দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ২ : সত্যিকারের সুখ

অ্যারিস্টোটল ( ৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

‘একটি কোকিল মানেই বসন্ত নয়’ – আপনি ভাবতেই পারেন এমন কোন বাক্য হয়তো এসেছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার অথবা অন্য কোন মহান কবির কবিতা থেকে। শুনলেও মনে হয় সেটাই তো হওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবিকভাবে বাক্যটিকে আমরা খুজে পাবো ‘দি নিকোম্যাকিয়ান এথিকস’ নামে অ্যারিস্টোটল এর একটি বইতে। বইটির নাম এরকম হবার কারণ এটি অ্যারিস্টোটল উৎসর্গ করেছিলেন তার ছেলে নিকোম্যাকাসকে। তিনি এই বাক্যটির মাধ্যমে যা বোঝাতে চাইছিলেন সেটি হচ্ছে, বসন্ত কিংবা গ্রীষ্ম এসেছে সেটি প্রমান করার জন্য একটি মাত্র কোকিলের আগমনের চেয়েও আরো বেশী কিছুর প্রয়োজন আছে এবং একটি উষ্ণ দিন, বা অল্প কিছু মহুর্তের আনন্দ আর সত্যিকারের সুখ কিন্তু এক নয়। অ্যারিস্টোটলের কাছে সুখ মানে ক্ষনিকে জন্য অনুভূত আনন্দের কোন বিষয় ছিল না। বিস্ময়করভাবে, তিনি ভাবতেন যে, শিশুরা কখনোই সুখী হতে পারেনা। এই কথাটি আমাদের কাছে খুব অদ্ভুত শোনায়, কারণ যদি শিশুরাই সুখী হতে না পারে, তাহলে কে পারে? কিন্তু তার এই প্রস্তাবটি স্পষ্ট করে সুখ সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গিটি আসলে আমাদের থেকে কতটা ভিন্ন। শিশুরা কেবলই তাদের জীবন শুরু করেছে, সুতরাং কোন অর্থেই বলা যাবেনা তারা পুরোপুরি জীবনের আস্বাদ পেয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, সত্যিকার সুখের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘ জীবন।

অ্যারিস্টোটল ছিলেন প্লেটো ছাত্র, আর প্লেটো ছিলেন সক্রেটিসের ছাত্র। সুতরাং মহান এই তিন দার্শনিক একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খল তৈরী করেছিল, সক্রেটিস-প্লেটো-অ্যারিস্টোটল। এবং প্রায়শই সেটাই ঘটে থাকে। প্রতিভাবানরা সাধারণত শুন্য থেকে আবির্ভূত হননা। তাদের বেশীর ভাগের জীবনেই দেখা মেলে কোন না কোন এক অনুপ্রেরণা দেবার মত শিক্ষক। কিন্তু এই তিনজনের প্রত্যেকের ভাবনাই ছিল পরস্পর থেকে ভিন্ন। তারা কেউই তোতা পাখির মত তাদের শিক্ষকের কাছে যা শিখেছিলেন শুধু তারই পুনরাবৃত্তি করে যাননি। প্রত্যেকের চিন্তারই একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গী ছিল। খুব সহজভাবে যদি বলি, সক্রেটিস অসাধারণ ছিলেন তার কথোপকথনে, প্লেটো ছিলেন অসাধারণ একজন লেখক, আর অ্যারিস্টোটলের অসাধারণ কৌতুহলী মন অনুসন্ধান করেছে সবকিছু। সক্রেটিস এবং প্লেটো পৃথিবীকে ভাবতেন সত্যিকার বাস্তবতার একটি ফ্যাকাশে প্রতিফলন হিসাবে, যে বাস্তবতাটির স্বরুপ অনুসন্ধান শুধুমাত্র সম্ভব হতে পারে নৈর্ব্যক্তিক দার্শনিক ভাবনা দ্বারা। এর ব্যতিক্রম, অ্যারিস্টোটল, তার চারপাশে বিদ্যমান সবকিছুর বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান নিয়েই আবিষ্ট ছিলেন তার পুরোটা জীবন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অ্যারিস্টোটলের বেশীর ভাগ লেখাই টিকে আছে লেকচার নোট এর আকারে। কিন্তু তারপরও তার চিন্তার এই লিপিবদ্ধ বিবরণ পশ্চিমা দর্শনের উপর এখনও তার প্রভাব বজায় রেখেছে, যদিও তার লেখার শৈলী প্রায়শই শুষ্ক। কিন্তু তিনি শুধু একজন দার্শনিকই ছিলেন না, প্রাণিবিজ্ঞান,জ্যোতির্বিজ্ঞান,ইতিহাস,রাজনীতি এবং নাটক ইত্যাদি বহু বিষয়েও তিনি আগ্রহী ছিলেন।

৩৮৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মেসিডোনিয়ায় জন্ম গ্রহন করেছিলেন তিনি, প্লেটোর শিক্ষার্থী হিসাবে কিছুদিন পড়াশুনা করার পর, বিভিন্ন দেশ ঘুরে অবশেষে তিনি কিছুদিন আলেক্সান্ডার দি গ্রেট শিক্ষকের দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন, পরে এথেন্সে ফিরে এসে তার নিজের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, লাইসিয়াম। সেই সময়ে লাইসিয়াম সবচেয়ে বিখ্যাত জ্ঞানপীঠ ছিল, কিছুটা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতই। সেখান থেকেই তিনি গবেষকদের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা করার জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিতেন, তাদের কাজ ছিল রাজনীতি থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান যে কোন বিষয়ে কিছু না কিছু নতুন তথ্য সংগ্রহ করে আনা। একই সময় সেখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইব্রেরীও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রেনেসাঁ পর্বের শিল্পী রাফায়েল এর একটি বিখ্যাত দেয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো আছে, দি স্কুল অব এথেন্স, যেখানে আমরা প্লেটোকে উপরের দিকে নির্দেশ করতে দেখি তার বিশুদ্ধ ফর্মের দিকে, এর ঠিক বীপরিত, অ্যারিস্টোটল দৃষ্টি আমরা দেখি তার সামনেই বাস্তব পৃথিবীর দিকে।


রাফায়েল এর আঁকা  ফ্রেস্কো, দি স্কুল অব এথেন্স একটি ডিটেইল ( বায়ে প্লেটো ও ডানে অ্যারিস্টোটল)

প্লেটো হয়তো সন্তুষ্ট ছিলেন এক জায়গায় বসে সব বিষয় নিয়ে দার্শনিক প্রস্তাবনা ও আলোচনা করার জন্য, কিন্তু অ্যারিস্টোটল বাস্তব এই পৃথিবীকে যা আমরা আমাদের সব ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করি,সেটি পর্যবেক্ষন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তার শিক্ষকের থিওরী অব ফর্ম বা সবকিছুর একটি আদর্শ নিখুঁত রুপ আছে এমন প্রস্তাবনা সমর্থন করেননি কখনো। এর পরিবর্তে তিনি বিশ্বাস করতে কোন একটি সাধারন শ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত কোন কিছুকে বুঝতে হলে, সেই শ্রেনীর কোন একটি সুনির্দিষ্ট উদহারণকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। সুতরাং একটা বিড়াল আসলে কি সেটা বোঝার জন্য অ্যারিস্টোটল ভাবতেন সত্যিকারের কোন বিড়ালের দিকেই আমাদের তাকানো উচিৎ, নৈর্ব্যক্তিকভাবে কোন বিড়ালের ফর্মের কথা না ভেবে।

একটি প্রশ্ন যা অ্যারিস্টোটলকে বেশ ভাবিয়েছিল, সেটি হচ্ছে, আমাদের কেমন করে বাঁচা উচিৎ? তার আগে এই প্রশ্ন সক্রেটিস এবং প্লেটোও করেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর খোজার প্রয়োজনীয়তা মূলত মানুষকে দর্শনের দিকে আকৃষ্ট করে। এই প্রশ্নের উত্তরে অ্যারিস্টোটলের একটি নিজস্ব উত্তর আছে, সেই উত্তরের খুব সরলতম সংস্করণটি হচ্ছে: সুখের অনুসন্ধান করা।

কিন্তু সুখের অনুসন্ধান করা – এই বাক্যটি কি আসলে বোঝাচ্ছে? আজ বেশীর ভাগ মানুষকে উপদেশ দেয়া হয় সুখ খোজার জন্য তাদের এমন কিছু উপায় অনুসন্ধান করতে হবে, যা করলে তারা নিজেদেরকে তৃপ্ত করতে পারবে। হয়তো সুখ আপনার জন্য কোন সুন্দর জায়গায় ছুটি কাটানোর সাথে সংশ্লিষ্ট, অথবা কোন সঙ্গীতের অনুষ্ঠান বা পার্টিতে যাওয়া অথবা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো ইত্যাদি। এমনকি এর মানে হতে পারে আপনার প্রিয় বইটা নিয়ে আরাম করে কোথাও বসে পড়া, অথবা কোন আর্ট গ্যালারীতে যাওয়া। কিন্তু যদিও এই সবকিছুই একটি উপভোগ্য জীবনের অংশ হতে পারে ঠিকই, তবে তিনি অবশ্যই বিশ্বাস করতেন না যে এভাবে বাইরে বের হয়ে আনন্দ খোজা, বেঁচে থাকার সবচেয়ে ভালো কোন উপায় হতে পারে। কারণ তার দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব কিছু শুধুমাত্র এর নিজ গুনে একটি ভালো জীবনের নিশ্চয়তা দেয়না। যে গ্রীক শব্দটি অ্যারিস্টোটল ব্যবহার করেছিলেন তার ‘সুখ’ বোঝাতে, সেটি হচ্ছে ইউডাইমোনিয়া (Eudaimonia); প্রায়ই তার এই শব্দটি অনূদিত হয়, ‘সুখ’ এর বদলে বরং ‘সফলতা’ বা ‘সমৃদ্ধি লাভ করা’ হিসাবে। কিন্তু আসলেই এটি – ধরুন আপনার পছন্দের আমের ফ্লেভার দেয়া আইসক্রিম বা আপনার প্রিয় দলকে খেলা জিততে দেখলে যে ধরণের আনন্দময় অনুভূতি হয় – তার থেকেও কিছুটা বেশী। ইউডাইমোনিয়া মানে ক্ষনিকের আনন্দ বা কিভাবে আপনি অনুভব করছেন সেই বিষয়ক নয়, এটি এর চেয়ে আরো বেশী চিন্তানিরপেক্ষ বাস্তব কোন কিছু। এটি বেশ কঠিন বোঝা কারন, আমরা কি অনুভব করছি শুধুমাত্র তার সাথেই সুখকে সংশ্লিষ্ট করতে আমরা খুব বেশী অভ্যস্ত এবং তার বাইরে আমরা বেশী কিছু ভাবতে পারিনা।

একটি ফুল গাছের কথা ভাবুন, আপনি যদি যত্ন করে তাকে পানিতে রাখেন, যথেষ্ট পরিমান আলো দেন, সামান্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন, এটি ঠিক মত বেড়ে উঠবে এবং ফুল ফুটবে। আপনি যদি এটিকে অবহেলা করেন, অন্ধকারে রেখে দেন, এর পাতা পোকামাকড়কে খেতে সুযোগ করে দেন, এটিকে শুকিয়ে যেতে দেন, এটিও ক্রমেই দূর্বল হয়ে মারা যাবে, অথবা নিদেনপক্ষে এটি রুপান্তরিত হবে অনাকর্ষণীয় একটি উদ্ভিদে। মানুষও গাছের মতই ভালো বা খারাপ ভাবে বিকশিত হতে পারে, যদিও গাছের ব্যতিক্রম আমরা আমাদের নিজেদের জন্যই সিদ্ধান্ত নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমরা কি করতে চাই এবং হতে চাই। অ্যারিস্টোটল দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলেন যে মানব প্রকৃতি বলে নিশ্চয়ই কিছু আছে এবং তিনি যেমন করে লিখেছিলেন, এবং মানুষের কিছু নির্দিষ্ট ধরণের কাজ আছে, এবং মানুষ হিসাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে মানানসই হয়, এমন কোন বাচারও উপায় আছে। অন্য যে কোন জীব বা আর অন্যসব কিছু থেকে যা আমাদের আলাদা করে, সেটি হচ্ছে আমরা চিন্তা করতে পারি এবং আমাদের কি করা উচিৎ এই বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এখান থেকেই তিনি উপসংহারে আসেন কোন একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে সেরা জীবনটি হবে সেটি, যেখানে আমরা আমাদের যুক্তির শক্তি ব্যবহার করতে পারি।

বিস্ময়করভাবে, অ্যারিস্টোটল বিশ্বাস করতেন, যে বিষয়গুলো সম্বন্ধে আপনার কোন কিছু জানা নেই-এমন কি আপনার মৃত্যুর পরে ঘটা কোন ঘটনাও -আপনার ইউডাইমোনিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। বিষয়টি শুনতে বেশ অদ্ভুত তাই না। যদি ধরে নেই মুত্যুর পরে কোন জীবন নেই, তাহলে আপনি যখন বেঁচে থাকবেন না, তখন ঘটা এমন কোন কিছু কিভাবে আপনার সুখের উপর প্রভাব ফেলতে পারে? বেশ, ধরুন, আপনি কোন সন্তানের পিতা কিংবা মা, আংশিকভাবে আপনার সুখ নির্ভর করছে সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আপনার আশা-আকাঙ্খার উপর। যদি, দুঃখজনকভাবে, আপনার নিজের মৃত্যুর পর সেই সন্তান গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হয়, তাহলে আপনার ইউডাইমোনিয়া এটি দ্বারা প্রভাবিত হবে। অ্যারিস্টোটলের দৃষ্টিভঙ্গিতে আাপনরা জীবন আরো খারাপ হবে, এমনকি যদিও আপনি আসলে জানতে পারবেনা আপনার সন্তানের অসুস্থতার কথা এবং আপনিও আর জীবিত নন। এটি বেশ সুন্দরভাবে সুখ সংক্রান্ত তার ধারণাটিকে ব্যাখা করে, যা দাবী করছে যে সুখ আপনি কি অনুভব করছেন শুধুমাত্র তার উপর নির্ভর করেনা। সুখ এই অর্থে হচ্ছে আপনার জীবনের সামগ্রিক অর্জন, এমন কোন কিছু যাকে প্রভাবিত করতে পারে, আপনি যাদের জন্য ভাবেন তাদের জীবনে কি ঘটলো সেই বিষয়টিও। আপনার নিয়ন্ত্রনের বাইরের ঘটনাগুলো এবং সেই বিষয়ে আপনার জ্ঞানও একে প্রভাবিত করে। আপনি সুখী কিংবা অসুখী আংশিকভাবে তা নির্ভর করে আপনার ভাগ্য কতটুকু ভালো তার উপর।

মূল প্রশ্নটি হচ্ছে: আমরা কি করতে পারি আমাদের ইউডাইমোনিয়া’র সম্ভাবনা বাড়াতে? অ্যারিস্টোটলের উত্তর ছিল: ‘সঠিক ধরনের চরিত্র গড়ে তোলা।’ সঠিক সময়ে আপনাকে সঠিক ধরনের আবেগ অনুভব করতে হবে এবং এটাই আপনার সঠিক আচরণ নিশ্চিৎ করবে। আংশিকভাবে আপনি কিভাবে প্রতিপালিত হয়েছেন সেটার উপরও বিষয়টি নির্ভর করবে, কারন ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার সেরা উপায়টি হচ্ছে খুব অল্প বয়স থেকেই সেটি অনুশীলন করা। সুতরাং এখানেও ভাগ্যের হাত আছে। ভালো ধরনের আচরণগুলো সদগুন আর খারাপগুলোই হচ্ছে অনাচার।

যুদ্ধের সময় সাহসিকতার সদগুনটির কথা ভাবুন। হয়তো কোন একজন সৈন্যর জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে কিছু বেসামরিক জনতাকে আক্রমনরত সেনাবাহিনী থেকে রক্ষা করার জন্য তার নিজের জীবনকে ঝুকিপূর্ণ কোন এক পরিস্থিতিতে ফেলা। কোন বেপরোয়া সাহসী ব্যক্তি যার নিজের জীবনের নিরাপত্তার ব্যপারে কোন খেয়াল নেই, সে হয়তো কোন বিপদজ্জনক পরিস্থিতিতে ঝাপিয়ে পড়ে, এমনকি এমন কোন সময়েও যখন সেটা করার কোন দরকার নেই। কিন্তু সেটা সত্যিকারের সাহসিকতা নয়, শুধুমাত্র বেপরোয়া ঝুকি নেয়া। এর অন্যপ্রান্তে আছে, কোন ভীরু সৈন্য, যে তার ভয়কে যথেষ্ট পরিমানে জয় করতে পারেনা এমন কোন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে আচরণ করার জন্য। এবং যখন তাকে সবচেয়ে প্রয়োজন সেই বিশেষ মুহুর্তেই হয়তো সে ভয়ে অবশ হয়ে যাবে। একজন সাহসী মানুষ এই পরিস্থিতিতে ঠিকই ভয় অনুভব করবে, কিন্তু সেই ভয়কে সে জয় করতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। অ্যারিস্টোটল ভাবতেন এধরনের যে কোন সদগুনই অবস্থান করে এধরনের দুটি চরম প্রান্তের মাঝামাঝি কোন স্থানে। এখানে সাহসিকতা, ভীরুতা ও বেপরোয়া সাহসিকতার মাঝামাঝি অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে এটিকে বলা হয় অ্যারিস্টোটল এর ডকট্রিন অব দি গোল্ডেন মিন (Doctrine of the golden mean) বা আদর্শ গড় এর মতবাদ।

নৈতিকতার প্রতি অ্যারিস্টোটলে দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র ঐতিহাসিকভাবে কৌতুহলের ব্যাপার না। বহু আধুনিক দার্শনিকও বিশ্বাস করেন, সদগুন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত তার দৃষ্টিভঙ্গিটি সঠিক, এবং সুখ সংক্রান্ত বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিটিও ছিল সঠিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী। জীবনের আনন্দ বাড়াবার উপায়গুলো খোজার পরিবর্তে, তারা মনে করেন, আমাদের সবার চেষ্টা করা উচিৎ ভালো মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করা এবং সঠিক কাজটি করা। এবং এটাই জীবনকে সুন্দর ও সুখী করে তোলে।

এই সবকিছুই শুনলে মনে হয় যেন অ্যারিস্টোটল একক ব্যাক্তির ব্যক্তিগত জীবনের বিকাশ বা উন্নতিতে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তিনি বিষয়টি বলেছিলেন আরো বড় পরিসরের কথা ভেবে। তিনি যুক্তি দেন, মানুষ হচ্ছে রাজনৈতিক জীব, আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় একটি কাজ হচ্ছে অন্য মানুষের সাথেও ভালোভাবে বাস করার মত উপযুক্ত হওয়া এবং আমাদের একটি ন্যায়বিচার নিশ্চিৎ করার পদ্ধতিরও প্রয়োজন, যা আমাদের প্রকৃতির খারাপ দিকগুলোর সাথে বোঝাপড়া করতে আমাদের সাহায্য করবে। ইউডাইমোনিয়া শুধুমাত্র অর্জন করা সম্ভব কোন একটি সমাজের অভ্যন্তরে কাটানো সংশ্লিষ্ট সমগ্র জীবনে। আমরা একসাথে বাস করি এবং আমাদের সুখ খোজা প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে আমাদের চারপাশে সবার সাথে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।

অ্যারিস্টোটলের দুর্দান্ত মেধার একটি দুর্ভাগ্যজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে যদিও। তিনি খুবই বুদ্ধিমান ছিলেন, এবং তার গবেষনা এত বেশী গভীর এবং বিস্তারিত ছিল, যে অনেকেই যারা তার লেখা পড়েছেন বিশ্বাস করতেন তিনি সব বিষয়ে ঠিক কথা বলেছেন। আর এটি প্রগতির জন্য সহায়ক ছিলনা, সক্রেটিসের সূচনা করা দর্শনের ঐতিহ্যবাহিকতার ধারাতেও সেটি মঙ্গলজনক নয়। তার মুত্যুর পর বহু শতাব্দী বেশীর ভাগ গবেষকই পৃথিবী সম্বন্ধে তার সব দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নাতীতভাবে সত্য হিসাবে গ্রহন করে নিয়েছিলেন। যদি তারা কোনভাবে প্রমাণ করতে পারতেন, অ্যারিস্টোটল এই কথা বলেছেন, তাদের জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল, এবং এটাকে মাঝে মাঝে বলা হয়, ‘ট্রুথ বাই অথরিটি’ বা কোন কিছুকে সত্য বলে বিশ্বাস করা কারন কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা কেউ এটিকে সত্য বলেছে ।

আপনি কি মনে করেন ঘটতে পারে যদি আপনি একই আকারের একটুকরো কাঠ আর একটুকরো ভারী কোন ধাতু কোন একটি উচু জায়গা থেকে নীচে ফেলেন? কোনটি আগে মাটিতে পড়বে? অ্যারিস্টোটল ভেবেছিলেন, যেটা ভারী, যেটা বানানো হয়েছে ভারী ধাতু দিয়ে সেটি আগে মাটিতে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে সেরকম ঘটে না, তারা একই গতিতে মাটিতে পড়ে ।কিন্তু যেহেতু অ্যারিস্টোটল বলেছেন এটাই সত্যি, পুরো মধ্যযুগ ধরে প্রায় সবাই ভেবেছেন এটাই অবশ্যই সত্যি। আর কোন প্রমানের দরকার পড়েনি। কিন্ত ষোড়শ শতাব্দীতে গ্যালিলিও গ্যালিলেই পিসার হেলানো টাওয়ারের উপর থেকে একটি কাঠের বল আর একটি কামানের বল একই সাথে নীচে ফেলেছিলেন এই বিষয়টিকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য। দুটোই একই সাথে মাটিতে পড়েছিল। সুতরাং অ্যারিস্টোটল তাহলে ঠিক বলেননি। কিন্তু বহু আগেই এই পরীক্ষাটি খুব সহজে যে কেউই করতে পারতেন।

অন্য কারো মতামত আর কর্তৃত্বের উপর নির্ভর করে কোন কিছু মেনে নেয়া ছিল এমনকি অ্যারিস্টোটলের গবেষনারও মূল প্রাণশক্তির বিরুদ্ধে, এটি দর্শনের মুল চালিকা শক্তিরও বিরুদ্ধে। কোন কর্তৃত্ব নিজেই কোন কিছু প্রমান করতে পারেননা। অ্যারিস্টোটলের নিজের পদ্ধতি ছিল, পরীক্ষা, গবেষনা এবং সুস্পষ্ট যুক্তি। দর্শন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বিতর্কের জন্য, ভূল প্রমানিত হবার সম্ভাবনায়, প্রতিদ্বন্দী দৃষ্টিভঙ্গীকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে। সৌভাগ্যক্রমেই, প্রতিটি যুগেই দার্শনিকরা ছিলেন তারা গভীরভাবে নিরীক্ষাধর্মী পর্যালোচনা করেছেন, যা কিনা অন্য মানুষরা তাদের বলেছেন অবশ্যই বিশ্বাস করার জন্য। একজন দার্শনিক যিনি কিনা একেবারে সবকিছু নিয়ে নিরীক্ষামূলক পর্যালোচনার বিষয় করেছিলেন তিনি ছিলেন সন্দেহবাদী পিরো (Pyrrho), তার কথা আমরা পরবর্তী পর্বে জানবো।

Advertisements
দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ২ : সত্যিকারের সুখ

One thought on “দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ২ : সত্যিকারের সুখ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s