জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

ছবি:  উপরে: Opuntia জীনাসের Opuntia littoralis var. vaseyi  (প্রিকলী পিয়ার ক্যাকটাস) ; নীচে: Ferocactus cylindraceus (ব্যারেল ক্যাকটাস)
Cacti দের প্রায় ১৬০০ প্রজাতি আছে, যারা আমেরিকার ( New World) মরু অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা। Cactaceae পরিবার খুবই বৈচিত্রময়, তারা বিবর্তিত হয়েছে  Rhodocactus এবং Pereskia সদৃশ উদ্ভিদ থেকে। পাতা হারানো আর মাংশল সালোক সংশ্লেষন সক্ষম কান্ড দুটি মুল ক্যাকটাস গ্রুপেই স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হয়েছে : Opuntioidea ( যেমন  the prickly pear cactus Opuntia cochenillifera যাদের চ্যাপ্টা প্যাডের মত কান্ড) এবং আরো বিবর্তিত Cactoidea ( যেমন the barrel cactus Ferocactus acanthodes); মরুভুমির মত আবহাওয়ায় এদের সফলভাবে বেচে থাকার জন্য দায়ী করা হয় তাদের পরিবহন নালীকার (vascular) বিবর্তনকে। কান্ডের স্ফীতি বা Stem succulence , পত্রহীনতা, (যা কন্টকে রুপান্তরিত হয়) ক্যাকট্যাস দের মধ্যেই কনভার্জেন্ট বৈশিষ্ট ( একই ধরণের প্রাকৃতিক নির্বাচনী চাপ যখন একই ধরনের বৈশিষ্ট সৃষ্টি করে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে); অথচ আমরা এই একই ধরনের বৈশিষ্ট দেখতে পাই পুরোনো পৃথিবী.. আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার মরুভুমির দেখা অন্যান্য সাকুলেন্ট দের মধ্যে যেমন: Euphorbiaceae আর Asclepiadaceae দের মধ্যে। এবার নীচের ছবি দেখুন:

উপরে Euphorbia resinifera , মরোক্কোর স্থানীয় এই উদ্ভিদটি কিন্তু ক্যাকটাস না, এটি ক্যাকটাসের মত একই বৈশিষ্ট বিবর্তিত করেছে একই ধরনের প্রাকৃতিক নির্বাচনী চাপে। নীচের ছবিটি Euphorbia enopla , দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় এরাও ইউফর্ব। সৃষ্টিবাদীরা যারা দাবী করেন বিভিন্ন প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে আলাদা আলাদা ভাবে তারা বায়োজিওগ্রাফীর এই সব প্রমানগুলোকে না দেখার ভান করেন। কেন একজন বুদ্ধিমান সৃষ্টি কর্তা এই আবহাওয়ার উপযোগী ভিন্ন প্রজাতির সব উদ্ভিদ সৃষ্টি করবেন, যাদের বাইরে থেকে দেখতে একই রকম দেখতে লাগে।  নতুন পৃথিবী ( আমেরিকা) র ক্যাকটাস আর পুরোনো পৃথিবী ( আফ্রিকা যেমন) র ইউফর্বরা মৌলিক ভাবে ভিন্ন অথব এই দুই সাকুলেন্ট গ্রুপের উদ্ভিদরা একই ধরনের কিছু বৈশিষ্ট প্রদর্শন করে। এটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব শুধু বিবর্তনের ধারণা দিয়েই । Euphorbiaceae পরিবারের প্রায় ৭৫০০ প্রজাতি আছে, ক্যাকটাসদের সাথে সবচেয়ে বেশী মিল দেখা যায় Euphorbia জীনাসের ৮৫০ টি সাকুলেন্ট। মুলত তারা আফ্রিকার আদিবাসী। ক্যাকটাসের যেমন পানির মত রস থাকে এদের আছে বিষাক্ত সাদা রস ( এটি অবশ্য কনভার্জেন্ট বিবর্তনের আরেকটি উদহারণ) ; ক্যাকটাসের সাথে এদের আলাদা করার আরেকটি উপায় হচ্ছে  ফুলের গঠন। তবে তাদের সাকুলেন্ট আর CAM ফটোসিনথেটিক কান্ড বিস্ময়করভাবে ক্যাকটাই দের মত।

জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব)
(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

Why Evolution Is True: Jerry A. Coyne

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায় : প্রথম পর্ব ;  দ্বিতীয় পর্ব ; তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্বশেষ পর্ব
তৃতীয় অধ্যায়: প্রথম পর্ব , দ্বিতীয় পর্ব , তৃতীয় পর্ব , শেষ পর্ব
চতুর্থ অধ্যায়: প্রথম পর্ব

জীবনের ভুগোল
মহাদেশ:

একটি বিশেষ পর্যবেক্ষন দিয়ে শুরু করি, যে বিষয়টি যারা অনেক জায়গায় ভ্রমন করেছেন তাদেরও দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। আমি যদি দুটো এলাকায় যান, যারা ভৌগলিকভাবে বহু দুরে অবস্থিত তবে তাদের একই ধরনের ভৌগলিক গঠন আর জলবায়ুর  সদৃশ্যতা আছে, সেখানে আপনি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সব জীবন দেখবেন। মরুভুমির কথা ধরুন, অনেক মরুভুমির উদ্ভিদই আসলে সাকুলেন্ট (Succulents: In botany, succulent plants, also known as succulents or sometimes fat plants, are plants having some parts that are more than normally thickened and fleshy, usually to retain water in arid climates or soil conditions. Succulent plants may store water in various structures, such as leaves and stems.) জাতীয় উদ্ভিদ: তারা কিছু বিশেষ অভিযোজনীয় কৌশল ব্যবহার করে, মরুভুমির বৈরী পরিবেশে টিকে থাকতে, যেমন আকারে বড়, ফোলা মাংশল কান্ড যেখানে পানি জমা থাকে, শিকারী প্রানী থেকে বাচার জন্য থাকে কাটা, খুব ছোট বা পাতা থাকেই না পানি যেন না হারায়। কিন্তু বিভিন্ন মরুভুমিতে বিভিন্ন ধরনের সাকুলেন্ট জাতীয় উদ্ভিদদের দেখা যায়, দক্ষিন আর উত্তর আমেরিকার মরুভুমিতে সাকুলেন্ট রা হচ্ছে ক্যাকটাস পরিবারের। কিন্তু এশিয়া অষ্ট্রেলিয়া আর আফ্রিকায় তারা আবার সম্পুর্ণ ভিন্ন পরিবারের সদস্য, ইউফর্বস (Euphorbia)। আপনি দুই ধরনের সাকুলেন্ট এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন, তাদের ফুল এবং তাদের স্যাপ বা কান্ড রস দিয়ে, ক্যাকটাসে যা স্বচ্ছ পানির মত, ইউফর্ব দের তা দুধের মত, স্বাদে যা তেতো। এইসব মৌলিক কিছু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ক্যাকটাস আর ইউফর্বরা দেখতে প্রায় একই রকম, আমার জানালায় দুই ধরনের সাকুলেন্ট আছে, এবং ট্যাগ ছাড়া তাদের পার্থক্য করতে পারবেন না অনেকেই।

কেনই বা কোন সৃষ্টিকর্তা  মৌলিকভাবে আলাদা কিন্তু দেখতে প্রায় একই রকম দুই ধরনের উদ্ভিদের সৃষ্টি করলেন, পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়, যে জায়গাগুলোর ভুপ্রাকৃতিক ও জলবায়ু আর পরিবেশগতভাবে একই রকম? একই প্রজাতির গাছগুলোকে একই ধরনের মাটি আর পরিবেশগতভাবে  জায়গায় সৃষ্টি করাটা কি তার জন্য বুদ্ধিমানের মত কাজ হতো না?

আপনি হয়তো উত্তর দিতে পারেন, যদিও মরুভুমিগুলো একই রকম দেখতে মনে হয়, কিন্তু সেখানকার পরিবেশগুলো খুব সুক্ষ্ম কিন্ত গুরুত্বপুর্ণ ভাবে ভিন্ন। আর ক্যাকটাস আর ইউফর্বদের সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের সেই সংশ্লিষ্ট পরিবেশের সাথে মানানসই করে।কিন্তু এই ব্যাখ্যা কাজ করেনা। কারন যখন ক্যাকটাস পুরোনো পৃথিবীর ( আমেরিকা মহাদেশ এর বাইরে)  মরুভুমিতে বিস্তারের সুযোগ করে দেয়া হয়,যেখানে প্রাকৃতিকভাবে তাদের পাওয়া যায়না, তারা কিন্তু বেশ ভালো ভাবেই বংশ বিস্তার করে।  যেমন উত্তর আমেরিকার প্রিকলি পিয়ার ক্যাকটাস, ১৮০০ র শুরুর দিকে যখন প্রথম অষ্ট্রেলিয়াতে এটি সুযোগ করে দেয়া হয় বংশ বিস্তারের জন্য, কারন বস তি স্থাপন কারীরা কখিনেয়াল বীটল (The cochineal Beatle, Dactylopius coccus);  যারা এই সব ক্যাকটাস খেয়ে বেচে থাকে তাদের থেকে একটি গাড় লাল রঙ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা ( যে রংটি পার্সিয়ার গালিচার লাল রঙ দেয়) করেছিল, কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে সেখানে প্রিকলী পিয়ার যেভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, যা রীতিমত ক্ষতিকর, হাজার হাজার একর চাষাবাদের জমি নষ্ট করেছিলো তাদের লাগামহীন বৃদ্ধি, এদের নিয়ন্ত্রন করার লক্ষ্যে বাধ্য করেছিলে দ্রুত তবে অকার্যকরী কিছু পদক্ষেপ নেবার জন্য। এই গাছটিকে অবশ্যই সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রন করা গেছে অবশেষে ১৯২৬ সালে, ক্যকটোব্লাসটিস মথ এর ব্যবহার করে, যাদের শুয়োপোকারা এই ক্যাকটাস খেয়ে বাচে, জৈববৈজ্ঞানিক উপায়ে কোন কিছু নিয়ন্ত্রন করার এটাই প্রথম  এবং সবচেয়ে সফল উদহারণ। অবশ্যই প্রিকলী পিয়ার অষ্ট্রেলিয়ার মরুভুমি তে খুব ভালোভাবে বাচতে ও বংশবিস্তার করতে পারে, যদিও সেখানকার স্থানীয় সাকুলেন্ট হলে ইউফর্ব।

ছবি: কখিনিয়াল বীটল থেকে লাল রঙ সংগ্রহ করা হয় ঐতিহ্যগতভাবে।

ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিদের একই ধরনের ভুমিকা পালন করার সবচেয়ে বিখ্যাত উদহারণ হলো মারসুপিয়াল স্তন্যপায়ীরা, যাদের মুলত অষ্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায় ( ভার্জিনিয়া অপাসাম একটি পরিচিত ব্যতিক্রম), এবং  পৃথিবীর আর বাকী জায়গায় প্রাধান্য বিস্তার করেছে প্লাসেন্টা নির্ভর স্তন্যপায়ীরা। দুটি গ্রুপের মধ্যেই গুরুত্বপুর্ণ অ্যানাটোমিক্যাল পার্থক্য দেখা যায় । বিশেষ করে তাদের প্রজনন তন্ত্র, ( প্রায় সব মারসুপিয়ালদের পেটে একটি থলি থাকে, যারা খুব পুরোপুরি গড়ে উঠে নি এমন বাচ্চার জন্ম দেয়, অন্যদিকে প্লাসেন্টাল প্রানীরা আরো খানিকটা সুগঠিত শিশুদের জন্ম দেয়।)  তাসত্ত্বেও অন্য নানাভাবে বেশ কিছু মারসুপিয়াল প্রানী আর প্লাসেন্টাল প্রানীরা বিস্ময়করভাবে সদৃশ। মাটিতে গর্ত করে থাকা মারসুপিয়াল মোল দেখতে ও কাজও করে প্লাসেন্টাল মোল দের মত। মারসুপিয়াল ইদুর রা আবার প্লাসেন্টাল ইদুরের মতই দেখতে, মারসুপিয়াল সুগার গ্লাইডার যা একগাছ থেকে অন্যগাছে গ্লাইড করে উড়ে যায় ঠিক উড়ন্ত কাঠবেড়ালীদের মত আর মারসুপিয়াল অ্যান্টইটার দেখতে ঠিক দক্ষিন আমেরিকার অ্যান্টইটারদের মতই।

আবারও কারো অবশ্যই প্রশ্ন করা উচিৎ: যদি প্রানীদের বিশেষভাবেই সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, কেন তাহলে সৃষ্টি কর্তা মৌলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রানীদের ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশে সৃষ্টি করেছেন, যারা কিনা দেখতে যেমন, একই কাজও একই রকমভাবে করে থাকে?  এমন কিন্তু না যে, অষ্ট্রেলিয়ায় মারসুপিয়ালরা কোন ভাবে সেখানকার প্লাসেন্টাল প্রানীদের চেয়ে কোন অংশে শ্রেষ্ঠ। কারন পরবর্তীতে সেখানে নিয়ে যাওয়া প্ল্যাসেন্টাল স্তন্যপায়ীরা খুব ভালো ভাবে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যেমন খরগোশ, যাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এখন তারা সংখ্যায় অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়ে খুব সমস্যার সৃষ্টি করেছে, তারা স্থানীয় মারসুপিয়াল বিলবি ( একটি ছোট স্তন্যপায়ী প্রানী যাদের লম্বা কান আছে )দের  অস্তিত্বই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। খরগোশদের এই বিস্ময়কর বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সংরক্ষনকারীরা চেষ্টা করছেন ইস্টার বানি র বদলে ইষ্টার বিলবীর প্রচলন করার জন্য। প্রতিটি বসন্তে চকলেটের বিলবীগুলো অষ্ট্রেলিয়ার সুপার মার্কেটের নানা দোকানের তাকে শোভা পায়।

25-08-2013 6-22-08 PM

ছবি: স্তন্যপায়ীদের কনভার্জেন্ট বিবর্তন। মারসুপিয়াল অ্যান্টইটার, ক্ষুদ্র গ্লাইডারস এবং মোল যারা অষ্ট্রেলিয়ায় বিবর্তিত হয়েছে, সম্পুর্ণ স্বতন্ত্রভাবে তাদের সমতুল্য আমেরিকাবাসী প্ল্যাসেন্টাল স্তন্যপায়ীদের থেকে।অথচ  বিস্ময়করভাবে তারা একই রকমভাবে দেখতে।

কোন সৃষ্টিবাদী, সেটা নোয়া র আর্ক বিশ্বাসী হোক বা অন্য কিছু হোক, কেউ এখনও পর্যন্ত কোন যুক্তি গ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কেন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জীবদেন, যারা দেখতে আকারে একই রকম, তাদের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় আমরা খুজে পাই। উত্তরে তারা যা করতে পারে,  তাহলো সৃষ্টিকর্তা সেই মনের ইচ্ছার কথা  দাবী করা, যা কোনভাবে প্রমান করার উপায় নেই। কিন্তু বিবর্তন প্রক্রিয়া পারে এই প্যাটার্ণটি ব্যাখ্যা করতে সেই সুপরিচিত প্রক্রিয়া করভারজেন্ট বিবর্তন এর মাধ্যমে। এবং ব্যাপারটা খুব সহজ সরল একটি প্রক্রিয়া। একই ধরনের কোন স্থানে বসবাসকারী প্রজাতিরা একই ধরনের নির্বাচনী চাপের মুখোমুখি হয় তাদের পরিবেশ থেকে, সুতরাং তারা একই ধরনের অভিযোজন বিবর্তিত করে বা কনভার্জ করে, তারা দেখতে ও কাজে সদৃশ হয় যদিও তারা সম্পর্ক যুক্ত না। তবে এই সব প্রজাতিরা তাদের মুল পার্থক্যগুলো ধরে রাখে যা তাদের অতীত পুর্বসুরী সম্বন্ধে আমাদের একটি ধারণা দেয়। (এ ধরণের কনভার্জেন্ট বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি বিখ্যাত উদহারন হচ্ছে,  আর্কটিক অঞ্চলের নানা ধরনের প্রানীদের সাদা রং এর ক্যামোফ্লেজ প্রক্রিয়া বেছে নেয়া  যেমন পোলার বিয়ার বা স্নোয়ি আওল); মারসুপিয়ালদের পুর্বসুরীরা অষ্ট্রেলিয়ায় বসতি গড়েছিল,আর প্ল্যাসেন্টা সহ প্রানীরা পৃথিবীর বাকী অঞ্চলে তাদের বসতি স্থাপন করেছিল। প্ল্যাসেন্টাল ও মারসুপিয়াল প্রানীরা পরে বহু প্রজাতিতে বিভাজিত হয়েছে, এবং সেই সব প্রজাতির প্রানীরা তাদের নিজস্ব পরিবেশে খাপ খাইয়েও নিয়েছে। যদি মাটির নীচে গর্ত করে বাস করে কোন প্রানী যদি বেশী সফল হয় টিকে থাকতে ও প্রজনন করতে, তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচন নেই প্রাণীর চোখের আকার সংকোচিত করবে এবং সেই প্রানীকে মাটি খোড়ার জন্য দেবে বড় বড় নোখ। সেই প্রানী মারসুপিয়াল কিংবা প্ল্যাসেন্টা সহ যাই হোন না কেন, কিন্তু তারপরও আপনি আপনার পুর্বসুরীদের কিছু বৈশিষ্ট ঠিকই বহন করবেন।

ক্যাকটাই আর  ইউফোর্বরাও এধরনের কনভার্জেন্ট বিবর্তনের বৈশিষ্ট প্রদর্শন করে। ইউফর্বদের পুর্বসুরীরা প্রাচীন ( পুরোনো.. আমেরিকা বাদে বাকী পৃথিবী) পৃথিবীতে আগে বসতি গড়েছিল এবং ক্যাকটাসদের পুর্বসুরীরা বসতি গড়েছিল আমেরিকায়। সেই সমস্ত  প্রজাতিরা  ঘটনাচক্রে বসতি গড়ে মরুভুমিতে তারা একই ধরনের অভিযোজনীয় বৈশিষ্ট বহন করে। আপনি যদি কোন শুষ্ক পরিবেশে উদ্ভিদ হতে চান, ভালো হবে আপনি যদি শক্ত আর পাতাবিহীন হতে পারেন, কান্ডটা মোটা সহ, যেখানে পানি জমিয়ে রাখা যায়। সেকারনেই ক্যাকটাস আর ইউফোর্বদের প্রাকৃতিক নির্বাচন একই আকারের আদলে গড়ে তুলেছে।

করভার্জেন্ট বিবর্তন প্রদর্শন করে বিবর্তন তত্ত্বের তিনটি অংশ একই সাথে কাজ করছে: একটি সাধারণ পুর্বসুরী প্রানী, প্রজাতিকরণ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন। একটি সাধারণ পুর্বসুরীর বিষয়টি ব্যাখ্যা দেয় কেন অস্ট্রেলীয় মারসুপিয়ালরা কিছু একই ধরনের বৈশিষ্ট বহন করে ( যেমন স্ত্রী সদস্যদের দুটি যোনী, দুটি জরায়ুর মুখ বা সার্ভিক্স সহ একটি জরায়ু আছে), অন্যদিকে প্লাসেন্টা সহ স্তন্যপায়ীদের আছে ভিন্ন সাধারন বৈশিষ্ট ( যেমন একটি দীর্ঘমেয়াদী প্লাসেন্টা বা জরায়ুর ফুল); প্রজাতিকরণ হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রতিটি সাধারন পুর্বসুরী জীব বহু ভিন্ন উত্তরসুরীর জন্ম দেয়। এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রতিটি প্রজাতিকে তার নিজস্ব পরিবেশের সাথে সুঅভিযোজিত করে। এগুলো সব একসাথে জড়ো করুন, আর এর সাথে যোগ করুন সেই সত্যটা , পৃথিবীর দুরবর্তী এলাকাগুলোয় ভুপ্রকৃতি আর জলবায়ুগত দিক থেকে একই রকম বাসযোগ্য পরিবেশ থাকতে পারে এবং আপনি একারনে করভারজেন্ট বিবর্তনও দেখবেন এবং এটি হচ্ছে মুলত প্রধান জৈবভৌগলিক প্যাটার্ণের খুব সরল ব্যাখ্যা ।

আর কিভাবে মারসুপিয়াল প্রানীরা অষ্ট্রেলিয়ায় পৌছেছে ? এটা আরেকটি বিবর্তনের গল্পের অংশ, যেটি আমাদের আরেকটি পরীক্ষা করা সম্ভব এমন ভবিষ্যদ্বানীর দিকে নিয়ে যায়। সবচেয়ে আদি মারসুপিয়াল কোন প্রানীর জীবাশ্ম প্রায় ৮০ মিলিয়ন বছর পুরোনো, আর অষ্ট্রেলিয়ায় সেটি পাওয়া যায়নি, এটি পাওয়া গেছে উত্তর আমেরিকায়। এরপর মারসুপিয়াল প্রানীরা বিবর্তিত হবার সাথে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়েছে আরো দক্ষিনে, এবং একসময় তারা বর্তমান দক্ষিন আমেরিকার একেবারে শেষ প্রান্তে পৌছায় প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে, মারসুপিয়াল প্রানীরা এরপর অষ্ট্রেলিয়ায় পৌছে মোটামুটি এর আরো ১০ মিলিয়ণ বছর পর। যেখানে তারা মোটামুটি ২০০ টি প্রজাতিকে বিভাজিত হয়, এবং যারা আজ সেখানেই বসবাস করছে।

কিন্তু কিভাবে তারা পার হলো দক্ষিন আটলান্টিক মহাসাগর? উত্তর হচ্ছে তখনও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের অস্তিত্বই ছিল না। যে সময় মারসুপিয়াল প্রানীরা অষ্ট্রেলিয়ায় তাদের বসতি গড়তে শুরু করেছিল, দক্ষিন আমেরিকা আর অষ্ট্রেলিয়া তখনও পরস্পরের সাথে সংযুক্ত ছিল দক্ষিনের একটি বিশাল সুপার মহাদেশ গন্ডোয়ানা র অংশ হিসাবে। অবশ্য ইতিমধ্যে এটি ভাঙ্গতে শুরু করেছে,  দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যা পরে সৃষ্টি করে আটলান্টিক মহাসাগর। কিন্তু তখনও দক্ষিন আমেরিকার শেষ প্রান্ত এখন যা অ্যান্টার্কটিকা, তার সাথে সংযুক্ত ছিল, আর অ্যান্টার্কটিকা এখন যেটি অষ্ট্রেলিয়া তার সাথে ছিল যুক্ত। যেহেতু মারসুপিয়াল প্রানীরা স্থলভুমির উপর দিয়েই দক্ষিন আমেরিকা থেকে অষ্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল, নিশ্চয়ই তাদেরকে সেই যাত্রার সময় অ্যান্টার্কটিকাও অতিক্রম করেছে সুতরাং বিবর্তনের জ্ঞান দিয়ে আমরা ভবিষ্যতদ্বানী করতে পারি যে, ৩০ বা ৪০ মিলিয়ন বছর আগের কোন এক সময় আমরা সেখানে মারসুপিয়াল দের জীবাশ্ম খুজে পাবো।

আর এই হাইপোথিসিসটি এতই শক্তিশালী যে,  বিজ্ঞানীদের তা এই মারসুপিয়াল জীবাশ্মর খোজে অ্যান্টার্কটিকা নিয়ে যায়। এবং ঠিকই, তারা সেখানে অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলার সেমুর দ্বীপে এক ডজনের বেশী মারসুপিয়াল প্রজাতির জীবাশ্ম খুজে পান ( তাদের বৈশিষ্টসুচক দাত আর চোয়ালের গঠন সহ); আর এই জায়গাটা দক্ষিন আমেরিকা আর অ্যান্টার্কটিকার মধ্যবর্তী সেই  সেই প্রাচীন একদা বরফমুক্ত পথের উপরই পড়ে। আর জীবাশ্মগুলোর বয়সই ঠিক সেই সময়ের কাঠামোয় পড়ে, ৩৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন বছর প্রাচীন। ১৯৮২ সালে একটি আবিষ্কারের পর মেরু জীবাশ্মবিদ উইলিয়াম জিনসমেইষ্টার দারুন খুশী হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ”বছরের পর বছর মানুষ ভেবেছিল মারসুপিয়ালদের এখানে পাওয়া যাবেই। অ্যান্টার্কটিকা সম্পর্কে করা সব ধারণাগুলো এটি একই সুত্রে গেথেছে, আমরা যা খুজে পেয়েছি সেটাই আমরা খুজে পাবো এমনটাই আশা করা হয়েছিল। ”

26-08-2013 12-43-28 AM

ছবি: কন্টিনেন্টাল ড্রিফট ব্যাখ্যা করে প্রাচীন উদ্ভিদ গ্লোসেপটেরিস এর বিবর্তনীয় বায়োজিওগ্রাফী। উপরে বর্তমান সময়ে গ্লোসেপটেরিস (Glossopteris) এর বিস্তার ( দাগাঙ্কিত)),বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে এটি বিভাজিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, যা এর বিস্তারকে ব্যাখ্যা করার বিষয়টি বেশ কঠিন করে তোলে। পাথরের উপর হিমবাহের আচড়ের প্যাটার্ণটাও রহস্যময়( তীর চিহ্ন); নীচে, পারমিয়ান পর্বে Glossopteris এর বিস্তার, যখন সব মহাদেশ একই সাথে যুক্ত ছিল একটি সুপার বা মহা মহাদেশে । তখনই এই প্যাটার্ণটি অর্থবহ হয়, কারন পারমিয়ান দক্ষিন মেরুকে ঘিরেই এই গাছটি বিস্তৃত ছিল খানিকটা নাতিশিতোষ্ণ জলবায়ু এলাকায়। এবং হিমবাহের যে আচড়ের প্যাটার্ণ যা আমরা দেখি তাও অর্থবহ হয়, কারন তারা সব পারমিয়ান দক্ষিন মেরু দিক থেকে বাইরের দিকে নির্দেশ করছে।

এছাড়া আর সব সেই অসংখ্য সদৃশ ( তবে একই নয়) প্রজাতি যারা একই ধরনের ভুপ্রকৃতিতে বসবাস করে অথচ ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশে তাদের বিস্তার কিভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? রেড ডিয়ার বাস করে উত্তর ইউরোপে কিন্তু এল্ক, যা দেখতে রেড ডিয়ারের মতই প্রায় তারা বাস করে উত্তর আমেরিকায়। Pipidae পরিবারের টাঙলেস অ্যাকোয়াটিক ব্যাঙ দেখা যায়  অনেক দুরবর্তী বিচ্ছিন্ন দুটি এলাকায়: পুর্ব উত্তর আমেরিকা এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলের নীচের আফ্রিকায়। এবং আমরা এর আগেই দেখেছি পুর্ব এশিয়ার উদ্ভিদ রাজি আর পুর্ব ‍উত্তর আমেরিকার উদ্ভিদরাজির মধ্যে সদৃশ্যতা। এই পর্যবেক্ষনগুলো বিবর্তনবিদদের জন্য অবশ্যই অবোধ্য হতো যদি মহাদেশগুলো চিরকালই এখন যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতো। কোন উপায়ই ছিল না, পুর্বসুরী ম্যাগনোলিয়া উদ্ভিদের সুদুর চীন থেকে অ্যালাবামায় ছড়িয়ে পড়া বা কোন সুপেয় পানির ব্যাঙ এর পক্ষে আফ্রিকা আর দক্ষিন আমেরিকার মধ্যে মহাসাগর পাড়ি দেয়া কিংবা কোন পুর্বসুরী হরিনের ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকায় আসার কোন উপায়ই থাকতো না। কিন্তু আমরা এখন খুব ভালোভাবে জানি কিভাবে এই বিস্তার সম্ভব হয়েছে: এর কারন বিভিন্ন মহাদেশে এর মধ্যে বিদ্যমান প্রাচীন স্থল সংযোগের অস্তিত্ত্ব (তবে অতীতে বায়োজিওগ্রাফারদের কল্পিত বিশাল স্থল সেতু নয়, এটি ভিন্ন); এশিয়া আর উত্তর আমেরিকা  একসময় খুব ভালোভোবে যুক্ত ছিল বেরিং স্থল সেতু সংযোগের মাধ্যমে, যার মাধ্যমে উদ্ভিদ এবং স্তন্যপায়ী (মানুষ সহ) প্রানীরা একসময় উত্তর আমেরিকায় বসতি গড়েছিল। এবং দক্ষিন আমেরিকা আর আফ্রিকা একসময় যুক্ত ছিল গন্ডোওয়ানা র সাথে।

একবার যখন জীবরা ছড়িয়ে পড়ে আর সার্থকভাবে নতুন এলাকায় বসতি স্থাপন করে, সেখানেই প্রায়ই তারা বিবর্তিত হয়, এবং সেটাই আমাদের আরো একটি ভবিষ্যদ্বানী করার সাহস যোগায় যা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি প্রথম অধ্যায়ে। যদি বিবর্তন ঘটে থাকে,তাহলে কোন একটি এলাকায় বসবাসরত প্রজাতিরা উত্তরসুরী হবে সেই একই এলাকায় বাস করতো এমন পুর্বসুরী প্রজাতিদের। সুতরাং যদি আমরা কোন একটি এলাকায় অপেক্ষাকৃত কম গভীর শিলাস্তরে খনন করি, আমাদের সেই সব জীবাশ্ম খুজে পাওয়া উচিৎ যা,  বর্তমানে সেখানে জীবিত প্রানীদের সদৃশ হবে।

এবং ঠিক সেটাই পাওয়া যায়। কোথায় আমরা  জীবাশ্ম ক্যাঙ্গারুদের খুজে পাই যা কিনা বর্তমানে জীবিত ক্যাঙ্গারুদের মত দেখতে ? অষ্ট্রেলিয়াতেই । এছাড়া যেমন ধরুন নতুন পৃথিবীর আর্মাডিলো। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে আর্মাডিলোরা অন্যন্য কারন তাদের শরীরে হাড়ের একটি কারাপেস বা আবরণ আছে। স্প্যানিশ ভাষায় এর অর্থ ’বর্ম সহ ছোট কিছু’; তাদের শুধু উত্তর, মধ্য আর দক্ষিন আমেরিকায় পাওয়া যায়। কোথায় আমরা জীবাশ্ম পাবো তাদের মত একই রকম দেখতে? আমেরিকাতেই, যেখানে glyptodonts রা বাস করতো, সেই তৃণভোজী শরীরের হাড়ের বর্ম সহ প্রানীরা যারা দেখতে আকারে বড় সাইজের একটি আর্মাডিলোর মত। এর মধ্যে কিছু প্রাচীন আর্মাডিলো আকারে প্রায় ভক্সওয়াগন বীটল গাড়ির মত বড়, ওজনে এক টন, এবং শরীর ঢাকা থাকতে কয়েক ইন্চি মোটা হাড়ের বর্মর মত আবরণে, যাদের লেজের কাটা ওয়াল বলের মত থাকতো যা তারা চাবুকের এর মত আত্মরক্ষায় বা আক্রমনে ব্যবহার করতো। সৃষ্টিবাদীদের উপর কঠিন চাপ আছে  এইসব প্যাটার্ণ ব্যাখ্যা করার জন্য: আর সেই কাজটা করতে হলে,  তাদের এমন কিছু প্রস্তাব করতে হবে,  সেখানে অসংখ্য ধারাবাহিক ভাবে একের পর এক প্রজাতি বিলুপ্তি আর সৃষ্টি হয়েছে সারা বিশ্ব জুড়ে, এবং প্রতিটি সেট নতুনভাবে সৃষ্ট প্রজাতিগুলো এর প্রাচীন তম পুর্বসুরীদের সদৃশ যারা একই এলাকায় বসবাস করতো। নোয়া র সেই আর্ক বা নৌকা থেকে আমরা বহুদুর এসেছি।

জীবাশ্ম পুর্বসুরী আর উত্তরসুরীদের এই একই এলাকায় খুজে পাওয়ার এই বিষয়টি বিবর্তন জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বানীটির জন্ম দিয়েছিল, The Descent of Man এ ডারউইনের হাইপোথিসিসটি, যা প্রস্তাব করেছিল মানুষ বিবর্তিত হয়েছে আফ্রিকায়:

খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়, মানুষের জন্মস্থান ছিল কোথায়, বিবর্তনের সেই পর্যায়ে যখন আমাদের পুর্বসুরী প্রানীরা কাটারাইন গোষ্ঠী ( প্রাচীন পৃথিবীর বানর এবং এইপ বা নরবাণরা) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিভাজনের মাধ্যমে? তারা যে এই গোষ্ঠীর উত্তরসুরী এই বাস্তব সত্যটি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে তারা প্রাচীন পৃথিবীতে বসবাস করতো কিন্তু অষ্ট্রেলিয়া বা কোন মহাসাগরীয় দ্বীপে না,  আমরা ভৌগলিক বিস্তারের সুত্রানুযায়ী এ অনুসিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি। প্রতিটি বিশাল এলাকায় জীবিত স্তন্যপায়ীরা সেই একই এলাকায় বিলুপ্ত হওয়া প্রজাতিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত।আর সেকারণেই সম্ভাবনা আছে যে আফ্রিকায় কোন এক সময় বসবাস করতো বিলুপ্ত এইপ বা নরবানররা যারা গরিলা বা শিম্পান্জিদের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। আর যেহেতু এই দুটি প্রজাতি মানুষের নিকটতম আত্মীয়, তাই বলা যেতে পারে আমাদের আদি পুর্বসুরী প্রানীরাও অন্য কোন মহাদেশের চেয়ে আফ্রিকা মহাদেশে বসবাস করার সম্ভাবনাটাই বেশী।

যখন ডারউইন এই ভবিষ্যদ্বানীটি করেছিলেন, তখনও কেউ কোন আদি মানুষের জীবাশ্ম দেখেনি, আমরা অষ্টম অধ্যায়ে দেখবো, তাদের প্রথম পাওয়া গিয়েছিল  ১৯২৪ সালে – এবং আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন, আফ্রিকাতেই। এইপ মানুষের অন্তর্বতীকালীন অসংখ্য জীবাশ্ম যা এর পর আবিষ্কৃত হয়েছে, সবচেয়ে প্রাচীনতম গুলো সবসময়ই পাওয়া গেছে আফ্রিকায়, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করে ডারউইনের ভবিষ্যদ্বানী নির্ভুল ছিল।

বায়োজিওগ্রাফি শুধু প্রেডিকশনই করে না, এটি অমীমাংসিত ধাধারও উত্তর দেয়। যেমন একটি হচ্ছে হিমবাহ আর জীবাশ্ম বৃক্ষ নিয়ে। ভুতাত্ত্বিকরা বহুদিন আগে থেকেই জানতেন দক্ষিনের সব মহাদেশ বা উপমাহদেশগুলো পারমিয়ান পর্বে হিমবাহের ব্যপক আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল প্রায় ২৯০ মিলিয়ন বছর আগে, আর আমরা এটা জানি কারন হিমবাহ গতিশীল, আর যে পাথর কনা তারা বহন করে এর নীচের পাথরের স্তরে আচড় সৃষ্টি করে। আর এই আচড়ের দিক নির্দেশ করে কোন পথে হিমবাহ গতিশীল।

দক্ষিনের মহাদেশগুলোর পারমিয়ান শিলায় হিমবাহর আচড় লক্ষ্য করলে আপনি বেশ অদ্ভুত একটি প্যাটার্ন লক্ষ্য করবেন।  মনে হবে হিমবাহ স্তরের সুচনা হয়েছিল মধ্য আফ্রিকার মত কোন এলাকা থেকে, যাএখন খুবই উষ্ণ অঞ্চল এবং আরো বেশী বিভ্রান্তকর, মনে হয় এটি সাগর থেকে মহাদেশের দিকে স্থান পরিবর্তন করে (ছবিতে তীরের দিক নির্দেশনা গুলো লক্ষ্য করুন); কিন্তু, এটাতো অসম্ভব: হিমবাহ সৃষ্টি হয় শুধুমাত্র শুকনো স্থলভুমির উপর অপরিবর্তনশীল শীতল জলবায়ুতে। যখন বার বার পড়া তুষার জমে তার ভারের চাপে কঠিন বরফ এ পরিণত হয়, যা এর ওজনের কারনে নড়তে শুরু করে; তাহলে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা দেবেন এই অদ্ভুত হিমাবাহের দাগের প্যাটার্ণের আর আপাতদৃষ্টিতে সাগরে হিমবাহের সৃষ্টি হবার ব্যাপারটি?


ছবি: Glossopteris browniana fossil in the Artis zoo, Amsterdam.

এই ধাধার আরো একটি অংশ বাকী আছে, এটি হিমবাহের আচড়ের দাগের প্যাটার্ণ নয় বরং জীবাশ্ম উদ্ভিদ এর বিস্তার এর প্যাটার্ণ, Glossopteris জিনাস এর নানা প্রজাতির সদস্যদের। এরা মুলত কনিফার জাতীয় উদ্ভিদ তবে তাদের সুই এর মত পাতার বদলে ছিল প্রশস্ত জিহবার মত পাতা ( গ্রীক ভাষায় glossa  মানে জিহবা)।  Glossopteris পারমিয়ান পর্বের উদ্ভিদ জগতে অন্যতম প্রাধান্য বিস্তারকারী উদ্ভিদ ছিল। বেশ কিছু কারনেই উদ্ভিদবিদরা বিশ্বাস করেন তারা আসলে ডিসাইডুয়াস ( যারা হেমন্তের সময় তাদের পাতা ঝরিয়ে ফেলে এবং বসন্তে আবার নতুন করে পাতা হয়): তাদের কান্ডে গ্রোথ রিং আছে যা তাদের বৃদ্ধির ঋতু বৈষম্যের ইঙ্গিত করে। এবং বেশ কিছু বিশেষায়িত বৈশিষ্ট যা প্রমান করে এর পাতাগুলো গাছ থেকে পড়ে যাবার জন্য বিশেষায়িত, এগুলো এবং আরো কিছু বৈশিষ্ট প্রমান করে এরা টেম্পারেট কোন এলাকায় বাস করতে যেখানে খুব ঠান্ডা শীতকাল ছিল।


ছবি: Location of Glossopteris remains shown in green in the former Supercontinent Gondwana.

আপনি যখন  Glossopteris  এর জীবাশ্মগুলোর বিস্তার দক্ষিন গোলার্ধের মানচিত্রের মধ্যে প্লট করবেন, শুধু সেই অঞ্চলগুলোয় তাদের মুলত পাওয়া গেছে যেখানে (ছবি), সেটি একটি অদ্ভুত প্যাটার্ন তৈরী করে, পুরো দক্ষিনের মহাদেশগুলোয় যেন তারা বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই প্যাটার্ণটি সমুদ্রের পানির মাধ্যমে বীজের বিস্তার ব্যাখ্যা করতে পারেনা কারন এর বড় ভারী বীজ ছিল এবং তারা অবশ্যই ভাসতো না। তাহলে কি এটা বিভিন্ন মহাদেশে গাছের বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়েছে তার প্রমান কি? না এত তাড়াতাড়ি সেই সিদ্ধান্তে আসা যাবে না।

এই দুটি ধাধার সমাধান মেলে যখন আমরা অনুধাবন করতে পারি আজকে যেখানে দক্ষিণের মহাদেশগুলো আছে, তারা আসলে কোথায় ছিল লেট পারমিয়ান পর্বে (ছবি); তারা সব জিগস পাজল এর টুকরোর মত পরস্পর সংযুক্ত ছিল একটি বিশাল মহা মহাদেশ গণ্ডোয়ানা হিসাবে। এবং যখনই আপনি এই অংশগুলো পাশাপাশি রাখবেন, হিমবাহ আচড়ের দাগ এবং উদ্ভিদের জীবাশ্মদের বিস্তার হঠাৎ করেই বোধগম্য হয়ে উঠে। এই দাগগুলো দেখা যাবে আসলে সবগুলোই অ্যান্টার্কটিকার কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে মুখ করে আছে, যা একসময় গন্ডোয়ানার অংশই ছিল এবং পারমিয়ান পর্বে যে পুরো মহাদেশটি দক্ষিন মেরু অতিক্রম করছিল। আর এখানেই বরফ সম্ভবত বিশালাকার আর বিস্তৃত হিমবাহর সৃষ্টি করেছিল, যা ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে এখান থেকেই, তাই আমরা এখন যেভাবে দেখছি সেভাবেই আচড় কেটেছিল পাথরে। যখন Glossopteris এর বিস্তার এর উপাত্ত এই মহাদেশের  মানচিত্রের উপর প্লট করে দেখা হয়, তখন আর এর বিস্তারের পাটার্ণটিকে আগের মত এলোমেলো মনে হয় না। সমস্ত বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলো একটার সাথে অন্যটা যুক্ত হয়। যা এটা গোলাকৃতির আঙটির মত হিমবাহের প্রান্ত বরাবর অবস্থান করে। আর ঠিক সেই জায়গাগুলোই আসলে শীতল অঞ্চল, যেখানে টেম্পারেট পর্ণমোচী কোন বৃক্ষ খুজে পাওয়া সম্ভব।

সুতরাং আসলে কোন উদ্ভিদ  এক মহাদেশ থেকে দুরবর্তী অন্য কোন মহাদেশে অভিপ্রয়ান করেনি, মহাদেশগুলোই নিজেরাই সরে গেছে তাদের আগের সেই অবস্থান থেকে,  আর তাদের সাথেই সরে গেছে তাদের উপর দাড়িয়ে থাকা উদ্ভিদরা। এই ধাধার অর্থ কেবল হতে পারে বিবর্তনের আলোকে, আর অন্যদিকে সৃষ্টিবাদীরা এর ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম, তারা না পারে হিমবাহ আচড়ের প্যাটার্ণ বা Glossopteris দের অদ্ভুত সামঞ্জষ্যহীন বিচ্ছিণ্ন  বিস্তারের ব্যাখ্যা দেবার জন্য।

এই গল্পের একটি করুন পাদটীকা আছে। যখন দক্ষিন মেরুতে প্রথম মানুষ হবার ব্যার্থ প্রচেষ্টার পর (নরওয়ের রোয়াল্ড অ্যামুন্ডসনের টিম সেখানে একদিন আগে পৌছে ছিলেন) যখন তীব্রশীত আর খাদ্যের অভাবে মৃত রবার্ট স্কট এর দলকে খুজে পাওয়া যায় ১৯১২ সালে, তাদের নিথর মৃতদেহর পাথে প্রায় ৩৪ পাউন্ড Glossopteris ফসিল পাওয়া যায় ;বেচে থাকার প্রচেষ্টায় তারা বহু সরঞ্জাম ফেলে দিলেও স্কটের দল তীব্র শীতের মধ্যে ফসিলে ভারী পাথরগুলো টেনে নিয়ে এসেছিলেন তাদের শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করা অবধি, কোন সন্দেহ নেই এই ফসিলের গুরুত্ব তারা বুঝতে পেরেছিলেন। অ্যান্টার্কটিকায় প্রথম খুজে পাওয়া Glossopteris জীবাশ্ম ছিল সেটি।

((( এখানে একটি ভিডিও আছে : http://www.nhm.ac.uk/nature-online/earth/fossils/glossopteris/)

মহাদেশে জীবনের প্যার্টার্ণ কোন সন্দেহ নেই বিবর্তনের স্বপক্ষে জোরালো প্রমান, তবে আমরা কিছুক্ষন পরেই দেখবো যে বিভিন্ন দ্বীপে জীবনের প্যাটার্ণ তার চেয়ে আরো বেশী জোরালো প্রমান দেয় বিবর্তনের।

_____________________ চলবে

 

Advertisements
জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s