দর্শনের সহজ পাঠ, পর্ব ৩৬: কার্ল পপার ও থমাস কুন

popperকার্ল পপার (Sir Karl Raimund Popper(28 July 1902 – 17 September 1994)

ভুল থেকে শেখা

১৬৬৬ সালে এক তরুণ বিজ্ঞানী বাগানে বসেছিলেন যখন একটি আপেল মাটিতে ঝরে পড়েছিল। বিষয়টি তাকে ভাবায়, কেন আপেল সরাসরি নীচের দিকে পড়ে, কেন উপরে না, বাকা হয়েই বা অন্য দিকে কেন নয়। বিজ্ঞানীটির নাম আইজাক নিউটন এবং এই ঘটনা তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল তার মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বটি ভাবার জন্য। যে তত্ত্বটি যেমন গ্রহদের গতিপথ ব্যাখ্যা করে তেমনি ব্যাখ্যা করে কেন আপেল সরাসরি নীচে পড়বে।কিন্তু এরপরে কি ঘটেছিল? আপনি করে মনে করেন এরপর নিউটন সব স্বাক্ষ্যপ্রমাণ জড়ো করেছিলেন যা কিনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছিল তার তত্ত্বটি সত্য ? দার্শনিক কার্ল পপার (১৯০২-১৯৯৪) অবশ্যই তা মনে করতেন না।

বিজ্ঞানীরা, আমাদের সবার মতই, তাদের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেন। বিজ্ঞান অগ্রসর হয় যখন আমরা অনুধাবন করি, বাস্তবতা সম্বন্ধে কোনো একটি বিশেষ উপায়ে করা চিন্তাটি হচ্ছে ভুল বা মিথ্যা। দুটি বাক্যে, এটাই ছিল কার্ল পপারের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিভাবে পৃথিবী সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করার মানবতার শ্রেষ্ঠতম প্রত্যাশাটি কাজ করে। তার ধারণাগুলো প্রস্তাব করার আগে বেশীর ভাগ মানুষই বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কোনো কিছু সম্বন্ধে একটি ধারণা নিয়ে শুরু করেন তারপর তারা প্রমাণ যোগাড় করার চেষ্টা করেন, যা প্রমাণ করে তাদের মনে করা ধারণাটি সঠিক।

কিন্তু বিজ্ঞানী যা করেন, পপারের মতে, সেটি হচ্ছে তারা তাদের তত্ত্বগুলোকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কোনো একটি তত্ত্বকে পরীক্ষা করে দেখার প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে দেখা এটিকে অপ্রমাণিত বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ( বা দেখানো যে তত্ত্বটি আসলে ভুল)। কোনো একজন বিজ্ঞানী শুরু করেন একটি সাহসী অনুমান দিয়ে, তারপর সেটাকেই তিনি ধারাবাহিক পরীক্ষা কিংবা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অপ্রমাণিত বা ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। বিজ্ঞান সৃজনশীল আর রোমাঞ্চকর একটি উদ্যোগ, কিন্তু এটি কোনো কিছুকে সত্য প্রমাণিত করে না – এটি যা করে তাহলো ভ্রান্ত আর মিথ্যা দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে বাতিল করে – আর এভাবে – আশাবাদী হওয়া যেতে পারে – এ প্রক্রিয়ায় এটি ক্রমশ সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।

কার্ল পপার ১৯০২ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে জন্মগ্রহন করেছিলেন। যদিও তার পরিবার খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল, তবে তিনি ইহুদী পূর্বসুরিদের উত্তরসূরি ছিলেন, এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে আগেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অস্ট্রিয়া ত্যাগ করার, যখন ত্রিশের দশকে হিটলার জার্মানীর ক্ষমতায় এসেছিল। প্রথমে তিনি যান নিউ জিল্যাণ্ডে এরপর ইংল্যাণ্ডে, যেখানে তিনি স্থায়ী হয়েছিলেন, লণ্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স এর অধ্যাপনার পদ নিয়ে। তারুণ্যে তার আগ্রহের ক্ষেত্র ছিল বিশাল, বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাজনীতি, ও সঙ্গীত, কিন্তু দর্শন ছিল তার সত্যিকার ভালোবাসা। বিজ্ঞানের দর্শন আর রাজনৈতিক দর্শনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে পপার লেখার শুরু করা আগ অবধি, বহু বিজ্ঞানী আর দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান চর্চ্চা করার উপায় হচ্ছে সেই সব প্রমাণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা যা আপনার হাইপোথিসিসটিকে সমর্থন করে। যদি আপনি প্রমাণ করতে চান যে, সব সোয়ান বা রাজহাঁস হচ্ছে সাদা, তাহলে আপনাকে বহু রাজহাঁস পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে, যদি আপনি দেখেন সব রাজহাঁসগুলো যা আপনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেগুলো সাদা, তাহলে যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে যে আপনার হাইপোথিসিস, ‘সব রাসহাঁস সাদা’ সত্য। এই যুক্তি পক্রিয়া এভাবে অগ্রসর হয়, আমার দেখা সব রাজহাঁস সাদা উপসংহারের দিকে যে সব রাজহাঁসই সাদা। কিন্তু স্পষ্টতই আপনি এখনও কোনো রাজহাঁস দেখেননি যার রঙ কালো। অস্ট্রেলিয়াতে কালো রাজহাঁস আছে যেমন, এছাড়া সারা পৃথিবী জুড়ে বহু চিড়িয়াখানাতেও আছে। সুতরাং প্রস্তাবনা যে ‘সব রাজহাঁস সাদা’ এই সব প্রমাণের সামনে যুক্তিসঙ্গত কোনো প্রস্তাবনা হতে পারেনা। এমনকি আপনি যখন হাজার হাজার রাজহাঁস দেখেছেন যেগুলো সবই সাদা, এটি তারপরও মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে। সব রাজহাঁস সাদা এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার একটি মাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিটি রাজহাসকে দেখা। যদি একটি কালো রাজহাঁসের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে আপনার উপসংহার ‘সব রাজহাঁস সাদা’ ভুল প্রমাণিত হবে।

এটি আরোহ বা ইনডাকশন প্রক্রিয়ার একটি সংস্করণের ভুল যা ডেভিড হিউম লিখেছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ইনডাকশন ( আরোহ) খুবই ভিন্ন ডিডাকশন (অবরোহ) থেকে। আর সমস্যার উৎস সেখানে। ডিডাকশন হচ্ছে একধরনের যুক্তি প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবনা, যেখানে যদি কোনো প্রেমিস ( বা শুরুতে ধরে নেয়া কোনো প্রস্তাবনা) সত্যি হয়, তাহলে উপসংহার অবশ্যই সত্য হতে হবে। সুতরাং যদি আমরা সেই বিখ্যাত উদহারণটি নেই, ‘সব মানুষ মরণশীল’ আর ‘সক্রেটিস একজন মানুষ’, হচ্ছে দুটি প্রেমিস, যেখান থেকে যৌক্তিক উপসংহার ‘সক্রেটিস মরণশীল’ প্রস্তাবনাটিতে পৌছানো যায়। কিন্তু যদি সক্রেটিস মরণশীল এই প্রস্তাবনাটির সত্যকে যদি অস্বীকার করা হয়, সেটা অনেকটা এমন হবে কিছু বলার মত যে, সক্রেটিস মরণশীল আর মরণশীল নয়, একই সাথে। এই বিষয়টি নিয়ে একটি উপায়ে যেভাবে ভাবা যায় সেটি হচ্ছে অবরোহ প্রক্রিয়ায় উপসংহারের সত্যতা কোনো না কোনো ভাবে প্রাথমিক প্রস্তাবনা বা প্রেমিসের মধ্যে থাকে, এবং যুক্তি শুধুমাত্র সেটিকে বের করে আনে বাইরে। ডিডাকশন প্রক্রিয়ার আরো একটি উদহারণ যেমন:

প্রেমিস এক: সব মাছের ফুলকা আছে।
প্রেমিস দুই: জন হচ্ছে একটা মাছ।
উপসংহার: সে কারণে জনেরও ফুলকা আছে।

খুবই অস্বাভাবিক হবে যদি বলা হয় যে প্রেমিস এক ও প্রেমিস দুই দুটোই সত্য, কিন্তু উপসংহারটি হচ্ছে মিথ্যা। সেটি পুরোপুরিভাবে অযৌক্তিক হবে।

ইনডাকশন প্রক্রিয়াটি খুবই ভিন্ন এর থেকে। ইনডাকশন বা আরোহ পক্রিয়া মূলত পর্যবেক্ষণের একটি নির্বাচন থেকে সাধারণ উপসংহারে পৌছানোর প্রক্রিয়া। আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে গত চার সপ্তাহ ধরে প্রতি মঙ্গলবার সবসময় বৃষ্টি হচ্ছে, আপনি হয়তো সেখান থেকে একটি সাধারণীকরণ করতে পারেন যে, ‘প্রতি মঙ্গলবারেই বৃষ্টি হয়’। সেটাই আরোহ বা ইনডাকশনের একটি উদহারণ হবে। শুধুমাত্র একটি বৃষ্টিহীন মঙ্গলবারই যথেষ্ট এমন দাবী যে ‘প্রতি মঙ্গলবার বৃষ্টি হয়’ তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারে। চারটি পর পর মঙ্গলবার সম্ভাব্য সব মঙ্গলবারের তুলনা অল্প একটি স্যাম্পল বা নমুনা। কিন্তু এমনকি যদি আপনি আরো অসংখ্য মঙ্গলবার পর্যবেক্ষণ করেন, যেমন সাদা রাজহাসের ক্ষেত্রে হয়েছিল, আপনি তারপরও ভুল প্রমাণিত হতে পারেন একটি কেস দ্বারা, যারা এই সাধারণীকরণের সূত্র মানছে না: একটি শুষ্ক মঙ্গলবার বা সাদা নয় এমন রাজহাঁস, যেমন। আর আরোহ প্রক্রিয়ার এটাই সমস্যা ( ইনডাকশন), যুক্তিযুক্ত করার সমস্যা ইনডাকশন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে, যখন এটি স্পষ্টতই নির্ভরযোগ্য নয়। কিভাবে আপনি জানবেন পরের যে একগ্লাস পানি আপনি পান করবেন সেটি আপনার শরীরে বিষক্রিয়া করবেনা? উত্তর: অতীতে আপনি যত গ্লাস পানি খেয়েছেন সেগুলো সব ভালো ছিল। সুতরাং আপনিও ধরে নিচ্ছেন এটাও ভালো হবে। আমরা সব সময় এই ধরনের যুক্তিপ্রক্রিয়া ব্যবহার করি। কিন্তু স্পষ্টতই আমরা পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত নই যখন আমরা এর উপর ভিত্তি স্থাপন করি। আমরা প্যাটার্ন ধারণা করে নেই, যখন আসলেই সেটি থাকতে পারে আবার নাও পারে।

আপনি যদি মনে করেন বিজ্ঞান অগ্রসর হয় ইনডাকশন প্রক্রিয়ায়, যেমন বহু দার্শনিক ভেবেছিলেন, তাহলে আপনাকে ইনডাকশন প্রক্রিয়ার সমস্যার মুখে পড়েতে হবে। এই অনির্ভরযোগ্য উপায়ের যুক্তি প্রক্রিয়া কিভাবে বিজ্ঞানের ভিত্তি হতে পারে? পপারের দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে বিজ্ঞানের বিকাশ হয় সেটি পরিষ্কারভাবে এই সমস্যাটিকে এড়িয়ে যেতে পারে। এর কারণ তার মতে, বিজ্ঞান ইনডাকশনের উপর নির্ভর করেনা। বিজ্ঞানীরা একটি হাইপোথিসিস নিয়ে শুরু করেন, বাস্তবতার কোনো প্রকৃতি নিয়ে তথ্যপুষ্ট একটি ধারণা দিয়ে। একটি উদহারণ হতে পারে, যেমন, সব গ্যাসই সম্প্রসারিত হয় যখন উত্তপ্ত করা হয়। এটি খুব সাধারণ একটি হাইপোথিসিস, কিন্তু বাস্তব জীবনে বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট অনেক পরিমান সৃজনশীলতা আর কল্পনার সাথে এই পর্বে। বিজ্ঞানীরা তাদের ধারণা খুঁজে পান নানা জায়গায়: রসায়নবিদ অগুস্ত কেকুলে, যেমন স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি সাপ তার নিজের লেজে কামড় দিচ্ছে, যা তাকে ধারণা দিয়েছিল সেই হাইপোথিসিসটির যে বেনজিনের অনু হচ্ছে হেক্সাগোনাল ( ষড়ভূজ) রিং এর মত – যে হাইপোথিসিসটি এখনও তার সত্যতা বজায় রেখেছে বিজ্ঞানীদের এটিকে ভূল প্রমাণ করার প্রচেষ্টার মূখে।

এরপর বিজ্ঞানীরা একটি উপায় বের করেন সেই হাইপোথিসিসটি পরীক্ষা করে দেখার জন্য – এই ক্ষেত্রে, বিভিন্ন ধরনের গ্যাস সংগ্রহ করে তাদের উত্তপ্ত করে দেখা যেমন। কিন্তু টেস্টিং বা পরীক্ষা করে দেখা মানে কিন্তু এই হাইপোথিসিসের সমর্থনে প্রমাণ খোঁজা নয়, এর মানে হচ্ছে প্রমাণ করা যে এটি ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টায় এই হাইপোথিসিস টিকে থাকতে পারে। আদর্শ পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা সেই গ্যাস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন যা এই হাইপোথিসিসের সাথে খাপ খায় না। মনে করে দেখুন রাজহাসের ক্ষেত্রে একটি মাত্র কালো রাজহাঁসই যথেষ্ট সেই সাধারণীকরণকে মিথ্যা প্রমাণ করা যে, সব রাজহাসই সাদা।একইভাবে এখানে একটি মাত্র গ্যাস লাগবে যা তাপ দিলে প্রসারিত হবে না, যা এই হাইপোথিসিসকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করবে, যে সব গ্যাসই সম্প্রসারিত হয় যখন তাপ দেয়া হয়।

যদি কোনো বিজ্ঞানী একটি হাইপোথিসিসকে ভ্রান্ত প্রমাণ করেন – মানে তিনি যদি দেখান যে এটি মিথ্যা, তাহলে সেই ফলাফলটি হচ্ছে নতুন এক টুকরো জ্ঞান, সেই জ্ঞান যে হাইপোথিসিসটি ভুল। মানবতা অগ্রসর হয় কারণ আমরা এখানে কিছু শিখি। বহু গ্যাস লক্ষ্য করে, যাদের তাপ দিলে সম্প্রসারিত হয়, আমাদের কোনো জ্ঞান দেয়না, শুধুমাত্র হয়তো বা আমাদের হাইপোথিসিসের প্রতি খানিকটা আত্মবিশ্বাস দেয়। কিন্তু একটি বীপরিত উদহারণ আসলেই আমাদের কিছু না কিছু শেখায়। পপারের মত কোনো একটি হাইপোথিসিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এটি অবশ্যই falsifiable, বা যাকে মিথ্যা বা ভুল প্রতিপন্ন করা যাবে। তিনি এই ধারণাটি ব্যবহার করেন বিজ্ঞান ও যাকে তিনি বলতেন ছদ্মবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করতে। একটি বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস হচ্ছে এমন কিছু যা ভুল প্রমাণ করতে পারে: এটি এমন ভবিষ্যদ্বাণী করে যা দেখানো যেতে পারে ভুল। যদি আমি বলি, ‘অদৃশ্য, অশনাক্তযোগ্য কোনো পরীরা আমাকে দিয়ে এই বাক্যটি টাইপ করাচ্ছে, তাহলে এমন কোনো পর্যবেক্ষণ নেই যা আপনি করতে পারেন, যা আমার এই প্রস্তাবটিকে ভুল প্রমাণ করতে পারে। যদি পরীরা অদৃশ্য হয়, কোনো চিহ্ন না রাখে, তাহলে কোনো উপায় নেই দেখানো যে তাদের অস্তিত্বের দাবীটি মিথ্যা। এটি মিথ্যা প্রমাণযোগ্য নয় , আর সে কারণে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব নয়।

karl-popper_mini-1024x844

পপার ভেবেছিলেন যে বহু প্রস্তাবনা প্রস্তাব করা হয়েছে সাইকোঅ্যানালাইসিস ( মনোবিশ্লেষণ) সম্বন্ধে, যা অপ্রমাণযোগ্য এই প্রক্রিয়ায়। তিনি ভাবতেন এগুলো অপরীক্ষাযোগ্য। যেমন, কেউ যদি বলে যে সবাই প্ররোচিত হয় তাদের অবচেতন ইচ্ছাগুলো দ্বারা। তাহলে কোনো পরীক্ষা নেই সেটি যাচাই করে দেখার জন্য। প্রতিটি টুকরো প্রমাণ, সেই মানুষগুলোসহ যারা অস্বীকার করছে যে তারা কোনো অবচেতন ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত নয়, সেটিও, পপারের মতে, ধরে নেয়া হয়েছে সাইকোঅ্যানালাইসিসের সত্যতার বাড়তি প্রমাণ হিসাবে। মনোবিশ্লেষকরা বলবেন, সেই বাস্তব তথ্যটাই, যে আপনি অবচেতনকে অস্বীকার করছেন সেটাই প্রমাণ করে যে আপনার একটি শক্তিশালী অবচেতন ইচ্ছা আছে আপনার বাবাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। কিন্তু এই প্রস্তাবনাটি পরীক্ষা করা যাবে না কারণ কোনো কল্পনাযোগ্য প্রমাণ নেই, যা দেখাতে পারে এটি মিথ্যা। পরিণতিতে, পপার দাবী করেন, সাইকোঅ্যানালাইসিস বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান আমাদের যেভাবে জ্ঞান দেয় এটি সেভাবে কোনো জ্ঞান আমাদের দিতে পারেনা। পপার এভাবে মার্কসবাদী ইতিহাসকে আক্রমন করেছিলেন, যুক্তি দিয়ে যে প্রতিটি সম্ভাব্য পরিণতিকে বিবেচনা করা হবে সেই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে, যে মানবতার ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। সুতরাং আবারো এটির ভিত্তি ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয় এমন একটি হাইপোথিসিস।

এর ব্যতিক্রম, আলবার্ট আইনস্টাইনের তত্ত্ব যে আলোকে আকর্ষণ করবে সূর্য ভুল প্রমাণযোগ্য বা এটি ভুল প্রমাণ করার সম্ভব। ১৯১৯ সালে সুর্যগ্রহনের সময় তাদের আপাত অবস্থান লক্ষ্য করার প্রক্রিয়া এটি ভুল প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু সেটি তারা করতে পারতো। তারা থেকে আসা আলো সাধারণভাবে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু কিছু দূর্লভ পরিস্থিতিতে যেমন সূর্যগ্রহন হলে বিজ্ঞানীরা তাদের অবস্থানগুলো দেখতে পান যেখানে আইনস্টাইনের তত্ত্ব পূর্বধারণা করেছিল সেখানে থাকবে। যদি তাদের মত হতো অন্য কোনো অবস্থানে আছে তাহলে সেটি আইনস্টাইনের তত্ত্ব কিভাবে আলো খুব বেশী ভারী বস্তু দ্বারা আকৃষ্ট হয় সেটিকে ভুল প্রমাণ করতো। পপার কিন্তু মনে করেননি যে তার এই পর্যবেক্ষণগুলো প্রমাণ করেছে আইনস্টাইনের তত্ত্বটি সত্য। কিন্তু তত্ত্বটির প্রমাণযোগ্যতা, এবং বাস্তব তথ্য যে, বিজ্ঞানীরা এটি যে ভুল সেটি প্রমাণ করতে পারেননি, যা এর পক্ষেই প্রমাণ যোগায়। আইনস্টাইন এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যা ভুল হতে পারতো, কিন্তু সেগুলো ভুল প্রমাণ হয়নি।

বহু বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে প্রভাবিত করেছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির স্বরুপ সম্বন্ধে পপারের বিবরণটি। পিটার মেদাওয়ার, যিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন, বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি কার্ল পপার অতুলনীয়ভাবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক’। বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে তার সেই বিবরণটি পছন্দ করেছিলেন, যে তাদের কর্মকাণ্ড সৃজনশীল ও কল্পনাপ্রসূত। তারা এছাড়াও অনুভব করেন যে পপার বুঝতে পেরেছিলেন যে কিভাবে তারা তাদের কাজ করেন। দার্শনিকরা খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন যে যেভাবে আরোহ বা ইনডাকশনের কঠিন সমস্যাটিকে তিনি পাশ কাটাতে পেরেছিলেন।

১৯৬২ সালে, যদিও, আমেরিকার বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ও পদার্থবিদ থমাস কুন একটি বই প্রকাশ করেন The Structure of Scientific Revolutions, সেটি বিজ্ঞান কিভাবে অগ্রসর হয় সেই বিষয়ে অন্য একটি ধারণা প্রস্তাব করেন, আর যেটি প্রস্তাব করেছিল যে পপার বিষয়টি ভুল বুঝেছেন। কুন বিশ্বাস করতেন যে পপার যথেষ্ঠ পরিমান নিবিড়ভাবে বিজ্ঞানের ইতিহাসকে লক্ষ্য করেননি। যদি তিনি সেটি দেখতে তাহলে একটি বিশেষ প্যাটার্ণ তিনি অবশ্যই লক্ষ্য করতেন।

বেশীর ভাগ সময় যাকে আমরা বলি normal science বা সাধারণ বিজ্ঞান সেটি চলমান। বিজ্ঞানীরা একটি প্যারাডাইম বা স্বীকৃত কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন, যা সেই সময়ের বিজ্ঞানীরা সবাই অনুসরণ করতেন। সুতরাং, যেমন, সুর্যের চারপাশে পৃথিবী আবর্তিত হচ্ছে সেটি মানুষ অনুধাবন করার আগেই, সেই সময়ে প্যারাডাইম ছিল, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে আবর্তিত হচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা করেছেন এই কাঠামোর মধ্যে এবং তাদের কাছে ব্যাখ্যা থাকতো, যদি কোনো প্রমাণ সেই কাঠামোতে ঠিক মত খাপ না খেতো। এই প্যারাডাইমের মধ্যে কাজ করেই, কোপার্নিকাসের মত বিজ্ঞানী সেই ধারণায় উপনীত হয়েছিলেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, তার এমন ধারণাকে ভাবা হবে তিনি তার গণনায় কোথাও না কোথাও ভুল করেছেন। কুনের মতে, এমন কোনো ফ্যাক্ট বা বাস্তব তথ্য নেই যা অপেক্ষা করছে আবিষ্কৃত হবার জন্য, বরং, ফ্রেমওয়ার্ক বা প্যারাডাইম অনেকাংশেই ঠিক করে যে আপনি কি নিয়ে ভাবতে পারেন।

tomas-kunথমাস কুন (Thomas Samuel Kuhn ( July 18, 1922 – June 17, 1996)

পরিস্থিতি অন্যরকম হতে শুরু করে যখন, কুনের ভাষায় একটি paradigm shift এর মত পরিস্থিতি ঘটে। কোনো প্যারাডাইম শিফট হচ্ছে বোঝার একটি সম্পূর্ণ উপায় পুরোপুরিভাবে উল্টে যায়। এটি হতে পারে যখন বিজ্ঞানীরা এমন কিছু পান যা বিদ্যমান প্যারাডাইমের সাথে খাপ খায় না। যেমন, পর্যবেক্ষণগুলো সেই প্যারাডাইমের মধ্যে, যেমন পৃথিবীর চারপাশে সূর্য আবর্তিত হচ্ছে এমন ধারণার সাথ সামঞ্জষ্যপূর্ণ হয়না। কিন্তু এমনকি তারপরও বহু সময় লাগে পুরোপুরিভাবে সেই চিন্তা করার পদ্ধতিটি পরিত্যাগ করার জন্য। বিজ্ঞানীরা, যারা তাদের সারাজীবন কাজ করেছেন কোনো একটি প্যারাডাইমের মধ্যে, কাজ করার জন্য তারা সাধারণত ভিন্ন কোনো দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাগত জানায় না। যখন তারা একসময় নতুন প্যারাডাইমে তাদের ভাবনা পরিবর্তন করেন, আবারো একটি সাধারণ বিজ্ঞানের একটি পর্ব শুরু হতে পারে, এবার সেটি কাজ করে নতুন কাঠামোয়। আর এভাবে এটি চলতে থাকে। আর এটাই ঘটেছিল যখন মহাবিশ্বের কেন্দ্রে পৃথিবী উপস্থিত সেই ধারণাটি উল্টে গিয়েছিল। একবার যখন মানুষ সৌরজগতকে সেভাবে ভাবতে শুরু করেছে, সাধারণ বিজ্ঞান অনেক কিছু করার পেয়েছে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রদক্ষিণরত গ্রহগুলোর গতিপথ বোঝার জন্য।

পপার, বিস্ময়কর নয়, বিজ্ঞানের ইতিহাসের এই বিবরণের সাথে একমত হননি, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন সাধারণ বিজ্ঞানের ধারণাটি বেশ উপযোগি। তিনি কি সেই বিজ্ঞানীর মত যার কাছে পুরোনো হয়ে যাওয়া একটি প্যারাডাইম ছিল অথবা তিনি বাস্তবতা সংক্রান্ত কোনো সত্যের আরো কাছাকাছি পৌছাতে পেরেছিলেন, এটি বেশী কৌতুহলী প্রশ্ন।

Advertisements
দর্শনের সহজ পাঠ, পর্ব ৩৬: কার্ল পপার ও থমাস কুন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s