দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ১ : যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন..

সক্রেটিস

প্রায় ২৪০০ বছর আগে এথেন্সে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল অতিরিক্ত বেশী প্রশ্ন করার জন্য। তার আগেও বহু দার্শনিকরা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সক্রেটিস এর হাত ধরেই এই দর্শন বিষয়টি সত্যিকারভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। দর্শনের যদি কোন পৃষ্ঠপোষক সেইন্ট থেকে থাকেন, তিনি হলেন সক্রেটিস।

চ্যাপটা নাক, মোটা,বেঁটে, অগোছালো, নোংরা এবং বেশ অদ্ভুত প্রকৃতির সক্রেটিস সেই সমাজে ঠিক মানানসই ছিলেন না। যদিও শারীরিকভাবে তিনি কুৎসিত ছিলেন, প্রায়ই তিনি গোছল করতেন না, তবে তার ব্যক্তিত্বে ছিল অদ্ভুত একধরনের আকর্ষনীয়তা এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি। এথেন্স এর সবাই একমত ছিলেন অন্তত একটা বিষয়ে, তার মত এমন কাউকে আর কখনোই দেখা যায়নি এর আগে এবং সম্ভবত আর কখনোই দেখা পাওয়া যাবেনা। তিনি খুবই অনন্য একজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন খুবই বিরক্তিকরও। তিনি নিজেকে দেখতেন ঘোড়া বা গবাদীপশুর গায়ে কামড়ানো বিরক্তিকর মাছি, গ্যাডফ্লাই বা গোমাছির মত। তারা বিরক্তিকর তবে বড় কোন ধরণের ক্ষতি করেনা। তবে এথেন্সের সবাই অবশ্য তা মনে করতেন না। কিছু মানুষ তাকে ভালোবাসতেন ঠিকই তবে বেশীরভাগ মানুষরাই তাকে ভাবতেন বিপজ্জনক একজন ব্যক্তি হিসাবে, যিনি অনেককেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন।

তারুণ্যে তিনি ছিলেন সাহসী একজন সৈন্য, স্পার্টা এবং তাদের জোটের বিরুদ্ধে পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধে এথেন্সের হয়ে তিনি যুদ্ধ করেছিলেন। মধ্যবয়সে তাকে এথেন্সের বাজারে এলোমেলোভাবে হাটতে দেখা যেত, মাঝে মাঝে তিনি অন্যদের থামিয়ে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করতেন। কম বেশী মোটামুটিভাবে তিনি শুধু এই কাজটিই করতেন। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো তিনি করতেন সেগুলো ছিল ছুরির মত ধারালো। প্রশ্নগুলো খুব সহজ মনে হতো, কিন্তু সেগুলো আদৌ সহজ কোন প্রশ্ন ছিলনা। এর একটি উদহারন যেমন হতে পারে ইউথাইডেমুস এর সাথে তার একটি কথোপকথনে বা সংলাপে। সক্রেটিস তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ছলনাপূর্ণ হয়ে কোন কাজ করা কি অনৈতিক মনে করা যেতে পারে? ‘অবশ্যই অনৈতিক’ ইউথাইডেমুস জবাব দেন, তিনি ভেবেছিলেন এর উত্তরতো স্পষ্ট। সক্রেটিস তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, বেশ তাহলে ধরুন, যদি আপনার এক বন্ধু যে খুবই হতাশাগ্রস্ত এবং আত্মহত্যা করতে পারে, আপনি তার ছুরিটা চুরি করলেন? সেটা কি একটি ছলনাপূর্ণ কাজ হবে না? অবশ্যই হবে, কিন্তু এমন কোন কাজ কি অনৈতিক না হয়ে বরং নৈতিক হবার কি কথা নয়? যদিও এটি ছলনাপূর্ণ একটি কাজ, কিন্তু তারপরও তো এটি ভালো একটি কাজ যার উদ্দেশ্য বন্ধুর জীবন বাঁচানো – খারাপ কোন কাজ নয়। হ্যা, ইউথাইডেমুস উত্তর দেন, ততক্ষনে তিনি সক্রেটিসের প্রশ্নে জালে জড়িয়ে গেছেন। সক্রেটিস ঠিক এভাবে বুদ্ধিমানের মত বীপরিত একটি উদহারণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, ইউথাইডেমুস এর সাধারণ মন্তব্য যে, ছলনাপূর্ণ কোন কিছু মানেই অনৈতিক, এই প্রস্তাবটি আসলে সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য না। ইউথাইডেমুস বিষয়টি এর আগে কোনদিনও বুঝতে পারেননি। বারবার সক্রেটিস প্রমান করেন যে, বাজারে যে সব মানুষগুলোর সাথে তার দেখা হচ্ছে, তারা যা কিছু জানেন বলে ভাবেন, আসলেই তারা সেটি জানেন না। কোন এক সামরিক সেনানায়ক হয়তো আত্মবিশ্বাসের সাথে কথোপকথন শরু করলেন যে তিনি জানের ’সাহস;’ বলতে কি বোঝায়, কিন্তু সক্রেটিসের সাথে তার বিশ মিনিট বাদানুবাদের পরে তিনি পুরোপুরিভাবে সংশয়গ্রস্থ হয়ে পড়তেন। এই অভিজ্ঞতাটি নিশ্চয়ই খুব অসস্তিকর ছিল বহু মানুষের জন্য।

মানুষ আসলে সত্যিকারভাবে কতটুকু বুঝতে পারে তার সীমাটি দেখিয়ে দিতে সক্রেটিস ভালোবাসতেন এবং তিনি সেই সব ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করতেন, যার উপর ভিত্তি করে তারা তাদের জীবন গড়ে তুলেছে। কোন একটি কথোপকথন যদি শেষ হয় এমন কোনভাবে, যেখানে সবাই অনুধাবন করতে পারেন যে, আসলেই তারা কত অল্প জানেন, সেটি সক্রেটিসের জন্য ছিল একটি সফলতা। সক্রেটিসের মতে অবশ্যই যা অনেক বেশী ভালো সেটি হচ্ছে, কোন কিছুকে বুঝতে পারছেন বলে এমন ভ্রান্ত একটি বিশ্বাস বহন করে যাওয়ার বদলে যদি আপনি স্বীকার করে নেন আসলে ব্যাপারটি আপনি ঠিকমত বোঝেননি।

সেই সময় এথেন্স এর ধনী ব্যক্তিদের ছেলেদের পড়তে পাঠানো হতে সফিস্টদের কাছে। সফিস্টরা আসলে ছিলেন বুদ্ধিমান শিক্ষক, যারা তাদের ছাত্রদের শেখাতেন কিভাবে বক্তৃতা দিতে হয়। আর এই কাজটি করার জন্য তার মোটা অংকের পারিশ্রমিক নিতেন। কিন্তু এর ব্যতিক্রম, সক্রেটিস কোন কিছু শেখানোর জন্য পয়সা নিতেন না। বাস্তবিকভাবে তিনি দাবী করতেন যে তিনি আসলে কিছুই জানেনা না, সুতরাং কিভাবে তিনি আদৌ কাউকে কোন কিছু শেখাতে পারবেন? তবে এই দাবী অবশ্য তার কাছে ছাত্রদের শিখতে আসা বন্ধ করতে পারেনি, তার কথোকথন শোনার জন্যই তারা জড়ো হতেন দল বেধে। বিষয়টি তাকে সফিস্টদের কাছে মোটেও জনপ্রিয় করেনি।

একদিন তার বন্ধু শেরেফোন ডেলফিতে অ্যাপোলোর ওরাকল এর কাছে গিয়েছিলেন। ওরাকল হচ্ছেন একজন জ্ঞানী বৃদ্ধ মহিলা, একজন সিবিল, মন্দিরে আসা দর্শনার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন তিনি। তার উত্তরগুলো সাধারণত হতো ধাধার মত। শেরোফোন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কি কোন ব্যক্তি আছে? ‘না’ উত্তর এলো, ‘ সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী আর কেউ নেই’। যখন শেরোফোন সক্রেটিসকে বিষয়টি জানান, তিনি প্রথমে এটি বিশ্বাস করেননি। আসলেই তাকে অবাক করেছিল, ‘ আমি কিভাবে এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ হই যখন আমি এত কম জানি?’ তিনি ভাবলেন। তিনি তার জীবনের বহু বছর ব্যয় করেছিলেন, তারচেয়ে কেউ বেশী জ্ঞানী আছেন কিনা সেটি জানতে। অবশেষে তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ওরাকল আসলে কি বলতে চাইছে এবং তার কথাও ঠিক। বহু মানুষ সেই বিষয়টি ভালো জানেন তারা সাধারণত যেটি করেন – কাঠমিস্ত্রী কাঠের কাজে ভালো, সৈন্যরা জানে যুদ্ধ করতে – কিন্তু তাদের কেউই আসলে সত্যিকারভাবে জ্ঞানী নন। তারা আসলেই জানেন না কি বিষয় নিয়ে তারা কথা বলছেন।

দার্শনিকের ইংরেজী শব্দ ‘ফিলোসফার’ শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ থেকে যার অর্থ জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। পশ্চিমা দর্শনের প্রচলিত ধারাটি বিস্তার লাভ করেছিল প্রাচীন গ্রীস থেকে বিশ্বের বহু জায়গায়, কখনো এটি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে প্রাচ্য দর্শনের সংমিশ্রনে ও মিথস্ক্রিয়ায়। যে ধরণের জ্ঞানকে দর্শন মূল্য দেয়, তার ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি, তর্ক এবং প্রশ্ন করা, আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ কেউ কিছু সত্যি বলেছে শুধুমাত্র সেই কারণে সেটি বিশ্বাস করা নয়। সক্রেটিসের কাছে জ্ঞান মানে অনেক বাস্তব তথ্য জানা নয় বা কোন কিছু কিভাবে করতে হয় সেটি জানা নয়। এর মানে হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের সত্যিকার প্রকৃতিটিকে অনুধাবন করা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আমরা কতটুকু জানতে পারি তার সীমানাও।

আজকের যুগে দার্শনিকরা কম বেশী সেই কাজটি করছেন যা সক্রেটিস করেছিলেন: কঠিন সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা, যুক্তি এবং প্রমান পর্যালোচনা করা, চেষ্টা করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য, বাস্তবতার প্রকৃতি সম্বন্ধে এবং কেমন ভাবে আমাদের বাচা উচিৎ ইত্যাদি বিষয়ে যে প্রশ্নগুলো আমরা আমাদের নিজেদের করতে পারি। সক্রেটিসের চেয়ে বর্তমান দার্শনিকরা ব্যতিক্রম শুধুমাত্র তাদের চিন্তার ভিত্তি তৈরী করে দেবার জন্য গত আড়াই হাজার বছরের দার্শনিক ধ্যান-ধারণা বিদ্যমান। কিন্তু সেই ধারাটির সূচনা করেছিলেন সক্রেটিস।

সক্রেটিসকে এত জ্ঞানী বানিয়েছিল যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে, তিনি তার প্রশ্ন করা কখনোই থামাননি এবং তার নিজের যে কোন ধারনা নিয়ে তিনি সবসময় প্রস্তুত থাকতেন বিতর্ক করার জন্য। তিনি বলতেন, এই জীবন ধারন করার তখনই মুল্য আছে যদি আপনি কি করছেন সেই বিষয়ে চিন্তা করেন; অপরীক্ষিত কোন অস্তিত্ব গবাদী পশুদের জন্য ঠিক আছে, মানুষের জন্য ঠিক নয়।

দার্শনিকদের ক্ষেত্রে যেটা বেমানান, সক্রেটিস কোন কিছু লিখে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তার কাছে লেখার চেয়ে বরং কথা বলা অনেক বেশী উত্তম। লিখিত কোন শব্দ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা; তারা আপনাকে কোন কিছু বোঝাতে পারেনা যখন আপনি পড়ে সেটি বুঝতে পারবেন না। মুখোমুখি কথোপকথন অনেক বেশী উত্তম, তিনি মনে করতেন, কারন কথা বলার সময় কোন ধরনের মানুষের সাথে আমরা কথা বলছি সেটা বিবেচনায় আনা যায়, এবং আমরা ঠিক সেইভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারি আমরা যা বলছি সেটি যেন অপর পক্ষের কাছে বোধগম্য হয়। যেহেতু তিনি কোন কিছু লিখে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন, প্রধানত সক্রেটিসের বিখ্যাত তারকা ছাত্র প্লেটোর মাধ্যমে বেশীর ভাগ ধারনা পাই – এই মহান মানুষটা কি বিশ্বাস করতেন, কি নিয়ে তর্ক করতেন। প্লেটো সক্রেটিস এবং যে সব মানুষদের তিনি প্রশ্ন করতেন তাদের কথোপকথগুলো ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু বই হিসাবে লিখে গিয়েছিলেন। যা পরিচিত প্লেটোনিক ডায়ালগস হিসাবে। দর্শনতো বটেই তারা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও অনন্য সৃষ্টি – কোন একটি উপায়ে প্লেটো ছিলেন সেই যুগের শেকসপিয়ার। তার এই সব ডায়ালগ বা সংলাপগুলো পড়ে আমরা একটা ধারণা পাই সক্রেটিস কেমন ছিলেন, তিনি কত বুদ্ধিমান ছিলেন, কিভাবে তিনি বেশ কিছু মানুষের ক্রোধের কারণ হয়েছিলেন।


প্লেটো

কিন্তু আসলেই ব্যপারটা এত সরল ছিল না, যেমন আমরা কিন্তু সবসময় নিশ্চিৎ হয়ে বলতে পারিনা, প্লেটো কি সত্যি সক্রেটিস যা বলে গেছেন সেটি লিখেছেন নাকি তার নিজের সৃষ্ট সক্রেটিস নামের একটি চরিত্রের মুখে তার নিজের ধারণাগুলো তুলে দিয়েছিলেন। তবে তাদের মধ্যে একটি ধারনা বেশীরভাগ মানুষই সক্রেটিস নয় বরং প্লেটোর নিজের ধারণা বলেই মনে করেন সেটি হচ্ছে, পৃথিবীকে আমরা যেমন মনে করি, সেটি আসলে সে রকম নয়। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের সামনে আমরা যা দেখি তা আসলে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভিন্ন বাস্তবতা থেকে। আমরা বেশীর ভাগ মানুষই এই বাহ্যত রুপগুলো বাস্তবতা হিসাবে মনে করি। আমরা মনে করে আমরা বুঝতে পারছি কিন্তু আমরা আসলে পারছি না।

প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে শুধুমাত্র দার্শনিকরাই বুঝতে পারেন এই পৃথিবীটা সত্যিকারের কেমন। তারা বাস্তবতার প্রকৃতি আবিষ্কার করেন তাদের কোন ইন্দ্রিয়ের উপর ভরসা না করে বরং চিন্তা করে। তার এই এই ভাবনাটি বোঝাতে তিনি একটি গুহার বর্ণনা দেন। আর সেই কাল্পনিক গুহায় মানুষরা একটি দেয়ালের দিকে মুখ করে শৃঙ্খলিত হয়ে আছে। তাদের সামনে তারা শুধু দেখতে পারছে কম্পমান ছায়াগুলো, যা তারা বিশ্বাস করছে সত্যি কোন কিছু হিসাবে, কিন্তু তারা বাস্তব নয়। তারা যা দেখতে পারছে সেটি হলো তাদের পিছনের আগুনের সামনে ধরে রাখা কোন কিছুর ছায়া যা তাদের সামনের দেয়ালে পড়ছে। এই মানুষগুলো তাদের সারাটা জীবন অতিবাহিত করে দেয়ালের উপর প্রক্ষেপিত ছায়াগুলোকে বাস্তব পৃথিবী হিসাবে ভেবে।

তারপর তাদের মধ্যে কোন একজন তার শৃঙ্খল ভেঙ্গে পেছনে যখন আগুনের দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে সবকিছু প্রথমে ঝাপসা মনে হয়, তারপর সে দেখতে পারে আসলে সে অবস্থান করছে। সে হোচট খেতে খেতে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সুর্যের দিকে তাকাতে সক্ষম হয়। এরপর যখন সে গুহায় আবার ফিরে আসে, বাইরের পৃথিবী সম্বন্ধে সে যা কিছু অন্যদের বলে কেউই পারেনা বিশ্বাস করতে। যে মানুষটি তার শৃঙ্খলিত জীবন থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে দার্শনিকের মত। সাধারন মানুষের খুব সামান্যই ধারণা আছে বাস্তবতা সম্বন্ধে, কারন গভীরভাবে ভাবার বদলে তাদের সামনে যা আছে তা দেখেই তারা সন্তুষ্ট। কিন্তু এই চোখে যা দেখি সেটি ছলনাময়, তারা যা দেখে সেটি হচ্ছে ছায়া, বাস্তবতা না। এই গুহার গল্প সংশ্লিষ্ট প্লেটো সেই প্রস্তাবের সাথে, যা আমাদের কাছে পরিচিত, থিওরী অব ফর্মস নামে। তার এই দার্শনিক প্রস্তাবনাটি বোঝার সবচেয়ে সহজতম উপায় হতে পারে একটি উদহারণের মাধ্যমে : আপনি আপনার সারা জীবনে যতগুলো বৃত্ত দেখেছেন সেগুলোর কথা ভাবুন। তাদের কোনোটা কি একেবারে নিখুঁত বৃত্ত? না, তাদের কোনটাই একেবারে ক্রটিহীন নিখুঁততম বৃত্ত নয়। কোন একটি নিখুঁত বৃত্তে এর পরিধির উপর যে কোন বিন্দু এর কেন্দ্র থেকে সমান দুরত্বে অবস্থান করবে। বাস্তব বৃত্তগুলো কখনোই্ এটি পুরোপুরিভাবে অর্জন করতে পারেনা। কিন্তু আপনি বুঝতে পেরেছেন, আমি যখন নিখুঁত বৃত্তের কথা বলছি আমি আসলে কি বোঝাতে চাইছি।

বেশ, তাহলে এই নিখুঁত বৃত্তটা আসলে কি? প্লেটো বলবেন কোন একটি নিখুঁত বৃত্তের ধারণাটাই কোন একটি বৃত্তের ফর্ম। আপনি যদি বুঝতে চান একটি বৃত্ত আসলে কি, আপনাকে বৃত্তের ফর্মের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে, সত্যিকারের বৃত্তের উপর না যা কিনা আপনি আঁকতে পারেন এবং আপনার দর্শনেন্দ্রিয় দিয়ে সেটি অভিজ্ঞতায় অনুভব করতে পারবেন, যাদের প্রতিটি কোন না কোনভাবে ক্রটিপূর্ণ। এভাবে প্লেটো ভাবতেন, আপনি যদি ভালোত্ব কি বুঝতে চান, তাহলে আপনাকে মনোযোগ দিতে হবে ভালোত্বর ফর্মের উপর, বিশেষ কোন ভালোত্ব পরিচায়ক ঘটনার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নয় যার স্বাক্ষী আপনি ছিলেন। দার্শনিকরা হচ্ছে সেই মানুষগুলো যারা সবচেয়ে বেশী প্রস্তুত আর যোগ্য এভাবে নৈর্ব্যক্তিক উপায়ে ফর্মগুলো নিয়ে ভাবার জন্য। সাধারন মানুষ মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে দিকভ্রান্ত হয় তাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভূত আর অভিজ্ঞ পৃথিবীর দ্বারা। কারণ দার্শনিকরা খুব দক্ষ বাস্তবতা নিয়ে ভাবার জন্য।

প্লেটো বিশ্বাস করতেন দার্শনিকদের হাতেই থাকা উচিৎ সব রাজনৈতিক শক্তি। দি রিপাবলিক,তার বিখ্যাত বইটিতে তিনি একটি কাল্পনিক নিখুঁত সমাজের কথা বর্ণনা করেছিলেন। যেখানে দার্শনিকরা থাকবে সমাজের উচ্চতম স্তরে এবং তারা তারা বিশেষ শিক্ষা লাভ করবেন। কিন্তু তারা নিজেদের সুখ-সাচ্ছন্দ বিসর্জন দেবেন যে নাগরিকদের তারা শাসন করছেন তাদের কল্যানে। তাদের নীচের স্তরে থাকবে সৈন্যরা, যারা দেশে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবে এবং তাদের নীচে যারা আছেন তারা হচ্ছেন শ্রমিক। এই তিন গ্রুপের মানুষ নিখুত একটি ভারসাম্যে অবস্থান করবেন। প্লেটো ভাবতেন, এমন একটি ভারসাম্যময়তা যা কিনা সু-ভারসাম্যময় মনের মত, যেখানে যৌক্তিক অংশটি আবেগ আর কামনার উপর তার নিয়ন্ত্রন রাখবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার সমাজের মডেল গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক এবং যা জনগনকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে মিথ্যাচার এবং বলপ্রয়োগের মিশ্রণ দ্বারা। তিনি হয়তো সব ধরণের শিল্পকলাকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করতেন, তিনি ভাবতেন শিল্পকলা বাস্তবতার একটি মিথ্যা প্রতিনিধিত্ব করছে এই অভিযোগে। চিত্রকর নানা দৃশ্য ও রুপ আকেন যারা তার ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেন, কিন্তু ফর্ম সম্বন্ধে সঠিক তথ্য দেয়না এনসব ইন্দ্রিয়গোচর রুপগুলো। প্লেটোর আদর্শে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র প্রজাতন্ত্র দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন হবে উপর থেকে। এমন কোন রাষ্ট্রকে আমরা বলি কর্তৃত্ববাদী কোন একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র। প্লেটো ভাবতেন সব মানুষকে ভোট দেবার অধিকার দেয়া মানে যাত্রীদের জাহাজ চালানোর করার সুযোগ দেয়া – সেজন্য তার মতে অনেক উত্তম, যারা ভালোভাবে জানেন কি করতে হবে কেবল তাদেরই দ্বায়িত্বে থাকা উচিৎ।

প্লেটো তার দি রিপাবলিকে যে ধরনের রাষ্ট্রের কথা কল্পনা করেছিলেন, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর এথেন্স তার থেকে খুবই ভিন্ন ছিল।সেখানে এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল, যদিও জনসংখ্যার শুধুমাত্র দশ শতাংশ ভোট দেবার অধিকার রাখতেন। নারী এবং ক্রীতদাসরা যেমন, এই অধিকার থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু সব নাগরিকরাই রাষ্ট্রের আইনের চোখে ছিলে সমান। এবং সেখানে জটিল সুপরিকল্পিত লটারী পদ্ধতি ছিল যা নিশ্চিৎ করতো যে প্রত্যেকেই যেন একটি নায্য সুযোগ পায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রভাবিত করার জন্য।

প্লেটো তার শিক্ষক সক্রেটিসকে যেভাবে উচ্চ মুল্যায়ন করতেন এথেন্স সেভাবে করেনি। মূল্যায়ন তো দুরের কথা, বহু এথেন্সবাদী অনুভব করেছিলেন সক্রেটিস হচ্ছেন বিপজ্জনক এবং তিনি পরিকল্পিতভাবে তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অবমূল্যায়ন করছেন। ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যখন সক্রেটিসের বয়স সত্তর, তাদের একজন, মেলেতুস, তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাড় করান। তিনি দাবী করেন সক্রেটিস এথেন্সবাসীদের উপাস্য দেবতাদের অবহেলা করছেন, এবং নিজের দেবতাদের দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি আরো অভিযোগ আনেন যে সক্রেটিস এথেন্স এর তরুণদের খারাপ আচরণ করার জন্য উৎসাহিত করছেন, তাদেরকে উস্কে দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আচরণ করতে। দুটোই খব ভয়ঙ্কর অভিযোগ ছিল সেই সময়ের এথেন্সে। খুবই কঠিন আমাদের পক্ষে জানা তাদের এই অভিযোগে আদৌ কোন সত্যতা ছিল, হয়তো সক্রেটিস সত্যিই তার ছাত্রদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম অনুসরণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, এবং কিছু প্রমান আছে যেখানে তিনি এথেন্সের গণতন্ত্রকে উপহাস করে তিনি আনন্দ পেতেন। এই দুটোই তার চরিত্রের সাথে মানানসই হতে পারে। তবে যে বিষয়টা নিশ্চিৎ ছিল সেটি হচ্ছে বহু এথেন্সবাসী সত্যিকারভাবে তার প্রতি আনীত এই অভিযোগগুলো বিশ্বাস করেছিলেন।

যুক্তি তর্ক পরিশেষে তারা ভোট গ্রহন করেন সক্রেটিস দোষী না নির্দোষ এমন প্রস্তাবনায়, ৫০১ জন নাগরিক, যারা এই বিচারে সুবিশাল আকারের জুরির দ্বায়িত্বে ছিলেন, তাদের অর্ধেকের চেয়ে সামান্য কিছু বেশী এথেন্সবাসী ভোট দেন, হ্যা সক্রেটিস দোষী। সক্রেটিস যদি চাইতেন তিনি সম্ভবত তার মৃত্যুদন্ডটি এড়াতে পারতেন তার কথার মাধ্যমে। কিন্তু এর পরিবর্তে, গোমাছির মত তার পরিচিতির সত্যতা প্রমান করেন, তিনি এথেন্সবাসীদের আরো ক্ষেপিয়ে তোলেন যুক্তি দিয়ে যে, তিনি কোন ভূল কিছু করেননি এবং তাদের উচিৎ হবে, বাস্তবিকভাবে, শাস্তির বদলে তাকে সারাজীবন ধরে বিনামুল্যে খাদ্য সরবরাহ করা। তার এই প্রস্তাব অবশ্যই জুরীদের সহানুভূতি অর্জন করেনি।

তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় বিষপানে বাধ্য করে, হেমলক নামের একটি উদ্ভিদ থেকে বানানো এই বিষটি ধীরে ধীরে সারা শরীরকে অবশ করে দেয়। সক্রেটিস তার স্ত্রী ও তিন ছেলেকে বিদায় জানান এবং তারপর চারপাশে তার ছাত্রদের জড়ো করেন এবং বলেন, যদি তাকে সুযোগ দেয়া হত নীরবে, কোন কঠিন প্রশ্ন করে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দেবার জন্য, তিনি সেটি গ্রহন করতেন না, এরচেয়ে তার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়তর। তিনি তার নিজের ভিতর একটি কন্ঠস্বর শুনতে পেতেন যা তাকে প্রতিটি বিষয় সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে বলতো, এবং তিনি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারতেন না। এরপর তিনি একটি পাত্র থেকে বিষপান করেন এবং খুব শীঘ্রই মারা যান।

প্লেটোর সংলাপ বা ডায়ালগে, যদিও, সক্রেটিস এখনও জীবিত। এই কঠিন মানুষটি, যিনি সারাক্ষনই প্রশ্ন করতেন, এবং মৃত্যুকে শ্রেয়তর মনে করতেন কোন কিছু আসলেই কি সেই বিষয়ে চিন্তা করা থামানোর বদলে, সেই সময় থেকেই সব দার্শনিকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। সক্রেটিসের তাৎক্ষনিক প্রভাব আমরা দেখতে পাই সেই সব ছাত্রদের মধ্যে যারা তার কাছে ছিলেন। শিক্ষকের মৃত্যু হলে প্লেটোই সক্রেটিসের চিন্তা,চেতনা আর প্রাণশক্তিটিকে বহন করে নিয়ে যান বহুদুর। তবে প্লেটোর সবচেয়ে সমীহ জাগানো ছাত্রটি ছিল অ্যারিস্টোটল, যিনি সক্রেটিস এবং প্লেটো দুজন থেকে খুব ভিন্ন ছিলেন।

(চলবে)

Advertisements
দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ১ : যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন..

One thought on “দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ১ : যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন..

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s