দর্শনের সহজপাঠ -৩ : আমরা কিছু জানিনা


পিরো (Pyrrho)

কেউই কোন কিছু জানেন না – এবং এমনকি এই কথাটিও নিশ্চিৎ করে বলা সম্ভব না। যা সত্য বলে বিশ্বাস করেন, তার উপর আপনার ভরসা করা উচিৎ না – আপনি হয়ত ভূল প্রমানিত হতে পারেন। সব কিছুকেই প্রশ্ন করা যেতে পারে, সবকিছুকেই সন্দেহ করা যেতে পারে । সবচেয়ে সেরা উপায়টি হচ্ছে তাহলে, নিজের মনটাকে সবসময় খোলা রাখা। কোন কিছুর ব্যপারে অপরিবর্তনযোগ্য কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না, তাহলে আপনি হতাশও হবেন না। এটাই স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদের মুল শিক্ষা। সংশয়বাদ দর্শনটি কয়েক শতাব্দী ধরেই বেশ জনপ্রিয় ছিল প্রাচীন গ্রীসে, পরে রোমে। প্লেটো এবং অ্যারিস্টোটলের ব্যতিক্রম, বেশীর ভাগ চুড়ান্ত মাত্রার সংশয়বাদীরা কোন বিষয়ে, সেটি যাই হোক না কেন, কোন ধরনের স্থির বা নিশ্চিৎ বা অপরিবর্তনযোগ্য কোন মতামত ধারণ করা মত যে কোন অবস্থান এড়িয়ে যাওয়াই সমীচীন মনে করতেন। প্রাচীন গ্রীক এক দার্শনিক পিরো (সম্ভবত ৩৬৫ থেকে ২৭০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ) ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সম্ভবত সকল সময়ের সেরা সংশয়বাদী। খুব নিশ্চিৎভাবে তার জীবনটাও বেশ অদ্ভুত ছিল।


আপনি হয়তো বিশ্বাস করতে পারেন যে, অনেক কিছুই আপনি জানেন – যেমন আপনি জানেন এই মুহুর্তে এই লেখাটি পড়ছেল। কিন্তু সংশয়বাদীরা আপনার এই নিশ্চিৎ জানা বিষয়টিকে বা জ্ঞানটিকে চ্যালেঞ্জ করে। একটু চিন্তা করে দেখুন, কেন আপনি বিশ্বাস করছেন যে, আপনি আসলে এই শব্দগুলো পড়ছেন এবং শুধুমাত্র কল্পনা করছেন না যে, আপনি এটা পড়ছেন। আপনি কি নিশ্চিৎ হতে পারেন যে আপনি সঠিক? আাপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আপনি পড়ছেন-আপনার কাছে এটা ঠিক সেভাবেই অনুভূত হয়। কিন্তু হতে পারে আপনি পুরো ব্যাপারটি একটি ঘোর বা হ্যালুসিনেশন বা যা ঘটছে না অথচ আপনি তাই দেখছেন বা কোন স্বপ্ন দেখছেন ( এবং এটা একটি ধারণা যা রেনে দেকার্ত ব্যাখ্যা করেছিলেন আরো আঠারো শত বছর পরে, ১১ তম পর্বে আমরা তার কথা জানবো)। সক্রেটিস দাবী করেছিলেন তিনি যা জানেন তা সামান্য সেটি তিনি জানেন, সেই হিসাবে তিনিও একজন সংশয়বাদী। কিন্ত পিরো এই ধারণাটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আরো অনেকটা অগ্রসর পর্যায়ে। হয়তো একটু বেশীই সামনে।


যদি তার জীবন সম্বন্ধে বর্ণিত সব তথ্য আমরা বিশ্বাস করি ( এবং হয়তো সেই বিষয়েও আমাদের সংশয়বাদী হওয়া দরকার), পিরো, যে কোন কিছু আমরা যা দেখি,জানি বা বুঝি তা কোন প্রশ্ন ছাড়াই মেনে না নেওয়াটাকেই  জীবনের ধর্ম হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। সক্রেটিসের মতই কোন কিছুই তিনি লিখে যাননি। সুতরাং তার সম্বন্ধে আমরা যা জানি সেটি এসেছে অন্য মানুষদের কাছ থেকে তারা যার কথা লিপিবদ্ধ করে গেছেন, মূলত তার মৃত্যুর বেশ কয়েক শতাব্দী পর। তাদের একজন, ডাওজিনিয লেইআরশিয়াস , আমাদের বলেন, পিরো সেই সময় তারকা খ্যাতি পেয়েছিলেন এবং এলিস – যে শহরে তিনি বসবাস করতেন – তার প্রধান পুরোহিত হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তার সন্মানে সেখানে দার্শনিকদের কোন কর দিতে হতো না। কথাটি সত্যি কিনা তা যাচাই করে দেখার কোন উপায় নেই, যদিও দার্শনিকদের কর না দেবার নিয়মটি মন্দ না।

আমরা যতদূর বলতে পারি, যদিও পিরো, তার সংশয়বাদ নিয়ে খুব স্বাভাবিক কোন জীবন কাটাতে পারেননি। পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার মেয়াদ খুবই সংক্ষিপ্ত হতো, যদিনা রক্ষা করার জন্য তার বেশ কিছু প্রভাবশালী বন্ধু না থাকতো। দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকবার জন্য একজন চুড়ান্ত সংশয়বাদী মানুষের প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত কম সংশয়বাদী মানুষদের সহায়তা অথবা সৌভাগ্য।

জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংক্ষেপে এরকম : আমরা পুরোপুরিভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে বিশ্বাস করতে পারবোনা। কখনো কখনো তারা আমাদের বিভ্রান্ত করে। যেমন, অন্ধকারে আপনি কি দেখতে পারছেন, সে বিষয়ে খুব সহজেই আপনি ভুল করতে পারেন। যা দেখতে শিয়াল এর মত মনে হলেও হতে পারে সেটি শুধুমাত্র একটি বিড়াল। অথবা আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, আপনি শুনেছেন যে, কেউ আপনার নাম ধরে ডেকেছিলো, যখন সেটি শুধুমাত্র গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই না। যেহেতু আমাদের ইন্দ্রিয় প্রায়শই আমাদের বিভ্রান্ত করে, পিরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি তাদের ‘কখনোই’ বিশ্বাস করবেন না। তিনি কিন্তুসেই সম্ভাবনাকে একেবারে প্রত্যাখান করেননি যে, তারা তাকে হয়তো সঠিক তথ্য দিতে পারে, কিন্তু পুরো বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি খোলা মন রাখার ব্যাপারেই মতামত দেন।

সুতরাং, যখন বেশীর ভাগ মানুষই কোন খাড়া পাহাড়ের প্রান্তে গভীর খাদের দৃশ্যকে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমান হিসাবে ধরে নেন যে সামনের দিকে হাটা খুবই বোকামী হবে, পিরো তা মনে করতেন না। তার ইন্দ্রিয় হয়তো তাকে প্রতারণা করছে, সুতরাং তিনি তাদের বিশ্বাস করতেন না। এমনকি খাদে প্রান্ত যখন তার পায়ের আঙ্গুল স্পর্শ করে বা সামনের দিকে ঝুকে পড়ার অনুভূতিও তাকে বিশ্বাস করাতে পারেনি তিনি গভীর খাদের নীচে পাথরের উপর পড়ে যাবার উপক্রম হয়েছেন। এমনকি এটিও স্পষ্ট না তার কাছে যে, উপর থেকে নীচে পাথরের উপর পড়াটা তার স্বাস্থের জন্য খুবই খারাপ হবে। কিভাবে তিনি চুড়ান্তভাবে নিশ্চিৎ হবেন এই সব সম্ভাব্য পরিণতিগুলোর ব্যাপারে। তার বন্ধুরা, যারা স্পষ্টত সবাই তার মত সংশয়াবাদী ছিলেন না, এই ধরনের নানা দুর্ঘটনা ঘটানো থেকে তাকে বিরত রাখতেন। যদি তারা সেটি না করতেন, প্রায় প্রতিটি মিনিটে তিনি নানা ঝামেলায় পড়ে যেতেন।

হিংস্র একদল কুকুর দেখে কেনই বা ভয় পেতে যাবেন যদি আপনি নিশ্চিৎ না হতে পারেন তারা আপনাকে আক্রমন করতে চাইছে কিনা ? শুধুমাত্র তারা চিৎকার করছে বা দাঁত বের করে আপনার দিকে দৌড়ে আসছে বলে এমন মনে করা উচিৎ হবে না যে নিশ্চিৎভাবে তারা আপনাকে কামড়ে দেবে। এমনকি যদি তারা সেটাও করে, আবশ্যিকভাবেই যে আপনি ব্যাথাই পাবেন তা কিন্তু নিশ্চিৎভাবে বলতে পারবেন না। রাস্তা পার হবার সময় দুই দিক থেকে ধেয়ে আসা যানবাহনগুলোর দিকে আপনি কেন খেয়াল করবেন? ঐসব যানবাহন হয়তো আপনাকে নাও আঘাত করতে পারে। কে আসলেই তা জানেন? আর কিইবা এমন পার্থক্য হবে আপনি মৃত কিংবা জীবিত থাকার মধ্যে? কোন না কোনভাবে পিরো তার এই পুরোপুরি নির্বিকার থাকার দর্শন নিয়ে জীবন কাটাতে পেরেছিলেন এবং প্রচলিত আর স্বাভাবিক সব মানবিক আবেগ আর আচরণের নিয়মগুলোকে জয় করেছিলেন।

যাইহোক এগুলো পিরোর জীবন ঘিরে সম্ভবত রটানো কিংবদন্তি। তাকে নিয়ে এই গল্পের কিছু বানানো হয়েছে সম্ভবত তার দর্শনকে নিয়ে উপহাস করার জন্য। কিন্তু একেবারে সবই যে বানানো তার সম্ভাবনা কম। যেমন, একটি বিখ্যাত ঘটনা বলছে, একবার সমুদ্রযাত্রায় প্রবল ঝড়ে মুখে পুরোপুরিভাবে শান্ত ছিলেন তিনি, প্রবল বাতাস ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করেছিল জাহাজের পাল, বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। তার চারপাশে সবাই ছিল আতঙ্কিত, কিন্তু এসব কোনকিছুই পিরোকে একটুও বিচলিত করেনি। যেহেতু আমরা আপাতদৃষ্টিতে যা দেখি, তারা প্রায়শই খুব ছলনাময়, তিনি কিছুতেই চুড়ান্তভাবে নিশ্চিৎ হতে পারেননি এই ঝড়ে তার ক্ষতি হবে কিনা। তিনি শান্ত থাকতে পেরেছিলেন যখন এমনকি সবচেয়ে অভিজ্ঞ নাবিকও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে এমনকি এইসব পরিস্থিতিতেও নির্বিকার এবং অবিচলিত থাকা যায়। এই গল্পটির সত্যতা আছে।

তার তারুণ্যে পিরো ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। হয়তো এই অভিজ্ঞতাই তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল তার অপ্রচলিত জীবনাচরণের। ভারতের অ্যাধাত্মিক শিক্ষক আর গুরুদের ঐতিহ্যবাহী একটি ধারা আছে, যারা নিজেদের চরমতম এবং প্রায় অবিশ্বাস্য শারীরিক প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান, যেমন, জীবন্ত কবর, শরীরের সংবেদনশীল অংশ থেকে ভারী কিছু ঝোলানো বা কোন রকম খাদ্যগ্রহন ছাড়া বহু সপ্তাহ বেঁচে থাকা ইত্যাদি, শুধুমাত্র তাদের মনের ভিতরের স্থিরতা অর্জন করার জন্য। দর্শনের প্রতি পিরো’র দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই কোন মিস্টিক বা অতীন্দ্রিয়বাদীর মত। তবে যে কৌশলই তিনি ব্যবহার করুন না কেন সেটি অর্জন করার জন্য, তিনি যা প্রচার করতেন, অবশ্যই তিনি সেই অনুযায়ী আচরণও করতেন। তার স্থির মানসিক অবস্থা তার চারপাশের সবার উপর একটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কোন কিছু নিয়ে যে তিনি বেশী ব্যতিব্যস্ত হতেন না, কারন ,তার মতামত অনুযায়ী, চুড়ান্তভাবে সব কিছুই নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গি বা মতামতের উপর। যদি কোন সুযোগই না থাকে সত্যটাকে উদঘাটন করার জন্য, অযথা অস্থির হবার কেনা কারণ নেই। তাহলে আমরা নিজেদের পারবো সব ধরণের দৃঢ় বিশ্বাস থেকে নিজেদের দুরে রাখার জন্য, কারন দৃঢ় স্থির বিশ্বাসগুলোর সাথে সবসময়ই সংশ্লিষ্ট থাকে বিভ্রান্তি বা ডিল্যুশন।

আপনার সাথে যদি পিরো’র দেখা হতো, সম্ভবত আপনি ভাবতেন তিনি উন্মাদ এক ব্যক্তি। এবং হয়তো কোন এক ভাবে তিনি অবশ্যই তা ছিলেন। কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি আর আচরণ ছিলো সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি ভাবতেন যে আপনার নানা ধরণের স্থির বিশ্বাস শুধুমাত্র অযৌক্তিক এবং যা আপনার মনের শান্তির জন্য প্রতিবন্ধকতা স্বরুপ। যদি সবকিছু এমনই তো হবার কথা হিসাবে আপনি গ্রহন করে নেন, সেটি হবে বালির উপর বাড়ি বানানোর মত। আপনার চিন্তার ভিত্তিগুলো আপনি যেমনটা ভাবতে ভালোবাসছেন যে খুব মজবুত, সেটি আদৌ তেমন নয়, এবং আপনাকে সুখী করার সম্ভাবনাও তার খুব ক্ষীণ।

পিরো খুব চমৎকারভাবে তার এই দর্শনকে সারসংক্ষেপ করেছিলেন তিনটি প্রশ্নের আকারে, সুখী হতে চান এমন কারো এই প্রশ্নগুলি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা উচিৎ:

সত্যিকারভাবে আসলে কি মনে হয় সবকিছু?
তাদের প্রতি কি ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করবেন?
কি হতে এমন কারো, যে কিনা সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করেছেন?

তার উত্তরগুলো ছিল খুব সরল এবং সুস্পষ্ট। প্রথমত, আমাদের পক্ষে কখনোই জানা সম্ভব না পৃথিবীটা আসলেই সত্যি কেমন – এটি আমাদের ক্ষমতার বাইরে। বাস্তবতার আসল প্রকৃতিটি কি কেউ কোনদিনও জানতে পারবেনা। এই ধরনের জ্ঞান, মানুষের পক্ষে কোনভাবেই অর্জন করা সম্ভব না, সুতরাং বিষয়টি ভূলে যান পুরোপুরিভাবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি পুরোপুরিভাবে সাংঘর্ষিক প্লেটো থিওরী অব ফর্মের সাথে এবং তার বিশ্বাস যে দার্শনিকরা বিমূর্ত ভাবনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন (প্রথম পর্ব দেখুন); দ্বিতীয়ত, এর পরিণতিতে, আমাদের উচিৎ হবে না কোন একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি প্রতিশ্রুত হওয়া। কারন আমরা কোন কিছুই নিশ্চিৎভাবে জানতে পারিনা, সে কারণে কোন বিষয় সংক্রান্ত বিচার করার প্রক্রিয়া স্থগিত করে, কোন কিছুর প্রতি প্রতিশ্রুত বিশ্বাস না নিয়েই আমাদের জীবন কাটানো উচিৎ। প্রতিটি বাসনা যা আপনি অনুভব করেন তা প্রস্তাব করে কোন একটি কিছু অন্য সব কোন কিছু অপেক্ষা উত্তম। আর অসুখী হবার মত পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যখন আপনি যা চান তা পান না। কিন্তু আপনার পক্ষে জানা সম্ভব নয় কোন একটি কিছু অন্য কোন কিছুৃ থেকে ভালো কিনা। সুতরাং, তিনি মনে করতেন, সুখী হতে হলে আপনার উচিৎ হবে সব ধরণের বাসনা থেকে নিজেকে মুক্ত করা এবং এর ফলাফল কি হবে সে বিষয়ে আদৌ কোন চিন্তা না করা।  এটাই হচ্ছে সঠিকভাবে বাচার উপায়। কোন কিছুইতে কিছু যায় আসে না, এই বিষয়টাকেই শনাক্ত করা। এভাবে, কোন কিছুই আপনার মনের পরিস্থিতির উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারবেনা, মনে ভেতর সেই প্রশান্তি আপনি অনুভব করতে পারবেন। তৃতীয়ত, যদি আপনি এই শিক্ষা অনুসরণ করেন এটাই আপনার সাথে ঘটবে। আপনি শুরু করবেন নির্বাক হয়ে, এর কারণ সম্ভবত আপনার জানা থাকবেনা কোন কিছু বিষয়ে কি বলতে হবে। অবশেষে, আপনিও সব চিন্তা থেকে মুক্ত হবেন। এবং জীবনে আপনি বা অন্য যে কেউই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ যা আশা করতে পারে, সেটি হচ্ছে এই পরিস্থিতি, প্রায় ধর্মীয় কোন অভিজ্ঞতার মত।

এটা হলো তত্ত্বটি। পিরো’র জন্য আপাতদৃষ্টিতে এটি কাজ করেছিল, বাকী মানবজাতির বেশীর ভাগ অংশর জন্য এটি একই পরিণতির কারণ হবে এমন প্রত্যাশা করা খুব কঠিন কাজ হবে। আমাদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনই পারবেন তার প্রস্তাবিত সেই ধরণের নির্লিপ্ততা অর্জন করতে। এবং সবার সেই ভাগ্যও হবে না, অত্যন্ত খারাপ কোন ভুল থেকে বাচানোর জন্য তার নিবেদিত বন্ধুদের একটি দল থাকবে। বাস্তবিকভাবে, যদি সবাই তার পরামর্শ অনুসরণ করতেন, তাহলে কেউই অবশিষ্ট থাকতেন না পিরো’র সংশয়বাদীদের তাদের নিজেদের থেকে রক্ষা করার জন্য এবং এই পুরো দর্শনের ভাবনাটাই দ্রুত হারিয়ে যেত, যেমন তারা একে পর এক খাদের কিনারা থেকে নিচে ঝাপিয়ে পড়তেন, বা চলন্ত কোন যানবাহনের সামনে দাড়িয়ে যেতেন অথবা হিংস্র কুকুরের আক্রমনের শিকার হতেন।

পিরোর এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল দূর্বলতা হচ্ছে তিনি ‘আপনি কোন কিছু সম্বন্ধেই জানতে পারবেন না’ এই ভাবনা থেকে সরাসরি উপসংহারে উপনীত হয়েছিলেন, ‘সেকারণে আপনার উচিৎ হবে কোন কিছু বিপদজ্জনক কিনা সেই বিষয়ে আপনার সহজাত প্রবৃত্তি আর অনুভূতিকে অবজ্ঞা করা।’ কিন্তু আমাদের এই সহজাত প্রবৃত্তি আমাদের রক্ষা করে নানা ধরনের সম্ভাব্য বিপদ থেকে। তারা হয়তো সবসময় বিশ্বাসযোগ্য হয় না ঠিকই, কিন্তু এর মানে এই না যে আমাদের উচিৎ হবে সেগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা। এছাড়া এমন কি পিরো’রও সরে আসার কথা যখন কোন কুকুর তাকে আক্রমন করার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে: তার পক্ষে পুরোপুরিভাবে তার শরীরের স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া এড়ানো সম্ভব না, তিনি যতই েেচষ্টা করুন না কেন। সুতরাং পিরো’র মত সংশয়বাদী হয়ে বাঁচতে চেষ্টা করা হতে পারে বিভ্রান্তি কর একটি পথ। এমনকি এটিও স্পষ্ট নয় এভাবে জীবন কাটালেই কেউ, পিরো যেমন বলেছিলেন সেরকম মানসিক প্রশান্তির সন্ধান পাবেন। সুতরাং পিরোর সংশয়বাদিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা সম্ভব। আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে চাইতে পারেন, প্রশান্তি কি আসলেই অর্জন করা সম্ভব কিনা সেই সব ঝুকি নেবার মাধ্যমে যা পিরো নিয়েছিলেন। পিরোর জন্য হয়তো বিষয়টি কাজ করেছে, তাহলে কি প্রমাণ আছে এটি আপনার জন্য কাজ করতে পারে? আপনি হয়তো শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিৎ হতে পারবেন না যে একটি হিংস্র কুকুর আপনাকে কামড়াবে কিনা, কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধিমানের কাজ হবে সেই সতর্কতা গ্রহন করা, যখন আপনি কিনা শতকরা নিরানব্বই ভাগ নিশ্চিৎ।

দর্শনের ইতিহাসে সব সংশয়বাদীরা পিরো’র মত এমন চরম পন্থার ছিলেন না। মধ্যপন্থী সংশয়বাদিতার একটি চমৎকার ঐতিহ্য আছে, যেমন সব ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং আমরা যা বিশ্বাস করি তার স্বপক্ষে প্রমাণগুলোকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করা এবং সবকিছুই সবসময় সন্দেহ করে বাচার প্রচেষ্টা ছাড়াই এই সংশয়বাদ তার কাজ করতে পেরেছে। এই ধরনের সংশয়বাদীর প্রশ্নগুলোই দর্শণের প্রাণ। সব মহান দার্শনিকই এই অর্থে সংশয়বাদী ছিলেন। এটি ডগম্যাটিজম বা প্রশ্নাতীতভাবে কোন কিছু মেনে নেয়ার মতবাদ বিরোধী। যারা কিনা এই ধরণের যুক্তিহীন বিশ্বাস ধারণ করেন তারা খুবই আত্মবিশ্বাসী হন যে একমাত্র তারাই সত্যিটা জানেন। দার্শনিকরা এই সব মতবাদগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তারা জিজ্ঞাসা করেন কেন মানুষ বিশ্বাস করে তারা যা বিশ্বাস করে, কি ধরনের প্রমান আছে তাদের সেই মতামত আর উপসংহারগুলোর সমর্থনে। এটাই সক্রেটিস এবং অ্যারিস্টোটল করেছিলেন এবং বর্তমান সময়ের দার্শনিকরাও সেটি করে থাকেন। কিন্তু তারা এই কাজটি করেন না শুধুমাত্র বিতর্ক করার খাতিরে।  মাঝারি মাত্রার দার্শনিক সংশয়বাদিতার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্যের কাছাকাছি পৌছানো অথবা নিদেনপক্ষে উন্মোচন করা, কতটা কম আমরা জানি বা জানা সম্ভব হতে পারে। এই ধরনের সংশয়বাদী হবার জন্য আমাদের কারোরই পাহাড়ের খাদের কিনার থেকে পড়ে যাবার ঝুকি নেবার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনার প্রয়োজন আছে বিব্রতকর প্রশ্ন করার জন্য তৈরী থাকা এবং মানুষ আপনাকে যে উত্তরগুলো দেবে সেগুলো খুব সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবা।

যদিও পিরো সব ভাবনা থেকে মুক্তির কথা প্রচার করেছিলেন, আমাদের বেশীর ভাগ মানুষের পক্ষে সেটি অর্জন করা সম্ভব না। একটি খুব সাধারণ চিন্তা হচ্ছে সেই বাস্তবতাটি – যে আমরা প্রত্যেকেই একদিন মারা যাবো। অন্য একজন গ্রীক দার্শনিক, এপিকিউরিয়াস এর কাছে কিছু বুদ্ধিদীপ্ত প্রস্তাবনা ছিল, কিভাবে আমরা এই মৃত্যু ভাবনাটার সাথে বোঝাপড়া করতে পারি। কিন্তু এপিকিউরাসকে নিয়ে কথা হবে পরের পর্বে।

(চলবে)

Advertisements
দর্শনের সহজপাঠ -৩ : আমরা কিছু জানিনা

3 thoughts on “দর্শনের সহজপাঠ -৩ : আমরা কিছু জানিনা

  1. চমৎকার উদ্যোগ। প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত আসতে পারলে ব্যাপারটা অসাধারণ হবে। এ ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রমণ আমিও করার চেষ্টা করেছি, যদিও লেখা হয়নি কখনো। এবং আসলে আমি নিজেও দার্শনিকদের নিয়ে কিছু লেখা শুরু করার কথা ভাবছিলাম। উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম প্রথমত Peter Adamson এর History of Philosophy without any gaps পডকাস্ট শুনে এবং Anthony Kenny এর A New History of Western Philosophy এর অংশাবশেষ পড়ে। তাছাড়া লুক্রেতিউস এর দে রেরুম নাতুরা অনুবাদ করতে গিয়েও প্রাচীন দর্শন সম্পর্কে আগ্রহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পিটার অ্যাডামসন পিরো কে নিয়েও একটা অডিও পর্ব করেছিলেন। লিংক:
    http://www.historyofphilosophy.net/pyrrho
    ওর পডকাস্টগুলো আমার বেশ লাগে।

    প্রাচীন গ্রিসে প্রাক-সক্রেটীয় দর্শন থেকে শুরু করে প্লেটো-এরিস্টটল হয়ে হেলেনীয় দর্শনধারা পর্যন্ত যে অনন্যসাধারণ বৈচিত্র্যের দেখা মেলে তা এককথায় শ্বাসরুদ্ধকর। পৃথিবীর ইতিহাসে বর্গমাইল প্রতি দার্শনিকের সংখ্যা এত বেশি বোধহয় আর কখনো ছিল না। পিরো’র সংশয়বাদের পিছনে কি প্লেটোর Meno (Μένων–মেনোন) সংলাপটার কোনো ভূমিকা থাকতে পারে? আমাদের পক্ষে কোনোদিন কিছু জানা সম্ভব নয়, জানার জন্য প্রথমে কি জানতে হবে সেটাই জানতে লাগে, আর যদি কিছু না জানি তাহলে কি জানতে হবে সেটাই তো জানা সম্ভব না, সুতরাং কিছুই জানা সম্ভব না— একেই তো বোধহয় মিনো’র আপাতস্ববিরোধিতা (paradox) বলা হয়।

    আপনার লেখাটা খুব সাবলীল হয়েছে। তবে কিছু টাইপো রয়ে গেছে। আর Diogenes Laërtius এর নামের গ্রিক উচ্চারণটা হওয়া উচিত: দিওগেনিস লায়ের্তিওস (Διογένης Λαέρτιος)।

    শেষ একটা অনুরোধ: মুক্তমনায় দেয়ার কথা কি ভেবেছেন এই পর্বগুলো? আপনি যেখানেই দেন না কেন আমাকে নিয়মিত পাঠক হিসেবে পাবেন। তবে মুক্তমনায় দিলে অনেক বেশি ভালো লাগবে।

    1. অনেক ধন্যবাদ। মুক্তমনায় দেই না কারণ ওখানে এই সব লেখা কারো ভালো লাগবে না,..তেমন মানসম্মত না.. এগেুলো ড্রাফট , একটা পাইলট প্রজেক্ট.. আমার মত করে.. ইদানীং কিছু মানুষ আসছে যদিও। অন্য বইয়ের কাজ করার সময় ফাকে ফাকে করা কিছু কাজ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s