ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ

CYN8ZrzWAAAgdds

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (তৃতীয় পর্ব) 

বিশ্বাসের শক্তি

হ্যারিস: কিছুক্ষণের জন্য তোমার ব্যক্তিগত কাহিনীতে ফিরে আসি – মনে হচ্ছে তোমার ইসলামবাদ ছিল মূলত রাজনৈতিক,  যার জন্ম হয়েছিল বৈধ কোনো অভিযোগ থেকে – মূলত বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক অবিচার – যা তুমি দেখতে শুরু করেছিলে ইসলামের লেন্স দিয়ে। কিন্তু তুমি কিন্তু বলোনি, যেমন করে আল-কায়েদার সদস্যরা বলে থাকে, তুমি ক্ষুদ্ধ হয়েছো আরব উপদ্বীপে মসুলমানদের প্রবিত্র ভূমির নিকটে অবিশ্বাসীদের অপবিত্র পা পড়ার কারণে। কি পরিমান মাত্রায় তাহলে ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো – শহীদ হবার আকাঙ্খা, যেমন – তোমাকে ও তোমার সহযোগী ইসলামবাদীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল? আর যদি এমন কোনো চিন্তা কাজ না করে থাকে, তুমি কি বিপ্লবী ইসলামী বাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একটি জিহাদবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্যগুলো নিয়ে আলোচনা করতে  পারবে?

নাওয়াজ: হ্যা, নিশ্চয়ই, আসলেই কিছু মিল আর অমিল আছে ইসলামবাদ আর জিহাদীবাদের মধ্যে। আমাদের তা নিয়ে অবাক হওয়া উচিৎ না – একইভাবে বিষয়টি প্রযোজ্য, যেমন আমরা যখন কমিউনিজম নিয়ে কথা বলি। সোস্যালিস্টরা এক প্রান্তে আর কমিউনিষ্টরা অন্য প্রান্তে, তাদের কেউ জঙ্গী, আর কেউ জঙ্গী না। ইসলামবাদের ক্ষেত্রেও ব্যপারটা একই রকম।

তবে, আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে ইসলামবাদী ও জিহাদীবাদীদের উদ্বুদ্ধ করে আদর্শগত মতবাদ, যা তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়, প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে এমন কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যে সদস্য সংগ্রহ করে, যে কল্পিত কোনো অভিযোগ সংক্রান্ত সংক্ষুদ্ধ অনুভূতি আর একটি আত্মপরিচয়ের সংকটকে ব্যবহার করে তার উদ্দেশ্য সফল করার জন্য। বাস্তবিকভাবে, আমি বিশ্বাস করি যে কোনো ধরনের আদর্শগত যুদ্ধে সদস্য সংগ্রহের চারটি মূল উপাদান আছে, কোনো প্রকৃত বা কল্পিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ক্ষোভের কাহিনী, আত্মপরিচয়ের সংকট, প্রভাবিত করতে পারে এমন কেউ যারা সদস্য সংগ্রহ করে, এবং একটি আদর্শগত মতবাদ। মতবাদের ‘কাহিনী’ হচ্ছে এর প্রচারণা।

হিজব উত-তাহরির এবং আল কায়েদার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে অনেকটা কমিউনিজমের মধ্যে বিদ্যমান বিতর্কের মত, সেটি হচ্ছে পরিবর্তন কি সরাসরি কাজ বা সংঘর্ষের মাধ্যমে আসবে কিনা।

আপনি যদি কমিউনিজমের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদিতার তত্ত্বটি দেখেন – এবং আমাদের কি উচিৎ হবে অপেক্ষা করা এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে তার পথ খুজে নিতে সুযোগ দেয়া নাকি হস্তক্ষেপ করে এর গতিপথকে প্রভাবিত করা। – সেই তত্ত্বে বিশুদ্ধবাদীরা দাবী করবেন আপনার কিছুই করা দরকার নেই, উৎপাদনের উপায়গুলো স্বাভাবিকভাবেই বুর্জোয়াদের হাত থেকে শ্রমিকদের হাতে হস্তান্তরিত হবে, কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হবে অর্থহীন, কারণ ঠিক এভাবেই ইতিহাস কাজ করে। অন্যরা হয়তো বলবেন আমাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিৎ।

তাত্ত্বিক স্তরে এ ধরনের পার্থক্যও বিদ্যমান রাজনৈতিক ইসলামবাদী ( অথবা entryist – এনট্রিইজম হচ্ছে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল যখন কোনো গ্রুপ কোনো রাষ্ট্রের সদস্যদের উৎসাহিত ও সহায়তা করে ‍যুক্ত হবার জন্য অন্য, সাধারণত আরো বড় কোনো সংস্থার সাথে প্রভাব সম্প্রসারণ অথবা তাদের মতবাদ প্রচার করার প্রচেষ্টা হিসাবে), বৈপ্লবিক ইসলামবাদী এবং জিহাদীবাদীদের মধ্যে। অবশ্যই জিহাদীবাদীরা বিশ্বাস করে সরাসরি আক্রমনে: এই বিষয়ে তাদের পুরো একটি তত্ত্বও আছে। আমি যুক্তি দেবো, আসলে, আবু বাকর আল-বাগদাদীর নেতৃত্বে তথাকথিত ইসলামি স্টেট এর উত্থান কিছুটা হলেও ওসামা বিন লাদেন এর কৌশল যে সঠিক ছিল তা প্রমাণ করে, বিশেষ করে তার বিশ্বাস যে যুদ্ধের মাধ্যমে যদি পশ্চিমা শক্তিকে হস্তক্ষেপে ক্লান্ত করা যেতে পারে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হবে, এবং পশ্চিমা শক্তি বাধ্য হবে আরব স্বৈরাচারী শাসকদের প্রতি সমর্থন সরিয়ে নিতে, যা তাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলবে। এবং ধ্বংসস্তুপে ছাইয়ে গড়ে উঠবে একটি ইসলামী রাষ্ট্র। বিন লাদেন এটি বলেছিল প্রায় ১১ বছর আগে এবং আরব অভ্যুত্থানের ফলাফল কি ঘটেছে সেটি খুবই রহস্যময়।

হ্যারিস : আমি আসলে যা জানার চেষ্টা করছি সেটি হচ্ছে ধর্মীয় পার্থক্যটি, আমি মনে করছি যা আমি শনাক্ত করেছি; তুমি যে ধরনের ইসলামবাদী ছিলে – যুক্তরাজ্যে সহিংস বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হবার কারণে রাজনৈতিক ইসলামের একজন উগ্র সমর্থকে রুপান্তরিত হয়েছিল – এবং এমন কেউ, যার সেই ধরনের কোনো অভিযোগ বা রাগ নেই কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামিক স্টেট এর মত কোনো গ্রুপের জন্য সে যুদ্ধ করবে কারণ সে সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে সে ইসলামের শত্রুদের বা শয়তানের বিরুদ্ধে কোনো মহাজাগতিক যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, হয় সে একটি সত্যিকারের ধর্মবিশ্বাস প্রচার করবে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত অবধি অথবা তা করতে গিয়ে সে শহীদ হবে। তুমি কি তোমার নিজের শহীদ হবার সম্ভাবনা নিয়ে ভেবেছিলে? অথবা তোমার ইসলামবাদ সাধারণ ক্ষোভ প্রকাশের চেয়ে বরং বেশী সংশ্লিষ্ট রাজনীতি নিয়ে?

নাওয়াজ: আমি মনে করি, আমি যা বলার চেষ্টা করছি তা হলো যদিও পদ্ধতিগত একটি পার্থক্য আছে, সব ইসলামবাদীরা বিশ্বাস করে তারা একটি মহাজাগতিক সংগ্রামে লিপ্ত। কিন্তু এই সংগ্রামই শুধুমাত্র একমাত্র কারণ নয় তাদের সেই কাজটি করার জন্য।

হ্যারিস: হয়তো আমি আমার সমালোচকদের বেশী স্বীকৃতি দিচ্ছি এই বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, কিন্তু আরো একবার তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য বাড়তি চেষ্টা করি, আমি কল্পনা করছি ( যেমন বহু মানুষেই দাবী করেন এমন কিছুই এক্ষেত্রে) অতিমাত্রায় নিবেদিত ইসলামবাদীদের বেশ উল্লেখযোগ্য শতাংশ বিশুদ্ধভাবে রাজনৈতিক, এর মানে যেখানে তারা পার্থিব কোনো কিছু নিয়ে প্ররোচিত নয় এবং তারা শুধুমাত্র ইসলামকে ব্যবহার করছেন একটি ব্যানার বা পতাকা হিসাবে তাদের সেই উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে। এমন কি ইসলামবাদীরা আছেন না যারা শহীদ হবার আধ্যাত্মিক তত্ত্বে  বিশ্বাস করেনা?

নাওয়াজ: আমরা তাদের শুধুমাত্র বলবো তারা আসলেই আন্তরিক নয়। আন্তরিক নয় এমন মানুষ বহু আন্দোলনে  ও যে কোনো আদর্শের পতাকাতলে থাকতে পারে। কিন্তু যদি আমরা লক্ষ্য করি ইসলামবাদীরা আসলে কি সমর্থন করছে, আমাদের অবশ্যই সেই সংখ্যালঘুদের বাদ দিতে হবে, যারা মাকিয়াভেলীয় কপটতাপূর্ণ এবং তারা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে কারণ তারা সেখান থেকে অন্য কিছু চান।

কিন্তু তুমি যদি যারা আন্তরিক তাদের লক্ষ্য করো, এবং আমিও সৎ ছিলাম যা আমি একসময় বিশ্বাস করতাম – তাহলে তুমি দেখবে যে তারা শহীদ হবার জন্য প্রস্তুত। মিসরে আমাকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং আমি ভেবেছি আমি আমার আদর্শের জন্য মারা যাবো। সেই অর্থে সব আন্তরিক ইসলামবাদীরা বিশ্বাস করে তারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির মহাজাগতিক সংগ্রামে লিপ্ত। তারা শুভ শক্তিকে চিহ্নিত করে পবিত্র সংগ্রাম হিসাবে। কিন্তু আবারও এটাই একমাত্র জিনিস নয় যা তারা বিশ্বাস করে।

যা তারা অবশ্যই শহীদ হবার তত্ত্বে বিশ্বাস করে, তারা এছাড়াও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যে অশুভ শক্তি সেটিও বিশ্বাস করে। একইভাবে তারা বিশ্বাস করে তারা আরক স্বৈরাচারীদের অধীনে বসবাস করছে। এখানে ক্ষোভ আর অভিযোগের কাহিনী তার প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, যেমনটি আমি বলেছিলাম, সংগঠনে যোগদান বা যোগদানের জন্য কর্মী হিসাবে সংগৃহীত হবার আগের মুহূর্ত অবধি। যখন তাদের কর্মী হিসাবে সংগ্রহ করা হয় তাদের সেই ক্ষোভের কাহিনী জীবাশ্মভূত হয় আদর্শগত মতবাদের মাধ্যমে, সেটি এরপর সেই বাহক হিসাবে কাজ করে যার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রকাশ করে। সুতরাং একটি একটিমাত্র বিষয়ের উপর নির্ভর শীল নয়। তবে অবশ্যই মহাজাগতিক যুদ্ধ সব ইসলামবাদীদের জন্য জন্য একটি চিরন্তন উপাদান।

আরেকটি পার্থক্য জিহাদীবাদী আর ইসলামবাদীদের মধ্যে যে ইসলামবাদীরা তাদের নিজের তত্ত্ব অনুযায়ী শহীদ হবার কারণ অনুসন্ধান করে। সুতরাং হিজব ‍উৎ-তাহরিরে থাকার সময় আমাদের শেখানো হয়েছিল

শহীদ হবার সৌভাগ্য অর্জন করার সম্ভব কোনো স্বৈরাচারী নিপীড়ক শাসককে জবাবদিহি করানোর মাধ্যমে অথবা আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে। আমাদের শেখানো হয়েছে যদি শাসক আপনাকে হত্যা করেন যখন আপনি সেনা অফিসারদের দলে ভেড়াতে চেষ্টা করছেন, আপনি তাহলে শহীদ হবেন, এবং আপনার সেই হাসিমূখে গ্রহন করা উচিৎ। কিন্তু আমাদের এটাও শেখানো হয়েছে আপনি অবশ্যই শহীদ হবেন না যদি আমি কোনো বাজারের মধ্যে নিজেকে বোমা দিয়ে বিস্ফোরিত করেন, কারণ আপনি বেসামরিক ব্যক্তি ও অন্য মুসলিমদের হত্যা করছেন।

এখন, হিজব উত-তাহরির যখন বিদ্যমান কোনো সেনাবাহিনী দিয়ে ক্যু করার জন্য প্ররোচিত করছে, জিহাদীরা তখন সোজাসাপটা বলছে, কেন আমরা নিজেদেরই একটি সেনাবাহিনী তৈরী করছি না? এই সব লোকদের নিয়ে সময় নষ্ট করে কি লাভ, তারাতো এমনিতেই কাফের? জিহাদবাদীদের জন্য, তাদের নিজেদের সেনাদলের জন্য যুদ্ধ করার সময় মারা যাওয়া হচ্ছে শহীদ হওয়া। এটাই পার্থক্য, যতক্ষণ কিনা তুমি মারা যাচ্ছো, তোমার নিজের বিশ্বাস মতবাদ অনুযায়ী, আপনি সেই মতবাদে বিশ্বাসী গ্রুপের কাছে শহীদ।

হ্যারিস – সুতরাং তুমি জিহাদবাদী আর অন্য ইসলামবাদীদের ধমীয় বিশ্বাসের মাত্রা দিয়ে পার্থক্য করবে না – যেমন, স্বর্গ আছে কিনা অথবা শহীদ তত্ত্বের বাস্তবতা নিয়ে তাদের নিশ্চয়তার মাত্রা? পার্থক্যটি তাহলে শুধুমাত্র পদ্ধতিগত?

নাওয়াজ: হ্যা, কিছু জিহাদবাদী ধার্মিক নয়, যদিও তাদের দৃঢ় ধর্মবিশ্বাস আছে কিনা সেই অর্থে ভাবা হয়। তারা স্পষ্টতই সহিংসতা আর সরাসরি আক্রমন পছন্দ করে, সুতরাং সেই সব গ্রুপের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। কিন্তু কিছু ইসলামবাদীরা অবিশ্বাস্যভাবে ধার্মিক এবং আন্তরিকভাবেই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের পবিত্রতায় বিশ্বাস করে। সুতরাং ধর্মবিশ্বাসের উপস্থিতি অথবা এর অনুপস্থিতি, ধর্মীয় আন্তরিকতা ও এর অনুপস্থিতি, বিভিন্ন গ্রুপগুলোর মধ্যে, কোনো একটি গ্রুপের মধ্যেও নানা মাত্রায় দেখা যায়।

হ্যারিস : এই সব তথ্যই বিস্ময়কর – এবং আবারো সুস্পষ্টভাবে চিন্তিত করাটা অত্যন্ত সহায়ক। কিন্তু আমাদের আরো একটি বিষয় এখানে স্পষ্ট করা উচিৎ, কারণ ধার্মিকতার ও এর অনুপস্থিতির মধ্যবর্তী বিভাজন রেখাটি শনাক্ত করা সম্ভব না হতে পারে, যেমন করে বহু পাঠক আশা করেন। যেমন, প্রায়শই প্রস্তাব করা হয় যে ৯/১১ হাইজ্যাকাররা সত্যিকারের বিশ্বাসী হতে পারেনা, কারণ তারা নগ্ন বক্ষা নারীদের দেখার জন্য স্ট্রিপ ক্লাবে গিয়েছিল তাদের আত্মঘাতী আক্রমন চালানোর আগে। তবে, আমার জন্য, এখানে কোনো প্রশ্ন নেই যে এই মানুষগুলো বিশ্বাস করতো যে তারা স্বর্গের দিকে যাচ্ছে। আমি মনে করি বহু মানুষই সংশয়াচ্ছন্ন বহির্মূখি ধর্ম পালন আর বিশ্বাসের মধ্যের সম্পর্কটি নিয়ে।

নাওয়াজ:  ঠিক বলেছো।

হ্যারিস:  ৯/১১ হাইজ্যাকাররা আত্মহত্যার প্রবণতাপূর্ণ হতাশাগ্রস্থ লোক ছিল না যারা নগ্ন নারী দেখতে ক্লাবে গিয়েছিল, তার তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাজার হাজার নিরপরাধ আগান্তুককে হত্যা করে তারা আত্মঘাতী হবে। তারা কোনো ক্লাবে যাক কিংবা না যাক, বা তাদের দেখলে ধার্মিক মনে হোক কিংবা না হোক, এই মানুষগুলো ছিল সত্যিকারের বিশ্বাসী।

নাওয়াজ: হ্যা, স্ট্রিপ ক্লাবের এই বিষয়টি আসলে একটি রেড হেরিং, মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরানোর প্রচেষ্টা, কারণ এমনকি প্রথাগত জিহাদবাদী ভাবনায়, যখন আপনি ভাববেন আমি যুদ্ধ করছেন, আপনার অনুমতি আছে শত্রুকে ছলনা করার। সুতরাং সেটি গুপ্তচরবৃত্তি হোক অথবা ছদ্মবেশে আত্মগোপন হোক ও যুদ্ধের প্রচার, সাধারণ প্রথাগত চিন্তায় – আধুনিক জিহাদীবাদীরা সেটি পুনরুজ্জীবিত করেছে – যুদ্ধের সময় এমন কিছু করার অনুমতি আছে।

৯/১১ হাইজ্যাকারদের স্ট্রিপ ক্লাবে দেখা গেছে, যদিও এটি প্রাসঙ্গিক এদের বিরুদ্ধে প্রচারণার ক্ষেত্রে। বেশীরভাগ রক্ষণশীল পশ্চিমা মুসলিম ( যারা মনে করেন তারা তাদের নিজেদের দেশের সাথে যুদ্ধরত ) এই ধরনের আচরণকে অধার্মিকতার পরিচয় হিসাবে চিহ্নিত করবেন। কিন্তু তুমি পুরোপুরিভাবে ঠিক যখন বলছো, এটি হাইজ্যাকারদের ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা বিশ্বাসহীনতা কোনোটারই পরিচায়ক না। কোনো সম্ভাব্য জিহাদবাদীর ধার্মিকতা ও যৌনতা নিয়ে এই সংশয় এখন পৃথিবীবাসীর কাছে আরো বেশী স্পষ্ট যখন তারা বোকো হারাম আর ইসলামিক স্টেট এর নারীদের দাস হিসাবে বন্দী রাখা ও গণ ধর্ষনের ঘটনাটি যখন দেখছে।

আবশ্যিকভাবেই সঠিক না এমন কিছু পূর্বধারণা করা যে, মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতারা কোনো না কোনো ভাবে কম ধার্মিক, যেমন ধরুন, ইসলামিক স্টেট এর নেতাদের চেয়ে। মাত্রাহীন সহিংসকতা আবশ্যিকভাবে বেশী মাত্রায় ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে না। প্রতিটি গ্রুপই গভীরভাবে বিশ্বাস করে সমাজে ইসলামবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের বেছে নেয়া পথের উপর। এবং উভয় গ্রুপই বিপদজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবেলা করে তাদের সেই লক্ষ্য অর্জনে। কিন্তু তাদের পদ্ধতিটি ভিন্ন এবং তারা পরস্পরকে ঘৃণাও করে খুব বেশী মাত্রায়। ঠিক যেমন  করে ট্রটস্কি আর স্ট্যালিন একসময় করেছিল। তারা বোঝাতে চাননি যে একজন অন্যজনের চেয়ে কম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদের লক্ষ্য অর্জনে, তার মানে এই না যে কেউ কারো চেয়ে কম কমিউনিস্ট ছিল। তারা তাদের আদর্শেরই মধ্যে গোষ্ঠীগত দ্বন্দে জড়িয়ে পড়িয়েছিল। কিছু মানুষ ইসলামবাদের মধ্যে এই সব দ্বন্দ সম্বন্ধে ভুল বোঝেন। তার দাবী করেন, ইসলামবাদ বলতে তাহলে আপনি কি বোঝাচ্ছেন? এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। মুসলিম ব্রাদারহুড ইসলামিক স্টেটদের মত গ্রুপদের ঘৃণা করে এবং ইসলামিক স্টেট মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যদের হত্যা করতে পারে। আমি তাদের সবসময় মনে করিয়ে দেই, এটা এমন কিছু বলা যে কমিউনিজম বলে কিছু নেই শুধুমাত্র  এর কারণ স্ট্যালিন ট্রটস্কিকে হত্যা করেছে বলে । খুব অদ্ভুত একটি উপসংহার এমন কোনো যুক্তি থেকে যা দাবী করা যেতে পারে। অবশ্যই একটা জিনিস আছে যাকে বলা হয় ইসলামবাদ।  এটি একটি আদর্শ। বহু মানুষই সেই ইসলামবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, কিন্তু সেটি করার জন্য তাদের বেছে নেয়া পথটি ভিন্ন।

ধর্মীয় বিশ্বাসের মাত্রাগুলো আমাদের সাহায্য করবে না জিহাদবাদী, বিপ্লবী ইসলামবাদী, রাজনৈতিক ইসলামবাদী আর ইসলামবাদী নয় এমন মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য করতে। সাইদ কুতব এর উদহারণ নেয়া যাক। কুতব মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন সদস্য, এবং এখন তিনি পরিচিত সেই তত্ত্বের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা জনক যা একসময় রুপ নিয়ে আধুনিক জিহাদবাদের। মিসরীয় সরকার তাকে হত্যা করেছিল একটি বই লেখার জন্য, সেটি তিনি লিখেছিলেন সেই জেলখানায় বসে, যে জেলখানা আমি বহু বছর পরে বন্দী হিসাবে ছিলাম। খুব বেশী মাত্রায় ধর্মীয় বিশ্বাস থাকা উচিৎ শুধুমাত্র একটি বই লেখার জন্য মৃত্যুবরণ করতে, এবং ব্রাদারহুডের জন্য সেটাই হচ্ছে শহীদত্ব। একইভাবে হিজব উত-তাহরির তাদের সদস্যদের মৃত্যুকে বিশেষভাবে মহিমান্বিত করে রাষ্ট্রের হাতে মৃত্যু বরণ করার জন্য, কিন্তু আত্মঘাতীদের মৃত্যুর জন্য না। তারা তাদের সদস্যদের তৈরী করে কোনো রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য মৃত্যুবরণ করতে  এবং সবাই সেই একই গল্প বলে শহীদ হওয়া ও স্বর্গের চিরন্তন আনন্দ নিয়ে, ঠিক যেমন করে জিহাদবাদীরাও তা বলে।

হ্যারিস : তুমি  এই মাত্র যা কিছু বললে থেকে আমি শুধুমাত্র যে উপসংহারের আসতে পারি তা হলে বহু মানুষ যা মনে করে থাকে, আদর্শের সমস্যাটি আরো অনেক বেশী খারাপ।

নাওয়াজ:  অবশ্যই, কিন্তু পুনরাবৃত্তি যদি করি, আদর্শ শুধুমাত্র চারটি শর্তের একটি, যদিও প্রায়শই যা উপেক্ষিত।

হ্যারিস:  আমিও সার্বিকভাবে সহমত – যদিও অবশ্যই অনেক ক্ষেত্রে, যেখানে মানুষের কোনো বোধগম্য ক্ষোভ নেই শুধুমাত্র আদর্শগত ছাড়া এবং তারা উগ্রবাদী হয়ে ওঠে নিজের বিশ্বাসের জন্য সবকিছু বিসর্জন দেবার জন্য। আমি ভাবছি সেই সব পশ্চিমা নাগরিকরা যারা আল-কায়েদা আর ইসলামিক স্টেটদের মত গ্রুপে যোগ দিয়েছে। যেমন, মাঝে মাঝে ধর্মীয় আদর্শকে আপাতদষ্টিতে মনে হয় শুধুমাত্র আবশ্যিকই না বরং যথেষ্ঠ কারণ কোনো একটি মানুষকে এমন কিছু করার জণ্য প্ররোচিত করতে।

তুমি হয়তো বলবে যে আত্মপরিচয়ের সংকটও এর সাথে জড়িত, কিন্তু কোনো না কোনো সময়ে সবারই আত্মপরিচয়ের সংকট থাকে। বাস্তবিকভাবে, কেউ বলতে পারে পুরো জীবনটাই একটি দীর্ঘ আত্মপরিচয়ের সংকট। সত্যটি হচ্ছে কিছু মানুষ আপাতদৃষ্টিতে প্রায় পুরোপুরিভাবে প্ররোচিত হয় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা। সেই বিশ্বাসের অনুপস্থিতিতে, তাদের এই ধরনের আচরণের কোনো অর্থ হয়না। কিন্তু সেগুলো সহ, বিষয়টি কেবল বোধগম্য হয় ক্রটিহীনভাবে, এমনকি যৌক্তিক।

তুমি যেমন জানো, ইসলামী আদর্শগত মতবাদ আর মুসলিম অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে কথোপকথনের কন্ঠরুদ্ধ করে রেখেছে পলিটিকাল কারেক্টনেস বা রাজনৈতিক যথাযথতা। পশ্চিমে এখন, সমর্থনবাদ আর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার বিশাল শিল্প গড়ে উড়েছে, যা পরিকল্পিত, দেখে মনে পারে, মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য যেন তার আমরা যে সব সত্য নিয়ে কথা বলছি সেই সব বিষয় নিয়ে ভাবার প্রয়োজন না হয়। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটিস  আর সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ পূর্ণ বিদ্বাণ আর ছদ্মবিদ্বানদের দিয়ে, যাদের মনে করা হয় সন্ত্রাসবাদ, ধর্ম আর ইসলামী আইন, নৃতত্ত্ববিদ্যা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ- যারা দাবী করেন মুসলিম উগ্রবাদ যেমন দেখে মনে হচ্ছে সেটি কখনোই এর প্রকৃত রুপ নয়। এই বিশেষজ্ঞরা দাবী করেন আমরা ইসলামবাদ ও জিহাদীবাদের তাদের কথা দিয়ে বিচার করতে পারবো না, এবং ঈশ্বর, স্বর্গ, শহীদত্ব এবং ধর্মত্যাগ করার পাপাচার সম্বন্ধে তারা যা ঘোষণা দিচ্ছে, তার সাথে তাদের সত্যিকার উদ্দেশ্যের কোনো যোগসূত্রতা নেই।

যখন কেউ জিজ্ঞাসা করে ইসলামবাদী আর জিহাদীবাদীরে প্ররোচনাদায়ী এবং উদ্দেশ্য আসলে কি, তাকে উদারনৈতিকতাবাদের সুনামীর মুখে পড়তে হয়। বলাবাহুল্য এর ‍উত্তর হিসাবে দাবী করা হবে পশ্চিম হচ্ছে মুসলিম সমাজগুলোয় সব নৈরাজ্যের জন্য দায়ী। সর্বোপরি, আমরা কি অনুভব করবো যদি বাইরের কোনো শক্তি এবং তাদের মানচিত্রকররা আমাদের দেশকে বিভাজিত করে আর তেল চুরি করে? এই সব বঞ্চিত মানুষরা ঠিক সেটাই চায় যা পৃথিবীর বাকী সবাইও তাদের জীবনে চায়। তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা চায়, তারা তাদের সন্তানদের জন্য ভালো স্কুল চায়। তারা স্বাধীন হতে চায় বৈশ্বিক সভ্য সমাজে, বাকী সবাই যেভাবে সুখ আর স্বাচ্ছন্দে থাকতে চায় তার সাথে পূর্ণ সঙ্গতি সহ তারাও বাচতে চায়। লিবারেলরা কল্পনা করেন যে জিহাদীবাদী ও ইসলামবাদীরা  সেভাবেই আচরণ করছে অন্যরাও ঠিক যেভাবে আচরণ করতো যদি তাদেরও পশ্চিমের সাথে দূর্ভাগ্যজনক সাক্ষাৎকারের কোনো স্মৃতি থাকতো। তারা পুরোপুরিভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভূমিকাটি অস্বীকার করে ইসলামিক স্টেটদের মত গ্রুপগুলোকে অনুপ্রাণিত করার জন্য  – এমন একটি মাত্রা অবধি যে একজন জিহাদীবাদীর জন্যেও তা কঠিন হয়ে যায় প্রমাণ করা তারা ধর্মীয় কারণে যে কোনো কিছু করছে।

আপাতদৃষ্টিতে, এটি যথেষ্ঠ না যে কোনো শিক্ষিত মানুষের জন্য যার কিনা অর্থনৈতিক সুযোগ আছে , সে নিজেকে ইসলামের সবচেয়ে উগ্রতম আর কঠোরতম সংস্করণের জন্য আত্ননিবেদন করে, এই কাজ করার জন্য তার ধর্মীয় কারণ প্রায় বমি করার মত উগরে দেয় এবং এমনকি সেই অবধি সে যায় যে তার শহীদ হবার নিশ্চয়তা সে স্বীকার করে ভিডিওতে জনাকীর্ণ এলাকায় নিজেকে বিস্ফোরিত করার আগে। ধর্মীয় উগ্রতার এই সব প্রদর্শন কোনো না কোনো ভাবে বিবেচনা করা হয় মৌখিকভাবে যথেষ্ঠ না প্রমাণ করা যে সে সত্যি বিশ্বাস করে যা সে বলছে সে বিশ্বাস করে। অবশ্যই যদি সে এইসব কাজ করতো কারণ সে হতাশাগ্রস্থ এবং  মানবতার জন্য তার ঘৃণা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি না থাকে অথবা সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নিজেকে বিসর্জন দেবার জন্য দেশকে অত্যাচার মূক্ত করতে, তাহলে এই সব মনোস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যেভাবে উচ্চারণ করা হচ্ছে সেভাবেই গ্রহন করার হতো। এই দুটি ভিন্ন মাণদণ্ড প্রতিবারই সুযোগ করে দেয় ধর্মকে তার দায় এড়াতে। পুরো খেলাটাই আগে থেকে সাজানো কারচুপিতে।

আমি জানি না তুমি পরিচিত কিনা আমার মত এই ধরনের লিবারেল ধর্মীয় সমর্থকদের সাথে। এদের কেউ সাংবাদিক, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িত, অল্প কিছু মুসলিম – তবে সাধারণ চিত্রটি হচ্ছে সাদা, লিবারেল, অমুসলিম যার ইসলামী মতবাদের কোনো সমালোচনাকে বর্ণবাদী গোড়ামী প্রসূত কুসংস্কারের সাথে সমতুল্য করে ভাবে – ইসলামোফোবিয়া – বা ইসলামভীতি এমন কি বর্ণ বিদ্বেষও।  এই মানুষগুলো যুক্তরাষ্ট্রে খুবই পরিচিত এবং তাদের প্রভাব যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে বিব্রতকর, তেমনি নৈতিকতার স্তরে সমস্যাপূর্ণ। যদিও তারা  প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে হুবুহু ঠিক একই ধরনের শব্দ করে, তবে তারা তীব্র ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে মুসলিম সহিংসার মধ্যে কোনো সংযোগকে অস্বীকার করে। পুরো সংবাদপত্র আর ওয়েবসাইট এখন বাস্তবিকভাবেই গণ্য করা যেতে পারে ইসলামবাদের সমর্থনকারী হিসাবে কাজ করছে। দ্য গার্ডিয়ান, সালোন, দ্য নেশন, অ্যালার্ট নেট ইত্যাদি। এটি আসলেই আমরা যে ধরনের কথোপকথন করছি তেমন কোনো প্রকাশ কথোপকথনকে খুব বেশী কঠিন করে ফেলেছে।

(চলবে)

Advertisements
ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s