ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ

CYN8ZrzWAAAgdds

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (দ্বিতীয় পর্ব) 

সমস্যার ব্যাপ্তি

 হ্যারিস: তোমার এই প্রচেষ্টায়, তুমি ‘বিপ্লবী ইসলামবাদী’ (revolutionary Islamists) এবং ‘জিহাদবাদী’ (jihadists), এই দুটির মধ্যে একটি পার্থক্য প্রস্তাব করেছো, আমি মনে করি তোমার উচিৎ হবে শব্দগুলোকে সংজ্ঞায়িত  ও ব্যাখ্যা করা। আমি আরো জানতে চাই মুসলিম সমাজগুলোয় মতামতগুলো কিভাবে বিভক্ত সেই বিষয়ে তুমি কি ভাবো। আমি বেশ কয়েকটি এককেন্দ্রিক বৃত্তের কথা ভাবতে পারি। কেন্দ্রে আছে ইসলামিক স্টেট *, আল-কায়েদা, আল শেহাব, বোকো হারাম এর মত গ্রুপগুলো। তাদের সদস্যদের আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে সব অবিশ্বাসী আর ধর্মত্যাগীকে হত্যা করার তীব্র কামনাসহ। তাদের অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় শহীদ হবার জন্য বিশেষভাবে উদগ্রীব। আমরা অধিকাংশরাই এই সব মানুষগুলোকে চিহ্নিত করি ‘জিহাদবাদী’ হিসাবে। তারপর আরো বড় একটি ইসলামবাদীদের বৃত্ত, যারা সম্ভবত জিহাদ ও ইসলামবাদের সমর্থক – আর্থিকভাবে, নৈতিকভাবে অথবা দর্শনে – কিন্তু তারা সন্ত্রাস করে তাদের হাত নোংরা করতে চান না। পরিশেষে, আমরা আশা করতে পারি,  তথাকথিত মডারেট বা মধ্যমপন্থী মুসলিমদের আরো অনেক বড় একটি বৃত্ত , তারা তাদের নিজেকে সেভাবে চিহ্নিত করুক কিংবা না করুক, যারা আধুনিক যুগের মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচতে চান। যদিও তারা পুরোপুরি সেক্যুলার নয়, তারা মনে করে না যে ইসলামিক স্টেটদের মত কোনো গ্রুপ তাদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে না। হয়তো সত্যিকারভাবে বহু মিলিয়ন সেক্যুলার মুসলিম আছে, যাদের আসলেই কোনো কন্ঠস্বর নেই। ভাবছি আমার এই শ্রেণীবিভাগগুলো নিয়ে আমি যা বুঝি নিয়ে তুমি কি সেগুলো সঠিক বলে মনে করো কিনা, এবং যদি তাই হয়, তাহলে পৃথিবীর ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমদের কত শতাংশ করে ‍তুমি এই প্রত্যেকটি শ্রেণীতে রাখবে।

 নাওয়াজ: অবশ্যই, পরীক্ষা কিংবা গবেষণা নির্ভর কোনো উত্তর হবে না এটি, কিন্তু তোমাকে আমার অনুমান নির্ভর কিছু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি। তোমার এককেন্দ্রিক বৃত্তগুলোর দৃশ্যকল্পটি অব্যহত রাখছি, কেন্দ্রে, যেমন তুমি সঠিকভাবে বলেছো, আছে ‘জিহাদবাদীরা’,তাদের পরে আমরা দেখছি অপেক্ষাকৃত বড় গ্রুপ যারা ‘ইসলামবাদী’। আমাদের পাঠকদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের সন্দেহ না থাকে, যখন আমি বলছি ‘ইসলামবাদ’, আমি বোঝাতে চাইছি ইসলামের যে কোনো ব্যাখ্যাকেই কোনো সমাজের উপর চাপিয়ে দেবার আকাঙ্খা, যখন আমি ‘জিহাদবাদ’ বলছি আমি বোঝাতে চাইছি ইসলামবাদকে ছড়িয়ে দেবার জন্য শক্তির ব্যবহার।
ইসলামবাদ ও জিহাদীবাদ হচ্ছে ইসলাম ও জিহাদের রাজনৈতিক সচেতনতাপুষ্ট সাম্প্রতিক পাঠ। তারা নিজেরা ইসলাম ও জিহাদ কোনোটাই না। যেমন আমি বলেছিলাম, আর যে কোনো ধর্মের মতই ইসলামও প্রথাগত ঐতিহ্যবাহী একটি ধর্ম,  নানা সম্প্রদায়,উপদল, গোষ্ঠী এবং বিকল্প নানা পঠনে পূর্ণ। কিন্তু ইসলামবাদ হচ্ছে সমাজের উপর সেই সব পঠনের যে কোনো একটিকে চাপিয়ে দেবার আকাঙ্খা। সাধারণভাবে আইন হিসাবে শারিয়ার (shari’ah) একটি সংস্করণকে আরোপ করার বাসনা হিসাবে এটি প্রকাশিত হয়। রাজনৈতিক ইসলামবাদীরা তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গীকে সমাজের উপর আরোপ করার চেষ্টা করে ব্যালট বাক্স ব্যবহার করে, তারা অপেক্ষা করে যতক্ষণ না পর্যন্ত সামাজিক সব প্রতিষ্ঠানগুলোয় তারা ভিতর থকে অনুপ্রবেশ করতে পারে। বিপ্লবী ইসলামবাদীরা সমাজকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে বাইরে থেকে এক ধাক্কায়ে। জঙ্গী ইসলামবাদীরা জিহাদবাদী।
সত্য, জিহাদ সংক্রান্ত কোনো প্রথাগত পাঠ স্বশস্ত্র সংগ্রামের ধারণাটিকে উপেক্ষা করতে পারেনা, এবং এটি অবিশ্বাস্যরকম সরল দাবী করা যে মুসলিমরা জিহাদ মানে শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ভিতরের – অন্তরের সংগ্রামকে বোঝায়। তবে যে কোনো বা সব সশস্ত্র সংগ্রামগুলো, যে কোনো অথবা কোনো রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতায় হতে পারে প্রতিরক্ষামূলক অথবা আক্রমনাত্মক, ন্যায় এবং অন্যায়, প্রতিক্রয়ামূলক অথবা পূর্ব পরিকল্পিত এবং সন্ত্রাসবাদী অথবা প্রথাগতভাবে সামরিক। জিহাদীবাদ আমি যেভাবে ব্যবহার করছি শুধুমাত্র প্রতিনিধিত্ব করছে একটি বিশেষ স্বশস্ত্র সংগ্রাম, উপরের যে শ্রেণীতেই এটি সামঞ্জষ্যপূর্ণ হোক না কেন – যার উদ্দেশ্য ইসলামবাদের প্রসার।
এগুলো শুধুমাত্র আমার সংজ্ঞাগুলো, এই ক্ষেত্রে কাজ করা আমার জীবনে আমি এখনও এমন কোনো সংজ্ঞার মুখোমুখি হইনি যাদের মনে হতে পারে আরো সঠিক। অন্যদের তাদের নিজস্ব সংজ্ঞা থাকতে পারে।

হ্যারিস: সুতরাং একজন ইসলামবাদী চেষ্টা করে সমাজের বাকী অংশের উপর ইসলামের তার সংস্করণটি চাপিয়ে দিতে, আর একজন জিহাদীবাদী হচ্ছেন ইসলামবাদী যিনি সেই কাজটি করার চেষ্টা করেন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে।

নাওয়াজ:  হ্যা, ঠিক বলেছো।

হ্যারিস: এই ব্যাখ্যাটি খুবই উপকারী।

নাওয়াজ:  আবার তোমার প্রস্তাবিত এককেন্দ্রিক বৃত্তগুলোয় ফিরে আসি। ভিতরের বৃত্তের কেন্দ্রে এই মুহুর্তে আছে ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদাকে ম্লান করতে যাদের আবির্ভাব। এর সদস্যদেরকে আমি বলি বৈশ্বিক জিহাদীবাদী। এছাড়াও আছে আঞ্চলিক জিহাদীবাদী। তারাও, শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামবাদের বিস্তারের জন্য, কিন্তু তারা তাদের সীমাবদ্ধ রেখেছে একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক ও জনগোষ্ঠীর উপর তাদের কর্মকাণ্ড ঘণীভূত করে। তারা অপেক্ষাকৃত কম ভারসাম্যহীন। হামাস এবং হিজবোল্লাহ এই প্রকৃতির। যে কারোরই ব্যাখ্যা জিহাদীবাদীরা পৃথিবীর সংখ্যালঘু মুসলিম কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশী সংগঠিত এবং সবচেয়ে বেশী ক্ষমতার অধিকারী এবং  যে কোনো আলোচনায় তাদের বিষয়টি প্রাধান্য বিস্তার করে কারণ তারা হিংস্র। ইসলামিক স্টেট বিশাল পরিমান একটি ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং তেল শুল্ক, ভয় দেখিয়ে চাদাবাজী এবং চোরাচালানী থেকে তারা দৈনিক বহু মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে।
জিহাদবাদীদের পরে আছে বাকী ইসলামবাদীরা যারা আরো বড় গ্রুপ। প্রথমে আসে বিল্পবী ইসলামবাদীরা, যারা তাত্ত্বিকভাবে জিহাদবাদীদের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, এবং তারপর আসছে রাজনৈতিক ইসলামবাদীরা, যারা যদিও ইসলামবাদীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু সব মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘু। যেমনটি আমরা মিসরের নির্বাচনের প্রথম চক্রে দেখেছিলাম, মুসলিম ব্রাদারহুড মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। দ্বিতীয় স্থানের দাবীদার হোসনি মোবরকেরই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, আহমেদ শাফিক, পেয়েছিল ২৪ শতাংশ ভোট। এই ১ শতাংশ বাড়তি ভোটই যথেষ্ট ছিলনা মুসলিম ব্রাদারহুডের নিজেদের জয়ী বলে দাবী করার জন্য। পরে শাফিক এবং মোহাম্মেদ মোরসির মধ্যে প্রেসিডেন্ট হবার প্রতিযোগিতায়, শাফিকের বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু প্রতিবাদ ভোট ( এর আগের হোসনি মোবারক সংকারের সাথে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কলঙ্কিত) সত্ত্বেও ব্রাদারহুড মাত্র ৫১ শতাংশ ভোট সংগ্রহ করতে সফল হয়েছিল। বিষয়টি ইঙ্গিত করছে যে বহু মিসরীয় মুসলিম ব্রাদারহুডকে দ্বিতীয় চক্রে ভোট দিয়েছিল শুধুমাত্র হোসনি মোবারকের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে। এটাই যুক্তিসঙ্গত একটি পরিমান, সেকারণে বলা যায়, ক্ষমতার চুড়ান্ত পর্যায়ে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম ইসলামবাদী গ্রুপ মাত্র ২৫ শতাংশ নিবেদিত সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল।
হ্যারিস: তোমার হিসাব মতে পৃথিবীব্যাপী কত শতাংশ মুসলিম ইসলামবাদী?

নাওয়াজ: আমি মিসরের উদহারণ ব্যবহার করছি কারণ সেখানে মুসলিম ব্রাদারহুড বিশেষভাবে সফল। এবং ব্রাদারহুড যদি মিশরে নির্বাচনের প্রথম চক্রে তাদের পক্ষে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট সমর্থন আদায় করতে পারে, সম্ভবত এটি অপেক্ষাকৃত ভাবে কম জনপ্রিয় অন্যান্য মুসলিম প্রধান সমাজগুলোয়। এটাই আমার অভিজ্ঞতা নির্ভর অনুমান, কোনো পরীক্ষা নির্ভর প্রমান আমার হাতে নেই।

 হ্যারিস: বাস্তবিকভাবে, একটি গ্রুপ যে মুসলিম প্রধান দেশগুলোয় গত চল্লিশ বছরের সংসদীয় নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করেছে এবং তারা দেখেছে যে গড়পড়তা, ইসলামবাদী দলগুলো ১৫ শতাংশ ভোট সমর্থন আদায় করেছে।** । এটি প্রস্তাব করছে পৃথিবীর ১৫ শতাংশ মুসলিম হচ্ছে ইসলামবাদী। তবে shari’ah বিষয়ে জরিপের ফলাফলগুলো সাধারণত দেখিয়েছে এর নির্দেশাবলী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমর্থনের হার আরো অনেক বেশী – যেমন ব্যভিচারীদের হত্যা, চোরদের হাত কেটে ফেলা এবং ইত্যাদি । আমি নিশ্চিৎ না এমন কোনো সমাজ নিয়ে কি চিন্তা করা উচিৎ যেখানে ১৫ শতাংশ মানুষ এই ইসলামী দলকে ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু ৪০ শতাংশ অথবা এমনকি ৬০ শতাংশ মানুষ সেখানে ধর্মত্যাগীদের হত্যা করতে চায়।***  আর যদি কিছু নাও হয়, এটি ইসলামবাদীদের প্রকৃত সংখ্যা আরেকটু উপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমি বলে এসেছি যে,  এই সংখ্যা সম্ভবত বিশ্বব্যপী ২০ শতাংশ হবে – যে পরিমাপটি আমি মনে করি বেশ রক্ষণশীল, অন্যদিকে মুসলিম ধর্ম সমর্থকরা বিষয়টিকে বিবেচনা করে একটি ভয়ানক কল্পনাপ্রসূত যা আমার সন্দেহপ্রবণতা আর গোড়ামীর স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।

নাওয়াজ: আমি মনে করি অনেক বেশী সহায়ক হবে যদি সমালোচনাকারীরা তোমাকে নানা নামে ডেকে সমালোচনা না করার বদলে যদি এখানে যা আলোচনা হচ্ছে সেই ধারণাগুলোর দিকে নজর দেয়। তাদের এই কৌশলটা খুব সহজ উপায় তোমাকে ধারণাগুলোকে উপেক্ষা করার জন্য। এছাড়া, মিসরকে উদহারণ হিসাবে ব্যবহার করে, আমি কেবলমাত্র বিশ্বব্যপী ইসলামবাদীদের সংখ্যা ২৫ শতাংশেরও কম হবে এমন ধারণা করলাম, (মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরে তাদের সর্বোচ্চ সমর্থনের সীমা হিসাবে ২৫ শতাংশ ছুতে পেরেছে সেই বিষয়টি মনে রেখেই)। সুতরাং আমি মনে করি তোমার হিসাবও খুব বেশী অসামঞ্জষ্যপূর্ণ নয়। আমার মতে, যে কোনো সমাজ, যেখানে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ ইসলামীদের ভোট দেয়, সেই সমাজ ভয়ঙ্কর আত্মপরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি, যারা এখনও সংগ্রাম করছে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ সামাল দেবার জন্য।

এছাড়া তোমার উল্লেখিত সেই বেশী শতাংশ পরিমান – যা আমরা দেখি যখন মুসলিমদের বিশেষভাবে  জিজ্ঞাসা করা হয় সেই বিষয়গুলো সম্বন্ধে যেমন ধর্মদ্রোহীতা বা ধর্মত্যাগের জন্য মৃতুদণ্ড – আমি বিশ্বাস করি এটির উৎস হয়তো শরিয়া‘র (shari’ah) একটি প্রাচীন ব্যাখ্যা। কিন্তু আমার সংজ্ঞার খাতিরে, আমি এই সব মৌলবাদীদের ইসলামবাদী হিসাবে শ্রেণীবিন্যস্ত করবো না। ধর্মত্যাগীদের মৃত্যুদণ্ডের প্রতি তাদের এই সমর্থনের কারণ শরীয়াকে আইন হিসাবে প্রতিষ্ঠা এবং সেটি সমাজের উপর চাপিয়ে দেবার বাসনায় ইসলামবাদের আর্দশগত পরিকল্পনার উপর বিশ্বাস থেকে যতটা নয় বরং তার চেয়ে বেশী এর কারণ ‘গ্রুপ বা গোত্র-বহির্ভূতদের’ শাস্তি দেবার মধ্যযুগীয়, গোত্রস্বার্থ কেন্দ্রিক বাসনা, যার যৌক্তিকতা দিয়েছে পবিত্র র্ধম গ্রন্হ । এর মানে কিন্তু এটা বলা হচ্ছে না এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীগুলো সুস্থতার পরিচায়ক – বরং এর বীপরিত, তারা অবিশ্বাস্যরকম সমস্যা উদ্রেক করে। ’ইসলামবাদ‘ ছাড়াও এই মানসিকতা প্রায়শই ভিন্ন এবং কখনো একই রকম সমস্যারও উদ্রেক করে।

বাস্তবিকভাবে, বহু উদহারণ আছে এই একই মৌলবাদীরা হিংস্রতার সাথে ইসলামবাদীদের বিরোধিতা করেছে, যাদের তারা বিবেচনা করেছে পুরোপুরিভাবে পশ্চিমা আধুনিকতার একটি উৎপন্ন যার জন্ম হয়েছে একটি ইউনিটারী বা কেন্দ্রীয় আইন ব্যবস্থার অধীনে আইন বিধিবদ্ধ করার পশ্চিমা উদ্ভাবন থেকে। এ বিষয়ে একটি সুলিপিবদ্ধ উদাহরণ হচ্ছে  পাকিস্তান বিভক্তির সময় ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামবাদী গ্রুপ জামাত-এ- ইসলামীর বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের আন্দোলন। বারেলভিরা**** । জামাত এর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর বিরুদ্ধে যেমন অ্যান্টি সেমিটিক বা ইহুদী বিদ্বেষী শ্লোগান দিত – Sau yahudi aek Mawdui বা শত ইহুদী এক মওদুদী থেকেও খারাপ। যদিও ঘৃণ্য, এই শ্লোগানটি মৌলবাদী আর ইসলামবাদীদের মধ্যকার শত্রুতা সংক্রান্ত আমার বক্তব্যটাকেই সমর্থন করছে। যিনি পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর এবং ধর্মনিন্দা আইনের সংস্কারক সালমান তাসিরকে হত্যা করেছিল যে মমতাজ কাদরী, সেও এসেছে একটি বারেলভী আন্দোলন থেকে।

এটা নিখুঁতভাবে আমাদের পরবর্তী চক্রের দিকে নিয়ে যায়, যা সবচেয়ে বৃহত্তম: ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল মুসলিমরা। পাকিস্তান,ইন্দোনেশিয়া,মালয়শিয়া, মিশর অথবা আরব উপসাগরীয় দেশগুলো, যেদিকে আমরা তাকাই কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা বর্তমানে রক্ষণশীল – কেউ হয়তো তাদের চিহ্নিত করতে পারে মৌলবাদী হিসাবে। আপাতত আমরা তাদের রক্ষণশীলই বলবো, কারণ তারা পুরোপুরিভাবে সমসাময়িক মানবাধিকারের বিষয়টির প্রতি সমর্থন প্রদর্শন করতে পারেননি।

          হ্যারিস: রক্ষণশীল ইসলাম আর ইসলামবাদীদের মধ্য বিভেদরেখাটি কি ? অন্যার্থে, রক্ষণশীলদের কি বাধা দিচ্ছে সমাজের বাকী অংশের উপর ইসলাম চাপিয়ে দেবার বাসনায় প্ররোচিত হওয়া থেকে?

নাওয়াজ: ওহ, অনেক কিছুই। আবারো উদহারণ হিসাবে মিসরের দিকে তাকানো যাক। মিসর ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল একটি দেশ, কিন্তু মিসরীয় মসুলমানদের একটি বিরাট অংশ অবশেষে মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারকে প্রত্যাখান করেছে দেশটির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বৃহত্তম প্রতিবাদে নিজেদের ইচ্ছা প্রকাশ করে। সেটি করার সময় তাদের সমর্থন দিয়েছে মিসরীয় ধর্মতাত্ত্বিকরা। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই প্রতিবাদের পরিসমাপ্তি ঘটেছে আরেকটি নির্বাচনের পরিবর্তে জনতাপন্হী একটি সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে, যারা ব্রাদারহুড সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।   এটাই দৃঢ় করে আমার সেই বক্তব্যটিকে যে যদি রক্ষণশীল মিসরীয়রা উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রকে নির্বাচন করেনি যদিও, তবে তারা সন্দেহাতীত দৃঢ়তার সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডকে প্রত্যাখান করেছিল।

তিউনিসিয়া আরেকটি উদহারণ। সেখানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরিণতি হিসাবে দেখেছি মুসলিম আরব তিউনিসিয়াবাসীরা নাহদা পার্টির সরকারকে প্রত্যাখান করেছে – যে দলের উৎস ইসলামবাদী চিন্তাচেতনা – এবং তারা ভোট দিয়ে জয়ী করেছে এর পরিবর্তে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দলকে। ভালো খবরটা হচ্ছে নাহদা পার্টি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা ছেড়েছে, এমনকি জনসম্মুখে  সকল ক্ষমতার প্রতিভূ জনগণের ইচ্ছাকে সমর্থন জানিয়েছে।

বেশীরভাগ প্রথাগত মুসলিমরা ইসলামবাদকে তাদের ধর্মকে একটি ভ্রান্ত রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া হিসাবে মনে করেন। এই মানুষগুলো তাদের পরিবার, জীবনাচারণে অত্যন্ত রক্ষণশীল- যা কিছু অত্যাবশকীয় মানবাধিকারের ধারণার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জের কারণ। কিন্তু তারা সাধারণত চায়না যে  রাষ্ট্র তাদের ধর্ম তাদের উপর চাপিয়ে দিক – কারণ তারা এই ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বলতে কি বোঝায় সেই সংক্রান্ত তাদের নিজস্ব বোঝাপড়ার উপর অধিকারটিকে তারা ধরে রাখতে চান।

হ্যারিস: বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। সুতরাং যখন তারা হনার কিলিং এর সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলি, আমরা তখন শুধুমাত্র ইসলামবাদীদের নিয়ে উৎকন্ঠিত নই, আমরা একইভাবে চিন্তিত কিভাবে গড়পড়তা রক্ষণশীল মসুলমান পুরুষ তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মূ্ল্যবোধের আলোকে তার স্ত্রী এবং কন্যার সাথে আচরণ করবে। এবং তারপরও, এই সব রক্ষণশীল মুসলিমদের অনেকেই ইসলামবাদের বিরোধী হতে পারে।

নাওয়াজ: হ্যা, রক্ষণশীল মুসলিমরা ইসলামবাদ ও জিহাদীবাদের বিরুদ্ধে মিত্র হিসাবে খুবই উপযোগি হতে পারে, কিন্তু তারা আপনার বিরোধিতা করতে পারে লিঙ্গ অধিকার ও সাম্যতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক সন্মান রক্ষার্থে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডগুলোর। সুতরাং আমাদের হাতের এই বিষয়টি প্রভাবিত করবে তারা আপনার মিত্র হবে কি হবে না।

রক্ষণশীল মুসলিমরা আল-কায়েদার বিরুদ্ধে খুবই উচ্চকন্ঠ হতে পারে, কারণ তারা বিশ্বাস করে আল-কায়েদা তাদের ধর্মকে হাইজ্যাক করছে। বিশাল সংখ্যাক মুসলিমরা, ধরুন, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া,পাকিস্তান আর মিসরে রক্ষণশীল। বিষয়টি পরিস্থিতি আরো জটিলতর করে তোলে, কারন আমরা বর্তমানে দুটি পুরোপুরিভাবে ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এখন – ইসলামবাদ ও জিহাদবাদকে প্রতিরোধ করা একদিকে, আর অন্যদিকে মানবাধিকার ও গনতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা। রক্ষণশীল মুসলিমরা আমাদের মিত্র হতে পারে আগের চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করার জন্য, কিন্তু তারা পরের চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করার সময় আমাদের পাশে নাও থাকতে পারেন। আর এটাই সংস্কারপন্হী উদারনৈতিক মুসলিমদের মুখেোমুখি করেছে কঠিন এক পরিস্থিতিতে।

হ্যারিস: এটাও , আরেকটি অত্যন্ত সহায়ক বিভাজন।

নাওয়াজ:  মনে করে দেখো যে আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমকে রক্ষণশীল হিসাবে চিহ্নিত করেছি: যদিও সব রক্ষণশীল মুসলিমরা প্র্যাকটিসিং বা নিয়মিত ধর্ম পালনকারী মুসলিম না, তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী প্রথাগত মুসলিম মূল্যবোধকেই প্রতিফলিত করে থাকে। বেশ, এদের ছাড়া একটি ছোট গ্রুপ হচ্ছে রিফর্ম বা সংস্কারবাদী মুসলিম – যেমন যুক্তরাজ্যের সেরা সংস্কারবাদী ধর্মতাত্ত্বিক ডঃ উসামা হাসান। তারা চেষ্টা করছেন, সরাসরি ইসলামবাদ এবং ধর্মবিশ্বাসের কিছু অতি-রক্ষণশীল ব্যাখ্যাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। রিফর্ম বা সংস্কার শব্দটি দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি কিছু ব্যাখ্যার পুননবায়ন অথবা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া, এর সাথে খ্রিস্টীয় রিফরমেশন বা সংস্কারবাদী ধারণাগুলোর কোনো যোগসূত্র নেই। এই সব সংস্কারবাদীরা হলো, আমি বিশ্বাস করি, সুযোগ্য কিছু মানুষের গ্রুপ, যাদের যথেষ্ট পরিমান সংযোগ এবং বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী আছে এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য। আমি আশা করছি তারা আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আমার যদি কিছু করার থাকে, আমি তা করবো তাদের জন্য।

আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে আমি কুইলিয়াম ফাউণ্ডেশন সহপ্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছি, এটি লণ্ডন ভিত্তিক পৃথিবীর প্রথম চরমপন্থা বিরোধী প্রতিষ্ঠান। আমাদেরই অনীর্ষণীয় কাজ হচ্ছে তাদের চ্যালেঞ্জ করা যারা ইসলামবাদ ও অন্যান্য ধরণের সাংস্কৃতিক চরমপন্থার আশ্রয় নেবেন এবং আমাদের উদ্দেশ্য সেক্যুলার গণতান্ত্রিক পাল্টা বার্তা প্রচার ও প্রসার করা। কুইলিয়াম একটি সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ধর্মশাস্ত্রীয় যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক প্লুরালিজম বা বহুবাদিতার বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমরা সহিংস, মৌলবাদী এবং আদর্শগত গোড়া মতবাদের কঠোর অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবো। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা একটি নিবন্ধিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এবং বিভিন্ন অনুদান ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন এর টিকে থাকার জন্য। ডঃ হাসানের মত ইসলামী ধর্মতত্ত্ববিদের সহায়তায় আমরা ইসলামবাদ ও অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ধর্মীয় মতবাদের দুটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে পারবো, যা আমি কিছুক্ষণ আগে উল্লেখ করেছি, একটি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম কাঠামোয় মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রসার করার জন্য। আর সেটি করতে গিয়ে মাঝে মাঝে আমরা রক্ষনশীল মুসলিমদের বিচলিত করবো, যারা ইসলামবাদের বিরুদ্ধে আমাদের মিত্র হয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। যদি আমরা মানবাধিকারের বিষয়টির দিকে নজর না দিতাম, তারা হয়তো আমাদের মিত্রই থাকতো এখনো। তবে, আমরা নীরব থাকতে পারিনা লিঙ্গ অধিকার কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নে। খুবই কঠিন, কিন্তু আমরা দৃঢ় সংকল্প ও এই সব বিষয়গুলোকে দায়বদ্ধ সংস্কারের আলোচনায় আরো কাছে নিয়ে আসার জন্য। একই সাথে আমরা এর বীপরিতপ্রান্তের বিষয়গুলোর দিকে নজর দেবো, যার খুব ক্ষতিকরভাবে ভাবে এখন মুসলিম-বিরোধী।

তোমার সাথে এই সংলাপে অংশগ্রহনটাই যথেষ্ঠ বেশ কিছু রক্ষণশীল এবং গোত্রীয় ( যদিও ধর্মপরায়ন নয়) মুসলিমদেরকে উদ্বিগ্ন করে তোলার কারণ । অন্যদিকে আমি আমাদের এই কথোপকথনকে দেখছি গুরুত্বপূর্ণ  একটি উদাহরণ হিসাবে যে কিভাবে কুয়াশাটা কাটানো যেতে পারে, যদি শুধুমাত্র আমরা আমাদের অতিশয়োক্তি একপাশে সরিয়ে রাখতে আর অহংকারী অঙ্গভঙ্গীগুলো বর্জন করতে পারি – অন্যরা এই কথোপকথনকে দেখছে শত্রুর সাথে ভ্রাতৃরূপে মেলামেশা করা হিসাবে – আর সেই শত্রুটি হচ্ছে্ তুমি। আমার নীতি আমাকে অনুমতি দিয়েছে তোমার সাথে এই সংলাপে, ইসলাম ও বর্তমান পৃথিবীতে এর নেতিবাচক ভূমিকা সংক্রান্ত ব্যপারে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বে, ঠিক যেমন করে সেই নীতিগুলো আমাকে অনুমতি দেয় মুসলিম ব্রাদারহুডের কোনো সদস্যের সাথে আলোচনা করা জন্য, যারা মনে করে বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র সমাধান। যে কোনো ক্ষেত্রেই, আমার লক্ষ্য হবে আমার ধর্মনিরপেক্ষ,গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের মূল্যবোধগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বাস্তবিকভাবেই আমি নিয়মিতভাবে মত বিনিময় করি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ইসলামবাদী ও জিহাদীবাদীদের সাথে তাদেরকে তাদের আদর্শগত গোড়া মতবাদ থেকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায়- যেমনটি আমার দ্বায়িত্ব। তারপরও আমি সন্দেহ করছি যে বহু রক্ষণশীল ও গোত্রভুক্ত ( তারপরও ধর্মপরায়ন নয়) মুসলিমদের জন্য তোমার সাথে আমার এই কথোপকথন সমস্যার মনে করবে কোনো জিহাদীদের সাথে আমার কথোপকথনের চেয়ে। সেটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা যে সমস্যাটার মুখোমুখি হচ্ছি আজ তার ব্যপকতাটাকে।

হ্যারিস: আসলেই এটি সেই সমস্যার ব্যাপ্তীটাকে বোঝাচ্ছে।

নাওয়াজ: এখন, ভিন্ন ভিন্ন বৃত্তগুলো যা কেবলই শ্রেণীবিন্যস্ত করলাম, সেগুলো নিয়ে আমি যখন কথা বলি, তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে হবে যে আমি তাদের বৈশ্বিক অর্থে বোঝাতে চেয়েছি। সুনির্দিষ্টভাবে আমেরিকা হয়তো ভিন্ন হতে পারে। যেমন, আমি মনে করি ব্রিটেনের তুলনায়। আমেরিকায় মুসলিমদের সমাজে একীভূত হাবার প্রবণতা বেশ ভালো ছিল সবসময়ই, আমি আমার চাইনা আমাদের পাঠকরা এমন কিছু ভাবুক যে  আমেরিকার মসুলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে অবশ্যই রক্ষণশীল হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম আলোচনার মধ্যে সংস্কারের খুব শক্তিশালী একটি ধারা বিদ্যমান, এবং বেশীর ভাগ আমেরিকার মুসলিমরা সেটা হয়তো সেটি সমর্থন করেন।

আরেকটি ছোট গ্রুপ, যাদের আমি চিহ্নিত করবো, সেই সব নাগরিকরা যারা ঘটনাচক্রে মুসলিম হয়েছেন।  তাদের সাথে সংস্কারপন্হী মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে বহু মানুষই যখন সমাজের নানা কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহন করেন তারা নিজেদের প্রথমত মুসলিম বলে পরিচয় দেন না। এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়গুলোর একটি, কিন্তু এটাই প্রথম এবং প্রধান নয়। আমি খুব ভাবনা চিন্তা করেই সেক্যুলার মুসলিম শব্দটি এখানে ব্যবহার করতে চাইছিনা, কারণটা অবশ্যই রক্ষণশীল আর সংস্কারপন্হী মুসলিমরাও সেক্যুলার হতে পারেন।

হ্যারিস: বাস্তবিকভাবে, তুমি সেক্যুলার শব্দটির আরো বেশী সুনির্দিষ্ট একটি সংজ্ঞা ব্যবহার করছো, যা কিছুটা ভিন্ন এই প্রসঙ্গে শব্দটি সাধারণত যেভাবে ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি যদি পাঠকদের জন্য আরেকটু বিস্তারিত করি তাহলে এভাবে বলা যেতে পারে: আপনার ধর্ম আপনার একান্ত নিজস্ব বিষয়, এবং, আমার ধর্ম, বা কোনো একটি ধর্ম না থাকা, আমার নিজস্ব বিষয়। ধর্মপ্রতিষ্ঠানগগুলো এবং রাষ্ট্রের মাঝখানে একটি বিভাজনের দেয়াল নির্মান করার ইচ্ছা এবং পরিস্থিতিটাই মূলত সেক্যুলারিজমকে সংজ্ঞায়িত করে।- কিন্তু যেমনটি তুমি ইঙ্গিত করছো, এই দেয়ালের পেছনে কোনো একজন হয়তো পুরোপুরিভাবে ধর্মান্ধ হতে পারে, যতক্ষণ না সে তার উগ্রতার পরিণতিকে অন্যদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টা না করছে।

নাওয়াজ: সত্য, এবং সেক্যুলার ধর্মীয় ব্যক্তিরা তারপরও একটি মানব অধিকার সংক্রান্ত আলোচনাকে বর্জন করতে পারে একটি মাত্রা অবধি – যে বাস্তব সম্ভাবনা আর আর পরিস্থিতির সাথে আমি নিজে সন্তুষ্ট নই। তবে আমি যা আশা করছি, মানুষ শুধুমাত্র সেক্যুলারিজমকে গ্রহন করবেই না, বরং তারা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের মূল্যবোধগুলোকেও গ্রহন করবে। সুতরাং আমাদের সামনে কাজটি অত্যন্ত সুবিশাল তার মাত্রায়, কিন্তু সেক্যুলারিজম একটি পূর্বশর্ত। মুসলিমদের জন্য এটি একটি অনন্য চ্যালেঞ্জ যার কারণ ইসলামবাদ আর জিহাদবাদের উত্থান। এবং ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে যেভাবে সেক্যুলারিজম শব্দটিকে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এই চ্যালেঞ্জটি অনতিক্রম্য নয়।

আদর্শ পরিস্থিতি হিসাবে, আমি আশা করবো সব মসুলমানই হয় সংস্কার-মনা হবেন নয়তো সেই সব নাগরিকদের মতন হবে যারা যারা ঘটনাচক্রে মুসলিম। তুমি এই শেষ গ্রুপটি থেকে কোনো কিছু শুনবে না, যদিও। তারা তোমার কাছে আসবে না এমন কিছু বলতে – হেই, স্যাম, আমি ঐ সব কিছুতেই বিশ্বাস করি না এবং আমি একজন মুসলিম। কারণ তারা সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে মুসলিম হিসাবে অংশগ্রহন করছেন না। তারা আইনজীবি, চিকিৎসক, তত্ত্ববধায়ক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গাড়ী চালক ইত্যাদি। যদি এই সব মানুষ শুধুমাত্র নাগরিক এ পরিণত হয়, এবং তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যদি তারা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে, তাহলে বেশীর ভাগ সমস্যারই সমাধান হতো।

পরিশেষে, কিন্তু মন্তব্য মডারেট মুসলিম শব্দটি নিয়ে, ইসলামিক স্টেট এর পরে, এমনকি আল-কায়েদাকে আপাতদৃষ্টি মৃদুপন্হী মনে হবে। শব্দটি খুবই এতই আপেক্ষিক – ক্রমশ খারাপ হতে থাকা নৃশংসতার পাশাপাশি – যে এটি এখন অর্থহীন শব্দে পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের বলতে পারছে না, এই বিশেষণ দিয়ে চিহ্নিত মানুষটি ঠিক কোন মূল্যবোধটি ধারণ করছেন। এ কারণে আমার কাছে শ্রেয়তর সেই শব্দগুলো ব্যবহার করা, যা কোনো বিশেষ মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করছে, যেমন ইসলামবাদী, উদারনৈতিক বা লিবারেল, কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল মুসলিম।

 হ্যারিস: এই গ্রুপগুলোর আপেক্ষিক আকার নিয়ে তোমার অন্তর্জ্ঞান অবশ্যই আমার নিজের ধারণার সাথে মিলে যাচ্ছে। যেমনটা আমি বলেছিলাম, মুসলিমরা কি বিশ্বাস করে সেই সংক্রান্ত জরিপ থেকে পাওয়া যথেষ্ট পরিমান উপাত্ত আছে আমাদের কাছে। আমি জানতে চাই এই সব উপাত্তগুলোকে তুমি কি বিশ্লেষণ করছো কিনা? বিশেষভাবে যে জরিপগুলো ব্রিটেইনে করা হয়েছে ৭/৭ (৭ জুলাই লণ্ডন টিউব হামলা) লণ্ডনে বোমা হামলার পরবর্তী, যেখানে আমরা দেখেছি যে ২০ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিমরা সন্ত্রাসী হামলাকারীদের উদ্দেশ্যের প্রতি সমবেদনা অনুভব করেছে; ৩০ শতাংশ shari’ah বা শরীয়া আইনের অধীনে বাস করার ইচ্ছা পোষণ করেছে; ৪৫ শতাংশ মনে করেন যে ৯/১১ ( নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সন্ত্রাসী হামলা) ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের মধ্যে একটি ষড়যন্ত্রের পরিণতি এবং ৬৮ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন যারা ইসলামকে অপমান করে তাদের গ্রেফতার ও বিচার করা ‍উচিৎ***** ।

যখন আমরা দেখি ৭৮ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিমরা মনে করেন যে যারাই ডেনিশ কার্টুন প্রকাশ করেছেন তাদের শাস্তি দেয়া উচিৎ – এবং নিশ্চয়ই এদের মধ্যে অনেকেই তাদেরকে হত্যা করা হোক এমনও চেয়েছেন – বিষয়টি খুবই দুশ্চিন্তার। হয়তো তুমি ব্রিটেনের এই বিশেষ পরিস্থিতি নিয়ে কিছু মন্তব্য করতে পারো।

নাওয়াজ: হ্যা, ঐ সব জরিপের ফলাফলগুলো সত্যিই দুশ্চিন্তার কারণ – তবে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে যে ‘শরীয়ার অধীনে’ বসবাসের ব্যপারটির অর্থ ব্যক্তি বিশেষে খুবই ভিন্ন হতে পারে। কুইলিয়ামে আমরা মূলত লণ্ডন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, এবং বিষয়টি আমার কোনো গোপনীয়তা ছাড়াই বলি, যদিও বিষয়টি আমাদের খুব একটা জনপ্রিয় করেনি অমাদের সহধর্মাবলম্বীদের কাছে। আমেরিকার সাথে তুলনা করলে, ব্রিটেনে মুসলিম উগ্রবাদীতার সমস্যাটি সামঞ্জষ্যহীন ভাবে বিশাল, একই পরিস্থিতি ইউরোপে মূল ভূখণ্ডেও। আরো একটি সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত করছে যে ব্রিটেনের ২৭ শতাংশ মুসলিম জানাচ্ছেন প্যারিসে শার্লি হেবদো অফিসে সন্ত্রাসী হামলার উদ্দেশ্যের প্রতি তারা কিছুটা সমবেদনা অনুভব করেছেন। এগারো শতাংশ সমবেদনা অুনভব করেছেন সেই সব মানুষদের জন্য যারা পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চান।****** ।

যদিও এই জরিপটি প্রতিষ্ঠা করেছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সহিংস আক্রমনের প্রতি কম সমবেদনা অনুভব করেন ঠিকই, তাসত্ত্বেও এই দুটি সংখ্যা শঙ্কাজনকভাবেই অনেক বড়, বিশেষ করে সেই প্রাসঙ্গিকতায়, যখন প্রায় ১০০০ ব্রিটিশ মুসলিম হয়তো ইসলামিক স্টেট এর জন্য যুদ্ধ করতে দেশ ত্যাগ করেছে।

            হ্যারিস: তুমি কি বলবে যে ব্রিটেন এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সমস্যাপূর্ণ দেশ, যেখানে এর মোকাবেলার করার চ্যালেঞ্জটাও সবচেয়ে বেশী?

           নাওয়াজ: যদিও বেলজিয়ামের সবচেয়ে বেশী শতাংশ নাগারিক যারা সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক এবং সিরিয়ায় গেছেন ইসলামিক স্টেট এ যোগ দেবার জন্য। গবেষণাপত্র জানাচ্ছে যে, ৫০০ থেকে ১০০০ যারা ব্রিটেন ত্যাগ করেছে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তর অনেক বেশী এবং তারা তাদের ইউরোপীয় স্বগোত্রীয়দের অনেক বেশী চরমপন্হী*******। এই সংখ্যাগুলো ইঙ্গিত দেয় অস্বস্তিকরভাবে এর বেশ বড় আকারের সংখ্যালঘু এবং এরা কোনো শূন্য থেকে আবির্ভূত হতে পারে না। বাস্তব সত্য হচ্ছে, সবচেয়ে শঙ্কা উদ্রেক করা জরিপগুলো একটি সম্প্রতি যা প্রকাশ করেছে লণ্ডন টাইমস সেটি জানাচ্ছে প্রতি সাত জন তরুণ ব্রিটিশের এক জনের ইসলামিক স্টেট এর প্রতি উষ্ণ অনুভূতি আছে********।; এটি সত্যতা যাই হোক না কেন, এটি প্রস্তাব করছে তৃণমূল পর্যায়ে সমবেদনা স্বস্তি না দেবার মতই মাত্রায় অনেক বেশী। এই সমাজগুলোর মধ্যেই একটি আদর্শগত অন্তঃপ্রবাহ যারা এই সংখ্যাগুলোকে পোষণ করছে। ব্রিটেইন সুস্পষ্টভাবে রুপান্তরিত হয়েছে ইসলামবাদ আর জিহাদবাদের রপ্তানীকারক হিসাবে। আমার প্রাক্তন ইসলামবাদী গ্রুপের অস্তিত্ব পাকিস্তানে ছিলনা, যতক্ষণ না অবধি এটি রপ্তানী করা হয়েছে ব্রিটেন থেকে।

সুতরাং যুক্তরাজ্যে ও ইউরোপ জুড়ে আমাদের সমস্যাটি গুরুতর, এবং এর জন্য আমি কোনো অজুহাত উপস্থাপনও করছি না। আমরা কুইলিয়াম বানিয়েছি এই চ্যালেঞ্জটার সরাসরি মোকাবেলা করার জন্য। আমরা চেষ্টা করবো, প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জিহাদবাদীদের বিচ্ছিন্ন করতে বাকী সবার কাছ থেকে, এরপর ইসলামবাদীদের চ্যালেঞ্জ করবো এবং তাদের পৃথক করবো রক্ষণশীল এবং অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটিগুলো থেকে। আমরা মুসলিমদের উৎসাহ দিচ্ছি রাজনৈতিক ইসলামবাদ প্রকৃতার্থে কি সেটি দেখতে: এটি একটি আধুনিক আদর্শ যার সূচনা প্রথম শুরু হয়েছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের মাধ্যমে। আমরা যুক্তরাজ্যের মুসলিম কমিউনিটিগুলোকে আহবান করবো গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকার ভিত্তিক সংস্কারের বৃহত্তর প্রয়োজনীয়তাকে মনেপ্রাণে সমর্থন করার জন্য। ইউরোপেই কাজটি একটি সুবিশাল চ্যালেঞ্জ, বাকী বিশ্বের কথা তো বাদই দিলাম। সুতরাং আমাদের প্রয়োজন সবধরণের সাহায্য – যা আমরা পেতে পারি।

টিকা:

* আমরা দি ইসলামিক স্টেট নামটি ব্যবহার করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোনো ধরনের পূর্বসংস্কার ছাড়াই, শুধুমাত্র কারণ গ্রুপটি তাদের নিজেদের এই নামেই ডাকে এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে গণমাধ্যমগুলোও তাদের এই নামেই ডাকছে। আমাদের এই ব্যবহার গ্রুপটির নিজেদের ‘সত্যিকারের’ ইসলামের প্রতিনিধি অথবা একটি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার দাবীর সত্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো বিচারিক মনোভাব আরোপ করা নয় । এই বইটি নিজেই এই ধরনের দাবীর সত্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে একটি ব্যপক ও বিস্তারিত পর্যালোচনা)))

** C. Kurzman and I. Naqvi, “Do Muslims Vote Islamic?” Journal of Democracy 21, no. 2 (April 2010)

*** Muslim public opinion on the implementation of shari’ah has been polled extensively. For instance, http://www.pewforum.org/2013/04/30/the-worlds-muslims-religion-politics-society-beliefs-about-sharia/.

**** বারেলভী (Barelvi) সুন্নী হানাফী ইসলামী আইনী দর্শনের যে ধারা সূচনা হয়েছিল উত্তর ভারতে বারেলি শহরে, যার সূচনায় ছিলেন আহমেদ রাজা খান (১৮৫৬-১৯২১), যদি এই নামটি গণমাধ্যম কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হলে এই আন্দোলনটি পরিচিত হয়েছিল Ahle Sunnat wal Jama’at বা সুন্নী হিসাবে))

***** http://www.cbsnews.com/…/many-british-muslims-put-islam-fi…/.

****** http://www.bbc.co.uk/news/uk-31293196.

******* T. Coghlan, “British jihadists wealthier and better educated than those from rest of Europe,” The Times, October 2, 2014

********O. Moody, “One in seven young Britons has sympathy with Isis cause,” The Times, October 30, 2014

 

 

(চলবে)

Advertisements
ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s