ক্ষমাপ্রার্থনাকারী: মিলান কুন্দেরা

34044

মিলান কুন্দেরার সাম্প্রতিক উপন্যাস‘দ্য ফেস্টিভাল অব ইনসিগনিফিক্যান্স’ এর কিছু অংশ, দি অ্যাপোলোজাইজার নামে নিউ ইয়র্কারে এটি প্রকাশিত হয়েছিল (মে ৪,২০১৫), লিণ্ডা অ্যাশারের ইংরেজি অনুবাদ থেকে ভাষান্তর কাজী মাহবুব হাসান। এই লেখাটি সিলেট টুডে টুয়েন্টি ফোর (অনলাইন) এ প্রকাশিত হয়েছিল (ডিসেম্বর ৫, ২০১৬ )।

অ্যালেন নাভি নিয়ে ভাবে:
জুন মাস ছিল সেটি, মেঘের ভিতর থেকে বের হয়ে এসেছিল সকালের সূর্য, আর অ্যালেন প্যারিসের একটি রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল। সে তরুণীদের লক্ষ্য করেছিল: প্রত্যেকেই বেল্ট সহ খুব নিচু করে পরা ট্রাউজার আর খুব ছোট করে কাটা টি-শার্টের মাঝখানে তাদের নগ্ন নাভিটি প্রদর্শন করছে।সে মুগ্ধ হয়েছিল, সম্মোহিত হয়েছিল, এমনকি খানিকটা অস্বস্তিও অনুভব করেছিল: যেন এইসব তরুণীদের প্রলুব্ধ করার শক্তি আর তাদের উরুতে বা তাদের নিতম্বে কিংবা তাদের স্তনে নেই, বরং এখন সেটি বাস করছে শরীরের কেন্দ্রে ক্ষুদ্র গোলাকৃতির এই গর্তে।

বিষয়টি তাকে ভাবতে প্ররোচিত করেছিল : যদি একজন পুরুষ (অথবা একটি যুগ) রমণীদের প্রলুব্ধ করার শক্তির কেন্দ্র হিসাবে তাদের উরুগুলোকে দেখে, তাহলে কিভাবে সেই বিশেষ যৌন দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করতে পারে কেউ ? তাৎক্ষনিকভাবে অ্যালেন একটি উত্তর উদ্ভাবন করেছিল: উরুগুলোর দৈর্ঘ্য হচ্ছে দীর্ঘ, আকর্ষণীয় একটি পথের রূপক চিত্র (সে কারণে উরুদের আবশ্যিকভাবে দীর্ঘ হতে হয়), যা যৌন অর্জনের দিকে নিয়ে যায়। আসলেই, অ্যালেন স্বগতোক্তি করে, এমনকি মধ্য-সঙ্গমেও উরুগুলোর দৈর্ঘ্য রমণীদেরকে অলভ্যতার রোমান্টিক জাদুর একটি বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।

যদি কোনো পুরুষ (অথবা কোনো যুগ) নিতম্বগুলোকে রমণীদের প্রলুব্ধ করনের শক্তির কেন্দ্র হিসাবে দেখে, কিভাবে তাহলে কেউ সেই বিশেষ যৌন দৃষ্টিভঙ্গিটির বিষয়টি ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করে? অ্যালেন তাৎক্ষনিকভাবে একটি উত্তর উদ্ভাবন করেছিল: নৃশংসতা, প্রাণবন্ত আর উৎফুল্ল, গন্তব্যের অভিমুখে সংক্ষিপ্ততম পথ, একটি গন্তব্য আরো বেশী উত্তজেনাময়, দ্বিগুণ হবার কারণে।

যদি কোনো পুরুষ (বা একটি যুগ) স্তনগুলোকে রমণীদের প্রলুব্ধ করার শক্তির কেন্দ্র হিসাবে মনে করে, কিভাবে তাহলে কেউ সেই বিশেষ যৌন দৃষ্টিভঙ্গিটির বিষয়টি ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করে? সে তাৎক্ষনিকভাবে একটি উত্তর উদ্ভাবন করেছিল: রমণীদের পবিত্রীকরণ, যীশুকে বুকের দুধ পান করানো কুমারী মেরী, পুরুষ লিঙ্গ নতজানু স্ত্রী লিঙ্গের মহান দায়িত্বের সামনে।

কিন্তু কোনো পুরুষের (বা একটি যুগের) সেই যৌন ভাবনাটিকে কিভাবে কেউ ব্যাখ্যা করবে, যা কিনা শরীরের মাঝখানে, কেন্দ্রে থাকা নাভিকে রমণীদের প্রলুব্ধ করার শক্তি হিসাবে দেখে?

সুতরাং : ধীর, স্বচ্ছন্দ গতিতে রাস্তা দিয়ে হাটার সময়, অ্যালেন প্রায়ই নাভি নিয়ে ভাবতো, নিজেকে পুনরাবৃত্তি করার ভাবনায় আদৌ বিচলিত না হয়ে, আর এমনকি সেটি করার জন্য বিস্ময়কর একটি একগুঁয়েমিও তার মধ্যে কাজ করতো, কারণ নাভি তার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল দূর অতীতের একটি স্মৃতি: তার মায়ের সাথে তার শেষ দেখা হবার স্মৃতি।

তার বয়স তখন ছিল দশ। সে আর তার বাবা একাই ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিল, বাগান আর সুইমিং পুলসহ একটি ভাড়া করা একটি ভিলায়। বেশ কয়েক বছরের অনুপস্থিতির পর সেবারই প্রথম তার মা এসেছিলেন তাদের সাথে দেখা করতে।তার মা ও তার প্রাক্তন স্বামী ভিলার বন্ধ দরজায় পিছনে নিজেদের বন্দী করেছিলেন কিছু সময়ের জন্য, চারপাশে বহু মাইল জুড়ে যা সৃষ্টি করেছিল শ্বাসরুদ্ধর একটি পরিস্থিতি।কতক্ষণ তার মা ছিলেন সেখানে? সম্ভবত এক কিংবা দুই ঘণ্টার বেশী নয়, সেই সময়টি অ্যালেন সুইমিং পুলে সাতার কেটে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছিল।কেবলই যখন সে সুইমিং পুল থেকে উপরে উঠেছে, তার মা কিছুটা সময় বিরতি নিয়েছিলেন সেখানে এসে তাকে বিদায় জানাতে। তার মা একাই সেখানে এসেছিলেন। আর কি কথা তারা বলেছিল পরস্পরের সাথে ? অ্যালেন জানে না। সে শুধু মনে করতে পারে যে তার মা বাগানের একটি চেয়ারের উপর বসেছিলেন, এবং সে, তার ভেজা গোছল করার কাপড় পরে তার মুখোমুখি দাড়িয়ে ছিল। তারা কি কথা বলেছিল সেটি বিস্মরিত হয়েছে, কিন্তু একটি মুহূর্ত তার স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে, একটি বাস্তব, সুনির্দিষ্ট মুহূর্ত, তীক্ষ্ণতার সাথে যা খোদাই হয়ে আছে: চেয়ারে বসে থেকেই, একদৃষ্টিতে তিনি তার ছেলের নাভির দিকে তাকিয়ে আছেন। সে এখনো তার পেটের উপর সেই দৃষ্টিটি অনুভব করে। এমন একটি স্থির দৃষ্টি, যা দুর্বোধ্য: তার কাছে মনে হয়েছিল এটি সহমর্মিতা আর ঘৃণার একটি অবর্ণনীয় মিশ্রণকে প্রকাশ করছে। তার মায়ের ঠোটগুলো রূপ নিয়েছিল একটি স্মিত-হাসির (একই সাথে সহমর্মিতা আর ঘৃণার স্মিতহাসি), তারপর চেয়ার থেকে না উঠেই তিনি অ্যালানের দিকে ঝুঁকে সামনে এগিয়ে আসেন আর তর্জনী দিয়ে, অ্যালানের নাভিটি স্পর্শ করেন। ঠিক এরপরই, তিনি উঠে দাঁড়ান, অ্যালেনকে একটি চুমু খান (আসলেই কি তিনি তাকে চুমু খেয়েছিলেন? সম্ভবত, কিন্তু সে নিশ্চিত নয়), এবং চলে যান, এরপর তার সাথে অ্যালানের আর কখনোই দেখা হয়নি।

গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে এক নারী:
নদীর পাশ ঘেঁষে চলা রাস্তাটি দিয়ে একটি ছোট গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। সকালের ঠাণ্ডা বাতাস অনাকর্ষণীয় সেই জায়গাটিকে আরো বেশী পরিত্যক্ত করে তুলেছে, কোনো একটি শহরতলীর শেষ সীমানা আর গ্রামের মাঝামাঝি কোথাও সেটি, যেখানে ঘরবাড়ি ক্রমশ দুর্লভ, কোনো পথচারীরও দেখা মেলে না। রাস্তার পাশে একসময় গাড়িটি থামে; একজন নারী ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন – তরুণ, বেশ সুন্দরী। একটি অদ্ভুত বিষয়: এতই অবহেলার সাথে তিসি গাড়ির দরজাটি ধাক্কা দেন বন্ধ করার জন্য, যেন গাড়িটি অবশ্যই বন্ধ না হয়। আর এই অসতর্কতার কি অর্থ হতে পারে, খুবই অস্বাভাবিক একটি কাজ, বিশেষ করে বর্তমান এই সময়ে, যখন কিনা চারিদিকে চোরের কোনো অভাব নেই? নারীটি কি এতই অন্যমনস্ক?

না, তাকে দেখে অন্যমনস্ক মনে হচ্ছে না; বরং এর বিপরীত, তার চেহারায় দৃঢ় সংকল্প দৃশ্যমান। এই নারী জানে সে কি চায়। এই নারী হচ্ছে বিশুদ্ধ ইচ্ছাশক্তি। রাস্তা দিয়ে কয়েক শত গজ তিনি হেটে যান, নদীর উপরে একটি সেতুর দিকে, বেশ উঁচু আর সংকীর্ণ একটি সেতু, যেখানে যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ।তিনি সেতুর উপরে ওঠেন ও নদীর দূরের অন্য প্রান্তের দিকে হেটে যান। বেশ কয়েকবারেই নারীটি চারপাশে তাকিয়ে দেখে, কেউ তাকে সেখানে প্রত্যাশা করছে, এমন কোনো নারীর মত নয়, বরং নিশ্চিত হবার জন্য, কেউ যেন সেখানে তার জন্য অপেক্ষা না করে। সেতুটির মাঝখানে আসার পর, তিনি দাঁড়ান, প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয়, তিনি খানিকটা ইতস্তত বোধ করছেন, কিন্তু, না, এটি কোনো ইতস্তত নয় বা সংকল্পের হঠাৎ দুর্বলতাও নয়। বরং এর বিপরীত, এটি তার মনোযোগকে আরো সুতীক্ষ্ণ করার বিরতি, তার ইচ্ছাশক্তিকে আরো ইস্পাৎ কঠিন করে তোলার বিরতি। তার ইচ্ছাশক্তি? আরো বেশী সুনির্দিষ্টভাবে: তার ঘৃণা। হ্যাঁ, বিরতিটি, যা দেখে মনে হয় ইতস্তত, সেটি আসলে পাশে থাকার জন্য, তাকে সমর্থন করার জন্য, এক মুহূর্তের জন্যেও তাকে পরিত্যাগ না করার জন্য, তার ঘৃণার প্রতি একটি আবেদন।

নারীটি তার একটি পা উঁচু করে সেতুর রেলিং এর উপর তোলে এবং তারপর নিজেকে শূন্যে ছুড়ে দেয়। পড়ে যাবার শেষ মুহূর্তে, তিনি নিষ্ঠুরভাবে ধাক্কা খান পানির উপরি পৃষ্ঠের কঠোরতায়, এবং তিনি অসাঢ় হয়ে যান পানির তীব্র শীতলতায়, কিন্তু কয়েকটি দীর্ঘ সেকেন্ড অতিক্রান্ত হবার পর নারীটি তার মুখ পানির উপরে উঁচু করে তোলেন, আর যেহেতু তিনি খুব ভালো সাঁতারু, তার সব স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়াগুলো তার আত্মহত্যা করার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তার মাথাটিকে আবারো তিনি পানির নীচে ডুবিয়ে দেবার চেষ্টা করেন, নিজেকে বাধ্য করেন নিঃশ্বাসের সাথে পানি গ্রহণ করতে, তার শ্বাস বন্ধ করার জন্য। হঠাৎ করেই তিনি একটি চিৎকার শুনতে পান। দুরে পাড় থেকে আসা একটি চিৎকার। কেউ তাকে দেখে ফেলেছে। তিনি বুঝতে পারে, মরাটা খুব সহজ হবে না, আর তার সবচেয়ে বড় শত্রু হবে তার ভালো সাঁতারুর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা-নিরপেক্ষ ক্রিয়া নয়, বরং একজন ব্যক্তি, যার কথা সে ভাবেনি। তাকে যুদ্ধ করতে হবে। তার মৃত্যুকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ।

সে হত্যা করে:
চিৎকারের উৎসটির দিকে তাকায় নারীটি ।কেউ একজন নদীতে ইতিমধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তিনি হিসাব নিকাশ করতে থাকেন: কে বেশী দ্রুততর, সে, পানির নীচে থাকতে যে দৃঢ়-সংকল্প, যে পানি শ্বাসনালীতে নিতে চায়, যে নিজেকে ডুবাতে চায়, না কি সে, তার দিকে সাতার কেটে এগিয়ে আসা ব্যক্তিটি? যখন কিনা সে অর্ধেক ডুবন্ত, ফুসফুসে পানিসহ এবং এভাবেই দুর্বল, সে কি সহজতর শিকার হবে না তার রক্ষাকর্তার? সে তাকে টেনে নদীর পাড়ের দিকে নিয়ে যাবে, তাকে মাটিতে শোয়াবে, তার ফুসফুস থেকে জোর করে পানি বের করে দেবে, মুখ দিয়ে শ্বাস দেবার চেষ্টা করবে, উদ্ধারকারী দলকে ডাকবে, আর তিনি বেঁচে যাবে, আর চিরকালই বিদ্রূপের শিকার হবেন।

থামো, থামো, লোকটি চিৎকার করে।

এখন সবকিছু বদলে গেছে। পানি নীচে ডুব দেবার বদলে নারীটি তার মাথা পানির উপরে তোলেন, শক্তি সঞ্চয় করার জন্য গভীরভাবে শ্বাস নেয় । ইতিমধ্যেই তাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে আসা ব্যক্তিটি তার সামনে। অল্প বয়সী একটি ছেলে, তরুণ, যে বিখ্যাত হবার আশা করছে, কাগজে তার ছবি ছাপিয়ে। সে বার বার বলতে থাকে, ‘থামো, থামো’!, ইতিমধ্যে সে তার দিকে একটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, এবং নারীটি সেটি এড়িয়ে যাবার বদলে হাতটি ধরে, খুব শক্ত করেই সে ধরে।এবং সেই বাড়ানো হাতটিকে (এবং তাকে) টেনে নদীর পানির গভীরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। আবারো সে চিৎকার করে, ‘থামো’। যেন এটাই একমাত্র শব্দ যা সে বলতে পারে।কিন্তু সে আর শব্দটি উচ্চারণ করবে না।সে তার হাত টেনে ধরে তাকে পানির নীচের দিকে টেনে নিয়ে যায়, এরপর তার সারা শরীরটি তরুণটি পিঠের উপর বিছিয়ে দেয় তার মাথা পানির নীচে চেপে ধরে রাখতে। তরুণটি নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে, হাত পা ছোড়ে চারিদিকে, কিন্তু ইতিমধ্যে সে পানি শ্বাস নিয়েছে, নারীটিকে সে আঘাত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে দৃঢ়ভাবে তার পিঠের উপর চাপ দিয়ে শুয়ে থাকে, ছেলেটি বাতাসে শ্বাস নেবার জন্য তার মাথা আর পানির উপরে তুলতে পারে না। এবং এরপর বেশ কিছু দীর্ঘ, খুব দীর্ঘ সেকেন্ড অতিক্রম করার পর সে নড়াচড়া করা বন্ধ করে দেয়, আরো কিছুক্ষণ তাকে এভাবে ধরে রাখে নারীটি।মনে হয় যেন সে ক্লান্ত আর কাঁপছে। সে বিশ্রাম নিচ্ছিল, ছেলেটির পিঠের উপর শুয়ে। তারপর যখন সে নিশ্চিত হয়, তার নীচের তরুণটি আর কখনো নড়াচড়া করবে না, সে তাকে ছেড়ে দেয় আর দ্রুত অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, নদীর তীরের দিকে, যেদিক থেকে তিনি এসেছিলেন, যেন এইমাত্র যা ঘটেছে তার ছায়াও যেন তার মধ্যে সংরক্ষিত না হয়।

কিন্তু কি হলো? নারীটি কি তার সংকল্প ভুলে গিয়েছিল? কেন সে নিজেকে ডুবালো না, যে মানুষটা তার কাছ থেকে মৃত্যুকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল, সে যখন আর বেঁচে নেই? কেন এখন, যখন সে স্বাধীন, সে কি তাহলে আর আত্মহত্যা করতে চাইছে না?

অপ্রত্যাশিতভাবে পুনরুদ্ধারকৃত জীবন, তার জন্য একটি বড় ধাক্কার মত ছিল, যা তার সংকল্পকে ভেঙ্গে দিয়েছে; মরার জন্য তার সব প্রাণশক্তি একীভূত করার শক্তি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন।তিনি কাঁপছিলেন, হঠাৎ করে, সব প্রাণশক্তি আর ইচ্ছাশক্তি তাকে পরিত্যাগ করে। যান্ত্রিকভাবেই সে সেই জায়গার দিকে সাতার কেটে অগ্রসর হয়, যেখানে সে তার গাড়িটি পরিত্যক্ত করে রেখে এসেছিল।

সে বাড়ি ফিরে আসে:
অল্প অল্প করে নারীটি অনুভব করে পানির গভীরতা কমছে, পানির নীচে মাটিতে সে তার পা ছোঁয়াতে পারে, সে দাঁড়ায়, কাদার মধ্যে তার জুতাগুলো হারিয়ে ফেলে সে, আর সেগুলো খোঁজার মত কোনো শক্তি তার অবশিষ্ট ছিল না।খালি পায়ে পানি ছেড়ে নদীর পাড় বেয়ে সে রাস্তায় উঠে আসে।

নিজের মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হবার সময় পথের মধ্যে কি পড়ে গেছে সে বিষয়ের আপনি নিশ্চয়েই চিন্তা করবেন না। যখন তিনি গাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, কোনো ভবিষ্যতের অস্তিত্ব ছিলনা তখন, তার লুকিয়ে রাখার মত কিছুই ছিলনা, কিন্তু এখন, তার সবকিছু লুকাতে হবে। কোনো চিহ্ন রাখলে চলবে না। তার চিন্তা আরো প্রবলতর হয়: গাড়ির চাবিটা কোথায়? তাহলে কিভাবে বাসায় ফেরা যায়?

তিনি গাড়ির কাছে পৌছে দরজাটি টানেন, এবং বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন যে এটি খুলে যাচ্ছে, আর চাবিটি পরিত্যক্ত, তার জন্য অপেক্ষা করছে ড্যাশ-বোর্ডে। তিনি গাড়ির হুইলের পেছনে বসে, পেডালগুলোর উপর তার নগ্ন পাগুলো ঠিকমত রাখেন। তখনও তিনি কাঁপছিলেন, এখন তিনি ঠাণ্ডাতেও কাঁপছেন। তার শার্ট, তার স্কার্ট, সবই ভেজা, নদীর নোংরা পানি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি চালু করেও সেখান থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

যে মানুষটি তার উপর জীবন আরোপ করার চেষ্টা করেছিল, সে মারা গেছে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে, আর যে মানুষটাকে তিনি মারার চেষ্টা করছিলেন, তার পেটে এখনও সে জীবন্ত। আত্মহত্যার ধারণাটি চিরকালের জন্য বাতিল তাহলে, আর পুনরাবৃত্তি নয়। তরুণ ছেলেটি এখন মৃত, ভ্রূণ বেঁচে আছে, তারপক্ষে করা সম্ভব সবকিছুই তিনি করবেন, কি ঘটেছে সেটা যেন কেউ আবিষ্কার না করতে পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্য। তিনি কাঁপছেন, আর তার ইচ্ছাশক্তিও পুনরুজ্জীবিত হয়। নিকটবর্তী ভবিষ্যৎ ছাড়া তিনি আর কিছুই ভাবছেন না এখন: কিভাবে সবার অলক্ষ্যে গাড়ি থেকে বের হওয়া যায়? কিভাবে তার ভেজা কাপড়ে, অ্যাপার্টমেন্টের অভ্যর্থনার জানালা পেরিয়ে, সবার অগোচরে বাসায় ফেরা যায়?

অ্যালেন তার কাঁধে বেশ জোরে একটা ধাক্কা খায়, ‘সাবধানে দেখে চলো, নির্বোধ কোথাকার’।

সে ঘাড় ফেরায়, পাশে ফুটপাথ দিয়ে সে একটি কর্মচঞ্চল উদ্যমী তরুণীকে দ্রুত পায়ে হেটে যেতে দেখে।

‘দুঃখিত’, সে চিৎকার করে তাকে বলে (তার দুর্বল কণ্ঠে)।

‘আহাম্মক’, ঘুরে না তাকিয়ে সে উত্তর দেয় (তার শক্তিশালী কণ্ঠে)।

ক্ষমাপ্রার্থনাকারী:
দুই দিন পর তার স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে একা, অ্যালেন লক্ষ্য করে সে এখনও তার ঘাড়ে বেশ ব্যথা অনুভব করছে, এবং সে সিদ্ধান্তে পৌছায়, তরুণীটি, যে তাকে রাস্তায় এত দক্ষতার সাথে ধাক্কা দিয়েছে, সে অবশ্যই কাজটি করেছিল ইচ্ছাকৃতভাবে। অ্যালেন কিছুতেই ভুলতে পারেনা সেই কর্কশ আর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটি, যখন তরুণীটি তাকে ‘নির্বোধ’বলে সম্বোধন করেছিল। সে আবারো তার অনুনয়ের সুরে ‘দুঃখিত’বলাটি শুনতে পায়, প্রত্যুত্তরে ‘গর্দভ’ শব্দটিও সে শুনতে পায়। আবারো, কোনো কারণ ছাড়াই সে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছে ! ক্ষমা ভিক্ষা করার জন্য সবসময় তার কেন এই নির্বোধ ইচ্ছা নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া? স্মৃতিটি কিছুতেই তাকে মুক্তি দেয়না, আর সে অনুভব করে কারো সাথে তাকে অবশ্যই কথা বলতে হবে। সে তার প্রেমিকাকে ফোন করে, ম্যাডেলাইন। সে প্যারিসে ছিল না তখন, আর সেল ফোনও ছিল বন্ধ। সুতরাং সে ফোনে চার্লসের নম্বর চাপে, আর যখনই সে তার বন্ধুর কণ্ঠস্বর শোনে, সে ক্ষমা প্রার্থনা করে, ‘রাগ করো না, আমার মেজাজটা খুব খারাপ, আমার কথা বলা দরকার’।

‘খুবই ভালো সময় এটা, আমার মেজাজও খুব খারাপ। কিন্তু তোমারটার কারণ কি’?

‘কারণ আমি আমার নিজের উপর রাগ করেছি। কেন আমি সবসময় সুযোগ খুঁজি অপরাধবোধে ভোগার জন্য’?

‘কিন্তু সেটা এত ভয়ানক খারাপ কিছু না’।

‘অপরাধবোধে ভোগা বা না ভোগা- আমি মনে করি এটাই সার্বিক সমস্যা। জীবন হচ্ছে সবার বিরুদ্ধে সবার সংগ্রাম। এটি জ্ঞাত সত্য। কিন্তু কোনো একটি সমাজে, যা কিনা কম বেশী সভ্য, সেখানে কিভাবে এই সংগ্রামটি কাজ করে? দেখা মাত্রই মানুষ সরাসরি অন্য একজনকে আক্রমণ করতে পারেনা । সুতরাং এর পরিবর্তে তারা চেষ্টা করে একে অপরের উপরে অপরাধবোধের (শাস্তিযোগ্যতার) লজ্জা চাপিয়ে দেয়ার জন্য। যে মানুষটি অন্য একজনকে অপরাধবোধে ভোগাতে পারে সেই জেতে। যে তার অপরাধ স্বীকার করে সে হেরে যায়। তুমি চিন্তায় মগ্ন হয়ে রাস্তায় হাঁটছিলে, তখন তরুণীটি, সোজা সামনে এগিয়ে হেটে আসে, যেন পৃথিবীতে সেই একমাত্র মানুষ, ডানে বামে কোনো দিকে না তাকিয়ে, তোমরা একে অপরের সাথে ধাক্কা খেলে, আর সেই সত্য অনুধাবনের মুহূর্ত: কে অন্যজনের প্রতি চিৎকার করবে আর কেই বা ক্ষমা চাইবে? এটি একটি ধ্রুপদী মুহূর্ত: আসলেই প্রত্যেকেই একই সাথে ধাক্কা প্রদানকারী আর ধাক্কার শিকার। কিন্তু তারপরও কিছু মানুষ সবসময়ই, তাৎক্ষনিকভাবেই, স্বতঃস্ফূর্তভাবে – নিজেদের মনে করে ধাক্কা প্রদানকারী, আর সেকারণে তাদের অবস্থানটি ভুল। এবং অন্যরা সবসময়ই – তাৎক্ষনিকভাবে – নিজেদের ধাক্কার শিকার মনে করে, সুতরাং তাদের অবস্থানটি সঠিক ভেবেই তারা দ্রুত অন্যকে দোষী সাব্যস্ত করে আর তাকে শাস্তি দেবার ব্যবস্থা করে। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে কি হচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে, তুমি কি ক্ষমা চাইবে নাকি অভিযুক্ত করবে’?

‘আমি, আমি অবশ্যই ক্ষমা চাইবো’।

‘আহ, আমার অসহায় বন্ধু, তুমিও তাহলে ক্ষমা-প্রার্থী সেনাদলের সদস্য। তুমি অন্য মানুষটিকে প্রশমিত করার চেষ্টা করো তোমার ক্ষমা প্রার্থনার দ্বারা’।

‘পুরোপুরিভাবে’।

‘আর তোমার এই অবস্থানটি ভুল। যে ব্যক্তিটি ক্ষমাপ্রার্থনা করছে সে নিজেকে দোষী হিসাবে ঘোষণা করছে। আর তুমি যদি নিজেকে দোষী হিসাবে ঘোষণা করো, তুমি অন্যদের প্ররোচিত করছো তোমাকে অপমান করা অব্যাহত রাখার জন্য, তোমাকে দোষ দেওয়া, সবার সামনে, মৃত্যু অবধি। এটাই প্রথম ক্ষমাপ্রার্থনা করার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি’।

‘এটা সত্য, কারো উচিৎ না ক্ষমা চাওয়া, কিন্তু তারপরও আমি এমন একটি পৃথিবী পছন্দ করি যেখানে সবাই ক্ষমা প্রার্থনা করবে, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া, উদ্দেশ্যহীনভাবে, বাড়াবাড়িভাবে, কোনো কারণ ছাড়াই, যেখানে তারা নিজেদের পূর্ণ করে ক্ষমাপ্রার্থনার সাথে’।

অ্যালেন তার সেল ফোন ব্যবহার করে ম্যাডেলাইনকে ফোন করার করার জন্য। কিন্তু বার বার ফোন করে সে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়। এই ধরনের মুহূর্তগুলো প্রায়শইযা করে, সে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেয়ালে ঝোলানো একটি ছবির প্রতি। তার স্টুডিওতে আর কোনো ছবি নেই সেটি ছাড়া: একটি তরুণী মুখ – তার মা।

অ্যালানের জন্মের কয়েক মাস পর, তিনি তার স্বামীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। এবং তার স্বামী, তার সতর্ক আচরণের জন্য, কখনোই সে তার সম্বন্ধে খারাপ কিছু বলেননি। অ্যালানের বাবা খুবই সূক্ষ্ম, রুচিশীল, ভদ্র মানুষ। শিশুটি বুঝতে পারেনি কিভাবে কোনো মহিলা এমন কোনো পুরুষকে ছেড়ে যেতে পারে, যে কিনা এত ভদ্র আর নম্র, এবং আরো কম সে বুঝতে পারে কিভাবে কোনো মা তার ছেলেকে পরিত্যাগ করতে পারে, যে কিনা নিজেও (যেমন সে সচেতন ছিল) তার শৈশব থেকে (যদিও গর্ভধারণ করার সেই মুহূর্ত থেকে না) সে নম্র, ভদ্র মানুষ ছিল।

‘কোথায় থাকেন মা’? সে তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল।

‘সম্ভবত আমেরিকা’।

সম্ভবত বলতে কি বোঝাচ্ছো তুমি?

‘আমি তার ঠিকানা জানিনা।’

‘কিন্তু এটা তার একটা কর্তব্য ছিল তোমাকে ঠিকানাটা দেয়া’।

‘কিন্তু আমার প্রতি তার কোনো কর্তব্য নেই’।

‘কিন্তু আমার প্রতি কি তার কোনো কর্তব্য নেই? আমার কোনো খবর কি সে জানতে চায়নি কখনো? সে কি জানতে চায়নি আমি কেমন আছি, কি করছি? সে জানতে চায়নি আমি তার সম্বন্ধে কি ভাবি’?

একদিন, তার বাবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন।

‘যেহেতু তুমি জোর করছো, আমি তোমাকে বলছি, তোমার মা কখনো চানটি যে তোমার জন্ম হোক। সে কখনো চায়নি তুমি এখানে থাকো, ঐ ইজি চেয়ারে আরাম করে বসো, যেখানে তুমি খুব বেশী স্বচ্ছন্দে থাকো। সে কিছুই চায়নি তোমার, তাহলে তুমি কি এখন সব বুঝতে পারছো’?

তার বাবা আদৌ আক্রমণাত্মক কোনো মানুষ ছিলেন না। কিন্তু, তার, যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই মহিলার সাথে তার গভীর মতানৈক্যের বিষয়টি তিনি কিছুতেই লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে পারলেন না, যে কিনা একটি মানব সন্তানকে পৃথিবীতে না আসতে দেবার চেষ্টা করেছিল।

আমি ইতিমধ্যেই তার মায়ের সাথে অ্যালানের শেষ সাক্ষাতটিকে বর্ণনা করেছি, ভাড়া করা ছুটি কাটানোর ভিলার সুইমিং পুলের পাশে। তখন তার বয়স ছিল দশ। তার বাবা যখন মারা যান তার বয়স তখন ষোল। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পর সে তার মায়ের একটি ছবি পারিবারিক অ্যালবাম থেকে ছিঁড়ে ফ্রেম করে বাধিয়ে রেখেছিল তার দেয়ালে। কেন তার বাবার কোনো ছবি নেই তার অ্যাপার্টমেন্টে? আমি জানি না। এটি কি অযৌক্তিক? অবশ্যই। বাবার প্রতি তার অবিচার? কোনো সন্দেহ নেই সে বিষয়ে। কিন্তু সেটাই পরিস্থিতি। তার স্টুডিওর দেয়ালে একটি মাত্র ছবি ঝোলানো: সেটি তার মায়ের, যার সাথে, মাঝে মাঝেই, সে কথা বলে।

কিভাবে একজন ক্ষমাপ্রার্থনাকারীর জন্ম দিতে হয়:
‘কেন তুমি গর্ভপাত করালে না? তোমার স্বামী কি তোমাকে বাধা দিয়েছিল’?

দেয়ালের ছবিটি থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে আসে তার কাছে: ‘তুমি কোনোদিনও সেটি জানতে পারবে না। আমার সম্বন্ধে যা কিছুই তুমি কল্পনা করো, সেগুলো সব রূপকথা মাত্র। কিন্তু আমি তোমার রূপকথাগুলো ভালোবাসি। এমনকি যখন তুমি আমাকে খুনি হিসাবে কল্পনা করো যে পানিতে একটি তরুণকে ডুবিয়ে মেরেছিল। আমার সবটাই ভালো লাগে। চালিয়ে যাও অ্যালেন। আমাকে একটি গল্প বলো!বলো, কল্পনা করো! আমি শুনছি’।

এবং অ্যালেন কল্পনা করে। তার মায়ের শরীরের উপর তার বাবাকে সে কল্পনা করে। তাদের সঙ্গমের আগে তার মা তার বাবাকে সতর্ক করেছিল: ‘আমি কোনো পিল খাইনি, সাবধানে’! সে তাকে আশ্বস্ত করে। সুতরাং কোনো অবিশ্বাস ছাড়াই তার মা সঙ্গম করে, তারপর, যখন তার মা পুরুষটির মুখে আসন্ন চূড়ান্ত মুহূর্তটির চিহ্ন লক্ষ্য করে আর সেটি আরো স্পষ্টতর হতে থাকে, সে চিৎকার করে ওঠে, ‘সাবধানে’!, তারপর, ‘না! না! না! আমি চাই না! আমি চাই না’! পুরুষটির মুখ আরো লালচে হয়ে উঠতে থাকে, লাল আর আগ্রাসী। তার মা চেষ্টা করে তার গায়ের উপর শক্ত করে আটকে থাকা শরীরটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে, সে যুদ্ধ করে, কিন্তু পুরুষটি আরো বেশী শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে, আর তার মা হঠাৎ করেই বুঝতে পারে যে তার জন্যে এটি তীব্র আবেগের অন্ধত্ব নয়, বরং ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত শীতল ইচ্ছা – তবে তার জন্য এটি শুধুমাত্র ইচ্ছাই নয়, তার চেয়েও আরো অনেক বেশী, এটি ঘৃণা, একটি ঘৃণা যা আরো বেশী হিংস্র কারণ যুদ্ধে সে পরাজিত হয়েছে।

এটাই প্রথমবারের মত নয় যে অ্যালেন তাদের যৌনসঙ্গম কল্পনা করেছে; এই সঙ্গমটি তাকে মোহাবিষ্ট করেছিল, এবং তার সেই ভাবনাটির কারণ হয়েছিল: প্রতিটি মানুষই তাদের গর্ভধারণের সেই মুহূর্তটির অবিকল প্রতিরূপ। সে তার আয়নার সামনে দাড়ায় এবং তার মুখে সেই সেই দ্বিগুণ ঘৃণার চিহ্ন অনুসন্ধান করে, সেই যুগপৎ ঘৃণা যা তার জন্মের কারণ: একটি পুরুষের ঘৃণা এবং একটি রমণীর ঘৃণা, সেই পুরুষটির চরম উত্তেজনার মুহূর্তে, নম্র আর শারীরিকভাবে শক্তিশালী একজনের ঘৃণার সাথে যুক্ত সাহসী আর শারীরিকভাবে দুর্বল একজনের ঘৃণা।

আর সে ভাবে, দ্বিগুণ ঘৃণার ফল হতে পারে কেবলই একজন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। সেও শান্ত, নম্র, তার বাবার মত মেধাবী, আর সে সবসময়ই একজন আগন্তুক হয়ে থাকবে তার বাবার মত, যেমন করে তার মা তার বাবাকে দেখতেন। আর কোনো মানুষ, যে কিনা একই সাথে আগন্তুক আর নম্র, সে দণ্ডপ্রাপ্ত, একটি নির্দয় যুক্তির দ্বারা, তার সারা জীবন ধরেই ক্ষমাপ্রার্থনা করার জন্য। সে দেয়ালে ঝোলানোর ছবিটির মুখের দিকে তাকায়, আবারো সে সেই রমণীকে দেখে, পরাজিত, তার ভেজা কাপড়ে, গাড়িতে উঠে বসে, অ্যাপার্টমেন্টের অভ্যর্থনা ডেস্কের জানালা পাশ দিয়ে দৃষ্টি এড়িয়ে সে চলে যায়, সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে, অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে, যেখানে সে সেই দিন অবধি ছিল, যতক্ষণ না আগন্তুকটি তার শরীর ত্যাগ করে।এবং যেখানে, এর কয়েকমাস পরই দুজনকেই সে পরিত্যাগ করবে।

ইভের বৃক্ষ:
তার স্টুডিওর মেঝেতেই অ্যালেন বসেছিল, দেয়ালে হেলান দিয়ে, মাথা বেশ নিচু করে বাকিয়ে। হয়তো সে ঘুমিয়ে পড়েছিল? একটি নারী কণ্ঠ তাকে জাগিয়ে তোলে।

‘আমাকে এতক্ষণ যা বলেছো তুমি, আমি সবই পছন্দ করেছি। তুমি যা কিছু আবিষ্কার করছো, সব কিছুই আমার বেশ ভালো লাগছে। আর এর সাথে যোগ করার মত আমার কিছু নেই। শুধুমাত্র, হয়তোবা নাভির বিষয়টি ছাড়া। তোমার মনে, কোনো নাভিহীন রমণী মানে দেবদূত। আমার জন্য, এটি ইভ, প্রথম রমণী। সে কারো পেট থেকে জন্ম নেয়নি, বরং একটি খেয়াল থেকে যে জন্ম নিয়েছিল, সৃষ্টিকর্তার খেয়াল। এবং তার যোনী থেকেই, নাভিহীন রমণীর যোনি থেকে প্রথম নাড়িরজ্জু আবির্ভুত হয়েছিল। আমাকে যদি বাইবেল বিশ্বাস করতে হয়, অন্য সব নাড়ি রজ্জুগুলোও এসেছিল সেখান থেকে: যাদের প্রত্যেকটির শেষ প্রান্তে যুক্ত ছিল ছোট একটি পুরুষ অথবা ছোট একটি রমণী। পুরুষদের শরীরগুলো পরিত্যক্ত হয় কোনো ধারাবাহিকতা ছাড়া, পুরোপুরিভাবে অনুপযোগী, অন্যদিকে প্রতিটি রমণীর যৌনাঙ্গ থেকে এসেছে আরেকটি রজ্জু, যাদের প্রত্যেকটির প্রান্তে একটি পুরুষ কিংবা একটি রমণী। এবং এই সবকিছুই, বহু লক্ষ হাজার বার পুনরাবৃত্তি হয়, রূপান্তরিত হয় একটি সুবিশাল বৃক্ষে, অসীম সংখ্যক শরীর দিয়ে নির্মিত একটি বৃক্ষ। একটি বৃক্ষ যার শাখা প্রশাখা আকাশ স্পর্শ করেছে। কল্পনা করো! দানবীয় একটি বৃক্ষ যার শিকড় একটি ছোট রমণীর যোনীতে, প্রথম রমণী, অসহায় নাভি-হীন ইভ’।

যখন আমি গর্ভধারণ করেছিলাম, আমি নিজেকে সেই বৃক্ষের অংশ হিসেবে দেখেছিলাম, এর কোনো একটি সুতো থেকে ঝুলন্ত, আর তুমি, এখনও যার জন্ম হয়নি, আমি তোমাকে কল্পনা করেছি শূন্যে ভাসছো, সেই সুতায় বাধা, যা আমার শরীর থেকে বের হয়ে এসেছে, আর তখন থেকেই আমি একটি আততায়ীকে কল্পনা করেছি সেই বহু নীচের শুরুতে, যে কিনা নাভিহীন রমণীটির গলা কাটছে। আমি তার শরীরকে মৃত্যু যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে দেখছি, পচতে দেখছি, যতক্ষণ না পুরো সেই বিশাল বৃক্ষটি, যা তার শরীর থেকেই বেড়ে উঠেছিল, এখন হঠাৎ করে শিকড়হীন, কোনো ভিত্তি ছাড়া, পড়তে শুরু করে। আমি এর শাখা প্রশাখার অসীম বিস্তার দেখতে পেয়েছিলাম, দানবীয় কোনো বিস্ফোরণের মত সেটি মাটিতে আছড়ে পড়ে, আর – আমাকে বোঝো – আমি যা কল্পনা করছি সেটি মানব ইতিহাসের সমাপ্তি নয়, কোনো ভবিষ্যতের বিলুপ্তি নয়, না, না, আমি যা চেয়েছিলাম সেটি হচ্ছে পুরো মানবজাতির অপসারণ, অন্তর্ধান, এর ভবিষ্যৎ আর অতীত সহ, এর শুরু আর শেষ সহ, পুরো অস্তিত্বের সব কিছু সহ, সব স্মৃতি সহ, নিরো আর নেপোলিয়ন, বুদ্ধ আর যীশু সহ। আমি পুরোপুরি ধ্বংস চেয়েছিলাম সেই বৃক্ষের যা নাভিহীন নির্বোধ কোনো প্রথম রমণীর শরীরে প্রোথিত ছিল, যে জানতো না সে কি করেছে অথবা কি পরিমাণ বিভীষিকা আমাদের মূল্য হিসাবে দিতে হয়েছে তার করুণ যৌনসঙ্গমের জন্য, যা নিশ্চিতভাবেই তাকে সামান্যতম তৃপ্তি দিতে পারেনি’।

মায়ের কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে যায়, আর দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা অ্যালেন আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

মোটরসাইকেলে কথোপকথন:
পরদিন সকালে, প্রায় এগারোটার সময়, লুক্সেমবার্গ গার্ডেনের কাছে মিউজিয়ামের সামনে অ্যালেনের দেখা করার কথা ছিল তার বন্ধু রামোন আর কালিবানের সাথে। তার স্টুডিও ছেড়ে বের হবার আগে সে তার ছবিতে থাকা মাকে বিদায় জানাতে ফিরে আসে। এরপর সে রাস্তায় নেমে আসে, ও তার মোটরসাইকেলটির দিকে এগিয়ে যায়, তার নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সামান্য দূরে সেটি পার্ক করা ছিল।

মোটরবাইকে ওঠার পরেই তার একটি অস্পষ্ট অনুভূতি হয়, একটি শরীর তার পিঠের উপর হেলান দিয়ে আছে। যেন ম্যাডেলাইন আছে তার সাথে, তাকে হালকা ভাবে স্পর্শ করছে। এই বিভ্রমটি তাকে নাড়া দেয়: মনে হয় যেন প্রেমিকার প্রতি তার অনুভূত ভালোবাসা সেটি প্রকাশ করছে। সে ইঞ্জিন চালু করে।

তারপর সে তার পেছনে একটি কণ্ঠস্বর শোনে: ‘আমি আরো কিছু কথা বলতে চাই’।

না, ম্যাডেলাইন না, সে তার মায়ের কণ্ঠস্বর চিনতে পারে।

রাস্তায় ট্রাফিকও বেশ ধীর ছিল, আর সে শুনতে পায়: ‘আমি নিশ্চিত হতে চাই, তোমার আর আমার মধ্যে যেন কোনো সংশয় না থাকে, যেন আমরা পরস্পরকে পুরোপুরিভাবে বুঝতে পারি -’।

তাকে ব্রেক করতে হয়। একজন পথচারী গাড়িগুলোর ফাঁক গলে ঢুকে রাস্তা পার হবার চেষ্টা করছিল, এবং অ্যালেনের দিকে তাকায় ভয় দেখানোর একটি ভঙ্গিতে সে তাকায়।

‘আমি তোমার সাথে খোলামেলাভাবেই কথা বলবো। আমি সবসময়ই অনুভব করেছি, যে মানুষটি আসতে চায়নি এমন কাউকে পৃথিবীকে পাঠানো খুবই জঘন্য একটি কাজ’।

‘আমি জানি’, অ্যালেন বলে।

‘তোমার চারপাশে তাকিয়ে দেখো, যত মানুষ তুমি দেখছো, তারা কেউ এখানে তাদের নিজেদের ইচ্ছায় আসেনি। অবশ্য, আমি যা বললাম সেটি খুবই সাধারণ একটি সত্য এখানে। এতই সাধারণ ও আর এতই মৌলিক যে আমরা এটি দেখা আর শোনা বন্ধ করে দিয়েছি’।

বেশ কয়েক মিনিট সে একটি ট্রাক আর গাড়ির সাথে একটি লেনে অবস্থান করে দুদিক থেকে যেগুলো তাকে চাপ দিচ্ছিল।

‘সবাই মানবাধিকার নিয়ে বকবক করে। কি হাস্যকর! তোমার অস্তিত্ব কোনো অধিকারের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়। এমনকি তোমার জীবন তোমার নিজের পছন্দমত শেষ করতেও তারা তোমাকে কোনো অনুমতি দেয়না, এই সব মানবাধিকারের সমর্থকরা’।

রাস্তার চৌরাস্তায় তখন লাল আলো, সে থামে, রাস্তার দুপাশ থেকেই পথচারীরা বিপরীত সাইডওয়াকের দিকে তাদের যাত্রা শুরু করে।

এবং মা বলতে থাকেন, ‘ওদের সবাইকে দেখো! দেখো! কমপক্ষে অর্ধেক যাদের তুমি দেখছো তারা কুৎসিত। কুৎসিত হওয়াও কি মানবাধিকারের একটি? আর তুমি কি জানো, সারাজীবন ধরে তোমার নিজের সাথে কদর্যতাকে বয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাটা আসলে কেমন? এক মুহূর্তের জন্য কোনো মুক্তি ছাড়া? অথবা তোমার লিঙ্গ? তুমি কখনোই সেটা বেছে নেওনি। অথবা তোমার চোখের রঙ? অথবা পৃথিবীর কোন যুগে তুমি জন্ম নেবে? অথবা তোমার দেশ? অথবা তোমার মা? কোনো কিছুই না, যা কিছু কিনা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একজনের অধিকার থাকতে পারে শুধুমাত্র অর্থহীন বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে, যেগুলোর জন্য কোনো যুদ্ধ করা বা কোনো মহান ঘোষণা লেখার প্রয়োজন পড়ে না’!

আবারো সে চালাতে শুরু করেছে এখন। তার মায়ের কণ্ঠস্বর আরো কোমল হতে শুরু করে।‘তুমি যেমন সেভাবে তুমি এখানে,কারণ আমি ছিলাম দুর্বল। এটাই আমার দোষ, আমাকে ক্ষমা করো’।

অ্যালেন নীরব থাকে, তারপর সে বলে, শান্ত স্বরে, ‘কিসের জন্য তুমি নিজেকে অপরাধী ভাবছো? আমার জন্ম নেয়া ঠেকাতে পারার মত শক্তি না থাকার জন্য? নাকি আমার জীবনের সাথে তোমার জীবনে যুক্ত না করার জন্য, ঘটনাচক্রে যা আসলে খুব বেশী খারাপ ছিল না’?

কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে উত্তর দেয়, ‘হয়তো তুমি ঠিক বলেছো। আমি দ্বিগুণভাবে অপরাধী’।

অ্যালেন বলে, ‘আমার বরং উচিৎ ক্ষমাপ্রার্থনা করা। আমি গরুর মলের মত তোমার জীবনের উপর পড়েছিলাম, আমি তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছি আমেরিকায়’।

‘ক্ষমা চাওয়া বন্ধ করো তোমার। আমার জীবন সম্বন্ধে তুমি কি জানো, আমার ছোট নির্বোধ ছেলেটা, আমি তোমাকে নির্বোধ বলতে পারি? হ্যাঁ, তুমি রাগ করো না। আমার মতে তুমি একটি নির্বোধ। আর তুমি জানো কোথা থেকে তোমার এই নির্বুদ্ধিতা এসেছে? তোমার ভালোত্ব থেকে, তোমার হাস্যকর ভালোমানুষি!’

সে লুক্সেমবার্গ গার্ডেনে পৌছায়। তার বাইকটা পার্ক করে।

‘প্রতিবাদ করোনা, আমাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে দাও’, সে বলে, ‘আমি একজন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী, সেভাবেই তুমি আমাকে তৈরি করেছো, তুমি ও বাবা। আর এভাবে , একজন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী হিসাবে, আমি সুখি, আমি ভালো অনুভব করি যখন আমরা পরস্পরের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করি। তুমি আর আমি। বেশ চমৎকার না, পরস্পরের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা?

এরপর তারা মিউজিয়ামের দিকে হেটে যায়।

(সমাপ্ত)

Advertisements
ক্ষমাপ্রার্থনাকারী: মিলান কুন্দেরা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s