যা উপরে ওঠে …

996740_967433789997421_7033962057826405341_nছবি: আইজাক নিউটন – Sir Isaac Newton, by G. Kneller, 1689.

বিজ্ঞান ইতিহাসের সহজ পাঠ : পর্ব ১৬ – আইজাক নিউটন

(জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী  ১৬৪২ এর ২৫ ডিসেম্বর, আইজাক নিউটন জন্মগ্রহন করেছিলেন (যদিও নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সেটি জানুয়ারী ৪, ১৬৪৩)। উইলিয়াম বাইনামের একটি লেখা অবলম্বনে – কাজী মাহবুব হাসান)

সঙ্গতকারণেই সন্দেহ করা যেতে পারে আপনি যদি বলেন আইজাক নিউটনের মত কোনো প্রতিভাবানকে আপনি চেনেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা অনেকেই মনে করেন সেটি সম্ভব না। তবে অবশ্যই তার মতই অপ্রীতিকর, অবন্ধুসুলভ বহু মানুষের সাথে আপনার দেখা হবার সম্ভাবনা আছে। বেশীর ভাগ মানুষকেই তিনি অপছন্দ করতেন, প্রায়শই মেজাজ খারাপ করতেন আর ভাবতেন মোটামুটি সবার উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো না কোনো ভাবে তার ক্ষতি করা। খুব গোপনীয় স্বভাবের ছিলেন, দাম্ভিক, প্রায়শই তিনি খেতে ভুলে যেতেন, এছাড়াও অপ্রিয় হবার মত বহু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তার ছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন দুর্দান্ত মেধাবী আর আমরা আজ তার সেই মেধাটিকে স্মরণ করি, এমনকি যদিও বোঝা খুব কঠিন তিনি কি ভেবেছিলেন এবং কি লিখেছিলেন।

তার সাথে যা কিছু ঘটুক না কেন, আইজাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) হয়তো অপ্রীতিকর মানুষ হতেন, তবে তার শৈশব ছিল বেশ ভয়ঙ্কর। তার জন্মের আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন, এবং তার মা, যিনি আশা করেননি যে নিউটন বাঁচবেন, তার বাবা মার কাছে রেখে আবার বিয়ে করেন ও নতুন একটি পরিবার গঠন করেছিলেন। সৎ বাবাকে নিউটন ঘৃণা করতেন তো বটেই, তারা নানাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন। তার মা কিংবা তার নানী, কাউকে তিনি খুব একটা পছন্দ করতেন না। বাস্তবিকভাবেই খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষ অপছন্দ করা শুরু করেছিলেন। একা থাকতেই পছন্দ করতেন তিনি, শৈশবে যেমন, তার বার্ধক্যেও তেমন।

তবে, তার শৈশব থেকে কারো মনে সন্দেহ ছিল না যে তিনি খুবই বুদ্ধিমান, গ্রান্টহামের গ্রামার স্কুলে তাকে পড়তে পাঠানো হয়, স্কুলটি ইংল্যান্ডের লিঙ্কনশায়ারে, তিনি যেখানে থাকতেন তার বেশ কাছে। চমৎকার ল্যাটিন শিখেছিলেন তিনি, ল্যাটিন আর ইংলিশ দুই ভাষায় সমান দক্ষতায় লিখতে পারতেন। কিন্তু স্কুলে থাকাকালীন বেশীর ভাগ সময় কাটাতেন নানা ধরণের ঘড়ি, সানডায়াল আর যান্ত্রিক নানা কলকব্জা বানিয়ে।

12391933_967999926607474_7465479373021607769_n
আইজাক নিউটন: Sculptured by Roublliac in 1755  at Trinity College, Cambridge University

১৬৬১ সালে যখন তিনি কেমব্রিজে ট্রিনিটি কলেজে পড়তে আসেন, তখনও তিনি যা ভালোবাসতেন করতে সেটাই করতেন। যদিও কলেজে তার প্রাচীন দার্শনিক, যেমন অ্যারিস্টোটল আর প্লেটো পড়া বাধ্যতামূলক ছিল, খুব সামান্যই তিনি তাদের পড়েছিলেন ( বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা সেটা জানেন কারণ তিনি খুব যত্ন করে সব কিছু নোট হিসাবে লিখে রাখতেন), তবে তিনি তার সময়ের আধুনিক লেখকদের পছন্দ করতেন – দেকার্ত, বয়েল এবং অন্যান্য নতুন বিজ্ঞানের প্রস্তাবকরা। পড়তে তার মোটামুটি লাগতো কিন্তু তিনি নিজে সব কিছুর সমস্যা সমাধান করতে চাইতেন। আর সেটা করতে তিনি বহু নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু তার সেরা প্রতিভার ঝলক আমরা দেখতে পাই গণিতে, কিভাবে এটি মহাবিশ্বকে বুঝতে ও আরো জানতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

নিউটন তার বহু ধারণা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন অবিশ্বাস্যকরম উৎপাদনশীল কয়েকটি বছরে। কোন বিজ্ঞানী, শুধু আইনস্টাইন ছাড়া, এত অল্প সময়ে এত বেশী কিছু করতে কেউ সফল হননি। নিউটনের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর বছর ছিল ১৬৬৫ এবং ১৬৬৬; এই সময়ের কিছুটা তিনি কাটিয়েছিলেন তার মায়ের বাসা লিঙ্কনশায়ারের উলসথর্পে, প্লেগ মহামারীর কারণে তখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রদের সবাইকে বাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই সময়েই কখনো নিউটন তার মায়ের বাড়ীর বাগানে আপেল গাছ থেকে পাকা আপেল মাটিতে পড়তে দেখেছিলেন। বিষয়টি কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া সেই গল্পের মত নাটকীয় ভাবে ঘটেনি, তবে বিষয়টি তাকে একটি সমস্যার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল, যা তখনও কারো পক্ষে  ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি – কেন সব কিছু নীচে মাটির দিকে পড়ে।

newtonNewton’s home at Woolsthorpe Manor and the probable apple tree in question

সেই সময়টিতে নানা বৈজ্ঞানিক কৌতুহল নিয়ে তিনি ব্যস্ত ছিলেন। গণিতের কথাই ধরুন, যেমন গ্যালিলিও, দেকার্ত এবং বহু প্রাকৃতিক দার্শনিক ( তার মানে, বিজ্ঞানী) ততদিনে গণিতকে বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বেশ বড় কিছু সফলতা অর্জন করেছিলেন। এমনকি আরো গুরত্বপূর্ণভাবে, এটি তারা ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষার ফলাফল বোঝার জন্য। নিউটন এমনকি আরো ব্শেী দক্ষ গণিতজ্ঞ ছিলেন, তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তার বিজ্ঞানে গণিত ব্যবহার করার ক্ষেত্রে। কিন্তু গানিতিকভাবে গতি বা মাধ্যাকর্ষণকে ব্যাখ্যা করার জন্য বীজগণিত আর জ্যামিতি যথেষ্ঠ না। কারণ সময় আর গতির ক্ষুদ্রতম এককগুলোকে আপনাকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে: বাস্তবিকভাবেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিমান। বন্দুকের নল থেকে বের হয়ে আসা বুলেট অথবা গাছ থেকে আপেলের মাটিতে পড়া কিংবা সূর্যের চারপাশে ঘোরা কোনো গ্রহকে পরীক্ষা করার সময়, আপনাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সময়ে কতটুকু দূরত্ব এটি অতিক্রম করছে। নিউটনের আগে বহু প্রাকৃতিক দার্শনিকরা সমস্যাটি লক্ষ্য করেছিলেন, চেষ্টাও করেছেন ভিন্ন ভিন্ন সমাধান দিয়ে বিষয়টির মোকাবেলা করতে। কিন্তু নিউটন, তখনও যার বয়স বিশের দশকে, নিজেই একটি গানিতিক কৌশল আবিষ্কার করেন সমস্যাটির সমাধান করার উদ্দেশ্যে, তিনি তার এই পদ্ধতির নাম দিচ্ছিলেন fluxions; নামটি তিনি দিয়েছিলেন flux শব্দ ব্যবহার করে, যার মানে এমন কোনো কিছু যা পরিবর্তিত হচ্ছে।  নিউটনের fluxions সেই ধরণের হিসাব নিকাশ করতে ব্যবহৃত হতো, যা আমরা এখনও গণিতের একটি শাখায় করে থাকি, যাকে এখন বলা হয় calculus;  ১৬৬৬ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ, যখন তিনি একটি প্রবন্ধ লিখে শেষ করেছিলেন, শুধুমাত্র নিজের সন্তুষ্টির জন্য, তখন তিনি ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় একজন গণিতজ্ঞ কিন্তু সেটি নিউটন ছাড়া আর কেউই জানেতেন না। তিনি তার গানিতিক আবিষ্কারগুলো বিষয়টি সাথে সাথেই প্রকাশ করেননি, বরং তার পরিবর্তে তিনি সেটি ব্যবহার করেছিলেন তার নিজের গবেষণায় এবং শুধুমাত্র বেশ পরে তিনি তার পদ্ধতিগুলো আর ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেছিলেন পরিচিতদের সাথে।

800px-newtonsprincipia
Sir Isaac Newton’s own first edition copy of his Philosophiae Naturalis Principia Mathematica with his handwritten corrections for the twentieth edition.

গণিত ছাড়া, নিউটন আলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। সেই প্রাচীনকাল থেকে ধারণা করে আসা হয়েছে যে সূর্যের আলোর রঙ সাদা, বিশুদ্ধ, সমজাতীয় উপাদান দিয়ে তৈরী ( বা হোমোজেনাস, যার মানে একই উপাদান দিয়ে তৈরী); রঙ মনে করা হতো এই আবশ্যিকভাবে বিশুদ্ধ রশ্মির পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট কোনো কিছু। দেকার্তের আলো নিয়ে গবেষণাগুলো নিউটন পড়েছিলেন এবং তার করা কিছু পরীক্ষারও পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তিনি প্রথমে লেন্স ব্যবহার করেছিলেন, পরে কাচের একটি বস্তু, প্রিজম ব্যবহার করেন, যা আলোক রশ্মিকে ভাঙ্গতে পারে। তার সেই বিখ্যাত পরীক্ষাটি তিনি করেছিলেন, পুরো অন্ধকার ঘরের ভিতর ক্ষীণ একটি আলোক রশ্মিকে তিনি প্রবেশ করার সুযোগ দেন প্রিজমের মধ্য দিয়ে, যা প্রক্ষেপিত হয় প্রায় বাইশ ফুট ( সাত মিটার) দূরে একটি দেয়ালের উপর। যদি আলো হোমোজিনাস হয়ে থাকে , যেমন দেকার্ত এবং অনেকেই ভেবেছিলেন – দেয়ালের উপর প্রক্ষেপিত আলোটি হওয়া উচিৎ ছিল সাদা একটি বৃত্তের মত, সেই ছিদ্রর মত যে ছিদ্র দিয়ে ঘরে তিনি আলোক রশ্মি প্রবেশ করার ‍সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিউটন এর পরিবর্তে আলোকে দেখেন প্রশস্ত বহু রঙের এটি ব্যান্ড হিসাবে। নিউটন তখনও ঠিক একটি রঙধনু সৃষ্টি করেননি, কিন্তু কিভাবে রঙধনু সৃষ্টি হয় তা ব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়াটি তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন।

1935204_968526156554851_5532454143245607729_n
আইজাক নিউটন  (Newton in later life, by James Thornhill)

প্লেগ মহামারীর সেই বছরগুলোয়, নিউটন  মেকানিকস নিয়েও গবেষণা শুরু করেছিলেন: অর্থাৎ যে সূত্রগুলো কাজ করে গতিশীল বস্তুদের উপর। আমরা দেখেছি কিভাবে গ্যালিলেও,কেপলার, দেকার্ত এবং অন্যান্যরাও বেশ কিছু ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন তা ব্যাখ্যা করতে ( এবং গাণিতীকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলেন), কি ঘটে কামানের গোলা ছোড়ার পর অথবা সূর্যের চারপাশে কিভাবে পৃথিবী ঘোরে। রবার্ট হুকও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। নিউটন এদের সবার লেখাই পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি বিষয়টি নিয়ে আরো বেশী অগ্রসর হয়েছিলেন।হুককে লেখা তার একটি চিঠিতে তিনি বলেছিলেন: ‘যদি আমি বেশী দূরে কিছু দেখতে পেরেছি, এর কারণ আমি দানবদের ঘাড়ে দাড়িয়ে তা দেখেছি’। আপনাদের যদি কারো শৈশবের স্মৃতিতে থাকে বাবার বা কারো ঘাড়ে বসার, তাহলে হয়তো বোঝা সম্ভব হবে হঠাৎ করে দুই বা তিনগুণ লম্বা হলে অনেক কিছুই দেখা সম্ভব যা নিজে নিজে হয়তো সম্ভব হোতো না। আর নিউটন হুককে তার চিঠিতে সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন ( যদি পরবর্তীতে হুক- নিউটন বিখ্যাত দ্বন্দে এটি ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছিল)- তার এই চমৎকার বাক্যটি বোঝাচ্ছে, কিভাবে প্রত্যেকটি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানীদের প্রতিটি প্রজন্ম উপকৃত হয় তাদের আগে আসা বিজ্ঞানীদের অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা। আর এটাই বিজ্ঞানের মূল নির্যাস।

কিন্ত নিউটন নিজেই ছিলেন একজন দানবীয় বিশাল মাপের প্রতিভা। সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল যখন নিউটন অনুভব করেছিলেন যে অন্যরা সে বিষয়টির স্বীকৃতি দিচ্ছেন না। রবার্ট হুকের সাথে নিউটনের ব্যক্তিগত শত্রুতা শুরু হয় যখন নিউটন রয়্যাল সোসাইটিতে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধটি পাঠিয়েছিলেন। সেই পেপারটি পেয়ে সোসাইটি যা করেছিল সেটা এখনও বর্তমানের ভালো বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলো করে থাকে। তারা সেই পেপারটিকে অন্য আরেকজন/কয়েকজন বিশেষজ্ঞর কাছে পাঠান সেই বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য। আমরা যাকে বলে থাকি peer review – এবং এই পক্রিয়াটি স্বচ্ছতা নিশ্চয়তা করে যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিজেই গর্ব করতে পারেন। নিউটনের সেই পেপারটি রিভিউ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল রবার্ট হুকের কাছে, কারণ হুকও তখন আলো নিয়ে গবেষণা করছেন। নিউটন হুকের মন্তব্যগুলো আদৌ পছন্দ করেননি, এবং এমনকি রয়াল সোসাইটির ফেলো পদ থেকে পদত্যাগ করতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু সোসাইটি বুদ্ধিমান নীরবতার সাথে তার পদত্যাগ পত্র স্বীকার করেনি।

তার বৈজ্ঞানিক সৃজনশীলতার সেই বিস্ময়কর ১৬৬০ এর দশকটির পর নিউটন তার মনোযোগ দেন ভিন্ন বিষয়ে – আলকেমি আর ধর্মতত্ত্ব। অন্য সব সময় নিউটন যা করেছেন, এই সব ক্ষেত্রেও তিনি সতর্কভাবে তার সব অধ্যয়ন আর গবেষণার ফলাফল লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, যা এখনও বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা গবেষণা করছেন, নিউটনের কৌতুহলের ভিন্ন এই দিকটি সম্বন্ধে জানার জন্য। তবে সেই সময়, এই সব গবেষণা বা তার চিন্তাভাবনাগুলো তিনি সতর্কতার সাথে কখনো প্রকাশ করেননি। বিশেষ করে তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী, যা তৎকালীন চার্চ অব ইংল্যান্ডের মতবাদের চেয়ে ভিন্ন ছিল। সেই সময় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রের জন্য বাধ্যবাধকতা ছিল চার্চের বিশ্বাসগুলোর সাথে একমত পোষণ করা। সৌভাগ্যক্রমে নিউটনের জন্য এবং অবশ্যই বিজ্ঞানের জন্য, তার বেশ কিছু শক্তিশালী সমর্থক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, সে সুবাদের তিনি ট্রিনিটি কলেজের একজন ফেলো হতে পেরেছিলেন, পরে গণিতের বিখ্যাত Lucasian অধ্যাপক হয়েছিলেন, চার্চ অব ইংল্যান্ডের মতবাদ তিনি অবশ্যই মানেন এমন কোনো প্রতিজ্ঞা করা ছাড়া। প্রায় বিশ বছর ধরে তিনি অধ্যাপকের পদে আসীন ছিলেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষক হিসাবে তিনি আদৌ ভালো ছিলেন না, এবং তার ছাত্ররা কখোনই বোঝেনি, তিনি কি বলতে চাইছেন। কখনো কখনো লেকচার দিতে আসলে তিনি লক্ষ্য করতেন লেকচার শোনার মত কোনো ছাত্রই তার ক্লাসে নেই। তিনি সবসময় আলোচনা করতেন আলো আর গতি নিয়ে, কখনোই আলকেমি নিয়ে না, যা তিনি গোপনে গবেষণা করতেন, হয়তো তার ছাত্ররা সেই বিষয়ে জানতে বেশী কৌতুহলী হতো।

১৬৮০ র দশকে মাঝামাঝি নিউটনের গণিত,পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণাগুলো পরিচিতি পেতে শুরু করে। প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছিলেন, কিন্তু খুব অল্প কয়েকটি তিনি প্রকাশ করেছিলেন। কারণ প্রায়শই তিনি মন্তব্য করেছেন তার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড মূলত তার একার জন্য, এবং যারা তার মৃত্যুর পর আসবে তাদের জন্য। ১৬৮৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডমন্ড হেলি ( হেলির ধূমকেতু খ্যাত) কেমব্রিজে এসেছিলেন নিউটনের সাথে দেখা করতে। হেলি এবং হুক দুজনেই তখন আলোচনা করছিলেন কোনো একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর চারপাশে প্রদক্ষিণ করার জন্য কি ধরণের পথ অবলম্বন করে ( যেমন সূর্যের চারপাশে পৃথিবী আর পৃথিবীর চারপাশে চাঁদ), তারা ভাবছিলেন প্রদক্ষিণের পথকি প্রভাবিত করে মাধ্যাকর্ষণ -এখন আমরা যাকে বলি inverse square law এর মাধ্যমে ? মাধ্যাকর্ষণ অবশ্যই এই আইনের বহু উদহারণের একটি মাত্র। এর মানে মাধ্যাকর্ষণের শক্তি কমে যায় যখন দুটো বস্তুর মধ্যে দূরত্ব বাড়ে ( দূরত্বের বর্গ পরিমানে) এবং অবশ্যই শক্তিটি একই অনুপাতে বাড়ে যখন তারা কাছে চলে আসে।

এই আকর্ষণ  হবে পারস্পরিক, কিন্তু দুটো বস্তুর ভরও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো বস্তু খুব বড় হয়, যেমন পৃথিবী, আর অন্যটি ধরুন খুব ছোট যেমন – কোনো একটি আপেল হয়, তাহলে আর্কষণের বেশীর ভাগ কাজটি করবে পৃথিবী। হেলির সাথে দেখা হবার পর নিউটন তার ধর্মতত্ত্ব আর আলকেমী নিয়ে তার গবেষণা থামিয়ে তার সবচেয়ে সেরা আর বিজ্ঞানের একটি অন্যতম ( কারো কারো মতে সবচেয়ে) সেরা বইটি লেখা শুরু করেন। বইটার ভাষা খুব সহজ ছিল না। আজ আমরা পুরো বইটাকে প্রিঙ্কিপিয়া (Principia) নামে জানি, এর পুরো ল্যাটিন নাম ছিল (নিউটন বইটা ল্যাটিন ভাষায় লিখেছিলেন) Mathematical principles of natural philosophy (নিশ্চয়ই মনে আছে natural philosophy ছিল বিজ্ঞানেরই প্রাচীন নাম)।

নিউটনের প্রিঙ্কিপিয়া বইটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিল কিভাবে তার নতুন গণিতকে প্রয়োগ করা যেতে পারে এবং ব্যাখ্যা করেছিল ভৌত প্রকৃতির নানা বিষয়গগুলো, তবে সংখ্যায়, শব্দবহুল কোনো বর্ণনায় নয়। নিউটনের জীবদ্দশায় খুব অল্প কজনই পেরেছেন তার বইটি সহজে বুঝতে, কিন্তু এর মূল বার্তাটি আরো বেশী মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন; এটি মহাবিশ্বকে নতুন করে দেখার একটি উপায় দেখিয়ে দিয়েছিল।

পৃথিবী আর মহাবিশ্ব সম্বন্ধে নিউটনের ধারণা বেশ কিছু বিষয় বিন্যস্ত আছে তার বিখ্যাত তিনটি গতির সূত্রতে (laws of motion); এই সূত্রগুলো তিনি প্রিঙ্কিপিয়াতে লিখেছিলেন। তার প্রথম সূত্র প্রস্তাব করছে যে কোন বস্তু হয় স্থির বা সরলরেখায় গতিশীল থাকবে যতক্ষন না অন্য কিছু – কোনো শক্তি – এর উপর কাজ না করে। কোনো পাহাড়ের পাশে থাকা পাথরের টুকরা চিরকালই সেখানে থাকবে, যদিনা অন্য কিছু – বাতাস, বৃষ্টি, কোনো মানুষ – এটিকে নড়াবে, কোন ধরনের বাধা ( যেমন friction বা ঘর্ষন) ছাড়াই, এটি চিরকালই সরল রেখা বরাবর চলতে থাকবে।

দ্বিতীয় সূত্রটি বলছে, যদি কোনো বস্তু ইতিমধ্যেই গতিশীল থাকে, তবে কোনো শক্তি এর গতিপথের দিক পরিবর্তন করতে পারে। আর পরিবর্তন কত বড় হবে তার নির্ভর করবে এর উপরে কাজ করা শক্তির উপর, আর গতিপথের দিক পরিবর্তন ঘটে সরল রেখায়, নতুন শক্তির দিক বরাবর। সুতরাং যদি আপনি কোনো পড়তে থাকা বেলুনকে এক পাশ দিয়ে আঘাত করেন, এটি সেই পাশে সরে যাবে, আপনি যদি উপর থেকে আঘাত করেন, এটি আরো দ্রুত নীচে নেমে যাবে।

তার তৃতীয় সূত্রটি বলছে, যে কোনো একটি ক্রিয়ার, সবসময়ই সমান ও বীপরিতমূখী প্রতিক্রিয়া আছে। এর মানে দুটি বস্তু সমানভাবে একে অপরে দিকে কাজ করছে। আপনি জোরে একটা বেলুনে আঘাত করতে পারেন, বেলুনটি আপনার হাত থেকে দুরে সরে যাবে, কিন্তু এটি আপনার হাতের উপর একটি বীপরিতমূখী প্রতিক্রিয়াও দেখাবে ( আপনি সেটা অনুভব করবেন), যদি আপনি কোন বড় পাথরের উপর হাত দিয়ে আঘাত করেন, পাথরের খন্ডটি নড়বে না ঠিকই, কিন্তু আপনার হাতটি ছিটকে আসবে, আপনি ব্যাথাও পাবেন। কারণ কোন হালকা কোন কিছুর পক্ষে কঠিন ভারী কোন কিছুর উপর প্রভাব ফেলা কঠিন – এর বীপরিতটাই বরং সহজতর ( আমরা এই একই বিষয় দেখি মাধ্যাকর্ষণের সাথে)।

10401250_969043066503160_8769546186307251571_n
Richard Mead attending Sir Isaac Newton on His Deathbed by unknown artist ( c.1900)

এই তিনটি সূত্রই এর আগের অনেক প্রাকৃতিক দার্শনিকদের পর্যবেক্ষণের বেশ কিছু ধাঁধার সমাধান দিয়েছিল। নিউটনের হাতে এই সূত্রগুলো বহু পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা করেছিল, গ্রহদের গতি থেকে ধনুক থেকে মূক্ত হওয়া তীরের গতিপথ। গতির সূত্রগুলো সম্ভব করেছিলে পুরো মহাবিশ্বকে একটি দানবীয়, সাধারণ যন্ত্র হিসাবে দেখতে – ঠিক ঘড়ির মত, যেটি তার সময় রাখে কারণ এর স্প্রিং, লিভার আর তাদের গতি।নিউটনের প্রিঙ্কিপিয়াকে শনাক্ত করা হয়েছিল শক্তিমান এক প্রতিভার কাজ হিসাবে। বইটি এই একা থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করা, অদ্ভুত আচরণের মানুষটিকে সেলিব্রিটির খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এর পুরষ্কার হিসাবে তিনি ভালো বেতনের Warden of the Mint হিসাবে নিয়োগ পান, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুদ্রা তৈরী ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। মিন্টে থাকাকালীন সময়ে তিনি বিপুল উৎসাহের সাথে দেশের অর্থ সরবরাহ নিয়ে ব্যস্ত হয়েছিলেন। তাকে এর জন্য লন্ডনে চলে আসতে হয়, সুতরাং তিনি কেমব্রিজের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছিলেন। জীবনের শেষ ত্রিশ বছর তিনি কাটিয়েছিলেন রাজধানীতে, পরে রয়্যাল সোসাইটির সভাপতিও হন।

লণ্ডনে থাকাকালীন সময়ে তিনি ‘প্রিঙ্কিপিয়া’ বইটি আবার সম্পাদনা করেছিলেন, নিজের কিছু কাজও যোগ করেছিলেন, এবং বিভিন্ন সমালোচনার উত্তরও দিয়েছিলেন যা এর প্রকাশের পর অনেকেই করেছিলেন। রবার্ট হুকের মৃত্যুর কিছু দিন পর ১৭০৪ এ নিউটন তার বিখ্যাত দ্বিতীয় বইটি প্রকাশ করেন Opticks, যার বিষয় ছিল আলো। নিউটন আর রবার্ট হুক নিজেদের মধ্যে বেশ বিতর্ক করেছিলেন তাদের মধ্যে কে প্রথম কি পরীক্ষা করেছিলেন, কিভাবে কে তাদের পরীক্ষাগুলো ফলাফল বিশ্লেষণ করেছিলেন আলো কি ও কিভাবে তা আচরণ করে সেটি বোঝার জন্য ইত্যাদি বিষয়ে। নিউটন এই বিষয়ে তার বেশীর ভাগ কাজই করেছিলেন প্রায় ৪০ বছর আগে, কিন্তু হুক যতদিন জীবিত ছিলেন,  বইটি প্রকাশ করতে তিনি রাজি হননি। পিঙ্কিপিয়ার মতই তার Opticks খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী আলো নিয়ে যারা কাজ করেছেন তারা নিউটনের মত এক দানবের ঘাড়ে দাড়িয়েই বহু দূর দেখেছিলেন।

5638443124_e8d539ee24_b
William Blake’s Newton (1795), colour print with pen & ink and watercolour. Blake’s picture of Newton as a divine geometer

ইংল্যান্ডের ইতিহাসে নিউটনই প্রথম বিজ্ঞানী যাকে নাইটের খেতাব দেয়া হয়েছিল, স্যার উপাধি সহ তিনি হয়েছিলেন স্যার আইজাক। ক্ষমতা তিনি পেয়েছিলেন, তবে সুখী হয়েছেন এমন দাবী কেউ করতে পারবে না। তাকে নম্র মানুষ বলে কেউ দাবী করবেন না ঠিকই, অবশ্যই তিনি মহান বিজ্ঞানী ছিলেন, সত্যিকারভাবে তার মত সৃজনশীল কোনো বিজ্ঞানী ইতিহাসে দূর্লভ। আমাদের এই মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে তার অবদান অবিসম্মরণীয়। তাঁর Principia বইটি জ্যোতির্বিজ্ঞান আর পদার্থ বিজ্ঞানের একটি শীর্ষবিন্দু ছিল, যে বিষয়গুলো নিয়ে এর আগে কাজ করেছেন গ্যালিলিও,কেপলার, দেকার্ত সহ আরো অনেকে। তার এই বইতে তিনি পৃথিবী আর মহাবিশ্বকে একটি পদ্ধতি আর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন, কারণ তার সূত্রগুলো ছিল সর্বত্র প্রযোজ্য – মহাবিশ্বের যে কোনো স্থানে। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিটি রচনা করেছিলেন যা বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন বিংশ শতাব্দী অবধি, এরপর আইনস্টাইন এবং অন্যরা দেখিয়েছিলেন স্যার আইজাকের কল্পনার বাইরে এই মহাবিশ্বের আরো কিছু ব্যাপার আছে।

 

Advertisements
যা উপরে ওঠে …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s