রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : ষষ্ঠ অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

060406.tiktaalik-3

060406.tiktaalik-1
ছবি: ২০০৪ সালে কানাডীয় আর্কটিক বা উত্তর মেরুর এলসমেয়ার দ্বীপে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীল শুবিন ও তার সহযোগীরা খুজে পেয়েছিলে এই জীবাশ্ম প্রজাতিটিকে, এর নাম  Tiktaalik roseae, উপরের ছবিতে প্রজাতিটিকে মডেল হিসাবে দেখানো হয়েছে  ৩৭৫ মিলিয়ন বছর আগে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে। টিকটালিক (টিকটালিক এর অর্থ ‘‘সুপেয় বা অলবনাক্ত পানির বড় মাছ’, স্থানীয় এলেসমেয়ার দ্বীপের আদিবাসীদের ইনুকটিটাট ভাষার একটি শব্দ) মাছ এবং প্রথম স্থলে বসবাসকারী মানুষসহ সকল স্থলচর মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে বিবর্তনীয় শুন্য স্থানটি পুরণ করেছে, সেকারনেই এটি মাছ এবং প্রথম স্থলবাসী মেরুদন্ডীদের মধ্যে এটি একটি মিসিং লিঙ্ক।৩৭৫ মিলিয়ন বছর প্রাচীন এই প্রানীটির ছিল কনুই কব্জিসহ পুর্ণ হাত, নমনীয় ও স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করা যায় এমন একটি ঘাড় , যেহেতু পানির নীচে ছিল এদের বসবাস, তখনও ফুলকা ব্যবহার করে নিঃশ্বাস নিতে হত তাদের। মাঝের ছবিটি কার্ল ব্রুয়েল এর আকা টিকটালিকের একটি কাল্পনিক ছবি তার নিজস্ব পরিবেশে। নীচের ছবিটি দেখাচ্ছে জীবাশ্ম রেকর্ডে ৩৮০ মিলিয়ন বছর  আগের মাছ  এবং ৩৬০ মিলিয়ন বছর আগে, চারপেয়ে মেরুদন্ডী প্রানী যারা স্থলে বসবাস উপযোগী, এর মাঝখানে টিকটালিক, যার লোব বা শক্ত ফিনযুক্ত মাছের মতই ফিন ছিল, পানির নীচে শ্বাস নেবার জন্য ফুলকা ছিল, আশ বা স্কেল ছিল, এছাড়া চোয়ালের গঠনও ছিল আদিম, তবে পরবর্তীতে জীবাশ্ম রেকর্ডে আবির্ভুত হওয়া স্থলবাসী টেট্রাপডদের মতই এর ছিল স্বতন্ত্র ঘাড়, চ্যাপটা মাথা, কব্জি, ফুসফুস ব্যবহার করার জন্য বাইরের দিকে প্রসারমান পাজরের হাড় । (ছবি সুত্র); এবং সংশ্লিষ্ট একটি ভিডিও এখানে

coelacanth_unique_char SAIAB_Coelocanth_sml_680pxছবি:  Coelacanth সিলোকান্থ খুব দুর্লভ এই প্রানী প্রজাতিটি আকস্মিকভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। জীবন্ত জীবাশ্ম এই প্রজাতিটি এখনও বেচে আছে সেটাই জীববিজ্ঞানীরা প্রথম জানতে পারেন। দুটি প্রজাতি খুজে পাওয়া েগেছে  -West Indian Ocean coelacanth (Latimeria chalumnae) ও Indonesian coelacanth Latimeria menadoensis); এরা সবচেয়ে প্রাচীনতম Sarcopterygii (lobe-finned fish ও tetrapods) দের বংশধারার প্রতিনিধিত্ব করছে, যার মানে হচ্ছে এরা অন্যন্য রে ফিনড মাছ (ray-finned fishes) দের তুলনায় সরীসৃপ, স্তন্যপায়ীদের নিকটাত্মীয়। (http://vertebrates.si.edu/fishes/coelacanth/coelacanth_wider.html)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ :  ষষ্ঠ অধ্যায়  (তৃতীয় পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The Greatest Show on Earth: The evidence for evolution by Richard Dawkins

 প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)  তৃতীয় অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব)তৃতীয় অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) | চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)
চতুর্থ অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব) | চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায়: প্রথম পর্ব | পঞ্চম অধ্যায়: দ্বিতীয় পর্ব |
পঞ্চম অধ্যায়: তৃতীয় পর্ব | পঞ্চম অধ্যায়: শেষ পর্ব |
ষষ্ঠ  অধ্যায়: প্রথম পর্ব|দ্বিতীয় পর্ব

 মিসিং লিঙ্ক ? ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন আপনি ’মিসিং’ শব্দটি দিয়ে?

সাগর পেছন ফেলে ….

রকেটে করে মহাশুন্যে প্রবেশ করার বিষয়টি ছাড়া, পানি ছেড়ে শুষ্ক ডাঙ্গায় পা রাখার জীবন বদলে দেয়া সাহসী পদক্ষেপেটির মত কিছু কল্পনা করা খুব কঠিন। জীবনের এই দুটি ক্ষেত্র, পানি এবং স্থলভুমি বহুভাবেই ভিন্নরুপী। কোন একটি থেকে অন্যটিতে যাত্রা বা পদক্ষেপ দাবী করে শরীরের প্রায় প্রতিটি অংশের বৈপ্লবিক কিছু পরিবর্তনের। ফুলকা বা জিল যা পানি থেকে অক্সিজেন আলাদা করার জন্য দক্ষ ছিল তারা ডাঙ্গায় বাতাসে কোন কাজ করতে পারে না আর পানিতে ফুসফুসের কোন উপযোগিতাও নেই। পানিতে যেভাবে চলাচল ছিল দ্রুত, দক্ষ আর সুন্দর সেই প্রক্রিয়া শুষ্ক মাটিতে সৃষ্টি করে নানা ধরনের সমস্যা, উভয় দিকেই। কোন সন্দেহ নেই, পানি ছাড়া মাছের মত বা ডুবন্ত মানুষের মত.. এই দুটোই বহু ব্যবহৃত প্রবাদ বাক্যে পরিণত হবার কারন কি হতে পারে। এবং অবাক হবার কারন নেই, জীবাশ্ম রেকর্ডের এই ক্ষেত্রে মিসিং লিংক এর ব্যাপারে বাড়তি উৎসাহ থাকাই স্বাভাবিক।

আপনি যদি যথেষ্ট অতীতে যেতে পারেন, সব কিছুই বাস করতো সমুদ্রে .. জলজ লবনাক্ত জীবনের সেই আলমা মাটের। বিবর্তনীয় ইতিহাসের বিভিন্ন পয়েন্টে, সাহসী কোন সদস্য বিভিন্ন প্রানী গ্রুপের, পানি ছেড়ে শুকনো মাটির দিকে অগ্রসর হয়েছিল, কখনো ধীরে ধীরে সবচেয়ে শুষ্ক মরুভুমিতে, তাদের সাথে তারা বয়ে নিয়ে এসেছিল তাদের নিজস্ব সমুদ্র, রক্ত আর কোষের অভ্যন্তরের তরল হিসাবে। সরীসৃপ ছাড়া, পাখি,স্তন্যপায়ী, কীটপতঙ্গ, আমাদের চারপাশে আমরা যা দেখি তারা ছাড়াও আরো অন্য গ্রুপের জীবরা যারা জীবনের এই জলজ জরায়ু থেকে শুকনো ডাঙ্গা অভিমুখে যাত্রা করতে পেরেছে সফলতার সাথে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যেমন, স্করপিয়ন, শামুক, কিছু ক্রাষ্টাশিয়ান, যেমন উডলাইস, ল্যান্ড ক্র্যাবস, মিলিপেড,সেন্টিপেড, মাকড়শারা এবং তাদের আত্মীয়রা, এছাড়াও অন্ততপক্ষে তিনটি পর্বের ওয়ার্মরা। আমাদের উদ্ভিদদের কথাও মনে রাখতে হবে ব্যবহারযোগ্য কার্বনের একমাত্র সুত্র, যাদের আগেই স্থলে আগ্রাসন ছাড়া কোন প্রানীর পক্ষেই পানি ছেড়ে স্থলে আগ্রাসন এর কাজটি সম্ভব হতো না।

সৌভাগ্যক্রমে আমাদের এই মহাযাত্রাকালীন ট্রানজিশনাল স্টেজ, যেমন যখন মাছ স্থলে তার আগ্রাসন শুরু করেছিল, খুব চমৎকারভাবে জীবাশ্ম রেকর্ডে তা রক্ষিত আছে। এবং একই ভাবে আরো পরে ঘটা বীপরিতমুখী যাত্রা বা প্রত্যাবর্তন…. যখন তিমি আর ডুগংদের পুর্বসুরীরা তাদের কষ্ট করে অর্জন করা শুকনো স্থলে আবাস ছেড়ে আবারও পুর্বসুরীদের বাসভুমি সমুদ্রর দিকে ফিরে যায়, উভয় ক্ষেত্রে যে লিঙ্কগুলো যা এতদিন মিসিং ছিল তা এখন আর মিসিং নয়, বহু প্রমান্য জীবাশ্ম সেই সংখ্যায় অগনিত, এবং তারা এখন আমাদের মিউজিয়ামের শোভা বৃদ্ধি করছে।

আমরা যখন বলছি মাছরা পানি থেকে উঠে এসেছে ডাঙ্গায়, আমাদের মনে রাখতে হবে যে মাছ সরীসৃপ এর মত কোন একটি প্রাকৃতিক গ্রুপ সৃষ্টি করেনা। মাছদের সংজ্ঞায়িত করা হয় কিছু বৈশিষ্টের অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে। যেহেতু সকল মেরুদন্ডী প্রানীদের আদি বিবর্তন ঘটেছে পানিতে, খুব অবাক হবার কিছু নেই, বেশীর ভাগ টিকে যাওয়া মেরুদন্ডী প্রানীদের শাখারা এখনও সমুদ্রে বসবাস করছে।এবং আমরা এখনও তাদের সবাইকে মাছ বলছি, যখন তাদের মাছের সাথে সংম্পর্ক খুব দুরের। যেমন ট্রাউট আর টুনা মাছ, হাঙ্গরদের সাথে তারা যতটা না নিকটবর্তী তার চেয়ে তারা মানুষের কাছাকাছি আরো বেশী, কিন্ত আমরা তাদের মাছ বলেই ডাকছি। এবং লাঙ্গফিস আর সিলোকান্থ মানুষের আরো নিকটবর্তী আত্মীয়, যত টা না তারা সম্পর্কযুক্ত ট্রাউট কিংবা টুনার সাথে ( এবং অবশ্যই হাঙ্গর থেকে), কিন্তু আবারো আমরা তাদের মাছ বলছি, এমন কি হাঙ্গররা মানুষের নিকটাত্মীয়, যতটা না তারা  হ্যাগ ফিশ বা ল্যামপ্রীদের সাথে সম্পর্কযুক্ত ( আধুনিক যে প্রজাতি যারা বেচে আছে, বহু আগের সে বৈচিত্রময় সফল চোয়ালবীহিন মাছের পরিবারে সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে) কিন্তু আবারো আমরা তাদের মাছ বলছি। মেরুদন্ডী প্রানীদের পুর্বসুরী প্রানীরা যারা কখনোই স্থলবাসী হয়নি, তারা দেখতে মাছের মত, তারা সাতার কাটে মাছের মত ( ব্যতিক্রম ডলফিন, তারা তাদের মেরুদন্ড উপরে নীচে বাকিয়ে সাতার কাটে, মাছরা যেমন একপাশ থেকে অন্যপাশ তাদের মেরুদন্ড নাড়ায়। তাদের সবারই, আমার সন্দেহ স্বাদেও মাছের মত হয়তো।

কোন একজন বিবর্তনবাদীর কাছে, আমরা যেমন পাখি এবং সরীসৃপদের উদহারনে দেখেছি, কোন একটি প্রাকৃতিক গ্রুপ হচ্ছে, সেই সব প্রানীদের নিয়ে একটা গ্রুপ, যেখানে প্রতিটি সদস্য পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, নিকর্টবর্তী আত্মীয়, গ্রুপের সদস্য নয় এমন প্রানীদের ‍তুলনায়; আমরা যেমন দেখেছি, পাখি হচ্ছে এমন একটি প্রাকৃতিক গ্রুপ, কারন তারা সবাই সবচেয়ে নিকর্টবর্তী অতীতে একটি কমন পুর্বসুরী প্রানী থেকে বিবর্তিত হয়েছে। যে পুর্বসুরী প্রানী সব পাখীরাই শেয়ার করে, কিন্তু পাখী নয় এমন কোন প্রানীর পুর্বসুরী সে নয়; এবং একই সংজ্ঞানুযায়ী  মাছ আর সরীসৃপরা কোন প্রাকৃতিক গ্রুপ নয়। কারন সবচেয়ে সাম্প্রতিক যে পুর্বসুরী প্রানী থেকে সব মাছরা বিবর্তিত হয়েছে, তারা মাছ নয় এমন প্রানীদেরও পুর্বসুরী। আমরা যদি আমাদের দুরবর্তী আত্মীয় হাঙ্গরদের একপাশে সরিয়ে রাখি, আমরা স্তন্যপায়ীরা এমন একটি প্রাকৃতিক গ্রুপের অংশ, যাদের মধ্যে বর্তমানে হাড়যুক্ত সব মাছও আছে ( হাড় সহ, তরুনাস্থি সহ হাঙ্গর যেমন হাড়যুক্ত মাছ না); এরপর যদি আমরা সব হাড়যুক্ত রে ফিন সহ মাছদের একপাশে সরিযে রাখি ( স্যালমন, ট্রাউট, টুনা, অ্যানজেল ফিস, মোটামুটি সব মাছ, যাদের আপনি যাদের চান এখানে হাঙ্গর ছাড়া), যে প্রাকৃতিক গ্রুপটির আমরা অন্তর্ভুক্ত, সেখানে সেখানে আছে সব স্থলবাসী মেরুদন্ডী এবং লোব ফিন যুক্ত মাছরাও; এই সব লোব ফিন যুক্ত মাছের সারি থেকে আমাদের বিবর্তন হয়েছে। আমরা এখন একটু বিশেষ দৃষ্টি দেবো এই সব লোব ফিন যুক্ত মাছদের দিকে। লোব ফিনরা বর্তমানে হ্রাস পেয়েছে শুধু লাঙ্গ ফিস আর সিলাকান্থ এ। ( মাছ হিসাবে তাদের সংখ্যা কমেছে, তবে তারা দারুনভাবে সফল হয়েছে স্থলে, আমরা সব স্থলবাসী মেরুদন্ডীরা আসলে ভিন্নরুপী লাঙ্গফিস), তাদের লোব ফিন বলার কারন তাদের ফিনগুলো দেখতে পায়ের মত, সুপরিচিত মাছদের রে ফিন দের ব্যতিক্রম। আসলেই ওল্ড ফোর লেগস (Old four legs) ছিল জনপ্রিয় একটি বইএর নাম, জে এল বি স্মিথ যে বইটি লিখেছিলেন, সিলোকান্থ দের নিয়ে। তিনি ছিলেন প্রথম, দক্ষিন আফ্রিকার একজন জীববিজ্ঞানী, ১৯৩৮ সালে যিনি প্রথম জীবিত একটি সিলোকান্থ যা দক্ষিন আফ্রিকার একটি মাছের ট্রলার ঘটনাচক্রে ধরেছিল তার নাটকীয় বিবরণ দিয়েছিলেন: ’কোন ডায়নোসোরকে রাস্তায় হাটতে দেখলেও আমি এর চেয়ে বেশী অবাক হতাম না।’ জীবাশ্ম হিসাবে সিলোকান্থ আগে থেকেই পরিচিত, কিন্তু সেই ডায়নোসোরদের সময়ই তারা বিলুপ্ত হয়েছে এমন ধারনা করা হতো । প্রথম বারের মত যখন তিনি বিস্ময়কর এই আবিষ্কারটি দেখেন সেই মুহুর্তের বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন আবেগময় ভাষায়, যেটা দেখার জন্য তাকে খবর পাঠিযেছিলেন, এর আবিষ্কর্তা মারগারেট লাটিমার ( পরবর্তীতে তিনি  এর নাম রাখেন Latimeria), তার বিশেষজ্ঞ মতামতের  জন্য:

আমরা সরাসরি মিউজিয়ামে পৌছাই, ঠিক সেই মুহুর্তে মিস লাটিমার মিউজিয়ামে উপস্থিত ছিলেন না, কেয়ার টেকার আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় ভিতরের একটি ঘরে যেখানে সিলোকান্থটির নমুনা রাখা ছিল, হ্যা..ঈশ্বর, যদিও আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছিলাম, কিন্তু সেই প্রথম দৃষ্টি আমাকে আঘাত করে গরম হলকার মত, আমি দুর্বল হয়ে পড়ি অদ্ভুত অনুভুতিতে, আমার সারা শরীর কেপে উঠে, আমি পাথরের মুর্তির মত দাড়িয়ে পড়ি, হ্যা, কোন সন্দেহর আর অবকাশ নেই, প্রতিটি আশ, প্রতিটি হাড়, প্রতিটি ফিন, এটি সত্যিকারের সিলোকান্থ; অনায়াসে এটি সেই ২০০ মিলিয়ন বছর আগের কোন প্রানী, যা আরো একবার জীবন্ত হয়ে সামনে এসে দাড়িয়েছে,  আমি সব কিছু ভুলে দেখতে থাকি, এবং খানিকটা শঙ্কা নিয়ে কাছে যাই, স্পর্শ করি, টোকা দেই, পুরো সময় আমার স্ত্রী নীরবে আমাকে দেখতে থাকে। মিস লাটিমের  যখন ফিরে এসে আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান, কেবল তখন মাত্র আমার কথা বলার ক্ষমতা ফিরে এলো, সঠিক শব্দটা আমি হয়তো ভুলে গেছি, কিন্তু আমার যা মনে পড়ছে সেটা হলো তাদের জানাতে, এটাই সত্যি, এটা আসলেই সত্যি, প্রশ্নাতীত ভাবে এটি একটি সিলোকান্থ। এমনকি আমিও আর কোন সন্দেহ প্রকাশ করতে পারছি না।

অন্য যে কোন মাছের চেয়ে সিলোকান্থরা আমাদের বেশী নিকটাত্মীয়, সাধারন পুর্বসুরী প্রানী থেকে দ্বি বিভাজিত হবার পর তারা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং সেই সময়ে তারা কিছুটা বদলেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনটি যথেষ্ট না, যে তাদের জায়গা আলাদা কোন শ্রেনীতে আমরা রাখতে পারি, যা আমাদের সাধারন কথ্যভাষায় এবং জেলেদের কাছে, এটি শ্রেনী বিন্যস্ত হয় মাছ হিসাবে। কিন্তু তারা এবং লাঙ্গফিশ রা – ট্রাউট কিংবা টুনা এবং প্রায় সব মাছদের চেয়ে আমাদের নিকটাত্মীয়। সিলোকান্থ আর লাঙ্গফিসরা আসলেই জীবন্ত জীবাশ্মর উদহারণ।

indonesia_coelacanthছবি: ৈইন্দোনেশিয়ার সিলাকান্থ

যাই হোক, আমরা সিলোকান্থ বা লাঙ্গফিস থেকে বিবর্তিত হয়নি, আমরা লাঙ্গফিশ এর সাথে একটি পুর্বসুরী প্রানী শেয়ার করেছি বহু দুর অতীতে, সিলোকান্থের সাথেও তাই। যা দেখতে একটু বেশী লাঙ্গফিসের মত আমাদের চেয়ে, কিন্তু ‍দুটোর কোনটারই মত এটি তেমন দেখতে ছিল না। লাঙ্গফিশ জীবন্ত জীবাশ্ম  হতে পারে, কিন্তু তারা আমাদের পুর্বসুরী প্রানীদের মত দেখতে না; সেটা খুজতে হলে আমাদের বরং সত্যিকারের জীবাশ্ম খুজতে হবে পাথরে। এবং বিশেষভাবে ডেভোনিয়ান পর্বের জীবাশ্ম খুজতে হবে, যে সময়টা পানীবাসী মাছ আর প্রথম স্থলবাসী মেরুদন্ডী প্রানীদের ট্রানজিশন ঘটেছিল। এমনকি সত্যিকারের জীবাশ্মদের মধ্যে, আমাদের অনেক আশাবাদী হতে হবে, যদি আমরা আক্ষরিকভাবে আমাদের পুর্বসুরী প্রানীদের জীবাশ্ম খুজে পেতে চাই। কিন্তু আমরা আমাদের পুর্বসুরীদের নিকটাত্মীয়দের পেতে পারি। যারা যথেষ্ট কাছের, যাদের দেখে আমরা বুঝতে পারি, তারা মোটামুটি কেমন দেখতে ছিল।


Queensland_Lungfish_(Neoceratodus_forsteri)

800px-Lungs_of_Protopterus_dolloi
ছবি: Lungfish (also known as salamanderfish) are freshwater fish belonging to the subclass Dipnoi. Lungfish are best known for retaining characteristics primitive within the Osteichthyes, including the ability to breathe air, and structures primitive within Sarcopterygii, including the presence of lobed fins with a well-developed internal skeleton.

জীবাশ্ম রেকর্ডে সবচেয়ে বিখ্যাত গ্যাপটি – এত বেশী স্পষ্ট ‍শুন্যস্থান যে তার একটি আলাদা নাম আছে, Romer’s Gap ( এ এস রোমার ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র একজন বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ), এটির ব্যাপ্তি ৩৬০ মিলিয়ন বছর পুর্ব থেকে ডেভোনিয়ান পর্বের শেষ, প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন বছর আগ অবধি। কার্বনিফেরাস পর্বের প্রথমাংশ  যা কোল মেজারস নামে পরিচিত। রোমার গ্যাপ এর পর  আমরা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই উভচরীরা জলাভুমির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে, স্যালামান্ডার সদৃশ্য প্রানীদের সমৃদ্ধ বহু বিভাজন বা র‌্যাডিয়েশন। যাদের কারো কারো আকৃতি ছিল কুমিরের চেয়েও বড়, যাদের সাথে উপরি একটি সদৃশ্যতা তাদের ছিল। মনে হতে পারে সেই সময়টা দানবদের যুগ, কারন সেই সময়ে বেচে ছিল এমন কোন ড্রাগন ফড়িং ছড়িয়ে দেয়া ডানার প্রশস্ততা ছিল আমার পুরো হাতের সমান। এটাই সবচেয়ে বড় পতঙ্গ যার কোনদিন অস্তিত্ব ছিল [1]। ৩৪০ মিলিয়ন বছর আগে থেকে শুরু করে আমরা হয়তো বলতে পারি কার্বনিফেরাস যুগ ছিল উভচরীদের যুগ, যা ডায়নোসরদের যুগের সমতুল্য। কিন্তু তার আগে যদিও রোমার গ্যাপ, আর এই গ্যাপের আগে, রোমার শুধু দেখতে পেয়েছিলেন মাছ, লোব ফিন যুক্ত মাছ, যারা কেবল পানিতে বাস করে।তাহলে কোথায় গেল অন্তবর্তীকালীন কোন প্রজাতি। কি তাদের বাধ্য করেছিল পানি থেকে শুকনো ডাঙ্গায় অভিযান করার জন্য?

অক্সফোর্ডে পড়ার সময় আমার আন্ডারগ্রাজুয়েট কল্পনাকে উস্কে দিয়েছিল বিস্ময়করভাবে জ্ঞানী হ্যারল্ড পাসের কিছু লেকচার। শুষ্ক এবং দীর্ঘ সময়ে ধরে দেয়া লেকচার এর বৈশিষ্ট ছাড়াও প্রানীরা তাদের পৃথিবীতে বেচে থাকার জন্য নানা আচরণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষন করার বিরল একটি ক্ষমতা ছিল[2], তার সেই বর্ণনা, কি কারনে বা কিসের প্রণোদনায় লোব ফিন যুক্ত মাছে প্রথম পা এবং ফুসফুসের বিবর্তন ঘটেছিল, যার উৎস ছিল রোমার নিজেই, সেই ছাত্রজীবনে আমার মনে গভীর দাগ ফেলেছিল। কিন্তু এখনও সেই ব্যাখ্যাটি আমার অর্থবহ মনে হয়, যদিও ব্যাখ্যাটি আধুনিক জীবাশ্মবিদদের কাছে তামাদি হয়ে গেছে, রোমারের সময়ের তুলনায় প্রাচীন।রোমার, এবং পাসেই, প্রস্তাব করেছিলেন, বার্ষিক ক্ষরার চক্রাকারে আবির্ভাবের সময় যখন বৃষ্টির অভাবে যখন হৃদ আর ছোট জলাশয়গুলো এবং স্রোতধারাগুলো শুকিয়ে যায়, যা আবারও প্লাবিত হয় পরের বছর বৃষ্টির আধিক্যে ; মাছরা যারা পানিতে বসবাস করতো, তারা সুবিধাপ্রাপ্ত হতো যদি তারা শুকনো মাটিতে বাচার জন্য সাময়িকভাবে কিছু দক্ষতা অর্জন করতে পারতো, যেমন তারা নিজেদের টেনে হিচড়ে অগভীর শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম জলাশয় থেকে শুকিয়ে মরা থেকে বাচার জন্য অপেক্ষাকৃত গভীর জলাশয়ের নিয়ে যেতে পারতো মধ্যবর্তী শুকনো মাটির উপর দিয়ে, সেখানে তারা পরবর্তী বৃষ্টির মৌসুম অবধি বেচে থাকতে পারতো। এই দৃষ্টিভঙ্গীতে আমাদের পুর্বসুরীরা তেমন শুষ্ক ভুমিতে আবির্ভুত হয়েছে তা বলা যাবে না, বরং তারা মধ্যবর্তী স্থল ভুমি ব্যবহার করেছিল সাময়িক সেতু হিসাবে আবার পানিতে ফিরে যাবার জন্য। অনেক আধুনিক জীবিত প্রানী এখনও সেই কাজটি করছে।

বরং দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রোমার একটি তত্ত্ব এখানে প্রস্তাব করেছিলেন একটি ভুমিকা সহ যার উদ্দেশ্য ছিল প্রমান করা যে ডেভোনিয়ান পর্ব ছিল শুষ্ক ক্ষরা প্রধান পর্ব।ফলাফলে, যখন আরো সাম্প্রতিক প্রমাণ তার সেই ধারনাটিকে ভুল প্রমান করতে শুরু করে, মনে হতে পারে  রোমার এর পুরো তত্ত্বটাই ক্রুটিপুর্ণ। রোমার ভালো করতেন যদি তার এই ভুমিকাটি তিনি বাদ দিতেন, যা যে কোন ক্ষেত্রেই বাড়তি সংযোজন ছিল। আমি যেমন The Ancestor Tale এ যুক্তি দিয়েছিলাম, রোমারের তত্ত্বটি এখনও কাজ করে, এমন কি যখন ডেভোনিয়ান পর্বে তেমন ক্ষরার আধিক্য ছিল না যেমনটা রোমার  প্রথম ভেবেছিলেন।

আসুন, যাই হোক না কেন, আবারো জীবাশ্ম রেকর্ডে আমরা ফিরে আসি। লেট ডেভোনিয়ার পর্ব থেকে এর সংখ্যা বেশ কমে যায়, যে পর্বটি ঠিক কার্বনিফেরাস পর্বের ঠিক আগের অবস্থা। মিসিং লিঙ্ক খুজে পাবার লোভনীয় হাতছানি দেয়, যে প্রানীগুলো বেশ কিছুটা দুর বিবর্তিত হয়েছে লোব ফিন সহ মাছ, যারা বিপুল পরিমানে ডেভোনিয়ান পর্বের সাগরে বসবাস করতো এবং উভচরীরা পরবর্তী কার্বনিফেরাস যুগের জলাভুমিতে যাদের আধিপাত্য ছিল তার মধ্যবর্তী কোন অবস্থা। শুন্যস্থানটির যে দিকে মাছ, সেদিকে Eusthenopteron  এর জীবাশ্ম খুজে পাওয়া যায় ১৮৮১ সালে, কানাডায় আবিষ্কৃত একগুচ্ছ ফসিলের মধ্যে। দেখেই মনে হয় এটি পানির উপরে ভেসে শিকার করতো হয়তো কখনোই ডাঙ্গায় উঠেনি, ইতিপুর্বে বেশ কিছু সম্ভাবনাময় কল্পনার পুণ:সৃষ্ট মডেল তৈরী সত্ত্বেও। তা সত্ত্বেও যেটা গুরুত্বপুর্ণ সেটা হচ্ছে এর বেশ কিছু অ্যানাটোমিকাল বৈশিষ্ট ছিল যার সাথে মিল ছিল এর প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর পরে বিবর্তিত হওয়া উভচরীদের সাথে, এর মাথার খুলির বৈশিষ্ট, দাত এবং সর্বোপরি তাদের ফিন গুলো সহ।যদি সম্ভবত তাদের ব্যবহার ছিল সাতার কাটার জন্য, হাটার জন্য না, তাদের হাড়গুলো টেট্রাপড দের বৈশিষ্টসুচক (স্থলবাসী মেরুদন্ডীদের যে নামে ডাকা হয়), হাড়ের সজ্জার সাথে মিল আছে। সামনের হাতে, এটি একক হাড়, হিউমেরাস, যা যুক্ত হয় দুটো হাড়ের সাথে, রেডিয়াস ও আলনা, যারা যুক্ত থাকে বেশ কিছু ছোট ছোট হাড়ের সাথে, টেট্রাপডদের ক্ষেত্রে যে হাড়গুলোকে আমরা বলি কারপাল,মেটাকারপাল এবং আঙ্গুল। এবং এদের পেছনের পাও টেট্রাপডদের মত একই বৈশিষ্ট বহন করে এর হাড় সজ্জায়।

28-12-2013 3-32-11 PM

এরপর এই শুন্যস্থানের উভচরী প্রানীর দিকে, প্রায় ২০ মিলিয়ন বছর পরে, ডেভোনিয়ান ও কার্বনিফেরাস এর সংযোগে যে জীবাশ্মটি আবিষ্কার বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল তা হলো Ichthyostega, সেটি পাওয়া যায় ১৯৩২ সালে গ্রীনল্যান্ডে; না গ্রীনল্যান্ড শুনেই আবার ভাববেন তার এখনকার শৈত্য আর বরফের কথা সেই অতীতেও ছিল। কারন Ichthyostega  র  সেই সময়কার  গ্রীনল্যান্ড ছিল বিষুব রেখার উপর। Ichthyostega কে তার আদি রুপে পুণসৃষ্টি করেন সুইডিশ জীবাশ্মবিদ এরিক জারভিক ১৯৫৫ সালে। এবং আবারও তিনি এটিকে স্থলবাসীদের কাছাকাছি পর্যায় হিসাবে প্রস্তাব করেছিলেন, বর্তমান জীবাশ্মবিদদের তুলনায়। তবে সবচেয়ে নতুন পুণগর্ঠনটি যো করেছিলেন জারভিকের পুরোনো উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের পের আহলবার্গ। যা Ichthyostega র অবস্থানটি মুলত জলজ বলেই প্রস্তাব করেছে, যদিও সম্ভবত এটি মাঝে মাঝে স্থলে উঠে  এসেছে খাদ্য সন্ধানে এমনটা মনে করা যেতে পারে, তবে যাই হোক এটি দেখতে দানবীয় কোন সালাম্যান্ডারই মনে হয়, মাছ না। এবং এর মাথার খুলি চ্যাপটা, যা উভচরী প্রানীদের জন্য বিশেষভাবে বৈশিষ্টসুচক। আধুনিক টেট্রাপড এর ব্যতিক্রম, যাদের পাচটি করে আঙ্গুল আছে প্রতিটি হাতে ও পায়ে ( অন্ততপক্ষে ভ্রুণাবস্থায়, যদি তারা কেউ কেউ সেটা হারিয়ে ফেলে বয়সকালে), Ichthyostega র ছিল সাতটি পায়ের আঙ্গুল। মনে হতে পারে আদি টেট্রাপডরা বর্তমানের টেট্রাপডদের চেয়ে বেশী স্বাধীনতা পেয়েছিল নানা সংখ্যক আঙ্গুল নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করার জন্য। এবং মনে করা হয় ভ্রুণতাত্ত্বিক বিকাশের কোন একটি সময় এটি স্থির হয়েছিল পাচটি আঙ্গুলে। এবং এমন একটি পদক্ষেপে সেখানে নেয়া হয়েছিল যা প্রতিবর্তন করা সহজ ছিল না। যদি স্বীকার করতে হবে, সেটা অতটা কঠিনও না আবার, কারন আমরা বিড়াল এবং এমনকি মানুষকেও দেখেছি পায়ে ছয়টি আঙ্গুল সহ। সেই বাড়তি আঙ্গুলটা দেখা যায় ডিএনএ দ্বিলিপি করণ প্রক্রিয়ার ভুলের ফল হিসাবে।

28-12-2013 3-33-13 PM

আরো একটি উত্তেজনাময় আবিষ্কার, সেটিও ক্রান্তীয় গ্রীনল্যান্ড থেকে, এটির সময় কাল ডেভোনিয়ান ও কার্বনিফেরাস পর্বের সীমানার মধ্যে, Acanthostega; Acanthostega রও চ্যাপটা মাথার খুলি ছিল, যা উভচরীদের বৈশিষ্ট, এবং টেট্রাপডদের মতই তাদের হাত ও পায়ের হাড়ের সজ্জা ছিল। কিন্তু এটিও chthyostega র চেয়ে আরো বেশী ভিন্ন, যাকে আমরা ভাবছি পাচ আঙ্গুলের স্ট্যান্ডার্ড রুপটি। এর ছিল আটটি আঙ্গুল। যে বিজ্ঞানী এটি সম্বন্ধে আমাদের ধারনা দিয়েছেন তারা হলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনী ক্লার্ক ও মাইকেল কোটস। তারা বিশ্বাস করেন, Acanthostega, Ichthyostega র মতই পানিতে বাস করতো, তবে এর ফুসফুস ছিল, এবং এর হাত পা জোরালো প্রমান যোগায় যে পানিতে তো বটেই শক্তমাটিতেও চলাচল করতে পারতো, যখন তার দরকার লাগতো। আবারও এটি দেখকে দানবাকৃতির কোন স্যালামান্ডারের মতই প্রায়। এবার শুন্যস্থানের মাছদের দিকে, Panderichthys ও খুজে পাওয়া গেছে লেট ভেভোনিয়ার পর্বে।এটি বরং আরো খানিকটা বেশী উভচর প্রানীদের মত দেখতে, কিছুটা কম মাছের মত দেখতে Eusthenopteron এর তুলনায়।কিন্তু যদি আপনি তাদের দেখতেন, নি:সন্দেহে তাদের সালমান্ডার বলার চেয়ে মাছ বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করেতেন।

সুতরাং আমাদের কাছে এখন শুধু আছে Panderichthys, উভচরী সদৃশ মাছ এবং Acanthostega, মাছ সদৃশ একটি সরিসৃপের মধ্যবর্তী শুন্যস্থানটি। এদের মধ্যে মিসিং লিঙ্কটি কোথায়? পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জীবাশ্মবিদদের একটি টিম, যার সদস্য ছিলেন নীল শুবিন ও এডওয়ার্ড ডেশলার, সেটাই খুজতে শুরু করেছিলেন। শুবিন তার সেই অসাধারণ যাত্রার বিবরণ দিয়েছিলেন মানব বিবর্তন সম্বন্ধে ধারাবাহিক কিছু ভাবনা প্রকাশ করার মাধ্যমে তার লেখা বই The Inner Fish এ। তারা গভীরভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন, ঠিক কোথায় তারা এই জীবাশ্মটিকে খুজবেন। তারা খুব সাবধানতার সাথে বেছে নেন কানাডীয় উত্তর মেরু অঞ্চলে একটি পাথুরে এলাকায় যা ডেভোনিয়ান পর্বের সেই সঠিক  সময়টার প্রতিনিধিত্ব করে। তারা সেখানে তাদের অনুসন্ধান চালান, প্রানীবিজ্ঞানের স্বর্ণখনির সন্ধান তারা খুজে পেয়েছিলেন -Tiktaalik! যে নাম কখনোই ভোলা সম্ভব না। শব্দটি এসেছে ইনুইট ভাষা থেকে যার অর্থ মিঠা পানি মাছ; আর প্রজাতির নাম roseae, সেটার কারণ ? বেশ আমাকে আমার বিরুদ্ধে একটি সতর্কতামুলক কাহিনী বলার সুযোগ দিন।

যখন আমি প্রথম এই প্রজাতির নামটি শুনেছিলাম এবং এর একটি কল্পিত পুণসৃষ্ট ছবি দেবার সৌভাগ্য হয়েছিল, যা আমার এই বইটিতে প্রকাশিত হয়েছে, আমার মন সাথে সাথে ডিভোনিয়ীয় সেই রঙ ( পুরোনো লাল বেলেপাথর) ভেসে ওঠে, বিখ্যাত ডেভোন (Devon) কাউন্টির রঙ, কিংবা পেট্রা র কথা (Petra) ( সেই গোলাপী লাল পাথুরে শহুর, সময়ের মত প্রাচীন); কিন্তু হায়! আমি সম্পুর্ণ ভুল করেছিলাম। মডেলটির ফটোগ্রাফটাতে অতিরিক্ত গোলাপী রঙ এর একটি আভা ছিল; roseae, নামটা এসেছে এই আর্কটিক ডেভোনিয়ান অভিযানের পৃষ্ঠপোষক এর সন্মানে। ড: ডেশলার এর কল্যানে আমার Tiktaalik roseae র জীবাশ্মটি চাক্ষুষ দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল, যখন ফিলাডেলফিয়ায় তিনি আমাকে মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য নিমন্ত্রন করেছিলেন – এবং আমার ভিতরে চিরন্তন জীবিত সেই প্রাণীবিজ্ঞানীটি – বা হয়তো আমার ইনার ফিস – আবেগে বাকরুদ্ধ হয়েছিল।হালকা গোলাপী রঙ এর আভাযুক্ত চশমা দিয়ে আমি কল্পনা করতে পেরেছিলাম, আমি আমার সরাসরি পুর্বসুরী কোন প্রাণীর দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছি। যতই অবাস্তব সেই অনুভুতি হোক না কেন, এই তেমন বেশী গোলাপী লাল নয় জীবাশ্মটি সময়ের মত প্রাচীন সত্যিকার কোন মৃত পুর্বসুরী দেখার এটাই শ্রেষ্ট সুযোগ ছিল, যে সুযোগ সম্ভবত আমি আর পাবোনা জীবদ্দশায়।

আপনার যদি কখনো সত্যিকারের জীবিত Tiktaalik এর সাথে দেখা মিলতো, মুখোমুখি, আপনি হয়তো ভয়ে পেছনের সরে আসতেন যেন কোন কুমির দেখছেন সামনে, কারন ঠিক তেমনই এর মুখটা দেখতে। সালামান্ডারের শরীরে কুমিরের মাথা, যার সাথে যুক্ত হয়ে মাছের পশ্চাৎদেশ ও লেজ। অন্য যে কোন মাছ এর ব্যতিক্রম , Tiktaalik এর একটি ঘাড় আছে, এটি তার মাথা ঘোরাতে পারতো। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি আসলেই সঠিক  মিসিং লিঙ্ক এর উদহারণ। সঠিক কারণএটি ঠিক মাঝামাঝি ভাগ করেছে মাছ ও উভচরীর বৈশিষ্টগুলো এবং আরো সঠিক এই কারনে যে, তারা আর মিসিং নয়। আমাদের হাতে এখন জীবাশ্ম আছে। আপনি চাইলে দেখতে পারেন, স্পর্শ করতে পারেন, এর বয়সটা বোঝার চেষ্টা করতে পারেন এবং ব্যর্থ হবেন।

image-03-largeছবি: টিকটালিক


[1] প্রস্তাব করা হয়েছে, প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার,  এই দানবাকৃতি হবার ব্যপারটা সম্ভব হয়েছে সেই সময়ে বায়ুমন্ডলে বেশী পরিমান অক্সিজেন থাকার কারনে, পোকামাকড়দের ফুসফুস থাকে না এবং তারা শ্বাস নেয় তাদের সারা শরীরে থাকা সরু এয়ার টিউব যা শরীরে পাইপের মত সরু নালী দিয়ে সারা দেহে বাতাস সরবরাহ করে। যেহেতু রক্তনালীর মত এটি শরীরে একই রকম কোন কোন সরবরাহ প্রক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনা এবং সম্ভবত এটি এই কারনের শরীরের আকারও সীমাবদ্ধ করে।এই সীমা আরো বেশী হয়তো যদি পরিবেশে ৩৫ শতাংশ অক্সিজেন থাকতো এখন আমরা যে শ্বাস নেই, সেই ২১ শতাংশর বেশী। এটি সন্তোষজনকভাবে দানবাকৃতির ড্রাগন ফ্লাই এর ব্যাখ্যা করে, কিন্তু হয়তো এটি যে সঠিক হতে হবে তার বাধ্যবাধকতা নেই। ঘটনাচক্রে, আমি বিস্মিত এই ভেবে, এত অক্সিজেন থাকার কারনে, সবকিছু কেন সব সময় আগুন এর মত বিস্ফোরিত হতো না। হয়তো তাই হতো, জঙ্গলে দাবানল হয়তো বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশী হতো।জীবাশ্ম থেকে প্রমান মেলে অগ্নিসহিষ্ণু উদ্ভিদ প্রজাতির ব্যপক উপস্থিতি। এখনও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিৎ নন কেন কার্বনিফেরাস এবং পারমিয়ান পর্বে বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন এর পরিমান এত বৃদ্ধি পেয়েছিল। একটি সম্ভাবনা হচ্ছে অনেক বেশী কার্বন মাটির নীচে কয়লা হিসাবে বিচ্ছিন্ন ছিল।

[2]  পুরোনো ঘরানার কোন অক্সফোর্ড এর বিশেষ ব্যাক্তি যিনি বিশ্বাস করতেন তার দ্বায়িত্ব আন্ডারগ্রাজুয়েটদের শিক্ষা দেবার জন্য, তিনি বর্তমানের এই  রিসার্চ অ্যাসিষ্টেন্ট প্রাধান্য পরিবেশে টিকতে পারতেন না।নিজের নামে একটি আর্টিকেল প্রকাশ কোন মতে প্রকাশ করা ছাড়া তার লিগেসি নির্ভর করছে বহু প্রজন্মের কৃতজ্ঞ ছাত্রদের উপর, যাদের মধ্যে তিনি জ্ঞান বিতরন করেছেন এবং তার বিশাল শিক্ষার ভান্ডার থেকে তার কিছুটা বিতরণ করছেন।

 

 __________________________চলবে

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : ষষ্ঠ অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

One thought on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : ষষ্ঠ অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s