দি স্ট্যাম্প কালেক্টর, নুরমেহম্মেত ইয়াসিন..আর দি ওয়াইল্ড পিজিওন..

sect2_02
ছবি:  Francois Thisdale

আমাদের অনেকেরই নিজস্ব চিন্তার পরিভাষায় ‘মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা‘ সংজ্ঞাটি বদলে যায় বয়স বাড়ার সাথে সাথে, মনের ভিতর জমতে থাকা নানা ছাকুনী শীর্ণতর করে ফেলে এর মৌলিক ভাবনাটিকে । কিন্তু ভাবনাটি একটি শিশুকে বুঝিয়ে বলুন, সে ঠিকই মত প্রকাশের স্বাধীনতার মুল সুরটিকে ধরতে পারবে সহজাতভাবে। আর ঠিক এই বিশ্বাস নিয়ে কয়েকদিন আগে কানাডীয় সাংবাদিক এবং লেখক জেনিফার ল্যাঁথিয়ে এবং আঁকিয়ে ফ্রাসোয়াঁ থিসডেল এর জুটি বেধে প্রকাশ করেছেন একটি ভিন্ন ধর্মী শিশু উপযোগী গল্পের বই The Stamp Collector; এর অভিনবত্ব এর কাহিনীর মুল সুর.. চিন্তা,মতামত আর বিবেকের স্বাধীনতা, সাধারনত যা কখনোই শিশুসাহিত্যের বিষয় হয়না।

The_Stamp_Collector_Book_Cover
ছবি:  Francois Thisdale

বইটির এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দুটি শিশুর জীবন ঘিরে, যাদের একজনের বাস শহরে আরেক জনের গ্রামে।শহুরে যে শিশু, সে একদিন খুজে পায় ফেলে দেয়া একটা ডাকটিকিট, আর ডাকটিকিটটি তার কল্পনার দরজা খুলে দেয়। নতুন করে পৃথিবীকে ভাবতে শুরু করে সে।আর গ্রামের ছোট ছেলেটি , সে তার স্বপ্নের দরজা খুজে পায় গল্প আর কাহিনীর জগতে। তারা দুজনে যখন বড় হয়, তাদের জীবনের পথও হয় আলাদা, একজন হয় জেলখানার পাহারাদার আর অন্যজন কারখানার শ্রমিক,কিন্তু তাদের শৈশবের তীব্রতম ভালো লাগার সেই বিষয়গুলো তাদের জীবনের যুক্ত হয়ে থাকে। পরে হঠাৎ করে দুজনের জীবনে একটি জায়গায় এসে অতিক্রম করে.. যখন সেই গ্রামের ছেলেটির একটি স্বপ্ন আর আশা দেখার গল্প লিখে শাসক কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ে, আর সেই অপরাধে তার জায়গা হয় একটি জেলখানায়, যে জেলখানায় তার পাহারাদার হয় শহুরে সেই ছেলেটি।

জেলখানার নিয়ম অনুযায়ী, তাদের দুজনের মধ্যে কোন কথা আদান প্রদান ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু যতই সময় কাটতে লাগলো.. গল্পকার সেই ছেলেটির গল্প সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যেতে শুরু করলো, তার মুক্তির জন্য, তাকে সাহস দেবার জন্য নানা দেশ থেকে চিঠি আসতে শুরু করে সেই জেলখানায়। স্ট্যাম্প প্রিয় পাহারাদার ছেলেটিকে মুগ্ধ করে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসার অজস্র ডাকটিকিটগুলো, এবং তার উৎসাহ বাড়তে থাকে, কে এই ছেলেটি যাকে সে পাহারা দিচ্ছে, তার জন্য সারা পৃথিবী থেকে কেনই বা চিঠি আসছে এভাবে। একসময় পাহারাদারটি বাধ্য হয় গল্পকার ছেলেটিকে তার প্রথম ডাকটিকিট আর পরে তার চিঠিগুলো দেবার জন্য, সে তাকে জানায় পৃথিবী তাকে ভুলে যায়নি। ‍সুচনা হয় দুজনের মধ্যে একটি অসাধারন বন্ধুত্বের। কিন্তু গল্পকার ছেলেটির শরীর ভেঙ্গে পড়ে নির্যাতনে, ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসা ছেলেটিকে পাহারাদার তাগিদ দেয় তার সব গল্প বলার জন্য, সে সারা পৃথিবীকে তার গল্প জানাবে। পরে লেখকের মৃত্যুর পর পাহারাদার সেই ছেলেচি দেখা যায় সাহসের সাথে তার চাকরী ছেড়ে দিয়ে বহু দুরে কোথাও চলে যেতে, যেখানে সেই নির্যাতনকারী শাসকগোষ্ঠী নেই এবং একসময় তাকে একটি লাইব্রেরীতে দেখি আমরা, যেখানে বসে সে তার লেখক বন্ধুর গল্প লিখতে শুরু করে।

the-stamp-collector-306x340
ছবি:  Francois Thisdale

PEN Canada তে ভলান্টিয়ার করার সময় লেখক ল্যাথিঁয়ে র উইঘুর লেখক ইয়াসিন এর মুক্তির জন্য কাজ করেছিলেন। তার মুক্তির জন্য কোন একটি সম্মেলনে তার দেখা হয়েছিল নির্বাসিত চীনা সাংবাদিক জিয়াং ওয়াইপিং এর সাথে, তিনিও চীন সরকারের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার দুর্নীতির কথা ফাঁস করে লেখা অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদনের জন্য ৬ বছর চীনে বন্দী ছিলেন। লেখক জানান এই সাক্ষাত করার সময় তিনি গল্পটি লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন.. যখন ওয়াপিং কে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, চীনে বন্দী লেখকদের কি চিঠি লেখার কোন অর্থ আছে, যখন সেখানে বন্দীদের চিঠিই দেখতে দেয়া হয় না। তিনি বলেছিলেন, অবশ্যই, কারন জেলখানার পাহারাদার রা স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে।

যদিও এই গল্পের পটভুমি কোন দেশে তা বলা হয়নি, তবে হালকা কিছু ইঙ্গিত দেয় দেশটি হচ্ছে চীন। আর সত্যি এই গল্পটির পেছনের অনুপ্রেরণা একটি সত্যি ঘটনা, ঘটনাটি উইঘুর (uyghur) কবি ও লেখক নুরমুহেম্মেত ইয়াসিন (Nurmuhemmet Yasin, 1977-2011) কে নিয়ে, যাকে চীন সরকার কারাদন্ডে দন্ডিত করেছিল ২০০৪ সালে, তার অপরাধ.. The Wild Pigeon নামে একটি ছোট গল্প লেখার জন্য; নুরমুহেম্মেত ইয়াসিন এর জন্ম ১৯৭৭ সালে, এবং ২০১৩ তে তার মুক্তির জন্য কাজ করে যাওয়া মানুষগুলো প্রথম জানতে পারেন তিনি সম্ভবত ২০১১ সালে কারা অন্তরীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

yasin01

ছবি: Nurmemet Yasin (c. 1977 – reportedly died 2011)

The wild pigeon নামে র এই অসাধারণ গল্পটি লেখার আগে তিনটি কবিতার বই লিখেছিলেন First Love, Crying from the Heart, and Come on, Children; The wild pigeon কাহিনী আবর্তিত হয়েছে একজন স্বাধীনতাকামী কবুতরের গল্প নিয়ে যে তার মৃত্যুকে বেছে নেয় পরাধীন হয়ে থাকার পরিবর্তে।বিষযুক্ত স্ট্রবেরী মুখে নিয়ে মারা যাবার আগে তার শেষ উচ্চারণ ছিল Now, finally, I can die freely. I feel as if my soul is on fire – soaring and free.. ইয়াসিন এর এই গল্পটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বহুল প্রচারিত উইঘর সাহিত্য ওয়েবসাইট এ গল্পটি প্রকাশিত হয়, চিহ্নিত হয় একটি সন্মানজনক পুরষ্কারের জন্য। তবে এটা চীনা কর্তৃপক্ষের নজরও এড়ায়নি, তারা গল্পটির অর্থটি নিজেদের অ্যাজেন্ডা মত সাজিয়ে নেয়, চীনা কর্তৃপক্ষের ধারনা তার এই গল্পটি চীনের উইঘুর জাতিগোষ্ঠী প্রধান এলাকায় সেটির উদ্দেশ্য ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে উস্কানী দেওয়া দেয়া, এর কারন হিসাবে তারা এখানে বুনো কবুতরের নীল রং টিও তারা সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন, কারন উইঘুর দের স্বাধীনতা আন্দোলনের বেশ কটি গ্রুপ নীল রং ব্যবহার করে।

গল্পটি প্রথম ছাপা হয়েছিল উইঘুর প্রধান প্রদেশ সিনজিয়াঙ্গ এর কাশগর শহর কেন্দ্রিক Kashgar Literary Journal পত্রিকা ২০০৪ এর শেষে, এর একমাস পর ইয়াসিন কে গ্রেফতার করে চীন সরকার। ২০০৫ এর ফেব্রুয়ারীতে, কাশগরে এর একটি আদালত ইয়াসিন কে এই গল্পটি লেখার কারনে ১০ বছরের কারাদন্ড দেয় উইঘর জনগোষ্ঠীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী উস্কানী দেবার অপরাধে। World Uyghur Congress এ প্রেসিডেন্ট রেবিয়া কাদীর এর ভাষায়..”the simple truth … that whenever Uighurs contradict the official narrative of the benevolence of the Communist Party, they are severely punished”, হিউমার রাইটস ওয়াচ এটিকে চীনা অফিসিয়াল পলিসির উদহারণ হিসাবে চিহ্নিত করে যা, কিনা শিল্প সাহিত্যে কোন সংখ্যালঘুদের মতামত প্রকাশকে গোপন ষড়যন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, এবং আর লেখকদের চিহ্নিত করা হয় সন্ত্রাসী বা অপরাধী হিসাবে। ব্যাপক আন্তর্জাতিক আন্দোলনের মুখে ২০১৩ সালের শুরুতেই চীন সরকার জানায় অসুস্থ হয়ে ২০১১ সালের কোন এক সময় Shaya Prison এ মারা যান।

উইঘুর অঞ্চলে চীনের দমননীতির কারন অন্যখানে। চীনের উত্তর পশ্চিমে Xinjiang Uyghur Autonomous Region (XUAR) এ প্রায় ১০ মিলিয়ন উইঘুরদের বসবাস। উইঘর রা এই অঞ্চলের আদিবাসী, মুলত তারা তুর্কীক জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাদের নিজস্ব ভাষাও আছে । আর এই Xinjiang এর আগের নাম ছিল পুর্ব তুর্কীস্থান, ১৯৪৯ সালে চীন প্রদেশটি দখল করে নেয়, আর এই জায়গাটি ছাড়তে চীন খুব উৎসাহীও নয়, কারণ সিনজিয়াং এ তেল,গ্যাস ও নানা খনিজ পদার্থের বিশাল মজুদ আছে। বহুদিন ধরে উইঘুর রা তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, যে আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসাবে ( মনে পড়ছে আমাদের নিজেদের ইতিহাসের কথা ….) চিহ্নিত করেছে চীনা সরকার, আর এই আন্দোলনকে দমন করার জন্য সাধারণ প্রথমত যা করা হয়, যাকে বলে এথনিক ডাইলুশন ( আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও যেটা করা হয়েছিল সামরিক শাসনামলে) এর আশ্রয় নিয়েছে চীন। ১৯৪৯ সেখানে চীনা হান জনসংখ্যা সেখানে ছিল শতকরা ৩ ভাগ, ২০০৯ নাগাদ সে সংখ্যা এখন ৪৫ ভাগ। একটি জাতি তাদের জন্মভুমি হারাচ্ছে। সেখানে চীনা সৈন্য আর প্যারামিলিটারীদের উপস্থিতি চমকে দেবার মত… উইঘুররা তাদের সব অধিকারই হারাচ্ছে দিনে দিনে, আর উইঘর লেখকরা, যাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছে চীনা সরকার তাদের Propaganda Bureau for the Xinjiang Uyghur Autonomous Region এর মাধ্যমে। এখনও অনেক উইঘুর লেখক বন্দী হয়ে আছেন স্থানীয় কারাগারে প্রায় একই অপরাধে।

The Wild Pigeon এর গল্পটি উইঘুর ভাষা থেকে ইংরেজী ও চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছেন Dolkun Kamberi (Radio Free Asias (RFA) Uyghur service এর প্রধান); পরে ইংরেজী সম্পাদনা করে এর নাট্যরুপ প্রচারিত করা হয়, যা সম্পাদনা করেন Sarah Jackson-Han ও Luisetta Mudie; নুরমুহেম্মেত ইয়াসিন English, American and Independent Chinese PEN Centers এর সন্মানিত সদস্য।

The Wild Pigeon এর গল্পটির লিঙ্ক:  

Advertisements
দি স্ট্যাম্প কালেক্টর, নুরমেহম্মেত ইয়াসিন..আর দি ওয়াইল্ড পিজিওন..

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s