কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন

kenneth-clark-800x600-1(ছবি: কেনেথ ক্লার্ক)

(আসমা সুলতানা ও আমি কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন বইটি অনুবাদ করেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। সেই বইটির অনুবাদকের ভূমিকাটি নিচে প্রকাশ করলাম। সহ অনুবাদক শিল্পী আসমা সুলতানা কিংবা প্রকাশক কারো অনুমতি ছাড়াই কাজটি করছি। – কাজী মাহবুব হাসান)

কেন এই বইটি

শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে লেখা হয়েছে এমন উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ শিল্পকলার ইতিহাসবিদ স্যার কেনেথ ক্লার্ক এর ‘সিভিলাইজেশন’ বইটি অন্যতম। এই বইটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এর সঙ্গী একই শিরোনামে ১৩ পর্বের প্রামাণ্য ধারাবাহিকটির জন্য। ১৯৬৯ সালে বিবিসি টেলিভিশনের জন্য নির্মিত প্রথম রঙ্গীন এই প্রামাণ্য চিত্রটি, শুধুমাত্র বিষয়বস্তু নয় বরং আরো বেশ কিছু কারণেই ছিল যুগান্তকারী। সে বিষয়ে অবশ্য আমরা পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো। ২০০৫ এ প্রামাণ্যচিত্রটির হাই ডেফিনিশন ডিভিডি এবং ২০১১ সালে ব্লু রে ডিস্ক প্রকাশনা এবং ২০১৪ সালে লন্ডনে টেট ব্রিটেইন গ্যালারীতে দর্শক নন্দিত কেনেথ কèার্কের ব্যাক্তিগত শিল্পকলা সংগ্রহের প্রদর্শনী আরো একবার প্রমাণ করে কেনেথ ক্লার্ক এখনও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারাননি। সেকারণে সত্তরের দশকের শুরুর দিকে প্রকাশিত আমাদের প্রিয় এই বইটি বাংলায় অনুবাদ করার জন্য নির্বাচিত করতে আদৌ তেমন কোনো কিছু ভাবার প্রয়োজন পড়েনি। মোট ১৩ টি স্বতন্ত্র প্রবন্ধের একটি ধারাবাহিক আখ্যানের সূত্রে তিনি রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর অন্ধকার যুগের সময় পেরিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার নির্মাণে শিল্পকলা, স্থাপত্য, সাহিত্য, দর্শন, মানবতবাদ, যুক্তি এবং শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসের মিথস্ক্রিয়াকে উপস্থাপন করেছিলেন, তাঁর স্বভাবসুলভ শিথিল সততা আর সহজাত আবেগ আর কৃর্তত্বপূর্ণ সংবেদনশীলতায়। এখনও শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে ব্যপক আর সর্বব্যাপী মন্তব্য করার ক্ষেত্রে কোনো শিল্পসমালোচকই তাঁর মত এত সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেননি ।

সভ্যতা : কেনেথ ক্লার্ক এর একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গী

সিভিলাইজেশন: এ পারসোনাল ভিউ বাই কেনেথ ক্লার্ক , ঠিক এভাবেই প্রামাণ্য ধারাবাহিকটির নামকরণ করা হয়েছিল যখন ১৯৬৯ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী এর প্রথম পর্বটি বিবিসি টু টেলিভশনে সম্প্রচার করা হয়। উপশিরোনাম ‘এ পারসোনাল ভিউ বাই কেনেথ ক্লার্ক’ কদাচিৎ উল্লেখ করা হলেও এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সভ্যতার মতো সর্বব্যাপী একটি বিষয়কে নির্দিষ্ট পরিসীমায় প্রকাশ করার জন্য, এর মূল চিত্রনাট্যকার ও উপস্থাপক কেনেথ ক্লার্কের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অবধারিত, যেখানে তিনি মূলত নজর দিয়েছিলেন পশ্চিম ইউরোপের সভ্যতা এবং খুব সংক্ষিপ্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতার ইতিহাসের প্রতি। তখন বিবিসি টু এর কন্ট্রোলারের দ্বায়িত্বে ছিলেন খুব পরিচিত মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব ডেভিড অ্যাটেনবুরো । কারগরী কারণে প্রথম রঙ্গীন টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ দক্ষতায় বিবিসি’র অন্য চানেলগুলোর থেকে বেশ এগিয়ে ছিল তাঁর বিবিসি টু। দৃশ্যমান শিল্পকলা নিয়ে বোদ্ধা দর্শককে আকৃষ্ট করার অভিপ্রায়ে, একটি বড় পরিসরে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণে তিনি উৎসাহী হয়েছিলেন। কিন্তু কেনেথ ক্লার্ককে সেই প্রামাণ্য চিত্রে উপস্থাপক হিসাবে কেন নির্বাচিত করেছিলেন ডেভিড অ্যাটেনবুরো?

একটু আগের ইতিহাসের দিকে যদি নজর দেয়া যায়, তবে আমরা দেখবো ন্যাশনাল গ্যালারীর সর্বকনিষ্ঠ পরিচালক হিসাবে কেনেথ ক্লার্ক একটি নতুন মিশনে নেমেছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন শিল্পকলাকে একটি জাতীয় গৌরবের বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে, আর এই লক্ষ্যেই সেই সময়ে নতুন প্রযুক্তি হিসাবে টেলিভশনের গুরুত্ব তিনি অনুভব করেছিলেন অনেকের আগেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বৃটিশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ইউনিটের প্রধান হিসাবে বাড়তি দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছিল সেই সময়ের দুটি অসাধারণ প্রামাণ্য চিত্র : ১৯৪২ সালে ‘লিসেন টু ব্রিটেইন’ এবং ১৯৪৪ সালে জিল ক্রেইগী’র ‘আউট অব কেওস’ , পরেরটির বিষয়বস্তু ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটেনে কর্মরত শিল্পীদের (যেমন পাইপার, সাদারল্যান্ড এবং হেনরী মুর) শিল্পকর্ম। দুটো প্রামাণ্য চিত্রই ছিল সেই সময়ের প্রেক্ষিতে খুব অগ্রসর শৈলীতে নির্মিত। অক্সফোর্ডে সংক্ষিপ্ত অধ্যাপনা পর্ব শেষে তিনি দ্বায়িত্ব নেন প্রথম বাণিজ্যিক টেলিভিশন আইটিভি’র প্রধান হিসাবে, কিন্তু সেই পদে অবশ্য তিনি বেশী দিন থাকতে পারেননি; তবে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসাবে তাঁর সম্ভাবনাকে শনাক্ত করেছিলেন, তৎকালীন টিভি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা অনুসন্ধানকারী লিউ গ্রেড ।

51jsxfdhn6l-_sx351_bo1204203200_
(ছবি: সিভিলাইজেশন বইটির প্রচ্ছদ)

বোদ্ধা মহলে শিল্পকলার ইতিহাসবিদ হিসাবে সুপরিচিত কেনেথ ক্লার্কের টেলিভিশন পর্ব শুরু হয় ‘ইস আর্ট নেসেসারী’ (১৯৫৮) এবং ‘সুড এভরী পিকচারস টেল এ স্টোরী?’ (১৯৫৮) নামের দুটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান দিয়ে। টেলিভিশনের জন্য এই ধরনের অনুষ্ঠান সেই সময়ের প্রেক্ষিতে অনেক অগ্রসর ছিল। স্টুডিও পরিবেশে বিতর্ক আকারে এই অনুষ্ঠানগুলো অব্যাহত ছিল পঞ্চাশের অধিক পর্বে। এখানেই আমরা প্রথম তাঁকে আরেক প্রখ্যাত ব্রিটিশ শিল্প সমালোচক জন বার্জারের সাথে বিতর্কে দেখি। অবশ্য স্টুডিও ফরম্যাটের এই ধরনের অনুষ্ঠান তাঁর পছন্দের ছিলনা আদৌ। তিনি মনে করতেন, এর চেয়ে অনেক বেশী দক্ষতার সাথে তিনি তাঁর ধারণাকে উপস্থাপন করতে পারবেন, যদি বিষয়ভিত্তিক লেকচার নির্ভর অনুষ্ঠান তৈরী করা হয়।

তাঁর পছন্দ অনুযায়ী নির্মিত হয় ‘ফাইভ রেভ্যুলশনারী পেইন্টারস’ (১৯৫৮), এখানে আমরা সেই কেনেথ ক্লার্ককে পাই, যে রুপটি তিনি ধরেছিলেন সম্প্রচার মাধ্যমে তাঁর বাকী দিনগুলোতে। এর পেছনের আরো একজনের অবদান ছিল, তিনি এর পরিচালক মাইকেল রেডিংটন। যিনি নিজেও একজন অভিনেতা ছিলেন আর তিনি ক্লার্ককে উৎসাহ দিয়েছিলেন বক্তৃতা নয় বরং খানিকটা অভিনয় করতে। তাঁকে তিনি সেই আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলেন তাঁর দ্বিমতগুলো টেলিভিশনের পর্দায় প্রকাশ করার জন্য এবং দর্শকের সাথে কথা বলার সময় অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য, যেন মনে হবে এককভাবে কোন দর্শকের সাথে কথা বলছেন। ১৯৬০ সালে তাঁর প্রযোজিত ‘পিকাসো: স্যার কেনেথ ক্লার্ক অ্যাট দি টেট গ্যালারী’ প্রামাণ্য চিত্রে ক্লার্ক এর উপস্থাপনা ও পান্ডিত্য আর সরল সততা দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল অভূতপূর্বভাবে। রেডিংটনের সাথে জুটি বেধে তিনি নির্মাণ করেন যুগান্তকারী কিছু প্রামাণ্য ধারাবাহিক: ‘আর্ট অব আর্কিটেকচার’ (১৯৬০), ‘শেপস অ্যান্ড সাউন্ড’ (১৯৬০), ‘ল্যান্ডস্কেপস ইনটু আর্ট’ (১৯৬১), ‘রেমব্রান্ট’ (১৯৬২), ‘মাইকেলেঞ্জলো’ (১৯৬৩), ‘ডিসকভারিং জাপানীজ আর্ট’ (১৯৬৩), ‘রিডিসকভারিং দি ইমেজ’(১৯৬৫)।

বিবিসি টু এর তৎকালীন সেকেন্ড কন্ট্রোলার, ডেভিড অ্যাটেনবুরোকে যখন দায়িত্ব দেয়া হয় বিবিসি টিভিতে রঙ্গীন প্রোগ্রামের সূচনা করতে, তিনি প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে বৃটিশ টেলিভিশনের প্রথম রঙ্গীন প্রোগ্রামটি এমন হবে, যেন এই ধরনের অনুষ্ঠান নির্মানের চাহিদা ভবিষ্যতেও যুক্তিযুক্ত হয় সবসময়। তাঁর পরিকল্পনা ছিল এমন একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করার, যা পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিসগুলো দেখাবে, আর একজন ধারাবর্ণনাকারী প্রাসঙ্গিক আলোচনায় তাদের যুক্ত করে নেবে। ডেভিড অ্যাটেনবুরো’র প্রথম পছন্দ ছিলেন স্পষ্টতই কেনেথ ক্লার্ক। ১৯৬৬ সালের গ্রীষ্মে লন্ডনের একটি রোস্তরায় মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় তিনি এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন কেনেথ ক্লার্কের কাছে। অ্যাটেনবুরো জানতেন তাঁর অস্পষ্ট এই ধারণাটিকে স্পষ্ট রুপ দিতে পারেন একজনই – তিনি শিল্পকলার ইতিহাসবিদ এবং টেলিভিশন উপস্থাপক ‘কে’।

এই মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় ধীরে ধীরে একটি রুপ পায় সিভিলাইজেশন অনুষ্ঠানটির রুপরেখাটি, ইউরোপে যে সময়টি পরিচিত ডার্ক এজ বা অন্ধকার যুগ বলে, সেই সময় পরবর্তী পশ্চিমা শিল্পকলা, স্থাপত্য এবং দর্শনের ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক বিবরণ। এখানেই ক্লার্ক সিদ্ধান্ত নেন, তিনি পশ্চিমা সভ্যতার কথা বলবেন, এর নির্মাণে শিল্পকলা, সাহিত্য, সঙ্গীত, দর্শনের ভূমিকা, জীবনের চেয়ে বড় এর বীরোচিত চরিত্রগুলোর কথা তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বর্ণনা করবেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার পরিসর এত সুবিশাল যে তিনি অনুভব করেছিলেন এমন কোন কিছু সৃষ্টি করতে তাঁকে কিছু আবশ্যিক সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিতে হবে।

অ্যাটেনবুরোর সাথে তাঁর সাক্ষাৎকারটি কোন সমস্যা ছাড়াই অতিক্রান্ত হলেও পরিচালক মাইকেল গিল এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎকারটি মসৃণ ছিলনা। প্রথম দেখাতে তাদের পারস্পরিক অপছন্দটি সুস্পষ্ট হয়। গিল ক্লার্কের আড়ম্বরময় অহংকারী বক্তৃতার ভক্ত ছিলেন না, এবং ক্লার্কও কোন পরিচালকের নির্দেশ বিনাবাক্যে মেনে নেবার মত মানুষও ছিলেন না। তবে এই সাক্ষাৎকারে অবশেষে গিল ক্লার্ককে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁকে ধারাবাহিকভাবে পুরো অনুষ্ঠানের রুপরেখাটি প্রবন্ধ আকারে দিতে, এবং সেটা যতই জটিল আর কঠিন হোক না কেন তিনি তাঁর চলচ্চিত্র রুপ দেবেন।

তেরোটি পর্বের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে ক্লার্ক তাঁর পুরো ধারণাটিতে ১৩ টি অসাধারণ প্রবন্ধে বিস্তৃত করেন। প্রামাণ্য চিত্রফঃ নির্মাণের জন্য ক্লার্ক এবং কুশলীরা মোট ১১ টি দেশে ১৩০ টি লোকেশনে শুটিং করার জন্য তারা মোট আশি হাজার মাইল ভ্রমন করেছিলেন। প্রায় ৬৫০ মিনিট দীর্ঘ ৩৫ মিমি ফিল্ম ফরম্যাটে এই প্রামাণ্য ধারাবাহিকটি নির্মিত হয়েছে প্রায় তিন বছর ধরে। এই নির্মাণকালীন সময়ে ক্লার্ক এবং পরিচালক, প্রযোজক মাইকেল গিলের মধ্যকার তিক্ততা রুপান্তরিত হয় মধুর বন্ধুত্বে। কাজ করার সময়ই ক্লার্কের পান্ডিত্য এবং নান্দনিকতাবোধ চিরস্থায়ী একটি শ্রদ্ধার জায়গা করে নিয়েছিল গিলের মনে। ১৯৬৯ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী এই সুবিশাল প্রজেক্টটির প্রথম পর্ব যখন সম্প্রচারিত হয় বিবিসি টু চ্যানেলে, এর প্রতি প্রতিক্রিয়া ছিল অভূতপূর্ব, শুধু দর্শক নয়, সমালোচকরাও উচ্চকন্ঠ হয়েছিলেন এর প্রশংসায়। জে বি প্রিস্টলী সেই সামগ্রিক অনুভূতিটাকেই প্রকাশ করেছিলেন তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে: ‘এটি নিজেই সভ্যতার প্রতি একটি নিবেদন।’ পরবর্তী ১৩ সপ্তাহ তিনি ধারবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, কিভাবে দুই হাজার বছরের সৃজনশীলতার তাড়না পশ্চিমা সভ্যতাকে তার বর্তমান রুপ দিয়েছে।

বিবিসি’র হিসাব অনুযায়ী তাদের প্রায় সেই সময়ে পাঁচ লক্ষ পাউন্ড ব্যয়ে নির্মিত অনুষ্ঠানটি প্রথম পর্ব দেখেছিলেন মাত্র ১ মিলিয়ন দর্শক – এর কারণ আংশিকভাবে বিবিসি টু নামের এই নতুন চ্যানেলটি তখনও সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি কারিগরী কারণে। কিন্তু প্রামাণ্যচিত্রটির প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী, ব্যয়বহুল একটি প্রোজেক্ট হিসাবে শুরুতে চিহ্নিত হলেও এটি খুব দ্রুত পরিণত হয় মানসম্পন্ন কোন প্রামাণ্য ধারাবাহিকের মানদন্ড হিসাবে। এরই ধারবাহিকতায় আমরা ডেভিড অ্যাটেনবুরোর পৃষ্ঠপোষকতায় জ্যাকব ব্রনস্কি’র ‘দি অ্যাসেন্ট অব ম্যান’ নির্মিত হতে দেখি ১৯৭৩ সালে। এছাড়া ১৯৭২ সালের আলিয়েস্টার কুক এর আমেরিকা, কেনেথ ক্লার্কের ‘দি রোমান্টিক রেবেলিয়ন’ (১৯৭৩), ডেভিড অ্যাটেনবুরো’র ‘লাইফ অন আর্থ’ (১৯৭৯), আধুুনিক শিল্পকলা নিয়ে রবার্ট হিউজ ‘এর দি শক অব দি নিউ’ (১৯৮০), কার্ল সেগান এর ‘কসমস’ (১৯৮০)। ১৯৭২ সালে সম্প্রচারিত জন বার্জারের মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর ‘ওয়েজ অব সিইং’ নির্মিত হয়েছিল খানিকটা কেনেথ ক্লার্কের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিক্রিয়ায়। আমেরিকার কোন টেলিভিশনে এটি প্রদর্শিত হবার সুযোগ প্রথমে না পেলেও ১৯৬৯ সালে ওয়াশিংটন ডিসি’র ন্যাশনাল গ্যালারী অব আর্ট এর থিয়েটারে এটি প্রদর্শন করার উদ্যোগ নেয়, মাত্র ৩০০ আসনে এর প্রথম প্রদর্শনীতে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় ২৪০০০ দর্শক। পরে ১৯৭০ সালে নব্য প্রতিষ্ঠিত ‘পিবিএস’ চ্যানেল এটি সম্প্রচার করে ও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

‘সিভিলাইজেশন’ এখনও সমীহ জাগানো একটি অবস্থান ধরে রেখেছে, একক ব্যক্তির সৃজনশীল উদ্যোগের উপর ভর করে আধুনিকতার এই উন্মেষ হয়তো এখন হাল ফ্যাশনের মনে নাও হতে পারে, তবে প্রামাণ্য চিত্রটিতে ক্লার্ক যে মতবাদটির প্রতি তাঁর যুক্তি সাজিয়েছেন, মানবতার অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতে পারে শিল্পকলার মাধ্যমে এখনও আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। আর তাঁর উপস্থাপন শৈলী ও ধারাবিবরণ কখনো মনে হতে পারে তাঁর আত্মগত একক সংলাপের মত, কিন্তু তারা খুব সহজেই আমাদের সুযোগ করে দেয় তাঁর ধারণাগুলোকে অনুভব করার জন্য, দর্শকদের প্রতি তাঁর কথোপকথনে কোন ঔদ্ধত্য আমরা অনুভব করতে পারিনা। বিবিসি ২০১১ সালে এটিকে হাই ডেফিনেশনে রুপান্তরিত করে তাদের এইচডি চ্যানেলে সম্প্রচার করে ৯ ফেব্রুয়ারী, পরে এর ব্লু রে সংস্করণটি প্রকাশ করা হয়। ২০১৪ সালে বিবিসি এই ধারাবাহিকটির একটি নতুন সংস্করণ নির্মাণের ইচ্ছা পোষন করে, নানা বিতর্কের সূচনাকারী এই প্রস্তাবটি এখনও পরিকল্পনাধীন।

এই প্রামাণ্য ধারাবাহিকের চিত্রনাট্যে ব্যবহৃত প্রবন্ধগুলো ‘সিভিলাইজেশন: এ পারসোনাল ভিউ’ শিরোনামে একটি সচিত্র সংস্করণ প্রকাশ করেছিল বিবিসি বুকস, প্রথমে নভেম্বর ১৯৬৯ এবং পরে ১৯৮০ সালে। শুধু সিভিলাইজেশন শিরোনামে বইটির একটি পেপারব্যাক ও ছবিহীন সংস্করণ লন্ডনের ‘জন মারে’ প্রকাশনী পুনঃপ্রকাশ করে ২০০৫ সালে। জন মারে প্রকাশনী এবং কেনেথ ক্লার্ক এস্টেট এর অনুমতি সাপেক্ষে আমরা অনুবাদ করেছি এই বইটি।

সভ্যতার অনুসন্ধান :

প্রামাণ্য চিত্রটির তেরো পর্বের প্রতিনিধিত্বকারী বইটির তেরোটি অধ্যায়ে কেনেথ ক্লার্ক সেইসব মহান ধারণাগুলো নীরিক্ষা করেছেন, রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে আধুনিক যুগ অবধি যে ধারণাগুলোর উদ্ভব, বিকশিত, পরিবর্তিত কিংবা পতন হয়েছিল পশ্চিম ইউরোপে। যেহেতু ক্লার্ক নিজে একজন শিল্পকলার ইতিহাসবিদ, বিস্ময়কর নয় যদিও তিনি সাহিত্য কিংবা সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, তবে তাঁর বিশেষ লক্ষ্য ছিল উপস্থাপন করা কিভাবে কোনো একটি যুগের ধারণাগুলো প্রতিফলিত হয় সেই সময়ের দৃশ্যমান শিল্পকলায় – চিত্রকলা, ভাস্কর্য, অলঙ্করনের জন্য নির্মিত নানা দ্রব্য, পান্ডুলিপি এবং স্থাপত্য। পুরো বইটি জুড়ে ক্লার্ক মানবিক চিন্তা এবং তাদের সৃষ্ট সৌন্দর্যের গুণগান করেছেন। অন্ধকার যুগ পরবর্তী প্রতিটি যুগ, যা তিনি পর্যালোচনা করেছেন, তিনি সভ্যতায় সেই যুগের বৈশিষ্ট্যসূচক অবদানটিকে চিহ্নিত করেছেন, আর এটি করতে গিয়ে সভ্যতায় অবদান রাখা সুনির্দিষ্ট পাত্রপাত্রীকে তিনি তাঁর আলোচনায় নিয়ে আসেন, যারা এইসব ধারণার প্রতিনিধিত্ব এবং সেই সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল খুব স্পষ্ট : ইতিহাস কোনো বিমূর্ত শক্তির নয়, এটি শক্তিশালী সৃজনশীল চরিত্রের পাত্রপাত্রীদের সৃষ্টি। ক্লার্ক এর নিজের মতে এই প্রামাণ্য ধারাবাহিকটি ও বইটির সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমা সভ্যতার উপর ক্রমশ বাড়তে থাকা নৈরাশ্যবাদীতার প্রতি একটি উত্তর হিসাবে, এর মূল্যবোধ এবং এর বীরোচিত সাহসী চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য।
সিভিলাইজেশন বা সভ্যতা আসলে কি ? এই প্রশ্নটি দিয়ে তিনি অনুসন্ধানী যাত্রা শুরু করেছিলেন বইটির প্রথম অধ্যায় থেকেই; সহজাত সরল একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে তিনি আমাদের মনে করিয়েও দেন এর উত্তর তাঁর জানা নেই ঠিক, তবে সভ্যতাকে দেখলে ঠিকই তিনি তা শনাক্ত করতে পারবেন, প্রামাণ্য চিত্রে এখানে আমরা তাকে প্যারিসের নতর দাম ক্যাথিড্রালের দিকে তাকিয়ে স্বগোতক্তি করতে শুনি, ‘আমি এখন তার দিকেই তাকিয়ে আছি’। জন রাস্কিন একটি প্রাসঙ্গিক উক্তির ব্যবহার করে তিনি আমাদের ইঙ্গিত দেন, সভ্যতার এই অনুসন্ধানে তিনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন, মানুষের সৃজনশীল সৃষ্টির নির্মাণের ইতিহাসে। রাস্কিন বলেছিলেন: ‘প্রতিটি মহান জাতি তাদের আত্মজীবনী লিখে রেখে যায় তিনটি পান্ডুলিপিতে – তাদের কৃতকর্মের বই, তাদের ব্যবহৃত শব্দমালার বই এবং তাদের শিল্পকলার বই । এই বইগুলোর কোন একটিকে বোঝা সম্ভব হবেনা যদি না আমরা অন্য বই দুটি পড়ি, কিন্তু এই তিনটির মধ্যে শুধুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য বইটি হচ্ছে শেষেরটি।’ আমরা পাঠক আর দর্শকরা অতীতের বহু শতাব্দী অভিমুখে ক্লার্কের সভ্যতাকে খোঁজার অসুন্ধানে সঙ্গী হই । তিনি ধীরে ধীরে চাক্ষুষ প্রমাণগুলো আমাদের সামনে জড়ো করতে শুরু করেন এবং সভ্যতার একটি আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করেন।

 

1377790_archiveindex
(ছবি: সিভিলাইজেশন প্রামাণ্যচিত্রটি ধারণ করার সময়)

আমরা কেনেথ ক্লার্ককে দেখি তাঁর পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রেই মূলত দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে, তাঁর পরিচিত পরিবেশ, পশ্চিম ইউরোপে। তাঁকে আমরা বাইজানটাইন রাভেনা থেকে কেল্টিক হেবরিডাইজ, ভাইকিংদের নরওয়ে থেকে জার্মানীর আখেন এ শার্লেমাইন এর চ্যাপেলে আসতে দেখি – এখানেই তিনি ইউরোপের সেই অন্ধকার যুগের কথা বলেন, যা বিস্তৃত ছিল রোমান সা¤্রাজ্য পতনের পর ছয় শতাব্দী জুড়ে। তিনি প্রথম অধ্যায়ের ‘দি স্কিন অব আওয়ার টিথ’ শিরোনামটিকে অর্থবহ করে তোলেন তাঁর অনুসন্ধানী যাত্রার সূচনায়, তিনি পাঠকদের মনে করিয়ে দেন, জীবনদায়ী যে সব মানবিক কর্মকান্ড, যাদের একত্রে সভ্যতা শব্দটি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি আমরা, পশ্চিম ইউরোপে সেই সভ্যতাটি একবার নিশ্চিহ্ন হয়েছিল যখন যাযাবর বারবারিয়ানরা রোম সা¤্রাজ্য আক্রমন করে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। আমরা আজ যাকে সভ্যতা বলছি সেই সভ্যতা খুব অল্পের জন্যই রক্ষা পেয়েছে, তাঁর ভাষায় এই রক্ষা পাওয়া আসলেই ‘বাই দি স্কিন অব আওয়ার টিথ’ বা কোনমতে। কেনেথ ক্লার্ক স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সভ্যতার ইতিহাস অবশ্যই শিল্পকলার ইতিহাস নয়, তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, এমনকি নগর কেন্দ্রিক সভ্যতার বাহিরে বাস করা গোত্রগুলো, যাদের গ্রীকরা চিহ্নিত করেছিল বারবারিয়ান হিসাবে এমনকি বঞ্চিত সমাজের সংকীর্ণতা সত্ত্বেও তারা নানা অলঙ্কারিক শিল্পকর্ম সৃষ্টির দক্ষতা অর্জন করেছিল। তিনি সতর্ক করে দেন, একদিন ক্ল্যাসিকাল যুগের মানুষরাও তাগিদ অনুভব করেছিল চিন্তা আর অনুভূতির গুণগত মানোন্নয়নের জন্য, যেমন একটি নিখুঁতত্ব আর শ্রেষ্ঠত্বর একটি রুপের নিকটবর্তী কিছু অর্জন করতে পারে। তারা হয়তো এটি করতে চেষ্টা করেছে নৃত্য,সঙ্গীত, দর্শনের নানা পদ্ধতি, দৃশ্যমান জগতের উপর তাঁর আরোপিত শৃঙ্খলা দিয়ে। কিন্তু অবশেষে সেই ক্ল্যাসিকাল বিশ্ব পরিশ্রান্ত আর নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল তারা । আর সেকারণে আরো প্রানবন্ত কিন্তু বর্বর মানুষের দল সেই জগতকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তী বারোটি অধ্যায় ক্লার্ক তাঁর পাঠক এবং দর্শকদের পশ্চিমা সভ্যতার পুনরুত্থান, সংগ্রাম, বিপর্যয় এবং বিজয়ের ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

‘দি গ্রেট থ’, দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম যেমনটি ইঙ্গিত দেয় ক্লার্ক আমাদের দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় সভ্যতার হঠাৎ পুনর্জন্মের কথা জানান, এই নতুন করে জেগে ওঠা সংস্কৃতি তিনি অনুসরণ করতে শুরু করেন ক্লুনির অ্যাবী থেকে ব্যাসিলিকা অব সেইন্ট ডেনিস অবধি, অবশেষে তিনি আমাদের নিয়ে আসেন ত্রয়োদশ শতাব্দীরর শরুর দিকে নির্মিত সেই সময়ের সেরা সৃষ্টি শার্ত্রের ক্যাথিড্রালে। দ্বিতীয় অধ্যায় (দি গ্রেট থ) থেকে ক্লার্ক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন খ্রিস্টীয় ধর্মের বিস্তার ও প্রগতির সাথে এবং মধ্যযুগের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে, আমরা তাঁকে গথিক স্থাপত্যের অনুসন্ধান করতে দেখি, যা ছিল পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে থাকা একটি সংস্কৃতির ঐশ্বরিক আর স্বর্গীয় অনুভূতিকে স্পর্শ করার একটি সাহসী বহিঃপ্রকাশ। ধীরে ধীরে ধর্মীয় নানা অলংকারিক শিল্পকলা, জটিল সুক্ষ্ম শৈলীর পান্ডুলিপি, যা শুধু সৌন্দর্যই নয়, খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি সযতœ দৃষ্টি, সৃজনশীল হবার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করেছিল। কিন্তু পরিশেষে, ধর্মীয় বাধানিষেধেরই প্রতিক্রিয়া জন্ম দিয়েছিল সেই অসাধারণ পর্বটির যা আমাদের কাছে পরিচিত রেনেসাঁ হিসাবে।
তৃতীয় অধ্যায় ‘রোমান্স অ্যান্ড রিয়েলিটি’র সূচনা হয় ফ্রান্সে লোয়ার নদীর উপর নির্মিত দুর্গ থেকে ইতালীর তুসকানী ও উমব্রিয়ার সূর্য¯œাত পাহাড় থেকে পিসা’র ব্যাপট্রিসট্রিতে, মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে চতুর্দশ শতাব্দীর ফ্রান্স এবং ইতালীর আশা-আকাঙ্খা এবং অর্জন নিয়ে আলোচনা করেন।

‘ম্যান: দি মেজার অব অল থিঙ্গস’ শিরোনামে চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা তাকে পাই ফ্লোরেন্সে – রেনেসাঁর সুতিকাগারে। ক্লার্ক ব্যাখ্যা করেন যে পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপীয় চিন্তাধারা যে বিশাল পরিবর্তন এসেছিল তার অনুঘটক ছিল এই সময়ে পুনআবিষ্কৃত হওয়া প্রাচীন গ্রীস ও রোমের বহু সৃষ্টি, কø্যাসিকাল যুগের লেখকদের সৃষ্টিকর্ম। রেনেসাঁর সেই সূচনা পর্বের কেন্দ্রীয় কিছু স্থান যেমন উরবিনো এবং মানতুয়ার প্রাসাদ ও সভ্যতার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর সাথে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।

রেনেসাঁ পর্বের সেই সময়টিকে নিয়ে আলোচনা তিনি আরো বিস্তৃত করেন পঞ্চম অধ্যায় ‘দি হিরো অ্যাস আর্টিস্ট’ এ। যেখানে ক্লার্ক তাদের পাঠক দর্শকদের নিয়ে যান ষোড়শ শতাব্দীর পোপের অধিকৃত রোমে, এখানে প্রাচীন গ্রীক রোমান পর্ব এবং খ্রিস্টধর্মের মিলনের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এখানে আমরা আলোচনায় পাই রেনেসাঁর তিন শ্রেষ্ঠ মানবকে, মাইকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল এবং লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। ভ্যাটিকান চত্ত্বর, পোপের প্রাসাদে রাফায়েল এর অমর ম্যুরাল আর সিস্টিন চ্যাপেলে ছাদে মাইকেলেঞ্জেলোকে আমরা দেখি।

পুনর্জন্মের এই পর্বে মানুষ প্রাচীন গ্রীস ও রোমের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছিল নতুন করে তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবার অনুপ্রেরণা খুজতে। বেশ কয়েকটি অধ্যায়ে আমরা দেখি তিনি আমাদের ধীরে ধীরে মানবতাবাদের উত্থানের ইতিহাসের সাথে পরিচিয় করিয়ে দিচ্ছেন। এই সময় পর্বকে প্রতিনিধিত্বকারী একটি অধ্যায় যার শিরোনাম খুব সঠিকভাবেই ‘দি হিরো অ্যাস আর্টিষ্ট’ এ ক্লার্ক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন সেই সব প্রাণবন্ত, প্রতিভাবান আর বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের সাথে যারা রেনেসাঁ পর্ব সৃষ্টি করেছিল। আমরা তাদের প্রাণশক্তি আর আত্মবিশ্বাসের উত্তাপ অনুভব করতে পারি। তাদের প্রাচীন গ্রীক ও রোমের ঐতিহ্যের ভারে পিষ্ট হবার কোন মানসিকতা ছিলনা, তারা তাদের ঐতিহ্যকে আত্মীকরণ করতে চেয়েছিলেন, তারা চেয়েছিলেন তাদের নিজেদের সময়ের বীর আর মহামানবদের সৃষ্টি করতে।

মাইকেলেঞ্জেলোর অসাধারণ সুবিশাল ভাস্কর্য ‘ডেভিড’ এর সাথে এর মাত্র পঁচিশ বছর আগে সৃষ্টি করা ভেরোচ্চিও’র ভাস্কর্যটি তুলনা করে তিনি আমদের দৃষ্টিতে স্পষ্ট করেন সেই যুগের সত্যিকারের উদ্দীপনা আর কর্মশক্তিটিকে, ভেরোচ্চিও ডেভিড হালকা, ক্ষিপ্র, স্মিতহাসি মুখে ও পরিচ্ছদে আবৃত, কিন্তু মাইকেলেঞ্চোলোর ডেভিড সুবিশাল, স্পর্ধিত, নগ্ন। তিনি এই ধারা পরির্তনের সাথে তুলনা করেন মোৎসার্টের ‘ফিগারো’র সাথে বীটহোভেন এর ‘ফিদেলিও’র সাথে। মাইকেলেঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র যখনই আমরা এর মাথার দিকে দৃষ্টি দেই, আমরা একটি আধ্যাত্মিক শক্তি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠি, যার সাথে প্রাচীন পৃথিবীর কোন পরিচিয় ছিলনা’, এখানে তিনি আধ্যাত্মিক শব্দটি উল্লেখ করেছেন ধর্মীয় নয় মানবিক অর্থে। তিনি আমাদের সচেতন করে তোলেন…কারণ তাঁর মতে এই গুনটি, যাকে তিনি চিহ্নিত করেছেন বীরোচিত হিসাবে, সেটি বহু মানুষেরই সভ্যতা সংক্রান্ত ধারণার অংশ নয়, কারণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানের প্রতি ঘৃণা এবং সেই সব স্বাচ্ছন্দ বিসর্জন, যে সব কিছুকে আমরা সাধারণত সভ্য জীবন বলে চিহ্নিত করি। এবং তারপরও আমরা শনাক্ত করতে পারি বস্তুবাদী প্রতিবন্ধকতাগুলোকে ঘৃণা এবং নিয়তির অন্ধ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারাই মানুষের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। আর এই পরিপ্রেক্ষিতটিকে আমার দৃশ্যমান হতে দেখি ডেভিডের মধ্যে। আমরা অনুভব করতে পারি সভ্যতা নির্ভর করে সেই মানুষের উপর যে তার মন আর আত্মার শক্তিকে এর চুড়ান্ত পর্যায় অবধি সম্প্রসারিত করতে পারে; আর সে কারণে মাইকেলেঞ্জেলোর ডেভিডের আবির্ভাব পশ্চিমা মানুষেদের ইতিহাসে অন্যতম একটি ঘটনা।

ষষ্ঠ অধ্যায় ‘প্রোটেস্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন’ এ তিনি আমাদের নিয়ে যান পশ্চিমা খ্রিস্টীয় ধর্মের রিফরমেশন বা সংশোধনের পর্বটি থেকে শেকসপিয়ার এর যুগে। তিনি উত্তর ইউরোপে অঙ্কুরিত হতে থাকা ধারণাগুলো আর দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর দিকে নজর দেন যা পরবর্তীতে রিফরমেশন আন্দোলনের সূচনা করেছিল, বিভাজিত করেছিল পশ্চিমা খ্রিস্টধর্মকে চিরকালের মত। শিল্পকলায় খুঁজে পাওয়া ব্যক্তিগত ধর্মভক্তির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন তিনি, যেমন আলব্রেখট ডুরার এর করা ওসওয়াল্ড ক্রেল এর প্রতিকৃতি। আমরা তাঁর মাধ্যমে ডুরারের সাথেও ভালোভাবে পরিচিত হই, তাঁর সেই সময়ের বিতর্কিত আত্ম-প্রতিকৃতির দিকেও আমরা দৃষ্টি দেই, যেখানে শিল্পী তাঁর সরাসরি মুখের সেই ভঙ্গিমায় প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, যা এতদিন শুধু সংরক্ষিত ছিল যীশু খ্রিস্টের জন্য। আমরা রটারডামের ইরাসমাসের সাথে পরিচিত হই, এবং তার সেই বিখ্যাত বই ‘দি প্রেইজ অব ফলি’র পান্ডুলিপির সাথে, ইউরোপের অন্যতম সেরা একটি প্রকাশনা ছিল যেটি, যা উত্তর রেনেসাঁ পর্বের ক্রমশ বাড়তে থাকা দাম্ভিকতাকে সরাসরি আঘাত করেছিল।

‘গ্র্যান্ডিউর এবং অবিডিয়েন্স’ এ আমরা মাইকেলেঞ্জেলো আর বার্নিনি’র রোমে আবার ফিরে আসি, ক্লার্ক আমাদের প্রটেস্টান্ট উত্তরের সাথে ক্যাথলিক চার্চের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা বলেন। প্রটেস্টান্ট আন্দোলনের প্রত্যুত্তরে আমরা দেখি ‘কাউন্টার রিফরমেশন’ , যখন ক্যাথলিক চার্চ তাদের আড়ম্বরময় সমৃদ্ধতাকে প্রতীকিরুপ দেয় সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার অসাধারণ সৌন্দর্যময়তায়।

অষ্টম অধ্যায়, ‘দ্য লাইট অব এক্সপেরিয়েন্স’, ক্লাক আমাদের মহাশুন্য এবং এক বিন্দু পানির মধ্যে আবিষ্কৃত নতুন জগতের কথা জানান – টেলিস্কোপ আর মাইক্রোস্কোপ যে জগতের দরজা খুলে দিয়েছিল – এবং রেমব্রান্ট এবং অন্যান্য ডাচদের চিত্রকর্মে এই নতুন বাস্তবতা মানব চরিত্র পর্যবেক্ষনের পর্যায়টি সপ্তদশ শতাব্দীতে একটি নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

নবম অধ্যায়ে তিনি বাখ, হ্যান্ডেল হাইডেন এবং মোৎসার্টের সঙ্গীতে ঐকতানের প্রবাহ এবং জটিল প্রতিসাম্যতার কথা বলেছেন, এবং কিভাবে তাদের সঙ্গীত প্রতিফলিত হয়েছিল বাভারিয়ার প্রাসাদ ও চার্চের রোকোকো স্থাপত্য শৈলীতে। ‘পারস্যুট অব হ্যাপিনেস’,দশম অধ্যায়ের শিরোনামটির এই অংশ এসেছে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের লেখা সংবিধানের পাতা থেকে, যারা বিশ্বাস করতেন সুখের অনুসন্ধান করার অধিকার মানবজাতির একটি সত্যিকারের জন্মগত অধিকার হতে পারে। ফরাসী সংস্কৃতিতে তিনি সমালোচনা করেন, যা পুরো ইউরোপ জুড়ে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। কর্তৃত্বপরায়ন একনায়কতন্ত্রবাদী কোন সমাজে অর্জিত এই আড়ম্বরময়কা ফরাসী ধ্রপদীবাদের মানবিকতাহীন রুপটির প্রতিনিধিত্ব করে বলে তিনি দাবী করেন। যা আসলে কোন সত্যিকার শিল্পীর সৃষ্টি নয় বরং দক্ষ সরকারী কর্মকর্তাদের সৃষ্টি। এর ব্যতিক্রম উত্তরের দেশগুলো স্থাপত্যের এই কঠোর সীমিত রুপের প্রতিক্রিয়ায় রোকোকো শৈলীর বিকাশ করে, উত্তরের সেই যুগের মুল্যবোধ প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ছিল সঙ্গীত, বিশেষ করে ইয়োহান সেবাস্টিয়ান বাখ, বাখের সঙ্গীতের অনুপ্রেরণা ধর্মবিশ্বাস হলেও এটি আসলে যুক্তিরই প্রতিফলন।
দশম অধ্যায়ে থেকে তিনি জ্ঞানাালোকপ্রাপ্তি বা এনলাইটেনমেন্ট যুগ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, অষ্টাদশ শতাব্দীর অভিজাত প্যারিসীয় সালন এর ভদ্র কথোপকথন থেকে অনুসরণ করে তিনি তাঁর আলোচনা বিস্তৃত করেন এর পরিণতিতে সূচিত বিল্পবী রাজনীতি, এছাড়াও এখানে আমরা দেখতে পাই ভার্সাই এবং ব্লেনহাইম ও অন্যান্য ইউরোপীয় প্রাসাদগুলো এবং টমাস জেফারসনের মন্টিচেলো। এই অধ্যায়টি তিনি মানব মনের ক্রম উত্থানের সেই বছরগুলো তিনি আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়টির শিরোনাম – ‘দি স্মাইল অব রিজন’ – এসেছে ফরাসী একাডেমীতে ভলতেয়ার এর ভাস্কর্যটি দেখে তাঁর পর্যবেক্ষণের প্রতিক্রিয়ায় -একটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে, তিনি এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহনকারী সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষদের একজন, এখানে মুখে তাঁর স্মিতহাসি, যুক্তির স্মিতহাসি। অষ্টাদশ শতাব্দীর ফ্রান্সের অন্যসব লেখক,নাট্যকার এবং দার্শনিকদের প্রতিকৃতিতে তিনি তাদের স্মিতহাসির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, কিন্তু তাদের এই স্মিতহাসির কারণটি কি? তিনি সতর্ক করে বলেন, আজ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তাদের এই স্মিতহাসি হালকা মনে হতে পারে, যখন আমাদের সময়ের আরো জটিল সমস্যার মুখোমুখি হই আমরা। আমরা অনুভব করি মানুষের আরো বেশী আবেগময় উৎসাহী হওয়া উচিৎ, আরো বেশী আত্মবিশ্বাসী অথবা, যেমনটি এর সাম্প্রতিকভাষায় আমরা ব্যবহার করি, আরো বেশী দায়বদ্ধ – কিন্তু এনলাইটেনমেন্ট এর কর্ম আর প্রাণশক্তিটি আদৌ হালকা কিছু ছিলনা।

ক্লার্ক আমাদের সতর্ক করে দেন যুক্তির স্মিতহাসি গভীর মানবিক আবেগ সম্বন্ধে একটি নির্দিষ্ট অনুপলদ্ধি হয়তো উন্মোচন করে, কিন্তু এটি অবশই দৃঢ়ভাবে ধারণ করা কিছু বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করেনা, প্রাকৃতিক আইনের প্রতি বিশ্বাস, ন্যায় বিচারের প্রতি বিশ্বাস, সহিষ্ণুতার উপর বিশ্বাস। এবং সভ্যতায় তার অবদান কোন অংশেই কম নয়, এনলাইটেনমেন্ট পর্বের দার্শনিকরা ইউরোপীয় সভ্যতাকে আরো কয়েকধাপ উপরে ঠেলে উঠিয়ে দিয়েছিল এবং আর যাই হোক না কেন তাত্ত্বিকভাবে এই অর্জনটি সংহত হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে। ১৯৩০ এর দশক অবধি, মানুষের কথা ছিল না কাউকে ডাইনী ডেকে আগুনে পোড়াতে এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন করার অথবা নির্যাতন করে স্বিকারোক্তি আদায় অথবা ন্যায় বিচারকে পথভ্রষ্ট করার কিংবা সত্যি কথা বলার জন্য কারাগারে যাওয়া। ক্লার্ক আমাদের জানান, ভলতেয়ার বহুভাবেই রেনেসাঁর মানবতাবাদের উত্তরসুরী ছিলেন, কিন্তু এখানে একটি মৌলিক ভিন্নতা আছে, রেনেসাঁর উত্থান হয়েছিল ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে। অল্প কিছু মানবতাবাদী তাদের সন্দেহবাদীতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কিন্তু কেউই পুরোপুরিভাবে খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে কোন সন্দেহ প্রকাশ করেননি। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, গভীরভাবে ভাবতে পারা মানুষগুলো অনুভব করতে পেরেছিল চার্চ আসলে রুপান্তরিত হয়েছে কায়েমী স্বার্থ রক্ষা করার প্রতিষ্ঠানে, এর উদ্দেশ্য সম্পদ ও তাদের সামাজিক মর্যাদার টিকিয়ে রাখা এবং নিপীড়ন এবং অবিচারের মাধ্যমে তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করার একটি প্রতিষ্ঠানে।

ভলতেয়ারের মত এত দৃঢ়ভাবে এটি এর আগে কেউই অনুধাবন করেনি, ‘ধ্বংস করো এই কুকীর্তি’, তাঁর পরবর্তী জীবনে এটাই তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল, যা তিনি তাঁর অনুসারীদের দান করে গেছেন। এভাবেই অষ্টাদশ শতাব্দী যে কঠিন কাজটির দ্বায়িত্ব নিয়েছিল তা হলো একটি নতুন নৈতিকতা নির্মাণ…‘কোন ধরনের ঐশী প্রত্যাদেশ বা খ্রিস্টীয় বিধিনিষেধ ছাড়া এই নৈতিকতার ভিত্তি ছিল দুটি, তাদের একটি প্রাকৃতিক আইনের মতবাদ। এবং অন্যটি প্রাচীন রোম প্রজাতন্ত্রের স্টয়িক বা সুখে দুঃখে নির্বিকার নৈতিকতা’ ক্লার্ক শুধুমাত্র ফরাসী এনলাটেনমেন্ট পর্বে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি কারণ ইংল্যান্ডও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, এবং ফরাসী কর্তৃপক্ষের নিগ্রহ এড়াতে ভলতেয়ার সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন, ফরাসী সরকার তখন ইংল্যান্ডের চেয়েও অনেক বেশী অসহিষ্ণু ছিল ভিন্নমতের প্রতি। ক্লার্ক আমাদের নিয়ে যান স্কটল্যান্ডে, সভ্যতার প্রতি স্কটদের অবদানকে চিহ্নিত করেন জেমস ওয়াট, এডাম স্মিথ, ডেভিড হিউম প্রমূখদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে। কিন্তু তিনি দাবী করেন ফরাসী এনলাইটেনমেন্ট এবং এনসাইক্লোপেডিয়ার উদ্দেশগুলো তার সত্যিকার রুপ পেয়েছিল আমেরিকায়। আর এনলাইটেনমেন্ট এর মূর্ত রুপ ছিলেন থমাস জেফারসন, ক্লার্কের মতে তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর সত্যিকারের বিশ্বজনীন মানব। ভাষাবিদ, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, শিক্ষাবিদ, নগর পরিকল্পক এবং স্থপতি জেফারসনের একটি ড্রইং এ তাকে ক্লার্ক তাকে বর্ণিত করেন স্বাধীনচেতা আর আত্মবিশ্বাসী হিসাবে, আমরা জেফারসনের সৃষ্টি মন্টিচেলো আর ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় দেখি।

ক্লার্ককে আবার আমরা শিল্পকলায় ফিরে আসতে দেখি, বিশেষ করে জাক-লুই ডাভিড এর চিত্রকর্মে যেখানে প্রাচীন রোমের বীর এবং ইতিহাসের মহান ঘটনাগুলো দেখি। আমরা দেখি কিভাবে ডাভিড তাঁর শৈলীর মাধ্যমে এনলাইটেনমেন্ট পর্বে সূচনায় পরিশীলিত, ন¤্র চিত্রশৈলীর প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। রোমের সেই প্রাণশক্তিকে আমেরিকার রুপ দেয়ার বিষয়টিকে ক্লার্ক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন হাডসনের জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটনের ভাস্কর্যটির সাথে, এখানে হাডসন তাঁর বিষয়বস্তুকে মনে করেছিলেন, তাঁর প্রিয় রোমান প্রজাতন্ত্রের কোন সাহসী বীর, একজন ভদ্র কোনো ব্যক্তি যাকে তাঁর খামার থেকে ডেকে আনা হয়েছে, তাঁর প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার সংগ্রামে। আমরা যেমন ক্লার্ক থেকে প্রত্যাশা করতে পারি, এনলাইটেনমেন্ট পর্ব নিয়ে তাঁর পর্যালোচনা পরেই তিনি অগ্রসর হন এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াটি বর্ণনা করার জন্য।

অধ্যায় এগারো, ‘দি ওয়ারশিপ অব নেচার’ এ, ক্লার্ক যুক্তি দেন প্রকৃতির স্বর্গীয় রুপটি পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান সৃজনশীল শক্তির প্রধান চালিকা শক্তি হিসাবে খ্রিস্টীয় ধর্মকে প্রতিস্থাপিত করে এবং সূচনা করে রোমান্টিক আন্দোলনের। আমরা ক্লার্ককে টিনটার্ন অ্যাবী এবং আল্পসে পটভূমিতে দেখি, টার্নার এবং কনস্টেবলের ভূ-দৃশ্যচিত্র বিস্তারিত আলোচনায় জীবন্ত হয়। ক্লার্ক আমাদের জানান, প্রায় হাজার বছর ধরে পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান সৃজনশীল চালিকা শক্তি ছিল খ্রিস্ট ধর্ম। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর সূচনায় এই প্রভাবটি হঠাৎ করেই শিথিল হয়ে যায়। বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে এই কার্যত পুরোপুরিভাবে হারিয়ে যায়। অবশ্যই এটি একটি শূন্যস্থান সৃষ্টি করেছিল। নিজেদের বাইরে আরো বড় কোনো কিছুকে বিশ্বাস না করলে মানুষ চলতে পারেনা এবং পরবর্তী একশ বছর, তারা একটি নতুন বিশ্বাসের সৃষ্টি করেছিল, সেটি যতই অযৌক্তিক হোক না কেন আমাদের কাছে, সভ্যতার প্রতি তার অবদান অস্বীকার করা যাবে না। সেটি হচ্ছে প্রকৃতির উপর স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য আরোপ। ক্লার্ক যুক্তি দেন যে, ‘এজ অব রিজনে’র প্রতিক্রিয়ায় জন্ম হয়েছিল প্রকৃতির প্রতি এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। প্রকৃতি প্রেমীদের অনুপ্রেরণার আগে, খুব অল্পমানুষই শুধু অভিজ্ঞতার আনন্দের জন্য পর্বতারোহন করেছে আর যুক্তি থেকে এই দিক পরিবর্তনের কারণ হিসাবে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন জাঁ জাক রুশোর সাথে। ক্লার্ক রুশোকে তাঁর সব ব্যক্তিগত ক্রটিসহ চিহ্নিত করেন প্রতিভাবান হিসাবে।

যুক্তি সমর্থনকারী ও প্রচারকরা প্রায়শই চিন্তাবিদ বা বিশ্লেষকদের বিচার করতে প্ররোচিত হন রুসোর প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করার মাধ্যমে; তারা যত বেশী রুসোর প্রতি ইতিবাচক ধারণা প্রকাশ করবেন তাদের ঠিক ততটা কমই মূল্যায়ন করা হবে। তিনি একটি দ্বীপে রুসোর জীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি পুরোপুরি একাত্ম বোধ করেছিলেন প্রকৃতির সাথে, নিজের স্বতন্ত্র সত্ত্বাকে পুরোপুরিভাবে হারিয়েছিলেন তিনি, রুসো বিশ্বাস করতেন আমাদের অস্তিত্ব আর কিছুনা বরং ধারাবাহিক কিছ মুহুর্তের সমষ্টি যা আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করি। অন্যভাবে যদি বলা হয়, ‘আমি অনুভব করি, সুতরাং আমার অস্তিত্ব আছে।’ প্রকৃতির প্রতি এই কেন্দ্রীভূত দৃষ্টি শিল্পকলা এবং সঙ্গীতে নতুন কিছু সৃষ্টি করার জন্য অনুপ্রানিত করেছিল। ক্লার্ক আমাদের উপসংহারের দিকে নিয়ে যান যেখানে আবেগকে প্রথমে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে চিহ্নিত করেছিলেন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক টাইম বোমার সাথে – যা কেবলই বিস্ফোরিত হয়েছে, কিন্তু সভ্যতার জন্য তাঁর অবদান কতটুকু ছিল সেটি তখনও সন্দেহের উর্ধে নয়। ক্লার্ক আমাদের সতর্ক করে দেন, ইন্দ্রিয়ানুভূতির প্রতি আমাদের এই আত্মসমর্পন ঠিক কতটুকু আমাদের অগ্রসর করেছে অথবা স্বর্গীয় এবং ঐশ্বরিক কোন সত্ত্বা হিসাবে প্রকৃতি কতটা প্রশ্নবিদ্ধ প্রমানিত হতে পারে। তাঁর মতে এই ব্যর্থতাকে যে মানুষটা চিহ্নিত করেছিল, তিনি মার্কি দো সাদে, যিনি বলেছিলেন, ‘প্রকৃতি সংঘাতের বিরুদ্ধে ? আমি আপনাদের বলছি, প্রকৃতি বেঁচে থাকে আর শ্বাস নেয় সংঘাতের মাধ্যমে, তার প্রতিটি ছিদ্রে রক্তপাতের ক্ষুধা, নিষ্ঠুরতাকে চলমান রাখাই তার একমাত্র কামনা।’

এখান থেকে আমরা দেখতে পাই রুসো ‘প্রাকৃতিক’ মানুষের ধারণাটি, যে কিনা যুক্তিকে প্রত্যাখান করে, মুহুর্তের তাড়না কাছে নতি স্বীকার করে, কিন্তু তারপরও সে গুনবান। তাঁর সমসাময়িক যে মানুষটি তাঁকে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি ভলতেয়ার। রুসোর প্রস্তাবিত সেই সদগুণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাদেরকে নির্বোধ হবার জন্য প্ররোচিত করতে এর আগে আর কেউ কখনো এত বেশী বুদ্ধিমত্ত্বা ব্যবহার করেনি।’ অষ্টাদশ শতাব্দী অনেক বেশী অনমনীয় আর আবদ্ধ রুপ নিয়েছিল এ বিষয়ে ক্লার্ক তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তিনি মন্তব্য করেন ‘একটি আবদ্ধ বিশ্ব প্রাণশক্তির বন্দীশালায় রুপান্তরিত হয়’, আর এই খাচায় আবদ্ধ প্রাণশক্তির বিদ্রোহ যা মুক্তি পেয়েছিল একজন বীটহোভেন এর সঙ্গীতে। কিন্তু রুসোর সেই অনুপ্রেরণা ফরাসী বিপ্লবের সূচনা করেছিল, সেই সাথে গণহত্যা আর সারা ইউরোপ জুড়ে বিপর্যয়।

দ্বাদশ অধ্যায়, ‘দ্য ফ্যালাসি অব হোপ’ এ ক্লার্ক যুক্তি দেন ফরাসী বিপ্লব প্রশস্ত করেছিলো নোপেলিয়নের একনায়কতান্ত্রিক শাসনামলের এবং উনবিংশ শতাব্দীর বিষন্ন ক্লান্তিকর আমলাতান্ত্রিকুার। তিনি রোমান্টিসিজম পর্বে শিল্পীদের মোহমুক্তির ইতিহাস অনুসরণ করেন, বীটহোভেন এর সঙ্গীত থেকে বায়রনের কবিতা, দেলাক্রোয়ার চিত্রকর্ম আর রদ্যাঁর ভাস্কর্য। শেষ অধ্যায় ‘হিরোয়িক ম্যাটেরিয়ালিজমে’ তিনি আলোচনা করেন উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বস্তুবাদীতা, মানবহিতৈষী পরিবর্তনগুলো নিয়ে। উনবিংশ শতাব্দী ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের এবং বিংশ শতাব্দীর নিউ ইয়র্কের আকাশচুম্বী ভবনের দৃশ্যপট নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি যুক্তি দেন, প্রকৌশলী আর বিজ্ঞানীদের অর্জন – যেমন ব্রুনেল এবং রাদারফোর্ড – মহান সমাজসংস্কারক উইলবারফোর্স আর শ্যাফটেসবুরী’র অর্জনের সমতুল্য হতে পেরেছে। যখন আলোচনা তিনি তাঁর নিজের ১৯৬০ এর দশকে পৌছান, উনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া শহর কেন্দ্রিক দারিদ্রতা সম্বন্ধে তিনি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কথাই বলেন, তিনি ম্যালথাসীয় ধারণাটিকে গ্রহন করে বলেন, এই ধরনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। একইসাথে তিনি বীরোচিত বস্তুবাদীতার প্রতি তাঁর উচ্ছাস ব্যক্ত করেন। আধুনিক বীরের উদহারণ হিসাবে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন বিখ্যাত পুরকৌশলী ও সেতু নির্মাতা ইসমবার্ড কিংডম ব্রুনেল এর সাথে। তিনি দাবী করেন সুবিশাল এই সব নির্মাণের কাঠামোগুলো, গার্ডার এবং খিলানগুলোর জ্যামিতিক আকৃতি আমাদের এই যুগকে প্রতিফলিত করঠে, ঠিক যেমন করে বারোক শৈলী সপ্তদশ শতাব্দীকে প্রতিফলিত করেছিল।

পশ্চিমা সভ্যতার উত্থানের দেড় হাজার বছরের ইতিহাস পরিভ্রমন শেষে ক্লার্ক আমাদের মনে করিয়ে দেন বিংশ শতাব্দীতেই এই সভ্যতা দুই বার প্রায় আত্মঘাতী হয়েছিল। কিন্তু তিনি আশাবাদী, তিনি দাবী করেন আমরা আর কোন অন্ধকার যুগের অভিমূখে অগ্রসর হচ্ছিনা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের লাইব্রেরীতে তরুণদের দেখে তিনি মন্তব্য করেন, তারা অবশ্যই রোমানদের শেষ পর্বের মানুষগুলো কিংবা দুর্দশাগ্রস্থ গলদের মত নয়, তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন, আজকের মত এত বেশী সংখ্যক মানুষ কি এর আগে কখনোই সুযোগ পেয়েছিল, প্রয়োজনী খাদ্য পাওয়ার, জ্ঞানার্জন করার কিংবা কোনদিনও কি তারা আজকের যুগের তরুণদের মত এত মেধাবী, এত বেশী কৌতুহলী ছিল? সিভিলাইজেশন বইটি এবং এর সঙ্গী প্রামাণ্য ধারাবাহিকটি শুধুমাত্র এর বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়বস্তুই নয় এটি সত্যিকার অর্থে ইতিহাসকে আমাদের সামনে দৃশ্যমান করে তোলে, এটি ধারাবাহিকভাবে দেয়া কোন বক্তৃতামালা না, আলোচনার বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে শিল্পকলা, স্থাপত্য প্রতিটি যুগের প্রধান ধারণা আর সংস্কৃতির অন্যান্য দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্বকারী উপাদানগুলো। আমরা ক্লার্কের সঙ্গী হই সেই সব জায়গাগুলোয়, যেখানে জীবনের চেয়ে বড় এই সব প্রতিভাবান চরিত্ররা বাস ও তাদের কাজ করতেন, এবং তাদের সম্বন্ধে যে তথ্যগুলো ক্লার্ক আমাদের জানাচ্ছেন, সেটি পাঠক বা দর্শক হিসাবে আমাদের পক্ষে তাদের সৃজনশীল শক্তিগুলোকে বুঝতে সুবিধা হয়।

খুব বেশী দিন আগেও কোন শিক্ষার্থী পশ্চিমে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা পার হতে পারতো না যদি না সে পশ্চিমা সভ্যতার উপর একটি কোর্স সম্পন্ন না করতো, সেই প্রথা এখন আর নেই; কিন্তু কেনেথ ক্লার্কের ‘সিভিলাইজেশন’ এই প্রয়োজনীয়তাটাকে স্মরণ করে এখনও টিকে আছে, তাঁর সবচেয়ে বড় যে অবদান সেটি সম্ভবত আমাদের সেই বিশ্বাসটিকে পুনরায় অনুধাবন করার সুযোগ করে দেয়া, অতীতের সৃজনশীল প্রতিভাদের এই মূল্যায়ন ভবিষ্যতের সৃজনশীল প্রতিভাদের অনুপ্রাণিত করবে। ক্লার্কের সভ্যতা কোন সন্দেহ নেই আমাদের সভ্যতাকেও আরো সম্প্রসারিত করে। ইউরোপীয় সভ্যতার ইতিহাসকে বুঝতে যা সাহায্য করে। হয়তো এটি সমসাময়িক সময়ে বিদ্যমান আত্মতুষ্টিকে কোন চ্যালেঞ্জ করেনা, কারণ ক্লার্কের সভ্যতা খুব বেশী বিন¤্র, সমালোচনার বদলে এটি মুগ্ধ প্রশংসার অনুভূতিকে বেশী প্ররোচিত করে, যা অবশ্যই জন বার্জারের বক্তৃতাগুলোর বীপরিত।

কিন্তু এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সভ্যতার এই দিকটি থেকে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন। দেয়ালে সাজানো ধ্রুপদী বই আর মিউজিয়ামে প্রাচীন মাস্টারদের শিল্পকর্ম নিয়ে আসলেই আমরা কতটা স্বাচ্ছন্দ বোধ করছি। আর এই বইটিতে ক্লার্ক তাঁর স্বভাবজাত আবেগময়তার সাথে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, সত্যিকার ভাবে এগুলো উত্তরসুরী হচ্ছি আমরা। আজ অবশেষে আমরাও অনুভব করতে পারছি ক্লার্ক নিজেই আমাদের জন্য তাঁর বিষয়বস্তু, সভ্যতার একটি মূর্ত প্রতীকে রুপান্তরিত হয়েছেন, যখন প্রযোজকের অনুরোধে তিনি তাঁর বিশ্বাসটিকে প্রকাশ করেন এভাবে: ‘আমি বেশ কিছু বিশ্বাস ধারণ করি, যা আমাদের সময়ের প্রানবন্ত বোদ্ধারা অস্বীকার করেছেন, আমি বিশ্বাস করি বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলা উত্তম, ধ্বংশ থেকে উত্তম সৃষ্টি।’

বইটি প্রকাশ এবং প্রামাণ্য চিত্রটির প্রথম প্রচারণার পরে সমালোচকরা ক্লার্কের এই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে দুটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, প্রথমত, সভ্যতা তাঁর অস্তিত্বের জন্য ঋণী সাধারণভাবে খ্রিস্টধর্ম এবং সুনির্দিষ্টভাবে ক্যাথলিক চার্চের প্রতি। যদিও তিনি ধর্মীয় সহিংসতা আর যুদ্ধ কিংবা রোমের পোপের আসন দখল করাকে কেন্দ্র করে বিদ্যমান জটিল বহুমুখী সংগ্রাম, যা সুযোগ করে দিয়েছিল ধর্মীয় সংশোধন বা রিফরমেশন পবের্র, সেই সবকিছু তিনি আলোচনার বাইরে রাখেননি- তবে তিনি এটি প্রশ্নেই ফিরে এসেছেন তাঁর মূল বিষয়বস্তুতে, সভ্যতার জন্য সেগুলো কি উপযোগি ছিল? তাঁর এই প্রশ্নের উত্তর সবসময়ই হ্যাঁ বোধক ছিল, যখন তিনি বর্ণনা করেছেন শিল্পকলায় চার্চের অবদান কিংবা সেই সব আইরিশ সাধুরা যারা সভ্যতাকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, কৌতুহলোদ্দীপকভাবে ক্লার্ক শেষ করেছিলেন দয়াশীলতা শব্দটি ব্যবহার করে, দানশীলতা না, কোন বীরোচিত আত্মত্যাগ নয়, শিষ্ঠাচার নয়, বরং দয়াশীলতা। যদি প্রথম বারোটি অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর সাথে তুলনা করা যায় আমরা দেখবো ত্রয়োদশ পর্বে শিল্পকলার অনুপস্থিতি, সমসাময়িক বিমূর্ত একপ্রেশনিজম নিয়ে তিনি কোন কথাই বলেননি, এখানে তিনি ইঙ্গিত করেন শিল্পকলার মতই কোন একটি জাতি কতটুকু সভ্য হলো তা পরিমাপ করা সম্ভব দয়াশীলতা দিয়ে। তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন, আমরা একে অপরের প্রতি দয়াশীল ( অথবা আমাদের দয়াশীল হওয়া উচিৎ)। এখানে কোন সন্দেহ নেই – আমাদের অবশ্যই পরস্পরের প্রতি দয়ালু হতে হবে – ক্লার্কের এই বক্তব্যটি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতসূচক।

যুক্তরাজ্যের শিল্পকলার জগতে তাঁর অবদান:

শিল্পকলা ও শিল্পীদের প্রতি সহজাত ভালোবাসা কেনেথ ক্লার্ককে তাঁর সময়ের যুক্তরাজ্যের শিল্পকলার জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল। প্রজ্ঞা এবং পান্ডিত্যে তো বটেই, তাকে মনে করা যেতে পারে কোন একটি লেন্সের মত, যার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই শিল্পকলায় ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতা ক্রমশই রুপান্তরিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ও জনগনের পৃষ্ঠপোষকতা আর গর্বের উপাদান হিসাবে। অনেকের মতেই তাঁর কারণে যুক্তরাজ্যে শিল্পী আর শিল্পকলার বহুমাত্রায় উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই, সেই সাথে শিল্পকলার মিউজিয়ামগুলো বহুল জনপ্রিয়তা। শিল্পকলার প্রতি শৈশব থেকেই গড়ে উঠেছিল তাঁর সংবেদনশীলতা, যা পরিশীলিত হয় রজার ফ্রাই, ক্রিস বেল, বার্নার্ড বেরেনসনের সাহচর্যে। বেরেনসনের সাথে ইতালী রেনেসাঁ পর্বে শিল্পীদের সৃষ্টিকর্মগুলো সংকলনের পর তিনি সুযোগ পান ইংল্যান্ডের রাজকীয় সংগ্রহশালা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির পান্ডুলিপি ও ড্রইং গুলো ক্যাটালগ করার জন্য। এরপর মাত্র ৩১ বছর বয়সে ন্যাশনাল গ্যালারীর দ্বায়িত্ব নেন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই ধারণা করা হয়েছিল জার্মানীর বিমানবাহিনী লন্ডনের উপর বোমা হামলা করবে, এই পরিস্থিতিতে শহরের অন্যান্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলেও কেনেথ ক্লার্ক ন্যাশনাল গ্যালারী খুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা রুপান্তরিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু বোমা হামলা বা জার্মানদের সম্ভাব্য লুটতরাজ থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি গ্যালারীর শিল্পকর্মগুলোকে ওয়েলস এর একটি অব্যবহৃত খনির মধ্যে সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেন। আর গ্যালারীর শূন্য কক্ষগুলো ব্যবহার করতে শুরু করেন নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জন্য। তাদের মধ্যে একটি ছিল মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় কনসার্টের আয়োজন। পিয়ানিস্ট মিরা হেস প্রতিদিন কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন সেখানে। এছাড়া নানা ধরনের সাময়িক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন, সেই সময়ের ‘ওয়ার আর্টিস্ট অ্যাডভাইসরি’ কমিটি, যার দ্বায়িত্বে তিনি নিজে ছিলেন। এবং ১৯৪৩ এ লন্ডনের বোমা হামলা বা ব্লিৎস কিছুটা কমে গেলে তিনি আয়োজন করেছিলেন ‘পিকচার অব দি মান্থ’ প্রোগ্রামটি। ওয়েলস থেকে আনা চিত্রকর্মগুলো থেকে একটি একটি করে তিনি প্রদর্শন করার ব্যবস্থা নেন সর্বসাধারণের জন্য।

শিল্পকলার ইতিহাসবিদ হিসাবে তিনি অত্যন্ত প্রতিভাবান ছিলেন, রাজকীয় সংগ্রহশালায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ড্রইং এর উপর তাঁর মনোগ্রাফটির শ্রেষ্ঠত্ব এখনও কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। তাঁর সবচেয়ে বহুল পঠিত দুটি বই ‘দি ন্যুড’ এবং ‘ল্যান্ডস্কেপ ইনটু আর্ট’ শিল্পকলার ইতিহাসে অসাধারণ মৌলিক সংশ্লেষণের উদহারণ। ন্যাশনাল গ্যালারীর পরিচালক হিসাবে তাঁকে মনে করা প্রায় ১৩০ বছর আগে স্যার চার্লস ইস্টলেক এর পরে সবচেয়ে যোগ্যতম পরিচালক। এখনও লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারীতে গেলে আমরা দেখতে পারবো তাঁর সংগৃহীত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম। ১৯৩৮ সালে তাঁর ‘ওয়ান হানড্রেড ডিটেইলস ইন দি ন্যাশনাল গ্যালারী’ জনপ্রিয়করণের প্রচেষ্টায় লেখা একটি অসাধারণ কাজ, যা ব্যপক সাড়া জাগিয়েছিল। শিল্পকলার উপর বক্তৃতা দেয়ায় দক্ষ অগ্রজ এবং রজার ফ্রাইয়ের বক্তৃতা সম্পাদন করেছিলেন তিনি। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ তিনি ছিলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ে, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শিল্পীর তালিকা করেছিলেন তিনি, মেধাবী, প্রতিভাবান শিল্পীদের প্রতি তাঁর এই পৃষ্ঠপোষকতা এখনও অতুলনীয়। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই হেনরী মুরের অসাধারণ ‘শেলটার’ এর রেখাচিত্র এবং জন পাইপার এর ব্লিৎস চিত্রকর্ম। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল গ্যালারীর জন্য তিনি যা করেছেন তা আসলে কোনো ভাবে অতিরঞ্জিত করা সম্ভব না।

তাঁর আগে এই সব বড় গ্যালারীগুলো মূলত প্রদর্শক কিউরেটরদের নিজস্ব ক্ষেত্র ছিল, তিনি প্রথম অনুভব করেছিলেন গ্যালারী শুধু গবেষণা কিংবা সংরক্ষনের জায়গা নয়, এটি সর্বসাধারণের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলার একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি এখানে ইলেকট্রিক লাইটের ব্যবস্থা করেছিলেন, যেন সন্ধ্যার পর এটি খুলে রাখা সম্ভব হয়, সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে তিনি খোলা রাখার প্রচলন করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটি, এটি অসাধারণ একটি রুপান্তর। ১৯৩৩ সালে সর্বকনিষ্ঠ পরিচালক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিতে যখন তিনি যোগ দিয়েছিলেন, বেশীরভাগ মানুষের কাছে এটি অচেনা একটি প্রতিষ্ঠান ছিল, কিন্তু দশ বছরের মধ্যে এটি রুপান্তরিত হয়েছিল জাতীয় সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে। সারা পৃথিবীতে আজ শিল্পকলার মিউজিয়াম বলতে আমরা যা বুঝি সেটির ভিত্তি রচণা করেছিলেন তিনি।

ক্লার্কের উদ্যোগ আমরা আরো দেখতে পাই যখন তিনি নভেম্বর ১৯৩৯ এ ‘ওয়ার আর্টিস্ট অ্যাডভাইসরি’ কমিটির প্রধান ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতই এই কমিটি শিল্পীদের কমিশন দিতো এই যুদ্ধ সংঘর্ষ নিয়ে চিত্রকর্ম সৃষ্টি করার জন্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমরা যেমন ‘পল ন্যাশ’ এবং ‘ওয়াইন্ডহাম লিউস’কে চিত্রকর্ম সৃষ্টি করতে দেখেছিলাম, ১৯৪০ ক্লার্ক সেই সময়ের শিল্পীদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ‘হেনরী মুর’। যদিও মুর প্রথমে রাজী হননি, কিন্তু লন্ডনের জার্মানদের ব্লিৎসক্রেইগ বা বোমা হামলা শুরু হবার দিকে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডে তাঁর একদিনের অভিজ্ঞতা তাঁর মন পরিবর্তন করতে সহায়তা করেছিল। ক্লার্কের কমিশনে তিনি অসাধারণ কিছু রেখাচিত্র অঙ্কন করেছিলেন, যা পরিচিত ‘শেলটার ড্রইং’ হিসাবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এক গ্রুপ শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, যখন কোন ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার অস্তিত্ব ছিলনা। বিংশ শতাব্দীতে বৃটিশ শিল্পকলায় কøার্কের অসাধারণ অবদানটি আমরা অনুভব করি, যখন আমরা হেনরী মুর, ব্লুমসবারী গ্রুপের শিল্পীরা, জন পাইপার, উইলিয়াম কোল্ডস্ট্রিম, সাদারল্যান্ডকে দেখি, বৃটিশ শিল্পকলার জগতে আজ তাঁরা সবাই স্মরণীয়। এই সব প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা ক্লার্কের কাছে ঋণী ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৃষ্টপোষকতা পাবার জন্য।

ন্যাশনাল গ্যালারী থাকাকালীন তিনি অনুভব করেছিলেন শিল্পকলার সাথে সাধারণ মানুষদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি শিল্পকলাকে শুধুমাত্র বোদ্ধা সমালোচকদের গবেষনার বিষয় না, বরং সাধারণ মানুষের কাছে গর্বের একটি বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছিলেন। আর তাঁর সেই আবেগময় উৎসাহ স্পর্শ করেছিল বহু মানুষকেই। তাঁর প্রকাশিত প্রতিটি বই শুধুমাত্র বিষয়ভিত্তিক পাঠক না সাধারণ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। তিনি বহু মানুষের কাছে শিল্পকলার প্রতি ভালোবাসাটিকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারের অংশগ্রহন নিশ্চিৎ করার সব প্রচেষ্টাই তিনি করেছিলেন, তিনি সে কারণেই আর্ট কাউন্সিলের সভাপতির দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টি করতেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল।

ইংল্যান্ডে বানিজ্যিক টেলিভিশনের সূচনা পর্বে তিনি দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন অথোরিটির, তিনি অনুভব করেছিলেন শিল্পকলার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টিতে এই মাধ্যমটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিল্পকলা ভিত্তিক বহু অনুষ্ঠান আর প্রামাণ্যচিত্রে আমরা তাঁকে আবির্ভূত হতে দেখি, তাঁর কালজয়ী প্রথম সম্পুর্ণ রঙ্গীন, টেলিভিশনের জন্য নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র সিভিলাইজেশন নির্মাণের আগে। যুগান্তকারী এই প্রামাণ্য চিত্রগুলোয় আমরা বিবর্তিত হতে দেখি ক্লার্ককে, সেটি চুড়ান্ত রুপ পায় সিভিলাইজেশন এ, যে প্রামাণ্যচিত্র রুপান্তরিত হয়েছে এ ধরণের কোন টিভি প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের চিরন্তন মানদন্ডে।

শিল্পকলার ইতিহাস, সভ্যতা সৃষ্টিতে এর ভূমিকা সেই সবকিছু সম্বন্ধে সাধারণ দর্শককে জানানো উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল তাঁর এই প্রামাণ্যচিত্রটি। শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে তিনি বহু দেশে বক্তৃতা দিয়েছেন, যা রুপ পেয়েছে অসাধারণ কিছু গবেষণা গ্রন্থে। তার জীবনী লেখক জেমস স্টোউরটন বলেছিলেন, ক্লার্ক যুদ্ধের সময় শিল্পকলাকে ব্যবহার করেছিলেন ঠিক চার্চিল যেভাবে তাঁর ভাষণের ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটেনের মানুষকে সেই প্রশ্নটি করার সুযোগ দিতে হবে, কিসের জন্য আমরা যুদ্ধ করছি? আমাদের মূল্যবোধগুলো আসলে কি? শিল্পকলাকে ব্যবহার করা যেতে পারে জাতির দেশাত্মবোধ আর আত্মবিশ্বাসকে অনুপ্রাণিত করার জন্য, যে ব্রিটেনের জন্য যুদ্ধ করছি সেই ব্রিটেনের কাহিনী সবাইকে বলার জন্য। তিনি ন্যাশনাল গ্যালারীকে হিটলারের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের জাতীয় প্রতিরোধের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। ইতিহাসে প্রথম বারের মত এই প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, সেই জনপ্রিয়তা আজও সেখানে কেউ পা রাখলে অনুভব করতে পারবেন।

ন্যাশনাল গ্যালারীকে সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি অসাধারণ কিছু কাজ সংগ্রহ করেছিলেন, কনস্টেবল, রেমব্রান্ট, আঙগ্র, প্যুসাঁ। এখানে দ্বায়িত্ব পালন করার সময়ই তিনি প্রথমবারের অনুভব করেছিলেন শিল্পকলার প্রতি তাঁর ভালোবাসাটিকে তিনি বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবেন। যুদ্ধের সময় তিনি ‘ক্রাউন ফিল্ম ইউনিটে’রও দ্বায়িত্বে ছিলেন, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা চল্লিশের দশকে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্য চিত্র নির্মিত হয়েছিল, সত্যিকার অর্থেই ‘লিসেন টু ব্রিটেইন’ এবং ‘আউট অব কেওস’ ছিল যুগান্তকারী তাদের নির্মাণে। ‘আউট অব কেওস’ যুদ্ধকালীন কয়েকজন শিল্পী ও তাদের শিল্পকর্ম নিয়ে নির্মিত হয়েছিল, সত্যিকার অর্থেই শিল্পকলা নিয়ে প্রথম বারের নির্মিত হয়েছিল কোনো প্রামাণ্য চিত্র। ন্যাশনাল গ্যালারীর দ্বায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি কিছুদিন শিক্ষাকতা করেন অক্সফোর্ডে, ‘স্লেড প্রফেসর অব ফাইন আর্টস’ হিসাবে, তাঁর সেই আটটি লেকচার জন্ম দিয়েছিল তাঁর অন্যতম সেরা বই ‘ল্যান্ডস্কেপ টু আর্ট’ । যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্থাপিত শিল্পকলার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আর্ট কাউন্সিল’ এর সভাপতির দ্বায়িত্ব নেন, ১৯৫১ সালে সারা দেশব্যাপী ফেস্টিভাল অব ব্রিটেনের আয়োজক হিসাবে, আর্ট কাউন্সিলের উপস্থিতি এই প্রতিষ্ঠানটির গ্রহনযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিল।

টেলিভিশনের সূচনাপর্বেই তিনি অনুভব করেছিলেন প্রযুক্তি উন্নত হলে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হতে পারে, ১৯৫৪ সালে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভশন অথরিটির একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি, ১৯৫৭ সাল অবধি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন। লন্ডনের অ্যাসোসিয়েটে টেলিভিশনের লিউ গ্রেড কেনেথ ক্লার্কের মধ্যে টেলিভিশনের উপস্থাপক হিসাবে সম্ভাবনাটিকে অনুভব করেছিলেন, এই কোম্পানির জন্য আমরা তাকে প্রায় ৫০ টির বেশী অনুষ্ঠান করতে দেখি যেমন, ‘ইস আর্ট নেসেসারী’? কিংবা ‘শুড এভরি পিকচার টেল এ স্টোরী?’, পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে নির্মিত এই অনুষ্ঠানগুলো শিল্পকলার ইতিহাস আর সমালোচনা নিয়ে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের অগ্রদূত ছিল। পরিচালক মাইকেল রেডিংটনের সাথে তিনি নির্মাণ করেন বেশ কিছু প্রামাণ্য চিত্র, যেখানে আমাদের পরিচিত কেনেথ ক্লার্কের বিবর্তন আমরা লক্ষ্য করি, আড়ষ্ট স্টুডিও ভিত্তিক অনুষ্ঠানের বাইরে আমরা ক্লার্ককে দেখি দর্শকের সাথে সরাসরি কথোপকথনের স্বাচ্ছন্দময় প্রজ্ঞাবান একজন শিক্ষককে, যিনি শিল্পকলার প্রতি তাঁর ভালোবাসার পরিশীলিত সংবেদনশীলতার মাধ্যমে দর্শকদের আন্দোলিত করতে পারদর্শী।

আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো তাঁর অদ্ভুত পোষাক, আর কন্ঠস্বর অদ্ভুত মনে পারে, কিন্তু মনোযোগী হয়ে যখনই কেউ তাঁর বাক্যগুলো শোনেন, তিনি অনুভব করতে পারবেন সভ্যতা নিয়ে তাঁর আশাবাদ আর উচ্ছাসকে। মানবিক শক্তির উপর তাঁর একনিষ্ঠ বিশ্বাসের। ক্লার্ক জনপ্রিয় হবার জন্য কোন শব্দ উচ্চারণ করেননি, তাঁর মত করে নিজের মতামতকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করার সাহস অভুতপূর্ব। সন্দেহ নেই তাঁর সমসাময়িক শিল্পকলার সমালোচক এবং সময়ের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত শিল্পকলার জগতে তাঁর বিশ্বাসে সমব্যাথীদের সংখ্যা ক্রমশ কমেছে। আধুনিক বিমূর্ত শিল্পকলার প্রতি তাঁর কোন আগ্রহ ছিলনা, তিনি দৃঢ়ভাবে মার্কসবাদ বিরোধী ছিলেন। ব্যাক্তি স্বাতন্ত্রবাদের প্রতি ছিল তাঁর একনিষ্ঠ সমর্থন। তিনি একক প্রতিভায় বিশ্বাসী ছিলেন। ক্লার্কের এই অনুষ্ঠানের পর জন বার্জার নির্মাণ করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ওয়েজ অব সিইং ( প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা প্রয়োজন এই বইটিও আমরা ইতিমধ্যে অনুবাদ করেছি ) সেখানেই তিনি শিল্পকলার ইতিহাসে মার্কসবাদী-নারীবাদী প্রাসঙ্গিকতার প্রথম আঘাত এনেছিলেন ক্লার্কের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে।

তিনি যে কর্তৃত্বের সাথে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন, তা আজও অতুলনীয়। ক্লার্ক চিরদিনই তাঁর হাটুর উপর নোটবুক রেখে লিখতেন, যেন কোনো ছোট শিশু তাঁর গোপন ডায়রী লিখছে। তাঁর স্মৃতিচারণে তিনি সরল স্বিকারোক্তি করেছেন, আত্মবিশ্লেষণ তাঁর পছন্দের কাজ নয়, যখনই আমি আমার চরিত্র বোঝার চেষ্টা করি, সহজেই হতাশ হয়ে আমি বোঝার আশা পরিত্যাগ করি, কোন সন্দেহ নেই রহস্যময় একজন মানুষ ছিলেন, কেন তিনি সারা বিশ্বকে শিল্পকলার কথা জানানোর জন্য এত আগ্রহী ছিলেন ? রহস্যময় এই মানুষটি কাজের সময় সামান্যতম বিরক্তি সহ্য করতে পারতেন না, সেই মানুষটি টেলিভিশনের সেই আদি যুগে নানা সমস্যা আর যন্ত্রণা সহ্য করে একের পর এক অনুষ্ঠান করে গিয়েছিলেন – শুধুমাত্র শিল্পকলার প্রতি ভালোবাসাই হতে পারে এর একমাত্র প্রণোদনা।

কেউ কেউ মনে করেন শিল্পকলার ইতিহাসবিদ হিসাবে ক্লার্কের সুনামে খানিকটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল ন্যাশনাল গ্যালারী মত কোন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হবার কারণে। কিন্তু তিনি সব সমালোচনাকে তাঁর কাজ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন। হেনরী মুর এবং গ্রাহাম সাদারল্যান্ডের মত কালজয়ী শিল্পীদের তিনি তাঁদের সংগ্রামী শিল্পী জীবনের শুরু থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, যা স্বষ্টভাবেই ইঙ্গিত করে শিল্পকলা বোঝার তাঁর ক্ষমতাটি। প্রায় সব আধুনিক চিত্রকলার তিনি সমালোচক ছিলেন, তাঁর তেরোতম অধ্যায়কে আমরা থেমে যেতে দেখেছি বিমূর্ত শিল্পকলা শুরু হবার আগেই। তাঁর প্রামাণ্যচিত্র এবং সিভিলাইজেশন বইটির বিপুল জনপ্রিয়তাই নতুন শিল্পকলার ইতিহাসবিদদের সমালোচনার নিশানায় পরিণত করেছিলো, যারা তাঁর কাজকে ‘প্রথাগত’ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে তিনি শিল্প সৃষ্টির পেছনের সামাজিক নিয়ামকগুলো উপেক্ষা করেছেন।

জন বার্জার তাঁর ওয়েজ অব সিইং এ গেইনসবরো’র মিঃ অ্যান্ড মিসেস অ্যান্ড্রুস অন কান্ট্রি এস্টেট নিয়ে ক্লার্কের বিবরণ – যেমন ‘মুগ্ধ করার মত’, ‘রুসো’র মতবাদের মত’ – কে বিরোধীতা করে বলেন, রুসো যেভাবে প্রকৃতি কল্পনা করেছে, এই দম্পতি ছবি আসলেই তাঁর প্রতিনিধিত্ব করছে না। তারা ভূ-স্বামী এবং তাদের চারপাশে যা কিছু আঁকা হয়েছে ক্যানভাসে তার উপর তাদের মালিকানার দাবী খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাদের ভঙ্গিমায়। বার্জার ক্লার্কের নগ্নতার সংজ্ঞাকে ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে তথ্যপুষ্ট হয়ে। কিন্তু একই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ক্লার্ক এর ‘দি ন্যুড’ ও ‘ল্যান্ডস্কেপ টু আর্ট’ এর মত বই, যা অনেক শিল্পকলার ইতিহাসবিদ অনায়াসে সমালোচনা করছেন তারা ভুলে যান, তাঁর সময়ে এই বই দুটি যুগান্তকারী একটি পর্যালোচনা ছিল, প্রথমবারের মত শিল্পকলার দুটি সুবিশাল বিষয়বস্তুকে সংশ্লেষন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাঁর ‘দি ন্যুড’ বইটি একক ভাবে দায়ী ছিল অ্যান্টিক ভাস্কর্য ও পশ্চিমা শিল্পকলা ও সংস্কৃতির উপর তাদের প্রভাবের পর রাস্কিনের আরোপিত শত বর্ষের অবহেলার পর নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হওয়ার জন্য। ১৯৮১ সালে আমরা প্রকাশ হতে দেখি ফ্রান্সিস হাসকেল ও নিকোলাস পেনী’র ‘টেস্ট অ্যান্ড দি অ্যান্টিক’, যে বইটির কথা ভাবা সম্ভব ছিল না যদি না ‘দি ন্যুড’ প্রকাশ হতে। ই এইচ গমব্রিখ বইটির পর্যালোচনা করার সময় ক্লার্কের ‘দি ন্যুড’ বইটির অবদানের কথা উল্লেখ না করার জন্য লেখকদের সমালোচনা করেছিলেন। এখন শিল্পকলায় নগ্নতা নিয়ে কোন বইয়ের অভাব নেই, তারা সবাই ন্যুড বইটি ব্যবহার করেছে স্প্রিঙবোর্ড হিসাবে, সাম্প্রতিক শিল্পকলায় নগ্নতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

‘সিভিলাইজেশন’ তাঁর জীবনের সপ্তম দশকের সৃষ্টি, তিনি স্পষ্টতই অনুভব করেছিলেন সভ্যতা আর সংস্কৃতির ভঙ্গুরতাকে – ফ্রাঙ্ক, ভাইকিং অথবা নাৎসীরা কি সন্মান পাবার যোগ্য? তিনি লিখেছিলেন, ‘নবম শতাব্দীর কোন এক সময়ে সেইন এর দিকে তাকালে হয়তো দেখা যেতো নদী দিয়ে ভেসে আসছে ভাইকিং জাহাজের সূচালো অগ্রভাগ বা প্রাও। বৃটিশ মিউজিয়ামে এরকমই একটি প্রাউ এর দিকে তাকালে দেখা যাবে, এটি আসলেই শক্তিশালী একটি শিল্পকর্ম। কিন্তু কোন একটি মা, যে তাঁর ছোট কুটিরে থিতু হয়ে বসবাস করার চেষ্টা করছে, তাঁর কাছে এটি অনেক কম সুখকর কিছু মনে হবে – তাঁর সভ্যতার জন্য এটি ঠিক ততটাই ভয়ঙ্কর যেমন কোন পারমানবিক শক্তিচালিক ডুবোজাহাজের পেরিস্কোপ।’ তিনি হয়তো এখন যেভাবে ভাইকিংদের উপস্থাপন করা হয় সেটি পছন্দ করতেন না, গণহত্যাকারী দাস-বানিজ্যকারী এই ভাইকিংরা এখন উদ্যোগী মুক্ত বানিজ্যকারী হিসাবে পুনআবিষ্কৃত হয়েছে। তিনি অবলীলায় বলেছেন ‘আমাকে যদি গৃহায়ন মন্ত্রীর ভাষণ এবং তার সময়ের নির্মিত ভবনের মধ্যে কোনটি সত্য হিসাবে বেছে নিতে বলা হয়, আমি ভবনকেই বিশ্বাস করবো।’ মার্কসবাদের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা সত্ত্বেও – বিশেষ করে যখন সেটি প্রয়োগ করা হয়েছে শিল্পকলায় – দাস বাণিজ্য, শিল্প বিপ্লব এবং দরিদ্রতা সম্বন্ধে তাঁর অনুচ্ছেদগুলো এখন শক্তিশালী আর আন্দোলিত করার মত অভিযোগ আরোপ করেছে সামাজিক অবিচারের প্রতি।

ক্লার্কের সমালোচকরা তাঁর ইউরোপকেন্দ্রিক চিন্তা নিয়ে বিলাপ করেছেন – নব্য রোমান্টিক ন্যাশ,পাইপার, সাদারল্যান্ড এবং মুর ( কিন্তু বেকন নন) এর মত শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা, বিশুদ্ধ বিমূর্ততার প্রতি তাঁর অপছন্দ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর উত্তরসুরীদের অপছন্দ অপরিমিত, এর কারণ এই না যে, যেমন অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, ‘শুধুমাত্র একজন নিলামকারীর পক্ষে সম্ভব শিল্পকলার প্রতিটি শৈলীর সমান ও পক্ষপাতহীনভাবে প্রশংসা করা’। যদি পেছন দিকে তাকানো যায়, তাহলে দেখবো ক্লার্ক সঠিক ছিলেন পিউরিজম বা বিশুদ্ধবাদিতা নিয়ে – এটি আসলে একটি জায়গায় আবদ্ধ, যতই অসাধারণ মনে হোক না কেন। মনড্রিয়ান এর বিমূর্তবাদের প্রতি যাত্রা অবশ্যই উত্তেজনাময়, কিন্তু যখনই তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন, তাঁর শিল্পকলাও রুপান্তরিত হয়েছিল শুষ্ক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং পুণরাবৃত্তিপূর্ণ বিষয়ে। ১৯৩৫ সালে ক্লার্ক একটি নৈরাশ্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘দি লিসেনার’ পত্রিকায়, যেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন কোন একটি টিকে থাকার মত শৈলীর ‘জন্ম হতে পারে এর বিষয়বস্তুর উপর একটি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করার মধ্যে… আমাদের একটি নতুন পুরাণ বা কিংবদন্তীর প্রয়োজন, যেখানে প্রতীক সহজাতভাবে ছবি মাধ্যমে প্রকাশিত হয়’ – জ্যাকসন পোলোক এর একটি উদহারণ হতে পারে, তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তাঁর বিমূর্ততার মধ্যে গভীর কিছু বিষয়বস্তুর জায়গা করে দিতে, তাঁর অকাল মৃত্যুর সময়কালে তিনি আংশিক প্রতীকি রুপ সৃষ্টিতে মনোযোগী হয়েছিলেন।

শিল্পকলার ইতিহাস কিংবা সমালোচনার ক্ষেত্রে ক্লার্ক এর সবচেয়ে বৈপ্লবিক, অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত নতুনত্ব উদ্ভাবন হচ্ছে ‘ডিটেইল’ এর প্রতি তাঁর অতিমাত্রায় বেশী নজর। ন্যাশনাল গ্যালারীর পরিচালক থাকাকালীল, তিনি সর্বপ্রথম ‘ডিটেইল’ বই প্রকাশ করেছিলেন, যা এখনও মূদ্রণে আছে : ‘ওয়ান হানড্রেড ডিটেইলস ফ্রম দি পিকচারস ইন দি ন্যাশনাল গ্যালারী’ (১৯৩৮); সম্ভবত এটি তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী বই। ক্লার্ক দর্শকদের উৎসাহ দিতে চেয়েছিলেন শিল্পকলার প্রতি আরো বেশী মনোযোগী দৃষ্টি দেবার জন্য এবং এভাবে একই ছবিকে নতুন একটি রুপে দেখার জন্য। তিনি বিভিন্ন শিল্পীর চিত্রকর্মের ছবি পাশাপাশি রেখে, কখনো ভিন্ন ভিন্ন পর্ব থেকে, তিনি তাঁর পাঠকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তুলনা কিংবা পার্থক্য খুঁজে দেখবার জন্য। আর ডিটেইল এর প্রতি তাঁর এই আগ্রহটির মূলত লালিত হয়েছিল মনোবিশ্লেষণের অনুসন্ধানী কৌশলের দ্বারা। ক্লার্কের এই বইটির প্রভাব প্রায় তাৎক্ষনিক, ‘ডাবলিউ এইচ অডেন’ তাঁর একটি কবিতায় ক্লার্কের সেই থিসিসটিকে সম্প্রসারিত করেছিলেন – ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিল্পকর্মের প্রেক্ষাপটে এবং মার্জিনে লুকিয়ে থাকে এবং বড় ঘটনাগুলো যেমন মানুষের বিস্মৃতিপরায়নতার মাঝেই লুকোনো থাকে।

ক্লার্ক তাঁর ‘ওয়ান হানড্রেড ডিটেইলস ফ্রম দি পিকচারস ইন দি ন্যাশনাল গ্যালারী’ বইটি শেষ করেছিলেন একটি ছোট ক্রুশ এর ডিটেইল দিয়ে, যা লুকিয়ে ছিল পিসানেলো’র ‘ভিশন অব সেইন্ট ইউস্টাসে’র ভূদৃশ্যচিত্রে। কোন বিশেষ বিবরণ নেই, তিনি এই ট্র্যাজিক, সহজে চোখে না পড়ার মত ছবিকে তার নিজের কথা বলার সুযোগ করে দেন। অবাক ব্যপার হচ্ছে জন বার্জারও ক্লার্কের দেখানো এই ডিটেইলকে তাঁর নিজের কাজেই ব্যবহার করেছিলেন এবং নুতন প্রজন্মের শিল্পকলার ইতিহাসবিদদের যা আজো মুগ্ধ করে রেখেছে, বিশেষ করে সামাজিক শিল্পকলার ইতিহাসবিদ টি জে ক্লার্ক, যা সংক্ষিপ্ত বই ‘দি সাইট অব ডেথ’ (২০০৬) এ আমরা পুস্যাঁর দুটি চিত্রকর্মের ৭০ টি ডিটেইল লক্ষ্য করি। এমনকি ন্যাশনাল গ্যালারীর একটি সাম্প্রতিক একটি বিশেষ প্রদর্শনী, ‘বিল্ডিং দি পিকচার’, বলা যেতে এর প্রাক্তন পরিচালক ক্লার্কের প্রতি নিবেদিত, কারণ এর মূল বিষয়টি হচ্ছে রেনেসাঁ শিল্পকর্মের প্রেক্ষাপটে স্থাপত্য। কোন চিত্রকর্মে ভবনের ব্যবহার সাধারণত দেখা হয় প্রেক্ষাপট, কিংবা শূন্যস্থান পুরণকারী উপাদান যা নিষ্ক্রিয় কিংবা বড়জোর সহায়ক কোন ভূমিকা পালন করতো, যা চিত্রকর্মের মূল বিষয়গুলোকে ভিত্তি দিতো, তাদের বার্তা উপস্থাপন করার জন্য। কিন্তু যদি চিত্রকর্মের মধ্যে ভবনগুলো আমরা ভালো করে লক্ষ্য করি, এবং তাদের একটি সক্রিয় প্রোটাগনিষ্ট হিসাবে বিবেচনা করি, স্পষ্টতই আমরা অনুধাবন করতে পারবো তারাও গুরুত্বপুর্ণ দ্বায়িত্ব পালন করে শিল্পকর্মটিকে আরো অর্থবহ করে তুলতে। সিভিলাইজেশনে আমরা ঠিক এভাবে ডোমেনচিও বেকাফুমি’র চিত্রকর্মে ক্যামেরা জুম হতে দেখি, এর দুরের প্রেক্ষাপটের চমৎকার ভাস্কর্যের জন্য।

হয়তো সর্বোপরি যে জিনিসটা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটি হচ্ছে কেনেথ ক্লার্ক ছিলেন অসাধারণ একজন শব্দনির্মাতা। রাস্কিন এবং প্যাটার এর পরে শিল্পকলা নিয়ে এত চিত্তাকর্ষক ভাষার লেখক আর আসেনি। আজকের বেশীর ভাগ শিল্পকলার ইতিহাসবিদরা লেখেন আনন্দহীনভাবে যেমন আইনজীবি কিংবা হিসাবরক্ষকদের মত। অনেকের মতেই তাঁর লেখনীর সেরা রুপটি দেখি আমরা ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত লিওনার্দোকে নিয়ে তাঁর ধ্রুপদী বইটাতে। লিওনার্দো কাজ সম্বন্ধে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য আজো এটি সেরা একটি বই। ক্লার্ক নিজেকে লিওনার্দো বিশেষজ্ঞ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ১৯৩৫ সালেই যখন তিনি তিন খ-ের রাজকীয় সংগ্রহশালায় থাকা লিওনার্দোর কাজের একটি তালিকা তিনি প্রকাশ করে ছিলেন। এখনও বক্তৃতার মাধ্যমে শিল্পকলার ইতিহাস উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে ক্লার্কের সূচনা করা প্রক্রিয়াটি অব্যাহত আছে প্রামাণ্যচিত্রে।

কøার্কের ব্যক্তিত্বে ছিল প্রজ্ঞার ছাপ, মানুষকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বোঝানোর অসাধারণ একটি ক্ষমতা, তাঁর লেখনী ছিল প্রাঞ্জল আর সহজবোধ্য। ক্লার্ক শিল্পকলার প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে যেভাবে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিলেন, এমন করে আর কেউই তা করতে সফল হননি। সভ্যতার প্রতি তাঁর আশাবাদে তিনি সবসময়ই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন এর ভঙ্গুরতাটিকে।

পরিশেষে:

বইটির শেষ পরিচ্ছেদে তিনি মন্তব্য করেন, আমরা আমাদের নৈরাশ্যবাদীতা ও হতাশা দিয়ে আমাদের ধ্বংস করতে পারি, ঠিক যেভাবে বোমা ব্যবহার করে কার্যকরীভাবে ধ্বংস করে দিতে পারি, অন্য যে কোন কিছুর চেয়েই আমাদের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিই যথেষ্ট সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্য। মন্তব্যটি এখনও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। মানব সভ্যতার ক্রমশ সামনে এগিয়ে যাবার পথে হোচট খাবার নজির এখনও দুর্লভ হয়ে যায়নি। এখনও চিন্তা চেতনার বিভেদ, মানবিক নৈতিকতা আর মূল্যবোধের প্রশ্নগুলোতে আমাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে পারেনি। সময়ের পালাক্রমে বদলাতে থাকা আমাদের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রথাগত জীবনের পটভূমি পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট হয় সভ্যতার সম্ভবনাকে আমরা এখনও ধ্বংস করে চলেছি। সভ্যতা সৃষ্টিতে নানা উপাদানের মিথস্ত্রিয়তা আছে ঠিকই কিন্তু এর একেকটি পর্বের উত্তরণে যুগান্তকারী কিছু পরিবর্তন এনেছে কিছু প্রতিভাধর সতন্ত্র মানুষ, যারা তাদের সময়ের মূল ভাবনাগুলোকে রুপ দিয়েছিল নানা ক্ষেত্রে। কেনেথ ক্লার্ক শিল্পকলার ইতিহাসকে তাঁর বইয়ের জন্য চিহ্নিত করেছিলেন কোনো জাতির সভ্যতা পরিমাপ করার সত্যিকারের মানদন্ড হিসাবে, সামাজিক মানুষ যে দৃশ্যমান অভিব্যক্তির মাধ্যমে তাদের অস্তিত্বের চিহ্ন রেখে যায়।

আমরা যদিও বইটি লেখার জন্য পরিকল্পনা করেছিলাম বছর খানেক আগে এবং কাজ শুরু, তথ্য সংগ্রহ, লেখকের অনুমতি গ্রহন করেছি ঠিক তখনই। অনুবাদের জন্য আমরা বইটির দুটি সংস্করণ (বিবিসি/জন মারে প্রকাশনী, ১৯৬৯ এবং জন মারে প্রকাশনী ,২০০৫) এবং প্রামাণ্য চিত্রের পান্ডুলিপি ব্যবহার করেছি। কাকতলীয়ভাবে যখন আমরা অনুবাদের কাজটি শুরু করেছিলাম, বইটির প্রথম প্রকাশকাল ও প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হবার ৪৫ বছর পরে, যখন সবাই কেনেথ ক্লার্কের নাম ভুলে যেতে বসেছিলেন তখন, লন্ডনের টেট মর্ডান গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘কেনেথ ক্লার্ক -লুকিং ফর সিভিলাইজেশন’ শীর্ষক কেনেথ ক্লার্কের জীবন, কর্ম ও তাঁর সংগ্রহের শিল্পকর্মগুলো নিয়ে এক প্রদর্শনী। আমরা আনন্দিত যে কেনেথ ক্লার্কের এর এস্টেট এবং লন্ডনের জন মারে প্রকাশনীর অনুমতি সাপেক্ষে অনুবাদ এবং প্রকাশনার কাজটা আমরা অবশেষে সমাপ্ত করতে পেরেছি। আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি নোকতা প্রকাশনীর কাছে এই গুরুত্বপূর্ণটি বইটির অনুবাদ প্রকাশ করার উদ্যোগ নেবার জন্য।
আমাদের এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য শিল্পকলার অনুরাগীদের জন্য তথ্য ও উপাত্তের দরজা উমুক্ত করে দেয়া। ইউরোপ -আধুনিক শিল্পকলার জন্মভূমি ও লালন ক্ষেত্র হিসেবে আমাদের সবার জানা উচিৎ এর শিল্পকলার ইতিহাসকে। আমরা মনে করি শিল্পকলার যে কোন শিক্ষার্থীদের জন্য এটা একটা অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিৎ; যেন আমরাও আত্মবিশ্বাসের সাথে কেনেথ ক্লার্কের মতো বলতে পারি : ‘সভ্যতা কি? আমি জানি না। যদিও কোন বিমূর্ত শব্দ ব্যবহার করে আমি এটিকে সংজ্ঞায়িত করতে পারবোনা, কিন্তু আমি মনে করি যখন আমি সেটি দেখবো, আমি তা শনাক্ত করতে পারবো।

আসমা সুলতানা | কাজী মাহবুব হাসান

Advertisements
কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s