জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)


1381324_10151799032403521_699627545_n
ছবি:  The Asian giant hornet (Vespa mandarinia), including the subspecies Japanese giant hornet (Vespa mandarinia japonica), colloquially known as the yak-killer hornet,is the world’s largest hornet, native to temperate and tropical Eastern Asia. Its body length is approximately 50 mm (2 in), its wingspan about 76 mm (3 in), and it has a 6 mm (0.24 in) stinger which injects a large amount of potent venom. (Wikipedia)

জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : পঞ্চম পর্ব ( প্রথম অধ্যায়)

(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

Why Evolution Is True: Jerry A. Coyne

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায় : প্রথম পর্ব  দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্বশেষ পর্ব
তৃতীয় অধ্যায়: প্রথম পর্ব , দ্বিতীয় পর্ব , তৃতীয় পর্ব , শেষ পর্ব
চতুর্থ অধ্যায়: চতুর্থ অধ্যায়:  প্রথম পর্ব ; দ্বিতীয় পর্বশেষ পর্ব

অধ্যায় ৫ : বিবর্তনের ইন্জিন

What but the wolf’s tooth whittled so fine
The fleet limbs of the antelope?
What but fear winged the birds, and hunger
Jewelled with such eyes the great goshawk’ s head?

Robinson Jeffers, “ The Bloody Sire”

বিবর্তনের অন্যতম একটি বিস্ময়কর উদহারণ হচ্ছে, এশিয়ান জায়ান্ট হরণেট (Asian Giant Hornet), এক ভয়ঙ্কর দর্শন শিকারী ও আক্রমনাত্মক ওয়াস্প (Wasp) বা বোলতা বা ভীমরুল, যাদের সাধারণত জাপানেই বেশী দেখা যায়। এর চেয়ে ভীতিকর কোন পতঙ্গ কল্পনা করা বেশ কঠিন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় হরনেট বা ভীমরুল, আপনার হাতের বুড়ো আঙ্গুলের মত দীর্ঘ, প্রায় দুই ইন্চি লম্বা দেহ, শরীর জুড়ে ভয়্ঙ্কর দর্শন কমলা আর কালো রং ঢোরা কাটা দাগ। এর অস্ত্র হচ্ছে শক্তিশালী ভয়ঙ্কর চোয়াল, যা দিয়ে সে অনায়াসে তার শিকার পতঙ্গদের ধরে হত্যা করতে পারে, এছাড়া আাছে প্রায় সিকি ইন্চি লম্বা হুল, যা প্রতি বছর কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়  এশিয়ায়। এছাড়াও তাদের ডানার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত প্রশস্ত প্রায় তিন ইন্চি, প্রতি ঘন্টায় এরা প্রায় পচিশ মাইল গতিতে উড়তে পারে ( আপনি যে গতিতে দৌড়াতে পারেন তার চেয়ে দ্রুত) এবং প্রায় ৬০ মাইল দুরত্ব তারা অতিক্রম করতে পারে এক দিনে।

1391834_10151799032993521_54025877_n
ছবি: Asian Giant Hornet (Wikipedia)

এই হরনেট গুলো শুধু হিংস্রই না এরা সারাক্ষনই ক্ষুধার্ত থাকে, ভীষন পেটুক এবং এদের লার্ভাগুলোও মোটা সোটা যাদের খাওয়া চাহিদাও ভীষন বেশী, নিরন্তর মেশিনের মত এরা খেতে পারে, ভীমরুল চাকে মাথা ঠুকে ঠুকে জোর করে জানান দেয় তাদের মাংশ দরকার। আর এই লার্ভাদের ক্রমাগত খাদ্যের চাহিদা বাধ্য করে পুর্ণবয়স্ক ভীমরুলগুলোকে সামাজিক মৌমাছির বা ওয়াস্পদের চাকে আক্রমন করার জন্য।

এই হরণেটদের প্রধান শিকার হচ্ছে ইউরোপীয় মৌমাছিরা, যারা এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি নয়, যাদের এশিয়ায় পরবর্তীতে নিয়ে আসা হয়েছে। এই মৌমাছিদের মৌচাকে হরণেটদের আক্রমন হচ্ছে  নির্মম গণ হত্যাকান্ড, প্রকৃতিতে যার অনুরুপ উদহারণ খুব কম। এটি শুরু হয় একটি সন্ধানী বা স্কাউট হরনেট এদের মৌচাক খুজে বের করার মাধ্যমে। প্রথমেই স্কাউট হরনেট টি তার পেট দিয়ে মৌচাকটির জন্য মৃত্যুপরোয়ানা নিশ্চিৎ করে যায় এক ফোটা ফেরোমেন ঢেলে দিয়ে , যা মৌচাকের মুখের কাছে জায়গাটিকে চিহ্নিত করে অন্যান্য হরনেট দের জন্য। এই চিহ্ন র সংকেত পেয়ে, স্কাউট হরণেটদের একই চাকে বসবাসকারী সদস্য হরনেটরা সেই মৌচাকের উপর ঝাপিয় পড়ে, বিশ থেকে ত্রিশটা হরণেট এর একটি দল প্রায় ত্রিশ হাজার মৌমাছিদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু কোন প্রতিদ্বন্দীতাই আসলে সেখানে হয় না। তাদের শক্ত ধারালো চোয়াল নাড়িয়ে তারা মৌচাকে ঢোকে, তাদের চোয়ালের আঘাতে একের পর এক মৌমাছির মাথা কাটা পড়ে। প্রতিটি হরণেট মিনিটে ৪০ টা মৌমাছির গলা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, কয়েক ঘন্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ, প্রত্যেকটা মৌমাছি মারা যায়, তাদের শরীরের ছিন্ন ভিন্ন অংশ পুরো মৌচাক জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। এর পর হরণেট টা তাদের খাদ্যগুদামের মজুত আক্রমন করতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা ধীরে ধীরে মৌচাকের সবু কিছু লুট করে, মধু খায়, মৌমাছিদের অসহায় লার্ভা গুলোতে নিয়ে যায় তাদের নিজেদের চাকে, সাথে সাথে মৌমাছির সেই লার্ভাগুলো জায়গা হয় তাদের নিজেদের ক্ষুধার্ত লার্ভাদের হা করে থাকা মুখের মধ্যে।

কবি টেনিশন যেভাবে বলেছিলেন এটি হচ্ছে সেই “Nature red in tooth and claw বা প্রকৃতির হিংস্রতার নগ্ন একটি রুপ। এই হরণেটগুলো ভয়ঙ্কর শিকারী মেশিন, আর পরবর্তীতে এশিয়ায় নিয়ে আসা এই সব ইউরোপীয় মৌমাছি রা অসহায় এদের সামনে, কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া। কিন্তু এশিয়ায় আসলে অন্য মৌমাছিরাও কিন্তু আছে যারা এই বিশালকার হরণেটদের আক্রমন রুখে দিতে পারে। যে মৌমাছিরা এই হরণেটদের মত জাপানের স্থানীয়। আর তাদের সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দারুন চমকপ্রদ, অভিযোজনীয় আচরণের আরো একটি বিস্ময়কর অর্জন। যখনই কোন স্কাউট একাকী হরণেটকে তারা তাদের মৌচাকের আশে পাশে দেখে, তারা দ্রুত মৌচাকে প্রবেশ করে, অন্য মৌমাছিদের সতর্ক করে দেয়, সবাই প্রস্তুত হয় যুদ্ধের জন্য, এই সময় তারা একাকী হরণেটটিকে মৌচাকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে টোপ ফেলে। ততক্ষনে হাজার হাজার মৌমাছি মৌচাকের মুখে অপেক্ষায় থাকে প্রস্তুত হয়ে। যখনই হরণেটটি ভিতরে প্রবেশ করে, সব মৌমাছিরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে এবং একটি টাইট বলের মত গোল হয়ে মৌমাছিরা আটকে ফেলে ভেতরে হরণেটটিকে। এরপর সবাই মিলে তারা তাদের পেট ব্যবহার করে একটি কম্পন সৃষ্টি করে এবং সবার সম্মিলিত কম্পন সেই মৌমাছিদের বানানো বলটির কেন্দ্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় প্রায় ১১৭ ডিগ্রী ফারেনহাইট অবধি। মৌমাছিরা এই তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, কিন্ত মাঝখানে আটকে থাকা হরণেট বা ভীমরুলটি তা পারেনা। ২০ মিনিটের মধ্যে স্কাউট হরণেটটি গরমে সিদ্ধ হয়ে মারা যায় এবং  আর সাধারণত এভাবে তারা তাদের মৌচাককে বাচাতে পারে। আমি আর কোন উদহারন পাচ্ছি না যেখানে কোন একটি প্রানী ( স্প্যানিশ ইনক্যুইজিশন বাদে) তার শত্রু অপর একটি প্রাণীকে হত্যা করে আগুনে ধলসে।

995221_10151799032408521_1798868968_n
ছবি: A defensive ball of Japanese honey bees (Apis cerana japonica) in which two hornets (Vespa simillima xanthoptera) are engulfed, incapacitated, heated, and eventually killed.

এই অদ্ভুত গল্পে বেশ কয়েকটি বিবর্তনীয় শিক্ষা আছে। সবচেয়ে স্পষ্ট শিক্ষাটি অবশ্যই এশিয়ান জায়ান্ট হরনেটগুলো তাদের শিকারদের হত্যা করার জন্য অত্যন্ত চমৎকারভাবে অভিযোজিত হয়েছে, দেখলে মনে হবে যেন, গলা কেটে জবাই করে গণহত্যা করার জন্যই এদের ডিজাইন করা হয়েছে। উপরন্তু বেশ কিছু বৈশিষ্ট এই ভীমরুণটিকে রুপান্তরিত করেছে হত্যা করার মেশিন হিসাবে, যেমন এর শরীরের আকৃতি ( বড় আকার, হুল, শক্তিশালী চোয়াল, বিশাল পাখা),রাসায়নিক দ্রব্য ( চিহ্নিত করার জন্য ফেরোমোন এবং হুলের জন্য মারাত্মক বিষ) এবং এর বৈশিষ্টসুচক কিছু আচরণ ( দ্রুত উড়ার ক্ষমতা, মৌচাকে দল বেধে আক্রমন করার আচরণ, এদের লার্ভা গুলোর ’আমি ক্ষুধার্ত আমাকে খাবার দাও’ জানান দেয়ার আচরণ যা ভীমরুলদের মৌচাক আক্রমন করতে উস্কে দেয়); আর অন্যদিকে স্থানীয় মৌমাছিদের এই ভীমরুলের আক্রমন প্রতিহত করা বিবর্তিত অভিযোজনীয় কৌশল – সম্মিলিতভাবে জড়ো হয়ে, একই সাথে তাদের শরীরের অংশে কম্পন সৃষ্টি করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তাদের শত্রুকে পুড়িয়ে মারা – নি:সন্দেহে এটি বিবর্তনীয় একটি জবাব যার উদ্ভব হয়েছে ভীমরুলদের নিয়মিত আক্রমনের প্রতিক্রিয়ায় ( আর মনে রাখতে হবে এই আচরণ জীনগত সংকেত হিসাবে রুক্ষিত আছে একটা পেনসিলের ফোটার চেয়েও ক্ষুদ্র একটি মস্তিষ্কে)।

অন্যদিকে সম্প্রতি অনুপ্রবেশ করা ইউরোপীয় মৌমাছিদের আসলেই এই ভীমরুলের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা করার মত কিছু নেই। আর ঠিক এটাই আমরা আশা করতে পারি সেই সব মৌমাছিদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যে মৌমাছিগুলো বিবর্তিত হয়েছে এমন একটি জায়গায় যেখানে এরকম আক্রমনাত্মক প্রকৃতির শিকারী ভীমরুলের অস্তিত্ব নেই। আর সেকারনে প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। আমরা একটা ভবিষ্যদ্বানী করতে পারি যে যদি এই ভীমরুলগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী শিকারী প্রানী হয় তাহলে এই ইউরোপীয় মৌমাছিগুলো হয় মরে যাবে ( যদি না আবার নতুন করে তাদের এই পরিবেশে পুণরায় প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়া হয়) নতুবা তারা তাদের নিজেদের একটি বিবর্তনীয় জবাব খুজে নেবে, যা স্থানীয় মৌমাছিদের বিবর্তিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মত  একই রকম নাও হতে পারে।

Red-black-anttumblr_ls3jdiDQ3n1qgfmcuo1_500ছবি: Comparison of normal worker ants (top) (Cephalotes atratus ) and ants infected with a nematode.

কিছু অভিযোজন আরো বেশী অশুভ পরিকল্পনা আর কৌশলের উদহারণ । তাদের একটির সাথে জড়িত যেমন একটি প্রজাতির রাউন্ডওয়ার্ম বা কৃমি যা এ মধ্য আমেরিকার একটি প্রজাতির পিপড়ার শরীরে পরজীবি হিসাবে জীবন ধারণ করে। যখন আক্রান্ত হয়, আক্রান্ত পিপড়াটির আচরণ আর চেহারা বদলে যায় রাতারাতি। প্রথমত তাদের সাধারণত কালো রঙ এর পেট রুপান্তরিত হয় উজ্জ্বল লাল রঙ এ। এই সময় পিপড়া বেশ শ্লথ হয়ে পড়ে তাদের নড়াচড়ায়, এবং তাদের পেটটাকে উচিয়ে রাখে উপরের দিকে, যেন দৃষ্টি আকর্ষনকারী লাল পতাকা কোন। তাদের পেট আর বুকের সরু সংযোগটি দুর্বল ও প্রায় বিচ্ছিন্ন হবার উপক্রম হয়। এবং এই পিপড়াটি আর কোন ধরণের অ্যালার্ম বা সতর্ক করার ফেরোমোন তৈরী করে না, সুতরাং সে তার অন্যান্য একই জায়গায় বসবাসকারী পিপড়াদের সতর্ক করতেও ব্যর্থ হয়।

i-87608ed8cc8f4fff04400db171f01ff4-Ant Berry
ছবি: When the ant Cephalotes atratus is infected with a parasitic nematode, its normally black abdomen turns red, resembling the many red berries in the tropical forest canopy. According to researchers, this is a strategy concocted by nematodes to entice birds to eat the normally unpalatable ant and spread the parasite in their droppings. (Steve Yanoviak/University of Arkansas)

আর এই সব পরিবর্তনই হচ্ছে কিন্তু একটি পরজীবি কৃমির জীনের কারণে, সবই তার অসাধারণ একটি কৌশল শুধু প্রজননের জন্য। কৃমিটি পিপড়া আচরণ ও চেহারা দুটোই বদলে দেয়, যা পাখিদের কাছে নিজেদের বিজ্ঞাপন করে মজার রসালো কোন বেরী ফল হিসাবে, আর সেটা করতে গিয়ে নিজেদের মৃত্যু ঢেকে আনে। বেরী ফলের মত লাল পেট উচু করে রাখে সব পাখিদের দেখার জন্য এবং পিপড়ার স্লথগতির ও পেট আর বুকের দুর্বল সংযোগের জন্য সহজে পাখিরা ঠুকরে তুলে নেয় লাল পেট খাবার জন্য। পাখিদের খেয়ে নেয়া এই লাল পেটে ভরা থাকে সেই কৃমির ডিম এ। পাখিরা এরপর এই ডিমগুলো তাদের বিষ্ঠার সাথে আবার বের করে দেয়, যা পিপড়া আবার খাদ্য হিসাবে সংগ্রহ করে তাদের লার্ভাদের খাদ্য হিসাবে খাওয়ানোর জন্য। এই কৃমির ডিমগুলো পিপড়ার লার্ভার মধ্যে ফুটে বড় হয়। যখন পিপড়ার লার্ভা পিউপায় পরিণত হয়, কৃমিগুলো পিপড়ার পেটের মধ্যে আসে এবং প্রজনন করে এবং আরো ডিম পাড়ে, এবং এভাবে জীবন চক্রর পুণরাবৃত্তি হয়।

ant_gaster_eggs
ছবি:An infected ant’s abdomen, or gaster, is sliced open to reveal hundreds of nematode eggs. A closeup of the eggs shows the worm coiled inside. Once consumed by ant larvae, the eggs hatch, the adults migrate to the larval ant’s gaster, mate and produce more eggs. (Steve Yanoviak/University of Arkansas)

এই ধরনের বিস্ময়কর অভিযোজনগুলো -নানা উপায়ে যেভাবে পরজীবিরা তাদের পোষকদের নিয়ন্ত্রন করে, শুধু তাদের জীন পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর নিশ্চিত করার জন্য- যে কোন বিবর্তন বিশেষজ্ঞদের দারুন কৌতুহলী করে তোলে। প্রাকৃতিক নির্বাচন, সাধারন একটি কৃমির উপর কাজ করে এটিকে দক্ষ করেছে তার পোষককে নির্দেশনা দিতে এবং তার চেহারা আর গঠন পরিবর্তন করে একে রুপান্তরিত করে মিথ্যা ফলের মত।

এ ধরনের অভিযোজনের উদহারণের সংখ্যা অসংখ্য। এমনও অভিযোজন আছে যেখানে প্রানীরা দেখতে হয় উদ্ভিদের মত, শিকারী প্রানীদের হাত থেকে বাচার জন্য গাছের পাতার মধ্যে সহজে লুকিয়ে থাকার জন্য। কিছু ক্যাটিডিড (katydid) যেমন, দেখতে ঠিক পাতার মত, পাতার মত প্যাটার্ণ সহ এমন কি পাতার ‘পচা দাগ’ সহ। যা দেখতে ঠিকই পাতার ছিদ্রর মতই লাগে। এই মিমিক্রি বা প্রায় হুবুহু অনুকরণ এতই সুক্ষ্ম আপনি খাচায় একগুচ্ছ পাতার মধ্যে খুব সহজে খুজেই পাবেন না। আর প্রকৃতিতে কাজটি আরো কঠিন।

article-0-13797F32000005DC-838_634x408
ছবি: At a casual glance it looks just like a dead, partially damaged leaf, but if the peacock katydid is threatened is suddenly reveals a pair of bright eye spots and starts jumping excitedly

04-rotting-leaf-mimic-katydid-tettigoniidae-amazon-peru
ছবি: A superb leaf-mimicking katydid (Tettigoniidae) from the Amazon rainforests of Peru with markings that imitate decay spots.

ছবি:A large leaf-mimicking katydid (Tettigoniidae) from the Amazon Basin of Peru shows the coloration of a diseased or damaged leaf.

এবং এর উল্টোটাও আছে প্রকৃতিতে, অনেক উদ্ভিদও আছে যারা প্রানীদের অনুরুপ দেখতে হয়। কিছু প্রজাতির অর্কিড আছে যারা দেখতে প্রায় মৌমাছি আর ওয়াস্পদের মত দেখতে, পাখার মত পাপড়ি আর মিথ্যা চোখের স্পট সহ ; এই সদৃশ্যতা যথেষ্ট পরিমানে ভালো যে অনেক হ্রস্বদৃষ্টির পুরুষ পতঙ্গকেও বোকা বানায়, যারা এই ফুলের উপর আরোহন করে, চেষ্টা করে তাদের সাথে প্রজনন করতে। আর যখন এটা হতে থাকে, অর্কিডের রেণু থলেটা পতঙ্গর মাথার সাথে আটকে যায়। যখন হতাশ পুরুষটি ফুল ছেড়ে চলে যায় তার প্রজননের ইচ্ছা অপুর্ণ রেখে, নিজের অজান্তেই তারা তাদের শরীরের বয়ে নিয়ে যায় পরাগ রেণু এবং পরের অর্কিডে গিয়ে এটি নিষিক্ত করে পরবর্তী ব্যর্থ ,”মিথ্যা সঙ্গমের’ প্রক্রিয়ায়। প্রাকৃতিক নির্বাচন এই অর্কিডগুলোকে এমন ছাচে গড়ে তোলে যেন একটি মিথ্যা পতঙ্গ কারন সেই জীনগুলো যা পরাগায়নকারী পতঙ্গকে আকর্ষন করে সেগুলোরই সম্ভাবনা থাকা পরবর্তী প্রজন্মের স্থানান্তরের। কিছু অর্কিড এমন কি পরাগায়নকারীদের প্রলুব্ধ করে রাসায়নিক পদার্থ সৃষ্টি করে যা ঠিক মৌমাছিদের যৌন ফেরোমেন এর মতই গন্ধে।

ছবি: উপরের ছবি গুলো বী অর্কিড ((Ophrys apifera ) এর বেশ কয়েকটি ভ্যারিয়ান্ট; পুরুষ মৌমাছিদের শুধু চোখের দেখায় বা স্পর্শেই ছলনা করেনা তারা, স্ত্রী মৌমাছিদের মত ফেরোমোনও তৈরী করে; পুরুষরা এদের স্ত্রী মৌমাছি ভেবে সঙ্গমে উদ্যত হয়, তখনই পরাগায়নের কাজটি সে সেরে নেয় তারা;

খাদ্য সন্ধানের ক্ষেত্রেও, সঙ্গী খোজার মতই জটিল অভিযোজনীয় কৌশল ঘটে থাকে। যেমন পাইলিয়েটেড কাঠ ঠোকরা, উত্তর আমেরিকার মাথায় পালকের ঝুটিওয়ালা এই পাখিটি সবচেয়ে বড় কাঠ ঠোকরা, যারা বেচে থাকার জন্য নির্ভর করে গাছের কান্ড ঠুকরে পোকা মাকড় যেমন পিপড়া আর বীটলদের মতো পোকা খুটে খুটে খাওয়ার উপর। এছাড়া এর অসাধারণ ক্ষমতা আছে গাছের বাকলের নিচে কান্ডের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শিকার খুজে বের করার জন্য (সম্ভবত শব্দ শুনে বা তাদের নাড়াচাড়া অনুভব করে- আমরা এখনও নিশ্চিত নই); এই কাঠ ঠোকরাদের অনেকগুলো বৈশিষ্ট থাকে যা একে শিকার করতে আর হাতুড়ির মতো ঠোট দিয়ে কাঠ ঠোকরাতে সাহায্য করে। যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো এদের অনেক লম্বা একটা জিহবা। জিহবার মুলটা আটকে থাকে চোয়ালের হাড়ে আর তারপর জিহবাটা একটা নাকের ফুটো দিয়ে বের হয় পুরোপুরি মাথার পিছন ঘুরে আবার এর ঠোটের মধ্যে প্রবেশ করে নীচ দিয়ে। বেশীর ভাগ সময় জিহবাটা সংকোচিত অবস্থায় থাকে তবে এটি প্রসারিত হতে পারে কোন গাছের বাকলের নীচে পিপড়া বা অন্য পোকামাকড় খোজার জন্য। এটি সুচোলো আর আঠালো লালায় ভেজা থাকে গর্ত থেকে খুব ছোট পোকামাকড় অনায়াসে তুলে আনে। পাইলেটিয়েড উডপেকার তাদের শক্ত ঠোট ব্যবহার করে গাছের গুড়িতে তার নিজের বাসা বানায় খুড়ে খুড়ে বা গাছের কান্ডে ড্রামের মত শব্দ তৈরী করে সঙ্গীনির দৃষ্টি আকর্ষন করে বা তার নিজের এলাকার আধিপাত্য ঘোষনা করে।


ছবি: Palliated woodpecker

কাঠ ঠোকরাটি আসলেই জৈব বৈজ্ঞানিক জ্যাক হ্যামার। তার এই আচরণ ব্যাখ্যার দাবী রাখে যেমন: কেমন করে একটা নাজুক প্রাণী শক্ত কাঠের মধ্যে ড্রিলের ছিদ্র করতে পারে নিজের ক্ষতি না করে ( কাঠের গুড়ির মধ্যে পেরেক ঢুকিয়ে দেখুন, ঠিক কি পরিমান শক্তি লাগে।)  এই কাজটি করার জন্য পাইলিয়েটেড কাঠ ঠোকরা মাথার খুলি যে পরিমান চাপ সহ্য করে তা বিস্ময়কর – কাঠ ঠোকরা প্রতি সেকেন্ডে ১৫ বার ঠোকর মারে কাঠে যখন অন্য কাঠঠোকরাদের সাথে যোগাযোগের জন্য গাছের গুড়িতে ড্রামের মত শব্দ করে, সে সময় যে শক্তির সৃষ্টি হয় সেটি কোন দেয়ালে আপনার মাথা ঘন্টায় ১৬ মাইল বেগে আঘাত করার মত। এই গতিতে কোথাও ধাক্কা খেলে আপনার গাড়িও দুমড়ে যেতে পারে। এবং এ কারণে কাজটা আসলে সত্যিকারের বিপজ্জনক কাঠঠোকরাটির জন্য, এটি তার মস্তিষ্কের যেমন ক্ষতি করতে পারে বা এমনকি তার চোখও ছিটকে বাইরে চলে আসতে পারে।

ছবি: 2. A woodpecker’s tongue retracted (left) and extended (right). The exceptionally long tongue wraps around the skull and is anchored at the base of the bill. The tip of the tongue is barbed to help extract insects from holes, and the tongue is coated with sticky saliva. A pileated woodpecker is shown here.(Drawing by Jenifer Rees.)


ছবি: Pileated Woodpecker

কিন্তু এই ক্ষতি এড়াতে, কাঠ ঠোকরার মাথার খুলির আকারও ভিন্ন রকম, অতিরিক্ত হাড় এটিকে আরো মজবুত করেছে। আর তাদের ঠোটটা বসানো থাকে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থির একটি কুশনের উপর, এবং ঠিক যে মুহুর্তে ঠোটটি কাঠের উপর আঘাত করতে যায়  ঠোটের চারপাশের মাংশপেশীগুলো সংকুচিত হয়, ফলে আঘাতের চাপটি সরাসরি এর ব্রেনের উপর না পড়ে অন্যদিকে সরে যায়, শক্ত ও মজবুত এর খুলির গোড়ার দিকে। প্রতিটি ঠোকরের সময় পাখির চোখ বন্ধ হয়ে যায়, যা এর চোখকে ঠিকরে বাইরে বের হয়ে আসা থেকে রক্ষা করে, নাকের ছিদ্রের উপর খুবই নরম হালকা পালক এর একটি আস্তরণ থাকে , যেন পাখিটি কাঠের গুড়ো বা টুকরো শ্বাসনালীতে নি:শ্বাসের সময় না ঢুকে যায়। খুব শক্ত লেজের পালক তারা ব্যবহার করে গাছের সাথে নিজেকে খাড়া ভাবে ধরে রাখেতে এবং এদের আছে X এর মত চার আঙ্গুলের পা ( দুটো সামনে দুটো পেছনে) যা শক্ত করে গাছের ডাল ধরে রাখে।

আমরা প্রকৃতিতে যেদিকে তাকাইনা কেন, আমরা সব জীবদের দেখি যেন তাদের কি অসাধারণভাবে ডিজাইন বা পরিকল্পিত করা হয়েছে তাদের নিজস্ব প্রকৃতিতে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য।সেই পরিবেশ হতে পারে জীবনের ভৌত কাঠামো, যেমন তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা বা অন্যান্য প্রানীদের উপর – যেমন প্রতিদ্বন্দী, শিকারী বা শিকার – প্রত্যেকটি প্রানীকে তার পরিবেশের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়। আদৌ বিস্ময়কর না, যে অতীতের প্রকৃতিবিদরা বিশ্বাস করতেন প্রতিটি প্রানী স্বর্গীয় পরিকল্পনায় সৃষ্টি, যাদের ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন তাদের কাজ করার জন্য।

The Origin এ ডারউইন এই মতবাদ চিরতরে ভেঙ্গে দিয়েছেন। একটি মাত্র অধ্যায় দিয়ে, তিনি শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে ধারণ করা, স্বর্গীয় পরিকল্পনা আর সৃষ্টির নিশ্চিৎ ধারণাটিকে প্রতিস্থাপিত করেন একটি নৈর্ব্যক্তিক, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অসাধারণ সরল ধারনা দিয়ে – প্রাকৃতিক নির্বাচন – যা ঠিক সেই একই ফলাফল সহ একই সাথে কাজ করতে সক্ষম । জীববিজ্ঞানতো বটেই, মানবজাতির বিশ্বদর্শন সম্বন্ধে তার এই অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টিটির প্রভাবের গুরুত্ব সম্বন্ধে আসলেই বাড়িয়ে বলার কিছু নেই। এবং এই ধাক্কাটি থেকে এখনও অনেকে  স্বাভাবিক হতে পারেননি আর সেকারণে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি তীব্রতম হিংস্র আর অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়ার উদ্রেক করে অনেকের কাছ থেকে।

কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি নিজেও জীববিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি প্রশ্নের সুত্রপাত করে। কি প্রমান আছে এটি আসলেই প্রকৃতিতে কাজ করছে? আসলেই কি এই প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা দিতে পারে বিভিন্ন অভিযোজনীয় দৃষ্টান্তের, এমনকি যেগুলো জটিল সেগুলো? ডারউইন তার বইটিতে মুলত তুলনামুলক উদহারণ বা অ্যানালোজী ব্যবহার করেছিলেন তার ব্যাখ্যার সমর্থনে: পশু বা উদ্ভিদ কৃত্রিম প্রজনন করেন তাদের সাফল্যগুলো, যা খুব পরিচিত, যা উদ্ভিদ কিংবা প্রাণীকে গড়ে তোলে খাদ্য, পোষা প্রানী বা সাজানোর উপকরণ হিসাবে। কিন্তু সেই সময় আমাদের কাছে খুব কমই প্রত্যক্ষ প্রমান ছিল যে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রাকৃতিক কোন জীব জনগোষ্ঠীর উপর কাজ করতে পারে। এবং, যেমন টি ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন  যেহেতু এই প্রক্রিয়া খুবই মন্হর, হাজার হাজার লক্ষ বছরে যে কোন একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তন আনে, কোন একটি মানুষের জীবদ্দশায় সেই পরিবর্তন লক্ষ্য করা খুবই কঠিন হবে।

সৌভাগ্যক্রমে, মাঠপর্যায়ে ও ল্যাবরেটরীতে জীববিজ্ঞানীদের কঠিন শ্রমের কল্যাণে  আমাদের কাছ এখন প্রমান আছে– অনেক অনেক সব প্রমান। আমরা খুজে পেয়েছি যে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপস্থিতি সর্বব্যাপী, প্রতিটি একক সদস্যকে এটি পরীক্ষা নীরিক্ষা করে দেখছে, যা অযোগ্য জীন সরিয়ে, যোগ্যতর জীনদের টিকে থাকতে সাহায্য করতে।আর এই প্রক্রিয়াটি সৃষ্টি করতে পারে জটিলতম অভিযোজনীয় বৈশিষ্ট এবং কখনও কখনও বিস্ময়কর কম সময়ে।

ছবি: The Oldfield mouse has brown fur on its upper body with an underside that is pure white. It is well camouflaged in its natural habitat which includes anywhere where the soil is brown such as hedgerows, corn fields, woods (‘timber tracts’) and cotton fields.


ছবি: The gene which creates lighter coloured coats in mice (mc1r) is the identical gene that creates people with ginger coloured hair!

ডারউইনবাদের যে অংশটাকে সবচেয়ে বেশী ভুল বোঝা হয় সেটা হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন। এটি কিভাবে কাজ করে সেটা দেখার জন্য, খুব সরল সাধারণ একটি অভিযোজনের দিকে নজর দেয়া যাক: বুনো ইদুরের গায়ের চামড়ার রং, স্বাভাবিক রঙ এর বা ওল্ডফিল্ড ইদুর ( Peromyscus polionotus) এর গায়ের চামড়ার রং বা কোট এর রং সাধারণত বাদামী এবং গাঢ় রং এর মাটিতে এরা গর্ত করে বাস করে। কিন্তু ফ্লোরিডার উপসাগরীয় তীরে হালকা বালিয়াড়ীতে বাস করে একই প্রজাতির হালকা গায়ের চামড়া রং এর ইদুররা,বীচ ইদুর (Beach Mice)। শুধু পিঠে হালকা বাদামী একটা দাগ ছাড়া বীচ মাউস গুলোর গায়ের রঙ পুরোটাই সাদা। এই হালকা রং হচ্ছে শিকারী প্রানীদের, যেমন বাজপাখী, পেচা, বক, যারা এই সাদা বালিয়াড়ীগুলো শিকার করে তাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য একধরনের বিবর্তিত ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ। কিন্তু  আমরা কিভাবে জানলাম এটি একটি অভিযোজনীয় কৌশল? একটি সরল (যদিও খানিকটা অস্বস্তিকর) পরীক্ষা করেছিলেন কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ডোনাল্ড কাউফমান। তিনি পরীক্ষায় দেখেন যে ইদুরগুলোর গায়ের চামড়া রং যে মাটিতে তারা বসবাস করে তার সাথে বেশী মিলে যায় তারা অপেক্ষাকৃতভাবে বেশীদিন বাচে। এই পরীক্ষার জন্য কাউফমান বিশাল একটি বড় এনক্লোজার বা খাচা ( পরীক্ষাগারের বাইরে), যার একপাশে হালকা রঙ এর মাটি আর অন্য পাশে গাঢ় রঙ এর মাটি। প্রতিটি খাচায় তারপর তিনি সমান সংখ্যক গাঢ় আর হালকা রঙ এর চামড়ার ইদুর ছেড়ে দেন। এবং দুটি খাচায় তিনি ক্ষুধার্ত একটি করে পেচাকে ছেড়ে দেন, পরে তিনি ফিরে আসেন দেখতে কোন রঙের ইদুরগুলো বেশী বেচে গেছে। যেমনটি আশা করা হয়েছিল, সেই ইদুরগুলো যাদের গায়ের চামড়ার রং তাদের খাচার মাটির সাথে সবচেয়ে বেশী অসামন্জষ্যপুর্ণ, বা মাটির বীপরিতে তাদের গায়ের রং খুব বেশী আলাদাভাবে প্রকট তারাই সহজে শিকারী প্যাচার আক্রমনের শিকার হয়, দেখা যায় যে ইদুরগুলো ক্যামোফ্লেজ বা রং ছদ্মবেশ থাকে তারাই বেশী বেচে থাকে।  এই পরীক্ষা আরো ব্যাখ্যা করে সেই সরল সম্পর্কটি যা আমার প্রকৃতিতেও দেখি: গাঢ় রঙ এর মাটিতে গাঢ় রং এর চামড়ার ইদুররা থাকে।

যেহেতু সাদা রং বেলাভুমি বা বিচ ইদুরদের অনন্য বৈশিষ্ট, তারা খুব সম্ভবত বাদামী রঙ এর মুল ভুখন্ডের ইদুরদের থেকে বিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করা হয়, সম্ভবত খুব সাম্প্রতিক কোন সময় যেমন ৬০০০ বছর আগে, যখন ব্যারিয়ার দ্বীপগুলো আর তাদের সাদা বালিয়াড়ীগুলো মুল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আর তখনই নির্বাচন প্রক্রিয়া তার কাজটি করেছে। ওল্ডফিল্ড ইদুরের গায়ের চামড়ার নানা রুপ বা বৈচিত্রময়তা আছে, তাদের মধ্যে যারা এই সব দ্বীপে বসতি গড়ে  হালকা রঙ এর প্রায় সাদা বালির সাগরবেলায়, তাদের মধ্যে যে সদস্যদের গায়ের রং হালকা তাদের অপেক্ষাকৃত বেশী সুযোগ থাকবে তাদের সমগোত্রীয় গাঢ় চামড়ার সদস্যদের চেয়ে, যাদের সাদা বালিতে খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারবে শিকারী পাখিরা। আমরা আরো জানি যে সাদা আর গাঢ় চামড়ার ইদুরের মধ্যে একটি জীনগত পার্থক্য আছে: সাদা চামড়ার বীচ মাইস রা বেশ কিছু রন্জক বা পিগমেন্টেশন জীনের হালকা বা লাইট রুপগুলো বহন করে, যারা একসাথে তাদের গায়ের চামড়ায় হালকা রঙ এর সৃষ্টি করে। গাঢ় ওল্ডফিল্ড ইদুররা এই জীনগুলোর গাঢ় বা ডার্ক অপর বিকল্প রুপটি বহন করে। এবং সময়ের সাথে, এই শিকারী প্রানীদের শিকারের পরিণত হবার ভিন্ন ভিন্ন  হারের কারনে হালকা রং এর চামড়ার ইদুররা তাদের লাইট বা হালকা রঙ এর জীনের বেশী অনুলিপি রেখে যাবে ( কারণ তাদের বেশী সুযোগ থাকবে বাচার এবং প্রজনন সফল হবার) এবং এই পক্রিয়া চলবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। এবং বীচ মাইসের জনগোষ্ঠী গাঢ় থেকে হালকা চামড়ায় বিবর্তিত হবে।

ছবি: বিচ মাউস আর ফিল্ড মাউস দের বিস্তার

তাহলে কি হচ্ছে এখানে?? প্রাকৃতিক নির্বাচন , ইদুরের গায়ের চামড়ার রং এর উপর কাজ করে , শুধুমাত্র জীনগত গঠন বদলে দিয়েছে এই জনসংখ্যায় , বাড়িয়ে দিয়েছে সাদা বা হালক রং এর বিকল্প জীনের উপস্থিতি হার যা কিনা বাচতে এবং প্রজনন সফল হচ্ছে। এবং যখন আমি বলছি প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করছে , এটি সঠিক শব্দ চয়ন হচ্ছে না , মনে রাখতে হবে প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন একটি মেকানিজম না কিনা যা কোন গোষ্ঠীর উপর বাইরের থেকে চাপিয়ে দেয়া হয় বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, একটি বিবরণ , কেমন করে যে জীনগুলো উপকারী অভিযোজন বৈশিষ্টর জন্য দায়ী, সময়ান্তরে সেই জীনগুলোই জনসংখ্যায় সংখ্যায় বেড়ে যায়। যখন জীববিজ্ঞানীরা বলেন , যে প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন একটি ট্রেইট বা বৈশিষ্টর উপর কাজ করে, তারা আসলে শুধুমাত্র সংক্ষেপে বোঝাতে চান যে এই বৈশিষ্টটি একটি বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হচ্ছে। এবং সেই একই অর্থে প্রজাতিরাও তাদের পরিবেশের সাথে খাপ নেবার চেষ্টা করে না। এখানে কোন স্বাধীন ইচ্ছা জড়িত নেই, কোন সচেতন প্রচেষ্টার সংশ্লিষ্টতা নেই। পরিবেশের সাথে অভিযোজন অবশ্যম্ভাবী যদি কোন প্রজাতির সঠিক প্রকারের জীনগত ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ থাকে।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোন অভিযোজন প্রক্রিয়া সৃষ্টিতে তিনটি বিষয় জড়িত, প্রথমত, শুরুর জনসংখ্যায় অবশ্যই বৈশিষ্ঠের ভ্যারিয়েশন থাকতে হবে: যেমন, কোন একটি ইদুরদের জনসংখ্যায় তারা তাদের চামড়ার রঙ এর কিছু বৈচিত্রময়তা প্রদর্শন করবে, অন্যথায় এই ট্রেইট বা বৈশিষ্টটির কোন বিবর্তন হবে না সেখানে। ইদুরের ক্ষেত্রে , আমরা জানি এটি সত্যি, কারণ মুল ভুখন্ডের ইদুর জনগোষ্ঠীতে তাদের চামড়ার রঙ এর বৈচিত্রময়তা লক্ষ্য করা যায়।

দ্বিতীয়ত এই ভ্যারিয়েশগুলোর কিছুটা অংশ হতে হবে তারা যে জীন বহন করে তার পারস্পরিক ভিন্ন রুপের কারণে, অর্থাৎ এই ভ্যারিয়েশনগুলোর কিছুটা জীনগত ভিত্তি থাকতে হবে ( যাকে বলা হয় হেরিটিবিলিটি বা বংশগতি); যদি কোন জীনগত ভিন্নতা না থাকে গাঢ় আর হালকা রঙ এর ইদুরদের মধ্যেও তারপরও হালকা রঙ এর ইদুরগুলো সাদা বালিয়াড়ী বেশী বাচবে ঠিকই কিন্তু এই গায়ের চামড়ার রং এর পার্থক্য তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে হস্তান্তরিত হবে না এবং কোন বিবর্তনীয় পরিবর্তনও হবে না এই জনগোষ্ঠীতে। আমরা জানি যে জীনগত পুর্বশর্তটাও এই ইদুর জনসংখ্যা পুর্ণ করছে, বাস্তবিকভাবেই, আমরা ঠিকই জানি কোন দুটি জীন এই হালকা/গাঢ় রং এরি ভিন্নতার উপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের একটি হচ্ছে Agouti  জীন, সেই একই জীন যার মিউটেশন বা পরিব্যক্তি গৃহপালিত বিড়ালের চামড়ায় কালো রং এর কারণ, আর অন্যটি হচ্ছে Mc1r এবং এর একটি পরিবর্তিত রুপ, মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যা আইরিশ জনগোষ্ঠীতে বিশেষভাবে দেখা যায়, লাল চুল আর চামড়ার দাগ বা ফ্রেকলস এর জন্য দায়ী।

এই জীনগত প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশনটি এলো কোথা থেকে? মিউটেশনগুলোর মাধ্যমে, যা ডিএনএ বেস অনুক্রমের আকস্মিক কিছু পরিবর্তন যা সাধারণ ভুলের কারণে ঘটে, যখন ডিএনএ র অনুলিপি তৈরী হয় কোষ বিভাজনের সময়। জীনগত প্রকরণ যা মিউটেশনের কারণে সৃষ্টি হয় তাদের উপস্থিতি সর্বজনীন: এই পরিবর্তিত রুপের জীনই যেমন ব্যাখ্যা করে মানুষের চোখের আইরিস এর রং, রক্তের গ্রুপ এর ভিন্নতা, আমাদের প্রজাতি সহ অন্য বহু প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে দৃশ্যমান নানা প্রকরণ, যেমন উচ্চতা বা ওজনের তারতম্য, প্রাণরাসায়নিক সহ আরো অসংখ্য ট্রেইট এর ভিন্নতা।

অনেক ল্যাবরেটরী গবেষনা ও পরীক্ষা নীরিক্ষার পর, বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে মিউটেশন বা পরিব্যক্তি ঘটে র‌্যানডোম বা এলোমেলোভাবে। এখানে র‌্যানডোম শব্দটির বিশেষ অর্থ আছে, যা প্রায়ই ভুল বোঝা হয়, এমনকি এই ভূল করে জীববিজ্ঞানীরাও। শব্দটি এখানে যা বোঝায় তা হচ্ছে যে, মিউটেশন বা পরিব্যক্তি হবেই, সেটা সেই প্রজাতির সদস্যদের জন্য উপকারী হোক বা না হোক। মিউটেশন হচ্ছে খুব সরলভাবে ডিএনএ প্রতিলিপিকরণ প্রক্রিয়ায় ঘটা কিছু ভুল। তাদের বেশীর ভাগই হয় ক্ষতিকর নয়তো নিউট্রাল, বা ভালো খারাপ কোনটাই না, তবে কিছু কিছু মিউটেশন বেশ কাজেও আসতে পারে। আর প্রজাতির সদস্যদের কাজে লাগতে পারে এমন মিউটেশনগুলোই বিবর্তন প্রক্রিয়ার কাচামাল। কিন্তু কোন জৈববৈজ্ঞানিক উপায় নেই যা কিনা সেই সম্ভবনাটিকে বাড়াতে পারে,যেখানে কোন একটি মিউটেশন প্রজাতির বর্তমান অভিযোজনীয় প্রয়োজনীয়তায় কাজে আসবে। যদিও এটি উপকারী বিশেষ করে সাদা বালির মধ্যে বসবাস কারী ইদুরদের চামড়ার রং হালকা, কিন্তু তাদের ভাগ্যে সেই উপকারী মিউটেশনটি ঘটার সম্ভবনা কিন্তু গাঢ় মাটিতে বাসকরা ইদুরদের তুলনায় কোন অংশেই বেশী না।বরং একটি মিউটেশনকে র্যানডোম বা Random বলার চেয়ে, মনে হয় অোরো বেশী সঠিক হবে তাদের নির্বিকার বা Indifferent বলে ডাকা। কোন একটি মিউটেশন এর আবির্ভাব হবার সম্ভাবনা আসলেই নির্বিকার সেটা কি প্রজাতির সদস্যর জন্য আদৌ উপকারী কিংবা ক্ষতিকর হবে এই ক্ষেত্রে।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের তৃতীয় আর শেষ যে বিষয়টা হলো যে জীনগত প্রকরণ অবশ্যই প্রভাব ফেলবে প্রজাতির সদস্যদের পরবর্তী প্রজন্ম রেখে যাবার সম্ভাবনার উপর। এই ইদুরের ক্ষেত্রে, কফমানের প্রিডেশন বা শিকারী প্রানী আক্রমনের প্রতি ঝুকিপুর্ণতা পরীক্ষা দেখিয়েছে যে নির্দিষ্ট খাচার পরিবেশের সাথে ভালোভাবে লুকিয়ে থাকবার মত ক্যামোফ্লেজ যে ইদুরদের আছে তারা বেশী প্রজনন সফল হবে বা বেশী করে তাদের জীনের প্রতিলিপি তাদের প্রজন্মের মধ্যে রেখে যাবে। বীচ মাইস দের সাদা রঙ, তাহলে, সব শর্তই পুরণ করছে বিবর্তিত হওয়ার উপযুক্ত একটি ট্রেইট বা বৈশিষ্ট হিসাবে।

নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন, তাহলে, র‌্যানডোমনেস বা এলোমেলো নির্বিকার প্রক্রিয়া ও প্রাকৃতিক সুত্রমাফিক প্রক্রিয়ার একটি মিশ্রন। প্রথমে একটি র‌্যানডোম (বা নির্বিকার) একটি প্রক্রিয়া, পরিব্যক্তি সৃষ্টির একটি ঘটনা যা বেশ কিছু জীনগত প্রকরণ বা ভ্যারিয়ান্ট এর সৃষ্টি করে, যারা ভালো এবং খারাপ দুটোই (যেমন ইদুরের উদহারণ, নানা ধরনের চামড়ার রং এর বৈচিত্র), এরপর আসে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া – প্রাকৃতিক নির্বাচন- যা এই প্ররকণ গুলোর উপর কাজ করে সুনির্দিষ্ট উপায়ে, যা ভালো বৈশিষ্টগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করে, খারাপ বৈশিষ্টগুলো ধীরে ধীরে বাতিল করে দেয় ( সাদা বালিয়াড়ীতে হালকা রঙ এর জীন টিকে থাকে গাড় রঙ এর জীনের বদলে);

আর এই বিষয়টি ডারউইনবাদ সম্বন্ধে নি:সন্দেহে সবচেয়ে ব্যপকহারে বিদ্যমান ভ্রান্তধারণাটি নজরে নিয়ে আসে: সেই ধারনটা হচ্ছে বিবর্তন হলো, সবকিছুই ঘটছে আপতন বা সুযোগের কারণে ( অনেকসময় এটিকে বলা হয় সবকিছুই ঘটছে আকস্মিকভাবে বা দুর্ঘটনার মাধ্যমে); এই খুব সাধারণ দাবীটি চুড়ান্তভাবে ভুল একটি বক্তব্য; কোন বিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং অবশ্যই ডারউইন, কেউই কখনো এই যুক্তি দেননি যে প্রাকৃতিক নির্বাচন নির্ভর করে চান্স বা আপতন বা সুযোগের উপর। বরং ঠিক এর বীপরিত। কিভাবে একটি নির্বিকার বা র‌্যানডোম  প্রক্রিয়া হাতুড়ীর মত ঠোকরাতে পারা কোন কাঠঠোকরাকে বানাতে পারবে, বা ছদ্মবেশী মৌমাছির মত অর্কিডকে বা খুব সহজে নিজেদের লুকিয়ে ফেলার মত ছদ্মবেশ বা  ক্যামোফ্লেজ করা ক্যাটিডিড বা বীচ মাইস দের? নাহ অবশ্যই না। যদি হঠাৎ করে বিবর্তনকে বাধ্য হতে হয়  নির্বিকার মিউটেশনের উপর নির্ভর করে কাজ করতে হয়, তাহলে প্রজাতিরা খুব সহজেই ধ্বংস হয়ে বিলুপ্ত হবে। শুধু মাত্র আপতন বা চান্স ব্যাখ্যা করতে পারে না প্রজাতির সদস্যদের তার পরিবেশের সাথে বিস্ময়কর রকম অভিযোজন এর বিষয়টি, আর এটি সেটা করেও না।

সত্যিকথা, বিবর্তন প্রক্রিয়ার কাচামাল হচ্ছে প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে ভিন্নতা  বা ভ্যারিয়েশন, যা আসলেই তৈরী করে চান্স মিউটেশন। এই মিউটেশন গুলো ঘটে এলোমেলো ভাবে, প্রজাতির সদস্যদের জন্য তা ভালো হোক বা খারাপ হোক তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকুনীতে এই সব প্রকরণগুলোর যাচাই বাছাই করার মাধ্যমে অভিযোজন সৃষ্টি করে এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন খুব স্পষ্টভাবেই এলোমেলো বা র‌্যানডোম প্রক্রিয়া না। প্রাকৃতিক নির্বাচন খুবই শক্তিশালী শক্তি, যা গড়ে তুলতে পারে, পুন্জ্ঞীভুত করে সেই সব জীনগুলো যাদের বাড়তি সুবিধা আছে অন্যদের চেয়ে বেশী হারে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর হবার জন্য। এবং সেটা করার মাধ্যমে সে একক কোন সদস্যকে আরো বেশী দক্ষ করে তোলে তার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য। একারনে, এটি হচ্ছে মিউটেশন আর নির্বাচনের একটি অনন্য সংমিশ্রন – আপতন আর নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের ব্যাখ্যা দেয় কিভাবে কোন একটি জীব কোন পরিবেশে অভিযোজিত হতে পারে। রিচার্ড ডকিন্স সবচেয়ে আটসাট সংজ্ঞাটি দিয়েছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের, এটি হচ্ছে এটি এলোমেলো বা নির্বিকার বা র‌্যানডোম ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ এর নিয়মমাফিক বা নন র‌্যানডোম বেচে থাকা।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বের একটি বেশ বড় কাজ আছে – জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় কাজটি। এর কাজটি হচ্ছে কিভাবে অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজনীয় বৈশিষ্টগুলো বিবর্তিত হচ্ছে সেটা ব্যাখ্যা করা। ধাপে ধাপে, সেই বৈশিষ্টগুলো থেকে, যেগুলো আগে ছিল, সেখান থেকে কিভাবে নতুন বৈশিষ্টগুলো বিবর্তিত হলো।  এর মধ্যে শুধু শরীরের আকার বা রং ই নেই, আছে জীনগত পর্যায়েরও বৈশিষ্ট যা সবকিছুরই মুল ভিত্তি। নির্বাচনকে অবশ্যই ব্যাখ্যা  করতে হবে জটিল শারীর বৃত্তীয় নানা বৈশিষ্টর বিবর্তন: যেমন রক্ত জমাট বাধা, বা বিপাক প্রক্রিয়ার নানা জটিল বিক্রিয়া যা খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদন করে। বিস্ময়কর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা যা হাজার হাজার বহিরাগত প্রোটিনকে চিনতে ও ধ্বংস করতে পারে। এবং এছাড়া জীনতত্ত্বের সেই নানা খুটি নাটি ব্যপারগুলো? কেন ক্রোমোজমের জোড়গুলো বিচ্ছিন্ন হয় যখন ডিম্বানু আর শুক্রানু তৈরী হয়? আমরা কেনই বা যৌন প্রজনন করি, কেনই বা আমরা আমাদের ক্লোন হিসাবে প্রজন্ম তৈরী করি না বাডিং এর মাধ্যমে,যেমন টা অন্য অনেক প্রজাতিতে আমরা দেখি? নির্বাচনকে ব্যাখ্যা করতে হবে আচরণগুলোকে, সহযোগীতামুলক কিংবা প্রতিদ্বন্দীতা মুলক দুটোই। কেনই বা সিংহ রা একসাথে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিকার করে কিন্তু যখনই অনুপ্রবেশকারী পুরুষ সিংহরা কোন সামাজিক গ্রুপে স্থানীয় পুরুষদের সরিয়ে দেয়, কেন তারা প্রথমে যে বাচ্চাগুলো ‍দুধ খাচ্ছে তাদের মেরে ফেলে?

এবং নির্বাচনকে এই সব বৈশিষ্টগুলোকে এমনভাবে গড়ে তোলে একটি বিশেষ উপায়ে, প্রথমে, এর সেই বৈশিষ্টকে সৃষ্টি করতে হবে, প্রায়ই খুব ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে ইতিপুর্বে বিদ্যমান কোন প্রাক বৈশিষ্ট থেকে। যেমনটা আমরা দেখেছি প্রতিটি নতুনভাবে বিবর্তিত বৈশিষ্টগুলো শুরু হয়েছে এর আগের কোন বৈশিষ্টকে রুপান্তরিত করার মাধ্যমে। টেট্রাপডদের পা, যেমন, রুপান্তরিত ফিন মাত্র। এবং  এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি অভিযোজনীয় বৈশিষ্টের বিশেষত্ব অবশ্যই এর বহনকারী প্রজাতি সদস্যদের প্রজনন ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেবে। যদি সেটা না হয়, প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করবে না। সাতার কাটার ফিন থেকে হাটার পা বিবর্তনের এই ধারাবাহিকতায় এর প্রতিটি ধাপের সুবিধাসমুহ কি কি ছিল, বা পালকহীন ডায়নোসর থেকে পালক এবং ডানা সহ ডায়নোসর এর মধ্যবর্তী প্রতিটি ধাপে, কোন একটি অভিযোজনের জন্য কোন নিম্নমুখী পতন নেই। কারন নির্বাচন এর বিশেষ প্রকৃতির জন্যই এমন কোন ধাপ সৃষ্টি করতে পারেনা, যা এর বাহককে কোন সুবিধা দেয়না। অভিযোজনের জগতে আমরা এমন কোন চিহ্ন দেখিনি কখনো ক্ষতির কারন হতে পারে: কোন সাময়িক অসুবিধা- স্থায়ী কোন উন্নতি।

যদি কোন অ্যাডাপটিভ বৈশিষ্ট বিবর্তিত হয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, সৃষ্টি হবার বদলে, আমরা কিছু ভবিষ্যদ্বানী বা প্রেডিকশন করতে পারবো। প্রথম, নীতিগতভাবে আমরা কল্পনা করতে পারবো সেই ট্রেইট বা বৈশিষ্টটির বিবর্তনীয় পরিবর্তনের সম্ভাব্য ব্যাখ্যাযোগ্য ধাপে ধাপে সেই  দৃশ্যপট, যার প্রতিটি ধাপ ফিটনেস ( বা, পরবর্তী প্রজন্মের গড় সংখ্যা) বাড়িয়ে দেয় এর বাহকের। কোন কোন ট্রেইটের জন্য এটি খুব সহজ, যেমন ধীরে ধীরে শারীরিক অস্থিকাঠামোর পরিবর্তন যা স্থলবাসী প্রানীদের রুপান্তরিত করেছে তিমি তে।  কিন্তু কিছু কিছু বৈশিষ্টর জন্য ব্যাপারটা কঠিন, বিশেষ করে প্রাণরাসায়নিক ক্রিয়া যার কোন চিহ্ন আমরা জীবাশ্ম রেকর্ডে পাবো না। আমরা হয়তো কখনোই যথেষ্ট তথ্য পাবো না কোন কোন বৈশিষ্ট বিবর্তন কিভাবে হয়েছে সেটা ব্যাখ্যা বা পুর্ণনির্মান করার জন্য বা এমনকি বিলুপ্ত হয়েছে এমন কোন প্রজাতিতে, আমরা বলতে পারবো ঠিক কিভাবে এই সব বৈশিষ্টগুলো কাজ করতো (যেমন Stegosaurus দের পিঠের উপর সেই হাড়ের বর্মর মত প্লেটগুলো আসলে কি কাজ করতো?), তবে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট যে জীববিজ্ঞানীরা এমন কোন বৈশিষ্টর অভিযোজন পাননি যার বিবর্তনের জন্য অবশ্যই এমন কোন অন্তর্বতীকালিন পর্যায়ের প্রয়োজন হয় যা কিনা এর বাহকের ফিটনেস কমিয়ে দেয়।

এখানে আরো একটি পুর্বশর্তর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে: কোন একটি অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজনকে অবশ্যই বিবর্তিত হতে হবে এর বাহকের প্রজনন সাফল্য বৃদ্ধি করার মাধ্যমে। কারন হচ্ছে প্রজনন, বেচে থাকা নয়, যা নির্ধারণ করে কোন জীনগুলো পরবর্তী প্রজন্মের শরীরের হস্তান্তরিত হবে। অবশ্যই কোন একটি জীন পরবর্তী প্রজন্মের অংশ হবে কিনা তার জন্য প্রয়োজন, সেই জীনের বাহককে সেই বয়স পর্যন্ত বাচতে হবে, যে বয়সে সে প্রজননক্ষম ও সন্তান উৎপাদন করতে পারে। আবার অন্যদিকে কোন জীন যা কিনা প্রজননক্ষম বয়সের পর আপনার সমস্যা করে সেটি বিবর্তনীয় সমস্যা সৃষ্টি করেনা। জীনটি জীন পুলেই থেকে যায়। দেখা যায় যে জীন আপনাকে আপনার যৌবনে প্রজনন করতে সাহায্য করছে, সেই জীনই আপনাকে বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই সব জীনগুলোর পুন্জীভুত হওয়ার ব্যপারটাই  অনেকেই বিশ্বাস করেন ব্যাখ্যা করে আমাদের বৃদ্ধ বয়সে জ্বরাগ্রস্থ হবার কারণ। যে জীনগুলো আপনাকে আপনার প্রজনন সফল করেছিল সেগুলো আপনার বার্ধক্যে তারা আপনার চামড়া কুচকানো আর বড় প্রোস্টেট গ্রন্থি হবার কারন।

প্রাকৃতিক নির্বাচন যেভাবে কাজ করে, সে এমন কোন বৈশিষ্টকে সহায়তা করবে না বা সৃষ্টি করা উচিৎ না, যা কিনা কোন একক সদস্যকে বাচতে সাহায্য করবে কোন প্রকার প্রজনন সাফল্য না বাড়িয়ে। এর একটি উদহারণ যেমন হতে পারে সেই জীনগুলো যা মানব নারীদের মেনোপজ বা রজঃবিরতির পরও বাচতে সাহায্য করে। এবং আমরা এমন কোন অভিযোজনও দেখার আশা করবো না যেখানে কোন একটি প্রজাতি অন্য আরেকটি প্রজাতির সদস্যদের শুধু উপকার করে ।

আমরা এই শেষ প্রেডিকশনটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি, একটি প্রজাতির কোন বৈশিষ্ট পর্যবেক্ষন করে, যা দ্বিতীয় কোন প্রজাতির সদস্যদের জন্য উপযোগী। যদি সেই বৈশিষ্টগুলোর জন্ম হয় নির্বাচনের মাধ্যমে, তাহলে আমরা এটাও দেখতে পাবো যে তারা প্রথম প্রজাতির জন্যও উপকারী হবে। ট্রপিক্যাল অ্যাকাশিয়া গাছের কথাই ধরুন, যার বড়, ফাপা কাটা আছে, যেখানে খুব হিংস্র আক্রমনাত্মক কামড়ায় এমন এক ধরনের পিপড়া তাদের বসতি বানায়, এছাড়া গাছ টি এক ধরনের নেকটার আর প্রোটিন সমৃদ্ধে রস তৈরী করে যা পিপড়াদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। দেখে মনে হচ্ছে গাছটি পিপড়াদের থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করছে নিজের ক্ষতি করেই। তাহলে কি এটা আমাদের প্রেডিকশনটাকে ভুল প্রমান করছে? মোটেও না, বরং এই পিপড়াগুলোকে তার শরীরে বসবাস করতে দেবার মাধ্যমে গাছটি নিজেও অনেক উপকৃত হচ্ছে। প্রথমত, পাতা খায় এমন কোন কীটপতঙ্গকে বা স্তন্যপায়ী এরা এর কাছে আসে পাতা খেতে তাদের তাড়িয়ে দেয়ে হিংস্র এই পিপড়ার দল, যা আমি আবিষ্কার করেছিলাম একবার কোষ্টারিকায় এমন কোন গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময়। এছাড়া পিপড়া গুলো এই সব গাছের গুড়ির আশেপাশে নতুন গজিয়ে ওঠা কোন গাছের চারাদেরও কেটে ফেলে, যে চারাগুলো যখন বড় হবে এই গাছের সাথে খাদ্য আর আলোর জন্য প্রতিদ্বন্দীতা করতো। খুব সহজেই দেখা যায়, কিভাবে অ্যাকাশিয়ারা সক্ষম হয় পিপড়াদের ব্যবহার করতে, শিকারী প্রানী ও প্রতিদ্বন্দী উভয় থেকে নিজেদের সুরক্ষা করতে, তারা বেশী বীজ উৎপাদন করে সেই সব অ্যাকাশিয়াদের থেকে যারা এটি করতে পারে না। সবক্ষেত্রেই  যখন কোন একটি প্রজাতি অন্য একটি প্রজাতিকে সাহায্য করে কোন কিছু করার মাধ্যমে, এটি  নিজেও সাহায্য করে। এটি বিবর্তনের একটি প্রত্যক্ষ ভবিষ্যদ্বানী, যা ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন বা বিশেষভাবে সৃষ্টির মতবাদে যা ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।

কোন একটি অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজন অবশ্যই  প্রজাতির একক সদস্যর ফিটনেস বৃদ্ধি করবে সবসময়ই, কিন্তু আবশ্যিকভাবে প্রয়োজনীয় না পুরো প্রজাতি বা কোন গ্রুপের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটা। যদি প্রচলিত খুব, প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে প্রজাতির জন্য উত্তম এই ধারনাটি ভ্রান্ত কিছু ধারনার উপর ভিত্তি করে আছে।আসলেই বিবর্তন সেই সব বৈশিষ্ট সৃষ্টি করতে পারে যা, কোন একটি একক সদস্যকে সাহায্য করার মাধ্যমে পুরো প্রজাতির ক্ষতি করে। যখন একটি প্রাইড বা সিংহদের সামাজিক গ্রুপে পুরুষ সিংহদের সরিয়ে দিয়ে অনুপ্রবেশ করে অন্য পুরুষ সিংহরা, এই ঘটনার পর তারা নৃশংস ভাবে মায়ের দুধ খাওয়া সিংহ শাবকদের গণহারে হত্যা করে। প্রজাতির জন্য অবশ্যই ঘটনাটি খারাপ, কারন এটি পুরো সিংহ র সংখ্যা হ্রাস করে, যা তাদের বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। কিন্ত বিষয়টি অনুপ্রবেশকারী সিংহদের জন্য ভালো, তারা দ্রুত নারী সিংহদের আবার গর্ভবতী করে ফেলে ( যারা আবার শিশুদের দুধ না খাওয়ানোর ফলে পুনরায় ডিম্বানু উৎপাদন করে ) এবং তাদের নিজেদের সন্তান দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে নিহত শিশুদের জায়গা।খুবই সহজ যদিও অস্বস্তিকর, ব্যাপারটি বোঝা যে কিভাবে একটি জীন যা শিশুহত্যাকে উৎসাহিত করছে সেই জীনটি অপেক্ষাকৃত ভালো জীনের বদলে বিস্তার লাভ করার সুবিধা পাবে, যে ভালো জীনগুলো অনু্প্রবেশকারী সিংহদের বাধ্য করতো তাদের সাথে সম্পর্ক নেই এমন অনাত্মীয় সিংহশাবকদের পাহারা দেবার জন্য। যেভাবে বিবর্তন ভবিষ্যদ্বানী করে আমরা এমন কোন অভিযোজনীয় বৈশিষ্ট দেখবো না যা পুরো প্রজাতির উপকার করেছে, এর বাহক একক সদস্যটির ক্ষতি করে – যা আমরা হয়তো আশা করতে পারতাম যদি কোন দয়ালু ঈশ্বর প্রজাতিদের নিজ হাতে সৃষ্টি করতেন।

________________________________ চলবে

Advertisements
জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

2 thoughts on “জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

  1. sarmin বলেছেন:

    অসাধারণ লেখা। ভাবছি সিরিজটির সবগুলো লেখা দিয়ে একটি পিডিএফ ফাইল তৈরি করে ফেলব নাকি? তাহলে অফলাইনের বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করা যাবে।

    1. অনেক ধন্যবাদ :);ইচ্ছা আছে বছরের শেষ নাগাদ বইটার অনুবাদ আর বাড়তি সংযোজনগুলো শেষ করে বইটা প্রকাশ করবো। মুল লেখকের অনুমতিও জোগাড় করা হয়নি (যোগাযোগ করা হয়েছে); এই জন্য ছোট আকারে এই ব্লগেই। এছাড়া প্রথম ড্রাফট তো, আবার আমাকে নজর বোলাতে হবে সম্পাদনার জন্য। ধন্যবাদ পড়ার জন্য।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s