২৫ জুলাই, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের জন্মদিনে..

Rosalind-Franklin
ছবি: রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন

(২৫ জুলাই, ২০১৩ রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের জন্মদিনে লেখাটি ফেসবুকে লিখেছিলাম)

প্যাচানো মই এর মত ডিএনএ অনুর মডেলের স্কিমাটিক ডায়াগ্রামটিকে কখনো তুলনা করে বলা হয় বিজ্ঞানের মোনালিসা। ১৯৫৩ সালের শুরুর দিকে ফ্রান্সিস ক্রিক এবং জেমস ওয়াটসন ডিএনএ ডাবল হেলিক্স এর বিখ্যাত সুপরিচিত মডেলটি তৈরী করেন। কিন্তু খুব গুরুত্বপুর্ণ কিছু ডাটা, যেমন, মে ১৯৫২ সালে এক অসাধারণ বিজ্ঞানীর তোলা ডিএনএ অনুর বি ফর্মের একটি এক্সরে ডিফ্রাক্শন ফটোগ্রাফ নং ৫১ এবং হেলিক্স এর প্রতিটি টার্ণ এর পরিমাপ সংক্রান্ত হিসাব নিকাশের আভ্যন্তরীন রিপোর্টটি যদি গোপনে নানা হাত ঘুরে ওয়াটসন এবং ক্রিকের হাতে না আসতো, ডিএনএ অনুর মডেলটি তারা সেই সময় তৈরী করতে পারতেন না। সেই বিজ্ঞানীটির নাম রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ( ২৫ এ জুলাই ১৯২০ – ১৬ এপ্রিল ১৯৫৮) ।

18.-Rosalind-in-Alpine-hut
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন..

১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক এবং উইলকিন্স যখন ডিএনএ অনুর গঠন আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার জেতেন তখনও কারো জানা ছিল না তাদের আবিষ্কারের পেছনে ছিল রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন এর অবদান, যার স্বীকৃতি তার জীবদ্দশায় তারা দেননি। এর মাত্র কয়েক বছর আগে, ১৯৫৮ সালে ওভারিয়ান ক্যানসারে (দীর্ঘ সময় ধরে এক্সরে এক্সপোজারের কারনে) আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে রোজালিন্ড মৃত্যুবরণ করেন । কিংস কলেজে রোজালিন্ড তার গবেষনায় আগেই প্রমান করেছিলেন দুটি ফর্মের ডিএনএ র উপস্থিতি, বি ফর্মের ডিএনএ অনুর ফটো ৫১ এবং প্রায় ৫ মাস ধরে এর উপর জটিল সিলিন্ড্রিক্যাল প্যাটারসন ক্যালকুলেশন করে তিনি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন ডিএনএর ডাবল হেলিক্যাল আকৃতি এবং গণনা করেছিলেন এর নানা পরিমাপগুলো ( নভেম্বর ১৯৫১ র কিংস কলেজের একটি ইন্টারন্যাল সেমিনারে সেই ডাটা গুলো তিনি প্রকাশ করেছিলেন প্রথম)।

9231166_1
DNA গঠন রহস্য সমাধানের জন্য  নোবেল পেয়েছিলেন ক্রিক, ওয়াটসন এবং উইলকিন্স

১৯৫৩ র এপ্রিলে ন্যাচার এর সেই বিখ্যাত সংখ্যায় ৩ নং আর্টিকেল হিসাবে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল, যে সিরিজে প্রথম ছিল ওয়াটসন ক্রিকের সেই বিখ্যাত পেপারটি। সেই সময় ক্রমান্বয়ে বিষিয়ে ওঠা কিংস কলেজ থেকে রোজালিন্ড এর চলে যাবার প্রক্রিয়া চলছে। ব্রিকবেক কলেজে তার ফেলোশীপ স্থানান্তর করার সময় বায়োফিজিক্স ইউনিটের প্রধান জেমস রানডাল তাকে ডিএনএ নিয়ে আর কোন কাজ না করার শর্ত জুড়ে দেন এবং ডিএনএ র সব ডাটা ও ফটোগ্রাফ তাকে কিংস কলেজে সহকর্মী মরিস উইলকিন্স ( যার সাথে তার রেশারেশি ছিল শুরু থেকেই) এর কাছে রেখে আসতে হয়। জেমস ওয়াটসন তার বিখ্যাত বই The Double Helix এ প্রথম নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন রোজালিন্ডকে, কিন্তু আয়রনি হলো তিনি সেখানেই প্রকান্তরে উল্লেখ করেছিলেন ডিএনএ মডেল তৈরীতে রোজালিন্ড এর ডাটার প্রয়োজনীয় ভুমিকার কথা।

watson
ডিএনএ র মডেল এর সাথে ওয়াটসন এবং ক্রীক

ঠিক কতখানি এগিয়ে ছিলেন আসলে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ গঠন রহস্য উদ্ধারে.. খুব কাছে, ক্রিকের নিজের ভাষায় আর তিন মাসের মধ্যে তিনি রহস্যটি বের করে ফেলতেন। মনে রাখতে হবে রোজালিন্ড কিন্তু প্রথমেই বুঝেছিলেন ডিএনএ দুটি ফর্ম আছে, এর সর্পিলাকার মেরুদন্ডটির সব প্যারামিটার তার হাতে ছিল, তার নোটবুকে সব প্রমানই মেলে, তিনি A ফর্মের অ্যান্টি প্যারালাল রুপটি জানতেন, খুব বেশী সময় তার লাগতো না B ফর্মের অ্যান্টি প্যারালাল রুপটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় বাকী ছিল, সেটি হচ্ছে বেস পেয়ারিং, তার নোট বুকে স্পষ্ট আছে তিনি হাইড্রোজেন বন্ডের কথা জানতেন, রসায়নে ভালো দখল থাকার কারণে তিনি সহজেই জেরী ডোনাহুর প্রস্তাবটি ভালো করে বুঝেছিলেন, বেসগুলোর এনোল আর কিটো ফর্মও তার জানা ছিল, যা বেস পেয়ারিং এর জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়তা ছিল।তিনি শাগরাফ এর অনুপাত ও জানতেন। মুল যে বিষয়টি মনে করা হয় তার সময় নিয়েছিল তা হলো তিনি আসলে বি ফর্মটি নিয়ে তখন একটি পেপার লিখছিলেন, ১৯৫৩ র ১৭ মার্চ পেপারটি আবিষ্কার করেছিলেন অ্যারন ক্লুগ, যা লেখা হয়েছে মার্চের বহু আগেই। যখন তিনি জানতে পারলেন ওয়াটসন আর ক্রিক ডিএনএ র গঠন আবিষ্কার করে ফেলেছেন, তিনি পেপারটি সামান্য পরিবর্তিত করেন। এবং নেচারে তৃতীয় পেপার হিসাবে এটি প্রকাশ করে। তার ডাটা ছাড়া ওয়াটসন ক্রিক কোনভাবেই সম্ভব ছিলনা তাদের সমাধানে পৌছানোয়। কারন এই পেপারে ডাবল হেলিক্স এর কথা ছিল, এটা যদি আগে প্রকাশ পেত তাহলে ওয়াটসন ক্রিক দাবী করতে পারতেন তারা সেখান থেকে ডিএনএ আসল গঠন কি হবে সেটা বের করতে পেরেছেণ। সেক্ষেত্রে তাদেরকে সেখানে রোজালিন্ড এর বিষয়টি উল্লেখ করতে হতো। ইতিহাস থেকে রোজালিন্ড এর নামটি বাদ পড়তো না।

image1
টাইপ বি ডিএনএ র তোলা সেই বিখ্যাত ফটোগ্রাফ ৫১, এক্সরে ক্রিষ্টালোগ্রাফ, ছবিটি তুলেছিলেন রোজালিন্ড

রোজালিন্ড এর তোলা ডিএনএ এক্স রে ফটোগ্রাফ ৫১ এই বলে দিচ্ছে এর হেলিকাল একটি গঠন, ওয়াটসন ছবিটি হাতে পাবার পর উইলকিন্স এ ডিনারে নিয়ে যান, তাকে চাপ দেন এর ব্যাখ্যা দিতে। X মানে হেলিক্স এটা ছাড়া ওয়াটসন x ray diffraction ছবি কিছুই বুঝতেন না। মরিস উইলকিন্স তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে ছবিটি ইন্টারপ্রিট করতে হয়। MRC র রিপোর্ট থেকে অনেক কিছুই ওয়াটসন বুঝতে পেরেছিলেন, যেমন হাইড্রোফোবিক সুগার ফসফেট গ্রুপটা থাকবে বাইরের দিকে, ওয়াটসন ও ক্রিক যেমন সেটাকে ভিতরের দিকে রেখে কাজ করছিলেন এতদিন। মরিস উইলকিন্সই ওয়াটসনকে বলে রোজালিন্ড বলেছে এরা বাইরের দিকে থাকবে। ক্রিক রিপোর্টটি দেখার পর তারা তাদের মডেলটি ঠিক করেন।

এমনকি রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনেরও অজানা ছিল বিষয়টি, কারন ওয়াটসন এবং ক্রিক যে তার ফটোগ্রাফ ৫১ এবং এমআরসি র রিপোর্টটি ব্যবহার করেছিলেন তার অজান্তে এবং তার মারা যাবার আগ পর্যন্ত কোনদিনও তারা তা স্বীকার করেননি। যদিও ১৯৫৩ সালের পর রোজালিন্ড এর সাথে ক্রিক এবং ওয়াটসনের কিন্তু যোগাযোগ ছিল, যেমন ওয়াটসন তাকে ম্যাসাচুসেটস থেকে ক্যালিফোর্নিয়া ড্রাইভ করে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিংবা ক্রিক এবং তার স্ত্রীর সাথে স্পেনে অবকাশ যাপন এবং অসুস্থ অবস্থায় কেমব্রিজে ক্রিক দম্পতির বাসায় তিনি ছিলেনও কিছু দিন। কিন্তু আশ্চর্য তারা কেউই রোজালিন্ডের কাছে সেই কথা স্বীকার করেননি। এর কিংস কলেজ ছাড়ার পর প্রায় ১৭ টি মৌলিক গবেষনাপত্র তিনি লিখেছিলেন মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে। কয়লা, কার্বন আর ভাইরাসের উপর অসাধারণ গবেষনায় একজন বিশ্ব স্বীকৃত গবেষক হিসাবে তিনি মারা যান। তবে তার জানা হয়নি তিনি ছিলেন জীবনের মুল অনু, ডিএনএ র গঠন আবিষ্কারেরও একজন স্বীকৃতি বঞ্চিত নেপথ্য নায়িকা।

Advertisements
২৫ জুলাই, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের জন্মদিনে..

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s