরিচিত মানুষটি খুবই অনিশ্চয়তাপূর্ণ অস্থির একটি একটি মানসিক অবস্থার মধ্যে আছে, এবং এমন কি তিনি নিজেও ভয় পেতে শুরু করেছেন।

কিভাবে তিনি সিড়ি দিয়ে নেমেছিলেন, আর কিভাবে তিনি রাস্তায় আসলেন, আকাকি আকাকিয়েভিচের পক্ষে কিছু মনে করা সম্ভব ছিল না। তার হাত অথবা পায়ে কোনো অনুভূতিও ছিল না, তার জীবনে কখনো কোনো জেনারেল তাকে এত তীব্র তিরষ্কার করেননি, এমনকি অন্য কোনো বিভাগের কেউ তো বহু দূরের কথা। বারবার ফুটপাথের প্রান্ত থেকে হোটট খেয়ে তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন, তার মুখ ছিল হা করা, রাস্তার দৈর্ঘ বরাবর শীস তুলে প্রবাহিত তুষারঝড়ের মধ্যে দিয়ে তিনি হাটছিলেন, বাতাস, পিটার্সবুর্গের  যেমন রীতি, কম্পাসের চার দিকেরই সব দিক থেকে তার প্রতি ধেয়ে আসছিল, প্রতিটি পার্শ্ব রাস্তা থেকে। শুধুমাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে এই বাতাস তার গলায় একটি প্রদাহ প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল এবং যখন তিনি বাসায় পৌছান তিনি একটি শব্দও আর উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। তার টনসিল তখন ফুলে গেছে, তিনি বিছানায় শুয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে বড় আর সঠিক ধরনের তিরষ্কারের প্রভাব এত শক্তিশালী হতে পারে। পরের দিন তিনি টের পান যে তার গায়ে তীব্র জ্বর। পিটার্সবুর্গের জলবায়ুর অশেষ দয়া ও সহযোগিতায়, যা প্রত্যাশা করা যেতে পারে তার চেয়েও দ্রুত তার অসুস্থতা অগ্রসর হয়েছিল, আর যখন ডাক্তার এসে তার নাড়ী পরীক্ষা করে দেখেছিলেন, তিনি যা করার জন্য অনুভব করতে পেরেছিলেন তা হলো, পুলটিস দেবার একটি ব্যবস্থা পত্র দেয়া, শুধুমাত্র অসুস্থ মানুষটি যেন অনুভব না করেন যে তিনি পুরোপুরিভাবে চিকিৎসা সাহায্যের কোনো উপাযোগিতা ছাড়া আছেন। তবে এই সাথে  তিনি ঘোষণা করেন যে দেড় দিনের মধ্যে অবশ্যই আকাকি আকাকিয়েভিচের সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। এরপর তিনি বাড়িওয়ালীর দিকে ফিরে বলেন, ‘আর আপনি, ভদ্র মহেোদয়া, ভালো হয় যদি সময় নষ্ট না করেন। আপনি তার জন্য বরং একটি পাইন কাঠের কফিনের অর্ডার দেন এখুনি। কারণ ওক কাঠের কফিন তার জন্য বেশী দামী হয়ে যাবে’।

আকাকি আকাকিয়েভিচ এই ভয়ঙ্কর নিয়তি নির্দিষ্ট উচ্চারণ আদৌ শুনেছিলেন কিনা বা শোনেননি সেটি নিশ্চিৎ নয়, যদি তিনি শুনতেন, তার উপর এটি সর্বনাশা একটি প্রভাব ফেলতো নিশ্চয়ই। হয়তো বা হয়তো না, তিনি তার করুণ জীবন নিয়ে কোনো আক্ষেপ করেছিলেন কিনা – এসবের কোনো কিছুই জানা নেই ,কারণ তিনি একটি ঘোর আর জ্বরের মধ্যে ছিলেন। অশরীরি আত্মারা,একটার চেয়ে আরেকটি যা আরো অদ্ভুত, ক্রমাগত তাদের নিজেদের তার সামনে উপস্থাপন করছিল। একটি মুহূর্তে তিনি পেত্রোভিচকে দেখতে পাচ্ছিলেন, এবং তাকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন তাকে একটা গ্রেটকোট বানিয়ে দেবার জন্য যার মধ্যে এমন ফাদ থাকবে যা চোরদের ধরতে সাহায্য করবে, যাদের তিনি তার বিছানার নীচে লুকিয়ে আছে বলে কল্পনাও করছিলেন, এবং তিনি অবিরামভাবে তার বাড়িওয়ালীর কাছে অনুনয় করছিলেন, তার কম্বলের নীচে লুকিয়ে থাকা চোরটিকে যেন তিনি টান দিয়ে বের করে আনেন। পরে তিনি জিজ্ঞাসা করছিলেন কেন পুরোনো  ড্রেসিং গাউনটা এখনও সেখানে ঝোলানো আছে, যখন কিনা তার এখন একটি নতুন গ্রেটকোট আছে। এরপর তিনি কল্পনা করেন তিনি জেনারেলের সামনে দাড়িয়ে আছেন, খুব ভালোভাবে তার তিরস্কার শোনার পর তিনি বারবার বলছেন, ‘আমি দুঃখিত মাননীয় জেনারেল’ এবং সবশেষে তিনি এমনকি ঈশ্বর নিন্দা ও ভয়ঙ্কর সব শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলেন প্রলাপ হিসাবে, এবং সে কারণে তার বৃদ্ধ বাড়িওয়ালী, সারাজীবনে তার কাছ থেকে এমন কিছু কোনোদিনও শোনার অভিজ্ঞতা না থাকায় বারবার নিজের বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকছিলেন। আরো বেশী কারণ এই সব সবচেয়ে ভয়ানক শব্দগুলো সবসময় ‘মহামান্য মহোদয়!’ শব্দটির পর পরই উচ্চারিত হয়ে আসছিল। এরপর তিনি পুরোপুরি আবোল তাবোল কিছু বলতে শুরু করেন, কোনো কিছু বোঝা সেখানে পুরোপুরি ছিল অসম্ভব।

তবে শুধুমাত্র যে বিষয়টি স্পষ্ট তাহলো তার অসংলগ্ন শব্দ আর চিন্তাগুলো সবকিছু একটি ও একই গ্রেটকোটকে নিয়ে আবর্তিত। অবশেষে, দূর্ভাগা আকাকি আকাকিয়েভিচ তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার ঘর কিংবা তার যা কিছু ছিল তার কোনোটাই তালাবন্ধ করে রাখা হয়নি, প্রথমত, তার কোনো উত্তরাধিকার নেই, দ্বিতীয়ত, খুব সামান্য জিনিসই তিনি রেখে গিয়েছিলেন:  হাসের পালক দিয়ে বানানো কম্বলের একটি বান্ডিল, একগুচ্ছ সাদা দাপ্তরিক কাগজ, তিন জোড়া মোজা, দুই অথবা তিনটি বোতাম যা এসেছে  তার প্যান্ট থেকে, আর তার ‘ড্রেসিং গাউন’, যার সাথে পাঠকরা ইতিমধ্যে পরিচিত। উত্তরাধিকার সূত্রে এই সবকিছু কে পেয়েছিল ঈশ্বরই জানেন। স্বীকার করতে হবে যিনি এই কাহিনীটি বলছেন, তিনি খোজ-খবর করার কোনো ঝামেলায় নিজেকে জড়াননি। আকাকি আকাকিয়েভিচকে তার বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ও তাকে সমাহিত করা হয়, আর পিটার্সবুর্গ আগের মতই অপরিবর্তিত থাকে আকাকি আকাকিয়েভিচ ছাড়া, যেন তিনি আদৌ কখনই সেখানে ছিলেন না। মৃত আর চিরকালের মত অপসৃত হয়েছেন সেই মানুষটি, যাকে কেউ কখনো সমর্থন করেনি, যাকে কেউ প্রিয় কিংবা আপন বলে ভাবেনি, এবং কেউই, এমনকি একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী, যিনি কিনা সাধারণ একটি মাছিকেও সুন্দর করে সাজিয়ে রাখেন আলপিনের সাথে গেথে আর অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে তা পরীক্ষা করে দেখেন, তার প্রতি কোনো আগ্রহ প্রদর্শন করেননি।

একটি মানুষ  যিনি ধৈর্ঘ ধরে তার অফিসের সহকর্মীদের উপহাস সহ্য করেছিলেন, এবং যিনি খুব বেশী কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে তার কবরেও প্রস্থান করেছিলেন। কিন্তু তার সামনে, যদিও, শুধুমাত্র তার জীবনের একেবারে শেষে, সাময়িকভাবে তার করুণ জীবনকে উজ্জীবিত করতে উপস্থিত হয়েছিল গ্রেটকোট রুপে এক প্রাণবন্ত অতিথি। এবং যার উপর পতিত হয়েছিল ভয়ঙ্কর সেই বিপর্যয়, ঠিক যতটা নিষ্ঠুর হয়ে পড়েছিল পৃথিবীর বহু রাজা আর জারদের উপর। তার মৃত্যুর কিছুদিন পর, তার প্রাক্তন বাসস্থানে অফিসের একজন পিয়ন এসে হাজির হয়েছিলেন নির্দেশ নিয়ে যে, আকাকি আকাকিয়েভিচকে অবশ্যই এখনই তার বিভাগীয় দপ্তরে যেতে হবে, অফিস প্রধান তাকে খুঁজছেন। কিন্তু পিয়ন বাধ্য হয় একা ফিরে গিয়ে রিপোর্ট করতে যে কেরানি আর কখনোই তার কাজে আসতে পারবেন না। ‘কেন?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে সেই পিয়ন বলেছিলেন, ‘বেশ, কারণ হচ্ছে তিনি মারা গেছেন। তিন দিন হলো তাকে কবর দেয়া হয়েছে।’ এভাবে তার মৃত্যু সংবাদ পৌছেছিল তার কর্মস্থলে। আর পরের দিন তার জায়গা নিয়েছিল একজন নতুন কেরানি, যে কিনা বেশ দীর্ঘ দেহী, যার হাতে লেখা ততটা গোছানো আর সোজা নয় বরং উল্লেখযোগ্য পরিমানে অপরিষ্কার ও তীর্যক।

কিন্তু কে কল্পনা করতে পেরেছিল আকাকি আকাকিয়েভিচের জন্য এটাই শেষ নয়, এবং মৃত্যুর পর বেশ কিছুটা সময় ধরে তিনি আরো সমস্যা তৈরী করার জন্য নিয়তি দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিলেন, যেন, যে জীবন কেউ লক্ষ্য করেনি, তারই ক্ষতিপূরণ হিসাবে?  কিন্তু এটাই ঘটেছিল, আর আমাদের এই করুণ কাহিনীটি অপত্যাশিতভাবে বিস্ময়কর একটি উপসংহার অর্জন করতে পেরেছে সে কারণে।

সেইন্ট পিটার্সবুর্গে হঠাৎ করে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে কালিনকিন সেতুর আশে পাশে, এবং সেখান থেকে আরো দূরে বেশ কিছু জায়গা জুড়ে রাতের বেলায় সরকারী কেরানির ছদ্মবেশে একটি লাশ আবির্ভূত হয়েছে, যিনি তার হারিয়ে যাওয়া গ্রেটকোটটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। এবং তার হারানো গ্রেটকোটটি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় এই মরা লাশটি প্রত্যেকের গা থেকেই তাদের গ্রেটকোট খুলে নিচ্ছেন, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার কোনো তোয়াক্কা না করে, যে কোনো ধরনের গ্রেটকোট হোক না কেন: বিড়ালের লোম বা বিভারের লোম দিয়ে লাইন করা কোট, সুতি কাপড়ের লাইনিং করা কোট আর চামড়া, যা বহু মানুষ তাদের নিজেদের শীত থেকে রক্ষা করার জন্য বানিয়েছেন। বিভাগের একজন কেরানি দাবী করেন যে তার নিজের চোখে এই মৃত লাশটিকে দেখেছে এবং সাথে সাথেই তিনি তাকে আকাকি আকাকিয়েভিচ হিসাবে শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। তবে তিনি দুর থেকে সেই মৃত লাশটির ভীতিকর একটি আঙ্গুল নাড়ানো দেখে এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে, তার পা যতটা পারে ততটা দ্রুত তিনি সেখান থেকে পালিয়েছিলেন, সুতরাং খুব ভালো করে মৃত লাশটিকে তিনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেননি। চারদিক থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ আসতে শুরু করে, শুধুমাত্র টিটুলার কাউন্সিলরদের পিঠ আর কাধ নয়, প্রিভি কাউন্সিলররাও ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডার শিকার হয়েছেন তাদের গ্রেটকোটগুলোর রাত্রিকালীন ছিনতাই হবার ঘট।

পুলিশের প্রতি কড়া নির্দেশ জারি করা হয় যেভাবেই হোক এই সমস্যাটির কারণ জীবিত অথবা মৃত সেই মৃত লাশটাকে গ্রেফতার করতে হবে, এবং অন্যদের প্রতি উদহারণ সরুপ তার কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে – এবং এই কাজটি করতে এমনকি তারা প্রায় সফলও হয়েছিলেন। মানে, কিরুশকিন লেনের কোথাও একজন পুলিশ সদস্য একটি মৃত লাশকে আসলেই কলার ধরে পাকড়াও করেছিলেন অপরাধ ঘটানোর সময়, যখন এক অবসরপ্রাপ্ত সঙ্গীতজ্ঞের কাছ থেকে একটি সৌখিন গ্রেটকোট ছিনতাই করার চেষ্টা করেছিল লাশটি, যিনি একসময় বাঁশী বাজাতেন। মৃত লাশটির কলার দুই হাতে ভালো করে ধরে পুলিশ তার দুই অন্য সহকর্মীকে চিৎকার করে ডেকেছিলেন, তারপর তিনি তাদের নির্দেশ দেন ভালো করে তাকে ধরে রাখতে কিছু মুহূর্তের জন্য, যখন তিনি খুব দ্রুত তার বুটের মধ্যে রাখা নস্যির কৌটাটা বের করতে নীচু হয়েছিলেন, কারণ তার নাক ততক্ষণে তীব্র শীতের আক্রমনের শিকার হয়েছে ছয়বার, তার দরকার ছিল সেটিকে খানিকটা জীবন্ত করে তোলা, কিন্তু তার নস্যি স্পষ্টতই খুব কড়া ছিল, এমনকি একটি মৃত লাশও সেটি সহ্য করতে পারেনি। যখনই পুলিশটি তার ডান নাকের ছিদ্রটি বন্ধ করেছিলেন একটি আঙ্গুল দিয়ে, বা নাকের ছিদ্র আধামুঠ নস্যি টেনে নেবার জন্য, মৃত লাশটি এত জোরে হাঁচি দিয়েছিলেন যে তাদের তিনজনের চোখই পুরোপুরিভাবে ভিজে যায়। কিন্তু যখনই তারা তাদের চোখ পরিষ্কার করার জন্য হাত উঠিয়েছিল, সেই মৃত লাশটিও তখন শূন্যে মিলিয়ে যায়, সুতরাং তারা এখনও এমনকি নিশ্চিৎ নন যে, তারা আসলেই তাদের হাতে লাশটিকে পাকড়াও করেছিল। এরপর সেই পুলিশগুলো মৃত লাশ এত বেশী ভয় পেতেন যে তারা এমনকি জীবন্ত কাউকে পাকড়াও করতে গেলে সতর্ক হয়ে পড়তেন। বরং তারা দুর থেকে চিৎকার করে তাদের নির্দেশ দিতেন, ‘এই যে ওখানে, এখন সোজা সামনে এগুতে থাকো।’ এবং সেই কেরানি যিনি নিজে মৃত আরো বেশী বেশী করে কালিনকিন ব্রীজের ভুল দিকে আবির্ভূত হতে শুরু করেন, সব ভীরু মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

আমরা কিন্তু পুরোপুরি ভুলে গেছি সেই বিশেষ ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির’ কথা, যিনি নিজেই, বাস্তবিকভাবে, প্রায় সম্পুর্নভাবেই দায়ী এই অদ্ভুত কল্পনাপূর্ণ ঘটনা প্রবাহটির, যা ঘটনাচক্রে পুরোপুরিভাবে এই সত্য ঘটনায় মোড় নিয়েছিল। প্রথমত, ন্যায়বিচার করার মানসিকতাই আমাকে বাধ্য করেছে ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করতে, আসলেই খুব জোরালোভাবে তিরষ্কৃত সেই অসহায়, করুণ আকাকি আকাকিয়েভিচ তার দপ্তর থেকে চলে যাবার পর, সেই বিশেষ ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ মানুষটি খানিকটা অনুশোচনার মত কিছু অনুভব করেছিলেন। সমবেদনা তার চরিত্রে নতুন কিছু নয়। তার হৃদয় উন্মুক্ত নানা দয়াপূর্ণ তাড়নায়, যদিও, সেই বাস্তবতাটি সত্ত্বেও, তার পদমর্যাদা প্রায়শই সেই অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার মতো পরিস্থিতি থেকে তাকে সুরক্ষা করতো। সেদিন যখনই তার গ্রামের বন্ধুটি তার দপ্তর ত্যাগ করেছিলেন, তিনি এমনকি কিছুটা সময় আকাকি আকাকিয়েভিচকে নিয়ে ভেবেছিলেনও। এবং তখন থেকে প্রায় প্রতিদিনই তিনি ফ্যাকাশে এক কেরানির মুখ দেখতেন, যিনি কিনা একটি দাপ্তরিক তিরষ্কার সহ্য করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

আকাকি আকাকিয়েভিচের ভাবনা তাকে এতটাই অস্থির করেছিল যে, এমনকি এক সপ্তাহ পর তিনি তার দপ্তরের এক কেরানিকে পাঠিয়েছিলেন তার এখন কি অবস্থা সেই বিষয়ে খোঁজ নিতে, এবং আসলেই কি কোনো উপায় আছে কিনা এই মুহূর্তে সাহায্য করার জন্য। আর যখন তাকে জানানো হয়েছিল  আকাকি আকাকিয়েভিচ হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, তিনি এমনকি বড় একটি ধাক্কাও অনুভব করেছিলেন। তিনি শুনতে পেরেছিলেন তার বিবেক তাকে বিড়বিড় করে কিছু বলছে, সারাদিনই তিনি বেশ বিষন্নতা অনুভব করেছিলেন। নিজের মনটাকে কিছুটা উৎফুল্ল করতে আর অস্বস্তিটাকে মন থেকে তাড়ানোর জন্য তিনি তার পরিচিত একজনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। যেখানে তার সঙ্গ ছিল সম্মানজনক, সবচেয়ে বড় ব্যপার, তিনি নিজেকে সব বন্ধনমুক্ত মানুষ হিসাবে অনুভব করেছিলেন, কারণ সেখানে কম বেশী সবাই ছিল তার মত, একই পদমর্যাদা সম্পন্ন। তার মানসিক অবস্থার উপর এটি বিস্ময়কর একটি প্রভাব ফেলেছিল। তিনি কিছুটা শিথিল হয়েছিলেন, অমায়িক এবং চমৎকারভাবে কথপোকথনও করেছিলেন। সংক্ষেপে, তিনি সেই সন্ধ্যাটা বিশেষভাবে উপভোগ করেছিলেন। দুই গ্লাস শ্যাম্পেনও পান করেছিলেন রাতের খাবারের সাথে, আমরা সবাই জানি যা সুখানুভূতি সৃষ্টির জন্য এটি খুবই কার্যকরী একটি উপায়। এছাড়াও শ্যাম্পেন কিছু সুনির্দিষ্ট কাজ করার জন্য উপযুক্ত একটি মেজাজও সৃষ্টি করেছিল তার মধ্যে, তিনি সিদ্ধান্ত নেন তখনই বাসায় না যাবার জন্য, বরং একজন বিশেষ ভদ্রমহিলার সাথে দেখা করতে বের হয়েছিলেন, কারোলিনা ইভানোভনা, যিনি স্পষ্টতই জার্মান বংশোদ্ভুত এবং যার সাথে তার সম্পর্ক ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ করতে হবে যে, ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির’, বয়স অবশ্যই কম ছিল না, তিনি খুবই ভালো স্বামী ও সন্মানিত পারিবারিক মানুষ ছিলেন। দুটি পুত্র, যাদের একজন ইতিমধ্যে সরকারী চাকরীতে, এবং দেখতে খারাপ নয় মোটেও এমন একটি ষোল বছরের মেয়ে ছিল তার।  যদিও তার নাকটি খানিকটা বোচা, তবে একই সাথে খুব সুন্দর, যে প্রতিদিন তার হাতে ‍চুমু খেতে আসতো, ‘শুভদিন বাবা’ বলে। তার স্ত্রী যিনি এখনও বিকশিত হচ্ছেন, এবং অবশ্যই কোনোভাবে যিনি অনাকর্ষণীয় নয়, যিনি প্রথমে তার নিজের হাত এগিয়ে দেন তাকে চুমু খাবার জন্য, পরে তার হাতে চুমু খান, হাতটিকে উল্টো করে ধরে। কিন্তু ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি’, যদিও তিনি প্রসঙ্গক্রমে, পুরোপুরিভাবে সন্তুষ্ট তার গৃহস্থালী স্নেহপরায়নাতায়, তারপরও যথাযথ মনে করেছিলেন শহরের অন্য অংশে বসবাসরত এক মহিলার সাথে বিশেষ বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। তার এই নারী সঙ্গীনি কোনোভাবেই সুন্দরী বা বয়সে তো অবশ্যই কম নয় তার স্ত্রীর কাছ থেকে। কিন্তু পৃথিবীতে বহু এমন ধাঁধা আছে, আর সেগুলো সমাধান করাও আমাদের কাজ নয়।  সুতরাং সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি নীচে নেমে আসেন, তার শ্লেড গাড়ীতে উঠে বসেন ও চালককে বলেন, ‘ক্যারোলিনা ইভানোভনার ওখানে চলো’।

খুব বিলাসী উষ্ণ গ্রেটকোটে আবৃত হয়ে তিনি চমৎকার একটি পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেন, যার চেয়ে আর উত্তম কিছু রুশদের পক্ষে অকল্পনীয়: যে পরিস্থিতিতে আপনি নিজে কোনো কিছু আদৌ চিন্তা করেন না  কিন্তু তারপরও চিন্তাগুলো, প্রতিটি এর আগেরটির চেয়ে সুখকর, তাদের নিজেদের মর্জি মাফিক আপনার মাথার মধ্যে প্রবেশ করে, সেই সব চিন্তাগুলোকে খোঁজার জন্য তাদের পেছনে দৌড়ানোর মত অহেতুক কোনো সমস্যায় আপনাকে না ফেলে।

পূর্ণ সন্তোষসহ, তিনি কোনো পরিশ্রম ছাড়াই সেই সন্ধ্যার সব আনন্দময় মুহূর্তগুলো স্মরণ করতে পারলেন, সব শব্দগুলো যা তার ক্ষুদ্র চক্রের উচ্চকন্ঠের হাসির আওয়াজ সৃষ্টি করেছিল। তিনি এমনকি তাদের অনেকগুলোই পুনরাবৃত্তি করেন আপন মনে, আগের মতই সেগুলো তাকে আনন্দ দেয়। খুব অবাক হবার মত কোনো বিষয় না, এই সবই তার মুখে আনন্দের হাসি  এনেছিল। বারবার, তবে, তিনি বিঘ্নিত হচ্ছিলেন হঠাৎ করে ভেসে আসা দমকা বাতাসে, কোথা থেকে যে সেই বাতাসের উৎপত্তি হচ্ছিল তা ঈশ্বরই জানেন এবং স্পষ্টত কোনো কারণ ছাড়াই, তীব্র ঠাণ্ডার সেই বাতাসে তিনি মুখের চামড়ায় বেশ যন্ত্রণাও অনুভব করছিলেন, চোখের মধ্যে বরফ কুচি ছুড়ে দিয়ে সেই দমকা ঠাণ্ডা বাতাস নৌকার পালের মত করেই তার কোর্টের কলারগুলো বারবার ফুলিয়ে তুলছিল, হঠাৎ করেই যেন অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির বলে যেন সেগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার মাথার ওপরে। আর সেই জ্বালাতন  থেকে মুক্তি পেতে তার প্রচেষ্টায় অবিরাম বিঘ্নতা সৃষ্টি করে সেই দমকা বাতাস তাকে বেশ বিরক্ত করছিল। হঠাৎ করেই সেই ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি’ অনুভব করেছিলেন, কেউ যেন অত্যন্ত শক্তভাবে তার কলার চেপে ধরে আছে। পিছনে তাকাতেই, তিনি জীর্ণ পুরোনো ইউনিফর্ম একটি খাটো মানুষকে দেখেন, এবং অবশ্যই  ভয়ের সাথে, আকাকি আকাকিয়েভিচ হিসাবে তিনি তাকে শনাক্ত করেছিলেন। কেরানির মুখ ছিল বরফের মত ফ্যকাশে, মৃত লাশের মতই ঠিক দেখতে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির চরম আতঙ্ক সব পরিমাপই ছাড়িয়ে গিয়েছিল যখন তিনি মৃত মানুষটির মুখ খানিকটা বাঁকা হতে লক্ষ্য করেন, খোলা মুখ থেকে সেটি উগরে দিয়েছিল কবরের ভয়ঙ্কর দূর্গন্ধ, আর সেটি  উচ্চারণ করেছিল এই শব্দগুলো:  ‘আহ! তাহলে আপনাকে পাওয়া গেল, অবশেষে, এখন তাহলে, ইয়ে, আমি আপনার কলার চেপে ধরেছি, আপনার গ্রেটকোটটাই আমার দরকার। আপনি আদৌ বিচলিত হননি আমরাটা খুঁজতে সাহায্য করার জন্য, আর এমনকি যা প্রত্যাশিত ছিল আপনি আমাকে তারচেয়ে বেশী গালমন্দ করেছিলেন – সুতরাং এখন আপনি আপনারটা আমাকে দেন।’

সেই অসহায় ‘গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিটি’ প্রায় তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ অফিসে চরিত্রের যে শক্তি তিনি প্রদর্শন করেন, সাধারণত তার অধীনস্থ কর্মচারীদের সাথে, আর এমনকি তার পুরুষালী কাঠামো ও আচরণ দেখাই যথেষ্ঠ কোনো মানুষের মন্তব্য প্ররোচিত করার জন্য, ‘বাপরে বাপ, কি চরিত্র,’ যাই হোক, এই মুহূর্তে, বীর কোনো যোদ্ধার বৈশিষ্ট্যসহ বহু মানুষের মত তিনি বেশ তীব্রভাবেই ভয় পেতে শুরু করেন যে – আর অবশ্যই বিনা কারণে নয় – হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে এক ধরনের স্নায়ুবৈকল্যের স্বীকার হবেন তিনি। যতটা দ্রুত সম্ভব তিনি তার গ্রেটকোটটি ছুড়ে দেন আর চিৎকার করে চালককে তার নিজের নয় এমন কন্ঠস্বরে চিৎকার করে বলেন, ‘বাড়ি চলো, যত দ্রুত তুমি পারো’। আর চালক সমস্যার কোনো মুহূর্ত সংশ্লিষ্ট এমন একটি কন্ঠস্বর শুনে, যার সাথে সুস্পষ্টভাবে খুব জোরালো নির্দেশ জড়িত, নিজেকে বাঁচাতে তার মাথা খানিকটা নীচু করে ঘাড়ের মধ্যে রেখে, তার চাবুক চালায় এবং তীরের গতিতে সে এগিয়ে যায়। ছয় মিনিটের চেয়ে সামান্য বেশী কিছু সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তার বাড়ির সামনে চলে আসেন। ফ্যাকাশে, ভয়ঙ্করভাবেই শঙ্কিত, কোনো গ্রেটকোট ছাড়া, ক্যারোলিনা ইভানোভনার কাছে না গিয়ে তিনি বাসায় ফিরে এসেছিলেন। খানিকটা ভারসাম্যহীনভাবে টলতে টলতে তিনি তার নিজের ঘরে যান, এবং খুব অস্থিরতার সাথে তিনি সেখানে রাত কাটান আর তার ফলাফল ছিল সকালে খাবারের সময় তার মেয়ে তাকে সরাসরি বলে, ‘আজ তোমাকে খুব ফ্যাকাশে লাগছে, বাবা।’ কিন্তু বাবা কোনো উত্তর দেননি। কি ঘটেছে সে বিষয়ে একটি শব্দও তিনি কারো কাছে উচ্চারণ করেননি, কোথায় তিনি গিয়েছিলেন অথবা কোথায় যাওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল।

ঘটনাটি তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এরপর, অনেক কম সংখ্যকবারই তিনি তার অধীনস্ত কর্মচারীদের বলেছিলেন, ‘কত সাহস আপনার? আপনি জানেন কে আপনার সামনে দাড়িয়ে আছেন?’ আর যদি তিনি এ ধরনের কোনো শব্দ উচ্চারণও করতেন, প্রথমে অধীনস্ত কর্মচারীটি কি বলতে চাইছেন সেটি শোনার পরই শুধুমাত্র তা উচ্চারণ করতেন। কিন্তু আরো বেশী উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে, এরপর থেকে মৃত সেই কেরানির অশরীরী উপস্থিতি পুরোপুরিভাবে থেমে যায়। জেনারেলের গ্রেটকোট নিশ্চয়ই তার গায়ের সাথে ভালোই মানানসই ছিল। আর যাই হোক না কেন, গ্রেটকোট ছিনিয়ে নেবার আর কোনো ঘটনার কথা শোনা যায়নি।

তাসত্ত্বেও বহু সক্রিয় আর উদ্বেগপূর্ণ জনগোষ্ঠী আশ্বস্ত হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং তারা বলা অব্যাহত রেখেছিলেন যে মৃত সেই কেরানির অশরীরী আত্মাটি এখনও শহরের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় আবির্ভূত হচ্ছে। একজন কোলোমনা (২১) পুলিশ সদস্য সত্যিই, তার নিজের চোখে, একটি দালানের পিছন থেকে  সেই অশরীরি আত্মাকে বের হয়ে আসতে দেখেছিলেন। কিন্তু খানিকটা দুর্বল হবার সুবাদে – এতটাই দুর্বল যে একবার একটি প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ শূকর, যে কিনা কারো বাড়ি থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসছিল তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল, আশে পাশে দাড়ানো ভাড়া স্লেড গাড়ির চালকদের দারুণ মজার কারণ হয়েছিল সেই ঘটনাটি, পরে যাদের প্রত্যেককে অর্ধেক কোপেক করে তিনি জরিমানা করেছিলেন, যেন তার জন্য কিছু নস্যি কিনতে পারেন – তিনি, যেমন আমি বলছিলাম, খানিকটা দূর্বল হবার কারণে সাহস করেননি তাকে আটকাতে যাবার জন্য, শুধুমাত্র তাকে অনুসরণ করেছিলেন অন্ধকারে যতক্ষণ না অবধি ভুতটি হঠাৎ করে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল, আর থেমে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কিসের পিছু নিয়েছেন আপনি?’এবং তিনি তার মুষ্ঠিবদ্ধ হাতও প্রদর্শন করেছিল এমনভাবে যে যা আপনি এমনকি জীবিত কোনো মানুষের মধ্যেও পাবেন না। পুলিশ সদস্যটি বলেছিলেন, ‘কিছুনা’ আর সাথে সাথে তিনি উল্টোদিকে পা বাড়ান। এই ভূতটি যদিও, অপেক্ষাকৃত বেশ অনেক লম্বা ছিল, শুধুমাত্র তার বিশাল একটি গোফ ছিল এবং স্পষ্টতই মনে হচ্ছিল যে তিনি ওবুকভ ব্রিজের দিকে এড়িয়ে যাচ্ছেন, এরপর এটি রাতের অন্ধকারে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।

(সমাপ্ত)

টীকা:

১ গ্রেটকোট, মূলত বড় মাপের ওভারকোট সাধারণত উল দিয়ে বানানো পরিকল্পিত আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা আর উষ্ণতার জন্য। এর কলার এবং হাতের কাফকে ঠান্ডা বা বৃষ্টি থেকে বাচাতে উল্টে দীর্ঘ করে ব্যবহার করা যায়।

২ সেইন্ট পিটার্সবুর্গ ( পিটার্সবুর্গ) জনসংখ্যার দিক থেকে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, জার পিটার দ্য গ্রেট এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৭০৩ সালে। ১৯১৪ সালে এটির নাম হয় পেত্রোগ্রাদ, ১৯২৪ সালে লেনিনগ্রাদ, তবে ১৯৯১ সালে এটি তার পুরোনো নাম ফিরে পায়। নেভা নদীর তীরে বাল্টিক সাগরের গাল্ফ অব ফিনল্যাণ্ডের মাথায় এর অবস্থান।

৩  টিটুলার কাউন্সিলর – জার শাসনামলে সেনাবাহিনী,সরকারী ও রাজসভার র‌্যাঙ্ক বা পদমর্যাদার তালিকায় নবম ধাপ।

৪ ইয়েরোশকিন শব্দটি এসেছে এমন একটি শব্দ থেকে যার অর্থ অগোছালো।

৫ সেইন্ট পিটার্সবুর্গে সিনেট একই সাথে সাধারণ আদালত ও আইন প্রণয়ণকারী প্রতিষ্ঠান।

৬ বেলোব্রুশকোভা: এই অসম্ভাব্য শোনানো পদবীর নামের আক্ষরিক অর্থ সাদা পেট বিশিষ্ট

৭ খোহদাজাত, চতুর্থ শতাব্দীর একজন বিশপ। খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হবার আগে তিনি আইনজীবি ছিলেন, গোগোলের নায়কের ব্যতিক্রম, সুপরিচিত ছিলেন তার বাগ্মীতার জন্য।

৮ স্টেট কাউন্সিলর, এর মানে নবম স্তর থেকে পঞ্চম স্তর, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

৯ নক-আউট হুইস্ট – এক ধরনের তাশ খেলা

১০ তামাক সেবনের জন্য লম্বা নলের তুর্কী পাইপ

১১ ফ্যালকোনেট এর পিটার দ্য গ্রেট: এতিয়েন-মরিস ফ্যালকোনেট এর দ্য ব্রোঞ্জ হর্সম্যান সেইন্ট পিটার্সবুর্গের বিখ্যাত একটি ভাস্কর্য। ঘোড়াটি তার পেছনের পায়ের উপর ভর করে দাড়িয়ে আছে, যদি লেজটা, যা এর ভারসাম্যের জন্য তৃতীয় বিন্দুটি তৈরী করা হয়েছিল, যদি কেটে ফেলা হয় তাহলে পুরো ভাস্কর্যটি ধ্বসে পড়বে।

১২ চিজক্লথ – খুব শিথিল করে বোনা তুলোর কাপড়, সাধারণত পনির বা চিজ বেধে রাখার জন্য ব্যবহার হয়।

১৩ পেত্রোভিচ: অপেক্ষাকৃত কম বয়সী আর অবিবাহিত কৃষক যারা সাধারণ পরিচিত তাদের খ্রিস্টীয় নাম বা ডাকনামে। আর বাবার নামে তাকে ডাকা হোক দর্জির সামাজিক মর্যাদা পাবার ইচ্ছাই প্রকাশ করছে।

১৪ খ্রিস্টীয় অর্থোডক্স ক্যালেণ্ডার মোট ১২ টি বড় উৎসব আছে, লাল রঙ দিয়ে সেই তারিখগুলো মূদ্রণ করা হয়, আর সাধু বা সেইন্টের কোনো দিনকে বড় অক্ষর আর ছোট একটি ক্রুশ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।

১৫ বনেট মানে কৃষকে মাথার চাদর নয়, কোনো ভদ্র মহিলাদের মত টুপি বা বনেট।

১৬ ফুট-ক্লোথ, পা আর গোড়ালী পেচিয়ে রাখা কাপড়ের একটি টুকরো, বিংশ শতাব্দীর আগে বেশীর ভাগ রুশরাই কখনো মোজা পরেনি।

১৭ মার্টেন এক ধরনের প্রাণি (family Mustelidae), যাদের গায়ের লোমশ চামড়া বা ফার ব্যবহার হতো কোটের কলারে লাগানোর জন্য।

১৮ বিভার, এক ধরনের প্রাণি, যাদের লোমশ চামড়া ব্যবহার করা হতো কোটের কলার বানানোর জন্য।

১৯ সামোভার, রাশিয়া সহ বেশ কিছু দেশে দেখা যায় ধাতু নির্মিত বড় পাত্র, যেখানে পানি ফোটানো হয়।

২০ পুলটিস (কাটাপ্লাজম) নরম আর্দ্র পট্টির মত, যখন তাপ দিয়ে উষ্ণ করা কখনো ঔষধ সহ, যা কাপড়ের উপর বিছানো হয় চামড়ার উপর দেবার জন্য ব্যাথ্যা, প্রদাহ কিংবা শরীরের ব্যাথা হচ্ছে এমন জায়গা চিকিৎসা দেবার জন্য।

২১ কোলোমনা: গোগোলের সময় সেইন্ট পিটার্সবুর্গের খানিকটা বাইরের একটি জেলা।

Advertisements
গোগোলের গ্রেটকোট

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s